somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... বাংলা ব্লগ ও ব্লগ-কমিউনিটির ভাঙা গড়া
সামহ্যোয়ারইন ব্লগে প্রথম পোস্ট দেওয়া হয় ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে। পোস্টের শিরোনাম ‘ইমরান ব্লগ স্রষ্টা’। পোস্টটি দেন দেবরা। উল্লেখ্য এই পোস্টটি ব্লগ টেস্ট করার জন্য দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া প্রথম ব্লগ লেখিয়ে ব্লগার সামহ্যোয়ারইন ব্লগে কর্মরত ছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর ব্লগটি লেখা হলেও প্রথম মন্তব্য আসে ২০০৬ সালের ১৮ জুলাই। তার মানে দীর্ঘ প্রায় ৭ মাস বাংলা ব্লগের প্রথম পোস্টে কোন মন্তব্য পড়েনি। এখন অবশ্য নতুন ব্লগারদের অনেকেই সেই পোস্টে মন্তব্য করে ‘ইতিহাসের অংশীদার’ হতে চান। সামহ্যোয়ারইন ব্লগের দ্বিতীয় পোস্টটিও দেন দেবরা। ১৬ ডিসেম্বর রাত ১২টা ৫ মিনিটে দেওয়া সেই পোস্টটির শিরোনাম- ‘বিজয় দিবস’। এই পোস্টে প্রথম মন্তব্য আসে ২২ শে মার্চ ২০০৭। তৃতীয় পোস্টটির ব্লগারও দেবরা। ‘জীবন যেখানে যেমন’ শিরোনামের পোস্টটি প্রকাশ করা হয় ১৬ ডিসেম্বর রাত ১২ টা ৫৭ মিনিটে। এতে প্রথম মন্তব্য আসে ২০০৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৬ ডিসেম্বর ২০০৫ রাত ১ টা ৩১ মিনিটে ব্লগের চতুর্থ পোস্ট দেন ব্লগার ‘সমকালের গান’। উল্লেখ্য তিনিও সামহ্যোয়ানইনে কর্মরত ছিলেন। ‘আমার অভিবাদন’ নামের সেই পোস্টটিতে বিজয় নামের একজন ব্লগার টেস্ট মন্তব্য করেন। তবে সেই টেস্ট মন্তব্যের সময়ক্ষণ বর্তমানে ভুল দেখাচ্ছে (১৫ ডিসেম্বর ২০০৫, দুপুর ১২ টা ৪৬ মিনিট)। মন্তব্যে লেখা হয়- ‘এটা একটি টেস্ট মন্তব্য’। এই টেস্ট মন্তব্যটিই কমিউনিটি বাংলা ব্লগের প্রথম মন্তব্য। টেস্ট মন্তব্যটিকে বাদ দিলে ব্লগের তৃতীয় পোস্টটিতে প্রথম মন্তব্য আসে ২০০৬ সালের ২৪ জুলাই। ব্লগের পঞ্চম পোস্টটি দেন একই ব্লগার আড্ডাবাজ। ১৬ ডিসেম্বর ২০০৫ রাত ৮টা ৬ মিনিটে প্রকাশিত সেই লেখার শিরোনাম ‘আড্ডা এবার বাংলায়!!’। তাতে প্রথম মন্তব্য আসে ২১ ডিসেম্বর। ৬ষ্ঠ পোস্টটিও দেন সমকালের গান যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ সবার সেরা!!’। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ এই লেখায় প্রথম মন্তব্য আসে। ব্লগের সপ্তম পোস্ট দেন হাসিন। তিনি ব্লগ ডেভলাপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ‘আমি এবং আমরা’ শিরোনামের পোস্টটি তিনি প্রকাশ করেন ১৬ ডিসেম্বর ২০০৫ রাত ৮টা ১৪ মিনিটে। তাতেও কিছু টেস্ট মন্তব্য আসে। সেগুলো বাদ দিলে পোস্টতে ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম মন্তব্য আসে। বাংলা ভাষার প্রথম কমিউনিটি ব্লগের প্রথম সাতটি পোস্ট বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি তথ্য বের হয়ে আসে। প্রথমত, শুরুর দিকে সামহ্যোয়ারইনে কর্মরতরাই ব্লগিং করেছেন। দ্বিতীয়ত, ব্লগে মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যের ব্যাপারটি ব্লগে তখন ছিল না। ফলে এটি সহজেই অনুমেয় যে শুরুর দিকে বাংলা ব্লগ তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। তাহলে জনপ্রিয়তা পর্ব শুরু হলো কখন?

২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করার পর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সামহ্যোয়ারইন ব্লগে মোট ১০৩ টি পোস্ট আসে। তবে মোট ব্লগারের সংখ্যা ১০-১২ জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই ১০৩ টি পোস্টের বেশিরভাগেরই গড় মন্তব্যের সংখ্যা ১-২। ২০০৬ সালের জানুয়ারি বেশ কয়েকজন নতুন ব্লগার যুক্ত হন ব্লগের সাথে। ব্লগের পোস্ট বাড়লেও পোস্টের মন্তব্য সংখ্যা বাড়েনি তখনও। জানুয়ারিতে ব্লগার শোহেইল মতাহির চৌধুরী, অপ বাক, হাবিব মহাজন ও মঈন বেশি পোস্ট দিয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে আরও কিছু ব্লগার যুক্ত হন ব্লগের সাথে। ২০০৬ সালের মার্চে আইটি সংশ্লিষ্ট, আইটিমনস্ক লোকদের বাইরে বেশ কয়েকজন সাহিত্যমনস্ক লোক ব্লগার হিসেবে যুক্ত হন। মার্চে ব্লগারের সংখ্যা বেশ বেড়ে যায়। পাশাপাশি পোস্টে মন্তব্যের সংখ্যাও বাড়ে। বাংলা ব্লগের কমিউনিটি উদ্ভবের সময়কাল হিসেবে ২০০৬ সালের মার্চকে চিহ্নিত করা যায়।

বাংলা ব্লগ কমিউনিটির ভার্চূয়াল রূপ বাস্তবে পদার্পন করে ২০০৬ সালের মে মাসে। প্রাপ্তির চিকিৎসা কেন্দ্রিক এক উদ্যোগের কারণেই ব্লগাররা তখন একত্রিত হয়েছিলেন। ব্লগারদের মধ্যে কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা সবসময়ই ছিল। কেন এই ক্ষুধা? এর বিশ্লেষণ নানাভাবে করা যায়। একটি বিশ্লেষণ হলো- প্রথম দিককার অনেক ব্লগার ব্লগে এসেছেন ‘চ্যাট করার অভিজ্ঞতা’ নিয়ে। ফলে এই চ্যাটিং অভিজ্ঞতাকে তারা ব্লগের সাথে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন। চ্যাটিং ব্যক্তিগত সম্পর্ক নির্ভর। এই অভিজ্ঞতার ব্লগীয় রূপ হয়ে ওঠলো ব্যক্তিগত যোগাযোগ নির্ভর। এই আন্তঃযোগাযোগ কমিউনিটি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফলে মতামত আদান প্রদানের মাধ্যমে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া হয়ে উঠে ব্লগের অন্যতম প্রধান চরিত্র। এই চরিত্রকে ভর করেই বাংলা ব্লগ বিকশিত হয়। পরবর্তী সময়ের ব্লগাররা এই চরিত্রকেই ব্লগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য মেনেছেন। এটি বর্তমান সময়ের নতুন ব্লগাররাও ভাবছেন। ফলে এখনও ব্লগের জনপ্রিয়তা বিচার করা হয় মিথস্ক্রিয়ার নিরিখে।

কমিউনিটির ধারণা বাংলা ব্লগে শক্তিশালী রূপ নিয়েছে কেন? বাংলা ব্লগে কমিউনিটি শক্তিশালী রূপ নিয়েছে কয়েটি কারণে। এগুলো হলো- মানবিক উদ্যোগ, ব্লগাড্ডা, ব্লগ ক্যাম্পেইন ইত্যাদি। ব্লগের প্রথম দিকের মানবিক উদ্যোগ প্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে। প্রাপ্তি নামের এক অসুস্থ শিশু ব্লগারদের ভার্চুয়াল ক্যারেক্টার থেকে বাস্তব জগতে হাজির করে । ২০০৬ সালের মে মাসে প্রাপ্তিকেন্দ্রিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন প্রথমবারের মতো কিছু ব্লগার একত্রিত হয়েছিলেন প্রাপ্তিকে সাহায্য করার জন্য। পরবর্তীতে ২০০৭ এর জুনে চট্টগ্রামের পাহাড়ধ্বসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থদের সহায়তা করতে ব্লগ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় কয়েকজন ব্লগার চট্টগ্রামে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাশ্বত সত্যকে বাঁচাতে ২০০৮ সালে মে মাসে ব্লগ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগ অনেক ব্লগারকে একত্রিত করে। ব্লগ কেন্দ্রিক ক্যাম্পেইনের কথা বললে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাম্পেইনের প্রসঙ্গ শুরুতেই আসবে। প্রথমটি সিআরপির ভেলরি টেইলরকেন্দ্রিক। এটি ২০০৭ মাসে মে মাসের দিকে ব্লগে তুমুল আলোড়ন তৈরি করে। ব্লগার আরিফ জেবতিক সেই ক্যাম্পেইনে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরের ক্যাম্পেইনটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এটি ২০০৯ এর জানুয়ারিতে পূর্ণ রূপ লাভ করে। এই ক্যাম্পেইনগুলোতে ব্লগারদের একত্রিত হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখে। একত্রিত করার ব্যাপারগুলোই কমিউনিটির বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে। ব্লগের প্রথম আনুষ্ঠানিক আড্ডা হয় ২০০৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর। তখন প্রায় ১ শত ব্লগার চারুকলার ব্লগ আড্ডায় একত্রিত হন (আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী ব্লগ সম্মেলন)। পরবর্তীতে ব্লগ আড্ডা ব্লগারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। একসময় নামটিই সংক্ষিপ্ত হয়ে হয় ‘ব্লগাড্ডা’। সামাজিকতা কিংবা কমিউনিটি বৈশিষ্টকে জোরদার করতেই বুঝি ২০০৮ সালে প্রথম বারের মতো ব্লগাররা পিকনিকেও যায়। ব্লগাড্ডার এই বৈশিষ্ট্য সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, সচলায়তন, আমার ব্লগ, প্রথম আলো ব্লগ, আমরা বন্ধু ব্লগেও দেখা গেছে। তবে হাল আমলে ব্লগাড্ডার পরিমান কমে গেছে। কমিউনিটির দ্রুত ভাঙা গড়াই হয়তো এর জন্য দায়ী।

ব্লগীয় উদ্যোগের সঙ্গে ব্লগ কমিউনিটির বিকাশের সম্পর্ক নিয়ে ব্লগার কালপুরুষ লেখেছেন,“একটা বিষয় নিয়ে গর্ব করতে পারি তা হলো ‘প্রাপ্তি’ নামের এক অসুস্থ শিশু আমাদের অনেক ‘ভার্চুয়াল ক্যারেক্টার’কে বাস্তবে মিলিত হবার একটা বিরাট সুযোগ করে দিয়েছিল। আর নিকের আড়ালে থাকা ব্লগারদের সম্মিলিত শক্তি যে কোন মানবিক কাজে কত বেশী আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে সেটা আমরা দেখেছি। আর সেই উদ্দ্যোগের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে আরো এমন মানবিক কাজ এই ব্লগের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে। এটা ব্লগ ও ব্লগারদের একটা বিরাট অর্জন। এরপর সিডর, ঘুর্নিঝড়, রাহেলা, ভেলরি, শাশ্বত, উপমা ইস্যু ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী ও আরও অনেক বিষয় নিয়েই ব্লগাররা স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে এসেছে। ব্লগিং-এর নেশা থেকে এবং ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হয়েও একটা কমিউনিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে এসব কাজ করা সম্ভব সেটা ব্লগার না হলে কখোনই জানতাম না। একজন ব্লগার হিসেবে এটা একধরণের বড় প্রাপ্তি বলেই মনে করি আর তা সম্ভব হয়েছে বাংলা ব্লগিং-এর এমন একটা সাইট খোলা হয়েছে বলেই। সামহয়্যারইন বাংলা ব্লগিং-এর মাইল ফলক হিসেবেই থাকবে আর এই ব্লগিং শক্তিকে আরো বেশী কার্যকর,আরও বেশী গতিশীল,আরও বেশী ঐক্যবদ্ধ ও করার নেপথ্যে এগিয়ে নেবার জন্যে সাথে থাকবে সচলায়তন,আমারব্লগ ও প্রথমআলো ব্লগ।” (কালপুরুষ, সামহ্যোয়ারইনব্লগ, মার্চ ২০০৯ )

বাংলা ব্লগ কমিউনিটির বিকাশ ও বিবর্তন নিয়ে ব্লগাররা বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে ব্লগে পোস্ট দিয়েছেন। এসব পোস্টে আলোচনার নানা দিক উঠে এসেছে। ব্লগার কৌশিক আহমেদ ‘ভার্চুয়াল ও ননভার্চুয়াল ক্ষেত্র থেকে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ কর্তৃপক্ষের ব্লগ রূপরেখা এবং এর ব্লগ, ব্লগার ও ক্রমঃবিবর্তিত পরিচালন পদ্ধতি’ শিরোনামের একটি ব্লগ পোস্টে সামহ্যোয়ারইন ব্লগের ক্রম বিবর্তিত রূপরেখার একটি বয়ান হাজির করেছেন। বাংলা ব্লগ কমিউনিটি যেহেতু সামহ্যোয়ারইন ব্লগের মাধ্যমে শুরু হয়েছে তাই বাংলা কমিউনিটি ব্লগের ক্রম বিবর্তনকে বুঝতে হলে সামহ্যোয়ারইন ব্লগের ক্রমবিবর্তন শুরুতেই বিবেচনায় নিতে হবে। কৌশিক আহমেদ তার লেখায় সামহ্যোয়ারইন ব্লগের সময়কালকে তিনটি কালে বিভক্ত করেছেন। কালগুলো হচ্ছে- ক. প্রাক-সচলায়তন খ. সচলায়তন কাল এবং গ. আমার ব্লগ কাল। তিনি প্রাক-সচলায়নকালকে আবার কয়েকটা সময়কালে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে একটা প্রাক-প্রাপ্তি কাল। কৌশিক আহমেদের মতে, “প্রাক-প্রাপ্তিকালের বৈশিষ্ট্য হলো এই সময়টাতে প্রথম একক কমিউনিটি তৈরী হয়েছিল এবং কমিউনিটি ভেঙে গিয়েছিল। তবে এর পুরোটাই ভার্চুয়াল। এটার ব্যাপ্তিকাল সামহ্যোয়ারের আত্মপ্রকাশ থেকে প্রাপ্তি বিষয়ক অমি রহমান পিয়ালের প্রথম পোস্ট পর্যন্ত। এই সময়ে যত ধরণের বিষয় নিয়ে ব্লগাররা আলোচনা করেছেন ও যত ধর্মী ব্লগারের উপস্থিতি সন্নিবেশিত হয়েছিল সেগুলো কিছু মোটা দাগে চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমন, ব্লগারদের প্রথম ওয়েবে যারা এসেছিলেন তারা কনটেমপরারি বিষয় নিয়ে লিখতেন, ব্লগারদের পারস্পরিক জানা-পরিচয় নিয়ে লেখার চর্চা তখনও অনুপস্থিত। এসময়টাতে কর্তৃপক্ষ যেমনটা চেয়েছিলেন তেমন ব্লগারদেরই তারা দেখলেন তাদের ঘাটে নাও ভিড়াতে। কেউ রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখছে, সরকারকে সমালোচনা করে, কেউ সমর্থন করে। কেউ ধর্ম নিয়ে পড়েছে, এর ব্যবচ্ছেদ করে শেষ,কেউ আবার শুরু করেছে ওয়াজ-মাহফিল। এই বিভিন্ন কিসিমের ব্লগাররা আবার তাদের পারস্পরিক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাকা সত্ত্বেও আলোচনামূলক সম্পর্ক বিনিময় করছে। যুক্তি দিয়ে কখনও আবেগ দিয়ে তার মন্তব্য সেধিয়ে দিচ্ছে। প্রি-প্রাপ্তিকালের প্রথমভাগে কর্তৃপক্ষের ব্লগের রূপরেখার পূর্ব-পরিকল্পিত অবস্থানের পুরোপুরি বাস্তবায়ন দেখা যায়। সেই রূপরেখা তখন পর্যন্ত আমি যা জানি তা হলো যে কেউ এখানে যা কিছু লিখতে পারে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করাটাকেই কমিউনিটি ভাঙা কাল বলে চিন্থিত করতে পারি।” এই কাল বিভাজনের কারণ কী? এই ব্যাখ্যাও দিয়েছেন কৌশিক আহমেদ। তার মতে, “আমার প্রদত্ত কাল-বিভাজনটার কারণ উল্লেখ্যযোগ্য টার্নিং পয়েন্ট। যেমন সচলায়তন তৈরী হবার পূর্ব পর্যন্ত সব ব্লগার এই একটা প্লাটফর্মে লিখতো। ব্রডস্কেলে এই সময়টা "অবিভাজিত ব্লগ কমিউনিটির কাল" হিসাবেও চিহ্নিত করাও সম্ভব। অবিভক্ত বাংলার মত অবিভক্ত ব্লগ। এর ডিউরেশন সেই অর্থে সবচেয়ে প্রোডাক্টিভ এবং স্বল্পস্থায়ী। এই সময়ে প্রথম ব্লগাররা ভার্চুয়াল অস্তিত্ব ছেড়ে বাস্তবে পরিচিত হতে শুরু করেন। সেজন্য এর ভেতর থেকে এবসলিউট ভার্চুয়াল কাল ও বাস্তবে দেখাসাক্ষাৎ শুরু হবার দুটো পিরিয়ডকে আলাদা করতে পারি। প্রাপ্তি ইস্যু ব্লগে পদার্পনের পূর্ব পর্যন্ত ব্লগাররা সম্পূর্ণ রূপেই আলাদা, বিচ্ছিন্ন, স্বল্প মাত্রায় সংগঠিত ভার্চুয়াল অস্তিত্বময় ছিল।” (কৌশিক আহমেদ, ভার্চুয়াল ও ননভার্চুয়াল ক্ষেত্র থেকে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ কর্তৃপক্ষের ব্লগ রূপরেখা এবং এর ব্লগ, ব্লগার ও ক্রমঃবিবর্তিত পরিচালন পদ্ধতি, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, ২৫ মার্চ ২০০৯)।

অন্যদিকে ব্লগার জামাল ভাস্কর ভিন্ন আঙিক থেকে কমিউনিটি তৈরি ও ভাঙা-গড়ার বিষয়টিকে ব্যাখা করেছেন। তিনি লিখেছেন, “শুরুতে সকলেই এই ব্লগেই লিখছে...যার যার ইচ্ছামতোন লেখা হইছে...প্রো-লিবারেশনরা যেমন লিখছে, এন্টি লিবারেশনরাও লিখছে সমানে। সাহিত্য আর ভাষা নিয়া লিখছে উত্তরাধুনিকেরা, তাগো অবস্থানরে ব্যঙ্গ কইরা আধুনিকতাবাদীরাও লিখছে। সবাই লিখতো মনের আনন্দে। একে অপররে গালাগালি হইতো যারা যার রুচিবোধ মাফিক। কিন্তু সকলেই ভার্চুয়াল ছিলো বা থাকতেই পছন্দ করতো। একটা সময় আইলো যখন বুঝা গেলো এন্টি লিবারেটরা সংঘবদ্ধ লিখে...তার প্যা রালালি প্রো লিবাশনের সমর্থকেরাও ধীরে ধীরে গ্রুপ গঠনের দিকে গেলো। এই গ্রুপগুলি কতোটা সংঘবদ্ধ ছিলো সেইটা অবশ্য এক্কেরেই প্রশ্নহীন না...কিন্তু ব্লগ কর্তৃপক্ষের প্রথম দিককার একটা সিদ্ধান্ত প্রো-লিবারেশনপন্থীগো এক কইরা ফেললো বইলা আমার ধারনা। মাসুদা ভাট্টি'র একটা ধারাবাহিক উপন্যাসের সম্ভবতঃ দ্বিতীয় পর্ব তারা মুইছা ফেলে ব্লগ পোস্ট হিসাবে। এর প্রতিবাদে হয় ব্লগে প্রথম ঘোষণা দিয়া ব্লগ বিরতি। এই বিরতি ব্লগের নিয়মিত চরিত্র পাল্টাইয়া ফেললো...।” (জামাল ভাস্কর, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, মার্চ ২০০৯)

ব্লগ কমিউনিটি ও ব্লগ মডারেশন পদ্ধতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা উঠে এসেছে ব্লগার আজাদ মাস্টারের একটি ব্লগ পোস্টে। তিনি লেখেছেন, “বাংলা ব্লগ দুনিয়াতেও হয়েছে অনেক উথাল পাতাল, সামু ব্লগকে বাংলা কমিউনিটি ব্লগের ধারনা দাতা বা পাওনিয়ার বলা যায় সেখানে জমা হতো ডান বাম আস্তিক নাস্তিক মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার নানা কিসিমের মানুষ জন। তবে তাদের এই মনোপলি বেশিদিন থাকেনি বলা যায় কারন মডারেশন নিয়ে তাদের অস্বচ্ছ নীতি অনেক ব্লগারকেই ক্ষুব্ধ করে। ফলে ২০০৭ সালে সচলায়তন ব্লগ চালু হয়। এই ব্লগের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্লগারগণ স্বচ্ছ কিন্তু কঠোর মডারেশনের উপর জোর দেন এবং সদস্য ভুক্তির ব্যাপারে নেন কঠোর নিরক্ষনের রাস্তা। এর ভালো মন্দ দুইটা দিকই আছে। ভালো দিক, যারা লেখালিখি করতে চান বিশেষ করে কবিতা ,গল্প তাদের জন্য পরিচ্ছন্ন একটা প্লাটফর্ম হয়ে যায় সচলায়তন। বাংলা ব্লগের ভালো লেখাগুলোর বেশিরভাগ সচলায়তনে পাওয়া যায়। তবে এই কঠোর মডারেশনের খারাপ দিকগুলো হচ্ছে সচলায়তনে নতুন ব্লগারেরা আগ্রহ পায় না ব্লগের জটিল মডারেশনের কারনে। আরেকটা যে বিষয় লক্ষ্য করছি সেইটা হচ্ছে, সচলায়তনে প্রবাসী ব্লগারদের আধিক্য, বেশি বিশেষ করে আমেরিকা ,কানাডা সহ উন্নত পশ্চিমা দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত কিংবা চাকুরীরত। বাংলাদেশ হতে ব্লগকরনেওয়ালা ভালো ব্লগারের সংখ্যা সেখানে কম সংখ্যায়। তবে যাই হোক স্বাধীনতা বিরোধীদের নানা কুযুক্তির বুদ্ধিভিত্তিক জবাব দেওয়ার জন্য এই ব্লগের ব্লগারেরা অগ্রগামী । ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল যাত্রা আরম্ভ হয় আমার ব্লগের । সচলায়তন যেখানে কঠোর মডারেশনের জন্য পরিচিত সেখানে আমার ব্লগ পরিচিত তার নো মডারেশনের নীতিমালার জন্য। এই নীতিমালার ভালো দিকগুলা হচ্ছে এতে নতুন ব্লগারেরা নিজেদের সহজেই মনোভাব প্রকাশ করার একটা প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে আর ইন্টার্যাগকশনের জন্যেও আমার ব্লগের মডারেশন খুবই বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তবে এই ধরনের রিলাক্স মডারেশন পলিসির খারাপ দিকও কম না। প্রথমত আমার ব্লগে ভুয়া নিক পয়দা করে প্রতিপক্ষের সাথে রনে লিপ্ত হয়ে ব্লগের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে ফেলাটা অপেক্ষাকৃত সহজ যা অন্য ব্লগে সহজে করা সম্ভব হয় না। ফলশ্রুতিতে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লগের প্রক্সিওয়ারের তীর্থভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে আমার ব্লগ।” (আজাদ মাস্টার, বাংলা ব্লগগুলির ক্রম বিবর্তন, আমার ব্লগ, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১১)।

নতুন নতুন ব্লগ সাইট তৈরি হওয়ার সঙ্গে কমিউনিটি ভাঙা-গড়ার সম্পর্ক রয়েছে। ব্লগার কমিউনিটির প্রথম দৃশ্যমান ভাঙন হয় মডারেশন পদ্ধতিতে কেন্দ্র করে। মাসুদা ভাট্টির একটি পোস্ট ‘ধর্মানুভুতিতে আঘাত দেওয়া হয়েছে’ যুক্তিতে ব্লগ থেকে মুছে ফেলা হয়। উল্লেখ্য তখনও ব্লগে লিখিত কোন নীতিমালা ছিল না।এক ধরনের অলিখিত নিয়মনীতির মাধ্যমে ব্লগ মডারেশন চলতো। তবে ব্লগারদের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্লগীয় নিয়ম-নীতির উন্নয়ন হয়। মাসুদা ভাট্টির পোস্ট মুছে ফেলার ঘটনা ব্লগারদের মধ্যে বেশ আলোড়ন তুলে। সেই সময় কিছু কিছু ব্লগারের পক্ষ থেকে ব্লগ বিরতির ঘোষণাও আসে। সেই সময়কার বিরোধ বাংলা ব্লগের অবিভাজিত কমিউনিটিকে ভেঙে দেয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই পরবর্তীতে ২০০৭-এর ১ জুলাই কমিউনিটি বাংলা ব্লগিংয়ের দ্বিতীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সচলায়তনের যাত্রা শুরু হয়। সচলায়তনের পর সামহ্যোয়ারইন ব্লগের একদল ব্লগার ২০০৮ সালের এপ্রিলে আমার ব্লগ নামে নতুন আরেকটি ব্লগের সূচনা করেন। সামহ্যোয়ারইন ব্লগের ব্লগাররাই পরবর্তীতে আমরা বন্ধু, চতুর্মাত্রিক, সরবের মতো নতুন নতুন ব্লগ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে। এসবের মাধ্যমে ব্লগ মালিকানার গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। বাংলা কমিউনিটি ব্লগ শুরু হয়েছে সামহ্যোয়ারইন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ব্লগ তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও সামহ্যোয়ারইনের ব্যবসায়িক পরিচয় রয়েছে। ফলে সামহ্যোয়ারইন ব্লগের ক্ষেত্রে ব্লগের মালিকানা এটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ছিল। সচলায়তন, আমার ব্লগ, আমরা বন্ধু, চতুমাত্রিক ইত্যাদি ব্লগগুলোতে মালিকানার রূপ পরিবর্তিত হয়ে ব্লগারদের কাছে চলে যায়। অবশ্য ব্লগ কমিউনিটির ভাঙা গড়ার পেছনে এই মালিকানার ধারণা হয়তো খুব বেশি কাজে লাগেনি। তবে একই ঘরাণার লোকদের জন্য একটি ব্লগ, এমন চিন্তা হয়তো কোন কোন ব্লগার-গোষ্ঠী করেছেন। ব্লগ ভাঙা গড়ার ক্ষেত্রে কেবল সামহ্যোয়ারইন ব্লগের কমিউনিটিই ভাঙেনি, প্রথম আলো ব্লগের একদল ব্লগার আলাদা হয়ে মুক্তব্লগ নামে একটি ব্লগ তৈরি করেছেন। মডারেশন পদ্ধতি, পারস্পরিক মতবিরোধ, ব্লগীয় পরিবেশ ইত্যাদি নানা কারণে ব্লগ কমিউনিটির ভাঙন দেখা যায়। কোন কোন ক্ষেত্রে ভেঙ্গে যাওয়া কমিউনিটির কয়েকজন ব্লগার মিলে নতুন ব্লগ তৈরি করেছেন। দ্রুপাল, ওয়ার্ডপ্রেস, জুমলার মতো সিএমএস উন্নয়নের ফলে কমিউনিটির ব্লগ তৈরি এখন তুলনামূলক সহজ।

একটা বিষয় লক্ষ্যনীয়, কমিউনিটি ব্লগগুলোকে বর্তমানে অনেক আলোচনায় সামাজিক ব্লগ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগসাইটগুলোর জনপ্রিয়তাকেই এই নতুন নামকরণের কারণ হিসেবে চিহিৃত করা যায়। কমিউনিটি ব্লগ কিংবা সামাজিক ব্লগের চরিত্রগত খুব বেশি পার্থক্য নেই। দুই শ্রেণীর ব্লগেই ব্লগারদের সামাজিকতার উপস্থিতি রয়েছে। যে বিবেচনায় বাংলা ব্লগকে কমিউনিটি ব্লগ বলা হয় তা মূলত ব্লগার কমিউনিটির জন্য। এখানে ব্লগের পরিমাপ কেবল ব্যক্তির নিরিখে বিবেচিত হয় না। ব্লগ কেন্দ্রিক আলোচনা ওঠলে ব্লগার কমিউনিটির প্রসঙ্গ চলে আছে। কমিউনিটি ব্লগিংয়ের জন্যই ব্লগের কমন হোমপেজের এতো গুরুত্ব। কেউ ব্লগীয় কোন অপরাধ করলে তাকে কমন হোমপেজে পোস্ট করতে দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই সে নিজের পেজে ব্লগ পোস্ট করতে পারে। অন্যদিকে কোন পোস্টে আপত্তিকর কিছু থাকলে অনেক সময় তা কেবল কমন হোমপেজ থেকে মডারেশন করে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই কমন হোমপেজের ধারণাগত ও ব্যবহারিক জনপ্রিয়তা মূলত ব্লগ কমিউনিটির জন্য। এখানে ব্লগাররা পোস্ট লেখেন তার কমিউনিটির অন্যান্য ব্লগারদের কথা মাথায় রেখে, মন্তব্যও করেন সেই একই কমিউনিটির কথা মাথায় রেখে। অন্যদিকে, একত্রে অনেক ব্লগার ব্লগিং করছেন, মিথস্ক্রিয়া বজায় রাখছেন, পাশাপাশি পারস্পরিক সামাজিক যোগাযোগও রাখছেন এই বিবেচনায় কিছু বাংলা ব্লগসাইটকে সামাজিক ব্লগ সাইট হিসেবে চিহিৃত করা যায়। তবে হাল আমলে কেউ কেউ ব্লগে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। তবে তা সামাজিক ব্লগের চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ করে তা নিরুপন করা কঠিন। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29521508 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29521508 2012-01-13 07:04:58
ব্লগ রাজনীতি ও ব্লগের রাজনীতি
লক্ষ্য করা যাক, ব্লগাররা শব্দ হিসেবে ব্লগ রাজনীতি খুব একটা ব্যবহার করেন না। তারা ব্যবহার করেন ব্লগ পলিটিক্স। এর কারণ বিশ্লেষণ করা যায় বাংলা ব্লগে ব্লগারদের শব্দের ব্যবহারের ব্যঞ্জনা বিশ্লেষণ করে। পলিটিক্স শব্দটি ব্লগগুলোতে বেশিরভাগ অর্থেই নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয়। এমনিতেই পলিটিক্সের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের এক ধরনের বিতৃষ্ণা রয়েছে। সেই প্রভাব ব্লগেও পড়েছে। তবে এই আলোচনার জন্য আমি রাজনীতি শব্দটিকেই বেছে নিলাম।

ব্লগ রাজনীতি কি বাংলা ব্লগের শুরু থেকেই ছিল? এর উত্তর না। রাজনীতির উদ্ভব হয় একটি কমিউনিটিতে। ব্লগের শুরুর দিকে ব্লগ কমিউনিটিই দাড়ায়নি। ব্লগ কমিউনিটি পরিপূর্ণতা লাভের সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ভব হয় ব্লগ রাজনীতির। বাংলা ব্লগ রাজনীতির উদ্ভব জনপ্রিয়তার পিছনে ছুটতে গিয়ে। ব্লগ বিকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কারও কারও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলো, পাশাপাশি গোষ্ঠীবদ্ধতাও তৈরি হলো। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার মাধ্যমেই ব্লগ রাজনীতি শুরু হয়েছে। বাংলা ব্লগিংয়ের আদি ব্লগ হিসেবে সামহ্যোয়ারইন ব্লগের অনেক পোস্ট এই ব্লগ রাজনীতির প্রমাণ ধরে রেখেছে। ব্লগ রাজনীতির বর্তমান যে রূপ আমরা দেখছি তাতে নতুন কোন ব্লগার আসলেই তার লেখার চেয়ে রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ব্লগের গোষ্ঠীবদ্ধ অবস্থানের কথা বিবেচনা করা হয়। এই ব্লগ রাজনীতির জন্যই এক ধরনের বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় নতুন ব্লগারদের। বাছাই প্রক্রিয়ায় ঠিক করা হয় পক্ষের বা বিপক্ষের লোক। নতুন ব্লগারকে পক্ষের লোক মনে হলে তার ব্লগে কমেন্ট করা যাবে আবার বিপক্ষের লোক হলে তার ব্লগে কমেন্ট করা যাবে না। ব্লগার হয়ে উঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে এই ব্লগ পলিটিক্সের সম্পর্ক রয়েছে। কিংবা অন্যভাবে বলতে গেলে ব্লগার হয়ে উঠার পাশাপাশি অনেকেই হয়ে উঠেন ব্লগ পলিটিশিয়ান। বাংলা ব্লগ পলিটিক্সে গোষ্ঠীবদ্ধতার চর্চাই বেশি হয়। ফলে নতুন ব্লগারদের ব্লগে টিকে থাকতে হলে কোন একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মেলাতে হয়।

