গোর্কি সদনে এক সিনেমা উত্সব শুরু হল 'shining through' , a film festival on violence against women and children। আমি পাকে চক্রে সেখানে হাজির ছিলাম, উপস্থিত ছিলেন মৃণাল সেন প্রধান অতিথি হিসেবে, ছিলেন আরো বেশ কিছু মান্যগণ্য, আর ছিলেন একশর কাছাকাছি যৌনকর্মী ৷ আয়োজকেরা এনেছিলেন তাদের,হয়ত হল ভরাতে কিংবা নিজেদেরটা গুছিয়ে নেবার এক উপাদান হিসেবে ৷
এক বক্তার ( নামটা এই মুহুর্তে মনে পড়ছেনা) কথা শুনতে মন চলে গেল এক মেয়ের কাছে, ওয়াহিদা মেয়েটির নাম, তার মা আমার কাছে কোন এক সময় কাজ করত,ফিরোজা তার নাম, ফিরোজার শরীরে আছে গোটা পঞ্চাশ সেলাই, বাঁ হাতের তিনটে আঙুল সেলাই করে কোন রকমে জোড়া দেয়া, সে হাতে সে কোন কাজ করতে পারে না, আর এই আঘাত তাকে দিয়েছিল তার নিজেরই স্বামী, গভীর রাতে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে কুপিয়ে মারার চেষ্টা করেছিল সে, ফিরোজা তখন 6 মাসের গর্ভবতী ৷
কিন্তু মৃত্যু ছিল না ফিরোজার কপালে, পাশের বাড়ির কেও গভীর রাতে প্রাকৃতিক কাজ সারতে গিয়ে রক্তে পা পিছলে পড়ে যায়, আর তারপরে ফিরোজাকে ঐ অবস্থায় দেখতে পেয়ে নিয়ে যায় ডায়মন্ড হারবার হাসপাতালে,সেখানে তাকে কিছুদিন রাখার পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় কলকাতায়, ফিরোজা বেঁচে যায়, মরে না তার গর্ভের সন্তানটি ও৷ জন্ম নেয় ওয়াহিদা ৷ ফিরোজা লোকের বাড়ি কাজকর্ম করে মেয়েটিকে বড় করে তোলে, আমার বাড়ি যখন আসে সে, ওয়াহিদা তখন বছর পাঁচের, বেশ কবছর ফিরোজা ছিল আমার কাছে বাচ্চাটিকে তার দিদিমার কাছে রেখে, মাঝে মাঝে বড়ি গেলে সাথে নিয়ে ও আসত কখনো কখনো, বেশ কবছর হল ফিরোজা চলে গেছে দেশে, ওখানেই কোথাও কাজ করে, মাঝে মাঝে আসে আমার কাছে, ঈদে, ক্কোরবানীতে, কিংবা কোন প্রয়োজনে, গতবছর এল বেশ কয়েকমাস পর, জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, ও নাকি কাশ্মীর গিয়েছিল গ্রামের এক আত্মীয়ার সাথে, সেখানে ওয়াহিদাকে বিয়ে দিয়ে এসেছে, বিয়ে দিতেই নাকি নিয়ে গিয়েছিল, শুনে চমকে গেলাম, বারবার জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলাম, তার সারমর্ম হল, মেয়ের বিয়ে নিয়ে সে বেশ চিন্তায় ছিল, (ওয়াহিদা দেখতে বেশ সুন্দরী ছিল) তখন তার গ্রামের কোন মহিলা, যে নিজে কাশ্মীরে থাকে, সে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে ফিরোজা ও তার সুন্দরী মেয়েকে নিয়ে যায় কাশ্মীরে, ফিরোজা মেয়ের ভাল বিয়ের আশায় কাওকে কিছু না জানিয়ে ওদের সাথে চলে যায় কাশ্মীরে, ওখানে এক সব্জিবিক্রেতার সাথে মেয়ের বিয়ে দেয়, আর জামাইএর হাতে মেয়েকে সঁপে দিয়ে ফিরে আসে কোলকাতা, জামাই তার ফেরার গাড়িভাড়া ও পথখরচ দিয়ে দেয় ৷
ফিরোজা বেশ সুখী ছিল মেয়ে বিয়ে দিয়ে এসে ৷মাস ছয়েক পর ফিরোজা আবার এসে হাজির, বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল এসেই, ভাবী গো, আমার ওয়াহিদা নেই, মরে গেছে ও বাচ্চা হতে গিয়ে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু যা জানতে পারলাম, ফিরোজাকে তার সেই আত্মীয়া ফোন করে খবর দেয়, ওয়াহিদা নাকি বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যায়, আমি বললাম, এই তো সেদিন বিয়ে দিয়ে এলি রে, 7 মাস ও হয়নি, এর মাঝে কি করে বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যায়?
ফিরোজার কোন উপায় ছিল না সঠিক খবর জানার, মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েও কিছুই করার ছিল না তার, কিছু টাকা দিলাম, যাতে করে সে একবার গিয়ে খোঁজ অন্তত নিয়ে আসতে পারে, সাথে করে গ্রামের আরেকজনকে নিয়ে ফিরোজা আবার গেল কাশ্মীর, জামাই তাকে চিনতেও পারে না আর, যে আত্মীয়া তাকে নিয়ে গিয়েছিল, সেও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে, আশে পাশের লোকজনের কাছ থেকে যা তথ্য উদ্ধার করল সে, তাতে করে জানা গেল, ওয়াহিদা সন্তান সম্ভবা ছিল, সেই অবস্থায়ই তাকে প্রচন্ড মারধর করা হত, কারণ সে রাজী ছিল না দেহ ব্যবসা করতে, একদিন সকালে ওয়াহিদাকে আর কেও ওখানে দেখতে পেল না ৷ সে কি সত্যি মরে গেছে, নাকি তাকে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে কেও জানে না ৷
ফিরোজার মত এক গরীব মহিলার পক্ষে সম্ভব ছিল না ওখানকার স্থানীয় লোকজনের বিরোধিতা করার, আধ পাগল অবস্থায় সে ফিরে এল, মাস 3/4 সে পাগলের মত ছোটাছুটি করল সাহায্য যোগাড় করতে, থানায় থানায় দৌড়ুল, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে গেল, কিন্তু কেও তার মেয়ের কোন খবর ঐ সুদূর কাশ্মীর থেকে এনে দিল না৷ কিছুদিন আগে ফিরোজার ছেলে এসেছিল আমার কাছে, একথা জানাতে যে, তার মা ও নিরুদ্দেশ, মেয়ের জন্যে আধ-পাগল ফিরোজা কাওকে না জানিয়ে একটি ও টাকা সঙ্গে না নিয়ে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ল মেয়ের খোঁজে কাশ্মীরের পথে...
এরপর আমি আর জানি না ফিরোজা কিংবা তার মেয়ের খবর ৷
ছবি: আজ মৃণাল সেন এর পঁচাশিতম জন্মদিন ।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০০৭ রাত ১১:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


