যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সচেতনা তৈরি করতে এবং এই ইস্যুটিতে সরকারের উপর নিজেদের পর্যায় থেকে চাপ বজায় রাখতে বাংলা ব্লগের ব্লগাররা সমন্বিত একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এ নিয়ে পোস্টও এসেছে। এরকমই একটি পোস্টে একজন ব্লগারের একটি কমেন্ট দেখলাম। এ ধরণের কমেন্ট যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনগত ভিত্তি নিয়ে অনেকের মনে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। তাই আলাদাভাবে এই পোস্ট দিতে হলো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আইনগত ভিত্তি নিয়ে কোন ব্লগারের সন্দেহ থাকলে এই পোস্টে দয়া করে বলুন। তার জবাব যথাসাধ্য দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। দয়া করে ঠিকমতো না জেনে আইনগত ভিত্তি নেই এমনটা বলে অন্যকে দ্বিধান্বিত করবেন না।
কৌশিক'দার পোস্ট (Click This Link) কমেন্টটি করেছিল ব্লগার মামু। তার জবাবে আমি একটি কমেন্ট করি। সেটিই তুলে দিলাম।
ব্লগার মামু, আপনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আইনগত কিছু বিষয় নিয়ে কথা বললেন। একটা বিষয় মনে রাখবেন, না জেনে মানুষকে কনফিউজড করে দেওয়া খুব সহজ, কিন্তু জেনে মানুষকে সচেতন করা সময়সাপেক্ষ কাজ। আপনার এই কমেন্ট অনেককে কনফিউজড করতে পারে, তাই এর জবাব দেওয়া জরুরী মনে করছি।
১. আপনি বলেছেন- "এই ইস্যুটা রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা যায় মাগার আইন গত ভাবে করা যায় না বলা চলে। আইনগত ভাবে সম্ভব হইলে পৃতিবীর বহু দেশেরই বিচার করা হইত।"
আপনি এর পুরোটাই ভুল জেনেছেন। যুদ্ধাপরাধের কোন ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার বিষয়টা আলাদা। তবে এই ইস্যুর অবশ্যই আইনগত ভিত্তি। সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো আইন আছে। জেনোসাইড কনভেনশন আছে, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের প্রিন্সিপল আছে। আইনগতভাবে পৃথিবী অনৈক দেশেই বিচার হয়েছে। চিলিতে অগাস্টো পিনোশেটের বিচার হয়েছে। ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদন্ড, তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড ও চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড দেওয়া হয়। তিনজনকে মুক্তি দেওয়া হয়।
টোকিও ট্রাইব্যুনাল এর ট্রায়ালে ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা করা হয় এবং যারা যুদ্ধ সংঘটিত ও পরিচালিত করেছিল, তাদের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। যারা যুদ্ধাপরাধ, মানবতা ও শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ করেছিল, তাদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড দেওয়া হয়।
২. আপনি বলেছেন- "দেশের প্রচলিত আইনে "যুদ্বঅপরাধী" বইলা কাউকে সনাক্ত করা হয় নাই। সরকারীভাবে কাউরে "যুদ্বঅপরাধী" বইল্যা অভিযুক্তকরা হয় নাই।"
এই বিষয়টিও আপনার জানার ভুল। দেশে প্রচলিত আইনে যুদ্ধাপরাধী বলে অনেককেই সনাক্ত করা হয়েছে।
পড়ুন এই অংশটুকু- "১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশ, ১৯৭২ এবং ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ জারি করা হয়। ১৯৭২ সালের ২৯ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনালস) আদেশে তিনটি সংশোধনী আনা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশ থেকে এ আদেশের অধীনে ৩৭ হাজার ৪৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। যেসব মামলা দায়ের করা হয়েছিল, তার মধ্যে ১৯৭৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৮৪৮টি মামলা নিষ্কপত্তি হয়েছিল। অভিযুক্তদের মধ্যে ৭৫২ জন দোষী প্রমাণিত হয়েছিল, দুই হাজার ৯৬ জন ছাড়া পেয়েছিল।
১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দালাল আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নেই, তাদের জন্য সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পর দালাল আইনে আটক ১১ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি এসব অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।"
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩ , যুদ্ধারাপরাধীদের বিচারের জন্য আইন। এই আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।
৩. আপনি বলেছেন- "যুদ্বঅপরাধীদের বিচার করতে গেলে আন্তজাতিক ভাবে একটা গ্রহন যুগ্যতা লাগে, সেই রকম পরিবেশও তৈরি হয় নাই। এই ধরনের বিচার প্রক্রিয়া আন্তজাতিক ভাবে একটা নিরুৎসাহিত করা হয়।"
এইখানেও আপনার ভুল ধারণা দেখে অবাক হলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য অবশ্যই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা আছে। কোনভাবেই বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয় না। করা হলে চিলিতে অগাস্টো পিনোশেটের বিচার হতো না। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল এবং টোকিও ট্রায়ালের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতো না।
প্রাসঙ্গিক দুটি বিষয় এখানে উল্লেখ করছি-
প্রথমত- ১৯৪৬ সালের ১১ ই ডিসেম্বর তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৯৬ (১) নম্বর সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবের মাধ্যমে গৃহীত ঘোষণায় বলা হয় যে, গণহত্যা (জেনোসাইড) আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অপরাধ, জাতিসংঘের মূলনীতি ও লক্ষ্যের পরিপন্থী এবং সভ্য জগৎ কর্তক নিন্দিত।
দ্বিতীয়ত- Convetion of the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide এর অনুচ্ছেদ ১ অনুযায়ী
"চুক্তিকারী পক্ষসমূহ দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে যে, শান্তি অথবা যুদ্ধকালে-যখনই সংগঠিত হউক না কেন, গণহত্যা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে একটি অপরাধ এবং তার পক্ষসমূহ উহার নিরোধ ও শাস্তিবিধান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

