১.
তখন একটা দৈনিক সংবাদপত্রে লেখালেখির চেষ্টা করতাম। অফিসের কম্পিউটারে বসে অনুবাদ করার জন্য লেখা বের করার প্রচেষ্টা চলতো খুব। সেই সুবাধে অনলাইনে থাকা হতো। সে সময় একটা ইংরেজি দৈনিকে প্রথম সামহ্যোয়ার ইন ব্লগের খবর পাই। সাইটটি খুলে দেখি বাংলায় লেখালেখি। তখনো বাংলা টাইপিং করতে পারতাম না। তাই তখনই ইচ্ছা থাকলেও ব্লগ খুলতে পারলাম না। লেখালেখিতো পরের ব্যাপার। পত্রিকায় কাজ করা এক বড় ভাইয়ের (সাব এডিটর) দ্বারস্থ হলাম। বাংলা টাইপিংয়ের বেসিক কিছু বিষয় শিখলাম উনার কাছে। তারপর ওয়ার্ড ফাইল উল্টা পাল্টা টাইপ করতে থাকলাম। অল্প কয়েকদিনের চেষ্টায় শিখে গেলাম বাংলা টাইপিং। একদিন বিকালে ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম। তারিখটা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৬।
১ মার্চ ২০০৬ প্রথম পোস্ট দিলাম। তখন তেমন কাউকেই চিনতাম না। ব্লগার সংখ্যাও অনেক কম ছিল বলে ইন্টারঅ্যাকশনও তেমন হতো না। এরমাঝে কিছুদিন আবার ব্লগ থেকে আলাদা ছিলাম। পুনঃরায় আবার ব্লগে লেখা শুরু করলাম। একটা পর্যায়ে আবিস্কার করলাম ব্লগে আমার অনেক পরিচিত মানুষ হয়ে গেছে। এখন ব্লগে আসতেই হয়। একটা টান অনুভব করি। এখানে আমার অনেক পরিচিত মানুষেরা.....এখানে আমার অনেক ভালো লাগার মানুষেরা.....।
২.
ব্লগে আমার ৩ বছর হলো। এই সময়ে ব্লগের বেশ কয়েকটা ভার্সন দেখেছি। অনেক নতুন ফিচার দেখেছি, অনেক ফিচার উঠে যাওয়া দেখেছি। একসময় শীর্ষব্লগারদের একটা তালিকায় প্রথম পাতার বামপাশে ঝুলতো। বেশ কিছুদিন সপ্তাহের সবচেয়ে বেশি পোস্ট করা ব্লগারদের একটা তালিকাও ঝুলতো। সবচেয়ে বেশি রেটিং পাওয়া পোস্টের একটা তালিকাও ঝুলতো প্রথম পাতার ডান পাশের নিচের দিকে। এই ৩ বছরে ব্লগের অনেক পরিবর্তন। রাজা আসে রাজা যায়...নেতা যায় নেতা নির্বাচিত হয়ে আসে....অনেকটা যেন এইরকমই। অনেক ব্লগারের চলে যাওয়া দেখেছি...অনেক নতুন ব্লগারের আসা দেখেছি। আমার পছন্দের অনেক ব্লগারই এখন আর লেখে না..কেউ বা খুব কম কম লেখে। অনেকটা এমন হয়েছে- বাংলা কমিউনিটি ব্লগিংয়ের বিবর্তনটা যেন চোখের সামনেই ঘটতে দেখেছি।
তবে ব্লগে ৩ বছর , ২ বছর মূল কথা না। যে ব্লগার মাত্র রেজিস্ট্রেশন করে ব্লগার হলো তার গুরুত্বও কম না। তারপরেও দীর্ঘদিন ব্লগের সাথে আছি এমনটা ভাবতে ভালোই লাগে।
দীর্ঘদিনের ব্লগিংয়ের কারনে অনেক ব্লগারের সাথে পরিচয় হয়েছে, অনেকের সাথে সামনাসামনি দেখা হয়েছে। এতো এতো পছন্দের মানুষদের সাথে পরিচয় না হলে হয়তো এতোদিন ব্লগে এতোদিন থাকা হতো না আমার। আবজাব অনেক কিছুই লেখেছি, সেইসব লেখায় মন্তব্য করেছেন ব্লগাররা। সকলের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।
৩.
