খুব গোলমেলে, নিজেও ভাল জানি না। তবে আছে,এই ঢের।

ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে..

০৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১০

শেয়ার করুন:                   Facebook

চৈত্রের শেষ দুপুরেও রোদের তেজ একটুও কমেনি ৷ স্টেশনের সিমেন্টের বাঁধানো এক বেদীতে বসে কুলকুল ঘামি ৷ অপেক্ষায়, হাওড়াগামী ট্রেনের ৷ লেডিস কমরায় উঠব বলে এমন একটা জায়গায় এসে বসেছি যেখানে প্ল্যাটফর্মের মাথার উপর কোন আবরন নেই৷ আদ্ধেক ন্যাড়া এক গাছের ছায়া খুঁজে নিয়ে গাছের গোড়ার বাঁধানো বেদীতে বসি৷ পিঠ বেয়ে ঘামের ধারা নামে৷ রুমালের আকারের ছোট্ট তোয়ালে হাতব্যাগ থেকে বের করে মুখ গলা আর ঘাড়ের দিকটা মুছি৷ বৌদি কী হাওড়া যাবেন? প্রশ্ন শুনে মুখে তুলে তাকিয়ে দেখি হাঁটুর উপরে লুঙ্গি পরা খালি গায়ের এক লোক প্রশ্ন করেছে৷ লোকটিকে ভিখিরি ভেবে তার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাই৷ লোকটি বলে ওঠে, 'আমার মেয়েছেলেটাও হাওড়া চলে গেছে! ঘুমিয়ে ছিলাম আমি, পাশ থেকে কখন উঠে চলে গেছে টেরও পাইনি৷ মাগী বদমাইশ! বারোভাতারী, একটা ব্যাটাছেলেতে মন ভরবে তার? আমি কত খুঁজেছি মাগীকে, পাইনি৷ এখন গিয়ে আমি মদ খাব৷ দশটা টাকা আছে আমার কাছে, মদ খাব আর ঘুমাব!' ট্রেনের জন্যে অপেক্ষারত এক ভদ্রমহিলা পাশ থেকে বলে ওঠেন, 'ঐ করগে, তোমার আর কী হবে! ঠিক করেছে বৌ চলে গেছে!' লোকটি আর দাঁড়ায় না কে কী বলল শোনার জন্যে৷ এগিয়ে যায় প্ল্যাটফর্ম ধরে৷ চোখে পড়ে লোকটির সারা গায়ে দগদগে ক্ষত৷ যেন খাবলা খাবলা ছাল চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছে কেউ৷ ঐ ক্ষতের উপর বসে থাকা মাছিরাও যায় লোকটির সাথে সাথে, আগে পিছে ওড়ে তারা৷ গা শিরশির করে আমার, চোখ ফেরানোর চেষ্টা করি অন্যদিকে, রেললাইনের দিকে, ট্রেন কি আসছে!

শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছি আমি। অসুস্থ শ্বশুরমশাইকে দেখতে এসেছিলাম ৷ বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ তিনি, দুদিন আগে ফোন করে শাশুড়ি বলেন, তোমার বাবার শরীরটা বেশ খারাপ। শরীর প্রায়শই খারাপ থাকে তবু এভাবে তো বলেন না ওঁরা। জানতে চাই, আমি কী একবার বাড়িতে আসব মা? শাশুড়ি বলেন, আসবে? তা এসো! কবে যাব জেনে নিয়ে তিনি বলেন, এলে আর সেদিন ফিরে যাবে না, সেইমত ব্যবস্থা করে এসো ৷ সম্মতি জানাই ৷ রবিবারে নাকি ট্রেন এমনিতেই কম থাকে ৷ তায় প্রতিটি ট্রেনই দশ-পনের মিনিট করে লেট থাকে, প্ল্যাটফর্মে অস্থির পায়চারীরত সাদা চুড়িদার কামিজ পরা একটি মেয়ে নিজের মনেই বলে যায়৷ আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চায় লাষ্ট ট্রেন কখন গেছে৷ হেসে ফেলি আমি, লাষ্ট ট্রেন দেখতে পেলে তো আমি তাতেই চেপে বসতাম আর এতক্ষণে হাওড়ার কাছাকাছি চলেও যেতাম! এবারে মেয়েটিও হেসেই ফেলে৷

পাশে নামিয়ে রাখা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হই এটাকে বয়ে সেই বাড়ি অব্দি নিয়ে যেতে হবে ভেবে ৷ দেখতে ছোট হলেও ব্যাগটি বেশ ভারী ৷ গাছের নারকোল, দু'রকমের আচারের শিশি, কাগজি লেবু কী নেই এতে! আর সেই বই দুটো ও তো আছে, সময় কাটানোর কথা ভেবে যে দুটো আমিই সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম অথচ একবারও খুলে দেখিনি! মন প্রসন্ন হয় ভোরবেলায় ছাদ থেকে কুড়িয়ে আনা আমের গুটিগুলো ও শাশুড়ি দিয়ে দিয়েছেন ভেবে! ক্ষুদ্র এক জিনিস, যার কোন মূল্যই নেই, আমি কুড়িয়ে না আনলে সেগুলো ছাদেই পড়ে থেকে শুকিয়ে যেত আর তারপর ঝরা পাতা ঝাট দেওয়ার সময় ওরাও চলে যেত শুকনো পাতাদের সাথে৷

ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই ছাদে চলে গিয়েছিলাম৷ ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখি, দাঁড়িয়ে থাকি রেলিং ধরে ৷ এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে একা রাত্রিবাস আমার৷ ও'র কথা ভাবি, গতকাল দুপুর থেকে আজ এই ভোর অব্দি এক মুহুর্তের জন্যেও সে মন থেকে সরেনি৷ রাতে আধো ঘুম আধো জাগরনের মাঝেও সে ছিল৷ কথা বলেছে, খুনসুটি করেছে, আদর করেছে৷ সে কী তবে স্বপ্ন ছিল!

খানিক পরেই শাশুড়িও উঠে আসেন ছাদে, হাতে অ্যালুমিনিয়ামের জাগ ভর্তি জল, টবে দেবেন ৷ শুকনো মরে যাওয়া গাছ সব, কয়েকটা ফণিমনসা শুধু বেঁচে আছে জল ছাড়াই৷ জলের জাগ শাশুড়ি মায়ের হাত থেকে নিয়ে একটু একটু করে সব কটা টবেই জল দেই৷ মা বলেন, হাঁটুতে ব্যাথা, কোমরে ব্যাথা, ছাদে উঠতে পারি না এখন আর, গাছগুলো সব শুকিয়ে গেল গো! এই ক্ষরায় কী গাছ বাঁচে জল ছাড়া! আমি শুনি, এই ছাদ নাকী ও'র খুব প্রিয়৷ অনেক আগে, যখন ও বাড়িতে থাকতো, বেশির ভাগ সময়ই এই ছাদে কাটাতো৷ মাদুর পেতে বই নিয়ে ছাদে চলে আসতো, ঘন্টার পর ঘন্টা ছাদেই থাকতো সে৷ তখন নাকি অনেক গাছ ছিলো ছাদে৷ দু'বেলা গাছেরা জল পেত, ইট আর সিমেন্টের এই ছাদে ছিল এক ছোট্ট বাগান৷ তবে সাজানো নয়৷ ইতস্তত: ছড়ানো ছিল সব টব৷ এখানে ওখানে৷ ঠিকই তো! যে বাগানে সে সময় কাটায়, যে যায়গা ও'র প্রিয়, সেই বাগান সাজানো হতেই পারে না!



(ডায়রিতে লিখে রাখা অনেকদিন আগের কিছু কথা। ।
সচলায়তনে প্রকাশিত। প্রথম পাতার জন্যে নয়। )

 

প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরিতুমি আমি  বিভাগে ।

 

  • ২৮ টি মন্তব্য
  • ২৮৭ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৬ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি
১. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৩১
comment by: তেলাপোকা বলেছেন: :)
২. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৩৬
comment by: শ্যাজা বলেছেন: এই স্মইলিডা কিসের লাগি বুইতে পারলাম না ভাই আরশোলা থুক্কুরি তেলাপোকা :-((
৩. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৪১
comment by: মৈথুনানন্দ বলেছেন: এখন sachet করে আচার পাওয়া যায় ফুড বাzআরে। ভালো কথা - তোমার একটা কথা আমায় পুরোনো একটা কথা মনে করিয়ে দিল। ( কতো কথা রে! ) আমি কিন্তু ক্লাস এইটে বাংলায় হায়েস্ট পেয়েছিলুম...৭৬...হুঁউ। তিরিশ তো হাতছানি দিয়ে ডাকছে --- এখন কি আর তোষকের --- থুড়ি শশকের কথা মনে থাকে?
৪. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৫১
comment by: শ্যাজা বলেছেন: আচার এখন আমি আর খাই না যে!
ফুডবাজার বড় দেরি করে ফেলল বাজারে আচার আনতে আনতে:-((

হায়েষ্ট পেয়েছিলে?!
বাপস!
হায়েষ্ট শুনলেই আমার কি'রম ভয় ভয় করে:-((
৫. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সকাল ১১:৩৬
comment by: সান্তর বলেছেন: আমার ডায়েরী হারিয়ে গিয়েছে যেনো কোথায়। হায়! হায় করতে থাকি আর হঠাত্‌ মনে পড়ে আমার তো ডায়েরী ছিলোই না।

শেয়ার করে যান জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনাগুলো।
৬. ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৪৩
comment by: শ্যাজা বলেছেন: ধন্যবাদ সান্তর।

আপনার ব্লগ দেখলাম, বেশ মজাদার।
৭. ১০ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:১৭
comment by: আবু সালেহ বলেছেন: স্বৃতিচারন বেশ ভালো লাগলো....

