সম্মানিত হাজীসাহেব,
“মাবরুর হজ্বের প্রতিদান হচ্ছে – জান্নাত”[তাবারানী, মুসনাদে আহমাদ] ‘মাবরুর হজ্ব’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সে হজ্ব যে হজ্বের পর হজ্বকারীর মাঝে পরিবর্তন আসে। হজ্বের পরের অবস্থা হজ্বের আগের অবস্থার চেয়ে ভাল হয়। নেক আমল বেশী করার প্রতি তার অনুপ্রেরণা বাড়ে এবং যাবতীয় পাপের কাজ থেকে তিনি বিরত থাকেন। সুতরাং আপনার প্রভুর আনুগত্য করার মাধ্যমে নিজের আমলনামাকে ধবধবে সাদা রাখুন। নেকের পথে একবার স্থির হওয়ার পর আবার যেন আপনার পদস্খলন না ঘটে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। পাঁচ ওয়াক্ত নামায সঠিকভাবে আদায় করুন। যাবতীয় ‘হারাম’ (নিষিদ্ধ) থেকে দূরে থাকুন। মানুষের উপর জুলুম করা থেকে বেঁচে থাকুন। এই মহান দিনে আল্লাহ্ তাআলাকে অধিক স্মরণ করুন। আল্লাহ্ আপনাদের প্রতি রহম করুন। বেশী বেশী ইসতেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করুন। “অতঃপর যখন তোমরা আরাফা থেকে প্রর্ত্যাবর্তন করবে তখন ‘মাশআরে হারামের’ কাছে আল্লাহ্কে স্মরণ করবে। তিনি যে তোমাদেরকে নির্দেশনা দিলেন সেজন্য তোমরা তাঁকে স্মরণ করবে। নিশ্চয় তোমরা (এ নির্দেশনা পাওয়ার) আগে বিভ্রান্ত ছিলে। আর মানুষ যেখান থেকে প্রর্ত্যাবর্তন করে তোমরাও সেখান থেকে প্রর্ত্যাবর্তন করবে। আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত দয়ালু।”[সূরা বাকারা ১৯৮, ১৯৯]
ও মুসলিম,
এই বিশাল সমাবেশকে দেখে আল্লাহ্র সম্মুখে সম্মিলিত হওয়ার দিনকে স্মরণ করুন। স্মরণ করুন, সেই মহান দিনকে যে দিন আমরা আমাদের কবর থেকে উত্থিত হব চোখ বড় বড় করে, বিবস্ত্র দেহে, নগ্ন পায়ে। যেদিন আল্লাহ্ তাআলা অগ্রজ অনুজ সবাইকে একত্রিত করবেন। যে দিনটি হবে দুনিয়ার ৫০ হাজার বছরের সমান। সূর্য মানুষের অতি নিকটে থাকবে। প্রত্যেকের আমলের অনুপাতে তার ঘামের গভীরতা হবে। সে দিনটিকে স্মরণ করুন, যেদিনে প্রত্যেক দুগ্ধপানকারিনী তার বাচ্চার কথা ভুলে যাবে। প্রত্যেক গর্ভধারিনী তার গর্ভপাত ঘটাবে। মানুষকে দেখে মনে হবে তারা বুঝি নেশাগ্রস্ত; আসলে তারা নেশাগ্রস্থ নয়। কিন্তু আল্লাহ্র আযাব বড় কঠিন। স্মরণ করুন, সে দিনটিকে যে দিন আমলনামা ভাগ করে দেয়া হবে। কেউ তার আমলনামা ডান হাতে গ্রহণ করবে। সে বলবে, “নাও, তোমরাও আমার আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। অতঃপর সে সুখী জীবন যাপন করবে; সুউচ্চ জান্নাতে।”[সূরা হাক্কাহ্ ১৯-২২] আর কেউ তার আমলনামা পাবে বাম হাতে। সে বলবে, “হায়, আমায় যদি আমার আমলনামা না দেয়া হত। আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব।”[সূরা হাক্কাহ্ ২৬-২৭]
প্রিয় ভায়েরা,
আমলসমূহ পরিমাপের দিনটিকে স্মরণ করুন। “যাদের (নেকীর) পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম। আর যাদের (নেকীর) পাল্লা হালকা হবে তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে, তারা জাহান্নামে স্থায়ীভাবে থাকবে। ”[সূরা মুমিনুন ১০২-১০৩] স্মরণ করুন, জাহান্নামের উপর পুলসিরাত থাকবে। মানুষ তাদের আমলের অনুপাতে সে পুল পার হবে। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি আল্লাহ্র আনুগত্যে সবচেয়ে বেশী অগ্রণী ছিলেন তিনি সবচেয়ে দ্রুত গতিতে সে পুল পার হবেন। এভাবে আল্লাহ্র আনুগত্যে কসুরের অনুপাতে পুল পার হওয়ার গতিও ধীর হবে। সে দিনকে স্মরণ করুন, যে দিন একজন আহ্বানকারী জান্নাতীদেরকে আহ্বান করে বলবে, ও জান্নাতীরা, তোমাদের জন্য চিরস্থায়ী সুস্থতা, আজকের পর আর কখনো তোমরা অসুস্থ হবে না। তোমাদের জীবন স্থায়ী, মৃত্যু তোমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তোমাদের যৌবন অনন্ত, বার্ধক্য তোমাদেরকে পাবে না। এই মহান আহ্বান ও এই মহান অনুগ্রহকে স্মরণ করুন। স্মরণ করুন, সেদিনকে যেদিন জান্নাতীদেরকে বলা হবে, ও জান্নাতীরা তোমরা চিরস্থায়ী, তোমাদের মৃত্যু নেই। ও জাহান্নামীরা, তোমরা চিরস্থায়ী, তোমাদের মৃত্যু হবে না। প্রিয় ভাই, দুনিয়া থেকে বিদায়ের দিনটিকে স্মরণ করুন। যেদিন মালাকুল মাউত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আপনার ছেলে-সন্তান আত্মীয়-স্বজনের মাঝ থেকে আপনার রুহ কবজ করে নিয়ে যাবে। কিন্তু কেউ আপনাকে রক্ষা করতে পারবে না, একদিনের জন্যেও আপনার মৃত্যুর সময়কে পিছিয়ে দিতে পারবেন না। স্মরণ করুন, সেই মুহূর্তটির কথা যে মুহূর্তটি হবে মুমিনের জন্য খুশি ও উচ্ছ্বাসের মুহূর্ত। “নিশ্চয়ই যারা এ ঘোষণা দেয়, আল্লাহ আমাদের রব, অতঃপর এতে অবিচল থাকে তাদের প্রতি ফেরেশতাকূল অবতীর্ণ হয়ে থাকে, এ বক্তব্য নিয়ে যে, তোমরা ভয় করো না, তোমরা দুশ্চিন্তা করো না। আর তোমরা সুসংবাদ নাও সে জান্নাতের যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছিল।[ সূরা হা-মীম আস সাজদাহ ৩০] মুমিন ব্যক্তি মৃত্যু শয্যায় থেকে জান্নাতে তার অবস্থানস্থল দেখতে পায়। তখন সে আল্লাহ্র সাক্ষাতে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। আল্লাহ্ নিজে তার সাক্ষাতকে পছন্দ করেন এবং সেও আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাত করাটা পছন্দ করে। আর কাফির ব্যক্তি অনুতাপ, অনুশোচনার মধ্যে উক্ত মুহূর্তটি কাটায়। প্রিয় ভাই, কবরের প্রথম রাতটির কথা স্মরণ করুন। যে রাতে আপনি একাকী কবরে থাকবেন। আপনার ভাল বা মন্দ অবস্থা সম্পূর্ণরূপে আপনার আমলের ভিত্তিতে নির্ণিত হবে। এই চরম মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করুন। আশা করি এগুলোকে স্মরণ করা দ্বারা আমাদের অন্তর ও আমাদের আমলে সংশোধন আসবে।
হে আল্লাহ্,
আমরা আপনার ফজল (অনুগ্রহ) ও কারাম (মহাত্ম্য) গুণের ওছিলা দিয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করছি, অনুগ্রহ করে আমাদেরকে মঞ্জুর করে নিন। আমাদের হজ্বকে কবুল করে নিন। আমাদের শ্রমকে প্রতিদানপ্রাপ্ত করুন। আমাদের গুনাহ্গুলোকে মাফ করুন। হে আল্লাহ্, মুমিন নর-নারীকে আপনি ক্ষমা করে দিন। মুসলিম নর-নারীকে মাফ করে দিন। তাদের অন্তরগুলোকে একতাবদ্ধ করে দিন। তাদের পারস্পারিক বিরোধ মিটিয়ে দিন। তাদেরকে আপনার শত্রু এবং তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ্, সকল প্রয়াত মুসলিম - যারা আপনাকে একক উপাস্য হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছে, আপনার প্রেরিত নবীকে রাসূল হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং এর উপর মৃত্যু বরণ করেছে - তাদেরকে ক্ষমা করে দিন। হে আল্লাহ্, তাদেরকে মাফ করে দিন। তাদের উপর রহম করুন। তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তায় রাখুন। তাদের উত্তম আতিথেয়তা করুন। তাদের আবাসস্থলকে প্রশস্ত করে দিন। পানি, বরফ ও শিশির দিয়ে তাদেরকে বিধৌত করে নিন। তাদেরকে গুনা-খাতাহ্ থেকে এভাবে মুক্ত করে নিন যেভাবে সাদা কাপড় থেকে