আমার বাবা তাঁর বয়স যখন ২৬ দিন মাকে হারিয়েছেন এবং তিনি তখন দাদুর বুকেই ঘুমাচ্ছিলেন, ৬ বছর বয়েসে বাবাকে হারান। এরপর তিনি জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন, তিনি সবসময় বলেন, "বাংলাদেশের মানুষ আমার মত কষ্ট করলে বাংলাদেশ অন্যরকম দেশ হবে।" তিনি আমাকে প্রায় বলেন আমার দাদা দাদুদের গল্প যা তিনি অন্যের মুখে শুনেছেন। উনি একবার বলেছিলেন, "আমি মানসিক ভাবে যত কষ্ট পেয়েছি তা নিয়ে একটি বই লেখা যাবে, আমার ইচ্ছা করে বসে বসে তোকে দিয়ে লেখাই"। পরে একবার চট্টগ্রামের একটা দৈনিকে তাঁকে নিয়ে লেখা আসে যা তাঁর জীবনভিত্তিক। আমার সেদিন খুব ভাল লেগেছিল।
আমাদের জীবনে আমার বাবার ভূমিকা মায়ের মত, প্রতিটা নিঃশ্বাস উনার আদর মাখা। আমার বাবা একজন খুব ব্যাস্ত মানুষ তবে এখন চেষ্টা করেন আমাদের সময় দিতে। তিনি সকালে যেতেন রাতে ফিরতেন, ফিরেই আমাদের নিয়ে বসতেন আর সারাদিনের সব কথা শুনতেন।
বাসার পিছনে ছিল বড় একটা বাগান যেখানে আমাদের সবার আলাদা একটি করে মিনি বাগান ছিল, বাগানে যেতাম বাবা মার সাথে। মা বলতেন আদর করতে, তাই গাছে পানি দিয়ে পাতা ফুলে আদর করে দিতে হত। এটা এখনও আমার মাঝে কাজ করে।
বাবা সবসময় একটা জিনিষ চেয়েছেন আমাদের যেন বর্ণিল একটা জীবন হয়। কোন দুঃখ কষ্ট আমাদের স্পর্শ না করে..
তিনি একদিকে চাইতেন আমরা যেন সব কাজ করতে পারি তাই সাইকেল, গাড়ি থেকে শুরু করে সাঁতার কাটা শিখতে হয়েছিল, খুব ভোরে ম্যারাথন এর মত করে হাঁটতে হত। তবে এটা ছিল উনাদের বিপরীতমুখি চাওয়া, এ নিয়ে আমার মনে কিছু দুঃখ আছে। একবার স্কুলের বন্ধুরা কেক বানানো শিখবে, আমি বাবাকে এটা বলতেই উনি হাসতে হাসতে বললেন আমার মেয়েকে কেক বানানো শিখতে হবে না এমনি করে অনেক কিছু শিখতে চাওয়া ও করতে চাওয়া নাকচ। আসলে উনারা চাইতেন আমরা যেন বাইরে তেমন না যাই, এবং একটা নিদিষ্ট গন্ডিতে থাকি। এমন করে কোথাও যেতে পারিনি, অনেক ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গিয়েছে।
আমার কোমল বাবা শীতের দিনে খুব ভোরে আমাদের নিয়ে হাঁটতে বের হতেন আর গল্প শুনাতেন উনার রস চুরি করে খাবার গল্প, আবার কিভাবে হাড়িতে পানি দিয়ে তা যথাস্থানে রাখতেন। বাবা খুব অত্যাচার করেন খাবার নিয়ে, এর মাঝে একটা হল কাঁচা রস খাওয়ানো।
আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় হাম হয়, আমার মা কিছুক্ষন পরপর আমার পড়ার টেবিল ঘুরে যাচ্ছিলেন কিন্তু তিনিও দেখেন নাই, বাবা ফেরার সাথে সাথেই আমাকে দেখে অবাক ! আমি এখনো বাবার সেই দুঃখমাখা চেহারা ভুলতে পারিনা। তিনি আমাদের হাসিমুখ দেখতে চান সবসময়, আর আমরা একাজটা খুব ভাল পারি।
তিনি অনেক আবেগপ্রবণ হলেও কোনদিন আবেগকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি যেমন কোমল তার চেয়েও বেশি কঠোর। আমার ভাইকে একবার অপহরণ করা হয়, সেবার দেখেছি তাঁর রূপ। পরে আমার ভাই যখন ফিরে আসে তিনি তাকে বুকে নেন নাই... কথা বলেন নাই একদিন। আমাদের সবাই বাবার উপর খুব রেগে ছিলাম, বাবা তখন একা হয়ে গিয়েছিলেন এখন তা ভাবলে খুব খারাপ লাগে।
একটি দিনের জন্যও দেখি নাই কাজকে অবহেলা করতে, বিশ্রাম নিতে। যখন দেশের বাইরে যান তখন তিনি প্রতিদিনের মতই খুব সকালে ঘর থেকে বের হন। কিন্তু আজকাল খুব চান আমাদের সাথে সময় কাটাতে..........
আমরা আড্ডায় বসলে খুব হাসির শব্দ শুনলে বাবা এসে বসেন, বাবা আসার পর আমরা একটু চুপ করে যাই এতে তিনি অনেকবার অভিমান করেছেন, বলেন "আমার কেউ নাই, কেউ আমাকে বন্ধু ভাব না।" তিনি আমাদেরকে অনেক আদর করলেও তেমন শাসনও করেছেন এবং আমরা তাঁকে অনেক ভয় পেতাম এখনো পাই। আর মা সবসময় থাকেন আমাদের সাথেই ... মা ঠিক আমাদের মত !
স্কুলে যতবার আদর্শ মানুষ/ প্রিয় মানুষ নিয়ে লিখতে হয়েছে আমি ততবার আমার বাবার কথা লিখেছি। আমি যাদের কাছাকাছি গিয়েছি বা যারাই আমার কাছে আসতে চেয়েছে, সবসময় খুঁজেছি আমার বাবার ছায়া, খুঁজেছি তাঁর মত সৎ নিষ্টাবান, কর্মঠ একজন মানুষ।
আমার বাবাকে নিয়ে লিখতে চেয়েছি অনেকদিন ধরেই, পারছিলাম না । এখনো পারি নাই গুছিয়ে লিখতে, কষ্ট হচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



