রিংকু কোচিং-এ আসার পর থেকেই চুপচাপ থাকতো। তবে ছেলেটি যথেষ্ট ভদ্র। ব্যবহারও সুন্দর। ওর সাথে পরিচিত হবার পর হঠাৎ করে মনে হতে থাকলো যে ছেলেটি অহংকারী। মনে হবার যথেষ্ট কারণ ছিল। ওর কাছে রোল জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতো না। শুধু বলতো, "মানুষকে কিছু জিনিস জিজ্ঞেস করতে হয়না। রোল তার একটা।" আমি ভাবতাম বলতে যখন চায়না তখন কি আর করার। রিংকু আমার অনেক ভাল বন্ধু হলেও এখন পর্যন্ত ওকে আর ওর রোল জিজ্ঞেস করিনি।
একসময় আমার মনে হল রিংকু আমার কাছে কিছু একটা লুকোচ্ছে। রিংকু আমাদের শিক্ষককে বলল ও প্রথম পার্বিক পরীক্ষা নাকি দেবেনা। কারণ জিজ্ঞেস করাতে আমাকে কিছু বলল না। একদিন রিংকু আমাদের শিক্ষককে বলল, "স্যার, আমাদের সবার মধ্যে মুন্না সবচেয়ে একটিভ।" (উল্লেখ্য, কোচিং-এ আমার চেয়ে শয়তান দুইটা নেই।) আমি কথাটা শুনে রিংকুকে বললাম, "এটা কেমন কথা বললি? তুই কি কম একটিভ?" রিংকু শুধু হাসলো। কিছু বলল না। ছুটির পরে আমাকে নিয়ে বের হয়ে রিংকু আমাকে আস্তে করে বলল, "আমি কিভাবে একটিভ থাকবো রে। আমারতো ক্যান্সার।" আমি থমকে গেলাম। বলার মতো কোন ভাষা আমার মুখে ছিলনা। শুধু মনে হচ্ছিল আমার বুকের ভিতরে কি যেন একটা হয়ে গেল। এই ছেলেটা ক্যান্সারের মতো ভয়াবহ একটা রোগ নিয়ে এতটা স্বাভাবিক। খুব লক্ষ করলাম। ও কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে বলেছে যেন ক্যান্সার একটা কমন রোগ। সবার-ই দুই একবার হয়।
ওর কথা শেষ হয়েছিল না। আমি সামলে উঠে কিছু প্রশ্ন করলাম।
আমিঃ আচ্ছা রিংকু। চোর কিসের ক্যান্সার? মানে ক্যান্সারতো দেহের অনেক স্থানেই হয়।
রিংকুঃ আমার ব্লাড ক্যান্সার।
আমিঃ কতোদিন হল?
রিংকুঃ দুইবছর হল।
আমিঃ দু্ইবছর! দুইবছর যখন তুই বেচে আছিস তখন তুই বেচে যাবি।
রিংকুঃ কে বলল? গতকালকেও তিনটা স্যালাইন নিয়েছি। রক্ত পরীক্ষাও করিয়েছি।
আমিঃ আচ্ছা রিংকু। তোর কি কষ্ট হয়না?
রিংকুঃ হয়
আমিঃ কেমন কষ্ট?
রিংকুঃ তোকে তা বলে বুঝানো যাবেনা। তোর হলে বুঝতি।
আমিঃ রিংকু, ক্যান্সারের কোন ওষুধ বের হয়নি?
রিংকুঃ বের হয়েছেতো।
আমিঃ তাহলে তুই সেগুলি খাসনা?
রিংকুঃ কে বলল খাইনা?
আমিঃ তাহলে তুই এরকম কথা বলিস কেন? তুইতো বেচে যাবি।
রিংকুঃ শুধু ওষূধেই কি বাচা যায়?
মনটা খারাপ করে গতকালকে বাসায় ফিরলাম। এত মন খারাপ আগে কখনো হয়নি। রিংকুর যে ক্যান্সার তা ও কাউকে বলেনি। বললে হয়তো তারা করুনা করবে। হয়তো মন খারাপ করবে আমার মতো। তাই রিংকু আমাকেই বলল। শুধুমাত্র আমি আর আমাদের কোচিং-এর আরো দুইজন জানে রিংকুর ক্যান্সারের কথা। একজন আমার স্কুলে পড়ে। আর অন্যজন রিংকুদের বিল্ডিংয়েই থাকে।
আচ্ছা মানুষের জীবন এরকম হয় কেন? আমাদের প্রত্যেকের জীবন ফুলের মতো প্রভাবে ফোটে আর সন্ধায় ধরে যায়। রিংকুর জীবনটা এরকম হলো কেন? ওর জীবনের ফুলটা কেন এরকম সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঝরে যাবে?
কিছুই করতে পারবো না আমি আমার বন্ধুটির জন্য। শুধুমাত্র দোয়া করতে পারবো খোদার কাছে। ওর অর্থ লাগবে না। অর্থের অভাব নেই ওদের। আপনারা ছেলেটির জন্য দোয়া করবেন। রিংকু যেন আমাদের সাথেই সবসময় থাকে। আমাদের মতো স্বাভাবিকভাবে। আগুনের মতো উজ্জ্বল হয়ে রিংকুও যেন থাকতে পারে আমাদের সাথে। একটা ফুল যেন অকালেই ঝরে না পরে।।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

