খুব সাদামাটা অর্থে বন্ধুত্ব একটা সম্পর্ক। কিন্তু কেমন এ সম্পর্ক তা দিয়েই অনেক রকমের আলোচনা রয়েছে। বন্ধু ও বন্ধুত্বের প্রান্তর এতো বেশি প্রসারিত যে সেখানে চষে বেড়ানো যায় আজীবন। ব্যক্তি বিশেষ অনুযায়ী বন্ধুত্বের রয়েছে তাৎপর্য, ভিন্ন ব্যঞ্জনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, বন্ধুত্ব বলতে তিনটা পদার্থ বুঝায়। দুইজন ব্যক্তি ও একটা জগত। রবি ঠাকুরের এই বক্তব্য থেকে বন্ধুত্বের সম্পর্কের একটা রূপ দাড় করানো যায়। গাণিতিক হিসেবে বন্ধুত্বের স্থান দুই এবং তিনে। অর্থাৎ যেখানে বন্ধু আছে সেখানে দুজনে মিলে তৃতীয় একটা পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন থাকে। বন্ধুত্বের এই চিরন্তন সম্পর্কটিই মানুষকে মহান করে তোলে। বন্ধুত্ব সেই আদিযুগের পরিসর থেকে বর্তমান সমাজে এসে তাৎপর্যময় অবস্থানে রয়েছে। স্থান পেয়েছে সম্পর্কের অনেক গভীরে।
বন্ধুত্ব কী
গত শতাব্দীর সেরা মানুষ হিসেবে বিবেচিত অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বন্ধুত্বকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন পরিসরে। শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে একই কাতারে দাড় করিয়ে দিয়েছেন বন্ধুত্বকে। তিনি বলেছেন, আমাদের নিরন্তর গবেষণায় প্রাপ্ত সবচেয়ে সৌন্দর্যময় জিনিসগুলো শিল্প, বিজ্ঞান আর বন্ধুত্ব।
অ্যারিস্টটল একবার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন বন্ধুত্ব কি? তিনি খুব সহজ ভাষায় এর জবাব দিয়েছিলেন- বন্ধুত্ব হলো দুটি দেহে একটি আত্মা।
বন্ধুত্ব বলতে খুব সহজ ভাষায় পরস্পরের বোঝাপড়ার সম্পর্ক বোঝায়। তবে সব বোঝাপড়ার সম্পর্কই চূড়ান্ত পর্যায়ে বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে না। কারণ বন্ধুত্ব হতে হলে তার সঙ্গে আরো কিছু উপাদানের সংযোগ হতে হবে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমতা, সমবেদনা থাকতে হবে। তাহলেই সম্পর্ক বন্ধুত্বে গড়ায়। অনেকেই বন্ধুত্বের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসাকে মিলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এর কোনোটিই এক বিষয় নয়। বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা নিয়ে একটি উপমা রয়েছে। বন্ধুত্ব যদি একটা ফুলের গাছ হয় তবে ভালোবাসা সেই গাছের সুন্দর একটা ফুল। বন্ধুত্বের পরশ গাছের সবুজ পাতার সজীবতায় আর ভালোবাসার আমেজে ফুলের নরম পাপড়ির পেলবতায়।
কবি লর্ড বায়রন ডানা বিহীন ভালোবাসাকে বলেছিলেন বন্ধুত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন- বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার অনেক তফাৎ আছে। কিন্তু ঝট করিয়া তফাৎ ধরা যায় না।
বন্ধুত্ব এমন একটি সম্পর্ক যার সীমানা অনেক বেশি প্রসারিত। মানুষে মানুষে যেমন বন্ধুত্ব হতে পারে ঠিক তেমনি সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের বন্ধুত্ব হতে পারে।
বন্ধু কে?
পৃথিবীতে প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু বন্ধুত্ব কোনো বয়সের পরিসীমা মানে না। আর এ জন্যই বুঝি ৬৪ বছরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ১৭ বছরের রানুর মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। আবার মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব হতে হবে এমনটাও নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন সেনার বন্ধু হয়েছিল তার পালিত কুকুর। সেনাটি মারা যাওয়ার পর কবরের ব্যবস্থা করেছিল তার সেই পোষা কুকুরটি। কিংবা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মুভি চরাচরের মতো কারো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পাখির সঙ্গে। আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুষ্কোণ উপন্যাসের নায়ক রাজকুমার সম্পর্কের বহুমুখিতার মাঝে বন্ধুত্বের স্বরূপ খুজতে চেয়েছিল। সে হয়তো শেষ পর্যন্ত মরমীর মাঝে বন্ধুত্বের ভিন্ন স্বরূপ খুঁজে পেয়েছিল। আর এ জন্যই বুঝি তার উপলব্ধি হয়েছিল- সে যেন সকলকে রেহাই দেয় নাই, তাকেই সকলে পরিত্যাগ করিয়াছে, একমাত্র মরমী তাকে ছাঁটিয়া ফেলে নাই, আরো তার কাছে সরিয়া আসিয়াছে। প্রকৃত বন্ধুত্ব এমনই। বিপদের সময়টিতে বন্ধু আরো কাছে সরে আসে।
চাইছি তোমার বন্ধুতা
মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের একটা গান আছে।
হাত বাড়ালেই বন্ধু সবাই হয় না, বাড়ালে হাত বন্ধু পাওয়া যায় না।
প্রকৃত বন্ধু পাওয়া খুবই প্রতীক্ষাময়। নাগরিক জীবনের ব্যস্ত মানুষগুলো যেন বন্ধুত্বের আসল স্বরূপ খুজে পাচ্ছে না। হূমায়ুন আহমেদের লেখা রূপা গল্পটিতে লোকটি নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলার জন্য খুঁজে খুঁজে অপরিচিত লোক বের করে। তারপর সেই অপরিচিত মানুষটির কাছে তার জীবনের গল্পটি বলে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ত মানুষগুলোর অবস্থাও কিছুটা এ রকম। বন্ধুত্বের আশ্রয় তারা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্বের আশ্রয় তারা পাচ্ছে না। আর এ জন্যই মনের ভাবনা শেয়ার করতে খুজে খুজে অপরিচিত লোককে বের করছে।
প্রাচীন সময়ে গ্রিক এবং রোমানরা যেমন বুঝতে পেরেছিল ভালো সমাজ এবং ভালো জীবনের জন্য বন্ধুত্বের প্রয়োজন, বর্তমান সময়েও এ উপলব্ধিটাই প্রয়োজন। আর তাহলেই বন্ধুত্বের অবারিত প্রান্তর ধরে হেটে বেড়ানো যাবে। সুমন কবীরের একটা গান আছে- চাইছি তোমার বন্ধুতা
সেই গানের কথার মতোই আজ পৃথিবীময় চাইছি বন্ধুত্বা। শুভ বন্ধুত্ব দিবস
(ভেবেছিলাম বন্ধুত্ব দিবসে একটি পোস্ট দিব। কিন্তু অলসতার খাতিরে সেই লেখা আর হয়ে উঠে নি। তাই বিকল্প উপায় হিসেবে দুই বছরের পুরনো পোস্ট খুঁজে বের করে খানিকটা পরিমার্জন করেই পোস্ট করলাম।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



