‘কাগজ! কাগজ বিক্রি কাগজ !পুরানো কাগজ,খবরের কাগজ...’ বলে ডাক আর কি কেউ শুনবেনা? ফেরিওয়ালার এ মিষ্টি সুর হারিয়ে যাবে নেটের ভিড়ে?খবর থাকবে শুধুই নেটে?ইন্টারনেটের এই যুগে খুব শিঘ্রই হয়তো একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখবেন নাস্তার টেবিলে আর নেই আজকের কাগজটি,কিম্বা সকালে দরজা খুলতেই , হেসে সে আর বলছেনা ‘সুপ্রভাত’ ,পথে রাস্তার জামে কিম্বা ট্রাফিক লাইটে কেউ বিক্রি করতে আসছেনা ‘আজকের তাজা খবর’,বাসে ট্রেনে যাত্রিদের হাতে হাতে নেই আর আজকের কাগজটি।আছে ল্যাপটপ কিম্বা আরো অত্যাধুনিক কিছু। কেননা খবর আর কাগজে নেই। খবর আছে নেটে।হ্যাঁ, সমগ্র বিশ্ব জুড়েই খবরের কাগজ এখন হুমকির মুখে। যদিও এমন হুমকি এই প্রথম নয়।রেডিও এবং টেলিভিশন এসে ও হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।
বর্তমান সভ্য সমাজের জীবন যাত্রার সাথে ওঁতো প্রতো ভাবে জড়িত এবং সভ্য মানুষের চোখ কান এই সংবাদ পত্র। ইতিহাসের দিকে চোখ বুলালে আমারা দেখতে পাই,প্রথম শুরু হয়েছিল আজ থেকে ৫০০ বছর আগে হাতে লেখা নিউজলেটার হিসাবে মূলত বণিকদের জন্য।১৪০০ শতাব্দির শেষের দিকে জার্মান থেকে প্রকাশিত হয় প্রথম ছাপানো কাগজ ।১৬০০ শতাব্দির শুরুতেই ইংরেজী ভাষায় সংবাদ পত্র প্রকাশিত হ’তে শুরু করলেও আধুনিক সংবাদ পত্রের পথচলা শুরু ১৯৬৬ সালে ‘লন্ডন গ্যাজেট’(LONDON GAZETTE) এর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ এ পথ চলা।দীর্ঘতর হোক।হোক অনন্ত এমনই আমারা চাই।কিন্তু একাবিংশ শতাব্দিতে এসে খবরের কাগজ এখন হুমকির মুখে।তবে আশার কথা হ’লো ‘খবর’ নয় শুধুই ‘কাগজ’আছে বিপদে।এখন আর মানুষ বিরাট এক কাগজ় জুড়ে খবর খুঁজে সময় নষ্ট করতে চায়না।গুগল কিম্বা ইয়াহুতে একটি সার্চ দিলেই চলে আসে খবর. সাথে সাথে প্রয়োযনীয় সব লিঙ্ক। আমুক পৃষ্ঠায় দেখুন কিম্বা পুরানো কাগজের ঝুড়ি নিয়ে বসার ঝামেলা নেই এখানে।ব্লগিং এর সুবাদে সবাই প্রকাশ করতে পারছে তাদের মতামত--সম্পাদকীয় উপসম্পাদকীয়।সমগ্র বিশ্বের দরজা খোলা এখানে। দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা, যখন খুশি ।শুধু কি তাই ?বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে সব খবর। জীবন এখন অনেক সহজ।অধিকাংশ সময়ই কাটে কম্পিউটারের সামনে।কিন্ত কত জন লোক খবর পড়ে নিচে বিজ্ঞাপ্নের লিঙ্কটি ক্লিক করেন?তাই বিজ্ঞাপনের সংখ্যা তত বেশি নয় নেটে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক পরিসংখানে দেখা গিয়েছে অনলাইন পাঠক সংখ্যা ছাপানো কাগজ়ের সংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ।কিন্তু বিজ্ঞাপন আয় ঠিক উলটো। ছাপানো কাগজ়ের আয় দশগুন বেশি।তবে চাকুরী ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম। অনলাইনে ই সবাই চাকুরি খুঁজতে ও যোগাযাযোগ করতে পছন্দ করে।এভাবে চলতে থাকলে হয়তো দেখা যাবে বিজ্ঞাপন ও সব অনলাইনে চলে গিয়েছে।কেউ কেউ মনে করছেন ২০১২ সালের পর আর কোন ছাপানো পত্রিকা পাওয়া যাবেনা। আমরা যেমন করে ছেড়ে এসেছি গ্রামোফোন ও টেপরেকর্ডার ,ক্যাসেট প্লেয়ারের যুগ ঠিক তেমনি করেই,যেতে হবে সামনে, ভুলে যেতে হবে এ খবরের কাগজের যুগ।