ব্লগ রাজনীতির কয়েকটি ধাপ লক্ষ করা যাক। প্রথমত আদর্শগত দ্বন্ধ, দ্বিতীয়ত গোষ্ঠীবদ্ধতার চর্চা, তৃতীয়ত জনপ্রিয়তা অর্জনের চোরাপথ হিসেবেও ব্লগ-রাজনীতির ব্যবহার এবং চতুর্থত ব্লগ দখলের রাজনীতি। সুমন রহমান তার ‘সামহোয়ারনামা’য় বর্গী নিক সমাজের কথা বলেছেন। তিনি লেখেছেন- “বর্গী নিকসমাজের কথা বলছিলাম, এরা এদের মতাদর্শ দিয়ে পরিচিত। এভাবে একদঙ্গল নিকের বিরূদ্ধে আরেক দঙ্গল নিক, ইডিওলজি ওয়ারফেয়ার। এরা হাঙরের মত দল বেঁধে চলে, ঝাঁকে ঝাঁকে মাইনাস দেয়, জুতা রেটিং করে, গালির তুবড়ি ছোটায়। এটা শত্রুশিবিরে। আর মিত্রশিবিরে এরা মিষ্টভাষী অনুমোদক, অনলবর্ষী সমর্থক, মিত্রশিবিরের আকাশে এরা পুষ্পকরথ সমেত টহল দিয়ে বেড়ায়। ক্ষণে ক্ষণে পুষ্পবৃষ্টি ঘটায়। পাড়ায় যে নতুন, তাকে এরা নানান প্রক্রিয়ায় যাচাই বাছাই করে। তাদের বাছাই পদ্ধতি দ্বিমাত্রিক: ফলে দুইমাত্রার বাইরের কেউ হলে তার ভয়াবহ বিপদ। হয় মাত্রা রিডিউস করতে হবে, না হয় দুই শিবিরেরই সন্দেহভাজন এবং অপ্রিয়ভাজন হয়ে থাকতে হবে। (সুমন রহমান, সামহোয়ারনামা, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, মার্চ ২০০৯)। ব্লগ রাজনীতির ক্ষেত্রে এই ‘বর্গী নিক সমাজের’ বেশ ভূমিকা রয়েছে। নিক চর্চার নেতিবাচক দিকও এটি। নিক চর্চার মাধ্যমে নোংরাভাবে ব্লগীয় রাজনীতি হয়েছে। যার ফলে অনেক নিয়মিত ব্লগারকে ব্লগ ছেড়ে দিতে হয়েছে।

ব্লগাররা ব্লগ রাজনীতির পেছনে বিভিন্ন কারণ খুঁজে পেয়েছেন। কেউ দায়ী করছেন গ্রুপিংকে, কেউ দায়ী করছেন মতাদর্শিক দ্বন্ধকে, কেউবা আবার দায়ী করছেন দলীয় প্রোপাগান্ডাকে। ব্লগার জামাল ভাস্কর লেখেছেন, “বাংলা ব্লগিং'এর দুইটা অভিজ্ঞতা থেইকা দেখতেছি ব্লগিং'এর সাথে গ্রুপিং কাহিনীটা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়াইয়া গেছে। যেই কারনে শোভন দূরত্ব তৈরীর প্রসঙ্গ তুইলা ফেলেন ব্লগারের সাথে অনেকেই, সেই ব্লগারের ব্লগিংয়ের সাথে নয়।” (জামাল ভাস্কর, সচলায়তন, জুলাই ২০০৭)। বাংলা ব্লগে গ্রুপিংয়ের প্রভাব বেশ প্রকট। কেউ কেউ একে সিন্ডিকেট ব্লগিং নামেও অভিহিত করে থাকেন। ব্লগার কালপুরুষ ব্লগ রাজনীতি সম্পর্কে লেখেছেন, “ব্লগে পছন্দের বা অপছন্দের ব্লগার নির্ধারিত যতটা না লেখার মধ্যে দিয়ে তার চেয়ে বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং নিজস্ব পছন্দ বা অপছন্দের মাধ্যমে। তাই যে যার পছন্দের ব্লগারের সাথেই মত বা মন্তব্য বিনিময়ে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আর যারা সুশীল ব্লগার তারা যে কোন ধরণের ব্লগারের কাছ থেকেই মন্তব্য পেয়ে থাকেন এবং একটা মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে যান। তারা কোন বিতর্কিত লেখাতে তেমন কোন মতামত দিতে চাননা বা দিতে অস্বস্তিবোধ করেন। তবে ব্লগীয় সম্পর্ক যদি কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ছাড়িয়ে যায় সেক্ষেত্রে যারা এই সম্পর্কের বাইরে থাকেন বা যারা সহজে মানুষের সাথে মিশতে পারেন না তাদের অনেকের কাছেই ব্যাপারটা ঈর্ষা বা নিজের ব্যক্তিগত অপারগতা বা দুর্বলতার কারণ হিসেবে দেখেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে কোন ব্লগারের বিপুল জনপ্রিয়তা বা ব্লগীয় গন্ডির বাইরে ব্লগারদের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বা সখ্যতা অনেকের কাছে ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর সেই কারণেই একজন ব্লগার কারো অপছন্দের তালিকায় চলে আসতে পারেন।” (কালপুরুষ, প্রথম আলো ব্লগ, নভেম্বর ২০০৯)। ব্লগার কালপুরুষ ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতিকে ব্লগ রাজনীতির জন্য দায়ী করেছেন। অন্যদিকে ব্লগার পারভেজ ব্লগ রাজনীতি সম্পর্কে লেখেছেন, মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে পারস্পরিক মতবিরোধ, দলাদলি, নৈতিক ভিন্নতার লিখিত বহিঃপ্রকাশ।”

তবে ফাহমিদুল হক ব্লগ রাজনীতির বিষয়টিকে ভিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বাংলা ‘ব্লগরাজনীতি’র তিনটি দিক উল্লেখ করেছেন। এক. বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জামায়াতবিরোধিতা, দুই. গণতন্ত্রের জন্য তৎপরতা এবং তিন. ব্লগাভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই। (ফাহমিদুল হক, বাংলা ব্লগ কমিউনিটি : মতপ্রকাশ, ভার্চুয়াল প্রতিরোধ অথবা বিচ্ছিন্ন মানুষের কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা, যোগাযোগ, ডিসেম্বর ২০১০)। তবে ফাহমিদুল হকের উল্লেখ করা প্রথম দুইটি ‘ব্লগরাজনীতি’র দিক আদতে বাংলা ব্লগের সংস্কৃতি। এদুটিকে ব্লগ সংস্কৃতি হিসেবে চিহ্নিত করাই অধিকতর য়ৌক্তিক। বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও জামায়াতবিরোধিতা ব্লগের গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। অন্যদিকে গণতন্ত্রের জন্য ব্লগাররা বিভিন্ন সময় তৎপরতা দেখিয়েছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্লগাররা মত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং মানুষকে সচেতন করতে পেরেছে। ব্লগাররা ব্লগ রাজনীতি বলতে যা বুঝেন তা ফাহমিদুল হকের ব্লগ রাজনীতির তৃতীয় দিকটিতে রয়েছে। ব্লগ রাজনীতি হিসেবে ‘ব্লগাভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই’য়ের কথা বলতে গিয়ে ফাহমিদুল হক ‘ট্যাগিং’ এর কথা বলেছেন। তিনি লেখেছেন, “ট্যাগিং ব্লগে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। ভিন্নমতকে দমন করার জন্যও ঐ একই ট্যাগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ব্লগের বাইরে সমমনা ব্লগাররা ফেসবুক, ইমেইল, মেসেঞ্জার, ফোনালাপ বা ব্লগীয় আড্ডার মাধ্যমে তাদের বন্ধন দৃঢ় করতে থাকেন, আর বিরুদ্ধমতের ব্লগারদের তারা ব্লগময়দানে এসে গালি ও ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে দমন করতে থাকেন।”

ব্লগ রাজনীতি ছড়িয়ে পড়েছে এক ব্লগ থেকে অন্য ব্লগে। ফলে এক ব্লগের কোন ঘটনা নিয়ে পোস্ট দেওয়া হয় অন্য ব্লগে। ফেসবুকের মাধ্যমেও অভিযোগনামা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ব্লগ রাজনীতির উন্নত সংস্করণ হিসেবে বগোস্ফিয়ার দখলের রাজনীতিও শুরু হয়েছে। বগোস্ফিয়ার দখলের রাজনীতির ক্ষেত্রে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ ও আমার ব্লগের দ্বন্ধ বেশ প্রকটভাবেই হাজির রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ব্লগ দিবসের কথা মনে করা যাক। সামহোয়ারইন ব্লগ ১৯ ডিসেম্বরকে বাংলা ব্লগ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমার ব্লগ ১ ফেব্রুয়ারিকে বাংলা ব্লগ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আলাদা আলাদা দুইটি তারিখে বাংলা ব্লগ দিবস উদযাপন ব্লগ রাজনীতির প্রকাশ। সচলায়তনকে বগোস্ফিয়ার দখলের রাজনীতিতে দেখা যায়নি। অবশ্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে সচলায়তন ব্লগইস্যুতে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে। প্রথম আলো ব্লগকেও এখন পর্যন্ত বগোস্ফিয়ার দখলের রাজনীতিতে দেখা যায়নি।

ব্লগ রাজনীতির কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ ব্লগটির নাম সামহ্যোয়ারইন ব্লগ। ব্লগ রাজনীতির জন্য নানাভাবে ব্লগার হারিয়েছে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ। নতুন বেশ কিছু কমিউনিটি ব্লগের সৃষ্টি হয়েছে ‘সামুর ব্লগ পলিটিক্সে বিরক্ত হয়ে’। ব্লগ পলিটিক্স কেবল একটি ব্লগের জন্যই ক্ষতিকর নয়, বাংলা ব্লগ কমিউনিটির জন্যই ক্ষতিকর। তবে ব্লগ এবং ব্লগার যেহেতু আছে, ব্লগ রাজনীতির চর্চাও দেখতে হবে ব্লগারদের।


(ব্লগ রাজনীতি বেশ বিতর্কিত একটি বিষয়। তাড়াহুড়া করে পোস্টটি লেখা হয়েছে। পরবর্তীতে এডিট করা হবে। ব্লগ রাজনীতি নিয়ে আপনাদের মতামত জানতে পারলে ভালো লাগবে।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29516535 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29516535 2012-01-05 06:28:22
ব্লগের সাহিত্য ও ব্লগ সাহিত্য
ভিন্ন আঙ্গিকে যদি প্রশ্ন করা, ব্লগ কি সাহিত্য? এই প্রশ্ন পুরো ব্লগের জন্যই। ব্লগে নানা ধরনের লেখালেখি হয়। এরমধ্যে আছে দিনলিপি, স্মৃতিচারণ, চলমান ঘটনার বিশ্লেষণ, মতামত, জার্নাল, সিনেমা ও বই সমালোচনা, ফিচার, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক লেখা, ছবি ও ছবির আলোচনা, গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি। এরমধ্য থেকে আলোচনার সুবিধার্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও ছড়াকে শুরুতেই সাহিত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যাক। এর বাইরে বাকি যে বিষয়গুলো রয়েছে তা কি সাহিত্য? এই বিতর্কে দুইদিকেই ব্লগারদের অবস্থান রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন- ব্লগ সাহিত্য। এখানে লেখা কবিতা, গল্প, উপন্যাস তো অবশ্যই সাহিত্য, এর পাশাপাশি আরও অনেক বিষয় ব্লগে প্রকাশিত হয় যেগুলোকে সাহিত্যের উপাদান হিসেবেই মনে হয়। অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন- ব্লগ মূলধারার সাহিত্য না, কারণ এতে দিনলিপি ঢুকে যায় অনেকটাই। দিনলিপির সংস্রবটা সমস্যা না। মূলধারার সাহিত্যে সবটা সাহিত্যিক/শৈল্পিক সৃষ্টি খুব গাঢ় হয়, ব্লগে সেটা ছড়িয়ে থাকে হাজারটা ছোট ছোট কথায়।

কোন কোন ব্লগার অবশ্য ব্লগকে লেখালেখি চর্চা করার জায়গা হিসেবে দেখেছেন। তাদের মতে, ব্লগ লেখালেখি মকশো করার জায়গা হিসেবে মন্দ না। এখানে সম্পাদকের শাসন নেই, প্রত্যাখ্যাত হয়ে নবীন লেখকের মুষড়ে পড়ার ভয় নেই। বরং আছে তাৎক্ষণিক মন্তব্যে ভালোমন্দ যাচাইয়ের সুবিধা। অভ্যাসটা ধরে রাখতে পারলে তা ফল দেবে, কেউ কেউ ভালো লেখকও হয়ে উঠবেন। আবার কোন কোন ব্লগার ব্লগকে লেখকের মার্কেটিংয়ের জায়গা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। বই প্রকাশে এবং প্রচারের সঙ্গে মার্কেটিং জড়িত। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের বর্তমান অবস্থা নীরিক্ষা করলে দেখা যাবে এখানে কয়েকজন লেখকের বই-ই ঘুরে ফিরে বেশি বিক্রি হয়। এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ১৫-২০ জনের বেশি হবে না। বাকি লেখকদের বই বিক্রির পরিমান খুবই কম। এই ‘সর্বোচ্চ ১৫-২০ লেখকই’ ঘুরে ফিরে বছরজুড়ে মূল সাহিত্যালোচনায় থাকছেন, পত্রিকার সাহিত্য পাতায় এদের লেখা কিংবা এদের লেখার সমালোচনা ছাপা হচ্ছে। ফলে পাঠক ঘুরেফিরে তাদের লেখার সাথেই পরিচিত হচ্ছেন এবং তাদের বই কিনছেন। যে আলোচনাটি এখানে প্রাসঙ্গিক তা হলো পাঠক যদি কোন লেখকের লেখার সাথে পরিচিত না থাকেন তাহলে তিনি কেন সেই লেখকের কোন বই কিনবেন? ব্লগ এই বিষয়টির ক্ষেত্রে একটি পর্যবেক্ষণ নিয়ে হাজির হয়েছে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ব্লগারদের বই ভালো বিক্রি হয়েছে। এর কারণ ব্লগাররা তাদের লেখালেখি প্রকাশের জায়গা পেয়েছেন, পাঠকের কাছে পৌঁছানোর উপায় পেয়েছেন। তাছাড়া ব্লগে লেখালেখির মাধ্যমে ব্লগারদের সার্কেলও হয়ে গেছে। ফলে নতুন লেখকদের সাহিত্য করার জন্য ব্লগ একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ব্লগের সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে ব্লগার পান্থ রহমান রেজা লেখেছেন, ‘আমার ধারণা, ব্লগ বর্তমানে আমাদের ভুবনে নতুন বিষয় হলেও আগামী দিনে এটাই লেখালেখির (সাহিত্যচর্চার) বড় একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে। নতুন ব্লগভিত্তিক সাহিত্যিকগোষ্ঠীর পাশাপাশি মুলধারার লেখকরাও ব্লগ সাহিত্যে আসবেন। নিয়মিত লিখবেন। আর এজন্যই ব্লগের পাঠকদের মেজাজ মর্জির খোঁজখবর রাখা দরকার বলে আমি মনে করি। এটা বরং যারা আগামী দিনে ব্লগ নির্ভর সাহিত্য করবেন, তাদের কাজে দেবে। (পান্থ রহমান রেজা, নতুন দিনের ব্লগ সাহিত্য, একটি অভিমত, সচলায়তন, জুলাই ২০০৮)। ব্লগ ও সাহিত্যের পার্থক্য নিয়ে ব্লগেই বেশকিছু বিতর্ক হয়েছে। সেই বিতর্কে ব্লগারদের নানা মন্তব্য এসেছে। সেইসব মন্তব্য থেকে প্রাসঙ্গিক দুইটি মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। ব্লগার ইশতিয়াক রউফ লেখেছেন, “সাহিত্যরস উপলব্ধির জন্য অনেক সময় দরকার, স্থির চিত্ত দরকার। সাহিত্য সময় লিখিত, পঠিত। ব্লগ সেই তুলনায় অনেকটাই ‘দৌঁড়ের উপর’ লেখা। এই গতিই ব্লগকে আলাদা করে দেয় অন্য যেকোন মাধ্যম থেকে। গতির কারণেই লেখার আকার সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে ব্লগে। সময়ের স্বল্পতার কারণেই সময়ের সাথে সাথে আরো গতিশীল মাধ্যম আসবে।” (ইশতিয়াক রউফ, সচলায়তন, ২০০৮)। ইশতিয়াক রউফ ব্লগের গতির কথা বলেছেন। এই কথার সত্যতা মেলে ব্লগের পোস্ট ও মন্তব্যগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে। পোস্ট খুব বড় হলে সহব্লগারদের কাছ থেকে অনুযোগ লক্ষ্য করা যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ব্লগের গতির চর্চা রয়েছে। তবে সময় নিয়ে ব্লগ লিখে তা প্রকাশ করার প্রবণতাও বেড়েছে। ব্লগার রণদীপম বসু মন্তব্যে লেখেছেন, “ব্লগ আর সাহিত্য, দুটোকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায় বেঁধে ফেলা কি ঠিক? সাহিত্য যদি হয় সংযোগ বা সমন্বয়সূত্র, অতীতের সাথে বর্তমানের, লেখকের সাথে পাঠকের, পাঠকের সাথে পাঠকের, যাপিত জীবনের বাস্তবতার সাথে মানবমনের উপলব্ধির, ব্লগ কি এর বাইরে? এই যে আমরা ব্লগরব্লগর করছি, এটা সাহিত্য নয় কে বললো? সাহিত্য তো মঙ্গল গ্রহ থেকে আনা কোন আচানক জিনিস নয়। যদি আসেও, পৃথিবীর সংশ্লেষণে তাও তো সাহিত্যের অংশ হয়ে যাচ্ছে। ব্লগে যিনি কবিতা লিখছেন, যিনি ছড়া লিখছেন, যিনি ভ্রমন কাহিনী লিখছেন, যিনি আজাইরা প্যাঁচালের নামে তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশ করছেন, যিনি প্রবন্ধ নিবন্ধের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার সংশ্লেষ ঘটাচ্ছেন, কোনটা সাহিত্য নয় ? শুধু গল্প কবিতা উপন্যাস বা প্রবন্ধ নিবন্ধকেই সাহিত্য নাম দিয়ে যারা সাহিত্যকে জানতে অজান্তে গন্ডিবদ্ধ করে ফেলছেন, তারা মূলত ব্লগ নামের দ্রুত কার্যকর ও বিশাল সম্ভাবনাময় একটা মাধ্যমকে খন্ডিত দৃষ্টিতে দেখছেন বলে আমার বিশ্বাস। ব্লগে যিনি কেবল মাত্র মন্তব্য করছেন, তিনিও সাহিত্যস্রোতের বাইরে নন। ব্লগার মানেই হচ্ছে সময়ের অগ্রবর্তী সাহিত্যিক সত্ত্বা।” (রণদীপম বসু, সচলায়তন, ২০০৮)

ব্লগে লেখালেখির মাধ্যমে কি তাহলে লেখক তৈরি হচ্ছে? বাংলা ব্লগিংয়ের সঙ্গে যারা জড়িত তারা এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ-সূচক জবাব দিবেন বলেই মনে হয়। ব্লগে লেখালেখির মাধ্যমে ‘মূলধারার সাহিত্য পাতার’ লেখক হয়ে উঠেছেন। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন ব্লগারের গল্প, কবিতা মূলধারার সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছে। বলে রাখা ভালো, ‘মূলধারার সাহিত্য পাতায়’ লেখা প্রকাশিত হলেই তাকে লেখক বলা যাবে কিনা সেই বিতর্কে এখানে যেতে চাচ্ছি না। ব্লগে লেখালেখির মাধ্যমে লেখক তৈরি হওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাহমিদুল হক লেখেছেন, “ব্লগে লিখে লিখেই অনেক শক্তিশালী লেখকের সৃষ্টি হয়েছে। ব্লগ কমিউনিটি তাদের লেখালেখির সুযোগ করে না দিলে হয়তো সংবাদপত্র-লিটল ম্যাগাজিনের মতো দ্বাররক্ষক-নিয়ন্ত্রিত মাধ্যমে লেখালেখি করে লেখক হয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। কেবল সামহ্যোয়ার ব্লগে লিখেই আবির্ভাব ঘটেছে (অ)গাণিতিক (তানভীরুল ইসলাম), আকাশচুরি (তারিক স্বপন), মোস্তাফিজ রিপনের মতো গল্পকারের। ২০০৯ সালে সামহ্যোয়ার-এর ব্লগারদের বাৎসরিক প্রকাশনা ‘অপরবাস্তব ৩’-এ এরকম বেশ কয়েকজন শক্তিশালী নতুন গল্পকারের গল্প প্রকাশিত হয়েছে। আবার সাইবারমাধ্যমে লিখতে লিখতে মুদ্রণমাধ্যমে গ্রন্থপ্রকাশে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন অনেকেই এবং এর সংখ্যা প্রতি বছর বেড়ে চলেছে।” (ফাহমিদুল হক, বাংলা ব্লগ কমিউনিটি : মতপ্রকাশ, ভার্চুয়াল প্রতিরোধ অথবা বিচ্ছিন্ন মানুষের কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা, যোগাযোগ, ডিসেম্বর ২০১০)। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক ও ব্লগার আহমাদ মোস্তফা কামাল এ সম্পর্কে লেখেছেন, “ব্লগের ক্রমবর্ধমান বিকাশ দেখে মনে হচ্ছে, ক্রমশই এই বিষয়টি তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। যারা কোনোদিন লেখার কথা ভাবেনও নি, তারাও হয়তো লিখতে শুরু করেছেন। লিখতে লিখতেই শিখে গেছেন, আলোচনা সমালোচনা উপদেশ পরামর্শ তাদেরকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলছে। আর এখানেই ব্লগ অন্যান্য যে কোনো মাধ্যমের থেকে আলাদা ও অধিকতর আকর্ষণীয়। সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এখানে একজন লেখকের গড়ে ওঠার প্রাথমিক কাজটি সম্পন্ন হয়।” (আহমাদ মোস্তফা কামাল, অপরবাস্তব:সাহিত্যচর্চার নতুন ধরন, বইয়ের জগৎ, ২০০৯)

সমকালীন বাংলা কমিউনিটি ব্লগ শিরোনামের একটি লেখায় ব্লগার শেখ আমিনুল ইসলাম লেখেছেন, সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে রেঁনেসার সূত্রপাত হয়েছিল, একটি অমিত সম্ভাবনাময় সাহিত্যিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল, যারা আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেক উঁচুতে। বর্তমানে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে তেমনই রেঁনেসা শুরু হয়ে গেছে। ব্লগগুলো থেকে তৈরি হচ্ছেন অনেক প্রতিভাশীল ও অমিত সম্ভাবনাময় কবি ও সাহিত্যিক। বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদী ও সাহিত্যে নব-সংযোজন লিটল ম্যাগাজিনের চর্চা চলছে। এখান থেকেও বের হয়ে আসবে অনেক প্রতিভাশালী লেখক, কবি ও সাহিত্যিক। প্রতি বছর অমর একুশে বই মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোতে পড়ে যায় সাঁজ সাঁজ রব। বিভিন্ন ব্লগ কর্তৃপক্ষ ও ব্লগারদের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ব্লগারদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বই। এ সব পদক্ষেপই আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যাবে অনেক দূর ও অনেক উচ্চতায়। (শেখ আমিনুল ইসলাম, সমকালীন বাংলা কমিউনিটি ব্লগ ভাবনা, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, এপ্রিল ২০১০)

ব্লগের সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আহমাদ মোস্তফা কামাল লেখেছেন, “গত এক দশকে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার একটি হল-ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে লেখালেখির চর্চার উদ্ভব হওয়া। অন্যান্য ভাষায় ব্যাপারটি অনেক আগেই শুরু হলেও বাংলাভাষায় এবং বাংলাদেশে এর উদ্বোধন হয় ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৫ সালে সামহোয়ারইন ব্লগ-এর মাধ্যমে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ঘটনাটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন বলে মূলধারার সাহিত্যজগতে এটি এখনো তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি করতে পারে নি বটে, বা মূলধারার সাহিত্য-আলোচনায় অনলাইন লেখকদের কথা উল্লেখিত হয় না বটে, তবে আগামী দশকের শেষে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে-এটি বিকল্প গণমাধ্যমের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে, এবং হয়তো সেদিন সাহিত্য-আলোচনায় এই লেখালেখিকে আর অস্বীকার করার উপায় থাকবে না।” (আহমাদ মোস্তফা কামাল, অপরবাস্তব:সাহিত্যচর্চার নতুন ধরন, বইয়ের জগৎ, ২০০৯)।তিনি ছাপা মাধ্যমে লেখালেখির সঙ্গে ব্লগের মতো অনলাইন মাধ্যমের লেখালেখির কিছু পার্থক্য চিহ্নিত করেছেন। এগুলো হলো এক. এখানে কোনো সম্পাদকীয় শাসন-অনুশাসন নেই, ফলে যে কেউ যে কোনো ধরনের লেখা প্রকাশ করার অধিকার রাখেন। সেই অর্থে এটি অনেক মুক্ত ও স্বাধীন মাধ্যম। দুই. এই মাধ্যমে লেখক-পাঠকদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া অত্যন্ত চমৎকার। লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পাঠকরা তাদের মতামত জানাতে থাকেন, কোনো প্রশ্ন থাকলে প্রশ্ন করেন, কোনো পরামর্শ থাকলে সেটিও লেখককে জানিয়ে দেন। লেখকও এইসব প্রশ্নের উত্তর দেন, মতামতের ব্যাপারে তার নিজস্ব অবস্থানটি পরিষ্কার করেন। একটি লেখা এইসব বিবিধ মতামত নিয়েই পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে এবং অধিকতর আকর্ষণীয় রূপে পাঠকদের কাছে হাজির হয়। তিন. এখানে লেখক-পাঠকদের সম্পর্ক এক তরফা নয়! একজন লেখক একইসঙ্গে পাঠকও, বা একজন পাঠক একসঙ্গে একজন লেখকও। ফলে পরস্পরের সঙ্গে মতবিনিময় করার একটি চমৎকার মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি। চার. লেখাগুলো সাধারণত উন্মুক্ত থাকে এবং পৃথিবীর যে-কোনো স্থান থেকে যে কেউ যে কোনো সময় সেগুলো পড়বার স্বাধীনতা ভোগ করে থাকেন। অর্থাৎ ছাপা-বইয়ের যেমন দুষ্প্রাপ্যতার একটা ব্যাপার আছে, চাইলেই যে কোনো সময় যে কোনো পাঠক সেটি পড়তে পারেন না, অনলাইনে সেই দুষ্প্রাপ্যতা নেই।

কেউ কেউ বলে থাকেন ব্লগ লেখে কেবল ব্লগারই হওয়া সম্ভব হয়, ব্লগ লেখে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। এ ব্যাপারে ব্লগার নীড় সন্ধানী লেখেছেন, “নিন্দুকেরা কিংবা ঈর্ষাবায়ুগ্রস্তরা যাই বলুক, এই তরুণ ব্লগারদের কেউ কেউ একদিন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক হবেন। প্রকাশকেরা তখন আগাম পয়সা দিয়ে তাঁদের বুকিং দিয়ে রাখবেন, পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকেরা ঈদসংখ্যার পৃষ্ঠা পূরণ করতে এঁদের শরণাপন্ন হবেন। কিন্তু তখন তাঁর প্রতিষ্ঠার কাল, উপার্জনের কাল, খ্যাতির কাল। উন্মেষের কাল তিনি পেরিয়ে এসেছেন ব্লগেই। জীবনের সেরা লেখাগুলোও রেখে এসেছেন ব্লগে। সবচেয়ে ভালো লেখাগুলো লেখার সময় তিনি সাহিত্যিক স্বীকৃত নন, প্রকাশকের আবদারে গার্বেজ লেখার সময়েই তিনি সাহিত্যিক। (নীড় সন্ধানী, ব্লগ লিখে ব্লগারই হয়, ব্লগ লিখে সাহিত্যক নয়, নির্মান ব্লগ, এপ্রিল ২০১১)

প্রাসঙ্গিক একটি আলোচনা এখানে যুক্ত করা যেতে পারে। বেশ কয়েকজন লেখক তাদের সাহিত্যিক পরিচয় নিয়েই ব্লগে লেখালেখি করতে এসেছেন। অনেকেই ব্লগিংয়ের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষণ হলো ব্লগে যে চলমান মিথস্ক্রিয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার সাথে অনেক সাহিত্যিকই মানিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে অনেক ‘মুদ্রন-লেখক’ কিছু দিন ব্লগে লেখে ব্লগ ছেড়ে দিয়েছেন। এই শ্রেণীর কেউ কেউ পরোক্ষভাবে ব্লগে অসংযত মাধ্যম হিসেবেও অভিহিত করেছেন। অবশ্য কিছু কিছু লেখক ব্লগের মিথস্ক্রিয়ার চ্যালেঞ্জটি (লেখক-পাঠকের মুখোমুখি অবস্থান) মোকাবেলা করেই ব্লগে নিয়মিত লেখে যাচ্ছেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29509648 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29509648 2011-12-25 06:37:26
ব্লগের ভাষা
ব্লগের ভাষা এবং নতুন শব্দ ব্যবহার কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন ব্লগার রুখসানা তাজীন। তার মতে, ব্লগারদের লেখা থেকেই ভাষার নতুন শাখা জন্ম নিচ্ছে।(রুখসানা তাজীন, ব্লগের ভাষা, সামহ্যোয়ানইন ব্লগ, জানুয়ারি ২০০৮) রুখসানা তাজীনের কবিতার কিছু অংশ পড়লে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
বাঃ, সবাই কেমন "পোস্টায়" দেখ সরল গরল ঢঙের।
"প্লাসায়" কেহ দেয়নাতো প্লাস, ব্রাত্যজনের ভীড়ে,
অই, কে বা ধরো লিখবে পুরো, সময় যে ভাই বেড়ে।
"আপুনি" তাই আপুমনির শর্টকাট নিকনেম,
ও, "গদাম লাথি" শোননি হায় ছি ছি কী শেম।
ভাই "খিয়াল কইরা" পড়ো যদি "ব্লগারু"দের কমেন্ট,
"ব্যান" খাচ্ছে দেখবে যখন তখন , কখনো "টপরেট"।
আবার, সকল নামের লেজ রয়েছে যেমন ধরো "নাদু"
"প্রচু" "মডু" "অনু" "মানু" এরাই যদুমধু।
তা, "ছাগু" ধরো বিশেষ প্রাণী তাড়ায় সবাই মিলে,
আবার "ধইন্যা পাতা" পেতেও পারো উৎসাহটা দিলে।
কয়, ফারুকী ভাই, চিনলেনা হায়, "ব্যাচেলর"এর জনক
"হয়যে ভাষার বদল সদাই, নয় নাড়িয়ে টনক।
ভাষাবিদের গোলটেবিলে হয়না ভাষার খসড়া,
এই, প্রান্তজনেই ঠিক করে দেয় ভাষার আগাগোড়া।"
তাই, অধম আমি রোজ গিলে যাই ব্লগারগণের লেখা,
ধরো, এখান হতেই জনম নিলো ভাষার নতুন শাখা।

কমিউনিটি ব্লগিংয়ের কল্যানেই হয়তো বাংলা ভাষার ব্লগগুলোতে প্রচুর নতুন নতুন শব্দ তৈরি হচ্ছে। একজন ব্লগার নতুন কোন শব্দ ব্যবহার করলে তা অন্যান্য ব্লগারদের ব্যবহারের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ব্লগের ভাষার ক্ষেত্রে নতুন নতুন সমাসবদ্ধ পদ তৈরি, সন্ধিবদ্ধ শব্দ তৈরি, বড় শব্দকে সংক্ষিপ্তকরণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলা কমিউনিটি ব্লগ এভাবেই নিজস্ব ভাষারীতি পেয়ে গেছে। ব্লগারদের ব্যবহৃত ভাষা বাইরে থেকে পড়লে যে কারও কাছেই অদ্ভূত মনে হবে। ব্লগেই একটি পোস্ট লেখে ব্লগের ভাষা নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম ব্লগারদের কাছে। ব্লগার পটল জানিয়েছেন ‘ব্লগীয় ভাষায় বিশেষত রম্য ও বিনোদনমূলক পোস্টের ক্ষেত্রে শব্দের নানান রূপ দেখা যায়। এখানে বিষয়বস্তুটাই প্রধান। সাহিত্য, কবিতা, ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয়ে ভাষার মাধূর্য সঠিকভাবেই অনুসরণ করতে ব্লগাররা সচেষ্ট থাকে।’ (পটল, বাংলা ব্লগ- সংস্কৃতি, রাজনীতি, সম্ভাবনা, ভাষা, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, ডিসেম্বর ২০১১)। ব্লগীয় ভাষা নিয়ে ফাহমিদুল হক লিখেছেন-“ব্লগ কমিউনিটির একটা নিজস্ব ভাষাশৈলী দাঁড়াচ্ছে। এটা প্রমিত বাংলা যেমন নয় তেমনি মুদ্রণমাধ্যমে বা সমসাময়িক সাহিত্যে কিছু তরুণ লেখকের কাছে আদর পাওয়া ‘পূর্ববঙ্গীয় ভাষা’ও নয়। ব্লগের ভাষায় আঞ্চলিকতার ছোঁয়াচ আছে, তবে শেষ পর্যন্ত তা আঞ্চলিক নয়। সেলফোন-সংস্কৃতি, বিজ্ঞাপন ও এফএম রেডিওর মাধ্যমে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া ‘ডিজুস ভাষা’ও নয় সেটা। এ এক পৃথক ‘ব্লগীয় ভাষা’। এতে প্রমিত ও কথ্য সব ধরনের ভাষারূপেরই মিশেল রয়েছে। একে কখনো মনে হবে ভাষিক অনাচার, আবার একটু খোলামনে দেখলে এর এক অদ্ভূত অনানুষ্ঠানিক সৌন্দর্য ও রস রয়েছে। দুটি শব্দকে সংযোগ করে দেওয়া বা নব নব সমাসবদ্ধ পদ সৃষ্টি করা এই ভাষাসংস্কৃতির অংশ। আবার বড়ো বড়ো নামকে সংক্ষেপে ডাকাই ব্লগীয় ভাষার রীতি।” (ফাহমিদুল হক, বাংলা ব্লগ কমিউনিটি : মতপ্রকাশ, ভার্চুয়াল প্রতিরোধ অথবা বিচ্ছিন্ন মানুষের কমিউনিটি গড়ার ক্ষুধা, যোগাযোগ, ডিসেম্বর ২০১০)