ময়লা মুক্ত করা হয়। হে আল্লাহ্, আপনিই আল্লাহ্। আপনি ছাড়া আর কোন উপাস্য সত্য নয়। আপনি দাতা, আমরা ভিখারী। আমাদের প্রতি বৃষ্টি অবতীর্ণ করুন। আমাদেরকে আপনার রহমত থেকে বিমুখ করবেন না। হে আল্লাহ্, আপনিই আল্লাহ্। আপনি ছাড়া আর কোন উপাস্য সত্য নয়। আপনি দাতা, আমরা ভিখারী। আমাদের প্রতি বৃষ্টি অবতীর্ণ করুন। আমাদেরকে আপনার রহমত থেকে বিমুখ করবেন না। হে আল্লাহ্, আমাদেরকে বৃষ্টি দিন। হে আল্লাহ্, আমাদেরকে বৃষ্টি দিন। হে আল্লাহ্, আমাদেরকে বৃষ্টি দিন। হে আল্লাহ্, আমাদেরকে আমাদের দেশে নিরাপদে রাখুন। আমাদের শাসকদেরকে নেককার বানান। হে আল্লাহ্, আমাদের শাসক, মুমিনদের নেতা আব্দুল্লাহ্ বিন আব্দুল আযিযকে যাবতীয় কল্যাণের কাজ করার তাওফিক দিন। হে আল্লাহ্, আপনার সাহায্য, সহযোগিতা ও ক্ষমতা দিয়ে তাকে বুলন্দ করুন। হে আল্লাহ্, তার যাবতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আপনার সাহায্য নাযিল করুন। হে আল্লাহ্, মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করার তাওফিক দিন। তার বয়স ও আমলের মধ্যে বরকত দান করুন। নিশ্চয় আপনি সকল বিষয়ে ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ্, তার উত্তরাধিকারী যুবরাজকেও আপনার সন্তোষজনক কাজ করার তাওফিক দান করুন। ন্যায় কথা ও ন্যায্য কাজ করার তাওফিক দান করুন। এছাড়াও হজ্বের কাজের জড়িত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষতঃ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি শুকরিয়া। আল্লাহ্ তাকেও তাওফিক দান করুন। এছাড়াও হজ্ব বিষয়ক কেন্দ্রীয় কমিটির প্রধানের প্রতিও শুকরিয়া। আল্লাহ্ তাকেও তাওফিক দান করুন। হাজ্বীদের খেদমতে নিয়োজিত সকলের জন্য আমি আল্লাহ্ তাআলার কাছে তাওফিক কামনা করছি এবং দোয়া করছি আল্লাহ্ যেন তাদের এ খেদমতগুলোর মাধ্যমে তাদের নেকীর পাল্লা ভারী করেন।
“হে আমাদের প্রভু, আমাদেরকে এবং ঈমানের ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রণী ভাইদেরকে ক্ষমা করে দিন। আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোন কুটিলতা রাখবেন না। হে আমাদের রব্ব, নিশ্চয় আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়।”[সূরা হাশর ১০] “হে আমাদের প্রভু, আমরা নিজেরাই নিজেদের আত্মার প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন, আমাদের প্রতি রহম না করেন তাহলে নিশ্চয় আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে যাব।”[সূরা আরাফ ২৩] “হে আমাদের প্রভু, আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ দান করুন। আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।”[সূরা বাকারা ২০১] “আপনার প্রতিপালক, যিনি সম্মান ও শক্তির অধিকারী, তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র। প্রেরিত পুরুষদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ্র জন্য।”[সূরা আস সাফ্ফাত ১৮০-১৮২] আল্লাহ্ তাআলা আগামী হজ্বকে আমার জন্য, আপনাদের জন্য এবং গোটা উম্মাহ্র জন্য বরকত ও কল্যাণ নিয়ে ফিরিয়ে আনুন। আমাদের আমলগুলোকে তিনি কবুল করে নিন। আমাদের সন্তান-সন্ততিকে নেককার বানান। সর্বাবস্থায় আমাদেরকে তিনি তার হেফাজতে রাখুন। আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি আল্লাহ্র রহমত বর্ষিত হোক।
সমাপ্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



