somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... প্রাণের বান্ধব রে...
এখানে নন্দীগ্রাম নিয়ে গোটা পশ্চিমবাংলা উত্তাল। বনধ, মিছিল। বিক্ষোভ। পাল্টা মিছিল। পুলিশ। লাঠি। লকআপ। নন্দীগ্রাম গণহত্যা কেন, যে কোন প্রকারের অত্যাচারই নিন্দনীয়। কাওকে হত্যা করার কোন অধিকারই কারোর নেই। তবুও মানুষ মানুষকে মারে নির্বিচারে। গণধর্ষণ হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রতিবাদের ভাষা এক একজনের এক একরকম। কেউ মোমবাতি জ্বালান, কেউ মিছিলে হাঁটেন, কেউ বা বনধ ডাকেন।

আমি কোনদিন কোন মিছিলে যাইনি। নন্দীগ্রামে গণহত্যা, শাসকদলের অত্যাচারের প্রতিবাদে লাখো মানুষের ঐ নীরব মিছিলেও আমার যাওয়া হয়নি। অথচ মন পড়েছিল ওখানেই। মিছিলে গেছেন এমন বন্ধুর ফোনে বারবার ফোন করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাব বলে তৈরি হয়েও যাওয়া হয়নি। ঠিক সাহস করতে পারিনি। বরাবরের কূপমুন্ডুক আমি তাই সম্পূর্ণ অরাজনৈতীক প্রতিবাদ মিছিলেও যাইনি। বাড়িতে থেকেই চোখ রেখেছি টিভির পর্দায়, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি এদিক ওদিক। ব্যাস। ওটুকু...

অনেকে চলচ্চিত্র উৎসব বয়কট করেছেন নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে। অনেক বড় বড় নামী দামী নাম সে লিষ্টে। আমার চেনা একজনও বললেন, বয়কট করেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না বা হয়নি। বছরে এই একবারই এভাবে সিনেমা দেখার সুযোগ আসে আর এবছর তো আমার হাতে ডেলিগেট পাস! কিন্তু তবু ভাবছিলাম, সত্যি কি সিনেমা দেখব? অন্তত এটুকু করি, এই সরকারের আয়োজিত এই উৎসবে না যাই...

রবিবার ১১তারিখে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসএর সামনে থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বেরুনোর কথা। কারা আসবেন সেই মিছিলে সেসব কিছুই জানি না। শুভজিত শুধু বলেছিল, বেলা দুটোর মধ্যে অ্যাকাডেমির সামনে চলে এসো। শুভজিত নিজে বয়কট করেছে এই ফেষ্টিভ্যাল (আমার জানামতে)। মিছিলে যাব নাকি সিনেমা দেখব এই নিয়ে দোলাচলে আমি দোদুল্যমান মন নিয়ে বেলা দুটোর মধ্যেই অ্যাকাডেমির সামনে গিয়ে হাজির হই। সেখানে পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়। আমি তাঁকে চিনি আমার বরের সহকর্মী হিসেবে, মিছিলে যাচ্ছ কী জানতে চেয়ে শুনলাম, সকালের শোয়ে সিনেমা দেখে এখন বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছি, মিছিল শেষে আবার টুক করে ঢুকে পড়ব সিনেমা দেখতে! শুনে আমি নিশ্চিন্ত মনে সিনেমা দেখতে ঢুকে যাই নন্দন চত্বরে। যাই মন দিয়ে সিনেমা দেখি গে..

খানিকক্ষণের জন্যে দুপুরবেলা সেদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে লগইন করতেই চট্টগ্রামের অর্কুট বন্ধু জাভেদ নক করলো, এখানে তো সাইক্লোন আসছে, তোমাদের ওদিকে কী খবর? এখানে সেদিন খটখটে রোদ। জাভেদ বললো, কী হবে জানি না তবে পূর্বাভাস যা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অবস্থা খারাপ হবে। পরদিন সকালে আব্বাকে ফোন করি ততক্ষণে কালো হয়েছে কলকাতার আকাশও। সাইক্লোনের পূর্বাভাস এখানকার কাগজেও। আব্বা বলেন, ঝড় আসছে, বিকেলের দিকে বা তারও পরে ভাঙবে, এখনো শুধু সাজছে। তবে এবার বোধ হয় চিটাগাং বেঁচে গেল! শুনে আমি স্বার্থপরের মত নিশ্চিন্ত হই। সবার খোঁজ খবর নিয়ে ফোন রেখে মন দিই নিজের কাজে। সন্ধের ঝড়ো বাতাস আর শিরশিরে ঠান্ডায় ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দেশের কথা ভাবি। বন্ধ জানালার কপাট কাঁপে বাতাসে, বারে বারেই মনে হয় এই বুঝি খুলে গেল বন্ধ ছিটকিনি...মন খারাপ হয়, চিন্তা হয়। কে জানে কী অবস্থায় আছে দেশের মানুষ...