আচ্ছা বেদী কি???@ শ্যাজা
৮. ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:০০
comment by: শ্যাজা বলেছেন: ধন্যবাদ আবু সালেহ।

বেদী- সিমেন্টের বেঞ্চ। পাথরেরও তো হয়..
৯. ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৪
comment by: ভাস্কর চৌধুরী বলেছেন: আমাদের সাথে শেয়ার করে যান জীবনের ঘটনাগুলো। খুব ভালোই লাগলো স্মৃতিচারন।
১০. ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৯
comment by: শ্যাজা বলেছেন: ধন্যবাদ ভাস্কর।
১১. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:০০
comment by: মৈথুনানন্দ বলেছেন: এবার পুজোয় ভাইজ্যাগ যাবে না? ভল্ভো সার্ভিস চালু হয়েছে জানো তো!
১২. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১:৩৫
comment by: শ্যাজা বলেছেন: এই জানলাম!

তুমি যাচ্ছ নাকি?
১৩. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১:৪৬
comment by: কালপুরুষ বলেছেন: অহন রাইত বেশী হইছে। পড়তে পারুম না। কাইলকা পরুম। কেমুন আছুইন?
১৪. ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১:৫১
comment by: শ্যাজা বলেছেন: দিব্য আছি।

যখন মর্জি তখন পড়ুইন। কুনো সমস্যা নাই।
১৫. ২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৪৪
comment by: অন্ধকার বলেছেন: ভালো লেখাগুলো কেন যে মূল্যায়িত হয় না এখানে।
ভালো লেগেছে।
১৬. ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ দুপুর ২:৩৬
comment by: শ্যাজা বলেছেন: অন্ধকার,
এই যে আপনি আপনার ভালো লাগাটুকুকু জানিয়ে গেলেন, খুব ভালো লাগলো।

ধন্যবাদ।
১৭. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৩৩
comment by: এরশাদ বাদশা বলেছেন: চমৎকার ভাষায় স্মৃতিচারণ, ভালো লাগলো। ৫
১৮. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৫০
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: এখনো লেখা হয়ে উঠলো না...
১৯. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:১৯
comment by: শ্যাজা বলেছেন: নাহ...

কিছুই হচ্ছে না...
২০. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:৩০
comment by: সফদর আলী বলেছেন: এরকম দু'একটা লেখা পড়ার লোভেই মাঝে মাঝে এখানে (ও সচলায়তনে) ঢু মারি।
২১. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:৩৫
comment by: সফদর আলী বলেছেন: লেখাটি কিভাবে যেন চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল...
অবশ্য দিনে/দু'দিনে একবার আসলে তো আর কারো দোষ দিতে পারিনা। টপ রেটেড এর ঘর তো শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য বরাদ্দ
২২. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:২৮
comment by: শ্যাজা বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।
২৩. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৩৪
comment by: কালপুরুষ বলেছেন: কম কম দেখি,
ভুলে গেলে নাকি?
২৪. ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৩৯
comment by: শ্যাজা বলেছেন: কম কম আসি।
২৫. ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:১৫
comment by: মৈথুনানন্দ বলেছেন: অ্যাই তোমাদের ওখেনে জল ক ফুট উঠেছিল গো?
২৬. ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:২৫
comment by: নূর-ই-হাফসা বলেছেন: ভাল লাগল পড়ে।
২৭. ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:১৬
comment by: শ্যাজা বলেছেন: ধন্যবাদ নূর-ই-হাফসা ।

আনন্দ,
আমাকে জল দেখতে হলে কলকাতায় যেতে হয়:-))

আমার বাড়ি থেকে বাসষ্টপ আর তারপর ষ্টপ থেকে ব্রীজ পার করে সোজা ওপারে গেলেই জল শুধু জল।
অবশ্য হাওড়ার ভেতরদিকে গেলেও বোধ হয় জল দেখা যেত কিন্তু দরকার পড়ে না খুব একটা ওদিকে যাওয়ার।

তোমাদের কি অবস্থা গেল?
২৮. ০১ লা অক্টোবর, ২০০৭ সকাল ১১:৫৩
comment by: ইছামতী বলেছেন: Ekta bishes dorkar e likhchhi. Tomar mail id amar kachhe nei tai ekhanei likhchhi. http://www.e-dur.net er Eid Greetings chalu hochchhe. Mushlimder ritiniti samparke ami khub bhalo janina, tai cardgulo baddo sadamata hoye jachchhe. Tumi jodi Kichhu quotation athoba nijer chhoto chhoto 2/4 line kore lekha (e-card e byabohar korar jonyo)dao tobe khub bhalo hai. e-card toiri korar jonyo tomar tola kono upojokto chhobi jodi pathao tobe khub bhalo hai. Amar hate somoi khub kom... jodi etuku upokar karo tobe khusi habo. Samnei Eid ebong Durgapujo bole ei duti bisoy nie kaajta age shes korte chai. Echhara o jodi onyo jekono bisoye tomar kichhu korar thake koro pls... bhalo theko. amar mail id http://www.e-dur.net e pabe. ekhane o likhe dichchhi or
Bhalo theko

 



 


আমি লিখি আবার লিখি না।
আমি শাহজাদী কিন্তু হাতি ঘোড়া নেই।
ঘুমোতে ভালবাসি, তবে জেগে জেগে।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৩১২৭৯