তপন বাগচী
ছোটবেলায় জানতাম মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। এটি একধরনের ছেঁদো কথা। বড় হয়ে দেখেছি নায়িকা কিংবা শোবিজের মেয়েরা জন্মতারিখ বললেও জন্মসাল বলে না। অর্থাৎ আংশিক হলেও সত্য যে মেয়েরা বয়স লুকাতে চায়। লেখালেখি করতে এসে শুনেছি সম্পাদকরা পত্রিকার সার্কুলেশন বলে না। কেউ যদি আকারে-ইঙ্গিতে বলেও, তার সঙ্গে সত্যের ফারাক থাকে। অডিট ব্যুরোর অব সার্কুলেশন (এবিসি) যে প্রচারসংখ্যার তালিকা বানায়, তাতেও ঘাপলা থাকে বলে শুনেছি। বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তির সুবিধার জন্য অনেক অখ্যাত পত্রিকাও তালিকাপ্রণেতাদের ম্যানেজ করে নিজেদের সার্কুলেশন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় প্রদর্শন করে। পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নিরূপণ করা একটু কঠিন হলেও মুদ্রণসংখ্যা তো সম্পাদকের অজানা নয়। তাঁর অফিসিয়ালি নির্দেশ ছাড়া তো এক কপি বেশি ছাপার সুযোগ নেই প্রেস ম্যানেজারের। তাই অডিট ব্যুরো নয় সম্পাদকই ভালো জানেন, তাঁর পত্রিকার মুদ্রণসংখ্যা কত। প্রচারসংখ্যা তার চেয়ে সামান্য কম হবে- এই যা! কারণ পত্রিকার সকল কপি হয়তো বিক্রি হয় না। অনেক কপিই ফেরত আসতে পারে। পত্রিকার ছাপার ব্যাপারটা এত স্বচ্ছ হওয়া সত্ত্বেও পত্রিকার প্রচারসংখ্যা নিয়ে অনেক বিভ্রান্তির জন্ম হয়। সম্পাদকেরা বা পত্রিকার মালিকেরা পত্রিকার প্রচারসংখ্যা বাড়িয়ে বললে মিথ্যে বলা হবে ভেবে হয়তো এই তথ্যটুকু এড়িয়ে যান। তাই একসময় শোনা যায়- ‘পত্রিকার সার্কুলেশনের খবর জিজ্ঞেস করতে নেই।’ সত্য গোপানের এই সাদৃশ্য থেকে প্রবাদের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে একটি উক্তিÑ ‘পত্রিার সার্কুলেশন আর মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই।’
০৪.০৮.০৮ তােিরখ দৈনিক আমাদের পত্রিকার সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান সেই প্রবাদটিকে বদলে দিলেন। নিজের পত্রিকার সার্কুলেশনের খবর তিনি স্বনামে স্বপত্রিকায় লিখে সকলকে জানিয়ে দিলেন। ‘দৈনিক আমাদের সময়ের সার্কুলেশনে নতুন মাইলফলক’ নামের একটি নিবন্ধের মাধ্যমে তিনি হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলেন।
এই পত্রিকাটির জন্মলগ্নে আমি যুক্ত ছিলাম। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে ষঢ়যন্ত্রের শিকার হয়ে চাকরি ছেড়ে আমি যখন চুপচাপ বাসায় বসে আছি, তখন নাঈমুল ইসলাম খান আমাকে খবর দিয়ে বাসায় নিয়ে তাঁর কাগজে কাজ করতে বলেন। তাঁর প্রস্তাবটি ছিল এমন, ‘তোমার মতো একটা ছেলের চাকরি যাওয়ার সংবাদ শুনে আমি খুব লজ্জা পেয়েছি। আমার তেমন কিছু করার নেই। আমার স্বপ্নের মধ্যে একটি পত্রিকা আছে। এখনো ডিক্লারেশন পাই নাই। তুমি আগের চাকরিতে যা পেতে তাই নিও, কাল থেকে আমার বিসিডিজেসি অফিসে বসবে।’ আমি নাঈমভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ এই দুর্দিনে এরকম সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার জন্য। পরের দিন থেকে অফিস করছি। ডিক্লারেশন নেই, সেই পত্রিকার পরিকল্পনা করছি। সেই সময় নাঈমভাই বলতেন, আমার পত্রিকা আমি হাইয়েস্ট সার্কুলেটেড বানাতে চাই না। প্রথম দিকের ৫-৭টা পত্রিকার পরে থাকলেই চলবে। আমি চাই নতুন কনটেন্ট, নতুন পাঠক। নামমাত্র মূল্যে পত্রিকা দেব। ৭০০ শব্দের স্টোরি এলে নাঈমভাই লিখে দিতেন, ‘৭৫ শব্দ’। তখন সম্পাদনার কোনো ব্যাকরণই কাজে লাগত না। পুরোটা পড়ে নতুন করে লিখতাম। এভাবে আকারে ছোট কিন্তু কোনো তথ্যই বাদ না দিয়ে আমরা রিপোর্ট প্রকাশের চেষ্টা করতাম। সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আনন্দে শিহরিত হই! আমাদের সেই ‘আমাদের সময়’ আজ চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে। সম্পাদক তো এটি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন নতুন কাগজ, নতুন পাঠক; তিনি চেয়েছিলেন পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। কিন্তু এত কম পুঁজি নিয়ে এত কম সময়ে এভাবে উঠে আসার কৃতিত্বে আমরা একসময়ের সহযাত্রী এবং বর্তমানের পাঠকেরা অভিনন্দন না জানিয়ে পারি না। দীর্ঘদিনে প্রচলিত সংস্কার ভেঙে সম্পাদক তাঁর প্রচারসংখ্যা বলে দিলেন-- এর জন্যেও ধন্যবাদ। তবে নিজের কথা নিজের লেখায় প্রকাশ করাকে কেউ ‘নিজের ঢোল নিজে পোটানোর’ অভিযোগে সমালোচনা করতে পারে। নিজের কথা নিজের উদ্যোগে অন্যের মুখ দিয়ে বলানোর কৌশল বেশ গ্রহণযোগ্য হলেও তার মধ্যে শঠতা থাকে, কপটতা থাকে-- নাঈমুল ইসলাম খান সেটি করেননি বলে আবারো ধন্যবাদ। জয়তু আমদের সময়ের ‘আমাদের সময়'।
ড. তপন বাগচী : কবি ও সাংবাদিক। দৈনিক আমাদের সময়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সহকারী সম্পাদক। বর্তমানে একুশে টেলিভিশনে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