একলা একলা নন্দন চত্বরের এ'হল ঐ হল ঘুরে ঘুরে সিনেমা দেখলাম এই ক'দিন। প্রথম দু'দিন অবশ্য আমার বরও ছিলেন ঐ চত্বরেই কিন্তু এক হলে নয়। আমি নন্দন ১এ তো উনি শিশির মঞ্চে। সিনেমা শেষ হলে বেরিয়ে এসে পরের সিনেমা শুরু হওয়ার মাঝের খানিকটা সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ফোঁকা, কী দেখলে কেমন দেখলে জাতীয় দু-চারটে কথা। দুপুরের খাওয়াটা ঐ দু-তিনদিন একসাথেই হয়েছে ৩টের শো শুরু হওয়ার আগে বেশ খানিকটা সময় হাতে থাকে বলে। একা একা একটানা অনেকগুলো সিনেমা দেখাটা নিজের কাছেই কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিল। মন খারাপও যে হত না তা নয়। সব সিনেমাই যে খুব ভালো লেগেছে বা খুব মন দিয়ে দেখেছি তা তো নয়। মন এদিক ওদিক ছোটাছুটি তো করেই বা করবেই। চোখ সিনেমার পর্দায় মন চলে যায় কোথায় কোথায়...

নন্দন ২য়ে সিনেমা দেখতে গেলেই মনে পড়ে নাসরীনের কথা। উড়ে যায় নিশিপক্ষী নামের একটা সিনেমা এসেছিল দু বছর আগের ফেষ্টিভ্যালে। সেখানেই নাসরীনের সাথে আলাপ। ওর কোন এক উপন্যাসের চিত্ররূপ বলে নাসরীন আমন্ত্রিত ছিল ফেষ্টিভ্যালে। নাসরীনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কোন কারন ছিল না কিন্তু তবু হয়েছিল। ওর ছেলেমানুষি ওর পাগলামো ওর প্যাশনআমার ভীষণভাবে মনে পড়ে। আমার নিজের এক খুব ব্যক্তিগত এক কারনেও ওকে খুব মনে পড়ে আমার। প্রায়শই। এই উৎসবে বারে বারেই নাসরীনকে মনে পড়েছে... অজান্তেই নন্দন চত্বরের এদিক ওদিক চোখ গেছে... ও কী আছে এখানেই?







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28746071 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28746071 2007-11-18 00:38:36
১৩তম চলচ্চিত্র উৎসব ও আমার সিনেমা দেখা
সিনেমা দেখলাম আজকে ৬টা যার মধ্যে ২টো শর্ট। ডার্ক নাইট আর টু অন ব্রীজ। প্রথমটি খুবই ভালো লেগেছে, দ্বিতীয়টি বেশ মজার। ( পরে এই লেখাতেই সিনেমাগুলির একটু ডিটেল যোগ করে দেব) ।

ফার্নান্ডো ই সোলানাসের দ্য ক্লাউড, জাফার পানাহির অফসাইড, ব্রাজিলের সিনেমা আই রিমেম্বার, আমাস গিতাইয়ের প্রমিসড ল্যান্ড।
খুব ভালো লেগেছে অফ সাইড। সিনেমা দেখতে গিয়ে কোন চাপ নেই। আমাস গিতাইয়ের সিনেমা আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, হল ছেড়ে পালিয়ে এসছি শেষের খানিকটা বাকি থাকতে। গরু ছাগলের মত নিলামে কিনে নিয়ে একদল মেয়েকে পাচার করার গল্প।

সিনেমার গল্প সময় নিয়ে লেখার ইচ্ছে রইল।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28744858 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28744858 2007-11-12 07:44:23
ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...
আবার এমনও হয়, হঠাত্ করে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হয় কেঊ যেন জানালা দিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছে, আর দাঁড়িয়েছে খুব কাছে এসে৷ তাকিয়ে আছে অপলক,নি:শ্বাস ফেলছে গায়ের পরে...আমি পাগলের মত দৌঁড়ুই, সোজা সামনের ঘরে, যেখানে মিষ্টি ঘুমিয়ে আছে ...দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি দরজা ধরে, কাঁপি থরথর থরথর... খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চেষ্টা করি ধাতস্থ হওয়ার৷ ফিরে আসি নিজের ঘরে, ঘরের বাতি জ্বালিয়ে জানালাগুলো টেনে বন্ধ করি পর্দাগুলো টেনে দিই ভালো করে, একটুও ফাঁক-ফোকর যেন না থাকে৷ পাশ বালিশ টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ি গুটিসুটি মেরে, যতখানি গুটিয়ে শোওয়া যায়!