ব্লগের শব্দ ও ভাষা প্রবণতা লক্ষ করা যাক।
যুক্তাক্তর প্রবণতা – মনটা > মন্টা, মন চায় > মন্চায়/ মুঞ্চায়, ব্যাপর না> ব্যাপার্না
ইংরেজি শব্দের ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার – ব্লগিং করা > ব্লগানো, কমেন্ট করা >কমেন্টাইছি, ক্লিক করুন> ক্লিকান, পোস্টাইলাম> পোস্ট প্রকাশ করলাম
সংক্ষিপ্ত ব্যবহার – হাসতে হাসতে পড়ে গেলাম > হা হা প গে
অপভ্রংশ - চরম >চ্রম, খারাপ> খ্রাপ

ব্লগের ভাষা নিয়ে নানা অভিযোগও রয়েছে। কেউ কেউ বলে থাকেন ইচ্ছামতো কিংবা প্রচলিত শব্দের বিকৃত করে ব্লগের ভাষা অনাচার হয়ে উঠেছে। এছাড়া ব্লগের ভাষায় গালাগালিপূর্ণ শব্দযুক্ত থাকার অভিযোগও কেউ কেউ করেন। স্ল্যাং শব্দের ব্যবহার বাংলা ব্লগের বাইরেও রয়েছে। অভ্র বসু তার ‘ বাংলা স্ল্যাং - সমীক্ষা ও অভিধান’ নামের বইটিতে স্ল্যাং ব্যবহারের বেশ কিছু কারন চিহ্নিত করেছেন। কারণগুলোর মধ্যে আছে- ১. হৈ হুল্লোড় অথবা ফুর্তি প্রকাশ ২. মজা করার জন্য ৩. ভাষার অভিনবত্ব সৃষ্টি এবং একঘেয়েমি পুনরাবৃত্তি দুর করার জন্য ৪. ভাষাকে সরস করা জন্য ৫. বিশেষ ভাবে স্বতন্ত্র বা নিজস্বতা দেখানোর জন্য এবং দৃষ্টি কাড়ার জন্য ৬. বক্তব্যকে টানটান, সংক্ষিপ্ত এবং চাঁচাছোলা করার জন্য ৭. নানারকম দুঃমোচনে বিশেষত প্রেমের সম্পর্ক ভাঙন বা মারাত্মক শারীরিক অসুস্থতা বা কঠোর কোন শাস্তির কারনে ৮. প্রথাগত পরিবেশ বা সভার গাম্ভীর্য ও অতিরিক্ত মাত্রা ভাঙার জন্য ৯. যে বিষয়গুলো নিয়ে ট্যাবু কাজ করে সে বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় স্ল্যাং প্রয়োগের বাড়তি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় ১০. বক্তা-শ্রোতা বা লেখক-পাঠকের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট করতে ১১. অপমান, হেয় বা তাচ্ছিল্য করার জন্য ১২. ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করতে অথবা খোঁচা বা খোঁটা দিতে ১২. ভাষাকে তাৎক্ষনিক , সময়োপযোগী ও বিষয়মুখী করে তুলতে ১৩. বিরক্তি , ক্ষোভ, অসোন্তষ বা রাগ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্ল্যাং ব্যবহার হয়। ব্লগার মামুন ম. আজিজ মতে, বাংলা ব্লগে ৫ এবং ৭ কারণগুলোর প্রভাব রয়েছে। (মামুন ম. আজিজ, স্ল্যাং ব্যবহারের পোষ্টমোর্টেম, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, মার্চ ২০০৮)

বাংলা ব্লগে নতুন নতুন শব্দ তৈরি হচ্ছে কেন? ব্লগীয় ভাষা সৃষ্টির পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। এক্ষেত্রে ব্লগকে একটি চলমান মিডিয়া হিসেবে ধরে নেওয়া যাক। বিভিন্ন অঞ্চলের ব্লগাররা ব্লগসাইটে চলমান নানা বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখছেন। সেই লেখায় কিছু কিছু আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার হচ্ছে। ফলে একে অপরের মিথস্ক্রিয়ায় নতুন নতুন শব্দ তৈরি হচ্ছে। মজা করার জন্য অনেক ব্লগার প্রচলিত একটি শব্দকে ভিন্নভাবে লেখছেন বা ভেঙ্গে লেখছেন। যেমন ধন্যবাদ বলতে বাংলা ব্লগে ব্যবহার করা হয় ‘ধইন্যাপাতা’। ব্লগে যেহেতু প্রতিনিয়তই নতুন নতুন লেখা আসছে এবং তার প্রতিক্রিয়া মন্তব্য আকারে আসছে সুতরাং ব্লগারদের প্রচুর ‘কনটেন্ট’ তৈরি করতে হয়। পোস্টে মন্তব্য করতে কিংবা মন্তব্যের জবাব দিতে দিতে একঘেয়েমি পেয়ে বসে ব্লগারদের। একঘেয়েমির পুনরাবৃত্তি দূর করতেও নতুন নতুন শব্দ তৈরি হচ্ছে। ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে গিয়ে বাংলা ব্লগে প্রচলিত শব্দের ভিন্ন ব্যবহার হয়েছে। যেমন কেউ ইংরেজি ভাষায় পোস্ট দিলে বলা হয়েছে ‘আংড়েজি পোস্ট’। এছাড়া ব্লগ রাজনীতির কারণেও স্ল্যাং আকারে প্রচুর নতুন শব্দ যুক্ত হয়েছে বাংলা ব্লগে।

প্রশ্ন উঠতে পারে ব্লগে তৈরি হওয়া এইসব শব্দের কি কোন গুরুত্ব আছে? এসব শব্দ কি অভিধানে ঠাই করে নিবে নাকি কেবল ব্লগেই বিচরণ করবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর এরইমধ্যে আসা শুরু করেছে। অনেক ব্লগার এখন তাদের ব্যবহারিক জীবনেও ব্লগে ব্যবহৃত শব্দ ব্যবহার করছেন। ২০১১ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারির অনলাইন সংস্করণে নতুন যোগ হওয়া শব্দের তালিকায় আলোচিত শব্দটি হলো 'ব্লগেবল'। যেসব বিষয় নিয়ে ব্লগ লেখা যাবে সেগুলোকেই বলা হয় ‘ব্লগেবল’। ফলে দেখা যাচ্ছে ব্লগে ব্যবহৃত কিছু কিছু শব্দ অভিধানেও স্থান করে নিচ্ছে। বাংলা ব্লগের ক্ষেত্রে এমনটা অবশ্য এখনও হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বাংলা ব্লগের কিছু কিছু শব্দ অভিধানে ঠাই নিবে এমনটা প্রায় নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। এছাড়া ব্লগে যে ভাষারীতির বিস্তার হচ্ছে তার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলাপের সময় বোধহয় এখনও আসেনি। বাংলা ব্লগিংয়ের ইতিহাস মাত্র কয়েক বছরের । ফলে ভাষারীতি বা ভাষাশৈলী এখনও তৈরি হচ্ছে ব্লগারদের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29509007 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29509007 2011-12-24 06:09:26
ট্রানজিটের নামে দ্বিখন্ডিত তিতাস নদী


বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল ইটিভির করা ‘ট্রানজিট’ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে উঠে এসেছে তিতাস নদীর দ্বিখন্ডিত হওয়ার মর্মান্তিক কাহিনী। ভিডিওটি দেখুন।



প্রতিবেদনের ভাষ্য এখানে তুলে ধরা হলো-

“নিজ চোখে দেখলেও অনেকে হয়তো বিশ্বাস করতে পারবেন না এই চিত্র। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে প্রায় সাড়ে তিনশ টন ওজনবাহী ভারতীয় ট্রেলার চলাচলের সুবিধা করতে একটি নদীর বুক চিড়ে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ পথ। আখাউড়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংযোগস্থলে তিতাস নদীতে বছর খানেক আগে সিমেন্ট আর বালুর বস্তা ফেলে তৈরি করা হয়েছে এটি। কারণ নদীর ওপর বিশাল ব্রিজ থাকলেও এতো ভার বহন করার মতো ক্ষমতা তার নেই। ভারতের ট্রানজিট সুবিধা নির্বিঘ্ন হলেও তিতাসের বুকে বাঁধ দেওয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে এলাকার লাখ লাখ হেক্টর জমিতে ফলস উৎপাদনে। এরইমধ্যে মাছের অভাবে পেশা বদলাচ্ছেন জেলেরা। তিতাসকে আগলে বেঁচে থাকা নৌকার মাঝিসহ অন্যান্য কর্মজীবী মানুষের জীবনে নেমে এসেছে জীবিকার অনিশ্চয়তা। বাঁধ দিয়ে তিতাস নদীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার কারণ জানতে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডে যাওয়া হলে কথা বলার মতো পাওয়া যায়নি কাউকেই। জীবিত একটি নদীকে এভাবে দুইভাগ করে ফেলায় হতবাক, বিস্মিত এখানকার মানুষেরা।”

স্থানীয় একজন জানিয়েছেন, রোড হওয়াতে সেই অঞ্চলের কয়েক হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল । তখন অনেকেই ধান ঘরে তুলতে পারেনি। এছাড়া স্থানীয় কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকেই বাঁধের বিরূপ প্রভাবে কথা জানিয়েছেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণ তার উপন্যাসে গ্রামের দরিদ্র জেলেদের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছিলেন। গ্রামের দরিদ্র মানুষের দুঃখ-দুর্দশা সহসাই শেষ হয় না। কেবল ফিরে ফিরে আসে। এতোবছর পরেও জেলেদের দুর্দশার শেষ হলো না। তাদের জীবকার জায়গাটিকে বাঁধ দিয়ে দুইভাগ করে ফেলা হলো। তাইতো জেলেদের মনে পেশা বদলের শঙ্কা। আর আমাদের মনে? তিতাস মরে গেলে আমাদের মনে কোন শঙ্কা জাগাবে? নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো একের পর এক মেরে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বড় বড় কথা বলা হচ্ছে। তিতাস নদী মরে গেলে আমাদের কি একটুও ভোগাবে না? ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29507648 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29507648 2011-12-22 06:21:46
ব্লগারদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
২. 'ব্লগ রাজনীতি' কোনগুলো?

৩. বাংলা ব্লগের সম্ভাবনা কোন কোন ক্ষেত্রে দেখছেন?

৪. ব্লগের ভাষা নিয়ে আপনার মতামত কী?

৫. ব্লগের সাফল্য কোনগুলো?

৬. বাংলা ব্লগের সীমাবন্ধতা কী কী?


* ব্লগ নিয়ে একটি লেখার কাজে তথ্যগুলো ব্যবহার করবো। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29506687 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29506687 2011-12-20 19:51:43
শায়েস্তা খাঁর আমল বনাম নতুন ইতিহাসে ‘অর্থলিপ্সু ও শোষক’ শায়েস্তা খাঁ
শায়েস্তা খাঁর আমল নিয়ে কিছুটা পড়া ছিল এফ. বি. ব্রাডলী বার্ট রচিত ‘রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল’ (প্রাচ্যের রহস্যনগরী, অনুবাদ- রহীম উদ্দীন সিদ্দিকী) নামের বইটির কল্যানে। ৮ম শ্রেণীর বইয়ে লেখা ইতিহাস পড়ে অবাক হলাম। আমরা যে ইতিহাস জেনে এসেছি এতোদিন এবং ব্রাডলীর বইয়ে যেভাবে শায়েস্তা খাঁ সম্পর্কে জেনেছি তার সাথে কোনভাবেই মেলাতে পারলাম না।

ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা পণ্ডিত এফ. বি. ব্রাডলী বার্ট (F B Bradley Birt) রচিত 'প্রাচ্যের রহস্যনগরী' (Romance of an Eastern Capital) [বাংলায় অনুবাদ করেছেন রহীম উদ্দীন সিদ্দিকী] বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়টি শায়েস্তা খাঁ’কে নিয়ে লেখা রয়েছে। অধ্যায়ের শুরুতেই ব্রাডলী বার্ট লেখেছেন- ঢাকার সাথে শায়েস্তা খাঁর নাম যে-রূপ ঘনিষ্টভাবে জড়িত হয়ে আছে, অন্য কোন শাসনকর্তা, এমন কি, এই নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ইসলাম খাঁর নামও সেরূপ নিবিড়ভাবে জড়িত হয়ে আসে নাই। যে-সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমান্তের প্রদেশটি শাহজাদাদের মল্লভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, পূর্ব বাংলা যে-সময়ে তাঁদের উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ পরিগণিত হয়েছিল এবং যে সময়ে চারদিকে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সময়েই পূর্বাঞ্চলের এই শ্রেষ্ঠ সুবেদার দীর্ঘকাল ধরে নিরুপদ্রুবভাবে এই অঞ্চল শাসন করে গেছেন। (প্রাচ্যের রহস্যনগরী, পৃ. ৮১)

অন্য এক জায়গায় ব্রাডলী লেখেছেন, মগ ও পর্তুগীজদের পৌনঃপুনিক হানা ও অমানুষিক অত্যাচারে পূর্ব বাংলার দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। ইহাদের অরাজকতার অবসান হওয়ায় প্রদেশে শান্তি ফিরে আসে। এই শান্তি বহু ক্লিষ্ট ও নির্জিত পূর্ব বাংলা এবং এর অধিবাসীদের কাছে এক চরম আশীর্বাদরূপে কাজ করেছিল। এই সময় ঢাকা সমৃদ্ধির উচ্চতম শিখরে আরোহন করে। এখান থেকে যে-সব পণ্য বিদেশে রফতানি হত, সেগুলোর সংখ্যা ও রকমারীই এর সমৃদ্ধির সাক্ষ্য বহন করে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই ঢাকা তার উৎপাদিত পণ্য রফতানি করত। (প্রাচ্যের রহস্যনগরী, পৃ. ৮৮)

ইংরেজদের অনধিকার প্রবেশকারী মনে করতেন শায়েস্তা খাঁ। ব্রাডলী লেখেছেন- ইংরেজদের লিখিত ইতিহাসে ‘স্বেচ্ছাসারী’ ও ‘বুদ্ধিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নওয়াব’ চিত্রিত হলেও প্রাজ্ঞতা, বিচক্ষণা ও ন্যায়ানুগতার জন্যে বাংলার শাসন কর্তাদের মধ্যে তিনি বিশিষ্ট হয়ে আছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি ইংরেজদের অনধিকার প্রবেশকারীর দল বলে মনে করতেন। (প্রাচ্যের রহস্যনগরী, পৃ. ১০৫)

শায়েস্তা খাঁর বিদায় পর্ব ছিল গৌরবব্যঞ্জক। বিপুল জনতা মিছিলের মাধ্যমে তাকে বিদায় জানিয়েছিল। একটি শতাব্দীর প্রায় এক-চতুথাংশকাল শাসন করে তিনি গৌরবের সাথে বিদায় নিয়েছিলেন। অথচ শিক্ষার্থীদের জন্য লেখা নতুন ইতিহাসে শায়েস্তা খানকে দেখানো হয়েছে অর্থলিপ্সু ও শোষক সুবেদার হিসেবে, যেমন করে ইংরেজদের লিখিত ইতিহাসে তিনি ‘স্বেচ্ছাসারী’ ও ‘বুদ্ধিভ্রষ্ট বৃদ্ধ নওয়াব’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছেন। নতুন ইতিহাস অনুযায়ী, দ্রব্যমূল্যের দাম কম হলেও মানুষ তার সুফল পায়নি, মানুষকে অত্যাচার করা হয়েছে। অথচ ব্রাডলী বার্টের লেখা ইতিহাস অনুযায়ী শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে বাংলার মানুষ শান্তিতে ছিল।



প্রশ্ন হলো নতুন ইতিহাসের বইয়ে কেন শায়েস্তা খাঁকে নেতিবাচক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? কেনইবা ইংরেজ শাসনের নেতিবাচক দিক নিয়ে কথাবার্তা নেই? ‘শায়েস্তা খানের আমল’ বলে কিছু ছিল না, এমনটা প্রমাণ করতে পারলে কী কী সুবিধা পাওয়া যেতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো কি দিবেন নব্য ইতিহাস রচয়িতারা? প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, ২০০৮ সালের দিকে একজন অর্থ উপদেষ্টা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে না পেরে বলেছিলেন, ‘এটি শায়েস্তা খাঁর আমল নয়’।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29499845 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29499845 2011-12-10 01:50:18
বাংলা ব্লগ ও সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য
ব্লগ ও ব্লগের গুরুত্ব নিয়ে শুরুতেই এতগুলো কথা বলার কারণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্য। ৩ ডিসেম্বর গণভবনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভা শেষে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিতে দিয়ে ব্লগ নিয়ে বেশকিছু মন্তব্য করেছেন সৈয়দ আশরাফ। বাংলাভাষী ব্লগারদের জন্য এটি আনন্দের যে, রাজনীতিবিদরা ব্লগসাইট দেখছেন এবং তা নিয়ে মতামত জানাচ্ছেন। তবে সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য থেকে ব্লগ এবং ব্লগসাইট নিয়ে মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে বলে মনে হয়েছে। মতপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্লগ যে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছে তার যাত্রা সঠিকপথে রাখার স্বার্থেই এই লেখাটি লিখতে হচ্ছে। সৈয়দ আশরাফ তার বক্তব্যে বলেছেন, 'শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আমি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অনেককে নিয়ে ব্লগে অশালীন ও কুৎসিত কমেন্ট করা হয়। যার সঙ্গে বক্তব্যের কোনো সম্পর্ক নেই। দুয়েকটা পত্রিকা নীতিগত ও সম্পাদকীয় নীতি অনুযায়ী অশালীন মন্তব্য ছাপে না। সবাইকে ব্লগ মডারেট করতে হবে।' তিনি আরও বলেন, 'ব্লগ এখন অনেকটা পর্নোগ্রাফিতে পরিণত হয়েছে।' সৈয়দ আশরাফের এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ব্লগ নিয়ে বেশ কিছু ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। সংবাদপত্রগুলোর অনলাইন সংস্করণের নিচে মতামত প্রদানের যে সুযোগ দেওয়া হয় তাকেই ব্লগ ভেবে ভুল করা হচ্ছে। অথচ ব্লগ বিষয়টি সম্পূর্ণই ভিন্ন। পত্রিকার পাঠক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ব্লগকে গুলিয়ে ফেলার কারণেই সৈয়দ আশরাফ এই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু তিনি শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন 'ব্লগ'। ফলে ব্লগ নিয়ে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। তিনি যখন বলেন 'ব্লগ এখন অনেকটা পর্নোগ্রাফিতে পরিণত হয়েছে', তখন ব্লগার হিসেবে আমরা আহত বোধ করি। এখানে স্পষ্ট ভাষাতেই জানাতে চাই, বাংলা ভাষায় ব্লগিং কোনো পত্রিকা শুরু করেনি কিংবা কোনো অনলাইন নিউজসাইট করেনি। এটি সত্য যে, ব্লগের জনপ্রিয়তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি পত্রিকা ও একটি অনলাইন নিউজসাইট ব্লগ শুরু করেছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগসাইট রয়েছে। আশা করব, সৈয়দ আশরাফ এই ব্লগসাইটগুলো দেখবেন এবং ব্লগ নিয়ে পুনরায় ভাববেন। বাংলা ভাষায় লেখার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্লগ হয়েছে। কোনো ব্লগে কড়াকড়ি মডারেশন নীতি, আবার কোনো ব্লগে সহজ মডারেশন নীতি রয়েছে। মূলত বাংলা ব্লগের মডারেশন নীতি ব্লগারদের দীর্ঘদিনের বোঝাপড়ার ফসল। ব্লগারদের নিজেদের মধ্যেও সমালোচনার চর্চা রয়েছে। ফলে কোনো ব্লগার অগ্রহণযোগ্য বা অশালীন কোনো পোস্ট দিলে ব্লগার কমিউনিটি থেকেই তার সমালোচনা করা হয়।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, বাংলা ব্লগের বিকাশপর্বের সবকিছু ইতিবাচক নয়। অনেক নেতিবাচক বিষয়ও রয়েছে। নানা বিষয় নিয়ে ব্লগে কাদা ছোড়াছুড়ি হয়। মাঝে মধ্যে অগ্রহণযোগ্য ব্লগ পোস্টও আসে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে কুৎসা রটনাও চলে। কট্টর পার্টিজান কিছু ব্লগারও রয়েছে, যারা দলের বিরুদ্ধে কিছু বললে গালাগাল করতেও দ্বিধা করে না। ব্লগার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় লেখার মান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে গেছে ব্লগসাইটগুলোর জন্য। এই নেতিবাচক বিষয়গুলোর দায় সামগ্রিকভাবে ব্লগার কমিউনিটির ওপরই বর্তায়। আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে নিজেদের দোষত্রুটিগুলো ঠিক করে নিতে ব্লগাররা কাজ করে যাচ্ছে। সেই সুযোগটুকু ব্লগারদের দেওয়া উচিত বলে মনে করি। ব্লগের সাফল্য অনেক। গত কয়েক বছর দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনায় ব্লগার কমিউনিটি শক্ত অবস্থান নিয়েছে, নিজেদের মতামত জানিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে শুরু থেকেই ব্লগাররা শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অনেক আগে থেকেই এ ব্যাপারে ব্লগে লেখা হচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে ব্লগ থেকেই গণস্বাক্ষর গ্রহণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। ভাস্কর্য ভাঙার প্রতিবাদে ব্লগাররাই প্রথম মানববন্ধন করেছিল। কমিউনিটি হিসেবে নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাজে ব্লগারদের অংশগ্রহণ সবসময়ই ছিল।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখতে চাই। সংবাদপত্রের পাঠক প্রতিক্রিয়া ও ব্লগসাইটের মন্তব্যগুলোর দিকে রাজনীতিকরা লক্ষ্য রাখছেন জেনে ভালো লাগছে। তবে ব্লগ নিয়ে যাতে ভুল বোঝাবুঝি না হয় তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আশা করব, আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মতপ্রকাশের এই মাধ্যমটিকে শক্তিশালী রাখার ব্যবস্থা করবেন। ব্লগে লেখালেখি ও মন্তব্য করা নিয়ে সরকারি পর্যায় থেকে নানাবিধ নিয়মকানুন তৈরি করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তার চেয়ে বিষয়টি বিশাল ব্লগ কমিউনিটির ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে একটি তথ্য জানাতে চাই, বর্তমানে বিভিন্ন কমিউনিটি ব্লগে যে নিজস্ব নিয়মকানুনগুলো রয়েছে তা ব্লগারদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও বোঝাপড়ার বিষয়। এই ব্লগার কমিউনিটিই আন্দোলন করে ঠিক করে নিয়েছিল যে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোনো পোস্ট ও মন্তব্য প্রকাশ করা যাবে না। এখন প্রায় সব ক'টি ব্লগে নিয়ম হিসেবে এটি স্থান পেয়েছে। সুতরাং ব্লগে লেখার নিয়মকানুন কেমন হবে তা ব্লগারদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। সৈয়দ আশরাফের বলেছেন, 'নিজেদের ক্রেডিবিলিটি ধরে রাখতে ব্লগগুলো মনিটর করুন।' আমরা ব্লগাররা এমন কথাই দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, কথাগুলো আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি। এত এত ব্লগার বাংলা ভাষায় রাজনীতি, অর্থনীতিসহ নানা বিষয়ে লেখে যাচ্ছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করেন আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এই মতামতগুলো বিবেচনায় নেবে। সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যের মতোই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বলতে চাই, নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাই-বাছাই করতে ব্লগ ও ব্লগের মতো বিকল্প মিডিয়াগুলোর প্রতি নজর রাখুন। কারণ, এখানেই মানুষ সবচেয়ে সহজে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারছে। বিনয়ের সঙ্গে জানাতে চাই অধিকাংশ ব্লগারই লেখে নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে, এখানে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি নেই, ব্লগ লীগ বা ব্লগ দলও নেই। রাজনৈতিক যে কোনো পরিস্থিতিতে ব্লগাররা যেমন করে গত কয়েক বছরে অবস্থান নিয়েছে, তেমন করে সামনেও অবস্থান নেবে। মতপ্রকাশের এই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রটিকে ব্লগাররা সফল করে তুলতে চায়। সেই সুযোগটুকু তাদের দেওয়া উচিত।

(লেখাটি ৬ ডিসেম্বর দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। কিছুটা সংশোধিত অবস্থায় ব্লগে প্রকাশ করা হলো।)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29498480 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29498480 2011-12-08 00:20:31
সামাজিক সাংবাদিকতা
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক টার্ম নতুন করে যুক্ত হয়েছে। কেউ কেউ এই নতুন ধারার মিডিয়াকে 'নিউ মিডিয়া' নামে অভিহিত করতে চাচ্ছেন। নতুন টার্মগুলোর মধ্যে রয়েছে সিটিজেন জার্নালিজম, কমিউনিটি জার্নালিজম ও সোস্যাল জার্নালিজম। সিটিজেন জার্নালিজম অর্থাৎ নাগরিক সাংবাদিকতার সঙ্গে অনেকেই কমিউনিটি সাংবাদিকতাকে গুলিয়ে ফেলেন। নাগরিক সাংবাদিকতায় সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণবিহীন একজন নাগরিক সংবাদকর্মী হয়ে সংবাদ পরিবেশন করেন। অন্যদিকে কমিউনিটি সাংবাদিকতায় একটি নির্দিষ্ট কমিউনিটিকে ভোক্তা করে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। প্রশিক্ষিত সাংবাদিকরাই সেই সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন। নাগরিক সাংবাদিকতায় ব্যবহারকারী উদ্ভূত বিষয়বস্তুর (ইউজার জেনারেটেড কনটেন্ট) প্রাধান্য থাকবে। ব্লগের মতো সিটিজেন মিডিয়া উদ্ভবের মাধ্যমেই নাগরিক সাংবাদিকতার বিষয়টি সামনে চলে আসে। প্রযুক্তির উন্নয়ন এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এখন ব্যবহারকারী ঘটনার ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করতে পারেন হাতে থাকা মোবাইল ফোনের ক্যামেরা, আর সংবাদ পরিবেশনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন ইন্টারনেট লাইনযুক্ত কম্পিউটার। ফলে সিটিজেন মিডিয়াগুলোর গুরুত্ব ক্রমশ বেড়েছে। তাহলে এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক যে, নাগরিক সাংবাদিকতার বাইরে সামাজিক সাংবাদিকতা কী?
সামাজিক সাংবাদিকতার উদ্ভবের সঙ্গে জড়িত সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো। শুরুর দিকে মনে করা হতো, অনলাইনে মানুষের যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য এটি কাজ করবে। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ধারণা পাল্টে গেল। এখন ফেসবুকের মতো সাইটগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যমই নয়, বরং হয়ে উঠল মতপ্রকাশের মাধ্যম। জনতা এ ধরনের সাইটগুলো ব্যবহার করে নানা বিষয়ে নিজেদের মত তৈরি করতে থাকল। গ্রুপ কিংবা পেজ তৈরির মাধ্যমে নিজেদের সংগঠিতও করল। তার ইতিবাচক ফল পাওয়া গেল তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লবে কিংবা পরে মিসর, সিরিয়া, লিবিয়াসহ অন্যান্য দেশের আরব বিপ্লবে। ফলে সামাজিক যোগাযোগ সাইটে সময় দেওয়া মানেই সময় নষ্ট করা- এমন ধারণা থেকে সরে আসার সময় বোধহয় চলে এসেছে।

সামাজিক সাংবাদিকতা হোক, আর নাগরিক সাংবাদিকতাই হোক- এসবের বিরুদ্ধে বড় যে অভিযোগটি রয়েছে তাহলো 'বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব'। অনেক গুজব এখানে সংবাদ হয়ে ওঠে। ফলে কোনটি গুজব আর কোনটি সংবাদ তা নির্ধারণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এর জন্যই সামাজিক মিডিয়াতে কোনো সংবাদ পরিবেশিত হলে তার সূত্র দাবি করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্রেকিং নিউজ সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে প্রথম কেউ প্রকাশ করতে পারে- এমন ধারণা এখনও গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে ব্যবহারকারীদের যথেচ্ছ ব্যবহার দায়ী। সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলো কিছু ব্যবহারকারী এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, তাতে এটি বিশ্বাসযোগ্য সামাজিক মিডিয়া হয়ে উঠতে পারছে না।

এতক্ষণ তো বলা হলো সামাজিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোর অবদানের কথা। এ ক্ষেত্রে ব্লগের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যে ব্লগ এক সময় সিটিজেন মিডিয়া ছিল, তা এখন হয়ে উঠেছে সামাজিক মিডিয়া। ব্লগ মিডিয়ার এই যে উন্নয়ন, তার অবদান গর্বের সঙ্গে নিতে পারে বাংলাদেশের ব্লগাররা। 'ইনডিভিজ্যুয়াল ব্লগিং' ধারণা থেকে 'কমিউনিটি ব্লগিং' কিংবা 'সোস্যাল ব্লগিং' ধারণার যাত্রা শুরু বাংলাদেশ থেকেই। এটিও সত্যি যে, অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় 'সামাজিক মিডিয়া' হিসেবে ব্লগ বাংলাদেশে বেশি জনপ্রিয়। ব্লগাররাও 'সামাজিকভাবে' বেশি শক্তিশালী অবস্থান রাখতে পারছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29493802 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29493802 2011-11-30 23:36:33
ঝরা পালক : জীবনানন্দ দাশ
প্রকাশ : ১৩৩৪ [১৯২৭]
প্রকাশক: শ্রীসুধীরচন্দ্র সরকার, ৯০/২এ হ্যারিসন রোড, কলিকাতা
মূল্য: ১ টাকা
পৃষ্ঠা: ১০+৯৩
উৎসর্গ : ‘ – কল্যাণীয়াসু – ’
কবি রচিত ভূমিকা :
ঝরা পালকের কবিতাগুলি কবিতাপ্রবাসী, বঙ্গবাণী, কল্লোল, কালি-কলম, প্রগতি, বিজলী প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। বাকিগুলি নূতন।
কলিকাতা। ১০ই আশ্বিন ১৩৩৪ শ্রীজীবনানন্দ দাশ


কবিতাসমূহ
১. আমি কবি-সেই কবি ২. নীলিমা ৩. নব নবীনের লাগি ৪. কিশোরের প্রতি ৫. মরীচিকার পিছে ৬. জীবন-মরণ দুয়ারে আমার ৭. বেদিয়া ৮. নাবিক ৯. বনের চাতক- মনের চাতক ১০. সাগর-বলাকা ১১. চলছি উধাও ১২. একদিন খুঁজেছিনু যারে ১৩. আলেয়া ১৪. অস্তচাঁদে ১৫. ছায়া-প্রিয়া ১৬. ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল ১৭. কবি ১৮. সিন্ধু ১৯. দেশবন্ধু ২০. বিবেকানন্দ ২১. হিন্দু-মুসলমান ২২. নিখিল আমার ভাই ২৩. পতিতা ২৪. ডাহুকী ২৫. শ্মশান ২৬. মিশর ২৭. পিরামিড ২৮. মরুবালু ২৯. চাঁদিনীতে ৩০. দক্ষিণা ৩১. সে কামনা নিয়ে ৩২. স্মৃতি ৩৩. স্মৃতি ৩৪. সেদিন এ-ধরণীর ৩৫. ওগো দরদিয়া ৩৬. সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়


২২ অক্টোবর ১৯৫৪, শুক্রবার, রাত ১১-৩৫। রূপসী বাংলার কবির মৃত্যু হয়। এ মৃত্যু কবির চেতনাকে নিভিয়ে দিতে পারে নি। কবিতায় কবি বারবার ফিরে আসেন জলসিড়ি নদীটির তীরে। ৫৭তম মৃত্যুদিবসে কবির প্রতি অনেক শ্রদ্ধাঞ্জলি।

প্রিয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থটি অনলাইনে তোলা হলো ।


ঝরা পালক


০১

আমি কবি– সেই কবি

আমি কবি– সেই কবি,–
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে!
বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে!
দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!
স্বপন-সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক’রে!
জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা–
পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা!
-নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা
সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ’রে!
ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি
শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি!
ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে
তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে!
-ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,–
বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি!
বিজন তারার সাঁঝে
আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!
প’ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!
হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!
কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর
কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!

০২.

