গোল্ডফিশ ঘরের কোনে সাজানো অ্যাকুরিয়ামের এপাশ থেকে ওপাশে যায়। অ্যাকুরিয়ামের একপাশ থেকে অন্য পাশে যেতে যেতেই গোল্ডফিশটি ভুলে যায় তার আগের তাবত স্মৃতি। ধরা যাক একটি গোল্ডফিশ অ্যাকুরিয়ামের একপাশে। হঠাৎ করেই তার অ্যাকুরিয়ামের অন্যপাশে থাকা একটি গোল্ডফিশকে মনে ধরে গেল। কিছু রোমান্টিক কথা শোনাবে বলে গোল্ডফিশটি যাত্রা শুরু করলো অ্যাকুরিয়ামের অন্যপাশের দিকে। কিন্তু হায় অন্যপাশে গিয়ে গোল্ডফিশটি হারিয়ে বসেছে তার আগের স্মৃতি। তার রোমান্টিক আলাপন হয়ে উঠে না আর। কারণ গোল্ডফিশের স্মৃতি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। বহু সাধ আর সাধ্যি করেও গোল্ডফিশটি মনে করতে পারে না তার আগের স্মৃতিগুলোকে। লাল, নীল, হলুদ , সবুজ কতো রঙের স্মৃতি......
গোল্ডফিশের স্মৃতি নিয়ে আলাপনের উদ্দেশ্য হলো নিজের স্মৃতির অবতারণা। নিজের স্মৃতিকে মনে হয় গোল্ডফিশের স্মৃতি। মনে হয় গোল্ডফিশের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি। কাটিয়ে দিচ্ছি একটা জীবন........
১.
প্রতিদিন ভোর হয়। বাড়ির তাবত লোকেরা তখন সূর্য দেখে। আর একজনের চোখ তখন অগোছালো একটি টেবিলের দিকে। মহল্লার ছোট্ট ছেলেমেয়েরা তখন দৌড়ে যায় ফুল কুড়াতে। মালা গাথতে গাথতে কোন কিশোরী মেয়ে আনমনেই গন্ধ শুকে জুই কামিনীর। আর প্রিয় মানুষটি তখন সেই ছেলেটির পুরানো একটি শার্ট নিয়ে দাড়িয়ে থাকে। প্রিয় ছেলের গন্ধ কি তবে সেই শার্টটাতেই রয়েছে! মায়ের চোখের কোনটা ভিজে উঠে ক্রমশ..ধীরে..ধীরে..। ছেলের স্কুলের ছুটি হয় বিকালে। বাসায় ফিরতে ফিরতে পড়ন্ত বিকাল। মা তখনো অপেক্ষায় থাকে। দুপুরে খাওয়া হয় না তার। বাড়ির তাবত লোক তখন হয়তো খেয়ে ভাতঘুম দিচ্ছে। ছেলে ঘরে ফিরে স্কুল শেষে। তারপর একসাথে মা-ছেলে খেয়ে নেয় দুপুরের খাবার।
অনেকদিন পরের বাস্তবতা হলো ছেলেটিকে ইট পাথরের এক নগরীতে থাকতে হচ্ছে। জীবনের নানা স্তরে আড়ি পেতে আছে বাস্তবতা। পড়ন্ত বিকালগুলোতে একসাথে খাওয়া হয় না। মায়ের কথা মনে পড়ে মাঝরাত পার করে খেতে বসলে। অথচ মা বলেছিল ঠিক মতো তিনবেলা খেয়ে নিতে। জীবনের বেড়াজালে বাধা পড়া ছেলেটি ঠিকমতো খায় না। কতো যে অনিয়ম। ভুলেই বুঝি গেছে মায়ের বলে দেওয়া সেই কথাগুলো। হায়রে গোল্ডফিশের স্মৃতি.....।
২.
ছোটবেলায় ছেলেটিকে তার প্রায় কাজই করতে হতো আব্বুর সাহায্য নিয়ে। প্রায় সকালেই আব্বুর হাত ধরে গ্রাম্যপথ হেটে হেটে তার যাওয়া হতো বাজারে। মজাদার খাবারের লোভ ছিল। তারপর অনেকটা বয়স পর্যন্ত সব কাজেই আব্বুকেই লাগতো। হয়তো শার্ট কিনতে হবে...কিংবা কোন কিছু লাগবে..নিজে পছন্দ করতে পারতো না। আব্বুই কিনে দিত সবকিছু।
একদিন স্কুলে যাওয়ার আগে বাবা বাসায় ছিল না বলে টাকা নিয়ে স্কুলে যেতে পারে নি ছেলেটি। পকেট শুন্য, তাই টিফিন পিরিয়ডে পানি খেয়ে বসে আছে খেলার মাঠের একপাশে। হঠাৎ দুর থেকে ডাক শুনে ছেলেটি অবাক হয়ে দেখে বাবা দাড়িয়ে আছে। কাছে গেলে হাতে পেয়ে যায় টাকা, যা দিয়ে টিফিন কিনে খেয়ে নিতে বলা হয়। অথচ স্কুলটি বাড়ি থেকে অনেক দুরে ছিল। ছেলেটি যাতে টিফিন পিরিয়ডে কিছু খেতে পারে, তার জন্যই বাবা গিয়েছিল স্কুলে।
বসবাস করা নগরীতে আসার আগে বাবাটি অনেক কথাই বলে দিয়েছিল। অনেক উপদেশ, অনেক দিকনির্দেশনা। অথচ ছেলেটি অনেক কথাই মানতে পারছে না এখন। ভুলেই বসে আছে বলে দেওয়া সেইসব উপদেশের কথা। হায়রে গোল্ডফিশের স্মৃতি..........।
৩.
অনেক ধরনের জ্ঞানী কথা শুনতে হয় পারিপার্শ্বিকতা থেকে। অনেক ধরনের আশ্বাসও পাওয়া যায়। এই হবে, সেই হবে....আরো কতো কি!! অবশেষে অনেক কিছুই হয় না। আমাদের কেবল দিন গুনতে হয়। অনেক আশ্বাসের নিচে চাপা পড়ে যায় আমাদের একান্ত দীর্ঘশ্বাসগুলো। কমতো হলো না....এতোটা বছর স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর চলে গেল। যারা একটি সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে জীবন দিয়ে গেছে তাদের স্বপ্ন কি আজো পুরণ হয়েছে! এই দেশেই সাহসী উচ্চারণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা অপমানিত হয়।তার বিচার চেয়ে আমরা বেশিদুর এগুতে পারি না। থেমে যায় সেই গুঞ্জন। অতঃপর সেই মুক্তিযোদ্ধা বয়ে বেড়ায় তার একান্ত কষ্টগুলো। আমরা কিছুই করতে পারিনা। অথচ এই দেশেই চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। আমরা বলে বলে এক পর্যায়ে চুপ হয়ে যাই। বিচার হয় না যুদ্ধাপরাধীদের। আমরা তাতেও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে এক সময় চুপ হয়ে যাই।
আমাদের স্মৃতিশক্তি কি এতোই কম! আমরা কি এতো সহজেই ভুলে যাই সেইসব অনুপ্রেরণার কথা! হায়রে গোল্ডফিশের স্মৃতি বয়ে চলছি আমরা....

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

