কীর্তিমানদের জন্য স্মৃতিরক্ষার সাধু উদ্যোগ
সরকার বেশ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিকের নামে স্মৃতিকেন্দ্র , জাদুঘর ও গ্রন্থাগার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জেনে ভালো লাগছ্ েউদ্যোগটি যে গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি যে সরকারের সংস্কৃতিপ্রীতির স্মারক, তা লেখাই বাহুল্য। জেনেছি, মাইকেল মধুসূদন (কেশবপুর, যশোর), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কুষ্টিয়া ও খুলনা), মীর মশাররফ হোসেন (কুষ্টিয়া), কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (কুমারখালী, কুষ্টিয়া), হাসন রাজা (সুনামগঞ্জ), সুকান্ত ভট্টাচার্য (কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ), ডা. লুৎফর রহমান (মাগুরা), জীবননান্দ দাশ (বরিশাল), ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান (নবীনগর, ব্রহ্মণবাড়িয়া), শামসুর রাহমান (নরসিংদী) প্রমুখ কবি ও শিল্পীর নামে তাঁদের জন্ম অথবা স্মৃতিধন্য স্থানে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এর জন্য অর্থিক বরাদ্ধও মঞ্জুর হয়েছে। প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণও করা হবে বলে শুনেছি। এই উদ্যোগকে সাধু বলতে চাই।
ভেবে আনন্দ পাচ্ছি যে, আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতি পূর্বাধিকার এই সকল মনীষীতুল্য মানুষের স্মৃতি ও অধ্যয়নের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়তো হবে। পাশাপাশি জানতে ইচ্ছে করে, এর আগে বাস্তবায়নাধীন মীর মশাররফ স্মৃতিকেন্দ্র এবং বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের খবর কী! প্রকল্পের মেয়াদ তো শেষ হয়েছে বহু আগেই। এই দুটি স্মৃতিকেন্দ্রের জন্যও বরাদ্দ ছিল, জনবল নিয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু তা কি আদৌ চালু হয়েছে এতদিনে? এই দুটি প্রকল্পের মতো শ্লথগতি হলে তো এই নতুন প্রকল্পগুলো হতাশার আলো ছড়াবে। বরং আমরা ভাবতে পারি যে, আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা এই নতুন প্রকল্পগুলোর আশু বাস্তবায়ন চাই।
আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, নড়াইলে চিত্রানদীর পাড়ে বাস্তবায়নাধীন সুলতান কমপ্লেক্স-এর সর্বশেষ অবস্থা কী? কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়লাম যে এটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সুলতানের মেয় নীহারবালা তাঁর জন্য বরাদ্ধ অর্থ ঠিকমতো পাচ্ছেন না। দুর্বিষহ হয়ে ঊঠেছে তাঁর জীবনযাপন। সুলতান কমপ্লেক্ষ খোলার লোকই নাকি এখন নাই। নিযুক্ত লোকবল রক্ষার কোনো উদ্যোগ সেখানে নেই। আমরা রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্র, মশাররফ স্মৃতিকেন্দ্র ও সুলতান কমপ্লেক্সের সুষ্ঠু সমাপনী প্রত্যাশা করতে পারি।
সরকার যে কজন শিল্পী-সাহিত্যিকের স্মৃতি সংরক্ষেণ ব্যবস্থা নিয়েছেন তা নিয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তাঁরা যাথাযোগ্য ব্যক্তি। আমরা মনে করি এর পাশাপশি আরো কয়েকটি স্থানকে বেছে নেয়া যেত। যেমন বাংলা কবিগানের প্রবাদপুরুষ রমেশ শীল (চট্টগ্রাম) ও বিজয় সরকার (ডুমদি, নড়াইল), বাংলা যাত্রাগানের প্রবাদপুরুষ মুকুন্দদাস (বরিশাল), উপেন্দ্র-সুকুমার-সত্যজিত রায় (কিশোরগঞ্জ), বাংলা চলচ্চিত্রের জনক হীরালাল সেন (মানিকগঞ্জ), সাহিত্যিক সত্যেন সেন (বিক্রমপুর), কবি কামিনী রায় (বরিশাল), যাত্রাসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস (জাবরা, মানিকগঞ্জ), কবি ও নারীনেত্রী সুফিয়া কামাল (বরিশাল), মনীষী আহমদ শরীফ (চট্টগ্রাম), কবি আহসন হাবীব (পিরোজপুর), কবি হুমায়ুন আজাদ (বিক্রমপুর), চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন (রংপুর) প্রমুখের স্মৃতিরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নেয়া যেতে পারে। এছাড়া যেসকল বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিকের বাড়ি বেদখল হয়ে যাচ্ছে, তা রক্ষা করাটাও জরুরি বলে মনে করি। দার্শনিক গোবিন্দচন্দ্র দেবের বাড়িটি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। কামিনী রায়ের বাড়িটিও আর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। একদিন দেখতে গিয়ে ফিরে এসেছি।
সরকারের এই উদ্যোগ আমরা স্বাগত জানাই। পাশাপশি আরও নতুন ক্ষেত্র চিহ্নত করার তাগিদ বোধ করি। আমার তাৎক্ষণিক স্মরণে আসা নামের পাশে হয়তো যুক্ত হবে আরো অনেক গৌরবজনক নাম। সকলের স্মৃতিরক্ষায় আমরা সচেষ্ট হলে, তাঁদের প্রতি অলক্ষ্য ঋণের বোঝা কিছুটা হলেও হালকা হবে। বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা কিছুটা দায়িত্বের পরিচয় দিতে পারব।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৮ দুপুর ১:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