নীলিমা

রৌদ্র ঝিল্‌মিল,
উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল,
অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে
নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে!
-উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,
উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি,
আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,
মরীচিকা-ঢাকা!
অগণন যাত্রিকের প্রাণ
খুঁজে মরে অনিবার, পায় নাকো পথের সন্ধান;
চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল-
হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল
তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।
জনতার কোলাহলে একা ব'সে ভাবি
কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি
বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!
স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা
মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!
চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা
জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!
বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত,
ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ,
লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,
এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার
ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে,
-শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে;
ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক,
তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!

০৩.

নব নবীনের লাগি

-নব নবীনের লাগি
প্রদীপ ধরিয়া আঁধারের বুকে আমার রয়েছি জাগি!
ব্যর্থ পঙ্গু খর্ব প্রাণের বিকল শাসন ভেঙে,
নব আকাঙক্ষা আশার স্বপনে হৃদয় মোদের রেঙে,
দেবতার দ্বারে নবীন বিধান-নতুন ভিক্ষা মেগে
দাঁড়ায়েছি মোরা তরুণ প্রাণের অরুণের অনুরাগী!
ঝড়ের বাতাস চাই।
চারি দিক ঘিরে শীতের কুহেলি, শ্মশানপথের ছাই,
ছড়ায়ে রয়েছে পাহাড় প্রমাণ মৃতের অস্থি খুলি,
কে সাজাবে ঘর-দেউলের পর কঙ্কাল তুলি তুলি?
সূর্যচন্দ্র নিভায়ে কে নেবে জরার চোখের ঠুলি!
মরার ধরায় জ্যান্ত কখনও মাগিতে যাবে কি ঠাঁই!
ঘুমায়ে কে আছে ঘরে!
মৃতুশিশু-বুকে কল্যাণী পুরকামিনী কি আজ মরে!
কে আছে বসিয়া হতাশ উদাস অলস অন্যমনা?
দোদুল আকাশে দুলিয়া উঠিছে রাঙা অশনির ফণা,
বাজে বাদলের রঙ্গমল্লী. ঝঞ্ঝার ঝঞ্ঝনা!
ফিরিছে বালক-ঘর পলাতক ঝরা পালকের ঝড়ে!
আমরা অশ্বরোহী!-
যাযাবর যুবা, বন্দিনীদের ব্যথা মোরা বুকে বহি,
মানবের মাঝে যে দেবতা আছে আমরা তাহারে বরি ,
মোদের প্রাণের পূজার দেউলে তাহার প্রতিমা গড়ি,
চুয়া-চন্দন-গন্ধ বিলায়ে আমরা ঝরিয়া পড়ি,
সুবাস ছড়াই উশীরের মতো, ধূপের মতন দহি!
গাহি মানবের জয়!
কোটি কোটি বুকে কোটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়!
সবার প্রাণের অশ্রু-বেদনা মোদের বক্ষে লাগে,
কোটি বুকে কোটি দেউটি জ্বলিছে-কোটি কোটি শিখা জাগে,
প্রদীপ নিভায়ে মানবদেবের দেউল যাহারা ভাঙে,
আমরা তাদের শস্ত্র, শাসন, আসন করিব ক্ষয়!
-জয় মানবের জয়!

০৪.

কিশোরের প্রতি

যৌবনের সুরাপাত্র গরল-মদির
ঢালো নি অধরে তব, ধরা-মোহিনীর
উর্ধ্বফণা মায়া-ভুজঙ্গিনী
আসে নি তোমার কাম্য উরসের পথটুকু চিনি
চুমিয়া চুমিয়া তব হৃদয়ের মধু
বিষবহ্নি ঢালে নিকো বাসনার বধূ
অন্তরের পানপাত্রে তব;
অম্লান আনন্দ তব, আপ্লুত উৎসব,
অশ্রুহীন হাসি,
কামনার পিছে ঘুরে সাজো নি উদাসী।
ধবল কাশের দলে, আশ্বিনের গগনের তলে
তোর তরে রে কিশোর, মৃগতৃষ্ণা কভু নাহি জ্বলে!
নয়নে ফোটে না তব মিথ্যা মরুদ্যান।
অপরূপ রূপ-পরীস্থান
দিগন্তের আগে।
তোমার নির্মেষ চক্ষে কভু নাহি জাগে!
আকাশকুসুবীথি দিয়া
মাল্য তুমি আনো না রচিয়া
ছলাময় গগনের নিচে!
-রূপ-পিপাসায় জ্বলি মৃত্যুর পাথারে
স্পন্দহীন প্রেতপুরদ্বারে
করো নিকো করাঘাত তুমি
সুধার সন্ধানে লক্ষ বিষপাত্র চুমি
সাজো নিকো নীলকন্ঠ ব্যাকুল বাউল!
অধরে নাহিকো তৃষ্ণা, চক্ষে নাহি ভুল,
রক্তে তব অলক্ত যে পরে নাই আজও রানী,
রুধির নিঙাড়ি তব আজও দেবী মাগে নাই রক্তিম চন্দন!
কারাগার নাহি তব, নাহিকো বন্ধন,
দীঘল পতাকা, বর্শা তন্দ্রাহারা প্রহরীর লও নি তুলিয়া,
-সুকুমার কিশোরের হিয়া!
-জীবনসৈকতে তব দুলে যায় লীলায়িত লঘুনৃত্য নদী,
বক্ষে তব নাচে নিকো যৌবনের দুরন্ত জলধি;
শূল-তোলা শম্ভূর মতন
আস্ফালিয়া উঠে নাই মন
মিথ্যা বাধাবিধানের ধ্বংসের উল্লাসে!
তোমার আকাশে
দ্বাদশ সূর্যের বহ্নি ওঠে নিকো জ্বলি
কক্ষচ্যুত, উল্কাসম পড়ে নিকো স্খলি,
কুজ্ঝটিকা আবর্তের মাঝে
অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গের সাজে!
সব বিঘ্ন সকল আগল
ভাঙিয়া জাগো নি তুমি স্পন্দন-পাগল
অনাগত স্বপ্নের সন্ধানে
দুরন্ত দুরাশা তুমি জাগাও নি প্রাণে!
নিঃস্ব দুটি অঞ্চলির আকিঞ্চন মাগি
সাজো নিকো দিকভোলা দিওয়ানা বৈরাগী!
পথে পথে ভিক্ষা মেগে কাম্য কল্পতরু
বাজাও নি শ্মশান-ডমরু!
জোছনাময়ী নিশি তব, জীবনের অমানিশা ঘোর
চক্ষে তব জাগে নি কিশোর!
আঁধারের নির্বিকল্প রূপ,
স্পন্দহীন বেদনার কূপ
রুদ্ধ তব বুকে;
তোমার সম্মূখে
ধরিত্রী জাগিছে ফুল্ল সুন্দরীর বেশে,
নিত্য বেলাশেষে
যেই পুষ্প ঝরে,
যে বিরহ জাগে চরাচরে,
গোধূলির অবসানে শ্লোকম্লান সাঁঝে,
তাহার বেদনা তব বক্ষে নাহি বাজে,
আকাঙ্খার অগ্নি দিয়া জ্বালো নাই চিতা,
ব্যথার সংহিতা
গাহ নাই তুমি!
দরিয়ার তীর ছাড়ি দেখ নাই দাব-মরুভূমি
জ্বলন্ত নিষ্ঠুর!
নগরীর ক্ষুব্ধ বক্ষে জাগে যেই মৃত্যুপ্রেতপুর,
ডাকিনীর রুক্ষ অট্টহাসি
ছন্দ তার মর্মে তব ওঠে না প্রকাশি!
সভ্যতার বীভৎস ভৈরবী
মলিন করে নি তব মানসের ছবি,
ফেনিল করে নি তব নভোনীল, প্রভাতের আলো,
এ উদভ্রান্ত যুবকের বক্ষে তার রশ্মি আজ ঢালো, বন্ধু, ঢালো!


০৫.

মরীচিকার পিছে-

ধূম্র তপ্ত আঁধির কুয়াশা তরবারি দিয়ে চিরে
সুন্দর দূর মরীচিকাতটে ছলনামায়ার তীরে
ছুটে যায় দুটি আঁখি!
-কত দূর হায় বাকি!
উধাও অশ্ব বগ্লাবিহীন অগাধ মরুভূ ঘিরে
পথে পথে তার বাধা জমে যায়-তবু সে আসে না ফিরে!
দূরে-দূরে আরো দূরে-আরো দূরে,
অসীম মরুর পারাবার-পারে আকাশ সীমানা জুড়ে
ভাসিয়াছে মরুতৃষা!
-হিয়া হারায়েছে দিশা!
কে যেন ডাকিছে আকুল অলস উদাস বাঁশির সুরে
কোন্‌ দিগন্তে নির্জন কোন্‌ মৌন মায়াবী-পুরে!
কোন্‌-এক সুনীল দরিয়া সেথায় উত্থলিছে অনিবার!
-কান পেতে একা শুনেছে সে তার অপরূপ ঝঙ্কার,
ছোটে অঞ্জলি পেতে,
তৃষার নেশায় মেতে,
উষর ধূসর মরুর মাঝারে এমন খেয়াল কার!
খুলিয়া দিয়াছে মাতাল ঝর্ণা না জানি কে দিলদার!
কে যেন রেখেছে সবুজ ঘাসের কোমল গালিচা পাতি!
যত খুন যত খারাবীর ঘোরে পরান আছিল মাতি,
নিমেষে গিয়েছে ভেঙে
স্বপন-আবেশে রেঙে
আঁখিদুটি তার জৌলস্‌ রাঙা হ’য়ে গেছে রাতারাতি!
কোন্‌ যেন এক জিন্‌-সর্দার সেজেছে তাহার সাথী।
কোন্‌ যেন পরী চেয়ে আছে দুটি চঞ্চল চোখ তুলে!
পাগলা হাওয়ায় অনিবার তার ওড়না যেতেছে দুলে!
গেঁথে গোলাপের মালা
তাকায়ে রয়েছে বালা,
বিলায়ে দিয়েছে রাঙা নার্গিস্‌ কালো পশমিনা চুলে!
বসেছে বালিকা খর্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কূলে।
ছুটিছে ক্লিষ্ট ক্লান্ত অশ্ব কশাঘাত জর্জর,
চারি দিকে তার বালুর পাথার-মরুর হাওয়ার ঝড়;
নাহি শ্রান্তির লেশ,
সুদুর নিরুদ্দেশ-
অসীম কুহক পাতিয়া রেখেছে তাহার বুকের পর!
পথের তালাসে পাগল সোয়ার হারায়ে ফেলেছে ঘর!
আঁখির পলকে পাহাড়ের পারে কোথা সে ছুটিয়া যায়!
চকিত আকাশ পায় না তাহার নাগাল খুঁজিয়া হায়!
ঝড়ের বাতাস মিছে
ছুটছে তাহার পিছে!
মরুভূর প্রেত চকমিয়া তার চক্ষের পানে চায়-
সুরার তালাসে চুমুক দিল কে গরলের পেয়ালায়!


০৬.

জীবন-মরণ দুয়ারে আমার

সরাইখানার গোলমাল আসে কানে,
ঘরের সার্সি বাজে তাহাদের গানে,
পর্দা যে উড়ে যায়
তাদের হাসির ঝড়ের আঘাতে হায়!
-মদের পাত্র গিয়েছে কবে যে ভেঙে!
আজও মন ওঠে রেঙে
দিলদারদের দরাজ গলায় রবে,
সরায়ের উৎসবে!
কোন্‌ কিশোরীর চুড়ির মতন হায়
পেয়ালা তাদের থেকে থেকে বেজে যায়
বেহুঁশ হাওয়ার বুকে!
সারা জনমের শুষে-নেওয়া খুন নেচে ওঠে মোর মুখে!
পান্ডুর দুটি ঠোঁটে
ডালিম ফুলের রক্তিম আভা চকিতে আবার ফোটে!
মনের ফলকে জ্বলিছে তাদের হাসি ভরা লাল গাল,
ভুলে গেছে তারা এই জীবনের যত কিছু জঞ্জাল!
আখেরের ভয় ভুলে
দিলওয়ার প্রাণ খুলে
জীবন-রবাবে টানিছে ক্ষিপ্ত ছড়ি!
অদূরে আকাশে মধুমালতীর পাপড়ি পড়িছে ঝরি-
নিভিছে দিনের আলো
জীবন মরণ দুয়ারে আমার করে যে বাসিব ভালো
একা একা তাই ভাবিয়া মরিছে মন!
পূর্ণ হয় নি পিপাসী প্রাণের একটি আকিঞ্চন,
নি একটি দল,-
যৌবন শতদলে মোর হায় ফোটে নাই পরিমল!
উৎসব-লোভী অলি
আসে নি হেথায়
কীটের আঘাতে শুকায়ে গিয়েছে কবে কামনার কলি!
সারাটি জীবন বাতায়নখানি খুলে
তাকায়ে দেখেছি নগরী-মরুতে ক্যারাভেন্‌ যায় দুলে
আশা-নিরাশার বালু-পারাবার বেয়ে,
সুদূর মরুদ্যানের পানেতে চেয়ে!
সুখদুঃখের দোদুল ঢেউঢের তালে
নেচেছে তাহারা- মায়াবীর জাদুজালে
মাতিয়া গিয়েছে খেয়ালী মেজাজ খুলি,
মৃগতৃষ্ণার মদের নেশায় ভুলি!
মৃগতৃষ্ণার মদের নেশায় ভুলি!
মস্তানা সেজে ভেঙে গেছ ঘরদোর,
লোহার শিকের আড়ালে জীবন লুটায়ে কেঁদেছে মোর!
কারার ধুলায় লুন্ঠিত হ’য়ে বান্দার মতো হায়
কেঁদেছে বুকের বেদুঈন মোর দুরাশার পিপাসায়!
জীবনপথের তাতার দুস্যুগুলি
হুল্লোড় তুলি উড়ায়ে গিয়েছে ধূলি
মোর গবাক্ষে কবে!
কন্ঠ-বাজের আওয়াজ তাদের বেজেছে স্তব্ধ নভে!
আতুর নিদ্রা চকিতে গিয়েছে ভেঙে,
সারাটি নিশীথ খুন রোশনাই প্রদীপে মনটি রেঙে
একাকী রয়েছি বসি,
নিরালা গগনে কখন নিভেছে শশী
পাই নি যে তাহা টের!
-দূর দিগনে- চ’লে গেছে কোথা খুশরোজী মুসাফের!
কোন্‌ সুদুরের তুরাণী-প্রিয়ার তরে,
বুকের ডাকাত আজিও আমার জিঞ্জিরে কেঁদে মরে!
দীর্ঘ দিবস ব’য়ে গেছে যারা হাসি-অশ্রুর বোঝা
চাঁদের আলোকে ভেঙেছে তাদের “রোজা”
আমার গগনে ঈদরাত কভু দেয় নি হায় দেখা,
পরানে কখনও জাগে নি রোজা’র ঠেকা!
কী যে মিঠা এই সুখের দুখের ফেনিল জীবনখানা!
এই যে নিষেধ, এই যে বিধান-আইনকানুন, এই যে শাসন মানা,
ঘরদোর ভাঙা তুমুল প্রলয়ধ্বনি
নিত্য গগনে এই যে উঠিছে রণি
যুবানবীনের নটনর্তন তালে,
ভাঙনের গান এই যে বাজিছে দেশে দেশে কালে কালে,
এই যে তৃষ্ণা-দৈন্য-দুরাশা-জয়-সংগ্রাম-ভুল
সফেন সুরার ঝাঝের মতন ক’রে দেয় মজ্‌গুল
দিওয়ানা প্রাণের নেশা!
ভগবান, ভগবান, তুমি যুগ যুগ থেকে ধ’রেছ শুড়ির পেশা!
-লাখো জীবনের শূণ্য পেয়ালা ভরি দিয়া বারবার
জীবন-পান্থশালার দেয়ালে তুলিতেছে ঝঙ্কার-
মাতালের চিৎকার
অনাদি কালের থেকে;
মরণশিয়ারে মাথা পেতে তার দস্তুর যাই দেখে!
হেরিলাম দূরে বালুকার পরে রূপার তাবিজ প্রায়
জীবনের নদী কলরোলে ব’য়ে যায়!
কোটি শুঁড় দিয়ে দুখের মরুভ নিতেছে তাহারে শুষে,
ছলা-মরীচিকা জ্বলিতেছে তার প্রাণের খেয়াল-খুশে!
মরণ-সাহারা আসি
নিতে চায় তারে গ্রাসি!-
তবু সে হয় না হারা
ব্যথার রুধিরধারা
জীবনমদের পাত্র জুড়িয়া তার
যুগ যুগ ধরি অপরূপ সুরা গড়িছে মশালাদার!

০৭.

বেদিয়া

চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি!
পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি?
উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে,
গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে;
নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী,
ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি!
কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে,
ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে!
যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে,
কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে
তারই প্রতীক্ষা মেগে ব’সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু!
দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু
ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে
কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে
ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি!
বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি
লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস!
ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস
নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে
বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে!
তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে,
তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে।
ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল’য়ে কলরব ক’রে ছুটে
নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে।
তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা,
তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা!
চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে
ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে!
যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল,
চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল,
-তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি,
তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি,
তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা,
তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা!
কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে!
মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে
আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে,
মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!

০৮.

নাবিক

কবে তব হৃদয়ের নদী
বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!
সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে
দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে
বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!
পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!
কারাগার-মর্মরের তলে
নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে
ভ’রে যায় বসুধার আহত আকাশ!
অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!
-সহস্রের অঙুলিতর্জন
নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন
বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;
তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-
তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,
অবগুণ্ঠিতার
হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ
পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস
তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা
চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা
বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,
তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট
তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!
নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!
প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!
ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-
অগাধের সাধ
তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ!
মণিময় তোরণের তীরে
মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে
নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে
হে দুরন্ত দুর্নিবার-প্রাণ তব কাঁদে!
ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন,
সমুদ্রের যৌবন-গর্জন
তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর শের!
টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের
হে জলধি পাখি!
পে তব নাচিতেছে ল্যহারা দামিনী-বৈশাখী!
ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রতœচূড় ময়ূখের টিপ,
কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ
করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে!
বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে
সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে!
কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে-
স্তম্ভিত নয়নে
নীল বাতায়নে
তাকায়েছ তুমি!
অতি দূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের
আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি
সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী!
সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি
আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া
হে জল-বেদিয়া!
অল্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন
সিন্ধু বেদুঈন!
নাহি গৃহ, নাহি পান্থশালা-
লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা
তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্যপাতালে-
বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে!
প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর!
সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছুডাকা স্বর
ভুলেছ নোঙর!
কোন্ দূর কুহকের কূল
লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল
কে বা তাহা জানে!
অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে!

০৯.

বনের চাতক–মনের চাতক

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়-
মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়!
ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে-
সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে
বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়!
পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে!
কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে!
বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে
বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে,
ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে!
ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে
নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে,
“দে জল!” ব’লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল
খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ !
মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে!
মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি
কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি?
ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে,
আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে!
আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি।
বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে,
কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে!
সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে!
চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে
লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!

১০.

সাগর - বলাকা

ওরে কিশোর, বেঘোর ঘুমের বেহুঁশ হাওয়া ঠেলে
পাতলা পাখা দিলি রে তোর দূর-দুরাশায় মেলে!
ফেনার বৌয়ের নোন্‌তা মৌয়ের মদের গেলাস লুটে,
ভোর-সাগরের শরাবখানায়–মুসল্লাতে জুটে
হিমের ঘুণে বেড়াস খুনের আগুনদানা জ্বেলে!
ওরে কিশোর, অস্তরাগের মেঘের চুমায় রেঙে
নীল নহরের স্বপন দেখে চৈতি চাঁদে জেগে
ছুটছ তুমি চ্ছল চ্ছল জলের কোলাহলের সাথে কই!
উছলে ওঠে বুকে তোমার আল্‌তো ফেনা-সই
ঢেউয়ের ছিটায় মিঠা আঙুল যাচ্ছে ঠোঁটে লেগে!
রে মুসাফের, পাতাল-প্রেতপুরের মরীচিকা
সাগরজলের তলে বুঝি জ্বালিয়ে দেছে শিখা!
তাই কি গেলে ভেঙে হেথায় বালিয়াড়ির বাড়ি!
দিচ্ছ যাযাবরের মতো সাগর-মরু-পাড়ি-
ডাইনে তোমার ডাইনীমায়া, পিছের আকাশ ফিকা!
বাসা তোমার সাতসাগরের ঘূর্ণী হাওয়ার বুকে!
ফুটছে ভাষা কেউটে ঢেউয়ের ফেনার ফণা ঠুকে!
প্রায়ণ তোমার প্রবালদ্বীপে, পলার মালা গলে
বরুণরানি ফিরছে যেথা, মুক্তপ্রদীপ জ্বলে
যেথায় মৌন মীনকুমারীর শঙ্খ ওঠে ফুঁকে।
যেই খানে মূক মায়াবিনীর কাঁকন শুধু বাজে
সাঁজ সকালে, ঢেউয়ের তালে, মাঝসাগরের মাঝে!
যায় না জাহাজ যেথায়- নাবিক, পায় না নাগাল যার,
লুঘ উদাস পাখায় ভেসে আঁখির তলে তার
ঘুরছে অবুজ সে কোন সবুজ স্বপন-খোজার কাজে!
ওরে কিশোর, দূর-সোহাগী ঘর- বিরাগী সুখ!
টুকটুকে কোন্‌ মেঘের পারে ফুটেফুটে কার মুখ
ডাকছে তোদের ডাগর কাঁচা চোখের কাছে তার!
-শাদা শকুনপাখায় যে তাই তুলছে হাহাকার
ফাঁপা ঢেউয়ের চাপা কাঁদন-ফাঁপর ফাটা বুক!

১১.

চলছি উধাও

চলছি উধাও, বল্গাহারা- ঝড়ের বেগে ছুটে
শিকল কে সে বাঁধছে পায়ে!
কোন্‌ সে ডাকাত ধরছে চেপে টুটি!
-আঁধার আলোর সাগরশেষে
প্রেতের মতো আসছে ভেসে!
আমার দেহের ছায়ার মতো, জড়িয়ে আছে মনের সনে,
যেদিন আমি জেগেছিলাম, সেও জেগেছে আমার মনে!
আমার মনের অন্ধকারে
ত্রিশূলমূলে, দেউলদ্বারে
কাটিয়েছে সে দুরন্ত কাল ব্যর্থ পূজার পুষ্প ঢেলে!
স্বপন তাহার সফল হবে আমায় পেলে, আমায় পেলে!
রাত্রিদিবার জোয়ার স্রোতে
নোঙরছেঁড়া হৃদয় হ’তে
জেগেছে সে হালের নাবিক
চোখের ধাধায় ঝড়ের ঝাঁঝে
মনের মাঝে মানের মাঝে
আমার চুমোর অন্বেষণে
প্রিয়ার মতো আমার মনে
অঙ্কহারা কাল ঘুরেছে কাতর দুটি নয়ন তুলে,
চোখের পাতা ভিজিয়ে তাহার আমার অশ্রুপাথার-কূলে!
ভিজে মাঠের অন্ধকারে কেঁদেছে মোর সাথে
হাতটি রেখে হাতে!
দেখিনি তার মুখখানি তো,
পাইনি তারে টের,
জানি নি হায় আমার বুকে আশেক-অসীমের
জেগে আছে জনমভোরের সূতিকাগার থেকে!
কত নতুন শরাবশালায় নাবনু একে একে!
সরাইখানার দিলপিয়ালায় মাতি
কাটিয়ে দিলাম কত খুশির রাতি!
জীবন-বীণার তারে তারে আগুন-ছড়ি টানি
গুঞ্জরিয়া এল-গেল কত গানের রানি,
নাশপাতি-গাল গালে রাখি কানে কানে করলে কানাকানি
শরাব-নেশায় রাঙিয়ে দিল আঁখি!
-ফুলের ফাগে বেহুঁশ হোলি নাকি!
হঠাৎ কখন স্বপন-ফানুস কোথায় গেল উড়ে!
-জীবন মরু- মরীচিকার পিছে ঘুরে ঘুরে
ঘায়েল হয়ে ফিরল আমার বুকের কেরাভেন-
আকাশ-চরা শ্যেন!
মরুঝড়ের হাহাকারে মৃগতৃষার লাগি
প্রাণ যে তাহার রইল তবু জাগি
ইবলিশেরই সঙ্গে তাহার লড়াই-হল শুরু!
দরাজ বুকে দিল্‌ যে উড়–উড়-!
ধূসর ধু ধু দিগন্তরে হারিয়ে যাওয়া নার্গিসেই শোভা
থরে থরে উঠল ফুটে রঙিন-মনোলোভা!
অলীক আশার, দূর-দুরশার দুয়ার ভাঙার তরে
যৌবন মোর উঠল নেচে রক্তমুঠি, ঝড়ের ঝুঁটির পরে!
পিছে ফেলে টিকে থাকার ফাটকে কারাগারে
ভেঙে শিকল ধ্বসিয়ে ফাঁড়ির দ্বার
চলল সে যে ছুটে!
শৃঙ্খল কে বাধল তাহার পায়ে-
চুলের ঝুটি ধরল কে তার মুঠে!
বর্শা আমার উঠল ক্ষেপে খুনে,
হুমকি আমার উঠল বুকে রুখে!
দুশমন কে পথের সুমুখে
-কোথায় কে বা!
এ কোন মায়া
মোহ এমন কার!
বুকে আমার বাঘের মতো গর্জাল হুঙ্কার!
মনের মাঝের পিছুডাকা উঠল বুঝি হেঁকে-
সে কোন সুদূরে তারার আলোরে থেকে
মাথার পরের খা খা মেঘের পাথারপুরী ছেড়ে
নেমে এল রাত্রিদিবার যাত্রাপথে কে রে!
কী তৃষা তার!
কী নিবেদন!
মাগছে কিসের ভিখ্‌!
উদ্যত পথিক
হঠাৎ কেন যাচ্ছে থেমে-
আজকে হঠাৎ থামতে কেন হয়!
-এই বিজয়ী কার কাছে আজ মাগছে পরাজয়!
পথ- আলেয়ার খেয়ায় ধোঁয়ায় ধ্রুবতারার মতন কাহার আঁখি
আজকে নিল ডাকি
হালভাঙা এই ভুতের জাহাজটারে!
মড়ার খুলি-পাহাড়প্রমাণ হাড়ে
বুকে তাহার জ’মে গেছে কত শ্মশান-বোঝা!
আক্রোশে হা ছুটছিল সে একরোখা, এক সোজা
চুম্বকেরই ধ্বংসগিরির পানে,
নোঙরহারা মাস্তুলেরই টানে!
প্রেতের দলে ঘুরেছিল প্রেমের আসন পাতি,
জানে কি সে বুকের মাঝে আছে তাহার সাথী!
জানে কি সে ভোরের আকাশ, লক্ষ তারার আলো
তাহার মনের দূয়ারপথেই নিরিখ হারালো!
জানি নি সে তোহার ঠোঁটের একটি চুমোর তরে
কোন্‌ দিওয়ানার সারেং কাঁদে
নয়নে নীর ঝরে!
কপোত-ব্যথা ফাটে রে কার অপার গগন ভেদি!
তাহার বুকের সীমার মাঝেই কাঁদছে কয়েদি
কোন্‌ সে অসীম আসি!
লক্ষ সাকীর প্রিয় তাহার বুকের পাশাপাশি
প্রেমের খবর পুছে
কবের থেকে কাঁদতে আছে-
‘পেয়ালা দে রে মুঝে!’

১২.

একদিন খুঁজেছিনু যারে

একদিন খুঁজেছিনু যারে
বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আঁধারে,
মালতীলতার বনে, কদমের তলে,
নিঝুম ঘুমের ঘাটে-কেয়াফুল, শেফালীর দলে!
-যাহারে খুজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে
হেমন্তের হিম ঘাসে যাহারে খুজিয়াছিনু ঝরঝর
কামিনীর ব্যথার শিয়রে
যার লাগি ছুটে গেছি নির্দয় মসুদ চীনা তাতারের দলে,
আর্ত কোলাহলে
তুলিয়াছি দিকে দিকে বাধা বিঘ্ন ভয়-
আজ মনে হয়
পৃথিবীর সাঁজদীপে তার হাতে কোনোদিন জ্বলে নাই শিখা@
-শুধু শেষ নিশীথের ছায়া-কুহেলিকা
শুধু মেরু-আকাশের নীহারিকা, তারা
দিয়ে যায় যেন সেই পলাতকা চকিতার সাড়া!
মাঠে ঘাটে কিশোরীর কাঁকনের রাগিণীতে তার সুর
শোনে নাই কেউ
গাগরীর কোলে তার উত্থলিয়া ওঠে নাই আমাদের
গাঙিনীর ঢেউ!
নামে নাই সাবধানী পাড়াগাঁর বাঁকা পথের চুপে চুপে
ঘোমটার ঘুমটুকু চুমি!
মনে হয় শুধু আমি, আর শুধু তুমি
আর ঐ আকাশের পউষ-নীরবতা
রাত্রির নির্জনযাত্রী তারকার কানে কানে কত কাল
কহিয়াছি আধো আধো কথা!
আজ বুঝি ভুলে গেছে প্রিয়া!
পাতাঝরা আঁধারের মুসাফের-হিয়া
একদিন ছিল তব গোধূলির সহচর, ভুলে গেছ তুমি!
এ মাটির ছলনার সুরাপাত্র অনিবার চুমি
আজ মোর বুকে বাজে শুধু খেদ, শুধু অবসাদ!
মাহুয়ার, ধুতুরার স্বাদ
জীবনের পেয়ালায় ফোঁটা ফোঁটা ধরি
দুরন্ত শোণিতে মোর বারবার নিয়েছি যে ভরি!
মসজেদ-সরাই-শরাব
ফুরায় না তৃষা মোর, জুড়ায় না কলেজার তাপ!
দিকে দিকে ভাদরের ভিজা মাঠ-আলেয়ার শিখা!
পদে পদে নাচে ফণা,
পথে পথে কালো যবণিকা!
কাতর ক্রন্দন,-
কামনার কবর-বন্ধন!
কাফনের অভিযান, অঙ্গার সমাধি!
মৃত্যুর সুমেরু সিন্ধু অন্ধকারে বারবার উঠিতেছে কাঁদি!
মর্‌মর্‌ কেঁদে ওঠে ঝরাপাতাভরা ভোররাতের পবন-
আধো আঁধারের দেশে
বারবার আসে ভেসে
কার সুর!-
কোন্‌ সুদুরের তরে হৃদয়ের প্রেতপুরে ডাকিনীর মতো
মোর কেঁদে মরে মন!

(বাকি কবিতাগুলো কমেন্ট অংশে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29470846 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29470846 2011-10-22 22:49:55
ক্যান্সারে আক্রান্ত জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ
চিকিৎসার উদ্দেশ্যে আগামীকাল বুধবার ভোরে হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মোমোরিয়াল সোলেন ক্যাটারিন হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদের চিকিৎসা হবে।

জানা গেছে, হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার এখনও প্রাথমিক অবস্থায় আছে। হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্টজনেরা তার রোগমুক্তির জন্য দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29447581 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29447581 2011-09-13 21:49:41
ব্লগের সমস্যা


তাছাড়া প্রথম পাতায় দেখাচ্ছিল আগস্ট ও জুলাই মাসের পোস্ট। স্টিকি পোস্টের নিচের পোস্টটি আগস্ট মাসের, ঠিক তার পরের পোস্টটিই জুলাই মাসের।


এখন দেখলাম এটি ঠিক হয়েছে। ব্লগের আপডেট কাজ আজকে চলেছে বলে শুনেছি। 'বাগ'গুলো ভালো করে চেক করার জন্য অনুরোধ জানাই। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29444538 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29444538 2011-09-08 02:08:26
ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন
চারপাশের মানুষগুলোও হয়ে উঠছে অপরিচিত। একসময় যাদের সাথে নিয়মিত কথা হতো, আড্ডায় ডাকলে সব ফেলে ছুটে যাওয়া হতো, এখন তাদের সাথে কথা বলতে গেলেই কেন জানি কথা খুঁজে পাই না। কেবই হুমম আর হুমম। দেখা হওয়া নিয়ে তো সংকোচের ভেতর বসবাস। এ সংকোচ ক্রমশ আষ্টেপৃষ্টে ধরে রাখে।

কোথায় যেন কোন অজান্তে কেঁটে গেছে সুতা। মাঝেমধ্যেই ভাবি, ভাবি আবার সবকিছু শুর করি নতুন করে। তবে করতে গিয়ে রোজনামচার দাড়ি, কমা, সেমিকোলন সবকিছুতেই ভুল করে ফেলি। এতো ভুল যে করে তাকে তো ভুলে ভরা বোহেমিয়ান জীবন বয়ে চলতে হয়, কড়া নেড়ে যেতে হয় ভুল দরজায়। এখন কারণে অকারণে মাঝেমধ্যেই মনের ভিতরে ঘুরপাক খায় লাইনগুলো-

সব পাখি ঘরে আসে- সব নদী-
ফুরায় এ- জীবনের সব লেন দেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার ......

