ইদানিং পরিচিত শহরটায় বদল এসেছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে নানারঙের অপরিচিত মুখ, রিক্সাওয়ালা, হকার, ভিক্ষুক, সব্জিওয়ালা...। পুরনো মুখগুলো কদাচিৎ দেখা যায়। নতুনদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে হচ্ছে তাদের। এর মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় চরিত্র হচ্ছে রিক্সার চালক। পুরনোদের চেয়ে এরা কিছুটা বৈচিত্রময়। ওদের বুদ্ধিদীপ্ত সরল চোখের ইতিউতি নড়নচড়নের জন্যই অদ্ভুত সুন্দর লাগছে এই এসিড নগরিকে। মনে হয় যেন একদল উচ্ছ্বল তরুন এসেছে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে, শহরটাকে বদলে দিতে। এদের হাসিতে এখনো কৃত্রিমতা বাসা বাঁধতে পারেনি। ওরা হঠাৎ হঠাৎ একমনে হেড়ে গলায় গেয়ে ওঠে অদ্ভুত সুন্দর কোনো গান, যে গান কেউ কখনো শুনেনি। প্যাসেঞ্জারকে মনে ধরলে বিষাদে ভরা মনের জানলার ছিটকিনি খুলে শুনায় নিজের ফেলে আসা দিনের গল্প। কেউ পড়ে দশমে, কেউ অষ্টম, কারো দৌড় স্কুল সেকেন্ডারী... সংকুচিত বাস্তবতা এদের কখনো বিদ্যাসাগরে বাসা বাঁধতে দেয়না। এরা এখনো নাটকিমুঠের কথা বলে, হলুদের বন্যায় দৌড়ানোর কথা বলে, বাঁশির সুরের কথা বলে, হা-ডু-ডুর কথা বলে। কঠিন বাস্তবতা হলো- ওদের স্বপ্ন, বাঁশীর সুর, হুলদের ভালোবাসা আজ গৃহহীন। পদ্ম এদের মাথাগুঁজার ঠাঁইকে করেছে নিচিহ্ন। অনেক অনেক স্বপ্ন আর আশার পাজল নিয়ে ওরা এসেছে শহরে। পাজল খেলায় যে ভালো দক্ষ সে-ই কেবল এখানে টিকে থাকবে। বাকীরা নিচিহ্ন হবে, ঝরবে কালের কৃষ্ণ গহ্বরে।
এরা চাইলেই ভাগ্য বদলের জন্য ইচ্ছেমাপিক শহরে পাড়ি দিতে পারেনা। আদম ব্যবসার মত এখানেও ব্যবসা চলে। দেখা যায় কিশোরদের মধ্যে ৯০% আসে পরিচিতদের হাত ধরে। শ'তিনেক টাকাকে জীবনের শেষ সম্বল ধরে এরা বাসা বাঁধে বস্তির কোনো ঝুপড়ি ঘরে। রহিম চাচা, করিম চাচাদের সাথে চলে গভির রাত পর্যন্ত নানান কল্পনা, পরিকল্পনা, স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য ছোটো ছোটো পদক্ষেপের গাঢ় আবেগী অভিলাস। আমরা ভদ্র মানুষরা ঠিক যেভাবে রেফারেন্সের উপর ভর করে ভালো চাকরী পেয়ে যাই, এখানেও চলে সেই একই রাজনীতি। রেফারেন্স শক্ত হলে ভালো কাজ পাওয়া যায়। কেউ গার্মেন্টস এর হেল্পার, কেউ সাজে হকার, কেউ বাস/ট্রাকের হেল্পার, কেউ টোকাই, কেউ হয় রিক্সাওয়ালা।
রিক্সা ভাও করা!
রেফারেন্স থাকলেই রিক্সা ভাড়া পাওয়া যায়। ব্যতিক্রমে মোটা দাগের টাকা জামানত জমা রাখতে হয় রিক্সা মালিকের কাছে। ভাড়ার পরিমান রিক্সার কন্ডিশনের উপর ওঠানামা করে। রিক্সা মোটামুটি ভালো হলে প্রতিদিন মালিককে দিতে হয় ৮০/৯০ টাকা, তারও চেয়ে ভালো হলে ১০০/১২০ টাকা। নতুন রিক্সা নয়া মুখদের কখনোই দেয়া হয়না। নতুনদের জন্য অবশ্যই পুরনো লক্করঝক্কর মার্কা রিক্সা নির্ধারিত থাকে।
দাম ?
একটি নতুন রিক্সা তৈরী করতে সর্বমোট খরচ হয় ১২০০০ হাজার টাকা! লাইসেন্সের জন্য লাগে ১৮০০০ হাজার টাকা! তাহলে কেমনে কি? আছে, উপায় আছে
আয়?
পুরনো রিক্সা চালকরা প্রতিদিন গড়ে ৪০০ টাকা করে আয় করে। রিক্সার ভাড়া, চাক্কা মেরামত, দুপুরের খাওয়া বাদ দিয়েই। নতুনরা গড়ে পায় ২৫০ টাকা।
এত টাকা যায় কোথায়?
আসাদ গেটের কবিরের ইনকাম মাসে ৬ হাজার টাকা। সব কাটশাট করে থাকে সাড়ে তিন/ ৪ হাজার টাকার মত। গ্রামের বাড়িতে পরিবার থাকে, তাই মাসের শেষে ঐ সম্বলটা নিয়ে সে গ্রামে চলে যায়। সুমন নামের এক কিশোরের দৈনিক আয় ৫০০ টাকা। ২০০ টাকা ব্যয় হয় কয়েকটা সমিতির কিস্তি, এন.জি.ওতে টাকা জমানোয়। সংসারের খরচ বাবদ যায় দৈনিক ৮০/১০০ টাকা। বাকী ২০০ টাকা সে মায়ের হাতে তুলে দেয়। কচুক্ষেতের মুন্সির মাসিক আয় কত সে জানেনা। সে একদিন পর পর রিক্সা চালায়। বেশির ভাগ রিক্সাচালকই প্রতিদিন রিক্সা চালায় না।
এদের বিনোদন?
এরা সপ্তাহে নিয়ম করে ২/৩ বার সিনেমা হলে যায়। কেউ গ্যারেজ সংলগ্ন স্থানে কিংবা বস্তিতেই কেরাম, তাস নিয়ে মেতে ওঠে বিনোদনে। শতকরা প্রায় ৭৫জন রিক্সাচালক অবৈধ যৌনকাজের নিয়মিত খদ্দের। নতুন পুরনো প্রসিদ্ধস্থান পরিদর্শনে এদের কোনো উচ্ছাসা নাই। এদের ভেতর বহু বিবাহের প্রবণতা বিদ্যমান। শতকরা প্রায় ৩০ জন রিক্সাচালকের একের অধিক স্ত্রী রয়েছে।
তারা কি সুখী?
রহমত নামক এক রিক্সাচালককে জিজ্ঞাসা করা হলে সে বলে, 'ভাই আল্লায় ভালা রাখছে। রাইতে বালা ঘুম হয়। কোনো চিন্তা ভাবনা করা লাগেনা।' সত্যিই তাদের চিন্তা ভাবনা নেই, সময়ের মারপ্যাঁচ, মানব মনের নানান কারিগরীর নিকট এদের এক সময়ের কল্পনা, জল্পনা আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অভিলাস সময়ের অন্যপ্রান্তে এসে মরে-টরে নি:শেষ হয়ে যায়। তারপরও এরা সুখী। এদের রাতে ভালো ঘুম হয়!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



