প্রাণের বান্ধব রে...
১৮ ই নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১২:৩৮
এই ক'দিন পাগলের মত শুধু সিনেমা দেখলাম। শুধু সিনেমা। ন'টার ফার্ষ্ট শো দেখতে হলে বাসা থেকে বেরোতে হয় আটটায়, আরেকটু আগে বেরুলে ভালো হয় কিন্তু আটটা ঠিকাছে। একটু তাড়াতাড়ি পা চালাতে হয়, খানিকটা দৌঁড়ুতেও হয় কখনো বাস বা শেয়ারের গাড়ির জন্যে তো কখনো হলে ঢোকার লাইনের জন্যে। সকালের ঐ সময়ে কোন গাড়িতে যাব সেটা নিয়ে পছন্দের কোন ব্যপার নেই। সামনে যা পাও জাষ্ট উঠে পড়ো!
এখানে নন্দীগ্রাম নিয়ে গোটা পশ্চিমবাংলা উত্তাল। বনধ, মিছিল। বিক্ষোভ। পাল্টা মিছিল। পুলিশ। লাঠি। লকআপ। নন্দীগ্রাম গণহত্যা কেন, যে কোন প্রকারের অত্যাচারই নিন্দনীয়। কাওকে হত্যা করার কোন অধিকারই কারোর নেই। তবুও মানুষ মানুষকে মারে নির্বিচারে। গণধর্ষণ হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রতিবাদের ভাষা এক একজনের এক একরকম। কেউ মোমবাতি জ্বালান, কেউ মিছিলে হাঁটেন, কেউ বা বনধ ডাকেন।
আমি কোনদিন কোন মিছিলে যাইনি। নন্দীগ্রামে গণহত্যা, শাসকদলের অত্যাচারের প্রতিবাদে লাখো মানুষের ঐ নীরব মিছিলেও আমার যাওয়া হয়নি। অথচ মন পড়েছিল ওখানেই। মিছিলে গেছেন এমন বন্ধুর ফোনে বারবার ফোন করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাব বলে তৈরি হয়েও যাওয়া হয়নি। ঠিক সাহস করতে পারিনি। বরাবরের কূপমুন্ডুক আমি তাই সম্পূর্ণ অরাজনৈতীক প্রতিবাদ মিছিলেও যাইনি। বাড়িতে থেকেই চোখ রেখেছি টিভির পর্দায়, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি এদিক ওদিক। ব্যাস। ওটুকু...
অনেকে চলচ্চিত্র উৎসব বয়কট করেছেন নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে। অনেক বড় বড় নামী দামী নাম সে লিষ্টে। আমার চেনা একজনও বললেন, বয়কট করেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না বা হয়নি। বছরে এই একবারই এভাবে সিনেমা দেখার সুযোগ আসে আর এবছর তো আমার হাতে ডেলিগেট পাস! কিন্তু তবু ভাবছিলাম, সত্যি কি সিনেমা দেখব? অন্তত এটুকু করি, এই সরকারের আয়োজিত এই উৎসবে না যাই...
রবিবার ১১তারিখে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসএর সামনে থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বেরুনোর কথা। কারা আসবেন সেই মিছিলে সেসব কিছুই জানি না। শুভজিত শুধু বলেছিল, বেলা দুটোর মধ্যে অ্যাকাডেমির সামনে চলে এসো। শুভজিত নিজে বয়কট করেছে এই ফেষ্টিভ্যাল (আমার জানামতে)। মিছিলে যাব নাকি সিনেমা দেখব এই নিয়ে দোলাচলে আমি দোদুল্যমান মন নিয়ে বেলা দুটোর মধ্যেই অ্যাকাডেমির সামনে গিয়ে হাজির হই। সেখানে পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়। আমি তাঁকে চিনি আমার বরের সহকর্মী হিসেবে, মিছিলে যাচ্ছ কী জানতে চেয়ে শুনলাম, সকালের শোয়ে সিনেমা দেখে এখন বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছি, মিছিল শেষে আবার টুক করে ঢুকে পড়ব সিনেমা দেখতে! শুনে আমি নিশ্চিন্ত মনে সিনেমা দেখতে ঢুকে যাই নন্দন চত্বরে। যাই মন দিয়ে সিনেমা দেখি গে..
খানিকক্ষণের জন্যে দুপুরবেলা সেদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে লগইন করতেই চট্টগ্রামের অর্কুট বন্ধু জাভেদ নক করলো, এখানে তো সাইক্লোন আসছে, তোমাদের ওদিকে কী খবর? এখানে সেদিন খটখটে রোদ। জাভেদ বললো, কী হবে জানি না তবে পূর্বাভাস যা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অবস্থা খারাপ হবে। পরদিন সকালে আব্বাকে ফোন করি ততক্ষণে কালো হয়েছে কলকাতার আকাশও। সাইক্লোনের পূর্বাভাস এখানকার কাগজেও। আব্বা বলেন, ঝড় আসছে, বিকেলের দিকে বা তারও পরে ভাঙবে, এখনো শুধু সাজছে। তবে এবার বোধ হয় চিটাগাং বেঁচে গেল! শুনে আমি স্বার্থপরের মত নিশ্চিন্ত হই। সবার খোঁজ খবর নিয়ে ফোন রেখে মন দিই নিজের কাজে। সন্ধের ঝড়ো বাতাস আর শিরশিরে ঠান্ডায় ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দেশের কথা ভাবি। বন্ধ জানালার কপাট কাঁপে বাতাসে, বারে বারেই মনে হয় এই বুঝি খুলে গেল বন্ধ ছিটকিনি...মন খারাপ হয়, চিন্তা হয়। কে জানে কী অবস্থায় আছে দেশের মানুষ...
