বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
শায়খ সালেহ বিন মুহাম্মদ (তালেবের বংশধর)
ইমাম ও খতিব মাসজিদুল হারাম
মক্কা-মুকাররমা
সৌদি আরব
ভাষান্তর: মুহাম্মদ নূরুল্লাহ তারীফ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি তাঁর বান্দাদের উপর কর্তৃত্বশীল ও পরাক্রান্ত। যিনি প্রচণ্ড ক্ষমতাধর, উদ্দেশ্য সাধনে যিনি কোন সভাসদের মুখাপেক্ষী নন। আপন মিত্রদের সাহায্যে যার একক সত্ত্বাই যথেষ্ট। যিনি লাঞ্চনা ও অবমাননার উর্ধ্বে। সৃষ্টি ও নির্দেশের ক্ষমতা যার একক অধিকার। অতএব কোন কিছুই তাঁর নির্ধারিত ভাগ্যের বাইরে নয় এবং কোন কিছুই তাঁর জ্ঞান সীমার উর্ধ্বে নয়। তাঁর কর্ম-কাণ্ড ও ভাগ্যলিপি নির্ধারণ বিজ্ঞানময়। আর্শীবাদ সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলী যাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়। অভিশাপ তাদের জন্য রবের নিদর্শনাবলী স্মরণ করিয়ে দিলেও যারা বোবা, বধিরের মত নির্লিপ্ত থাকে। আমি আমার রবের স্তুতি গাইছি, তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি, তাঁর প্রশংসা করছি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি তাওহীদের সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই, তিনি নিরংকুশ। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গোলাম ও রাসূল। তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের প্রতি আল্লাহর শান্তি ও দয়া বর্ষিত হোক।
মুসলিম ভায়েরা,
আল্লাহকে ভয় করুন; (হে যারা ঈমান এনেছ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তাহলে তিনি তোমাদেরকে সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার পাথেয় দিবেন।)
সুধী মণ্ডলী,
বিগত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব যুদ্ধের ইতি ঘটার পর, জাতিগত দ্বন্দ্ব ও গৃহযুদ্ধ অবসিত হওয়ার পর পাশ্চাত্য যুদ্ধের তিক্ততা ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারল। তারা বুঝতে পারল যে এহেন পরিস্থিতিতে জাতি ও সভ্যতার উন্নয়ন অসম্ভব, জ্ঞানের বিকাশ দুরুহ; কিভাবেই সম্ভব যে জনপদে প্রতিনিয়ত বোমা বিস্ফোরিত হয়, সাজোয়া যান যেন তার আরোহীসহ মৃত্যু পুরীর জন্য প্রস্তুত, যেখানে জনগণ বাস্তু-হারা, প্রিয়জন হারিয়ে তারা শোকে মুহ্যমান, পরিপাটি বাড়ী-ঘরগুলো এখন শুধু ধ্বংসস্তুপ, ক্ষেত-খামার ও ফলজ বৃক্ষগুলো কেবল ধ্বংসের সাক্ষী। তারা উপলব্ধি করল এ অবস্থা বিরাজ করলে সেখানে কোন জ্ঞানী-গুনীর জন্ম হবে না, কোন প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কর্ম সম্পাদিত হবে না। তখন তাদের বিবেকবান ও বিজ্ঞ লোকেরা বিভিন্ন সংঘ, কমিটি, বোর্ড ও পরিষদ গঠনের আহ্বান জানাল। তারা উদ্যোগ নিল বিভিন্ন চুক্তি, সনদ ও নীতিমালা নির্ধারণের মাধ্যমে সংঘের অধীনস্থ দেশসমূহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। দূরবর্তী অথবা প্রতিবেশী যে কোন শত্রু দ্বারা যদি কোন সদস্য দেশ আক্রান্ত হয় তবে সকল সদস্য দেশ এক যোগে আক্রান্ত দেশের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে আরব ও মুসলিম দেশগুলোও বিভিন্ন সংঘ ও পরিষদে যোগদান করল। অন্যদেশগুলোর মত তাদেরও একই উদ্দেশ্য শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লাভ করা।