উন্নত বিশ্বে বেশ কিছু কাগজে কর্মচারী ছাটাইর নজির রযেছে। সংবাদ পত্রের এমন ক্রান্তি লগ্নে সাংবাদিক গণ ও বসে নেই। চলছে বিভিন্ন ধরণের গবেষণা ও আলাপ আলোচনা।গুগল খবর গুলো পাচ্ছে কোথায়? খবরের কাগজ গুলোরই ওয়েবসাইট থেকে। কাগজই যদি আর না থাকে তবে সেখানেও বইবে ঝড়।মিডিয়া নিউজ গ্রুপের উর্ধতন কর্মকর্তা ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে সতর্কবাণী উল্লেখ করেছেন।এভাবে আর বিনা মূল্যে বিনা পরিশ্রমে এমন কি বিনা অনুমুতিতে সাংবাদিকদের পরিশ্রমকে হাত ছাড়া না করার চিন্তা ভাবনা চলছে।তিলে তিলে গড়ে ওঠা সাংবাদিকরা কাজ করেন একজন দক্ষ সম্পাদকের সাথে--সমন্বয়ে সৃষ্টি করেন সংবাদ পরিবেশনের এক ধারাবাহিকতা।যা তুলনাবিহীণ এবং অপ্রতিদন্দি ।৫০থেকে ৬৫ বছরের শতকরা ৭২ জনই ইণ্টারনেটে অভ্যস্ত হ’লেও ৬৫ উর্ধো শতকরা ৪১ জন মাত্র ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এবং উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে তো ইন্টারনেটের ব্যাবস্থাই তেমন জোরালো নয়। তাই বলে লঙ্কা অনেক দূর ভেবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে কিম্বা চোর গেলে বুদ্ধি হলেই বা কি লাভ।বরং সাবধানের কোন মার নেই।এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে টিকে থাকার সংগ্রামের।
একজন দক্ষ সাংবাদিকের লেখা এডিটরিয়ালের আজও কোন বিকল্প নেই অন্যান্য মিডিয়ায়। এখন ও বেশিরভাগ মানুষ কাগজ হাতে নিয়েই পড়েন তা শুধুমাত্র অভ্যস্ততার জন্যই নয়।সমৃদ্ধ এডিটরিয়ালের ভুমিকা অনেকাংশেই প্রধান।এ জায়গাটিতেই তাঁদের হ’তে হবে আরো সচেতন,দক্ষ এবং রাখতে হবে গভীরতার ছাপ,বহুমুখী চিন্তা ভাবনার প্রকাশ।পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনাটিকে আরো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। বাড়াতে হবে পাঠকের সাথে যোগাযোগ।সবাই তার নিজস্ব মতামত জানাতে পছন্দ করে।সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে সব ধরণের মিডিয়াতে যেমন,ইন্টারনেট,ভিডিও।ডিজিটাল ভবিষ্যতের কথা মনে না রাখলে হোঁচট তো খেতেই হবে।এমনকি পড়তে হবে মুখ থুবড়ে।যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চললে এবং নিজেদের আরো উন্নত থেকে উন্নত তর করলে সংবাদ পত্র কখনোই ইতিহাস হ’য়ে যাবেনা। আমরা সংবাদ পত্র ও সমৃদ্ধ সাংবাদিকতার অনন্ত জীবন কামনা করি।
সমকাল, ২৬ শে অক্টোবর,২০০৯ প্রকাশিত
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