আমার ভীষণ ভয় করে, ভীষণ ভয়! স্বপ্নেরা অনবরত ভয় দেখায়...কেউ যেন কাটা-ছেঁড়া করে আমায়...ছুরি কাঁচি চালায় যখন তখন ...যত্র তত্র... কোন অষুধ দেয় না, দেয় না কোন অ্যানেস্থেশিয়া ..কিছু একটা অপারেশন চলছে, আমি সেটা দেখি... আমারই উপর চলছে কাটা-ছেঁড়া...ব্যথার আশঙ্কায় আমি চীত্কার করি...ব্যথাহীন ব্যথায় নীল হয়ে যাই... ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28743976 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28743976 2007-11-09 15:30:12
ক্রিং ক্রিং টেলিফোন হ্যালো হ্যালো হ্যালো...
আমি একছুট্টে চলে যাই ছেলেবেলায়, খুঁজতে থাকি চেনা মুখগুলো। বিস্মরণের গলিগুলোতেও ঘুরে আসি একপাক। আতিপাতি করে খুঁজি সব ঘিঞ্জি গলি। কিন্তু কোথাও আমি খুঁজে পাই না আনোয়ারকে।

আমি সত্যিই চিনতে পারি না। তবে একটা আবছা অবয়ব ফুটে ওঠে আর মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে যায়, আনোয়ার! রোগা ঢ্যাঙ্গা আর কালো? ওপাশ থেকে জোরালো হাসির শব্দ আসে, হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই রোগা ঢ্যাঙ্গা কালো আনোয়ার! এই তো মনে আছে! ব্যস, ঐটুকুই! আর কিছু মনে পড়ে না। আইএসডি ফোন কানে নিয়ে বেশি চিন্তাও করা যায় না। ওদিকে ফোন হাতবদল হয়েছে বুঝতে পারি। এবারে নারীকন্ঠ ভেসে আসে। আমি আনোয়ারের মিসেস। আপনি তো সামরান। ওর ছেলেবেলার বন্ধু! আপনার কথা আমার সাহেবের কাছে এতো শুনেছি এতো শুনেছি যে আপনাকে কোনদিনও না দেখেও আপনাকে ভীষণ চেনা মনে হয় আর খুব আপন মনে হয়। আপনি ভালো আছেন তো?

আমার অবাক হওয়ার পালা তো কেবল শুরু! কি বলব না বলব ঠিক যেন ভেবে না পেয়েই বলি, ভালো আছি, আপনাকে তো চিনি না, আপনার নামও জানি না কিন্তু আপনি আমার কথা শুনেছেন, আর আপন বলে ভেবেছেন। কি বলব বুঝতে পারছি না! শুনলাম আমার নাকি একটা ছবিও আছে আনোয়ারের কাছে। সাদায় কালোয় ফুলছাপ ফ্রক পরা এক ছোট্ট মেয়ের ছবি। ওপাশের নারীকন্ঠ আবার জানতে চায়, আপনি এখন কেমন হয়ছেন দেখতে?

কেমন? যেদিক দিয়ে হেঁটে যাই, লাইন দিয়ে সব লাশ পড়ে । দুজনের সম্মিলিত হাসির শব্দে বুঝতে পারি, ওরা ফোন লাউডস্পিকারে রেখেছে! আনোয়ারের স্ত্রী বলে, আপনি কী এখনো আগের মতই অহংকারি? অহংকার? আমার? জবাব আসে, আপনি নাকি খুব অহংকারি ছিলেন। কাউরে পাত্তাই দিতেন না! আমি হেসে ফেলি। আর্জি আসে, ঢাকায় গেলে যেন একবার অবশ্যই অবশ্যই দেখা দেই। অনেকক্ষণ ধরে যে প্রশ্নটা ঠোঁটের ভেতরে আটকে ছিল, বেরিয়ে আসে, আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন? ফোন নম্বর? চাইলে পাওয়া যায় না এমন কিছু কি এই দুনিয়ায় আছে? তুমি মনে রাখো নাই, ভুইলা গেসো, সেটা অন্য কথা!