কেনইবা মুসলমানরা এ আহ্বানে সাড়া দিবে না; তাদের সামনে রয়েছে তাদের নবীর অমিয় বাণী- একদিন তিনি তাঁর সাথীদের বললেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন জাদআ'নের বাড়ীতে এমন একটি শপথে উপস্থিত ছিলাম যা আমার কাছে (মূল্যবান) লাল উটের চেয়েও অধিক প্রিয় ছিল। যদি ইসলাম আগমনের পর এ ধরনের কোন চুক্তির আহ্বান জানান হত তবে আমি সে ডাকে সাড়া দিতাম। এটাই ছিল হিলফুল ফুজুল ( সম্ভ্রান্তদের শপথ)। যার আহ্বায়ক ছিল কুরাইশ গোত্রসমূহ। তাদের শপথবাক্য ছিল এরূপ- "তারা মজলুমের পাশে দাঁড়াবে এবং অধিকার আদায় অবধি জালিমের বিরুদ্ধে লড়বে।"
কেনইবা মুসলমানরা এ ধরনের চুক্তি বা সনদে স্বাক্ষর করবে না; তাদের নবী দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রথম ব্যক্তি, যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল মদীনার ইহুদীদের সাথে। কিন্তু, বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতি অবলোকনকারী যে কেউ লক্ষ্য করবেন যে এ সকল পরিষদ ও সংঘ প্রতিষ্ঠার পরও জুলুম-অত্যাচার হ্রাস পায়নি, রক্তের হোলিখেলা বন্ধ হয়নি, যুদ্ধের ঢামাডোল থেমে যায়নি; শুধুমাত্র মানচিত্রে যুদ্ধ-ক্ষেত্র পরিবর্তন হয়েছে। যুদ্ধের ঢংকা এখন পাশ্চাত্যের বদলে প্রাচ্যে বাজে। মুসলিম বিশ্ব ও আরব জাহান এখন শত্রুর লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু এ সকল পরিষদ মুসলমানদের ওপর জুলম-নির্যাতন দেখেও নিশ্চুপ। শুধু তাই নয় বরং কখনো কখনো জুলুম ও জালেমের পক্ষ সমর্থন করতেও দেখা যায়। দু-একবার কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেলেও তা দীর্ঘ কাল-ক্ষেপন ও এতদ্ অঞ্চলে হামলাকারী দেশের অনুকূলে নতুন কোন পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার পর। একদিকে পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিমহল মানবাধিকার, সাম্য ও ন্যায়ের বুলি আওড়ায় অন্যদিকে মুসলিম বিশ্বে তাদের কর্মনীতি সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রাচ্যের পরিস্থিতি পাশ্চাত্যের এসব নীতিবাক্যকে অসার প্রমাণিত করে।
আপনি যদি মনে করেন স্বার্থের আদান-প্রদানে অসাঞ্জস্যতার কারণে আরব ও মুসলমানদের সাথে পাশ্চাত্যের এ দুরাচার কিনা। তবে জেনে রাখুন, আমাদের আইনে (ইসলামী শরীয়াতে) দ্বি পাক্ষিক সুযোগ-সুবিধার আদান-প্রদানে কোন বাধা নেই। বরং আপনি দেখতে পাবেন দ্বি পাক্ষিক স্বার্থের ক্ষেত্রে মুসলমানদের পক্ষ থেকেই আগ্রহটা বেশী থাকে। বিশ্বে মুসলমানদের সংখ্যা এক বিলিয়নেরও বেশী। মুসলিম-বিশ্ব পৃথিবীর সমৃদ্ধতম অঞ্চল; পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ স্থল, জল ও আকাশ পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী মুসলিম বিশ্বকে ভেদ করে গিয়েছে। মুসলিম সন্তানরা ইমিগ্রান্ট হয়ে ওয়েস্টার্ন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র ও পরীক্ষাগারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা অতীতেও যেমন শান্তিপূর্ণ অবস্থানে বিশ্বাসী ছিল বর্তমানেও তারা পর সহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও মুসলমানদের শত্রুর স্বার্থে তাদের কোন অবদানের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করা হচ্ছে না। মাত্র কয়েক মিলিয়ন ইহুদী হানাদারদের রাজী করতে মুসলমানদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। গুটি কতেক মানুষের মিত্রতা রক্ষার্থে কোটি কোটি মানুষকে শত্রু বানানো হচ্ছে। মুসলমানদেরকে অজানা ভবিষ্যতের দিকে ঢেলে দেয়া হচ্ছে। যে শত্রু অন্যায়ভাবে মুসলমানদের দেশ দখল করে নিয়েছে, দেশের