মুখোমুখি বসার কালে কেবলই উপলব্ধি করি নিস্তব্ধ একাকিত্বকে! একাকিত্ব, কখনো তা অসম্ভব উপভোগের, কখনো আবার হাহাকার জাগানিয়া বিচ্ছিন্নতার রক্তমাংস। জীবনের লেনদেন বুঝি এভাবেই ক্ষয়ে যেতে থাকে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29437976 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29437976 2011-08-24 20:41:06
বিকল্প মিডিয়ার উত্থান
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কেবল মূল মিডিয়ার ওপর নির্ভর না করে নিজেদের খবর নিজেরাই জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১৫ জুলাই জনপ্রিয় সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুকে একটি কমিউনিটি পেজ খুলেছে শিক্ষার্থীরা। ‌‌'ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটে যাওয়া প্রকৃত ঘটনা' [www.facebook.com/vnsc.update] নামের কমিউনিটি পেজটি খোলার উদ্দেশ্য হিসেবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছে- 'মিডিয়া বিভ্রান্তি দূর করা আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমরা চাই সবাই সত্য জানুক।' তারা আরও জানাচ্ছে, 'ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখায় শিক্ষক নামধারী পশু পরিমল জয়ধর কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়নের পর তার বিচার এবং পরিমলকে সমর্থনকারী অধ্যক্ষ হোসনে আরার পদত্যাগ দাবি করে প্রতিষ্ঠানটির অস্থির অবস্থার কথা সবার জানা। কিন্তু মিডিয়ায় এ সংক্রান্ত কিছু ভুল ও অসত্য সংবাদ পরিবেশিত হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত। সবার এই বিভ্রান্তি দূর করতেই আমাদের এই কমিউনিটি পেজ। পেজটি ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের দ্বারা পরিচালিত। জুনের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত কী ঘটছে, জানতে চোখ রাখুন আমাদের পেজের নোট, ফটো অ্যালবাম ও ওয়ালে।' নিউ মিডিয়ার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে ওই কমিউনিটি পেজটির দিকে লক্ষ্য রাখছিলাম। দেখলাম মাত্র একদিনের মধ্যেই কমিউনিটি পেজটি ৫ হাজারের বেশি লোক পেয়ে গেছে, যারা এটি পছন্দ করেছেন। তার মানে ৫ হাজার সক্রিয় ফেসবুক ব্যবহারকারী নিয়মিত এই কমিউনিটি পেজটি অনুসরণ করছেন। এই ৫ হাজার ব্যবহারকারীর মাধ্যমে তাদের ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা আরও হাজার হাজার লোক এই পেজের পোস্ট সম্পর্কে জানতে পারছেন। প্রতিনিয়তই অনুসরণকারী লোকের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে এই কমিউনিটি পেজটির মিডিয়া ভ্যালু এখন অনেক বেশি।

বলতে দ্বিধা নেই, ওই কমিউনিটি পেজটির মাধ্যমে বিকল্প মিডিয়া মূলধারার মিডিয়াগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। এর প্রভাব নিঃসন্দেহে সুদূরপ্রসারী। পুরনো প্রশ্নটি আবারও প্রবলভাবে সামনে এসে উপস্থিত। তাহলে কি বিকল্প মিডিয়ার উত্থান মূলধারার মিডিয়ার জনপ্রিয়তাকে হুমকির মুখে ফেলবে? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যবেক্ষক হিসেবে একটা ব্যাপারে বলে রাখতে পারি, জনপ্রিয়তাকে কতটা হুমকির মুখে ফেলবে সেটি সময়ই বলে দেবে, তবে বিকল্প মিডিয়াগুলো যে এখন শক্তিশালী অবস্থান করে নিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই বিকল্প মিডিয়া কেবল সংবাদ প্রচারের জায়গা হয়নি, পাশাপাশি অ্যাকটিভিজমের জায়গাও হয়ে উঠেছে। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চালিয়েছে ব্লগ আর ফেসবুকে। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুটি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ছিল_ এটি প্রায় সব রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেনে নিয়েছেন।
ফেসবুক গত এপ্রিলে সাংবাদিকদের জন্য একটি বিশেষ পেজ খোলে। মূলধারার সংবাদপত্রগুলোর সাংবাদিকরা সংবাদ উৎস হিসেবে ফেসবুকের ব্যবহার করছেন এমন বক্তব্যকে সামনে রেখেই ফেসবুক এই পেজ খোলে। শুরু থেকেই পেজটির দিকে লক্ষ্য রাখছিলাম। কিছুদিন আগেই দেখলাম ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ানের মতো পত্রিকাগুলো সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার খবরকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেই বিবেচনায় ভিকারুননিসার সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে আমাদের মূলধারার মিডিয়াগুলো দুটি বিষয়ে ধারণা নিতে পারে। এক. কোনো স্বার্থের কারণে কিংবা চাপে সঠিক সংবাদ প্রকাশ না করলে মিডিয়ার ভোক্তারা বিকল্প মিডিয়াতে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেই। দুই. গণমানুষের সেন্টিমেন্টকে বুঝতে হলে মূলধারার মিডিয়াগুলোকে বিকল্প মিডিয়াগুলোর দিকে নজর রাখতে হবে।

আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা মূলধারার সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল দেখে অনেক সময়ই সিদ্ধান্ত নেন কিংবা পরিবর্তন করে থাকেন। কিন্তু এসব সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের মতের বাইরেও সাধারণ মানুষের ভিন্ন কোনো মত থাকতে পারে। সেই ভিন্ন মতগুলোই উঠে আসে ব্লগ, ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস আর ইউটিউবের মতো বিকল্প মিডিয়াগুলোতে। তাই মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে বুঝতে হলে সংবাদপত্র পড়া ও টিভি চ্যানেল দেখার পাশাপাশি বিকল্প মিডিয়াগুলোও পড়ে দেখা উচিত দেশের নীতিনির্ধারকদের।


লেখাটি গত ১৭ জুলাই ২০১১ দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় ছাপা হয়েছিল (Click This Link)। লেখাটার ব্যাকআপ রাখার জন্য ব্লগে পোস্ট করে রাখলাম। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29418013 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29418013 2011-07-22 20:30:57
এই সময়(০০১) ১.
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৪৩ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে (১১ জুলাই)। প্রাথমিকভাবে জানা যায় গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলায় চালক অসতর্ক হয়ে পড়েছিলেন। ট্রাকটি ডোবায় পড়ার আগেও চালককে কয়েকদফা সাবধান করেছিলো আরোহী শিক্ষার্থীরা। বেঁচে যাওয়া কয়েকজনের অভিযোগ, দুর্ঘটনার আগমুহূর্তেও চালক মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। গত কয়েক বছরের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় এতো বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
প্রশ্ন হলো-
ক. চালকের অবহেলার জন্য আর কতো প্রাণ যাবে? গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ। গাড়ির চালকরা কেন তা মানছে না সেই বিষয়ে তদন্ত করবে কারা? আর কতোদিন এইরকম সড়ক দুর্ঘটনার খবর শুনতে হবে আমাদের?
খ. এতো শিক্ষার্থীকে কেনইবা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো?

২.
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে। হয়তো এমনটা আগেও ছিল, কিন্তু মিডিয়াতে গত কয়েকদিনে এমন বেশকিছু সংবাদ পড়লাম। এর মধ্যে একটি খবর- শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী নিপীড়ন। শিক্ষাঙ্গনে যদি শিক্ষকদের কাছে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ আশ্রয় না পায় সেখানেই যদি তাদের নিপীড়িত হতে হয় তাহলে শিক্ষাঙ্গনে যাওয়ার দরকার কোথায়, আর শিক্ষক নামের মূল্যই বা কোথায়?
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ঘটনায় বিষয়টি মিডিয়াতে বেশি এসেছে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে। কৃতজ্ঞতা সেই বোনটির প্রতি যে 'আত্মহত্যা' না করে (আগে এমন ঘটনা রয়েছে) সাহসী ভূমিকা নিয়েছে। পরিমলের মতো শিক্ষক নামের কলঙ্ককে বিচারের মুখোমুখি নিয়েছে। নাম না জানা সেই বোনটির জন্যই আরও হাজার হাজার শিক্ষার্থী পরিমলদের মতো দানবদের হাত থেকে বেঁচে যাবে। কৃতজ্ঞতা ভিকারুননিসার শিক্ষার্থীদের প্রতিও। সহপাঠীকে বিদ্রুপ না করে (এমনটাই হয়ে থাকে বেশি আমাদের সমাজের পেক্ষাপটে, এখানে কোন একজন মেয়ে ভিকটিম হলে প্রথমেই আমরা ভাবি- 'এই মেয়েটাই কেন? নিশ্চয়ই এর কোন দোষ আছে।') তারা আন্দোলনের মাধ্যমে পাশে দাড়িয়েছে।

পরিমলের শাস্তি নিশ্চিত করা ও শিক্ষাঙ্গনে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য ১২ জুলাই বিকাল ৪ টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে। আসুন মানববন্ধনে যোগ দিয়ে আমরা আমাদের প্রতিবাদী বোনদের পাশে দাড়াই।

৩.
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মনজুরের ঘটনা নিয়ে একসময় মিডিয়ায় অনেক আলোড়ন হলেও এখন মিডিয়াগুলো এ ব্যাপারে খানিকটা চুপ। মিডিয়ায় ঠিকমতো ফলোআপ না হলে একটা ঘটনা সহজেই আড়াল হয়ে যায়। ফলে প্রভাবশালীরা প্রভাব খাটিয়ে সাঁজা থেকে রেহাই পেয়ে যায়। আশা করছি রুমানা মনজুরের ঘটনায় শাস্তি নিশ্চিত হবে।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29411398 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29411398 2011-07-12 01:27:56
রোজনামচা-শূন্য শূন্য এক স্কুলে থাকতে একবার দিনলিপি লেখার খুব শখ হয়েছিল। তা লেখার জন্য তো একটা ডায়েরি থাকা চাই, কিংবা নিদেনপক্ষে সাদা কাগজের একটা খাতা। একটা ডায়েরি দোকান থেকে কিনে ফেলেছিলাম তখন। কয়েকদিন নিয়মিত লেখার পর আর সেই ইচ্ছা থাকেনি। অনেক অনেক দিন পর মাত্র কিছুদিন আগে সেই পুরনো ডায়েরিটা হঠাৎ করেই আবিস্কৃত হলো আমার সামনে। হাতে নিয়ে পড়লাম পুরনো সেই লেখা। নিজের হাতের লেখাকেই এখন মনে হচ্ছে অপরিচিত। কতো ছেলেমানুষী লেখাই না লেখেছিলাম তখন। এতোসব হতে চাওয়ার সঙ্গে আজকের অবস্থানের অনেক অমিল। অনলাইনে ব্লগিং চালু হওয়ার পর কোন কোন ব্লগার অনলাইনে নিজের দিনলিপি লিখেছেন। খন্ড খন্ডভাবে যাপিত জীবনের কথা সেখানে স্থান পায়। এসব অনলাইন দিনলিপি পড়তে খুবই ভালো লাগে। কিন্তু নিজে লেখার সময় আলসেমি পেয়ে বসে।

২.
গত কয়েকদিন ধরেই একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরছে। বিষয়টা ‌রোমান্টিকতা নিয়ে। আমাদের রোমান্টিকতাগুলো কি আরোপিত? জানি এর পক্ষে বিপক্ষে অনেক মত আসতে পারে। তারপরেও কেন জানি মনে হয় আমাদের রোমান্টিকতা অনেকটাই আরোপিত।

৩.
বৃষ্টিমুখর দিন এখন প্রায়শই আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়। রাতের বৃষ্টি আমার এমনিতেই অনেক প্রিয়। শেষ রাতের বৃষ্টিতে ঘুমানোটাও প্রিয়। কিন্তু কোন কাজে বের হওয়ার সময় যদি বৃষ্টির মুখোমুখি পড়তে হয় তখন খুব বিরক্ত লাগে। এমনটাই হচ্ছে গত কয়েকদিন ধরে।

৪.
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক গত কয়েকদিনের আলোচিত বিষয়। সংসদে বিল পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হলো। সরকার এই পরিস্থিতিতে ঠিক সিদ্ধান্ত নিল কিনা বুঝতে পারছি না। আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই এই বিল পাস। কিন্তু কেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকবে কি থাকবে না এই সিদ্ধান্ত আদালত দিতে গেল বুঝলাম না। ‌‌'ডক্ট্রিন অব পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন' বিবেচনায় নিয়ে আদালত এই বিষয়ে রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারতো। বরংচ বিষয়টা সংসদের কাছে ছেড়ে দেওয়াই উত্তম ছিল। এখন মনে হচ্ছে বিষয়টা নিয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বেশ একটা সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। তেমন সমস্যা হলে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ ব্যাপার হবে।

৫.
গুগল ট্রান্সলেশন নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে বেশ গুতোগুতি করলাম। গুগলের উল্টা পাল্টা বাংলা অনুবাদ নিয়ে ব্লগে বেশ কিছু পোস্ট এসেছে। সেগুলোও পড়েছি। অনুবাদ ঠিক করার জন্য কিছু কাজও করেছি। গুগলের বাংলা অনুবাদের মান উন্নয়নে কাজ করার জন্য ফেসবুকে 'গুগল ট্রান্সলেশন ইন বাংলা' নামে একটি কমিউনিটি পেজ খোলা হয়েছে। আগ্রহীরা সেখানে যোগ দিতে পারেন।

৬.
গত কয়েকদিন ধরেই গুগল প্লাসের কথা শোনা যাচ্ছে। ফেসবুকের সঙ্গে পাল্লা দিতেই গুগল একটা স্যোশাল নেটওয়াকিং সাইট খুললো। এর আগেও গুগল বেশ কয়েকবার এই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। অর্কুট, গুগল ওয়েভ, বাজ এর কথা এক্ষেত্রে বলা যায়। তবে এবারের গুগল প্লাস একটু ব্যতিক্রমি মনে হচ্ছে। বিশেষ করে 'হ্যাংআউট', 'স্পার্কস', 'হাডল' অপশনগুলো ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।

৭.
অনেকদিন ধরে দুইটা গল্পের প্লট সমান্তরালভাবে মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আলসেমি করে কোনটাই লেখা হচ্ছে। একটার নামও ঠিক করা - 'শিকার'। বাকিটার নাম নিয়ে ভাবিনি। আলসেমি ছেড়ে গল্প দুটি লেখে ফেলতে হবে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29405094 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29405094 2011-06-30 20:10:37
মাকে আমার মনে পড়ে না, কিন্তু হঠাৎ অবসরে...
তারচেয়ে ঢের শৈশবের সময়গুলো কিংবা স্কুলে কাটিয়ে আসা সেই সময়টাই আমাকে বেশি তাড়িত করে। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে নিজের বাড়িতে, নিজের গ্রামে, নিজের চিরচেনা পরিমন্ডলে, নিজের পথ ঘাটে হেটে চলা, বাস করার সমময়গুলোই আমাকে বেশি তাড়িত করে, বেশি করে ভাবায়। মানুষ মাত্রই তার স্মৃতিতাড়না থাকবে। নষ্টালজিয়া শব্দটাকেই আমরা প্রায়শই এক্ষেত্রে যুতসই শব্দ হিসাবে ব্যবহার করি। যদিও নষ্টালজিয়া মানে আক্ষরিক অর্থে হোমসিকনেস জাতীয় কিছু। যা বলতে ছিলাম, মানুষ মাত্রই তার নষ্টালজিয়া থাকে, শৈশব নিয়ে ভাবনা থাকে। অনেকেরই সেই সময়টাতে ফিরে যাওয়ার একটা আকুতি থাকে। আমার এ ধরনের আকুতি আছে কিনা ঠিক বুঝতে পারি না। হয়তো ঠিক করে বোঝার চেষ্টা করি না। হয়তো চাই আবার চাই না!

শৈশবের সময়টাতে সকালের ঘুম ভাঙ্গতো মায়ের ডাকে। অলস এই আমি যদিও চাইতাম দেরি করে ঘুম থেকে ঘুম থেকে উঠবো তারপরেও তা হতো না। এখন আমি ইচ্ছামতো ঘুম থেকে উঠি। অনেক বেলা করে প্রায়শই ঘুম থেকে উঠি। তারপরেও শৈশবের সেই ঘুম থেকে উঠাকে খুব বেশি মিস করি।

জীবনের অনেকটা সময় পর্যন্ত প্রায় সব কাজের জন্যই মায়ের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। আম্মুও ঠিক ঠিক কাজগুলো করে দিতেন। হয়তো স্কুলে যাবো...বই গোছানো, কাপড় রেডি করা সবই করে দিতেন আম্মু। খুব শৈশবে প্রায়শই আম্মু ছোট্ট ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করতেন, এই যে তোকে সব কাজ করে দিতে হয়, তুই বড় হয়ে চলবি কি করে? সেই ছোট ছেলেটা হেসে জবাব দিত, আম্মু সবসময়তো আমি তোমার সাথেই থাকব। তাহলে চিন্তা কিসের? আম্মু থেমে গিয়ে বলতো...তাইতো তুই সবসময় আমার সাথেই থাকবি...কিন্তু তারপরেও জীবনে কাজের জন্য তোকে অনেক কিছুই করতে হবে, বাড়ি থেকে দুরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হবে।তখন? ছোট্ট সেই ছেলেটি তখন কিছু না বলে ভাবতো হায় এতো কঠিন কেন বিষয়গুলো!

এসএসসি পরীক্ষার আগ পর্যন্ত যেই ছেলেটি কোনদিন মাকে ছাড়া কোথাও বেড়াতে যায়নি সেই ছেলেটি পরীক্ষার পরে হঠাৎ করেই বড় হয়ে গেল যেন। মাত্র কিছু দিনের ব্যবধানে বাড়ি থেকে দুরে গিয়ে থাকা শুরু হয়। যোগাযোগের সহজ মাধ্যমে মোবাইল ফোন তখনো আমাদের কাছে সহজলভ্য ছিল না। ভরসা ছিল একটা সপ্তাহান্তের ছুটি। সেই ছুটিতে দেখা হবে মায়ের সাথে, কথাও হবে। মনে হলো ছোট্র ছেলেটা হঠাৎ করেই অনেক বড় হয়ে গেল। আদতেই কি খুব বেশি বড় হতে পেরেছিল? তাহলে কেনইবা কলেজ হোস্টেলের রুমটাতে পড়ন্ত বিকালে একা একা বসে কাঁদতো ছেলেটি। খুব বেশি বড় হলে কি কাঁদা যায়!

মনে পড়ে তখন স্কুলে পড়তাম। বন্ধুদের হঠাৎ সিদ্ধান্তে ফুটবল খেলার জন্য গিয়েছিলাম পাশের গ্রামে। আম্মুকে বলে যেতে পারিনি। পরে খেলার কারনে বেশ রাত হয়ে যায়। বাড়িতে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যায়। ওদিকে বাড়িতে আম্মু চিন্তায় অস্থির। সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। অবশেষে বাড়ি ফিরলাম যখন কি যে অবস্থা! অথচ এখন আমি প্রতি রাতেই বেশ রাত করে বাসায় ফিরি। কখনো মধ্যরাতেও বাসায় ফিরি। রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা ঘুমঅলা মানুষগুলো মাঝেমধ্যে মাথা উঠিয়ে তাকায়। খুব অলস ঘুমঅলা মানুষেরা জিজ্ঞেস করে বসে, কে যায়? আমি উত্তর দেই না। সব কথার উত্তর কেন জানি দিতে ইচ্ছে হয় না। বাসায় এই যে দেরি করে ফিরি, কেউতো আমার খোঁজ করে না আম্মু। কতো রাতে ফিরলাম বিবেচ্য বিয়ষ না মোটেও এখন। রাতে ফিরে একা একা সব কিছু করে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। সময় কি খুব বেশি বয়ে গেল তবে?

স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে ৪টা কিংবা সাড়ে ৪টা বেজে যেত। আমি প্রতিদিনই দেখতাম আম্মু তুমি অপেক্ষা করে আছো। একসাথে খাবে বলে বসে থাকতে না খেয়ে। অথচ দুপুরের খাবারটা আর সবাইতো অনেক আগেই খেয়ে ফেলতো। কেন করতে আম্মু এইসব? এখন এই আমি দুপুরবেলা শেষে পড়ন্ত বিকালে ত্রস্ত পায়ে বাসায় ফিরি। কই কেউতো একসাথে খাবে বলে আমার জন্য অপেক্ষা করে না? কেউতো ভাত বেড়ে দিয়ে তরকারীটা এগিয়ে দেয় না! প্রায়শই দুপুরের খাবার খাই পড়ন্ত বিকালে, কিংবা মাঝেমধ্যেই দুপুরে খাই না। আম্মু তোমাকে এইসব জানতে দেই না আমি। এটাকেই বলে বাস্তবতা।

প্রতিদিন রাতেই তুমি জেনে নেও খেয়ে নিয়েছি কিনা। আমার জবাব প্রতিরাতেই হয়, না খাইনি। তুমি বলো খেয়ে নিও। এখন দুরে থাকি বলেই কি আম্মু তুই থেকে তুমি হয়ে গেলাম? নাকি ছেলে কিছুটা বড় হয়েছে বলে তুমি সম্বোধন? কই বাড়িতে গেলেতো ঠিকই তুই বলে সম্বোধন করো। আমি বুঝি হয়তো মুঠোফোনের স্বল্প সময়ের কথায় তুমি সম্বোধনেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করো। তোমাকে বলি নি আম্মু, আমি প্রায় রাতেই মধ্যরাতে রাতের খাবাটা খাই। তখন হয়তো তুমি ঘুমের ঘোরে।

মা দিবস বলে একটা দিন আছে সেই দিনটা নিয়ে খুব বেশি সচেতন নও তুমি। কবে দিনটি আসলো, কবে চলে গেল তা তুমি মোটেও খেয়াল করো না। আমিও তোমাকে কখনো আলাদা করে মনে করিয়ে দেই না, আজ মা দিবস। আমার কাছে প্রতিদিনই মায়ের জন্য দিবস, প্রতিদিনই তোমাকে ভাবার দিবস আম্মু। আর এই বোধটা আছে বলেই পৃথিবীর সব মায়েরা আমার অজান্তে হয়ে উঠেছে আম্মু। অন্য সকল মাকেই নিজের মায়ের মতো করে শ্রদ্ধা করতে পারি।

মা দিবসে তোমাকে আলাদা করে কিছু মনে করিয়ে দেই না আমি। এখনো আমরা ভাবি, আসলে মা দিবসটা ঠিক আমাদের জন্য নয়। আমাদের মায়েরা আমাদের অস্তিত্বের খুব কাছাকাছি। তাদের জন্য প্রতিদিনই অনুভুতি কাজ করে । আলাদা দিনের কোন দরকার নেই। তারপরেও দিবস একটা ডেভলাপ করেছে। মা দিবস বলে একটা দিন প্রচলিত আছে। ইন্টারনেটে মাদার্স ডে সার্চ দিলে অনেক অনেক তথ্য চলে আসে। হয়তো অধিকাংশ রেজাল্টই কর্পোরেট কিছু বিষয়কে বিজ্ঞাপিত করে। তারপরেও তো মায়ের জন্য একটা দিন!

কিছুই করার পরিকল্পনা ছিল না। সব কিছু আগের মতো, আগের দিনগুলোর মতোই হতো। স্বাভাবিক কথাবার্তা। তারপরেও কেন জানি মা দিবসকে ঘিরে একটা লেখা লিখে ফেললাম। আমি জানি এই লেখাটা তুমি পড়বে না আম্মু। কারণ আন্তর্জালের জগতের কোন জানালা দিয়ে কখনোই উকি দিয়েও দেখনি তুমি। কোনদিন জানবেও না এই লেখায় গলে গলে পড়া আমার অনুভুতিগুলোকে। আমি ভাবি এতো কিছুর দরকার নেই, সবকিছু হতে নেই। আমি জানি তোমার অনুভূতিগুলোকে, হৃদয়ের গভীরে ধারণ করি তোমার ভালোবাসা আর মমতাকে।

তারপর উচ্চারন করে ফেলি সেই অনুভূতি নিয়ে- মা দিবসে পৃথিবীর সকল মাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

[আমি যে অলস সেইটা এখন পর্যন্ত অনেকবার বলা হয়ে গেছে। এই আলসেমির কারনেই নতুন করে পোস্ট না লেখে পুরনো একটা লেখা পোস্ট করে দিলাম।]]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29377508 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29377508 2011-05-08 15:37:39
বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা
ফিরে আসি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা' প্রসঙ্গে। সুনীল 'বিজনে নিজের সঙ্গে দেখা'কে গুরুত্ব দিয়েছেন বলেই তার জীবনে নিজের সঙ্গে দেখা করার কিছু সুযোগ তিনি করে নিয়েছেন। লেখক নিজের সঙ্গে দেখার সুযোগ পান লেখালেখির মাধ্যমে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সুযোগটাও এমনই। তবে সুনীলের এবারের লেখালেখি ভিন্ন মাধ্যমে, ভিন্ন পরিচয়ে। বাংলা ব্লগে প্রথমবারের মতো লেখালেখি শুরু করেছেন তিনি। সেই ১৯৫৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'একা এবং কয়েকজন' প্রকাশিত হয়েছিল। লেখালেখি শুরু করেছেন তারও আগে। এরপর পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী সময়। খ্যাতনামা সাহিত্যিক হিসেবে সুনীলের অবস্থান পাকাপোক্ত। সুনীল তার সাহিত্যিক পরিচয় নিয়েই ব্লগার। লক্ষণীয় হলো, সুনীল তার সাহিত্যিক প্রভাব ব্লগে দেখাতে চাননি। আর সব ব্লগারের মতোই তিনি লিখেছেন নিজের কথা, নিজের জীবনযাপনের কথা। ব্লগিংকে তিনি দেখেছেন 'বিজনে নিজের সঙ্গে নিজের দেখার মতো' করে। এরই মধ্যে ব্লগে দিয়েছেন দুটি পোস্ট।

বাংলা ব্লগিংয়ের শুরু থেকে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা সূত্রে বলতে পারি তিন-চার বছর আগেও 'মূলধারার' লেখক-সাহিত্যিকরা ব্লগিংকে এতটা গুরুত্ব দেননি। সেই সময় অনেককে বলতে শুনেছি, ব্লগিং করে কেবল সময় নষ্ট হয়। এও অনেকে বলেছেন, যাদের অন্য কোথাও লেখার স্পেস নেই তারা লিখছেন ব্লগে। তবে এই সময়ের ব্লগের লেখালেখি দেখে মনে হয় সেই ধারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। লেখালেখি আর মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্লগের প্রভাবকে এখন আর অস্বীকার করার জো নেই। ব্লগকে বলা হয়ে থাকে নতুনধারার মিডিয়া। প্রচলিত মিডিয়ার বাইরে ব্লগের আলাদা অবস্থান তৈরি হচ্ছে দিন দিন। সেই অবস্থানকে গুরুত্ব দিতেই হয়তো মূলধারার মিডিয়াগুলো ব্লগের জন্য আলাদা জায়গা রাখছে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় ব্লগ আগে থেকেই ছিল। বাংলাদেশেও মূলধারার পত্রিকার ব্লগ সংস্কৃতি রয়েছে। সম্প্রতি ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকাও শুরু করেছে তাদের নিজস্ব ব্লগ (http://my.anandabazar.com)। সেখানে কেবল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ই নন, আরও ব্লগিং করছেন বাণী বসু, শ্রীজাত, নবনীতা দেব সেন, উল্লাস মলি্লক, রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়।

সাহিত্য জগতের প্রভাবশালী ও খ্যাতনামাদের ব্লগের জগতে পদার্পণ ব্লগিং সংস্কৃতির জন্য নতুন বার্তা দেয় বৈকি। সামনে যে ব্লগ বিকল্প মিডিয়া হিসেবে আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে তা সহজেই বলে দেওয়া যায়। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29368023 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29368023 2011-04-23 20:06:28
ব্লগে ৫ বছর : পেছন ফিরে দেখা এখন আমাকে অতিথি ব্লগারই বলা চলে। মাসে ১ টা করে পোস্ট দেই। খুব বেশি হলে ২ টা। ব্লগে নতুন পোস্ট লেখতে বসলেই রাজ্যেই অলসতা এসে ভর করে আমার উপর। তারপরেও নিয়ম করে প্রতিদিন ব্লগে লগইন হই। বিভিন্ন কমিউনিটি বাংলা ব্লগ খুলে পড়তে বসি।

২.
নতুন অনেক ব্লগার ব্লগে এসেছেন। একটা সময় ছিল যখন আমি অধিকাংশ অ্যাকটিভ ব্লগারকেই চিনতাম। কিন্তু এখন অধিকাংশ অ্যাকটিভ ব্লগারকেই চিনি না। ৫ বছর আগে যাদের সঙ্গে ব্লগিং শুরু করেছিলাম তাদের অনেকেই আর এখন ব্লগে নেই। এই কারণেই হয়তো আমারও তেমন ব্লগে আসা হয় না।

৩.
ব্লগের ৫ বছর পূর্তির দিনেই তা লক্ষ্য করি। একটা পোস্ট তখনই লেখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। এখন ৫ বছর ৫ দিন পূর্তিতে লেখছি।

৪.

