বেশ কিছুদিন ধরে একটা ভাবনা মাথায় ঘোঁট পাকাচ্ছে। লেখার তাগিদ অনুভব করিনি। সাম্প্রতিক একটা ঘটনায় ভাবনার সাথে সযতনে যোগসূত্র ঘটিয়ে এবং এরপর প্রাসংগিকতার সফল সম্ভাবনা দেখে ব্লগীয় ডায়েরিতে স্থান দিচ্ছি। পরম্পরা ভেঙ্গে ঘটনাটাই আগে বলি। সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী ছাত্রদের একটা সংগঠন আছে। এর ওয়েবসাইট থেকে আমার নাম এবং ইমেইল এড্রেস নিয়ে প্রায় বছরখানেক আগে জাপানের কোবে-তে থাকা একজন বাংলাদেশী মেয়ে সৌজন্য মেইল করেন। এরপর থেকে তার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কখনো দেখা না হলেও নিয়মিত কথা হয়। গত সোমবার তার বড়ভাইয়ের ব্যবসার কাজে টোকিও আসা উপলক্ষ্যে মেয়েটাও সাথে আসে এবং আমার অনুরোধে দু'জনেই আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।
ভাইটি মধ্য ত্রিশের। সফল ব্যবসায়ী। দেশে থাকেন মাসের ১২/১৩ দিন। বাকিটা সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ব্যবসার দেখভালে ঘুরে বেড়ান। আলাপে জানলাম তাঁর আজকের অবস্থানের পেছনে সংগ্রামের ইতিহাসটুকু। একশ্রেণীর মানুষ সফলতার তৃপ্তিজনক পর্যায়ে এসে নিজের দারিদ্র্যক্লিষ্ট, শীর্ণ অতীতের বর্ণনায় একধরণের সুখ পান। খুব স্বাভাবিক এবং পরিশীলিত একধরণের অনুভূতি। কালো পেছনটাকে স্মরণ করে সিঁড়ির ধাপ পেরুনোর দীপ্ত চলাটাকে উপভোগ করেন বলেই বারবার এ বিষয়টি তাঁরা নিজেদের সামনে আনেন। এ প্রবণতাতে আমি কোন দোষ দেখিনা। এ ভাইটিও খুব গর্বভরেই বললেন তাঁর পিওন বাবার কথা, স্নাতক পর্যায়ে পড়ার ব্যাপারে বাবার বাধা দেবার কথা, টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর লড়াইটুকুর কথা। বললেন, পাশ করে দ্বারে দ্বারে চাকরির জন্য ঘুরে কত অপমানের মুখোমুখি হয়েছেন সেসব কথা। প্রচণ্ড মানসিক শক্তি আর আত্মবিশ্বাসের জোরে প্রথম চাকুরির চ্যালেঞ্জটি কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন, সেকথা। নানা ঘাট পেরিয়ে, চৌদ্দ বছরের পরিশ্রমে সম্পূর্ণ নিজের হাতে গড়া ব্যবসার বয়ান শুনছিলাম তাঁর মুখে।
জানলাম তাঁর ব্যবসার মূলধন আজ ছয়শ কোটি টাকা। একটু ধাক্কামতন খেলাম। এত ধনাঢ্য ব্যক্তি আমার বাসায় অতিথি হয়ে আসাতো দূরের কথা, আমি কখনো চোখেও দেখিনি। সামান্য সময়ের জন্য থাকার ইচ্ছে নিয়ে আসলেও আমাদের জোরাজুরিতে রাতটুকু থেকে গেলেন। দু'টো মানুষকে আমি গভীর মনোযোগে বুঝতে চাইলাম। আমার মুগ্ধতার জায়গাটুকু হলো তাদের একেবারে নিরহংকার জীবনবোধ। অবশ্যই এত অল্প চেনায়, অল্প সময়ে মানুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে উপসংহার টানা বোকামি হিসেবেই আখ্যায়িত হতে পারে। কিন্তু দৃশ্যত কোন উন্নাসিকতা আচরণে ধরা পড়লে আমার চোখ এড়াতোনা, এতটুকু আত্মবিশ্বাস আছে। চলনে, কথায়, মানসিকতায় বিত্ত-প্রতিপত্তির ন্যূনতম কোন ছাপ যাতে না পড়ে, এ বিষয়ে ভাই-বোন একধরণের বাড়তি সতর্কতায় ছিলেন যেন। খুব বড়লোকদের সম্পর্কে আমার অন্যরকম ধারণা ছিলো বলেই হয়ত বিস্ময়ের মাত্রাটাও একটু বেশি হয়ে গেছে। মানুষ হিসেবে সৌন্দর্য্য যে কয়টা আচরণে পরিস্ফূটিত হয়ে - বিনয় আর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এ দু'টো বিষয়কে কেউ যখন জীবনাচরণের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে নিজের অবস্থান বিবেচনার পরেও, তখন তাকে আমি নিখাদ ভালোলাগাটুকু জানাতে কার্পণ্য করিনা।