জনগণকে বাড়ী-ভিটা ছাড়া করেছে, যারা শুধু নিতে জানে দিতে জানে না, যারা শুধু সুবিধা চায় কাউকে সামান্যটুক সুবিধাও দেয় না, যারা নিজ জাতি ব্যতীত অন্যদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। এরপরও তাদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার যদি নৈতিক কোন ভিত্তি থাকত তাহলে না হয় মানা যেত। আপনি যদি ওয়েস্টের একচোখা নীতি পর্যালোচনা করে দেখেন তবে দেখতে পাবেন বাহ্যতঃ কোন স্বার্থই এর কারণ নয়, বরং একমাত্র কারণ হল ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাস। একথা সুস্পষ্টভাবে তাদের অনেকেই বলেছেন। "যদি তারা সক্ষম হয় তবে ধর্মচ্যুত করা পর্যন্ত তোমাদের সাথে যুদ্ধ করবে।" [আলকুরআন] "তারা (কাফেরেরা) তাদেরকে (মুসলমানদেরকে) এ কারণে শাস্তি দিয়েছিল যে, তারা সপ্রংশিত ও পরাক্রান্ত আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। মূলতঃ মুসলমানদেরকে যে গন্তব্যের দিকে ঢেলে দেয়া হচ্ছে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। যার জন্য মুসলমানরা অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করবে না। ইতিহাস বিশ্লেষকদের যে কেউ লক্ষ্য করবেন মুসলমানরা যখনই ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে অনেক চড়াই-উতরাই পার হতে হলেও, নগন্য সংখ্যা ও অপ্রতুল রসদ সত্ত্বেও বিজয় ছিল মুসলমানদের। খোদ শত্রুরাই সাক্ষ্য দিয়েছে যে, প্রস্তরখণ্ড মুসলমানদের হাতে শত্রুর অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক, মুসলমানদের সাধারণ গোলা-বারুদ শত্রুর কামানের চেয়েও ভয়াবহ। যদিও পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিরা ধর্ম-যুদ্ধ বন্ধের, সভ্যতার দ্বন্দ্ব নিরসনের ওয়াজ করে থাকেন এবং তাদের সরকাররা নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবী করে থাকেন, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে ধর্মীয় চেতনা ব্যতীত তাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ভিন্ন কোন ব্যাখ্যা নেই। আমরা অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে বিশ্বের কয়েকটি পরাশক্তির অপরাজনীতি লক্ষ্য করছি, ঘৃণ্য এ রাজনীতির মাধ্যমে শুধুমাত্র মানুষের ঘৃণা ও নতুন নতুন শত্রু তৈরী করা ছাড়া তাদের আর কোন অর্জন নেই। তাদের বিবেকবান লোকগুলো এতদ্ অঞ্চলে শত্রু সৃষ্টি করা থেকে তাদেরকে আগে থেকেই বারণ করে আসছেন। দাম্ভিকতা ও অহমিকার আতিশয্যে থেকে তারা যদি আসন্ন বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করে থাকেন তাহলে তারা বোকার স্বর্গে আছেন। যদি পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে, আর রাজনীতির মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায় তবে অচিরেই তারা কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হবেন, যে রকম পরিণতির মুখোমুখি হয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষরা। আর্ন্তজাতিক সংঘ ও পরাশক্তিগুলোর ছত্রছায়ায় তাদের নিক্ষিপ্ত প্রতিটি গোলা, প্রতিটি বাড়ী ধ্বংস করা, অকাতরে মানুষ মারা, একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো নতুন নতুন জিহাদী সংগঠন ও ফিদাঈ বাহিনী গড়ে ওঠার জন্য উত্তম পরিবেশ তৈরী করে দিচ্ছে। মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন সমাধানের পথকে আরো দূর্গম করে দিচ্ছে; শান্তির পালবাহীকে তীর থেকে দূরে ঢেলে