সত্যিই লজ্জ্বিত হই। এমন এক বন্ধু, যে সেই ছোটবেলার ছবি এখনো গুছিয়ে রেখেছে, আমাকে মনে রেখেছে, আর এত বছর পরে খুঁজেও বের করেছে তার কথা একটুও মনে না পড়ার জন্যে লজ্জ্বিত হই। ঢাকায় গেলে দেখা করব কথা দিই। ওরা ফোন ছাড়ে আন্তরিকতার উত্তাপ ছড়িয়ে। ভালো থাকার শুভাকাঙ্খা উড়ে আসে যেন সেই ছেলেবেলা থেকে। আমার চোখ ভিজে আসে অজান্তেই!

নাহ। আনোয়ারের শুধু নামটুকু আর একটা আবছা অবয়ব ছাড়া আমার আর কিছুই এখনো মনে পড়ে না। কাল রাত থেকে খুঁজেই চলেছি আনোয়ারকে...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28737071 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28737071 2007-10-12 01:59:29
যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...
বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি বলছিলেন কোথাও বাইরে বেড়াতে যেতে। বাইরে বলতে যে কোন একটা লোকাল ট্রেন ধরে উঠে বসা আর পছন্দমত একটা ষ্টেশন দেখে নেমে পড়া। রিকশা করে খানিক এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরত ট্রেন ধরে ফিরে আসা। আমি ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলাম না এধরণের অ্যাডভেঞ্চারে অভ্যস্ত নই বলে। কোথাও একটা গেলাম আর আটকে গেলাম তাইলে তো চিত্তির!

টেলিফোনের বিল প্রতিমাসেই উর্ধমুখী দেখে বিয়ের জন্যে বেশ সিরিয়াসলি ভাবনা চিন্তা চলছিল। বিয়েটা যখন করবই তো করে ফেললেই চুকে যায়! এভাবে ফোনওয়ালদের প্রতিমাসে ১২-১৪হাজার করে দেওয়ার কোন মানে নেই! তো আমরা ঠিক করলাম বিয়েটা করেই ফেলি! তো আমরা মোটামুটি বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে সেদিন বেরোলাম বিয়ের ব্যবস্থা করতে। মোল্লা মৌলভি, কোর্ট কাচারি ঘুরে ফিরে ব্যবস্থাদি করতে বেলা দুপুর । ক্ষিদেও পেয়েছে বেশ। ধর্মতলার এক রেষ্টুরেন্টে ঢুকে রুটি-মাংস খেয়ে বললাম, চল একটু বাজারের দিকে। একটু কেনাকাটা তো করতে হবে, বিয়ে বলে কথা! বাজারের দিকে এগিয়েও তিনি বললেন বাজার তো কালও করতে পারবে, আজকে চল না কোথাও একটু বাইরে! মুখের দিকে তাকিয়ে আমার আর না করতে মন সরল না। তবুও বললাম, বেলা দুটো বাজে, এখন গিয়ে ফিরতে পারব? ত্বরিত জবাব এল, হ্যাঁ হ্যাঁ। চল তো! এগোলাম বাসগুমটির দিকে । এই প্রায় বিকেলে লোকাল ট্রেনে প্রচন্ড ভীড় হবে বলে বাসে যাওয়াই সাব্যস্ত হল। সেটা নভেম্বরের শেষ। ছোট দিন, বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায় কিন্তু ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে খুব বেশি ভাবনা চিন্তা করতে মন চাইল না সেদিন আর।

যাব কোথায়? বলল, গাদিয়াড়া যাবে? সেখানে গঙ্গা আছে! আমরা যেখানেই যাব সেখানে একটা নদী তো থাকতেই হবে। শহরের এই ভীড়, ধোঁয়া থেকে দূরে, কোথাও একটা খোলা জায়গায়, নদীর ধারে দু'দন্ড গিয়ে বসব এই আকাঙ্খায় চেপে বসলাম এক বাসে। গন্তব্য গাদিয়াড়া। গঙ্গাপারের এক গ্রাম। বাসগুমটির টিকিটবাবুর কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছে, যেতে ঘন্টা দেড় লাগবে। মনে মনে হিসেব করে নিলাম, এখন দুটোর একটু বেশি বাজে, মোটামুটি চারটে-সোয়া চারটে নাগাদও যদি পৌঁছুই তো ঘন্টাখানেক সেখানে ঘুরে-ফিরে সন্ধের আগেই ফেরত বাসে চেপে বসা। একটু রাত হয়ে যাবে হয়ত ফিরতে, ঠিক আছে! বাস ছাড়ল প্রায় তিনটে বাজিয়ে।