ব্লগে চার বছর পূর্তিতে লেখেছিলাম- "একটা বিষয়ে অনার্স করতেও চার বছরের মতো সময় লাগে। তাহলে কি আমাকে গ্র্যাজুয়েশনের একটা সার্টিফিকেট দেওয়া উচিত না? ব্যাচেলর্স অব সায়েন্স ইন ব্লগ (বিএসসি, ব্লগ)।"

৫ বছর পর এখন তো আমার মাস্টার্স অব সায়েন্স ইন ব্লগ ডিগ্রি দাবি করা উচিত। <img src=" style="border:0;" />

৫.
পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সামহ্যোয়ারইন ব্লগকে পেছন ফিরে দেখতে ইচ্ছে হলো। কমিউনিটি বাংলা ব্লগিংয়ের পটপরিবর্তনের সময়ধারা সম্পর্কে বলার চেষ্টা এখানে রয়েছে।
তাহলে পেছন ফিরে দেখা যাক ব্লগকে

ব্লগের শুরু

২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর কমন ফ্রন্ট পেজসহ কমিউনিটি বাংলা ব্লগের চূড়ান্ত পর্যায়ের পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্লগে প্রথম পোস্ট দেন ব্লগার দেবরা।

ব্লগে ফোনেটিক বাংলা

সামহ্যোয়ারইন ব্লগ ফোনেটিক বাংলা লেখার সুবিধা যোগ করা হয় ২০০৬ সালের ২৪ জানুয়ারি।
ইউনিকোড ব্লগ

ব্লগের শুরুতে ইউনিকোড ফন্ট ছিল না। ইউনিকোড ফন্টে ব্লগিং শুরু হয় ২০০৭ সালের ১৪ এপ্রিল। তবে আজকের ব্লগে আমরা যেভাবে সোলাইমানলিপি ফন্ট দেখছি শুরুতে তা ছিল না। ১৮ ডিসেম্বর ২০০৭ থেকে ব্লগে বাই ডিফল্ট ফন্ট হিসেবে সোলাইমানলিপি ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনলাইন ইউজার

ব্লগের প্রথম পাতার বাম পাশের সবার নিচে ‘অনলাইনে আছেন’ নামে একটি বিভাগ আমরা এখন দেখতে পাই। এটি ব্লগে অন্তর্ভুক্ত হয় ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি।
আর্কাইভ

২০০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্লগারের পার্সোনাল পেজে আর্কাইভ বিভাগ যোগ করা হয়।

ব্লগের ইমোটিকন

সামহোয়্যারইনব্লগের ইমোটিকনগুলো ডিজাইন করেছেন ডিজাইনার রাশেদ।

ব্লগের ভার্সন

১৫ ডিসেম্বর যাত্রা শুরুর পর ব্লগের সংস্করণে প্রথম পরিবর্তন আসে ২০০৬ সালের ৩১ মার্চ। পরবর্তীতে ২৫ মার্চ, ২০০৭ সামহ্যোয়ার ইন ব্লগের বেটা ভার্সন ছাড়া হয়। সেই বেটা ভার্সনের পূর্ন ভার্সন আসে ১৪ এপ্রিল ২০০৭। ব্লগের তৃতীয় সংস্করণ আসে ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর। তখন অটো সেভ ড্রাফট এবং অটো ড্রাফট কমেন্ট সুবিধা যোগ করা হয়।

ব্লগের রেটিং

ব্লগে রেটিং দেওয়া শুরু হয় ২০০৬ সালের ১০ মার্চ। প্রথমে অবশ্য রেটিং দেওয়ার পদ্ধতি ভিন্ন ছিল। ১ থেকে ৫ এর মধ্যে নাম্বারিংয়ের ভিত্তিতে শুরুতে রেটিং দেওয়া যেত। সেসময় সর্বোচ্চ ১ রেটিং পাওয়ার রেকর্ড ছিল একটি ইংরেজি পোস্টের। মোট ৩৮ টি ১ রেটিং পেয়েছিল সেই পোস্টটি। পরবর্তীতে এই রেটিং পদ্ধতির পরিবর্তন করে প্লাস/মাইনাস রেটিং পদ্ধতি শুরু করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি ‘ভালো লেগেছে’ রেটিং যুক্ত করা হয়।

ব্লগের সার্চ সুবিধা

ব্লগে ব্লগার সার্চ সুবিধা যোগ করা ২০০৬ সালের ৩০ মে। তবে কনটেন্ট সার্চ সুবিধা যোগ করা হয় আরও পরে। ২০০৭ সালের ৩১ মে কনটেন্ট সার্চ সুবিধা যোগ হয়।

মন্তব্য

শুরুর দিকে মন্তব্য করলে সময় দেখা যেত না। তা ছাড়া রেজিস্ট্রেশন না করে অন্য নাম দিয়েও মন্তব্য করা যেত। মন্তব্যে সময় দেখনোর অপশন যোগ করা হয় ১৭ জুলাই ২০০৬। মন্তব্যে ইমোটিকন দেওয়া যায় ২০০৭ সালের ৩ মে থেকে।

অনেকেই দেখে থাকবেন পুরানো অনেক মন্ত্যব্যে মন্তব্যকারীর নামের জায়গায় রয়েছে অতিথি। এর কারণ ব্লগের মাইগ্রেশন। ২০০৭ সালের ১৪ এপ্রিল ইউনিকোড ব্লগে মাইগ্রেট করা হয় ব্লগকে। তখন কিছু মন্তব্য ডিজ্যাবল হয়ে গিয়েছিল। মন্তব্য চলে যাওয়ার কারণ -ব্লগের প্রথম দিকে যেকোন নাম নিয়ে কমেন্ট করা যেত। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ২১ মে পুরোনো মন্তব্যগুলো ফিরিয়ে আনা হয়। তখন হারিয়ে যাওয়া মন্তব্যগুলোর মন্তব্যদাতা হিসেবে নাম ‘অতিথি’ দেওয়া হয়।

এডিটিং প্যানেল

সামহোয়্যারব্লগে বিভিন্ন সময় এডিটিং প্যানেলের পরিবর্তন এসেছে। তবে প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল ২০০৬ সালের ১৮ আগস্ট।

মডারেটর ও মডারেশন

মডারেটরের কার্মকান্ড নিয়ে এখন বিতর্কের শেষ নেই। ২০০৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর ব্লগ থেকে মডারেটর নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ব্লগারদের পাঁচজন করে ব্লগারের নাম মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তবে পরবর্তীতে ব্লগারদের থেকে মডারেটর নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি কাজ করেনি।

পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর অটোমেটেড মডারেশন পদ্ধতি শুরু হয়। এরফলে বেশ কিছু বিষয়ের পরিবর্তন হয়। ব্লগার লগইন করার পর নিজের পাতায় তাঁর মডারেশন স্ট্যাটাস দেখতে পান। দুটি আলাদা ট্যাব চালু হয়। এগুলো হলো 'সংকলিত' ও 'ক্রমানুসারে' পোস্ট ট্যাব। প্রথম পাতায় লেখার সুযোগ দেওয়ার আগে একজন নতুন রেজিস্ট্রিকৃত ব্লগারকে সর্বোচ্চ ৭(সাত) দিন পর্যবেক্ষনে রাখার পদ্ধতি চালু হয়।
মিথিলা ক্যারেক্টার
ব্লগের প্রথম দিককার ব্লগারদের নিশ্চয়ই মিথিলার কথা মনে আছে। বাংলা ব্লগের অন্যতম আলোচিত চরিত্র মিথিলা। নিজের অসুস্থ্যতার কথা ব্লগে লিখে ব্লগারদের সহানুভুতি পেয়েছিলেন অনেক। একসময় জানা যায়, মিথিলা মারা গেছে। এর ফলে ব্লগে নানা ধরনের শোক পোস্ট আসে। কিন্তু পরবর্তীতে ১৬ জানুয়ারি ২০০৭ ব্লগ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে পোস্ট দিয়ে জানানো হয় মিথিলা একটি ভার্চুয়াল ক্যারেক্টার।

ব্লগপোস্টে ইউটিউব ভিডিও

ব্লগপোস্টে সরাসরি ইউটিউব ভিডিও যোগ করার সুবিধা চালু হয়েছে ২০০৭ সালের ১৭ মে।

নির্বাচিত পোস্ট

ব্লগে পোস্ট নির্বাচিত করা শুরু হয় ২০০৭ সালের ২৫ মে। সেসময় ডানদিকের কলামে ফিচারটি যোগ করা হয়। ব্লগারদের চাওয়া অনুযায়ী আরিফ জেবতিকের লেখা “সাড়ে সাত হাজারের ভেলরি, আড়াই লাখের শফি সামি, আর দুই পয়সার আমরা...” পোস্টটিকে প্রথম নিবার্চিত পোস্ট কলামে নিয়ে আসা হয় । এখন অবশ্য নির্বাচিত পোস্ট ফিচারটি নেই।

ব্লগের আন্দোলন

ব্লগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবি দাওয়াকে সামনে রেখে এমনকি মডারেটরের কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদস্বরূপ ব্লগীয় আন্দোলন হয়েছে। ব্লগ আন্দোলনের শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে জুন মাসে। ২৫-২৭ তারিখের দিকে এটি চলে।

পরবর্তীতে আরেকবার ব্লগ আন্দোলন চলে ২০০৮ সালের ৮ জানুয়ারি থেকে। কয়েকদিনের সেই ব্লগ আন্দোলনের কারণে ব্লগের নীতিমালায় নতুন একটি ধারা যুক্ত হয়। একই বছরের মার্চ মাসে আবার ব্লগ আন্দোলন চলে। এরপরে বিভিন্ন সময় ব্লগে আন্দোলন চলে। তবে সবচেয়ে সফল ব্লগ আন্দোলন ছিল ২০০৮ সালের জানুয়ারির সেই ব্লগ আন্দোলন।
ব্লগের নীতিমালা

ব্লগের শুরুতে পূর্নাঙ্গ নীতিমালা ছিল না। নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হয় ২০০৭ সালে। ২০০৭ সালের ৫ জুলাই ব্লগের বর্তমান নীতিমালাটি খসড়া আকারে ব্লগে উপস্থাপন করা হয় । তবে তখন নীতিমালাটি ইংরেজিতে ছিল। সেটি বাংলায় অনুবাদ করে উপস্থাপন করা হয় ১০ জুলাই। ১৬ জুলাই ২০০৭ থেকে নীতিমালাটি কার্যকর হয়।
ব্লগ আন্দোলনের সফল পরিনতি হিসেবে ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ব্লগ নীতিমালায় সংযোজন (ধারা ৩ ঞ) আসে। এর ফলে ব্লগে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী পোস্ট, মন্তব্য করা নিষিদ্ধ হয়।

ব্লগে বিজ্ঞাপন

ব্লগে বিজ্ঞাপন নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় ২০০৯ সালের ২৮ মে। তারপর থেকে ব্লগে নানা ধরণের বিজ্ঞাপন নেওয়া হচ্ছে।


ব্লগের সামাজিক ক্যাম্পেইন

ব্লগের সামাজিক ক্যাম্পেইন শুরু হয় ২০০৬ সালে প্রাপ্তিকে বাঁচানোর তাগিদ নিয়ে। এরপর ২০০৭ সালের জুন মাসে চট্টগ্রামের পাহাড় ধ্বসে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সহায়তা দেওয়া হয়। পরবর্তী ক্যাম্পেইনটি হয় একই বছরের ২০ নভেম্বর। সেসময় সিডর আক্রান্ত মানুষের সহায়তায় জাগরণ ক্যাম্পেইন নামে ক্যাম্পেইনটি করা হয়। পরবর্তী নানা সময় আরও বিভিন্ন ধরণের সামাজিক ক্যাম্পেইন করা হয়েছে ব্লগ থেকে। এরমধ্যে রয়েছে , শাশ্বত সত্যকে সহায়তা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে ক্যাম্পেইন, ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন, শীত বস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি।

গ্রুপ ব্লগ

গ্রুপ ব্লগ শুরু হয় ২০০৮ সালে।



ব্লগ সেমিনার

প্রথম ব্লগ সেমিনারের আয়োজন করা হয় ২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ব্র্যাক সেন্টারে সেই সেমিনার হয়েছিল। তারপর অবশ্য আর ব্লগের কোন সেমিনার হয় নি।


বাংলা ব্লগ দিবস

বাংলা ব্লগ দিবস পালন শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। শুরুর বছর ১৬ ডিসেম্বর বাংলা ব্লগ দিবস হিসেবে পালিত হলেও ২০০৯ সাল থেকে ১৯ ডিসেম্বর বাংলা ব্লগ দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

বিজয় মিছিল

ব্লগারদের বিজয় মিছিল শুরু হয় ২০০৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে। তারপরে ২০০৯ ও ২০১০ সালে বিজয় মিছিল করা হয়।

সেরা বাংলা ব্লগ পুরস্কার

সেরা বাংলা ব্লগ পুরস্কারের সঙ্গে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ যুক্ত হয় ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে।


ব্লগারদের বই

ব্লগারের লেখা প্রথম বই শুভ (আলী মাহমেদ) এর লেখা শুভ’র ব্লগিং। এটি ২০০৭ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়।


ব্লগ পিকনিক

সামহ্যোয়ারইন ব্লগের প্রথম পিকনিক হয় ২০০৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি। নারায়নগঞ্জের রূগগঞ্জে এই পিকনিক হয়। দ্বিতীয় পিকনিক হয় ১৩ মার্চ ২০০৯। এটি হয় পূর্বাচলে। এরপর অবশ্য সামহ্যেয়ারইন ব্লগ থেকে আর কোনো পিকনিক হয়নি।

ব্লগ আড্ডা

ব্লগ থেকে প্রথম আড্ডা হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। চারুকলার সিরামিক্স বিল্ডিংয়ের মাঠে হয়েছিল সেই আড্ডা। তারপরে বিভিন্ন সময় আড্ডার আয়োজন করা হয়েছে। আড্ডাগুলো-

• ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭, চারুকলার সিরামিক্স বিল্ডিং
• ২১ মার্চ ২০০৮, পাবলিক লাইব্রেরি
• ২৭ জুন ২০০৮, পাবলিক লাইব্রেরি
• ৩১ আগস্ট ২০০৮, পাবলিক লাইব্রেরি
• ১১ অক্টোবর ২০০৮, পাবলিক লাইব্রেরি
• ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৯, ছবির হাট
• ২ অক্টোবর ২০০৯, রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ
• ২৩ অক্টোবর ২০০৯, বলধা গার্ডেন
• ১৮ ডিসেম্বর ২০০৯, ছবির হাট
• ১ জানুয়ারি ২০১০, ছবির হাট
• ২ অক্টোবর ২০১০, পাবলিক লাইব্রেরি
(এর বাইরেও আরও কিছু আড্ডা হয়েছে।)


অপরবাস্তব

সামহোয়্যারইনব্লগের ব্লগারদের লেখা নিয়ে সংকলন ‘অপরবাস্তব প্রথম বের হয় ২০০৭ সালের একুশে বইমেলায়। এখন পর্যন্ত মোট ৫ টি অপরবাস্তব বের হয়েছে। এক নজরে অপরবাস্তব

অপরবাস্তব-১
প্রথম প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, একুশে বইমেলা

অপরবাস্তব-২
প্রথম প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০০৮, একুশে বইমেলা

অপরবাস্তব-৩
প্রথম প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, একুশে বইমেলা

অপরবাস্তব-৪
প্রথম প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, একুশে বইমেলা

অপরবাস্তব-৫
প্রথম প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০, একুশে বইমেলা

ব্লগের ই-বুক

ব্লগের প্রথম ই-বুক হচ্ছে মুক্তলেখা। এটি ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ১২ জুলাই প্রকাশিত হয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ই-বুক ফিরে দেখা একাত্তর। এটি সবচেয়ে আলোচিত ব্লগীয় ই-বুক। ২০০৯ সাল থেকে মা দিবস উপলক্ষ্যে ব্লগীয় ইবুক মমতাময়ী প্রকাশ শুরু হয়। ২০১০ সাল থেকে ভালোবাসা দিবস উপকক্ষ্যে ইবুক প্রকাশ শুরু হয়। প্রথম বছর এর নাম ছিল ‘ভালোবাসি’। এছাড়া ব্লগ থেকে বিভিন্ন সময় নানা ই-বুক প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে-বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প সংকলন - ২০০৯, ব্লগারদের প্রিয় কবিতা, ১ ব্যাগ কবিতাঃ ব্লগারদের লেখা কবিতার সংকলন।


(আরও অনেক বিষয় বাদ থেকে গেল)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29340080 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29340080 2011-03-07 21:26:12
খুঁজিস কোথায়....জগৎজুড়ে....
বরফ পড়া দেখা হয়নি কখনো, মিশরের পিরামিডের নাম কত্তো শুনেছি, উইকিপিডিয়া দেখে দেখে পিরামিড সম্পর্কে কতো কিছু জেনে ফেলেছি। গুগল ইমেজ সার্চ দিয়ে দেখেছি কতো ছবি, নানা অ্যাঙ্গেলের ছবি। এমন করে আইফেল টাওয়ার, ল্যুভর মিউজিয়াম, গ্রেট ওয়াল আরও কতো কতো বিষয়ে জানি বই আর ইন্টারনেটের পাতার মাধ্যমে। মাঝেমধ্যেই মনে হতো কখনও কি দেখা হবে না এইসব!

"বিউটিফুল বাংলাদেশ : স্কুল অব লাইফ, অ্যাডমিশন গোয়িং অন" ভিডিওটা বারবার দেখছি। অসাধারণ একটি ভিডিও। এরইমধ্যে অনেকবার দেখে ফেলেছি। বাংলাদেশের এত্তো সুন্দর সুন্দর জায়গা এখনও দেখা হয় নি! 'মুনসুন ম্যাজিকের' খুব কাছাকাছি থাকি বলেই হয়তো ম্যাজিককে উপলব্ধি করি না তেমন করে। হঠাৎ বৃষ্টিতে ভেজার আগ্রহও কিছুটা হারিয়ে ফেলেছি শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দা হতে গিয়ে। মুনসুন ম্যাজিকের জন্য আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করছি এখন।



...হিয়ার লাইফ হ্যাপেনস, ওয়েলকাম টু দ্য স্কুল অব লাইফ, অ্যাডমিশন গোয়িং অন, ওয়েলকাম টু দ্য বিউটিফুল বাংলাদেশ

জীবনের এই স্কুলের কাছে আরও অনেক কিছুই শিখার আছে। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29328973 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29328973 2011-02-18 02:43:58
'মেহেরজান' : ভুল পরিপ্রেক্ষিত ও ভুল ভালোবাসার গল্প

অনেকদিন ধরেই শুনছিলাম ‘মেহেরজান’ আসছে। এই আসছে আসছে মাতমের পেছনে নির্মাতা বাহিনীর চমক দেওয়ার চেষ্টাটাই হয়তো বেশি ছিল। অভিনয়ের ক্রেডিট লাইনে জয়া বচ্চনকে নিয়ে আসা সেই চমক বাণিজ্যেরই অংশ। 'মেহেরজান' চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার শো দেখার সুযোগ এলে তাই চমকৃৎ হতেই গিয়েছিলাম। কিন্তু মেহেরজান আসছে, আসছে রবটা যতোটা জোরে শুরু হয়েছিল এবং নানাবিধ আলোচনা শুনে চলচ্চিত্রটি নিয়ে যতোটা উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল, প্রত্যাশা ঠিক ততোটাই মিইয়ে গেল চলচ্চিত্র দেখার পর।

'মেহেরজান' চলচ্চিত্রের ট্যাগলাইন ‘একটি যুদ্ধ ও ভালোবাসার ছবি’। যুদ্ধ ও ভালোবাসা পাশাপাশি আসলেই শুরুতেই একটি কথা মনে পড়ে। ভালোবাসা ও যুদ্ধ কোনো নিয়ম মানে না। চলচ্চিত্রটা দেখে মনে হয়েছে এটিও কোনো নিয়ম মেনে চলে নি। এটি যদি নির্মাতার ইচ্ছাকৃত হয় তাহলে বলতে হয় তিনি যথেষ্টই সফল। আমার কাছে ’একটি যুদ্ধ ও ভালোবাসার ছবি’ শেষ বিচারে হয়েছে ভুল পরিপ্রেক্ষিত আর ভুল ভালোবাসার গল্প।

চলচ্চিত্রের কাহিনীর ব্যাপারে বলা যাক। তার আগে বলে নেওয়া ভালো, চলচ্চিত্রটিতে দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়, দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট, দুটি ভিন্ন সামাজিক অবস্থান উপস্থাপিত হয়েছে পাশাপাশি। পরিণত বয়সের ভাস্কর নিভৃতে শহরে বসে শিল্প চর্চা করছেন, আবার তিনি পুরনো ডায়েরির পাতা খুললেই পুরনো সময়ে ফিরে যান। ফিরে যান, বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তাল সময়ে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়। সারাহ নামের একজন যুদ্ধশিশু মায়ের সন্ধানে এসে আবিস্কার করে অতীতকে। মেহেরকে সে দাঁড় করিয়ে দেয় অতীতের সামনে। মেহেরের খালাতো বোন নীলার গর্ভে জন্ম নেওয়া যুদ্ধশিশু সারাহকে অতীতের ঘটনা খুলে বলেন মেহের। এই বলার মধ্য দিয়েই মেহের তার অতীতকে আবার দেখে। একাত্তরের উত্তাল সময়ে বাবা-মার সঙ্গে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে নানার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কিংবা কাত হয়ে সে ডায়েরি লেখে, ডায়েরির পাতায় তুলে রাখে যুদ্ধাক্রান্ত সময়ের স্মৃতি। একসময় পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে নির্যাতিত খালাতো বোন নীলা হাজির হন। নীলা আত্মগ্লানিতে না ভুগে প্রতিশোধের উপায় খোঁজে। যুদ্ধের উত্তাল সময়ে মেহের গ্রামময় ঘুরে বেড়ায়। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কা থেকে তাকে বাঁচায় পলাতক এক পাকিস্তানী সৈন্য। আহত সৈন্যটির প্রতি মেহের দূর্বল হয়ে পড়ে। শত্রুপক্ষের সৈন্য হওয়া সত্ত্বেও ওয়াসিমকে শুশ্রূষা করে ভালো করে তোলে মেহের। ওয়াসিমের প্রেমে পড়ে যায় মেহের। কিন্তু শত্রুপক্ষের একজন সেনাকে ভালোবাসার অপরাধে পরিবার থেকে কথা শুনতে হয় মেহেরকে, বাবার মার সহ্য হয় তাকে। এক রাতের আঁধারে ওয়াসিমকে নৌকায় উঠিয়ে বিদায় জানায় মেহের। কিন্তু সে ভালোবাসার বিচ্ছেদে আক্রান্ত।

গল্প মোটামুটি এই। চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্যে নানা ধরনের গোলমাল রয়েছে। বলতে গেলে পুরো চিত্রনাট্যই দাঁড়িয়েছে ভুল পরিপ্রেক্ষিত ও সামাজিক অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে। মেহেরজান এর চিত্র্যনাট্য ও চিত্রায়ন একাত্তরের উত্তাল সময়ের প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবেই করে না।

চলচ্চিত্রের অসঙ্গতিগুলো দেখে নেওয়া যাক।

১. বীরঙ্গনা নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন নীলা। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। খাজা সাহেবের বাড়িতে যুদ্ধ শুরু নিয়ে নানা কথাবার্তা হয়। হঠাৎ করেই খাজা সাহেবের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় নীলা। এসেই কিছু বলার আগেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানা যায়। কিন্তু নীলার চরিত্র কোনভাবেই কোন বীরঙ্গনার চরিত্রকে রিপ্রেজেন্ট করে না। এই চরিত্রে বীরঙ্গনাদের ব্যাথা আসেনি, বঞ্চনা আসেনি। সংলাপগুলো হয়েছে কৃত্রিম, বড্ড বেশি কানে লাগার মতো। একটি ব্যতিক্রমী দিক- নীলা আত্মগ্লানিতে ভোগে না, প্রতিশোধের পথ খোঁজে। তবে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্যে নীলা চরিত্রের কনফ্লিক্টিং অবস্থান দেখা গেছে। কখনও সে ঘোর পুরুষবিদ্বেষী। মুক্তিযোদ্ধা [চীনপন্থী বাম হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা রয়েছে] সুমনকে অভিযোগ জানিয়ে বলে সেও অন্য পুরুষের মতো তার শরীরটাকেই চায়। সুমন মৃদু ভাষায় প্রতিবাদ করে। পরে সুমন ও নীলাকে ঘনিষ্ট অবস্থায় দেখে ফেলে খাজা সাহেব। সুমনের জন্য বন্ধ হয়ে যায় খাজা বাড়ির দরজা। সুমন বিয়ে করতে চায় নীলাকে। নীলাও বলে- সুমনের সাথে বিয়ে না হলে আমার কী হবে ভেবে দেখেছো। এই সংলাপেই নীলার অবস্থান সম্পুর্ণই বিপরীতধর্মী।
তাহলে নীলা কি ভিন্ন একজন বীরঙ্গনার চরিত্র? নীলার রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশিত হয় এমনভাবে- ছাত্র ইউনিয়ন করা মেয়ে। সব ছেলেরা তাকে ভয় পায়। এইসব যুক্তি কিন্তু অসঙ্গতিগুলোকে পার করতে পারে না। তাই বলতে দ্বিধা নেই বীরঙ্গনার চরিত্রে ব্যর্থ অভিনেত্রী ঋতু এ সাত্তার। তবে এই ব্যর্থতার দায়ভার পরিচালককেই নিতে হবে।
[কেউ বলতেই পারেন- বীরঙ্গনা চরিত্র মানেই সেখানে ব্যাথা, বঞ্চনা থাকবে এমনটা নয়। মেহেরজানে না হয় একজন ব্যতিক্রমি বীরঙ্গনা চরিত্র আসলো। কিন্তু ব্যতিক্রমি আদতে কতোটা হয়েছে? নীলাকে আধুনিক ও প্রগতিশীল চরিত্র দাড় করাতে চেয়েছেন পরিচালক? এতোই যদি আধুনিক হবে, এতোই যদি নিয়ম না মানা হবে তাহলে যুদ্ধশিশু হিসেবে নিজের সন্তানকে অন্যকে অ্যাডপ্ট করতে দিলো কেন! সমস্যাটা হলো পরিচালক বার বার জাহির করতে চাচ্ছেন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বীরঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণা করেছেন, নীলিমা ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলেছেন। এইখানে বলে নেওয়া ভালো নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরঙ্গনা বলছি' বইয়ে বীরঙ্গনা চরিত্র রয়েছে মেহেরজান নামে। যদিও এই মেহেরজানের সঙ্গে 'মেহেরজান' এর মেহেরের মিল নেই। এতো গবেষণার পরেও চলচ্চিত্রে পরিচালক বীরঙ্গনার চরিত্র এমনভাবে উপস্থাপন করলেন কেন সেটিই বড় প্রশ্ন। কারণ চলচ্চিত্রের সংলাপের মাধ্যমে পরিচালক নিজেই অভিযোগ করেছেন- 'দু লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা' এই বাক্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদানকে সরলীকরণ করা হয়েছে। 'মেহেরজান' চলচ্চিত্রের দর্শক হিসেবে বলতেই পারি- পরিচালক 'নীলা' চরিত্রের মাধ্যমে বীরঙ্গনাদের অবদানকে বিকৃতি করেছেন।]

২. নীলা প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ে। এটা নীলার মিঠু খালার ভাষ্য থেকে জানা যায়। নীলা এমন একটি পরিবারের সদস্য যে পরিবারের অধিকর্তা খাজা সাহেব গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী। চলচ্চিত্রের সংলাপ অনুযায়ী, গ্রামের লোকজন তাকে পীরের মতো মানে। এমন প্রভাবশালী একটি পরিবারের পক্ষে অ্যাবরশন করানোটাই খুব স্বাভাবিক ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের অ্যাবরশনের ঘটনাগুলোই তা-ই প্রমাণ করে। অনেক নির্যাতিত নারীই মেনে নিতে পারে নি পাকিস্তানীদের সন্তান তিনি গর্ভে ধারণ করবেন। কেউ যদি বলতে চান, অ্যাবরশনের সময় পেরিয়ে যেতে পারে। সেটিও ঠিক মেনে নেওয়ার মতো যুক্তি নয়। কারণ অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে যান নীলা। ওই স্টেজে নিশ্চয়ই অস্ত্র নিয়ে সম্মুখ সমরে যাওয়ার মতো অবস্থা থাকার কথা না। গল্পের খাতিরে যুদ্ধশিশুর দরকার ছিল। বেশ কয়েকজন যুদ্ধশিশু পরে বাংলাদেশে মায়ের সন্ধানে এসেছেন এমন ঘটনা আমরা জানি। এমন একটা বিষয় পরিচালকের দরকার ছিলো বলেই জোর করে পারিপার্শ্বিকতা বদলে দিয়েছেন।

৩. যুদ্ধের সময় বন বাদাড়ে (জঙ্গল বলাই বোধ হয় ঠিক) ঘুরে বেড়াচ্ছে মেহের। এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য তখন গাছ ঘেরা বনের রাস্তার মধ্যে। মেহেরের কোনো দিকে খেয়াল নেই। সে বিমুগ্ধ হয়ে দেখছে গাছের সৌন্দর্য। হঠাৎ করেই দৃশ্যপটে পাকিস্তানী সেনা ওয়াসিমের আবির্ভাব। পাকিস্তানীদের হাতে ধৃত হওয়া থেকে মেহেরকে রক্ষা করে সে। শুরুতে মেহের তা বুঝতে পারে না। এক পর্যায়ে ওয়াসিমকে আঘাত করে বসে মেহের। কপালে করা আঘাতে মেহেরের হাতের চুড়ি ভেঙে যায়। তখনো ওয়াসিমের জ্ঞান আছে। বলার চেষ্টা করছে- তাকে বাঁচানোর জন্যই এই কাজ করেছে সে। আর এই বিষয়টিই দুর্বল করে তোলে মেহেরকে। সে ভাবতে থাকে আহত পাকিস্তানী সৈন্যের সেবা করা উচিত কিনা। নির্যাতনের শিকার হওয়া বোন নীলার পরামর্শ চাইতে গেলে বলে - সে হলে এক কোপে কল্লা কেটে ফেলবে। তারপর কিছুটা পাগলাটে স্বভাবের খালা সালমার পরামর্শে ওয়াসিমকে বাঁচাতে যায় মেহের। তখনও মেহেরের মনে চিন্তা - পাকিস্তানী সৈন্যটি বেঁচে আছে কিনা! পরে সেই বনে গিয়ে পাকিস্তানী সৈন্য ওয়াসিমকে নিয়ে এসে সুস্থ করে তোলে মেহের।
এইটুকু দেখে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই মাথায় আসে। প্রথমত. চুড়ির সামান্য আঘাত কি এতোটাই বেশি ছিল যে ওয়াসিমের জীবন মরণের প্রশ্ন চলে আসে। আহত অবস্থায় দেখা গেছে ওয়াসিম পায়ে ব্যাথা পেয়েছে। পায়ে ব্যাথা পাওয়ার ঘটনাটি রহস্যে ঘেরা। [ব্যাখ্যা খোঁজা যেতে পারে- দলত্যাগী পাকিস্তানী সেনা মসজিদের মুসলমানদের গুলি না করায় তাকে অত্যাচার করেছে পাকিস্তানী বাহিনী]। পাকিস্তানী বাহিনীর কেউ পালিয়ে বনে বাদাড়ে লুকিয়ে থাকছে, খাচ্ছে কোথায়, থাকছে কীভাবে এই ভাবনাটা মনে হয় পরিচালকের ভেবে নেওয়া উচিত ছিল। চিত্রনাট্যকারদেরও ভাবা উচিত ছিল হয়তো।

৪. সাইকোলজিক্যাল দিক থেকে মেহের ও ওয়াসিমের প্রেমে ত্রুটি রয়েছে অনেক। গড়পড়তা বাংলা চলচ্চিত্রের নায়িকাদের মতো, নায়িকার জীবন বা মান বাঁচালো নায়ক, আর ওমনিই নায়কের প্রেমে পড়ে গেল নায়িকা। [দলত্যাগী পাকিস্তানী সৈন্যের কাহিনী শুনে মেহেরের সহানুভূতি জাগতে পারে, সেই সহানুভূতির খাতিরে ওয়াসিমকে নিরাপদে পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে।] কিন্তু পরিচালক ভুলে গেলেন মেহেরের সামনে তখন পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা নির্যাতিত বড় বোন নীলা রয়েছে। নীলা বিভিন্ন সময় পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কথা বলে, অত্যাচারের কথা বলে। এই মানসিক ও শারিরীক নির্যাতনের গল্প শুনে মেহেরের ভালোবাসার এমন রূপ হওয়া স্বাভাবিক না। পাকিস্তানী বাহিনীদের কাছে নির্যাতিত একজন নারীর, যে কিনা কাছের একজন মানুষ, তার মর্মবেদনা মেহেরকে স্পর্শ করলো না, অবাক করার মতোই ঘটনা বটে। মেহের আর ওয়াসিমের প্রেমের ব্যাপারটিও অদ্ভূতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তারা পরস্পর প্রেম করে বেড়িয়েছে, গ্রামে একত্রে ঘুরে বেড়িয়েছে, নৌকায় চলেছে। সবই ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধরত একটি দেশে। অথচ গ্রামের কেউ , মুক্তিযোদ্ধাবাহিনী, রাজাকারবাহিনী কেউই ওয়াসিমের সন্ধান পেল না, ব্যাপারটি রীতিমতো অবাক করার মতো।

৫. চলচ্চিত্রের পোশাক আশাক কোন সময়ের তাও বোধগম্য হলো না। প্রেমে মগ্ন মেহের আর আহত পাকিস্তানী সৈন্য ওয়াসিম ঘন ঘন পোশাক পরিবর্তন করলো আর অদ্ভূত রকমের পোশাক পড়ে প্রেমে মগ্ন থাকলো, পুরো বিষয়টিই দৃষ্টিকটু লেগেছে।

৬. শত্রুপক্ষের সৈন্যকে ভালোবাসার জন্য দীর্ঘ ৩৮ বছর গ্লানিতে ভুগিয়েছে মেহেরকে। ছবির শেষ দিকে দেখা যায় মেহের আত্মগ্লানিবোধ থেকে মুক্তি পায়। সে তখন চিত্রপ্রদর্শনীর প্রস্তুতি নেয়। ভাস্কর্য করে তার অতীত ভালোবাসার কথা মনে করে। পুরো আত্মগ্লানির ব্যাপারটিই আরোপিত। ছবির ফ্ল্যাশব্ল্যাকে, মানে একাত্তরের দৃশ্যপটে, শত্রুশিবিরের কাউকে ভালোবাসা নিয়ে আত্মগ্লানি ছিল না মেহেরের। সেখানে বরং প্রতিবাদের ভাষা ছিল। ওয়াসিমকে যখন জেরা করা হচ্ছিলো তখন সে সবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। সেখানে অন্তত কোনো আত্মগ্লানি ছিল না। ওয়াসিমকে বিদায়ের দৃশ্যে বিচ্ছেদ বেদনা ছিল, কিন্তু কোনো ভাবেই আত্মগ্লানির ব্যাপারটি প্রস্ফূটিত হয়নি।

৭. চলচ্চিত্রটিতে যতগুলো মুক্তিযোদ্ধার চরিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে তার প্রতিটিই নিজেদের উপস্থাপিত করেছে ক্লান্ত যোদ্ধা হিসেবে। বলতে গেলে মুক্তিযোদ্ধাদের চরিত্র উপস্থাপনা করা হয়েছে বিকৃতভাবে। মুক্তিযুদ্ধ করতে করতে এরা ক্লান্ত, ক্লান্ত হয়ে এরা বিয়ে করতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তানী সৈন্য ওয়াসিমকে মহান চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বিষয়টি কনটেকচুয়ালি ঠিক রয়েছে কিনা তা পরিচালককে অবশ্যই ভাবতে হবে।
[প্রশ্ন হতে পারে- মুক্তিযোদ্ধাদের তো ব্যক্তিগত জীবন থাকতেই পারে। বিয়ের ইচ্ছাও হতে পারে। নয় মাসের সময়টাতে ব্যক্তিগত চাহিদা থাকবে না, এমন ভাবনাই বরংচ ভুল। কিন্তু যখন একটি চলচ্চিত্রের সবগুলো মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রকে ক্লান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, মুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে বিয়ে করায় আগ্রহী হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তখন পরিচালকের এই চাওয়ার প্রতি সন্দেহ জাগে।]

৭. হুটহাট প্রেমে পড়া দেখানো হয়ছে চলচ্চিত্রে। পুরো ব্যাপারটিই হাস্যকরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

৮. মেহেরজান-এ ব্যবহৃত ভাষা কোন সময়ের? কোন অঞ্চলের? আসতাছি, করতাছি জাতীয় ভাষার ব্যবহার তো খুব সাম্প্রতিক সময়ের। ঢাকার এই আধুনিক ভাষাগত প্রকৃতি কি একাত্তরে ছিল? একাত্তরের প্রেক্ষাপটে একটি গ্রামের লোকজন এভাবে কথা বলছে তা কতোটা সঠিক! ‘আমি তোমাকে জেনুইনলি ভালোবাসি।’ এমন সংলাপ হাস্যকর বটে।

৯. চলচ্চিত্র দেখে মনে হবে সিনেমাটোগ্রাফি ভালো হয়েছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা এটি কোন সময়ের? উত্তর স্বাভাব্কিভাবেই আসবে এটি উপস্থাপিত হয়েছে বর্তমান সময়ের হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নয়। গ্রামে পাকিস্তানী বাহিনীর নৃংশতার কোনো দৃশ্যই ছবিতে নেই। অবশ্য এক দৃশ্যে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। তবে যুদ্ধের ভয় পুরো চলচ্চিত্রে উপেক্ষিত। একইভাবে উপেক্ষিত যুদ্ধকালীন সময়ের সংকট।

১০. পরিচালকের কারণে কোন চরিত্রই দাঁড়াতে পারে নি। ভিক্টর ব্যানার্জির করা খাজা সাহেব চরিত্রটি যা একটু দাঁড়িয়েছে। জয়া বচ্চনের অভিনয়কে আলোচনার মধ্যে রাখা যেতে পারে। তবে সেটিও আশানুরূপ নয়। বাকি চরিত্রগুলো বিকাশ লাভ করেনি নির্মাতাদের অবহেলায়।

