somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমি মেলা থেকে কোন বাঁশি কিনে আনিনি

২১ শে মে, ২০০৭ রাত ৮:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এ'বছর মকর সংক্রান্তিতে পুরুলিয়ায় গেছিলাম। মেলা দেখতে। প্রচুর মেলা বসে সেখানে। মূলত সাঁওতালদের। একদিনে দুটো মেলাই দেখা সম্ভব হয়েছিল। মাঠাবূরু'র মেলা আর জয়দেব'এর মেলা। পশ্চিমবঙ্গ আর ঝাড়খন্ডের সীমানায় জয়দেবের মন্দির। পাহাড়ের উপর মন্দির, নিচে মোটামুটি সমভূমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এই মেলা।

জয়দেবের মেলায় সকাল সকাল পোঁছে গেছিলাম, মেলা তখন সবে জমছে। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে উঁচু নিচু রাস্তা একে বেকে চলে গেছে পাহাড়ের দিকে। সুবর্ণরেখা নদীও ঢুকে পড়েছে পাহাড়ের বুক চিরে স্বচ্ছ ঠান্ডা জল নিয়ে, খানিকটা যেন ঝর্ণার মত দেখতে। জানুয়ারীর শীতে নদী বেশ শীর্ণ, রোগা ভোগা। দূরে দেখা যায় রাঁচি জামশেদপুর মহাসড়ক।

মেলায় ঢুকতেই চোখে পড়ে কলসী নিয়ে খানিক দূরে দূরে বসে আছে কয়েকজন। কারও কলসীতে তাড়ি তো কারও কলসীতে খেজুরের রস। এক গ্লাস খেজুরের রস নিয়ে খেতে পারলাম না, প্রচন্ড ঝাঁজ। রোদের আঁচে খেজুরের রসও তাড়ি হয়ে গেছে। রঙবেরঙএর জামা কাপড় পরা মানুষজন সব উত্তসবের মেজাজে আসছে, দলে দলে। মানুষগুলোকে দেখলেই বোঝা যায়, এরা প্রকৃতির সন্তান। কালো মুখগুলো আনন্দে ঝলোমলো। বাইরের লোককে এরা খুব একটা পাত্তা দেয় না। কোন অভিব্যাক্তিও ফোটে না মুখে। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকায় আবার সাথে সাথেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে মন দেয় নিজেদের দিকে।

কেউ কেউ স্নান করছে সুবর্ণরেখায়। গতরাতে স্নানের যোগ ছিল। মকরের স্নান। রাতে যারা ডুব দেয়নি, এই দিনের বেলাতেই খানিকটা হলেও পূণ্যার্জনের আশায় এই ডুব। পরনের কাপড়খানি জলে দাঁড়িয়েই পাল্টে নেওয়া আর পাথরের উপর বিছিয়ে শুকিয়ে নেওয়া। ছানা পোনাদের ধরে ধরে ঠান্ডা জলে ডুব দেওয়ানো। সে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য।

নদীর তীর ধরে দূরে দেখা যায় রঙচঙে নাগরদোলা, আরও কিছু শহুরে খেলা ধুলোর আয়োজন। কয়েকটা অস্থায়ী ফটো ষ্টুডিওও বসেছে মেলায়। পরপর তিনখানি ষ্টুডিও। কাঠবোর্ডের দেওয়ালে রঙীন দৃশ্য আঁকা। যদিও কাওকে ছবি তোলাতে দেখিনি। টিনের কৌটোয় এক অদ্ভুত রঙ নিয়ে বসে থাকতে দেখলাম কয়েকজনকে। সাথে কাঠের ব্লক। নানা ডিজাইনের। ( যেগুলো দিয়ে কাপড়ে ডিজাইন করা হয়)। ব্লক বিক্রি করছে করছে ভেবে মূল্য জানতে চাইলে বুড়ো মানুষটা আমার হাতটি ধরে বসে দিলেন সামনে, আর টিনের কৌটোয় রাখা রংএ ব্লগুলো চুবিয়ে চুবিয়ে হাটে ছাপ দিতে লাগলেন, ছোটো বড় নানা ব্লক, নানা ডিজাইনের। হাতে ফুটে উঠল মেহেন্দির নকশা! আমি অন্য হাতটিও বাড়িয়ে দিলাম, আর হাতের উল্টো পিঠেও ছাপিয়ে নিলাম ঐ নকশা। বুড়ো লোকটি একটিও কথা না বলে মন দিয়ে নিজের শেষ করে মুখ তুলে তাকালেন আর বললেন, "দশ ট্যাকা দে। "

অদ্ভুত কায়দার সব জুয়ার আসর চোখে পড়ল। টাকার পরিমান কোথাও দশ টাকার বেশি নয়। ১টাকা, দু টাকা, পাঁচ টাকা আর সর্বোচ্চ দশ টাকা। এই দুপুরবেলায় খুব একটা ভিড় নেই কোন পসারির কাছেই। শহুরে কায়দায় জায়গা ঘিরে নিয়ে ফুচকা চটপটিওয়ালাদের বরং বিক্রি বেশি। হেথায়, হোথায় দাঁড়িয়ে আছে বেলুনওয়ালা আর বাঁশিওয়ালা। রঙীন সব বাঁশি। বাঁশের বাঁশি। আমার খুব মন চাইছিল একটা বাঁশি কিনি, কিন্তু কিনলাম না! রুদ্রাক্ষের এক মালা কিনব ভেবে হাতে নিয়েও রেখে দিলাম! কেন কে জানে কিছুই কিনতে ইচ্ছে করল না...

বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা। মেলায় খাবার বলতে , ছোলা ভাজা, মটরভাজা, চটপটি, ফুচকা আর সিঙাড়া। কোথাও বা মিষ্টি। খাজা, গজা। এই মিষ্টিগুলো আসলে ভোগ। পাহাড়ের উপর জয়দেবের মন্দিরে যারা পুজো দিতে যান, এই বিশালাকারের খাজাগুলো কিনে নিয়ে যান। একএকখানা খাজার সাইজ মাঝারি আকারের ভাতের থালার মত। দুখানি খাজা ওঠে এক কিলোতে। শালপাতায় করে নিয়ে গিয়ে পুজো দিয়ে আসা আর তারপর সেই প্রসাদী খাজা বাড়ি নিয়ে যাওয়া। চড়াই উত্তরাই ভেঙে পাহাড় অব্দি পৌঁছানোর দেখা গেল চওড়া একধাপ সিঁড়ি, সোজা উঠে গেছে মন্দিরে। আমাদের গন্তব্য মন্দির ছিল না , সিঁড়ি অবদি গিয়েই ফেরার পথ ধরলাম।

ফেরার পথে খানিক বসা সুবর্ণরেখার ধারে, পাথরে। বরফঠান্ডা জলে মুখ হাত ধোওয়া। গরম গরম বাদামভাজা কিনে খাওয়া। স্বপ্নের মত সেই পাহাড়ি রাস্তা, লালমাটির উঁচু নিচু রাস্তা দিয়ে প্রকৃতির কোল ছেড়ে ফিরে আসা তথাকথিত সভ্যতার দিকে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০০৭ রাত ৯:১২
২৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×