সকালে বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় একটা চাদর কাঁধে ফেলে নিয়েছিলাম, গলায় একটু ব্যথা ভাব আছে বলে। যদিও ঠান্ডা পড়েনি এই নভেম্বরে পড়েও না কিন্তু আমার আবার ঠান্ডা একটু বেশিই লাগে। তাই চাদর, যদি দরকার লাগে ভেবে। বাস শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে এগোতেই হাল্কা ঠান্ডা বোঝা গেল। চাদর ভালমতন জড়িয়ে পাশের মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে কত কথা যে বলে গেলাম দুজনে। বাস চলছে তো চলছেই। ঘড়ির দিকে চোখ যায় অজান্তেই। পাঁচটা বেজে গেলো! 'হ্যাঁগো, এখানেই তো পাঁচটা বাজল, আমরা পৌঁছুব কখন আর ফিরব কখন?' 'কী জানি, ঐ ব্যাটা তো বলল, ঘন্টা দেড় লাগবে যেতে!' সামনে ছোট্ট এক নদী দেখা যায়, বললাম, এখানেই নেমে পড়ি, খানিক পরে এই রাস্তা থেকেই ফেরার বাস ধরে ফিরে যাব নাহয়! কিন্তু শুনশান জায়গা দেখে নামার সাহস হল না। আবার মগ্ন হই কথায়। বাস চলে। আর চলে।

শীত আসি আসি করছে। শেষ নভেম্বরের ছোট বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ঘনায়। গাদাগাদি ভিড়ের বাস ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ নেমে যেতে থাকে যার যার গন্তব্যে। আমাদের কথাও কমে যেতে থাকে ক্রমশ। শহর থেকে বহুদূরে কোন এক গাদিয়াড়ার উদ্দেশ্যে বাস এগিয়ে যেতে থাকে গ্রামের পরে গ্রাম পেরিয়ে। কখনো ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে যাওয়া রাস্তা বেয়ে তো কখনো ঘন বসতিপূর্ণ কোন গ্রামের ভিতর দিয়ে। টিমটিমে বাতি জ্বলে ছোট্ট দোকানঘরে। কৃষকের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে বেরিয়ে আসে হলুদ আলোর ছিটে। রাস্তার পাশে হাত পা ছড়িয়ে কোথাও কোথাও পড়ে আছে খড়ের কাঠামো, দেবীমুর্তির। কোনটা দেবী সরস্বতী তো কোনটা দেবী দূর্গার। ছোট ছোট মন্দির দেখা যায়, কোনটা শিবের তো কোনটা কোন দেবীমায়ের। দ্রুত পেছনে সরে যায় দু'পাশের দৃশ্য। অন্ধকার ঘন হয়।

অবশেষে বাস এক রাস্তার শেষ মাথায় এসে থামল। ঘড়ির কাঁটা তখন ছ'টা ছুঁই ছুঁই। আমার মুখের কথা থেমেছে অনেকক্ষন। টিমটিমে বাতি জ্বলছে খুঁটির উপর শুধু চালের নিচে। দু-একজন যাত্রী, যারা এই শেষ অব্দি এসেছেন তাঁরা দ্রুতপায়ে বাস থেকে নেমে এগিয়ে গেছেন যার যার গন্তব্যে। গুটিগুটি পায়ে আমরা বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, কোথায় এলাম। বাস যেখানে এসে থেমেছে রাস্তার সেখানে শেষ। এখান থেকেই বাস আবার ঘুরবে কলকাতার দিকে। ফেরার টিকিট কাটা হোক আগে ভেবে বাসের কন্ডাক্টরের খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল পাশের চায়ের দোকানে সে গিয়ে বসেছে জুত করে। টিকিটের কথা বলতে জানা গেল এটা লাষ্ট বাস ছিলো, এখান থেকে কোন বাস আজ আর যাবে না। কাল সকাল ছ'টায় প্রথম বাস!