এবার আমার ঘোঁট পাকানো ভাবনাটা নিয়ে বলি। মানুষ মাত্রেই হয়ত স্টেরিওটাইপিংটা চর্চা করে। এটা সীমাবদ্ধতা না স্বাভাবিকতা, দ্বিধায় পড়ে যাই। আমি যেখানে আছি গত তিন বছর ধরে সেখানে দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের সাথে মেলামেশার সুযোগ হচ্ছে। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, বিভিন্ন জেলার, বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থানের, বিভিন্ন মেধাস্তরের এবং যোগ্যতার। যেটা হতে দেখি, কারো সাথে পরিচয়ের শুরুতেই আমরা প্রথমে জানতে চাই তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং এরপরেই তার জেলা। সাধারণত জেলাভিত্তিক কিছু বৈশিষ্ট্য দিয়ে আমরা ব্যক্তি মানুষকে নিরীক্ষণ করতে চাই। আর যোগ্যতার প্রশ্নে জানতে চাই তার শিক্ষাগত পরিমণ্ডলের কথা। আমি অবশ্যই কাউকে দোষারোপ করছিনা বা নিজেকেও এর বাইরে গণ্য করছিনা। শুধু ভাবতে চাইছি এ প্রবণতাটাকে আমরা চর্চা করবো কিনা। আমাদের উচ্চশিক্ষিত, আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠার নিরন্তর ছুটে চলায় এ ভাবনাগুলো কালো ছায়া ফেলছে কিনা। বরিশাল, নোয়াখালীর একজন থেকে আমি অবশ্যই বেশী গ্রহণীয় এবং সদাচারী, এ কথা ভাবতে আমাদের তৃপ্তি হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে আসলেই আমরা একধরণের অহমিকায় ভুগি। বি.আই.টি. গুলোর DUET, CUET, RUET, KUET হয়ে BUET এর অনুকরণের এবং সমমানে আসার বেহায়াপনাকে আমরা টিপ্পনির বিষয়বস্তু করি। নিজের চেয়ে একটু কমমানের কোন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমরা অবলীলায় কটু মন্তব্য ছুঁড়ে দেই। সে প্রতিষ্ঠানের একজনের চেয়ে আমি যে উপরের তলার, তা ভুলতে চাইনা। পাবলিক থেকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে কতদিকে ছোট হয়ে আছে, এ ব্যাপারটা আমরা সময়, সুযোগমত একজনকে মনে করিয়ে দিতে ভুল করিনা। বিজ্ঞানের ছাত্ররা মানবিক শাখার পড়াশোনাকে 'কিছুই না' বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়। বড় শহরে বড় হওয়া, পড়াশোনা করা একজন মফস্বলের একজন সম্পর্কে শুরুতেই অবজ্ঞার ভাব এনে নিজেকে খানিক অভিজাত ভেবে সুখ পায়। চাকুরীজীবী একজন নারী পুরোপুরি গৃহিনী একজনকে প্রকাশ্য করুণার চোখে দেখেন।
নিজেকে বড় ভাবার এই প্রবৃত্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেন মহামানবেরা। আমরা সকলেই জীবনের কোন না কোন ক্ষেত্রে নিজের অবস্থানের নিরীখে অহংকার আর অন্যকে আন্ডারেস্টিমেশনের শর্টকাট রাস্তায় চলে যাই। সেটা কি সমর্থনযোগ্য? আমার বিনয়ই কি সংজ্ঞায়িত করবেনা আমি আসলেই কতটা উপর তলার?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