দিচ্ছে। আমরা লক্ষ্য করছি পাশ্চাত্যের প্রতি মুসলমানদের ঘৃণাবোধ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে; যদিও তাদের সংগঠনগুলো মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সাম্যের কথা বলে বেড়ায়; জিঘাংসা, সন্ত্রাস ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে হরদম প্রচারণা চালায়; গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে যায়। পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিরা হয়ত জানে না আমরা প্রাচ্যে বসে তাদের সেমিনার ও গবেষণার ফলাফল পাচ্ছি; কিন্তু সে ফলাফল আমাদের কাছে পৌঁছে হয়ত ট্যাংকের পিঠে অথবা কামানের গোলার মাধ্যমে। আমাদের নিকট তাদের দূত হয়ে আসে সামরিক জেনারেলরা অথবা কোন বোমারু বিমান। সুবিবেচক, সংস্কৃতিমনা কোন মন্ত্রী আমাদের নিকট তাদের দূত হিসেবে আগত হয় না। বাগদাদের দুর্দশার দিকে তাকিয়ে দেখুন, দেখবেন সেখানে চলছে গণতন্ত্রের জামাই আদর, কানা ও বৈরুতে লাশ ও কঙ্কালের নীচে পাবেন মানবাধিকারের গন্ধ, ফিলিস্তিনি বাস্তুহারা শিশুদের দিকে তাকালে দেখবেন ন্যায়ের পরম চর্চা। পৃথিবীর নিকৃষ্টতম সব বন্দীশালার দিকে তাকালে দেখবেন স্বাধীণতার পরম পাওয়া পেয়ে বন্দীরা বিস্মৃত হতে চলছে। পরিবহন সেক্টরে চলছে বর্ণবাদের চরম সংঘর্ষ এবং আর্ন্তজাতিক নীতিনির্ধারক সংস্থাগুলো মুসলমানদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েই যাচ্ছে। এরপরও কি পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবিদের বোধোদয় হবে না? যারা বাক স্বাধীণতা ও মুক্তচিন্তার অধিকার নিয়ে বড়াই করেন। যারা গর্ব করেন তারা নিজেরাই নিজেদের সরকার গঠন করেন, তাদের শাসকদের নীতি-নির্ধারণে অংশ নেন। আমরা সে সব বুদ্ধিজীবিদের ও নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন মুসলমানদের প্রতি তাদের স্ব স্ব সরকারের কর্মনীতি পুণঃ পর্যালোচনা করে সঠিক পরামর্শ দেন এবং তাদের জাতিকে সঠিক নির্দেশনা দেন। নচেৎ আপনারা সবাই মিলে এর পাল্টা জবাবের অপেক্ষা করুন। অনুরূপভাবে আমরা সকল মুসলমানকে আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা প্রচার মিডিয়ায় সঠিক তথ্য তুলে ধরুন। মিথ্যা ও ভুল তথ্য পরিবেশন থেকে দূরে থাকুন। আরব চ্যানেলগুলো যেভাবে মিথ্যাচার ও ফতোয়ার অপব্যবহার করে, ফিতনা ছড়িয়ে জাতিকে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চায় তা থেকে বিরত থাকুন। আল্লাহ আমাকে ও আপনাদেরকে কুরআন ও সুন্নার বরকতে মোবারকময় করুন। এদতদুভয়ের নিদর্শনাবলী ও গুঢ়রহস্যের মাধ্যমে আমাদেরকে উপকৃত করুন। এটাই আমার বক্তব্য। আমি আল্লাহর কাছে আমার ও আপনাদের গুনার জন্য ক্ষমা চাচ্ছি। আপনারাও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
দ্বিতীয় খোতবা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সম্মানিত ও পরাক্রমশালী। যিনি তাঁর প্রিয়ভাজনদের জন্য সুপরিণতি রেখেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দাহ ও তাঁর বার্তাবাহক (রাসূল), তাঁর মনোনীত মহামানব। তাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি ও দয়া বর্ষিত হোক। অনুরূপভাবে শান্তি ও দয়া বর্ষিত হোক তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের উপরও।
মুসলিম ভায়েরা,