হাতের আঙুল তুলে ও দেখিয়ে দিল ঐ দ্যাখো, নদী! তাই তো! নদী দেখতেই তো এখানে আসা... কিন্তু নদী দেখা গেল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারকে যা খুশি তাই বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আমি তাই ধরে নিলাম সামনের ঐ অন্ধকারই গঙ্গা।

বাকিটুকু অপরজনের ভাষ্যে<img src=" style="border:0;" />br />
...রুমাল তুমি হও না দ্রুতগামী বাস, সে রসিক মানুষ বসে হাসবেন কেবল, জালেতে মুখ লাগিয়ে, এই ভাবে দেখলেই আমার ছাগলের সিং ঘষার কথা মনে পড়ে, উপস্থিত বুদ্ধিবিহীন আমি তাকেই বাসের গতিবিধির কথা জিজ্ঞাসা করি, এই তো এই ঘন্টা দেড়, শীতকাল, যদিও সে হরপ্পা সভ্যতার কথা,আমার বান্ধবীটি সারা রাস্তা তার অলঙ্কার ছড়াতে ছড়াতে যায়, যেন রামচন্দ্র আলসেতে বসে দেখে চলেছেন আনাকারেনিনা,আরে আরে আমাদের জন্য মর্তে ধেয়ে আসছেন নদী, সুতরাং গন্তব্যের শেষে একটা নদী থাকবেই, থাকবেই, আরে সে সব টেলিভিশন মার্কা প্রচার নয়, এই তুলির আঁচড়ে পানেসারজি এঁকে দিচ্ছেন নদী...

... অমাবস্যার রাতে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে পীচের রাস্তাকেও নদী প্রমাণ করতে পারেন নীলস বোর,সুতরাং ফেরার বাস যে এই সাড়ে ছয়টায় পাওয়া যাবে না, জানা কথা, আরে বিধাতা তো সব জেনেই বসে আছেন কি না,আমরা একটা হোটেলে প্রবেশ করি, হ্যাঁ এখানেও কোন প্রাপ্ত বয়স্ক চিত্রমালা নেই,আপনারা উঠেপড়ুন ...

... এবং আমরা ফিরে আসি,কলকাতায়,এই ভাবে সেই ভাবে, 50 কিমি অটোতে ও খুলে যাওয়া শারীরিক যন্ত্রপাতি কুড়াতে কুড়াতে, যাক সে সব গুরুত্ত্বপূর্ণ নয়। আসলে আমার কিছু-কিছু জিনিস ভালো লাগে না, তা শতবার বলেও,লিখেও আপনি বোঝাতে পারবেন না, তখন বেরিয়ে পড়ুন, টাইটানিক চিরকালই ডুবে যায়, ভরসা রাখুন...

ও শ্রেয়াদি, এর চাইতে বেশী লেখা গেল না আজ, কিছুতেই না,বাইরে বেশ বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে, অন্ধকার রাস্তায় হু হু , আরে তোমার খেলা তুমি নিয়ে সাজাচ্ছো, বাতাসে বেশ পুজো পুজো ভাব, দোলনায় আরেকটু দুলে নিন মাধবী...

আমাদের গল্পটা-আমাদেরই থাক, তাই জায়গাটার নাম গাদিয়াড়া হোক, যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28735246 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28735246 2007-10-03 12:37:47
ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে..
শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছি আমি। অসুস্থ শ্বশুরমশাইকে দেখতে এসেছিলাম ৷ বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ তিনি, দুদিন আগে ফোন করে শাশুড়ি বলেন, তোমার বাবার শরীরটা বেশ খারাপ। শরীর প্রায়শই খারাপ থাকে তবু এভাবে তো বলেন না ওঁরা। জানতে চাই, আমি কী একবার বাড়িতে আসব মা? শাশুড়ি বলেন, আসবে? তা এসো! কবে যাব জেনে নিয়ে তিনি বলেন, এলে আর সেদিন ফিরে যাবে না, সেইমত ব্যবস্থা করে এসো ৷ সম্মতি জানাই ৷ রবিবারে নাকি ট্রেন এমনিতেই কম থাকে ৷ তায় প্রতিটি ট্রেনই দশ-পনের মিনিট করে লেট থাকে, প্ল্যাটফর্মে অস্থির পায়চারীরত সাদা চুড়িদার কামিজ পরা একটি মেয়ে নিজের মনেই বলে যায়৷ আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চায় লাষ্ট ট্রেন কখন গেছে৷ হেসে ফেলি আমি, লাষ্ট ট্রেন দেখতে পেলে তো আমি তাতেই চেপে বসতাম আর এতক্ষণে হাওড়ার কাছাকাছি চলেও যেতাম! এবারে মেয়েটিও হেসেই ফেলে৷

