somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিবিড়তম (১ম পর্ব)

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ১১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তপ্ত দুপুর। সাই সাই করে ছুটে চলেছে বাস। জানালা দিয়ে লু বাতাস আসছে। কখনো কখনো অবশ্য বাসটিকে থামতে হচ্ছে। রাস্তায় জ্যাম লেগে আছে। রাস্তার দুইপাশে বাহারি বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। মার্কেটিংয়ের মোহনীয় ভাষায় ভোক্তাদের কাছে নানা আকুতি মিনতি। থেমে থেমে ছুটে চলা বাস এসে থামলো ফার্মগেটে। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রথমবার একাকি ঢাকা আসায় অনভ্যস্ত চোখে খুঁজে বেড়াচ্ছি দিকদর্শন। যেতে হবে মিরপুরের শেওড়াপাড়ায়। পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় বন্ধুরা মিলে বাসা ভাড়া নিয়েছি। রাজধানীর নতুন বাসিন্দা হিসেবে সেখানেই মাথা গোজার ঠাই হয়েছে। প্রথমে বন্ধুদের সাথে বাসা দেখে গিয়েছিলাম। তারপর থাকতে এসে ঢাকায় এলাম একাকি। অথচ এই আমি এসএসসি পাশ করার আগে বাড়ি থেকে কখনোই একা কোথাও যাই নি। একাকি ঢাকার নতুন বাসিন্দা হওয়ার কারন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং। অবশ্য দুয়েকজন সিনিয়র উপদেশ দিয়েছে এইসব কোচিং ফোচিং করে কিচ্ছুটি হবে না। নিজে নিজে পড়াটাই আসল । ফার্মগেটে এতো গলি আর এতো রাস্তা, কোন দিকে যে যাবো তাই ভাবছি। ফুটপাতের পাশে পেপারের দোকানের পাশে একজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখা যাচ্ছে। অন্তত এই লোকের কাছে লোকেশন জিজ্ঞেস করে নেওয়া যায়। কাছে এগিয়ে যেতেই দেখি উনি পত্রিকা স্টল থেকে ছোট ধরনের একটি বই গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। প্রশ্ন করবো কি-না এই দোলাচলে পত্রিকা স্টলের দিকে তাকালাম। একই ধরনের একটি বইয়ের কভার দেখেই বুঝলাম এই ভর দুপুরে ট্রাফিক বেচারা একঘেয়েমি কাটাতে নিষিদ্ধ কোন বই পড়ছেন। উনাকে বেশি না ঘাটিয়ে নিজে নিজেই পথ খুঁজে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। অবলম্বন কেবল আগের খন্ড স্মৃতি ও ১০-১১-১২ বাস। প্রথমবার যেবার বাসা ঠিক করতে এসেছিলাম তখনই জেনে গিয়েছিলাম ফার্মগেট থেকে শেওড়াপাড়ায় যেতে হলে ১০-১১-১২ বাসে যেতে হবে। ওভারব্রিজ পার হয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাস মিললো। কাধে ঝুলানো ব্যাগ আর হাতের ভারী ব্যাগটা নিয়ে কোনমতন গাড়িতে উঠে পড়লাম। তেমন পরিচিত রাস্তা নয়। বাস চলছে, জানালার এ পাশ ওপাশ দিয়ে আশেপাশের বিল্ডিং দেখছি। একসময় বাসের হেল্পারের মুখে শেওড়াপাড়া শুনে সম্ভিৎ ফিরলো। বাস থেকে নেমে বেশ কিছু পথ হাটতে হল। সর্পিল এক রাস্তা শেষে মাথা গোজার সেই বাড়ি। সর্পিল রাস্তার শেষ প্রান্তে এসে আনমনেই পেছনে তাকালাম। মনে হলো পেছনে ফেলা আসা মা ও ছোট বোন এখনও তাকিয়ে আছে। যেমনটা বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় রাস্তার শেষ পর্যন্ত তাকিয়ে ছিল তারা। চিন্তাগুলোকে পেছনে ফেলে সিড়ি ভেঙ্গে উঠতে লাগলাম। অনুভূতি জমাট বাধলো-এভাবেই এই শহরে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে।