একলা একলা নন্দন চত্বরের এ'হল ঐ হল ঘুরে ঘুরে সিনেমা দেখলাম এই ক'দিন। প্রথম দু'দিন অবশ্য আমার বরও ছিলেন ঐ চত্বরেই কিন্তু এক হলে নয়। আমি নন্দন ১এ তো উনি শিশির মঞ্চে। সিনেমা শেষ হলে বেরিয়ে এসে পরের সিনেমা শুরু হওয়ার মাঝের খানিকটা সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ফোঁকা, কী দেখলে কেমন দেখলে জাতীয় দু-চারটে কথা। দুপুরের খাওয়াটা ঐ দু-তিনদিন একসাথেই হয়েছে ৩টের শো শুরু হওয়ার আগে বেশ খানিকটা সময় হাতে থাকে বলে। একা একা একটানা অনেকগুলো সিনেমা দেখাটা নিজের কাছেই কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিল। মন খারাপও যে হত না তা নয়। সব সিনেমাই যে খুব ভালো লেগেছে বা খুব মন দিয়ে দেখেছি তা তো নয়। মন এদিক ওদিক ছোটাছুটি তো করেই বা করবেই। চোখ সিনেমার পর্দায় মন চলে যায় কোথায় কোথায়...
নন্দন ২য়ে সিনেমা দেখতে গেলেই মনে পড়ে নাসরীনের কথা। উড়ে যায় নিশিপক্ষী নামের একটা সিনেমা এসেছিল দু বছর আগের ফেষ্টিভ্যালে। সেখানেই নাসরীনের সাথে আলাপ। ওর কোন এক উপন্যাসের চিত্ররূপ বলে নাসরীন আমন্ত্রিত ছিল ফেষ্টিভ্যালে। নাসরীনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কোন কারন ছিল না কিন্তু তবু হয়েছিল। ওর ছেলেমানুষি ওর পাগলামো ওর প্যাশনআমার ভীষণভাবে মনে পড়ে। আমার নিজের এক খুব ব্যক্তিগত এক কারনেও ওকে খুব মনে পড়ে আমার। প্রায়শই। এই উৎসবে বারে বারেই নাসরীনকে মনে পড়েছে... অজান্তেই নন্দন চত্বরের এদিক ওদিক চোখ গেছে... ও কী আছে এখানেই?
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): সিনেমা ;
প্রকাশ করা হয়েছে: আমার দিনকাল বিভাগে ।
শ্যাজা বলেছেন:
আনন্দ,শুভজিত আমার বরের বন্ধু। একজন ফটোগ্রাফার। কাজ করে দৃক ইন্ডিয়ায়। ওর কথা প্রায় পোষ্টেই আসে তো ...
মাহবুব সুমন বলেছেন:
ভালো লাগলো লেখা
শ্যাজা বলেছেন:
মাহবুব সুমন,ধন্যবাদ।
আনন্দ,
আমার জানামতে নয়। সুচেতা দাসের নাম এই প্রথম শুনলাম। এরা মূলত ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকমের ফটোগ্রাফির প্রদর্শনী করে, কিছু ডকু ফিল্মও বানায়। নানা রকমের শোয়ের আয়োজন করে। শর্ট ফিল্ম দেখায় দেশ-বিদেশের যেগুলোর বেশিরভাই ডকুমেন্টরি। বিসর্জন জন্ম বলে একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম অ্যাবর্শন ডায়ালগস নামের এক ছবি প্রদর্শনী দেখে। সেটাও ওদেরই আয়োজিত ছিল। দৃক বাংলাদেশেও আছে, নেপাল আর বোধ হয় শ্রীলংকাতেও।
শ্যাজা বলেছেন:
না ভাস্কর, ঢাকায় না। সামনের বছর মার্চ এন্ডে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আপনার মেইল আইডি টা দিয়েন তো...
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম বলেছেন:
আপনার লেখা পড়তে ভালো লাগে।লেখায় সামান্য তথ্যবিভ্রাট আছে, সংশোধন করে দিলে কিছু মনে করবেন না আশা করি, আপনি যে ফিল্মটির কথা উল্লেখ করেছেন ওটার নাম 'শঙ্খনাদ'। নাসরীন জাহানের উপন্যাস 'উড়ে যায় নিশিপক্ষী' অবলম্বনে ছবিটি তৈরী করা হয়েছে। পরিচালনা করেছেন আবু সাইয়ীদ।
শ্যাজা বলেছেন:
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম,অনেক ধন্যবাদ। নামটি আমি আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম। বইয়ের নামটি মনে ছিল সেটিকেই সিনেমার নামের সাথে গুলিয়েছি।
আবারও ধন্যবাদ।
কালপুরুষ বলেছেন:
কি গো শাহজাদী! তোমার খবর কী? অনেকদিন পর এলে। কেমন আছো? সব খবর ভাল তো? অর্কুটে যাওয়া হয়না খুব একটা তাই যোগাযোগ হয়না তেমন একটা। দেশে আসার কথা ছিল, কী হলো? এলে জানিও। ফোন করো সময় পেলে।
মোদের দাবি মানতে হবে - নইলে গদি ছাড়তে হবে
কালপুরুষ বলেছেন:
আজ আবার সেই পথে দেখা হয়ে গেল.....
মুসতাইন জহির বলেছেন:
কেমন আছেন আপু?
শ্যাজা বলেছেন:
ভাল আছি জহির।ঢাকায় গিয়ে তোমার খোঁজ করেছিলাম কিন্তু কেউ খোঁজ দিতে পারল না। ফোন নম্বর না থাকায় এই বিভ্রাট।
তুমি ঠিকঠাক?


