পাশে নামিয়ে রাখা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হই এটাকে বয়ে সেই বাড়ি অব্দি নিয়ে যেতে হবে ভেবে ৷ দেখতে ছোট হলেও ব্যাগটি বেশ ভারী ৷ গাছের নারকোল, দু'রকমের আচারের শিশি, কাগজি লেবু কী নেই এতে! আর সেই বই দুটো ও তো আছে, সময় কাটানোর কথা ভেবে যে দুটো আমিই সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম অথচ একবারও খুলে দেখিনি! মন প্রসন্ন হয় ভোরবেলায় ছাদ থেকে কুড়িয়ে আনা আমের গুটিগুলো ও শাশুড়ি দিয়ে দিয়েছেন ভেবে! ক্ষুদ্র এক জিনিস, যার কোন মূল্যই নেই, আমি কুড়িয়ে না আনলে সেগুলো ছাদেই পড়ে থেকে শুকিয়ে যেত আর তারপর ঝরা পাতা ঝাট দেওয়ার সময় ওরাও চলে যেত শুকনো পাতাদের সাথে৷

ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই ছাদে চলে গিয়েছিলাম৷ ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখি, দাঁড়িয়ে থাকি রেলিং ধরে ৷ এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে একা রাত্রিবাস আমার৷ ও'র কথা ভাবি, গতকাল দুপুর থেকে আজ এই ভোর অব্দি এক মুহুর্তের জন্যেও সে মন থেকে সরেনি৷ রাতে আধো ঘুম আধো জাগরনের মাঝেও সে ছিল৷ কথা বলেছে, খুনসুটি করেছে, আদর করেছে৷ সে কী তবে স্বপ্ন ছিল!

খানিক পরেই শাশুড়িও উঠে আসেন ছাদে, হাতে অ্যালুমিনিয়ামের জাগ ভর্তি জল, টবে দেবেন ৷ শুকনো মরে যাওয়া গাছ সব, কয়েকটা ফণিমনসা শুধু বেঁচে আছে জল ছাড়াই৷ জলের জাগ শাশুড়ি মায়ের হাত থেকে নিয়ে একটু একটু করে সব কটা টবেই জল দেই৷ মা বলেন, হাঁটুতে ব্যাথা, কোমরে ব্যাথা, ছাদে উঠতে পারি না এখন আর, গাছগুলো সব শুকিয়ে গেল গো! এই ক্ষরায় কী গাছ বাঁচে জল ছাড়া! আমি শুনি, এই ছাদ নাকী ও'র খুব প্রিয়৷ অনেক আগে, যখন ও বাড়িতে থাকতো, বেশির ভাগ সময়ই এই ছাদে কাটাতো৷ মাদুর পেতে বই নিয়ে ছাদে চলে আসতো, ঘন্টার পর ঘন্টা ছাদেই থাকতো সে৷ তখন নাকি অনেক গাছ ছিলো ছাদে৷ দু'বেলা গাছেরা জল পেত, ইট আর সিমেন্টের এই ছাদে ছিল এক ছোট্ট বাগান৷ তবে সাজানো নয়৷ ইতস্তত: ছড়ানো ছিল সব টব৷ এখানে ওখানে৷ ঠিকই তো! যে বাগানে সে সময় কাটায়, যে যায়গা ও'র প্রিয়, সেই বাগান সাজানো হতেই পারে না!



(ডায়রিতে লিখে রাখা অনেকদিন আগের কিছু কথা। ।
সচলায়তনে প্রকাশিত। প্রথম পাতার জন্যে নয়। )

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28729592 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28729592 2007-09-05 19:10:49
হেঁটে যাই চাঁদের সাথে... হাত ডোবাই পাঁকে, খোঁজ করি পদ্মের।
মেলে না... মেলে না...
কাঁদা ঘাটাই সার হয়। ক্লান্তি আসে, তবু থামি না।
ঘেঁটেই চলি ঘেঁটেই চলি...
একসময় গড়িয়ে পড়ি খড়ের গাদায়, আমার ছেলেবেলার খড়ের গাদায়...
কী হবে পদ্ম তুলে! বরং এইখানে শুয়ে থাকি খানিক চুপটি করে। কেউ দেখতে পাবে না আমায়...

একসময় আমি চাঁদের সাথে হেঁটে বেড়াতাম। সরু চাঁদ,মোটা চাঁদ, আধখানা চাঁদ। পূর্ণচন্দ্র। সন্ধেবেলায় আকাশে চাঁদ উঠলেই আমার পাগল পাগল লাগত। চাঁদ যেন আমায় ডাকছে। কতদিন আমি একা একা কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে পড়েছি চাঁদের সাথে। আমিও হাঁটি চাঁদও হাঁটে। আমি থামলে চাঁদও থামে। একসময় বাড়ির কথা মনে পড়ত। পরদিনের স্কুলের পড়া। বাড়ি ফিরে মা'য়ের বকুনি কখনোবা মৃদু উত্তম মধ্যম। ফিরে আসতাম ঘরে। ওমা! চাঁদও ফিরছে! হ্যাঁ। চাঁদও ফিরত আমার সাথে। এসে জনালার কোণটিতে চুপটি করে দাড়িয়ে পড়ত। আমার ঘুম আসত আর চাঁদও কখন যেন চলে যেত আমার জানালা থেকে...