চরিত্রগুলোর বিন্যাস এই ফাঁকে দেখে নেওয়া যাক-

নীলা- পাক সেনাদের ক্যাম্পে ধর্ষিত হয়ে ফেরত আসা নারী। আত্মগ্লানিতে না ভুগে সে সবসময় পথ খোঁজে প্রতিশোধের। পাক বাহিনী যখন গ্রাম আক্রমণ করে তখনো তাকে দেখা যায় দা হাতে বেরিয়ে পড়ার চেষ্টায় রত।

খাজা সাহেব- উচ্চশিক্ষিত, রাজনীতি নিয়ে বেশ জ্ঞান। দেশ ভাঙার বিরোধী, তবে মনে করে একসময় জনগণ অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। বনেদি মুসলমান পরিবারের অধিকর্তা। নিজের গ্রামকে যুদ্ধের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চান। এজন্য পাকিস্তানী বাহিনী, রাজাকার বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী এই তিন বাহিনীর চাপ মোকাবেলা করতে হয় তাকে। সবাই তাকে এসে শাসিয়ে যায়।
[তার কথা শুনেই মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে কোনো বাহিনীই গ্রাম আক্রমন করতে সাহস পায় না। কিছুটা অবাক করার মতোই।]

সালমা- পাগলাটে স্বভাবের। বিয়ে পাগল।

মেহের- চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে বাবা মার সঙ্গে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। প্রেমে পড়ে পাকিস্তানী এক সৈন্যের।

ওয়াসিম- পালিয়ে থাকা পাকিস্তানী সৈন্য। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান থেকে যুদ্ধে আসা। মেহেরের প্রেমে পড়ে।

সুমন- মুক্তিযোদ্ধা চরিত্র হিসেবে সুমন বিকশিত নয়। তার রাজনৈতিক ওরিয়েন্টশনও ধোঁয়াটে। [যদিও সুমন চরিত্রকে চীনপন্থী বাম নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা ছিল চলচ্চিত্রে। কিন্তু খাজা সাহেবের সঙ্গে সুমনের রাজনীতি বিষয়ক কথোপকথন তার রাজনীতি জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।]

মেহেরজান এর প্রচরণার জন্য যে বুকলেটটি করা হয়েছে তাতে চলচ্চিত্রটিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে এভাবে- মেহেরজান ‘অপর’কে ভালবাসার মানবিক বোধের ছবি। পুরুষতন্ত্রের একক ক্ষমতায়নের পথকে পাশ কাটিয়ে নারীত্বের আবেগ ও অনুভূতির বহুবিচিত্র সংবেদনশীলতাকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়াস 'মেহেরজান'। অন্যদিকে, এই ছবির অন্যতম পরিপ্রেক্ষিত জাতীয়তাবাদের যে চোরাগুপ্তা পথে ছাড় পেয়ে যায় যুদ্ধ, হত্যা ও নৃশংসতা তারই সূক্ষ্ম সমালোচনা। শেষ পর্যন্ত ‘মেহেরজান’ যুদ্ধ ও হিংস্রতার বিরুদ্ধে নান্দনিক সমাধান দিতে ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিকতার পথে আশ্রয় খোঁজে।’ কিন্তু দেখা চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই বড় বড় কথাগুলোকে মেলাতে গেলে হতাশ হতে হয়। পরিচালক কী বানাতে চেয়েছিলেন এবং কী বানালেন সে ব্যাপারে বোধহয় নিজেই নিশ্চিত নন। যেভাবে মিডিয়াগুলোতে মেহেরজান চলচ্চিত্র সম্পর্কে এসেছে যে এটি -একাত্তরের নারী নির্যাতনের অনালোচিত অধ্যায়কে সামনে নিয়ে আনার প্রয়াস। কিন্তু নিয়ে আসা হলো ভুল ভাবে। শুধু ভুল বললে হয় না, সম্পুর্ণই ভুলভাবে।

পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ায় অধ্যয়নকালে বীরঙ্গনা ও একাত্তরে নারীর ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করেছেন বলে জানা যায়। এটিও জানা যায় যে, সেই গবেষণাকালেই মেহেরজানের কাহিনীর বীজ অঙ্কুরিত হয়। কিন্তু এই যদি হয় পরিচালকের গবেষণা তবে তা আমাদের হতাশ করে। এ যাবত করা সকল গবেষণাকেই যেন ‘না বিচার’ করলো পরিচালকের নতুন এই গবেষণা। প্রযোজক স্বীকার করতে চেয়েছেন, মেহেরজান শেষপর্যন্ত কোনো গবেষণাধর্মী তত্ত্ব ও তথ্যনির্ভর ছবি নয় বরং জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের আঙ্গিকে প্রেম-নির্ভর আবেগ অনুভূতির নাটকীয় প্রকাশ। কিন্তু শেষ বিচারে মেহেরজানকে ভুল সময়ের ও ভুল ভালোবাসার গল্পের ছবি বলা যায়। ট্যাগ লাইনে বলে দেওয়া ‘যুদ্ধ ও ভালোবাসার গল্প’কে বদলে ‘বিনোদনমূলক নিটোল ভালোবাসার গল্প’ রাখলেই ভালো করতেন পরিচালক।


অভিনয়

জয়া ব্চ্চন, ভিক্টর ব্যানার্জী, হুমায়ুন ফরিদী, খায়রুল আলম সবুজ, শর্মিলী আহমেদ, আজাদ আবুল কালাম, ঋতু এ সাত্তার, নাসিমা সেলিম, শতাব্দী ওয়াদুদ, ইকবাল সুলতান, মনিরা মিঠু, রিফাত চৌধুরী, অরূপ রাহী, শায়না আমিন ও ওমর রহীম।

কাহিনী ও পরিচালনা : রুবাইয়াত হোসেন
প্রযোজনা : আশিক মোস্তফা
সহযোগী প্রযোজক ও প্রধান সহকারী পরিচালক : ইশতিয়াক জিকো
চিত্রনাট্য : এবাদুর রহমান ও রুবাইয়াত হোসেন
চিত্রগ্রহণ: সমীরণ দত্ত

ফরম্যাট ৩৫ মি.মি.
ব্যবহৃত ভাষা : বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, সাবটাইটেল- ইংরেজি
দৈর্ঘ্য : ১১৯ মি.
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29312251 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29312251 2011-01-22 17:10:02
নিবিড়তম (১ম পর্ব)
প্রথম প্রথম প্রায় বিকালেই বাড়ির কথা মনে হলেও একসময় দিব্যি মানিয়ে নিলাম সবকিছু। বিকাল হলে এদিক ওদিক ঘুরতে বের হই, একা একা উদ্দেশ্যহীন সদ্য পরিচিত রাস্তায় হেটে বেড়াই। কোন কোন বিকালে নতুন রাস্তা আবিস্কার করতে বের হয়ে যাই। সকালে ক্লাস, বিকালে ঘুরাঘুরি আর রাত নামে জানালার কাচে। কাছের উচু ভবনের আলো এসে প্রতিফলিত হয় যত্ন না পাওয়া কাচটিতে। বুঝতে পারি, রাত নামতে শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে অভ্যস্থ্ হতে লাগলাম। নিয়মিত যাতায়াতের সুবিধায় কিছু কিছু এলাকা, কিছু আঁকাবাকা পথ পরিচিত হয়ে গেল। কেবল কাচের জানালাটিই পরিচিত হলো না। রাতের শহরে আলো এসে পড়া জানালা আমার আপন নয়, দুরের কেউ। যে স্বস্তা ব্যাগটি নিয়ে ক্লাসে যাই তার ভিতরে সবসময় কিছু গল্প-উপন্যাসের বই থাকে। বাড়ি দেওয়া হাত খরচের স্বল্প টাকা থেকেই সাহস করে কিছু গল্প-উপন্যাসের বই কিনে ফেলেছি। বিগতযৌবনা দুপুরে ক্লাস করে ফেরার সময় বাসে বসে ব্যাগ থেকে বের করে সেইসব বই পড়ি।
তিন চারমাস পেরিয়ে গেল বুঝতে পারি আমি আর ঢাকার নতুন বাসিন্দাটি নই। তখন হলো বিভিন্ন প্রদর্শনী আর মেলায় যাওয়ার বাতিক। শিক্ষামেলা, ফার্নিচার মেলা, কম্পিউটার মেলা থেকে শুরু করে ফল মেলা কোনটাই বাদ গেল না। এক দুপুরে ক্লাস শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম শেরাটনের শিক্ষামেলায় যাবো। কিন্তু সিদ্ধান্ত পরিরর্তন করে ফার্মগেট থেকে ৩ নম্বর বাসে চেপে বসলাম। গন্তব্য বনানী। কাজ শেষে ফার্মগেটে ফেরার জন্য একটি লেগুনা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির প্রবেশ পথের পাশের সিটেই। পাশে আরও দুটি সিট খালি। ড্রাইভার অপেক্ষা করছে গাড়ি ভরার জন্য। খানিক ডাকাডাকির পর একজনের দেখা পাওয়ার গেল। লেগুনা গাড়ির ছোট্ট দরজা গলে চোখ রেখে দেখি আমার বয়সী এক মেয়ে উঠতে যাচ্ছে। একহারা গড়ন, চেহারায় কেমন যেন একটা উচ্ছ্বলতা। সিট খালি কেবল দুইটি, তাই আমার পাশের সিটেই বসতে হবে। কোন এক অজানা কারনে মন আনন্দিত হয়ে উঠলো। হয়তো এই পথযাত্রায় কোন কথাই হবে না। কেবল পাশপাশি বসে যাওয়া হবে। ভাবতে ভাবতেই দেখি মেয়েটির পেছনে একজন মধ্যবয়সী মহিলা গাড়িতে উঠতে যাচ্ছেন। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হলো। পাশের সিটে বসলেন সেই মহিলা। তারও পাশের সিটে সেই স্নিগ্ধ কন্যা। কিছুক্ষণ পর কথা শুনে বুঝলাম সম্পর্কে এরা মা মেয়ে। অহেতুক মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে ভেবে ব্যাগ থেকে বই বের করে পড়তে শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথের বই ‘ডাকঘর’। পড়া শুরু করার আগ পর্যন্ত ধারণা ‘ডাকঘর’ রবীন্দ্রনাথের অন্যতম সেরা সাঙ্কেতিক নাটক। জনপ্রিয়ও। কয়েকপাতা উল্টে পাল্টে দেখে পড়া শুরু করলাম। গাড়ির ঝাকুনিতে মুশকিলেই পড়লাম। তখন মাত্র পড়ছি “মুশকিলে পড়ে গেছি। যখন ও ছিল না, তখন ছিলই না- কোনো ভাবনাই ছিল না। এখন ও কোথা থেকে এসে আমার ঘর জুড়ে বসল; ও চলে গেলে আমার এ ঘর যেন আর ঘরই থাকবে না”। পারিপার্শ্বিক অবস্থান ভুলে বইয়ে ডুব দিলাম। কিছুক্ষণ পর ধ্যান ভাঙলো কারো প্রশ্নে। তাকিয়ে দেখি পাশে বসা মধ্যবয়স্কা নারী আমায় জিজ্ঞেস করছেন-“বইটা ডাকঘর না?’’ হ্যা সূচক জবাবের পর ফিরতি প্রশ্ন উড়ে এল। বাবা, যদি কিছু মনে না করো বইটা একটু দেওয়া যাবে। এমন মায়া মাখানো আহ্বানে সাড়া দিয়ে বইটা তুলে দিলাম উনার হাতে। কিছুক্ষণ উল্টে পাল্টে ফিরিয়ে দিতে দিতে অস্ফুট উচ্চারণ করলেন, না সেই বইটা নয়। কৌতুহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসলাম, কোন বইটা নয়? জবাবে বললেন, সে এক বিরাট ইতিহাস। কিছুক্ষণ থেমে আবার বলা শুরু করলেন। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29299100 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29299100 2010-12-30 23:01:41
যাপিত জীবন
লামিয়ার সাথে আমার পরিচয়ের ঘটনাটি বেশ মজার। শীতের রাতে বাসায় ফিরছিলাম। সেই রাতে হঠাৎ করেই বৃষ্টি নেমে আবার থেমে গেল। রাস্তায় লোকজনের সংখ্যা খুবই কম। ভয় নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলাম। কিছুক্ষণ পরই অনিন্দ্য সুন্দরী এক তরুণীর দেখা। দেখেই আমার ভয়াবহ অবস্থা। হার্টবিট বেড়ে গেছে। হার্টবিট যেন বলছে, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই! থাক, আপনাকে নানামুখী আলাপ করে বিরক্ত করতে চাই না। পরিচয়ের এই গল্প মেলা বড়। অনেকেরই কাছে এই গল্প বলে ফেলেছি। আপনাকে পুরনো একটা বিষয় বলবো এমনটা যেন ভুলেও ভাববেন না। গল্পটা প্রতিবার বলার সময়ই নতুন নতুন বিষয় মনে পড়ে। তাই এক ধরনের আনকোরা ফ্লেভার পাবেন। আসল কথায় ফিরে আসি। বলছিলাম, আয়োজন করে গল্প বলতে বসেছি। আমি নিজেকে বস্তাপচা ধরনের গল্প বলিয়ে মনে করলেও বিন্তা মনে করে আমি খুবই ভালো গল্প বলি। গল্পের হিপনোটিজমের গুন নাকি আমার মধ্যে আছে। আফ্রিকার কিছু মানুষ নাকি হিপনোটাইজ করে দূর থেকে চামচ বাঁকিয়ে ফেলতে পারতো। আর আমি নাকি গল্প বলে মানুষের মন বাঁকিয়ে দিতে পারবো। অবশ্য মন বাঁকানোর ব্যাপারটি নিয়ে বিন্তার সাথে খোলাখুলি আলাপ হয় নি। এই মেয়েটার কথার কোন সেন্সর নেই। কখন আবার কী বলে ফেলে এই ভয়ে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করি না। একবার হুট করে আমার রুমে এসে বলে বসলো- আমার আম্মাজান তো মাইনকা চিপায় পড়েছে। মুরুব্বী একজন মানুষকে নিয়ে এই ধরনের কথা শুনে আমি রীতিমতো হতভম্ব। এই হতভম্ব অবস্থা কাটতে কাটতেই পুরো ঘটনা শোনা গেল। টিভির রিমোট হঠাৎ করেই নষ্ট হয়ে গেছে। যার ফলে বিন্তার মা ইচ্ছামতো যখন তখন চ্যানেল পরির্বতন করে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে পারছে না। এটাকেই বিন্তার কাছে মাইনকা চিপা মনে হয়েছে।

বিন্তা মাঝেমধ্যেই খাবার টাবার নিয়ে আসার বাহানায় ছাদের রুমে আসে। দুই রুমের বাসা। আলাদা রান্নাঘর। এক রুমে আমি আরাম আয়েশ করে থাকি, আরেক রুমে কেবল বই আর বই। কোন বুকসেলফ নাই, চেয়ার টেবিল নাই। ওই রুমে বই পড়তে হলে ফ্লোরে বসে পড়তে হয়। সবার জন্যই একই নিয়ম। এমনকি কখনো যদি প্রধানমন্ত্রীও এই রুমে বই পড়তে আসেন তাকেও ফ্লোরে বসে বই পড়তে হবে। একটা ছোটখাটো ভুল হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রীর আগে মাননীয় শব্দটা বলতে ভুলে গিয়েছি। সময় খুবই খারাপ। বিন্তার ভাষায় মাইনকা চিপাময়। দেখা গেল হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আমার নামে রুল জারি হয়ে গেছে। ‘প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে মাননীয় যোগ না করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না?’ এই মর্মে সাতদিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ চলে আসলো। ছাদের চিলেকোটায় বেশ ভালো আছি। আইনি ঝামেলায় জড়াতে চাই না। কথায় আছে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ৩৬ ঘা আর আইনে ছুঁলে ৭২ ঘা। কথাটা অবশ্য কিছুটা উল্টা পাল্টা হতে পারে।

তো যা বলছিলাম, আয়োজন করে গল্প বলতে বসেছি। গল্পের শ্রোতা বিন্তা। আমার জন্য আমের শরবত নিয়ে এসেছে। আমার প্রতি অনুরক্ত হয়ে সে আমের শরবত নিয়ে এসেছে, বিষয়টা এমন নয়। তাকে দিয়ে আনানো হয়েছে। মানে তার মা রেহেনা আক্তার আমের শরবত বানিয়ে আমার জন্য পাঠিয়েছেন। একবার ওনার বানানো আমের শরবত খেয়ে প্রশংসা করেছিলাম। তারপর থেকে যখনই উনি আমের শরবত বানান তখনই আমাকে পাঠান। আমের শরবত বানানোর প্রক্রিয়া বেশ সহজ। আমি বিন্তার মার কাছ থেকে শিখে নিয়েছি। প্রথমে দুই তিনটা কাঁচা আম নিতে হবে। কুচি কুচি করে কেটে ফেলতে হবে। কয়েকটা কাঁচা মরিচও সঙ্গে কুচি কুচি করে কাটতে হবে। মিষ্টি ফ্লেভার পেতে চাইলে দুই চামচ চিনি মেশানো যেতে পারে। পরিমাণমতো লবণ মেশাতে হবে। এইসব উপকরণ ব্লেন্ডার মেশিনে দিয়ে আমের শরবত করে ফেলা যায়। পরিবেশনের আগে অবশ্যই ফ্রিজে রাখতে হবে। যাদের ফ্রিজ নাই তাদের দুর্ভাগ্য। ঠাণ্ডা আমের শরবতে একটু বিট লবণের গুঁড়া দিলে অন্যরকম টেস্ট আসে। অবশ্য বিট লবণের গুঁড়া দেওয়ার বিষয়টি বিন্তার মার রেসেপিতে ছিল না। আমি যোগ করে নিয়েছি। ফলাফল নিজেই টেস্ট করেছি। ভালো। বিন্তার মায়ের বানানো শরবতে চুমুক দিয়ে বিন্তার দিকে তাকালাম। তখনই বিজলি চমকালো। আলোর কিছুটা অংশ হয়তো ঘরেও চলে আসলো। সেই আলোয় বিন্তাকে দেখে অন্যরকম মনে হলো। এইখানে আসার আগে সে বেশ সেজেগুছে এসেছে। আমের শরবতে দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে টেবিলে রাখার আগেই ঝুম করে বৃষ্টি নেমে গেল। বিন্তা উচ্ছ্বসিত হয়ে বাইরে গিয়ে বৃষ্টি ধরে আবার ফিরে আসলো। এসেই বললো- মারুফ ভাই, আমি নিজেই এইবার মাইনকা চিপায় পড়ে গেছি। কিছুক্ষণ পর এইচবিওতে ফাটাফাটি একটা মুভি শুরু হবে। গত কয়েকদিন ধরে প্রমো দেখাচ্ছে। নামটা ভুলে গেছি। মুভিটা মিস করতে যাচ্ছি। মেয়েটাকে শব্দ ব্যবহার বিষয়ক জ্ঞান দেওয়া বৃথা মনে করে হাই তুললাম। বললাম- কেন, রুম থেকে বের হয়ে চাইলেই তো নীচতলায় চলে যেতে পারো। বৃষ্টিতে তেমন ভিজবে না। বিন্তা তখন বললো- পাগল হয়েছেন আপনি, এই বৃষ্টিতে আমি নিচে যাবো কীভাবে? তাছাড়া যুবতী মেয়েদের হুটহাট বৃষ্টিতে ভেজা উচিত না। দেখা গেল পাশের বাসার ছাদ থেকে কেউ ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে থাকবে। আমি হেসে বললাম, তুমিতো পিচ্চি মেয়ে, মাত্র পড়ো ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে। এখনই নিজেকে যুবতী ভাবা শুরু করেছো? আপনি কিছুই জানেন না বলে বিন্তা চোখ মটকালো। কিন্তু মুভিটা দেখা উচিত। যেন মুভি দেখতে না পারার দহনে জ্বলছে মেয়েটি। আমি চুপ করে রইলাম। নিরবতা ভেঙে বিন্তা বললো- তারচেয়ে আপনার গল্প শুনি। বলেই চেয়ারে দুই পা তুলে বসে পড়লো বিন্তা। আমি মনে মনে বললাম- পড়েছো মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। বিন্তার সাথে যারা পরিচিত তারা জানেন, মেয়েটা যা বলে তা করে ছাড়ে। সুতরাং গল্প বলা বিষয়ক বিতর্ক সৃষ্টি করা অনর্থক। আমি গল্প বলার জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

একদিন হঠাৎ করেই আমার রুমে এসে বিন্তা প্রশ্ন করে বসলো- আচ্ছা আপনি কি কখনো প্রেম করেছেন?
হুম। একবার প্রেমে পড়েছিলাম। অনেকটা হুড়মুড়িয়ে পড়ার মতো।
আমার হুড়মুড়িয়ে পড়া শুনে বিন্তা চেয়ার টেনে আরেকটু কাছে এসে বসলো। আমিও দ্বিগুন আগ্রহ নিয়ে বলা শুরু করলাম- আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কারণে অকারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াই। বিকাল নামলেই টিএসসিতে চলে আসি, কোনো কোনো বিকালে হাকিম চত্বরের পাশের খালি জায়গায়। চুটিয়ে গল্প করি। গল্পের বেশিরভাগ বিষয়বস্তু সমকালীন সাহিত্য। ক্রিয়েটিভ কিছু হচ্ছে না এই আফসোসের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছি আমরা আড্ডাবাসীরা। এর মধ্যেই হঠাৎ করে আমি একটা উপন্যাস লিখে বসলাম। তাও যে সে উপন্যাস নয়, তরুণ বয়সের রোমান্টিক উপন্যাস। মনের মাধুরী মিশিয়ে গল্পের নায়িকাকে তৈরি করলাম। নাম দিলাম মৌমিতা। উপন্যাস আড্ডবাসীদের বেশ প্রশংসা কুড়ালো। তারপরের কয়েকবছর আমি আর নতুন কিছুই লিখতে পারলাম না। আড্ডার প্রত্যেকেই তখন একের পর এক ক্রিয়েটিভ লেখা লিখে যাচ্ছে। আমি আটকে থাকলাম সেই মৌমিতাতেই। নতুন গল্প যে লেখার চেষ্টা করিনি তা নয়। কিন্তু যতোবারই নায়িকা চরিত্র সৃষ্টি করতে যাই ততোবারই সামনে এসে ধরা দেয় মৌমিতা। অনেকটা অস্তিত্বে এসে ধরা দেওয়ার মতো। আমার সাহিত্য জগৎ মৌমিতাময় হয়ে গেল। নতুন কোন কবিতাও লেখা হলো না। যদিও মাঝেমধ্যেই রোমান্টিক কবিতার লাইন আমায় মাথায় ঘুরপাক খেত। কাগজে তা আশ্রয় পেত না। কিংবা হয়তো মৌমিতা চাইতো না কবিতাগুলো অন্য কেউ পড়ুক, অন্য কেউ শুনুক। সাহিত্য জগৎ থেকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবনকে গ্রাস করতে লাগলো মৌমি। একটা বিষয় বলা হয়নি, আমি তখন মৌমিতাকে আদর করে মৌমি নামে ডাকা শুরু করেছিলাম। ব্যক্তিগত জীবনের প্রেমিকা মনে করতে লাগলাম মৌমিকে। ক্যাম্পাসে হাতে হাত ধরে ঘুরি, ডাকসুর ক্যাফেতে খেতে বসলে পাশের চেয়ার মৌমির জন্য খালি রাখি। আমার এই পরিবর্তন দেখে সহপাঠীরা মাঝেমধ্যেই জিজ্ঞেস করে, কি রে নতুন প্রেমে পড়েছিস নাকি? প্রতিউত্তরে আমার মুখে হাসি ঝুলানো দেখে তারা রহস্যে ভোগে। নাম জিজ্ঞেস করতেই রহস্য বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলি- মৌমিতা। তারা তখন বায়না ধরে, ভাবির সাথে একদিন পরিচয় করিয়ে দিস। আমি মুচকি হেসে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাই। তবে দিন দিন অবস্থা ভয়াবহ হতে লাগলো। ক্যাম্পাসে কোন জুটিকে হাতে হাত ধরতে দেখলেই মনে হতো আমার সামনে মৌমিতার বাড়ানো হাত। আমাকে তখনই স্পর্শ করতে হবে। মাঝেমধ্যে মৌমিতার দেখা পেতে লাগলাম। মৌমিতায় আক্রান্ত ঘোর কাটলো বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে এসে। কার্জন হলের মাঠে এক বিকালে পরিচয় হলো এক উচ্ছ্বল তরুণীর সাথে। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী তরুণী। সে এক বিশাল কাহিনী। এখন অবশ্য তা বলতে ইচ্ছা করছে না।
বিন্তা এতোক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলো। আমি মনে মনে ধারণা করছিলাম সে একটি প্রশ্ন করবে, প্রশ্নটি কি তাও আমি ধারণা করতে পারছিলাম। হয়তো মনে করছেন আমার ইএসপি পাওয়ার বেশ ভালো। ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। মৌমিতার গল্প আমি যাকেই বলেছি সেই এই প্রশ্নটা করেছে। ‘মৌমিতার সাথে কি আপনার এখনো দেখা হয়, কথা হয়?’ বিন্তাও যথারীতি একই প্রশ্ন করলো। জবাবে আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। বিন্তা আর কথা না বাড়িয়ে নিচতলায় চলে গেল।

এভাবেই চলে যাচ্ছিল সময়। মাঝেমধ্যে বিন্তা খাবার নিয়ে চিলেকোঠায় আসতো, গল্প করতো, হাসাহাসি করতো, তারপর আবার চলে যেতো। এক বিকালে ছাঁদে বসেছিলাম। বিন্তা ছাঁদে উঠে কোন কথা না বলেই আমার পাশের চেয়ারটিতে বসে পড়লো। গম্ভীর মুখে বললো- আপনার জীবনের একটা ঘটনা শোনান।
গম্ভীর মুখে হঠাৎ এই গল্প শোনানোর আবদার শুনে ভিমড়ি খেলাম। বিন্তার স্বভাবের সাথে পূর্বপরিচিত বলে গাইগুঁই না করে গল্প বলা শুরু করলাম।
তখন আমার ফুফুর বিয়ে। গ্রামের বিয়ে। আশেপাশের বাড়ির সবাই চলে এসেছে বিয়েবাড়িতে। বাড়িভর্তি মানুষ। আত্বীয়স্বজনদের অনেকেই এসেছে। মেহেদি দেয়া হলো, গান হলো, একপ্রস্থ নাচও হলো। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধলো রাতে ঘুমাতে গিয়ে। রুম সংকটের কারণে একই বিছানায় অনেককে চাপাচাপি করে ঘুমাতে হবে। আমার এক মামাতো বোন ও আরেক খালাতো বোন তখন তাদের সাথে আমাকে থাকার প্রস্তাব দিয়ে বসলো। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মা তা অনুমোদন করে দিলেন। অন্য কোন ব্যাপার যেন মাথাতেই আনলেন না। মামাতো বোনটি আমার চেয়ে দুই বছরের বড় আর খালাতো বোন তিন বছরের বড়। অবশ্য একসাথে থাকতে চাওয়ার বিষয়টা খানিক পরে টের পেলাম। আমাকে হাসির গল্প শোনাতে হবে। সে না হয় হলো।
সমস্যাটা হলো গল্প শেষে ঘুমানোর পর। গল্প ভালোমতো শোনার স্বার্থে আমাকে দুইজনের মাঝখানে জায়গা করে দেওয়া হয়েছিল। ঘুমানোর সময় দেখা গেল যেদিকেই ফিরি সেদিকেই বোনেরা। মহা সমস্যায় পড়েছিলাম। বলেই হা হা করে হাসতে লাগলাম।
বিন্তা গম্ভীর হয়ে বললো- এই আপনার গল্প?
তুমি এতো সিরিয়াস মুডে কথা বলছো কেন? এইটা আমার ছোটবেলার কাহিনী। ছোটবেলায় এইরকম ঘটনা অনেকের জীবনেই ঘটে। কেন তোমার এমন কোন ঘটনা নেই?
কিছুক্ষণ থম মেরে থেকে বিন্তা বললো- হ্যাঁ আছে। একবার বাড়িতে কি একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমার বয়স তখন বারো। বাড়ি ভর্তি মানুষের কথা ভুলে গিয়ে নিজের রুমে গিয়ে কম্পিউটারে গেম খেলতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই রুমে ঢুকলো আমার চেয়ে সাত বছর বড় এক চাচাতো ভাই। ঢুকেই বললো, কিরে তুই একা একা এই রুমে বসে আছিস কেন? তারপর নিজেই নিজেই খানিকক্ষণ কি যেন ভাবলেন। আমার দিকে এগিয়ে এসে বুকের জামার ওপর হাত দিয়ে বললেন, তোর জামার ডিজাইনটা দারুণ, কে করে দিয়েছে রে? হাত ক্রমশ ভারী হচ্ছে। আমি ভয়ে জমে গেলাম। চিৎকার দিতে গিয়েও গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। এইটুকু বলে থেমে গেল বিন্তা। আমি অপেক্ষা করছি তখন সে বাকিটুকু বলা শুরু করবে। কিন্তু প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে সে বলা শুরু করলো-
আমার জীবনটাই কেমন যেন অগোছালো। কখনোই হিসাব রেখে চলতে পারি না। সামনে পিছে কিছু না ভেবেই এমন একজনকে ভালোবেসে ফেলেছি যার বয়স আমার চেয়ে দশ বছর বেশি। আমি নিজেও জানি না, আমার বাবা-মা এই সম্পর্ক মেনে নেবে কিনা। এমনকি বোকা মেয়েটা জানে না যাকে সে তীব্রভাবে ভালোবাসে সেই পুরুষটি তাকে ভালোবাসে কিনা। দশ বছরের পার্থক্যের কথা শুনে কিছুটা ধাক্কা খেলাম। আমার আর বিন্তার দশ বছরের বয়স পার্থক্যের ব্যাপারটি নিয়ে গত কয়েকমাসে আমরা বেশ কয়েকবার গল্পচ্ছলে আলাপ করেছি। তারপরেও ধাক্কা খাওয়ার ব্যাপারটি লুকিয়ে বললাম-সেই পুরুষটিকে তুমি জানিয়ে দাও।
জানলেই কি সে আমার অনুভূতি বুঝতে পারবে?
হয়তো বুঝতেও পারে, পরমুহূর্তে টু্ইস্ট করা জন্য বললাম, আবার নাও বুঝতে পারে।
আমি কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। বলেই বিন্তা আমার হাত ধরে ফেললো। চোখের নোনা জল এসে পড়লো আমার হাতের ওপর। শক্ত করে ধরা হাত যেন কিছুতেই ছাড়বে না। সেই মুহূর্তটিতেই উপলব্ধি করলাম, সহজ সরল এই মেয়েটিকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। আমি এক হাত দিয়ে বিন্তার চোখের জল মুছে দিতে লাগলাম। বিপত্তি বাঁধলো কিছুক্ষণ পর। বিন্তার মা ছাদে এসে দেখতে পেলেন একমাত্র মেয়ে গভীর মমতায় একজনের হাত ধরে বসে আছে। আবার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। রেহেনা আক্তার বেশ বুদ্ধিমতী। তিনি এদিকটায় আসলেন না। ছাদ থেকে নেমে গেলেন কিছুক্ষণ পর। বিন্তা টেরই পেল না স্বল্প সময়ের মধ্যে কতো ঘটনা ঘটে গেল!