"ব্লগার" শব্দটার সাথে লেখকের পার্থক্য আছে, পাঠকেরও পার্থক্য আছে, আবার সমালোচনাকারীরও পার্থক্য আছে। লেখক, পাঠক, সমালোচনাকারী প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা কিছু ভিউপয়েন্ট থাকে। আর একজন ব্লগার সবগুলো ভিউপয়েন্টকে ধারণ করে ব্লগার হয়ে উঠেন। তিনি একইসাথে পাঠক, লেখক, সামলোচনাকারী। তাই আমার মনে হয়ে ব্লগার হয়ে উঠার অধ্যবসায়টাও বেশি। নিজের চেষ্টাও তাই ব্লগার হয়ে উঠার....।
কথা না বাড়িয়ে পুরানো একটা কবিতা দেই।
আমাদের মিলগুলো
তুমি বলো, তোমায় আমায় অনেক অমিল
তোমার রাস্তা যেখানে শেষ আমার রাস্তা সেখানে শুরু।
তুমি ঠিক ঠিক বেছে বেছে অমিলগুলোই বের কর
তোমার কান্ড দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি আমি
তারপর আমি তোমার আমার মিল খুঁজতে যাই-
আমি গ্রাম্য রাতে কলপাড়ে দাড়িয়ে জোসনা দেখি
পাশেই মৃদু আলোয় তিনটা কলাগাছ থাকে দাড়িয়ে
চারটা বুনোপাখি উড়ে ডেকে যায় একমনে,
আর তুমি নাগরিক রাতে বারান্দায় দাড়িয়ে
উপলব্ধি করো সাতটা সমান্তরাল নিয়ন বাতি
লোকে তাকে বলে স্ট্রিটল্যাম্পের আলো।
আমাদের মিলটা কোথায় জানো?
আমি গ্রাম্য কলপাড়ে একা, আর তুমি বারান্দায় একা
দুজনেই একা, এটাইতো অনেক বড় মিল।
আমি গ্রাম্য সকালে শিউলি কুড়াতে যাই
হাতে থাকে একটা সুতার গুটি
মাড়িয়ে চলি পাঁচটা বাড়ির আঙ্গিনা
জমে থাকা শিউলি ফুল মুগ্ধ চোখে দেখি,
তুমি নাগরিক সকালে দুইটা ঝাড়বাতি জ্বালাও
তিনটা অ্যাকুরিয়ামে ঘুরে বেড়ানো মাছের রঙ দেখ
ঘরের কোনে থাকা একটা বনসাই দেখে মুগ্ধ হও।
তোমার আমার মিলটা কোথায় জানো?
আমি শিউলিতে মুগ্ধ, তুমি মুগ্ধ বনসাইয়ে
দুজনেই সমান্তরাল মুগ্ধতায় ভুগি।
তবুও কি বলবে, তোমায় আমায় অনেক অমিল,
তোমার রাস্তা যেখানে শেষ, আমার রাস্তা সেখানে শুরু?
পুনশ্চঃ
সবার মুগ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এক থাকে না। কেউ ঘরের কোনে থাকা বনসাই দেখে মুগ্ধ হয়, কেউ আবার গাছের তলে পড়ে থাকা শিউলি ফুল দেখে মুগ্ধ হয়। সবার একাকিত্বের ধরণও এক নয়। কেউ গ্রামের কলপাড়ে একা, আবার কেউ শহুরে বারান্দায় একা।
বলার ধরণ ও সবার এক না। কাজে কিংবা প্রতিবাদে সবাই একইভাবে প্রকাশিত হয় না...। তারপরেও যেখানে পথ শেষে মেলবন্ধন দেখা যায়, সেখানে একত্রিত হতে চাই ব্লগার হিসাবে।
সকল সহব্লগারের জন্য শুভকামনা।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০০৯ রাত ২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



