শুধু মাত্র জোৎসা রাতে সুন্দরবন দেখব বলে আমাদের যাত্রা এক মাস পিছিয়ে দিয়েছিলাম।
তারিখ ঠিক মনে নাই তবে সালটা ঠিক আছে, খুব সম্ভবত ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে অথবা মাঝামাঝি আমরা সুন্দরবন গিয়েছিলাম। লঞ্চ ভাড়া, বাজার করা, এবং আনুসাঙ্গিক প্রস্তুতি নিতে আমি তিন দিন আগে খুলনা চলে গিয়েছিলাম। খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল লাইব্রেরীর নাসির ভাই এবং তৎকালীন রিজার্ভ পুলিশ এর সহকরী পুলিশ সুপার আশরাফ ভাই আমাদের প্রচুর সাহায্য করেছেন।
যথা সময়ে ঢাকা থেকে আমাদের বাকী সদস্যরা মঙ্গলা এসে পৌছান। সবাই রেডী, কিন্তু ঘাটে লঞ্চ নাই। খোজ নিতেই জানা গেল লঞ্চ সমান্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় দেরী হচ্ছে। অবশেষে সকাল দশটায় আমাদের লঞ্চ ঘাটে ভিরে, সব মালামান ও সবাইকে লঞ্চে তুলে আমরা বেলা ১১টায় কটকা এর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। পষুর নদীর উপর দিয়ে লঞ্চ ঢাংমারী বন বিভাগের অফিসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এরই মাঝে সবাই যে যার পছন্দমত যায়গা খুজে নিয়ে আড্ডায় মশগুল। প্রায় ১ ঘন্টার ভ্রমন শেষে আমরা ঢাংমারী বন বিভাগের অফিসে এসে পৌছালাম। ঢাংমারীতে জন প্রতি কর প্রদান শেষে দুই জন বন রক্ষী সহ বেলা প্রায় ১:৩০ মিনিটে আমাদের মুল যাত্রা শুরু করি।
বাবুর্চী এরই মধ্যে দুপুরের রান্না শুরু করে দিয়েছে। শুরুতেই আমরা তিন বেলার খাবার মেন্যু সেট করে বাবুর্চী হাতে তুলে দিয়েছিলাম, দুপুরে মাছ এবং রাতে মুরগীর মাংশ সাথে সব্জী আর ডাল তো থাকছেই। সবাই যখন আড্ডা ও চারিদিক দর্শনে ব্যস্ত তখন আমরা আয়োজকরা সবকিছু ঠিকমত আছে কিনা দেখছি, এরই মাঝে আমাদেরই একজন নদীতে মাছ ধরতে থাকা এক জেলে নৌকা থেকে চিংড়ি মাছ কিনতে ব্যস্ত হয়ে পরেন, কারন তিনি আমাদের খাদ্য মন্ত্রী। বেশ অনেক গুলো চিংড়ি কেনেন মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে, এবং আবার নতুন খাবার মেন্যু সেট করেন। প্রতি বেলায় দুই পিস করে চিংড়ি বরাদ্দ করলেন সবার জন্য। এই সব করতে করতে বেলা প্রায় সাড়ে তিনটায় আমরা দুপুরের খাবার খাই। খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই ব্যস্ত হয়ে পরি সুন্দরবনের রুপ দেখতে। প্রায় সন্ধ্যা নাগাদ আমরা কটকা অভয়ারণ্যে পৌছাই। সবাই মোটা মুটি ব্যস্ত হয়ে পড়ে নামার জন্য, কিন্তু সাথে থাকা বনরক্ষী ও কটকা অভয়ারণ্যের বনরক্ষীরা লঞ্চ থেকে নামতে নিষেধ করে। নিষেধ শুনে সবাই বিরক্ত এর মধ্যে কেউ কেউ আবার খুব গরমও হলেন। কি আর করা অবশেষে তাদের কথা অনুযায়ী আমরা কেউ লঞ্চ থেকে আর নামলাম ন। আমাদের লঞ্চ ঘাট থেকে সরিয়ে নিয়ে মাঝ নদীতে নঙ্গর করলো, কারন ভাটায় ঘাটের কাছে পানি থাকে না। সবাই একটু হতাশ হলেও করার কিছুই ছিল না।
মাত্র সন্ধ্যা, সময় কাটানো জন্য আগে থেকে প্ল্যান করা সাংষ্কৃতিক পর্ব শুরু করলাম, আমাদের সথে ছিলেন মিলন ভাই (বর্তমানে জনপ্রিয় অভিনেতা আনিছুর রহমান মিলন), কামরুল (কাক জোত্ছনা নাটকের নাট্যকার) সহ আরো অনেকেই। সবাই কিছু না কিছু উপস্থান করে। এই ভাবেই রাতের খাবারের সময় হয়ে যায়। সবার খাওয়া দাওয়া শেষে যখন ঘুমানো ব্যবস্থা করতে করতে রাত প্রায় ১০.৩০। এরই মধ্যে আকশে উঠে গেছে বিশালাকারের চাদ। আমি আমার আগের প্ল্যান আর কিছুটা র্দূভাগ্য নিয়ে লঞ্চের বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম। একা বসে আছি, চারিদিক চুপচাপ, হঠাৎ পারের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা দুইটা করে হরিণ আসছে। নদীর ঠিক মাঝ খানে লঞ্চ, দুই দিকে বন, এক দিকে নদী আর একদিকে সাগর, আকাশে বিশাল একট চাদ। আমিতো মুগ্ধো হয়ে প্রকৃতির রুপ দেখছি, আর মাঝে মাঝে যারা আসছে কথা বলতে তাদের তারাতারি বিদায় করে দিচ্ছি, কারন তারা সবাই আসছে সিগারেট ফুকতে। এই করে কখন যে ভোর হয়ে গেছে টের পাইনি, সেটাও অদ্ভুত এক দৃশ্য, যা প্রকাশ করার মত নয়।
আগের প্ল্যান মতো সবাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়ল। আমরা সবাই তাড়াতাড়ি নাস্তা সেরে কটকা অভয়রান্য দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। কিছুদুর এগোনের পর আমরা হরিণ দেখতে পেলাম, হরিণ দেখে সবাই এতবেশী উৎসাহিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, আর চিৎকার শুনে হরিণের পাল যে পালাল আর দেখা পেলাম না। ঘন্টা খানেক ঘুরে আমরা আবার লঞ্চে উঠে পড়লাম। এইবারের গন্তব্য হিরণ পয়েন্ট।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