এক সন্ধ্যায় আমার চিলেকোঠার বাসায় আসলেন বিন্তার মা রেহেনা বেগম। দীর্ঘ দিন এই বাসায় থাকছি। অথচ হাতে গোনা দুই একদিন তিনি আমার রুমে এসেছেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। নতুন একটা মুভি দেখছিলাম। তা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম। রেহেনা বেগম নরম গলায় বললেন- বাবা মারুফ, তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।
জ্বী খালাম্মা, বলেন।
না আসলে, তুমি তো অনেকদিন ধরেই এই বাসায় আছো। তুমি বেশ ভালোভাবে থাকছো, আমাদেরও কোন সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু বাবা, তোমাকে কয়েকদিনের মধ্যে বাসাটা ছেড়ে দিতে হবে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে?
ছাদের এই রুম দুইটা আমাদের দরকার হয়ে পড়েছে। এইটুকু বলেই তিনি আমতা আমতা করতে লাগলেন।
আমি তখন বললাম- খালাম্মা, সত্যি করেন বলেন তো কী হয়েছে?
বাবা তুমি তো বিন্তার বাবাকে চেনো না। উনি পারেন না এমন কোন কাজ নেই। সেদিন তোমার আর বিন্তার কথা ওনাকে বলেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ছেলে হিসেবে ভালো। ভালো রেজাল্ট। লেখালেখি করছো। এতোদিন ধরে আমাদের সাথে থাকছো। হয়তো মানুষটা তোমার আর বিন্তার সম্পর্ক মেনে নেবে। কিন্তু তোমাদের কথা শুনতেই সে ক্ষেপে গেছে। বলে দিয়েছে প্রয়োজনে মেয়েকে এবং তোমাকে খুন করে ফেলবে। বাবা প্লিজ, তুমি এই বাসা ছেড়ে চলে যাও। আর কখনোই বিন্তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করো না। তুমি রাজি থাকলে তোমার জন্য নতুন বাসা ঠিক করে দেওয়ার কথা বলেছেন বিন্তার বাবা। জিনিশপত্র নিয়ে যাওয়া নিয়েও তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। বিন্তার বাবাই সবকিছুর ব্যবস্থা করবেন।
এতোসব কথার বিপরীতে আমি কোন কথাই খুঁজে পেলাম না। তারপর বেশ কয়েকদিন বিন্তার দেখা মিললো না। অনেক চেষ্টা করে খবর বের করতে পারলাম, বিন্তা বেড়াতে তার ছোট মামার বাড়ি চলে গেছে। বেশ কয়েকদিন পরে ফিরবে।
এক সকালে বাসা থেকে বের হয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। ক্যালেন্ডারের হিসেবে মাসের ৩১ তারিখ। গেটেই দেখা হলো বিন্তার মার সাথে। অনেক অপ্রস্তুত হয়েই বললেন, তোমার সব জিনিশপত্র নতুন বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই নাও নতুন বাসার চাবি। বাসা ভাড়া এই বাসার মতোই। তবে রুম মোট তিনটা। একটা অনুরোধ, দয়া করে তুমি আমার মেয়ের সাথে কোন যোগাযোগ রাখবে না। জানি তোমার খুব কষ্ট হবে, আমার মেয়েটাও হয়তো কষ্ট পাবে। কিন্তু এর বাইরে আমার কিছুই করার নেই।
আমি মাথা নিচু করে থাকলাম। কেবল বললাম- খালাম্মা বিন্তার সাথে কি একটু কথা বলা যাবে? শেষবারের মতো?
বিন্তা তার ছোটমামার বাসা থেকে এখনো ফেরেনি, উত্তর আসলো।
তারপর দুজনেই চুপ করে গেলাম। সিড়ি ভেঙে উঠে গেলাম চিরপরিচিত চিলেকোঠায়। বাতি না জ্বালিয়েই কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকলাম। সন্ধ্যার পর যোগাযোগের সূত্র বিচ্ছিন্ন করে বেড়িয়ে পড়লাম রাস্তায়। হাঁটছি আর হাঁটছি। হাতে নতুন বাসার চাবি। মাঝরাতে বৃত্তাকার চাঁদ উঠছে। কী অদ্ভূত মায়াকাড়া আলো! দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, চন্দ্রাহত বালকের অভিমান বোঝে না চাঁদ। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29276617 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29276617 2010-11-23 18:53:57
কবিতায় দেখি বাংলার রূপ
১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন জীবনানন্দ দাশ। অবশ্য কবির স্ত্রী লাবণ্য দাশের মতে কবির জন্মসাল ১৮৯৮। কবির পিতা সত্যানন্দ দাশ, মাতা কবি কুসুম কুমারী দাশ। শৈশবেই জীবনানন্দের সাহিত্যিক প্রতিভা বিকশিত হতে থাকে। ধারণা করা হয়, মা কুসুম কুমারী দেবীর প্রভাবেই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯১৯ সালে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। ‘বর্ষা আবাহন’ নামের সেই কবিতাটি ব্রহ্মবাদী পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল।

জীবদ্দশায় কবির লেখা খুব বেশি কবিতা প্রকাশ পায়নি। সাড়ে আটশ’র বেশি কবিতা লিখেছেন তিনি। অথচ জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা কাব্যসংকলনে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। জীবনানন্দ দাশের জীবদ্দশায় মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কবির ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সে লেখা। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের নয় বছর পর ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পান্ডুলিপি’। এ কাব্যগন্থের সব কবিতাই ১৯২৬ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে রচিত। জীবনানন্দ দাশের বিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতা পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় (পৌষ ১৩৪২ সংখ্যা, ডিসেঃ ১৯৩৪/জানুঃ ১৯৩৫) প্রকাশিত হয়। ১৮ লাইনের এ কবিতাটি বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম কবিতার একটি হিসেবে বিবেচিত। ১৯৪২ সালে ‘বনলতা সেন’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তার। এটি জীবনানন্দের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ।

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর দেখা যায় কবির আরও বহু কবিতা অপ্রকাশিত। কবির মৃত্যুর পর আরও বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হয় কবির লেখা প্রবন্ধ, ছোটগল্প, উপন্যাস। কবির অন্যতম আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর পর। প্রকাশ সময় ১৯৫৭-এর আগস্ট। কবিভ্রাতা অশোকানন্দ দাশের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ‘রূপসী বাংলা’র রচনাকাল ১৯৩২। জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র কবিতাগুলো ছিল শিরোনামহীন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কাব্যগ্রন্থটির প্রতিটি কবিতার শিরোনাম প্রথম পঙ্ক্তির প্রথমাংশ থেকে। ধারণা করা হয়, রূপসী বাংলা কাব্যগ্রন্থের নামকরণ এবং উৎসর্গ অশোকানন্দের।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জের কাছে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হন জীবনানন্দ দাশ। সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কবির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন জীবনানন্দ দাশ। ১৯৫৪ সালের ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু হয়। কেউ কেউ ধারণা করেন, আত্মহত্যাস্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। প্রায়ই তিনি ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। জানা যায়, একশ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা মাত্র একটি। তিনি জীবনানন্দ দাশ।

কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নেই। আজও তিনি তার কবিতার মাধ্যমে ভাস্বর। প্রতিদিনই জীবনানন্দ তার হাজার হাজার পাঠকের কাছে ফিরে আসেন এবং তাদের সত্ত্বাকে কবিতার মাধ্যমে স্পর্শ করেন যান।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29259376 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29259376 2010-10-22 15:11:36
পলেস্তরা ঝরে পড়া সময়ের গল্প প্রায় রাতেই চারদিক নিরব হয়ে গেলে ভাবি লেখতে বসবো। নতুন গল্পের প্লট সাজাই মনে মনে। কখনো ভাবি যাপিত জীবনটাকে কিবোর্ডে গলিয়ে দিয়ে হাজির করলেও মন্দ হয় না। কখনো আবার মন বিষণ্ণ করা গান শুনে লিখে ফেলতে ইচ্ছে হয় কিছু একটা। কিন্তু চাইলেই যে সবকিছু হয়ে যায় না তার প্রমাণ গত কয়েক মাসে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

২.
এক সন্ধ্যাবেলা ঢাকায় এসে উপস্থিত হয়েছিলাম। গ্রাম আর মফস্বলে বেড়ে উঠা এই আমি অবাক হয়ে মানুষের আনাগোনা দেখেছিলাম সেদিন। তখন ঠিকমতো জানতামও না কোন রুটে কোন গাড়ি চলে কিংবা শেওড়াপাড়া যাওয়ার গাড়ির নাম্বার কতো। ১০-১১-১২ এর সময় বেশ আগে পেছনে ফেলে এসেছি। তারপর অন্য আরেক ঠিকানায় ঠাই হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিময় দিনগুলোর স্বাক্ষী এই চিলেকোঠাটি। রাত করে বাড়ি ফেরার স্বাক্ষী, অগোছালো জীবনযাপনের স্বাক্ষী।

৩.
চার বছর তিন মাস ধরে এই বাসাটিতে আছি। মনে হয় এই বাসার সব কিছুকেই আমি চিনি। ক্রমশ ঝরে পড়া দেয়ালের পলেস্তরা থেকে শুরু করে বারান্দার কোনায় ছোট্ট বাসায় স্থান করে নেওয়া পাখিটিকেও। এই বাসায় আর থাকবো না, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বিদায় চিলেকোঠার পাখি, বিদায় ঝরে পড়া পলেস্তরা।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29233278 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29233278 2010-09-01 00:48:18
চাইছি তোমার বন্ধুতা
বন্ধুত্ব কী

গত শতাব্দীর সেরা মানুষ হিসেবে বিবেচিত অ্যালবার্ট আইনস্টাইন বন্ধুত্বকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন পরিসরে। শিল্প ও বিজ্ঞানের সঙ্গে একই কাতারে দাড় করিয়ে দিয়েছেন বন্ধুত্বকে। তিনি বলেছেন, আমাদের নিরন্তর গবেষণায় প্রাপ্ত সবচেয়ে সৌন্দর্যময় জিনিসগুলো শিল্প, বিজ্ঞান আর বন্ধুত্ব।
অ্যারিস্টটল একবার প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন বন্ধুত্ব কি? তিনি খুব সহজ ভাষায় এর জবাব দিয়েছিলেন- বন্ধুত্ব হলো দুটি দেহে একটি আত্মা।

বন্ধুত্ব বলতে খুব সহজ ভাষায় পরস্পরের বোঝাপড়ার সম্পর্ক বোঝায়। তবে সব বোঝাপড়ার সম্পর্কই চূড়ান্ত পর্যায়ে বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে না। কারণ বন্ধুত্ব হতে হলে তার সঙ্গে আরো কিছু উপাদানের সংযোগ হতে হবে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমতা, সমবেদনা থাকতে হবে। তাহলেই সম্পর্ক বন্ধুত্বে গড়ায়। অনেকেই বন্ধুত্বের সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসাকে মিলিয়ে ফেলেন। কিন্তু এর কোনোটিই এক বিষয় নয়। বন্ধুত্ব আর ভালোবাসা নিয়ে একটি উপমা রয়েছে। বন্ধুত্ব যদি একটা ফুলের গাছ হয় তবে ভালোবাসা সেই গাছের সুন্দর একটা ফুল। বন্ধুত্বের পরশ গাছের সবুজ পাতার সজীবতায় আর ভালোবাসার আমেজে ফুলের নরম পাপড়ির পেলবতায়।
কবি লর্ড বায়রন ডানা বিহীন ভালোবাসাকে বলেছিলেন বন্ধুত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন- বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার অনেক তফাৎ আছে। কিন্তু ঝট করিয়া তফাৎ ধরা যায় না।
বন্ধুত্ব এমন একটি সম্পর্ক যার সীমানা অনেক বেশি প্রসারিত। মানুষে মানুষে যেমন বন্ধুত্ব হতে পারে ঠিক তেমনি সৃষ্টি জগতের অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গেও মানুষের বন্ধুত্ব হতে পারে।

বন্ধু কে?

পৃথিবীতে প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু বন্ধুত্ব কোনো বয়সের পরিসীমা মানে না। আর এ জন্যই বুঝি ৬৪ বছরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ১৭ বছরের রানুর মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। আবার মানুষে মানুষে বন্ধুত্ব হতে হবে এমনটাও নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একজন সেনার বন্ধু হয়েছিল তার পালিত কুকুর। সেনাটি মারা যাওয়ার পর কবরের ব্যবস্থা করেছিল তার সেই পোষা কুকুরটি। কিংবা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মুভি চরাচরের মতো কারো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে পাখির সঙ্গে। আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চতুষ্কোণ উপন্যাসের নায়ক রাজকুমার সম্পর্কের বহুমুখিতার মাঝে বন্ধুত্বের স্বরূপ খুজতে চেয়েছিল। সে হয়তো শেষ পর্যন্ত মরমীর মাঝে বন্ধুত্বের ভিন্ন স্বরূপ খুঁজে পেয়েছিল। আর এ জন্যই বুঝি তার উপলব্ধি হয়েছিল- সে যেন সকলকে রেহাই দেয় নাই, তাকেই সকলে পরিত্যাগ করিয়াছে, একমাত্র মরমী তাকে ছাঁটিয়া ফেলে নাই, আরো তার কাছে সরিয়া আসিয়াছে। প্রকৃত বন্ধুত্ব এমনই। বিপদের সময়টিতে বন্ধু আরো কাছে সরে আসে।

চাইছি তোমার বন্ধুতা

মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের একটা গান আছে।
হাত বাড়ালেই বন্ধু সবাই হয় না, বাড়ালে হাত বন্ধু পাওয়া যায় না।
প্রকৃত বন্ধু পাওয়া খুবই প্রতীক্ষাময়। নাগরিক জীবনের ব্যস্ত মানুষগুলো যেন বন্ধুত্বের আসল স্বরূপ খুজে পাচ্ছে না। হূমায়ুন আহমেদের লেখা রূপা গল্পটিতে লোকটি নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলার জন্য খুঁজে খুঁজে অপরিচিত লোক বের করে। তারপর সেই অপরিচিত মানুষটির কাছে তার জীবনের গল্পটি বলে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ত মানুষগুলোর অবস্থাও কিছুটা এ রকম। বন্ধুত্বের আশ্রয় তারা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্বের আশ্রয় তারা পাচ্ছে না। আর এ জন্যই মনের ভাবনা শেয়ার করতে খুজে খুজে অপরিচিত লোককে বের করছে।
প্রাচীন সময়ে গ্রিক এবং রোমানরা যেমন বুঝতে পেরেছিল ভালো সমাজ এবং ভালো জীবনের জন্য বন্ধুত্বের প্রয়োজন, বর্তমান সময়েও এ উপলব্ধিটাই প্রয়োজন। আর তাহলেই বন্ধুত্বের অবারিত প্রান্তর ধরে হেটে বেড়ানো যাবে। সুমন কবীরের একটা গান আছে- চাইছি তোমার বন্ধুতা

সেই গানের কথার মতোই আজ পৃথিবীময় চাইছি বন্ধুত্বা। শুভ বন্ধুত্ব দিবস

(ভেবেছিলাম বন্ধুত্ব দিবসে একটি পোস্ট দিব। কিন্তু অলসতার খাতিরে সেই লেখা আর হয়ে উঠে নি। তাই বিকল্প উপায় হিসেবে দুই বছরের পুরনো পোস্ট খুঁজে বের করে খানিকটা পরিমার্জন করেই পোস্ট করলাম।)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29213076 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29213076 2010-08-01 22:59:02
একজন গরীব স্ক্রীপ্ট রাইটারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা
আচ্ছা গল্পের শুরুটা কেমন হয়েছে? চমক লাগানো না? আরে ভাই, এতোই যদি চমক দিতে পারতাম তাহলে তো আমিও লেখক কিংবা স্ক্রিপ্ট রাইটার হয়ে যেতাম। <img src=" style="border:0;" /> কিন্তু আমি কি আর স্ক্রিপ্ট রাইটারের মতো করে হুট করে গল্প কিংবা চিত্রনাট্য নামায়া দিতে পারি? তারচেয়ে বরং অন্য আরেকটা বিষয়ের অবতারনা করি। ফিরে যাই সেই সময়ে, অর্থাৎ ২০০৮ সালে।

এখনকার সময়ের চেয়ে সেই সময় ব্লগে প্রচুর সময় দিতাম। তো মার্চের এক দিনে কিছুটা গোয়েন্দাগিরী করে আবিস্কার ব্লগের একজন গরীব স্ক্রিপ্ট রাইটার আউলা র জন্মদিন ৩০ মার্চ। বিরাট আবিস্কার মনে করে এক আবেগঘন জন্মদিনের পোস্ট দিয়ে বসলাম। কিন্তু পোস্ট দিয়েই বুঝলাম কি ভুলটাই না করেছি! উপলব্ধি হলো শার্লক হোমস তো দুরের কথা, গোয়েন্দাগিরীতে 'মি. গ' হওয়ারও যোগ্যতা নাই। <img src=" style="border:0;" />

তবে তারপর থেকে ব্লগার আউলার জন্মদিন নিয়ে বরাবরই সেইফসাইডে থাকি। অবশ্য পরে জেনে গেছি আউলার জন্মদিন ১৮ জুলাই। অবশ্য এই বিষয়ক সন্দেহ এখনও পুরোপুরি দুর হয় নি। এইজন্য আজকেও একবার আউলাকে ১৮ জুলাইয়ের জন্মদিন বিষয়ক প্রশ্ন করলাম। অপরপক্ষ থেকে উড়ে আসলো রহস্যময় উত্তর। 'তাই নাকি?'। রহস্য বুঝতে অক্ষম এই আমি আরেকবার পোস্ট দিতে বসে গেলাম। অবশ্য এইবার নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসেবে এলাকাবাসী জেরী আছেন। এলাকাবাসী নিশ্চয়ই আরেক এলাকাবাসীকে নিয়ে এই ভরা ব্লগে ফান করে বেড়াবেন না। (কিছুটা সাহস পাচ্ছি <img src=" style="border:0;" /> )

যাই হোক জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে তো সমস্যা নাই। শুভ জন্মদিন গরীব স্ক্রিপ্ট রাইটার আউলা । সুখে শান্তিতে কাটুক অনাগত সময়।

যারা চোখ কুচকে ভাবছেন গরীব স্ক্রিপ্ট রাইটার আবার কিতা? তাদের সদয় অবগতির জন্য এইখানে একখান ক্লিক করে দেখে নিতে অনুরোধ করছি। <img src=" style="border:0;" />

বিশেষ দ্রষ্টব্য : কেক্কুক খাওয়ার জন্য আমি নিজেই ওয়েটিং লিস্টে আছি। সুতরাং কেউ কেক্কুক খাওয়ার জন্য দ্বিতীয়, তৃতীয় কিংবা চতুর্থ দাবি জানালে আমার নামটাও তকলিফ করে লিষ্টে ইনক্লুড করে দিয়েন। <img src=" style="border:0;" />]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29202187 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29202187 2010-07-18 01:11:10
এবারের বিশ্বকাপের কিছু তথ্য
১০ নাম্বার জার্সীধারী এই খেলোয়াড় এবার দারুন খেলেছে। গোল্ডেন বল প্রাপক নির্ধারণে মিডিয়ার ভোটে সেই এগিয়ে। পেছনে ফেলেছেন নেদারল্যান্ডের ওয়েসলি স্নাইডার ও স্পেনের ডেভিড ভিয়াকে। সিলভার বল পেয়েছে স্নাইডার, ভিয়া পেয়েছে ব্রোঞ্জ বল।

যোগ্য খেলোয়াড়টিই এবারের গোল্ডেন বল পেল।

২. গোল্ডেন বুট পেয়েছে জার্মানির টমাস মুলার।

৫ করে গোল বেশ কয়েকজনের হওয়ায়, গোল সহায়তার ওপর নির্ভর করে এবারের গোল্ডেন বুট দিতে হলো। ৫ গোল ও ৩ গোল সহায়তা পুজি নিয়ে গোল্ডেন বুট পেয়েছে জার্মানির টমাস মুলার। ৫ গোল নিয়েই সিলভার বুট পেয়েছে স্পেনের ডেভিড ভিয়া। অন্যদিকে ব্রোঞ্জ বুট নেদারল্যান্ডের স্নাইডারের। ভিয়া, স্নাইডার ও ফোরলানের প্রত্যেকের ৫ টি করে গোল ও ১ টি করে গোল সহায়তা ছিল। কিন্তু খেলার সময়ের ওপর নির্ভর করে সিলভার ও ব্রোঞ্জ বুট দেওয়া হয়েছে। ভিয়া (৬৩৫ মিনিট) বাকি দুইজনের চেয়ে কম সময় খেলেছে, তাই সে সিলভার বুট পেয়েছে। অন্যদিকে ফোরলানের (৬৫৪ মিনিট) চেয়ে কম সময় খেলেছে স্নাইডার(৬৫২ মিনিট) । তাই সে ব্রোঞ্জ বুট পেয়েছে।

৩. সেরা তরুন খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছে জার্মানির টমাস মুলার।

৪. সেরা গোলরক্ষক হিসেবে গোল্ডেন গ্লাভ পেয়েছে স্পেনের ইকার ক্যাসিয়াস। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কারের নাম ছিল লেভ ইয়াসিন অ্যাওয়ার্ড। এবারই সেরা গোলরক্ষককে পুরস্কার দেওয়া হলো গোল্ডেন গ্লাভ নামে।

৫. ফেয়ার প্লে টফি পেয়েছে স্পেন।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29197704 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29197704 2010-07-12 04:55:08
নারীর প্রতি নিপীড়ন : হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনামূলক রায় ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা
এবার আসা যাক, হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনামূলক রায় প্রসঙ্গে। রায়টি মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি হয়রানিমূলক আচরন প্রতিরোধকে লক্ষ্য করে দেওয়া। নির্দেশনামূলক রায়ে এর প্রচারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এর ব্যাপক প্রচার হয় নি। যার ফলে, রায়টি নিয়ে প্রচুর মিথ ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ বেশিরভাগ লোকই সঠিকভাবে জানে না রায়টিতে কি রয়েছে। এমনকি ইভ টিজিংয়ের সংঙা নিয়েও নানা ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত। নির্দেশনা রায়টি সম্পর্কে বলতে হলে রায়টি পড়তে হবে, জানতে হবে। না পড়ে, না জেনে মনের ইচ্ছা মতো মন্তব্য করা খুব সহজ। পোস্টটির সাথে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনামূলক রায়ের মূল বিষয়ের বাংলা ভাষান্তর প্রদান করা হলো। আগ্রহীরা দেখতে পারেন।


যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনামূলক রায়
মূল বিষয়ের বাংলা ভাষান্তর

লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য:

ক) যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা; খ) যৌন নির্যাতনের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা; গ) যৌন নির্যাতন শাস্তিযোগ্য অপরাধ—এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা
সংজ্ঞা:
যৌন হয়রানি বলতে বোঝায়: ক) অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন আবেদনমূলক আচরণ (সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতে) যেমন: শারীরিক স্পর্শ বা এ ধরনের প্রচেষ্টা। খ) প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা। গ) যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি। ঘ) যৌন সুযোগলাভের জন্য অবৈধ আবেদন। ঙ) পর্নোগ্রাফি দেখানো। চ) যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি। ছ) অশালীন ভঙ্গি, যৌন নির্যাতনমূলক ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, কাউকে অনুসরণ করা বা পেছন পেছন যাওয়া, যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা বা উপহাস করা। জ) চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিশ বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরি, শ্রেণীকক্ষ, বাথরুমের দেয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কোনো কিছু লেখা। ঝ) ব্ল্যাকমেইল অথবা চরিত্র লঙ্ঘনের উদ্দেশ্যে স্থির বা চলমান চিত্র ধারণ করা। ঞ) যৌননিপীড়ন বা হয়রানির কারণে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষাগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হওয়া। ট) প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেওয়া বা চাপ প্রয়োগ করা। ঠ) ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনে চেষ্টা করা।

সচেতনতা এবং জনমত সৃষ্টি:

ক) সরকারি-বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডারবৈষম্য, যৌন হয়রানি এবং নির্যাতননিরোধ ও নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে নিয়োগদাতা/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সচেতনতামূলক প্রকাশনার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে। এ বিষয়ে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি শিক্ষাবর্ষের প্রারম্ভে শ্রেণীর কাজ শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের এবং সব কর্মক্ষেত্রে মাসিক এবং ষাণ্মাসিক ওরিয়েন্টেশন ব্যবস্থা রাখতে হবে। খ) প্রয়োজন হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য অবশ্যই উপযুক্ত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। গ) সংবিধানে উল্লিখিত অনুচ্ছেদ এবং সংবিধিবদ্ধ আইনে নারী শিক্ষার্থী এবং কর্মে নিয়োজিত নারীদের যে অধিকারের বিষয়ে উল্লেখ করা আছে, তা সহজ ভাষায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। ঘ) আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের নিয়োগকর্তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং কার্যকরী মতবিনিময় করবেন। ঙ) সংবিধানে বর্ণিত জেন্ডারসমতা এবং যৌন অপরাধ-সম্পর্কিত দিক-নির্দেশনাটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করতে হবে। চ) সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংবিধানে উল্লিখিত মৌলিক অধিকার-সম্পর্কিত নিশ্চয়তাগুলো প্রচার করতে হবে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:

সব নিয়োগকর্তা এবং কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ যৌন হয়রানি প্রতিরোধের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে, অন্যান্য পদক্ষেপ ছাড়াও তারা নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
ক) নির্দেশনায় উল্লিখিত ৪ ধারা অনুযায়ী যৌন হয়রানি এবং যৌন নির্যাতনের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে, তা কার্যকরভাবে প্রচার ও প্রকাশ করা। খ) যৌন হয়রানিসংক্রান্ত যেসব আইন রয়েছে এবং আইনে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের জন্য যেসব শাস্তির উল্লেখ রয়েছে, তা ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। গ) কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষাক্ষেত্রের পরিবেশ নারীর প্রতি যেন বৈরী না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মজীবী মহিলা ও নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ বিশ্বাস ও আস্থা গড়ে তুলতে হবে যে, তারা তাদের পুরুষ সহকর্মী ও সহপাঠীদের তুলনায় অসুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে না।

শৃঙ্খলাবিধি কার্যক্রম:

এ নির্দেশনায় উল্লিখিত ৪ ধারা অনুযায়ী যৌন হয়রানি এবং যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে যথাযথ শৃঙ্খলাবিধি প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে।
অভিযোগ:
যেসব আচরণ এই গাইডলাইনের অন্তর্ভুক্ত নয়, এমন অশোভন আচরণ সম্পর্কে যদি অপরাধের শিকার নারী অভিযোগ করতে চায়, তা গ্রহণ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং তা প্রতিকারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ক) অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে হবে। খ) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। গ) অপরাধের শিকার নিজে অথবা বন্ধু বা চিঠি বা আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। ঘ) অভিযোগকারী ব্যক্তি স্বতন্ত্রভাবে অভিযোগ কমিটির নারী সদস্যের কাছে অভিযোগ জানাতে পারে। ঙ) অভিযোগ কমিটির কাছে অভিযোগ দায়ের করার জন্য ধারা ৯ অনুসরণ করতে হবে।

অভিযোগ গ্রহণকারী কমিটি:

(ক) অভিযোগ গ্রহণের জন্য, তদন্ত পরিচালনার জন্য এবং সুপারিশ করার জন্য সরকারি-বেসরকারি সব কর্মক্ষেত্রে এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগ গ্রহণের জন্য কমিটি গঠন করবে। (খ) কমপক্ষে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হবে, যার বেশির ভাগ সদস্য হবেন নারী। সম্ভব হলে কমিটির প্রধান হবেন নারী। (গ) কমিটির দুজন সদস্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে হবে, যে প্রতিষ্ঠান জেন্ডার এবং যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করে। (ঘ) অভিযোগ কমিটি সরকারের কাছে এ নীতিমালা বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বাত্সরিক অভিযোগ প্রতিবেদন পেশ করবে।

অভিযোগ কমিটির পরিচালনা প্রণালী:

সাধারণভাবে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ কমিটির কাছে অভিযোগ পেশ করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের জন্য কমিটি: (ক) লঘু হয়রানির ক্ষেত্রে যদি সম্ভব হয়, অভিযোগ কমিটি সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের সম্মতি নিয়ে অভিযোগ খারিজের ব্যবস্থা নেবে এবং এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। (খ) অন্য সব ক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটি বিষয়টি তদন্ত করবে। (গ) অভিযোগ কমিটি ডাকের মাধ্যমে উভয় পক্ষকে এবং সাক্ষীদের রেজিস্ট্রার বিজ্ঞাপন প্রেরণ, শুনানি পরিচালনা, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং সব সংশ্লিষ্ট দলিল পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা রাখবে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে মৌখিক প্রমাণ ছাড়াও অবস্থানগত প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ অভিযোগ কমিটির কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট অফিস সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানে বাধ্য থাকবে। অভিযোগ কমিটি অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখবে। অভিযোগকারীর সাক্ষ্য গ্রহণের সময় এমন কোনো প্রশ্ন বা আচরণ করা হবে না, যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে নীচ, অপমানজনক এবং হয়রানিমূলক হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ ক্যামেরায় ধারণ করতে হবে। অভিযোগকারী যদি অভিযোগ তুলে নিতে চায় বা তদন্ত বন্ধের দাবি জানায়, তাহলে এর কারণ তদন্ত করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। অভিযোগ কমিটি ৩০ দিনের মধ্যে তাদের সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রদান করবে। প্রয়োজনে এ সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস থেকে ৬০ কার্যদিবসে বাড়ানো যাবে।
যদি এটা প্রমাণিত হয় যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জন্য সুপারিশ করা হবে। অভিযোগ কমিটির বেশির ভাগ সদস্য যে রায় দেবে, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
শাস্তি:

সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে (ছাত্র ব্যতিরেকে) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারে এবং ছাত্রদের ক্ষেত্রে অভিযোগ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তাদের ক্লাস করা থেকে বিরত রাখতে পারে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে এবং সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলাবিধি অনুসারে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং যদি ওই অভিযোগ দণ্ডবিধির যেকোনো ধারা অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কোর্ট বা ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেবে।

আমরা নির্দেশ দিচ্ছি যে, এই দিকনির্দেশনা সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে অনুসরণ এবং পালন করা হবে, যত দিন পর্যন্ত না এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত আইন প্রণয়ন হয়।

কৃতজ্ঞতা : বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29188183 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29188183 2010-06-29 22:07:28
চিলেকোঠার বারান্দায় যখন বৃষ্টি নামে
অনেকদিন আগে একটা গল্প পড়েছিলাম। গল্পের চরিত্রটি অপেক্ষায় থাকে। সবকিছু আগের মতো ঠিকঠাক হয়ে যাবে। পুরনো বন্ধুদের সাথে জমিয়ে আড্ডা হবে। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আমার অবস্থা হয়েছে গল্পের সেই চরিত্রটির মতো। হয়তো লগইন করে অপেক্ষা করি সবকিছু আগের মতো আগের মতো হয়ে যাবে। পুরনো বন্ধুদের সাথে জমিয়ে ব্লগে রাত বিরাতের আড্ডা হবে। কিন্তু অবধারিতভাবে গল্পের মতোই অপেক্ষা আর অপেক্ষা।

মন খারাপ করা কথা রেখে পুরনো একটা লেখা শেয়ার করি। অনেকটা হঠাৎ করে লেখা, কিন্তু আমার কাছে লেখাটি খুবই প্রিয়। নিজের লেখা প্রিয় হয়ে গেলে কি আর করবো!

স্বপ্নগুলো তোমার মতো

চিলেকোঠার ছোট্ট বারান্দায় পা মুড়ে বসে খোলা আকাশের দিকে তাকাই। এক চিলতে নীল মুহুর্তেই আমায় ছুঁয়ে দিয়ে যায় । নীল হওয়া হৃদয়ে নীলপরী হয়ে ভর করে একটি স্বত্তা। অস্তিত্বে ধরা দেয়, স্পর্শ দেয়। ক্রমশ একটি চরিত্র হয়ে উঠে। সেই চরিত্র মায়ার মাদকতা ভুলিয়ে দেয় অনেক জাগতিক আয়োজনকে। বেঁচে থাকার অভিনয় নিয়ে যে জীবন তা মুহুর্তেই আনন্দময় হয়ে উঠে । তখনই উপলব্ধি হয় যদি মৃত্যু আলিঙ্গন করে তবে পাওয়া হবে না তোমাকে, তোমার সঙ্গে জাগা হবে না খোলা আকাশের নিচে জ্যোসনাস্নাত রাত। পাশের গজিয়ে উঠা উচু ভবনের এক চিলতে বারান্দা থেকে চোখ চলে যায় আকাশের দিকে।

অভিমানে তোমার চলে যাওয়া
তোমার জন্য সব ভুলে থাকা
জীবন মানে বাঁচার অভিনয়
মৃত্যু মানে তোমায় না পাওয়ার ভয়

তুমি চরিত্র রং, রূপ বদলে দেয় মনে মনে। মন থেকে মনে, নিউরনে শিহরন জাগিয়ে প্রহর ভাঙে। অপেক্ষা কিংবা প্রতীক্ষার। কতোকিছুইতো দেখি, কতো রূপ, বর্ণ, গন্ধ। সব কিছুতেই তোমার প্রচ্ছন্ন ছায়া আমায় তাড়িত করে। তোমার মতো আর কোন কিছুকেই ভালো লাগে না।

কাচের দেয়ার ভাঙার মতো
তোমায় ভাঙি ইচ্ছেমতো
আমার কেন ভালো লাগে না
কোন কিছু তোমার মতো

না দেখা সৌন্দর্য্য যা উপলব্ধির শিয়রে মাথা পেতে দেয়, তা অস্তিত্বের কাছে অপ্রকাশিত। এইসব অপ্রকাশিত বোধগুলো আলোকিত হয়ে তোমাকে চিনিয়ে দেয়, বাতাসের মিহি গন্ধের মতো তোমার গন্ধকে মিশিয়ে দেয়। তুমিতে-তোমাতে আমার আটপৌরে স্বপ্নগুলোও তোমার মতো হয়ে গেছে।

যখন তুমি একা থাকো
আগুন জ্বলে আলোর মতো
নিজের কাছে লুকিয়ে রাখি
স্বপ্নগুলো তোমার মতো

অবচেতন সত্ত্বার সাথে কথা হয়, হাসি ঠাট্টা হয়, কথা হয় কাটাকাটি। চেতন সত্ত্বা তখন ঠোট বাকিয়ে বিদ্রুপ করতে চায়। শরতের মেঘের মতো গাঢ় হয়ে উঠা অভিমানগুলোকে তখন ঘুরে বেড়াতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে নীড় খুঁজতে থাকে। নদীটি তবে ঠাই দেয় শেষে! শুকিয়ে যাওয়া নদীপথ এগিয়ে চলে। চলতে চলতে নাগরিক রাস্তায় ইটপাথরে ঠুকোঠুকি লাগে। পথ বাড়তে বাড়তে বারান্দায় গিয়ে থামে। সেই চিলেকোঠার বারান্দা। বৃষ্টিটা তখনই নামে।

আমার শরীরজুড়ে বৃষ্টি নামে
অভিমানের নদীর তীরে
শুধু তোমায় বলতে ভালোবাসি
আমি বারেবার আসবো ফিরে

পুনশ্চ : আনিলার একটি গান আছে ‘স্বপ্নগুলো তোমার মতো’ নামে। গানটি শুনে যে অনুভুতি হলো তা ধরে রাখার প্রয়াস চালালাম। সবারই মনে হয় একটি করে কল্পিত তুমি চরিত্র থাকে। জাগতিক স্বপ্নের অনেকটা অংশজুড়ে সেই তুমি চরিত্রের বসবাস।
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29164671 http://www.somewhereinblog.net/blog/tanmoytahsanblog/29164671 2010-05-29 02:18:54