প্রথম প্রথম প্রায় বিকালেই বাড়ির কথা মনে হলেও একসময় দিব্যি মানিয়ে নিলাম সবকিছু। বিকাল হলে এদিক ওদিক ঘুরতে বের হই, একা একা উদ্দেশ্যহীন সদ্য পরিচিত রাস্তায় হেটে বেড়াই। কোন কোন বিকালে নতুন রাস্তা আবিস্কার করতে বের হয়ে যাই। সকালে ক্লাস, বিকালে ঘুরাঘুরি আর রাত নামে জানালার কাচে। কাছের উচু ভবনের আলো এসে প্রতিফলিত হয় যত্ন না পাওয়া কাচটিতে। বুঝতে পারি, রাত নামতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে অভ্যস্থ্ হতে লাগলাম। নিয়মিত যাতায়াতের সুবিধায় কিছু কিছু এলাকা, কিছু আঁকাবাকা পথ পরিচিত হয়ে গেল। কেবল কাচের জানালাটিই পরিচিত হলো না। রাতের শহরে আলো এসে পড়া জানালা আমার আপন নয়, দুরের কেউ। যে স্বস্তা ব্যাগটি নিয়ে ক্লাসে যাই তার ভিতরে সবসময় কিছু গল্প-উপন্যাসের বই থাকে। বাড়ি দেওয়া হাত খরচের স্বল্প টাকা থেকেই সাহস করে কিছু গল্প-উপন্যাসের বই কিনে ফেলেছি। বিগতযৌবনা দুপুরে ক্লাস করে ফেরার সময় বাসে বসে ব্যাগ থেকে বের করে সেইসব বই পড়ি।
তিন চারমাস পেরিয়ে গেল বুঝতে পারি আমি আর ঢাকার নতুন বাসিন্দাটি নই। তখন হলো বিভিন্ন প্রদর্শনী আর মেলায় যাওয়ার বাতিক। শিক্ষামেলা, ফার্নিচার মেলা, কম্পিউটার মেলা থেকে শুরু করে ফল মেলা কোনটাই বাদ গেল না। এক দুপুরে ক্লাস শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম শেরাটনের শিক্ষামেলায় যাবো। কিন্তু সিদ্ধান্ত পরিরর্তন করে ফার্মগেট থেকে ৩ নম্বর বাসে চেপে বসলাম। গন্তব্য বনানী। কাজ শেষে ফার্মগেটে ফেরার জন্য একটি লেগুনা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির প্রবেশ পথের পাশের সিটেই। পাশে আরও দুটি সিট খালি। ড্রাইভার অপেক্ষা করছে গাড়ি ভরার জন্য। খানিক ডাকাডাকির পর একজনের দেখা পাওয়ার গেল। লেগুনা গাড়ির ছোট্ট দরজা গলে চোখ রেখে দেখি আমার বয়সী এক মেয়ে উঠতে যাচ্ছে। একহারা গড়ন, চেহারায় কেমন যেন একটা উচ্ছ্বলতা। সিট খালি কেবল দুইটি, তাই আমার পাশের সিটেই বসতে হবে। কোন এক অজানা কারনে মন আনন্দিত হয়ে উঠলো। হয়তো এই পথযাত্রায় কোন কথাই হবে না। কেবল পাশপাশি বসে যাওয়া হবে। ভাবতে ভাবতেই দেখি মেয়েটির পেছনে একজন মধ্যবয়সী মহিলা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হলো। পাশের সিটে বসলেন সেই মহিলা। তারও পাশের সিটে সেই স্নিগ্ধ কন্যা। কিছুক্ষণ পর কথা শুনে বুঝলাম সম্পর্কে এরা মা মেয়ে। অহেতুক মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে ভেবে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের বই ‘ডাকঘর’। পড়া শুরু করার আগ পর্যন্ত ধারণা ‘ডাকঘর’ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সেরা সাঙ্কেতিক নাটক। জনপ্রিয়ও। কয়েকপাতা উল্টে পাল্টে দেখে পড়া শুরু করলাম। গাড়ির ঝাকুনিতে মুশকিলেই পড়লাম। তখন মাত্র পড়ছি “মুশকিলে পড়ে গেছি। যখন ও ছিল না, তখন ছিলই না- কোনো ভাবনাই ছিল না। এখন ও কোথা থেকে এসে আমার ঘর জুড়ে বসল; ও চলে গেলে আমার এ ঘর যেন আর ঘরই থাকবে না”। পারিপার্শ্বিক অবস্থান ভুলে বইয়ে ডুব দিলাম। কিছুক্ষণ পর ধ্যান ভাঙলো কারো প্রশ্নে। তাকিয়ে দেখি পাশে বসা মধ্যবয়স্কা নারী আমায় জিজ্ঞেস করছেন-“বইটা ডাকঘর না?’’ হ্যা সূচক জবাবের পর ফিরতি প্রশ্ন উড়ে এল। বাবা, যদি কিছু মনে না করো বইটা একটু দেওয়া যাবে। এমন মায়া মাখানো আহ্বানে সাড়া দিয়ে বইটা তুলে দিলাম উনার হাতে। কিছুক্ষণ উল্টে পাল্টে ফিরিয়ে দিতে দিতে অস্ফুট উচ্চারণ করলেন, না সেই বইটা নয়। কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলাম, কোন বইটা নয়? জবাবে বললেন, সে এক বিরাট ইতিহাস। কিছুক্ষণ থেমে আবার বলা শুরু করলেন। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

(চলবে)
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×