আমরা প্রথম উম্মত নই যারা এ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে, বাঁচার জন্য যাদেরকে লড়াই করতে হচ্ছে। আর শত্রু আমাদের উপর তখনি সওয়ার হতে পেরেছে যখন আমরা বিভক্ত হয়ে পড়েছি, আমাদের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে গেছে। আমরা রিসালাতের পথ থেকে দূরে সরে গেছি, দ্বীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক নড়বড়ে অবস্থা।
মুসলমানদেরকে এ কথা বুঝতে হবে- এ যুদ্ধ হচ্ছে মরণ-পণ লড়াই। মুসলমানদের ধর্ম আজ বাতিলের লক্ষ্যবস্তু যেমনিভাবে মুসলমানদের ভূখণ্ডগুলোও বাতিলের টার্গেট। মুসলমানদের উচিত তাদের উত্থানের জন্য অহীর নূরে নিজেদেরকে আলোকিত করা, আসমানী বিধি-বিধানের অনুসরণ করা। (হে যারা ঈমান এনেছ, যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন, তোমাদের পা অটল রাখবেন) [আলকুরআন] মুসলমানদের উচিত শক্তি অর্জনের সকল উপায়-উপকরণ গ্রহন করা। আর শক্তির সর্বপ্রধান উৎস হল ঐক্যবদ্ধ হওয়া, বিভক্তি ও বিভাজন থেকে দূরে থাকা। জাতি ও রাষ্ট্রসমূহের ভাঙ্গা-গড়ার এটাই চিরায়ত নিয়ম, যা আল্লাহ পাক কর্তৃক নির্ধারিত। সময় আমাদেরকে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা দিয়েছে তা হল- ইসলাম ভিন্ন অন্যকোন মতবাদ কোন ধরনের নীতিমালাকে শ্রদ্ধা করে না, শক্তি ব্যতীত কোন অঞ্চলকে কেউ নিরাপত্তা দেয় না, বিশেষত শক্তির সামনে নীতিকথা অসার। এ কারণে শান্তি-শৃংখলা রক্ষার জন্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম মুসলমানদেরকে শক্তি অর্জনের প্রতি তাকিদ প্রদান করেছে। (তোমরা তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য যা পার শক্তি সঞ্চয় কর, অশ্ব সংগ্রহ কর; যার মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর শত্রুদেরকে এবং তোমাদের প্রতিপক্ষকে ভীতি প্রদর্শন করতে পারবে। আর আল্লাহর রাস্তায় যা কিছু ব্যয় কর না কেন আল্লাহ্ তোমাদেরকে এর বিনিময় দিবেন। তিনি তোমাদের প্রতি জুলুম করবেন না। আর তারা যদি শান্তি প্রস্তাব দেয় তবে তোমরা তা গ্রহন কর এবং আল্লাহর উপর নির্ভর কর। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। যদি তারা আপনাকে ধোকা দিতে চায় তবে আল্লাহই আপনার জন্য যথেষ্ট।
প্রাপ্ত নেয়ামত ও প্রেরিত রহমত মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর প্রতি আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ, আপনার বান্দাহ ও বার্তা-বাহকের প্রতি রহমত, বরকত ও শান্তি নাযিল করুন। যিনি নূরানী চেহারা ও উজ্জ্বল কপোলের অধিকারী, অনুরূপভাবে তাঁর পরিবার-পরিজন ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের প্রতি আপনি সন্তুষ্ট হোন।
হে আল্লাহ, ইসলামকে আপনি বিজয়ী করুন; শিরক (আল্লাহর সাথে সমকক্ষ দাঁড় করানো) ও মুশরিকদেরকে অপমান-অপদস্থ করুন। দ্বীনের কেন্দ্রবিন্দুকে আপনি রক্ষা করুন। এই দেশকে এবং সকল মুসলিম দেশকে আপনি নিরাপদে রাখুন। হে আল্লাহ, যারা আমাদের অথবা মুসলমানদের অথবা কোন মুসলিম দেশের ক্ষতি করতে চায় তাদেরকে আপনি নিজেদের ক্ষতিতে ব্যস্ত রাখুন, তাদের ষড়যন্ত্রকে আত্মঘাতি ষড়যন্ত্রে পরিণত করে দিন। হে আল্লাহ, এ উম্মতের জন্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করে দিন যেখানে দ্বীনদাররা বিজয়ীবেশে থাকবে, গুনাহগাররা হেদায়েত পাবে, যেখানে সৎ কাজের আদেশ দেয়া হবে, অসৎ কাজে বাধা দেয়া হবে। হে আল্লাহ, আমাদেরকে আমাদের দেশে নিরাপদে রাখুন, আমাদের শাসকগোষ্ঠী ও নেতৃবৃন্দদের সুমতি দিন। হে আল্লাহ, যারা আপনাকে ভয় করে, আপনার রেজামন্দির পথে চলার চেষ্টা করে তাদের হাতে আমাদের কর্তৃত্ব দিন। হে আল্লাহ, আপনি শাসকদের দিলে মুমিনদের প্রতি রহম পয়দা করে দিন। হে আল্লাহ, হে রাব্বুল আলামীন, আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানকে আপনার হেদায়েতের পথে পরিচালিত করুন, তার যাবতীয় কার্যক্রম আপনার সন্তুষ্টি মোতাবেক পরিচালনা করার তাওফিক দিন। তার মিত্র পক্ষকেও সুমতি দিন এবং অসৎ মিত্র থেকে তাকে হেফাযত করুন। হে আল্লাহ, তাকে, তার গভর্নরবর্গ ও সভাসদগণকে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ, শয়নে-জাগরণে সর্বদা ইসলামের উপর আমাদেরকে অবিচল রাখুন; আমাদের উপর নিন্দুক ও শত্রুবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েন না। হে আল্লাহ, সর্বস্থানে মুসলমানদের অবস্থা পরিবর্তন করে দিন; দূর্বল, অসহায় মুসলমানদের সাহায্য করুন। ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরাকে মুসলমানদের সহায় হোন, তাদেরকে প্রাণে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, তাদের নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিন, ঈমান ও সুন্নাহ দিয়ে তাদের অন্তরগুলো ভরে দিন। হে আল্লাহ, ইসলামের শত্রুদেরকে আপনি নস্যাৎ করে দিন; তারা তো আপনাকে পরাভূত করতে পারবে না। হে আল্লাহ, তাদেরকে পরাজিত করার জন্য আমরা আপনার অভিমুখী হচ্ছি, তাদের ক্ষতি থেকে আপনার কাছেই আশ্রয় চাচ্ছি; আপনি তাদেরকে পাকড়াও করুন। হে আল্লাহ, আপনি দুশ্চিন্তাগ্রস্তদের দুশ্চিন্তা দূর করে দিন; দুদর্শাগ্রস্তদের দুদর্শা দূর করে দিন; বন্দীদের মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন; ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করে দিন; আপনার রহমতে আমাদের মধ্য যারা অসুস্থ এবং মুসলমানদের মধ্যে যারা অসুস্থ সবাইকে নিরাময় দান করুন। আহতদের আপনি শক্তি যোগান, বাস্তুহারা ও দুদর্শাগ্রস্তদের আপনি সহায় হোন, মৃতদের প্রতি আপনি রহম করুন। হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী, হে সম্মান ও মর্যাদার আধার, হে আল্লাহ্, আমরা আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি; আমরা আপনার কাছে দ্বীন ও দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ প্রার্থনা করছি। ( হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দিন, আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।) [আলকুরআন] (হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি, আপনি যদি ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন তবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাব।) [আলকুরআন] হে আমাদের রব, আমাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আত্মীয়-স্বজনসহ সকল মুসলমানকে আপনি ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের দোয়া কবুল করুন; নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ। আমাদের তওবা কবুল করুন; নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী ও দয়াবান। সুমহান আপনার রব, তিনি তাদের উল্লেখিত এসব ত্রুটি থেকে মুক্ত। রাসূলদের প্রতি আল্লাহ পাকের শান্তি বর্ষিত হোক এবং সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।
সমাপ্ত
বি.দ্র. শিরোনামটি অনুবাদকের সংযোজিত।
উদ্ভট, অপ্রাসঙ্গিক, অযোক্তিক কোন মন্তব্য করার ব্যর্থ চেষ্টা করবেন না। গঠনমূলক যে কোন সমালোচনা সাদরে গৃহীত হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