স্বধীনতার ষাট বছর। সিক্সটি ইয়ারস অফ বিইং ফ্রী।
আকাশে ঘুড়িদের মেলা। সাদা ঘুড়ি, লাল ঘুড়ি, সাদায় কালোয় ছোট ছোট দাগ কাটা ঘুড়ি, সবুজ কমলা আর সাদায় তেরঙা ঘুড়ি,রাণীরঙা ঘুড়িরা সব উড়ে বেড়াচ্ছে ছাদের মাথা থেকে, সামনের ছোট মাঠ থেকে, টালির চালের নিচের একচিলতে পা রাখার জায়গা থেকে। ঘুড়িদের রঙে ধূসর আকাশে রঙের মেলা। স্বাধীন বলেই গলা সমান উঁচু দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়েন বাবাটি, উড়ে গিয়ে পড়ে যাওয়া ঘুড়িটি কুড়োতে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি হাফ প্যান্ট আর কিটোস পরা শিশুটি অপেক্ষা করে দেওয়ালে এধারে, ঘুড়িটির অপেক্ষায়।

পথশিশুটি সুতোর প্রান্তটি হাতে নিয়ে দৌড়য় ঘুড়ির পেছন পেছন। উড়ে আসা একটি ঘুড়ি কেটে দেয় তার ঘুড়িটিকে। ঘ্যাচাং। ঘুড়ি তবু উড়ে। বাতাসের ডানায় ভর করে ঘুড়ি উড়ে চলে। একসময় আর পারে না। পানাভর্তি ডোবায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ঘুড়ির পেছন পেছন দৌড়ুতে দৌড়ুতে পথশিশুটি এসে দাঁড়ায় ডোবার ধারে। মলিন মুখ। আরেকটি ঘুড়ি কেনার স্বাধীনতা তার যে নেই...

আমি এখনও চাঁদের সাথে হাঁটি। জানালা পেরিয়ে নেমে পড়ি পাশের বাড়ির ছাদে। সেখান থেকে এ'ছাদ ও'ছাদ পেরিয়ে সোজা উঠে পড়ি ফ্লাইওভারে। হেঁটে হেঁটে বিদ্যাসাগর সেতু। ওপারে আলো ঝলমল কলকাতা। চাঁদের আলো ম্লান হয়ে যায় সে আলোতে, প্রায় দেখাই যায় না। মরা, ফ্যাকাশে সাদা নিয়নের আলোয় ভেসে যায় বিদ্যাসাগর সেতুও। তবু আমি ঠিক দেখতে পাই চাঁদকে। ঐ তো! আমার সাথেই হাঁটছে সেও...

ভরা গঙ্গা উপচে উপচে পড়ে দুপাশে। ঘোলা জলও চিক চিক করে চাঁদের আলোতে। আমার বড় সাধ হয় আমি নৌকোয় করে খানিক বেড়িয়ে আসি গঙ্গায়। কিন্তু না, আজ থাক । আরেকদিন হবে। অন্য কোনদিন...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725904 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725904 2007-08-15 14:06:41
তিতাস কোন নদীর নাম নয়-শেষ পর্ব
সখিনার আবার ছেলে হল৷ হাসন আলি মরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই সখিনা আবার বিয়ে করে৷ পূবপাড়ার কাশেমকে৷ যার সাথে সখিনার বহু বছরের "পিরীত' ৷ এবারেও সে শ্বশুর বাড়ি যায় না ৷ তবে এবার আর তার স্বামী ঘর জামাই হয় না ৷ সে তার নিজের বাড়ি আর মইজুদ্দিনের বাড়ি দু বাড়িতেই থাকে ৷ তার নিজের বাড়িতেও তার একটা বউ আছে৷ মইজুদ্দিন এখন আর উঠোনে বসে বাঁশ চেঁছে বেত তোলে না ৷ বেশির ভাগ সময়েই নিজের ঘরের সামনে হুকো হাতে ঝুম মেরে বসে থাকে৷ সখিনা ঠেলে তুললে উঠে গিয়ে স্নান করে, খায় আবার এসে ঝুম মেরে বসে৷ কারও সাথে কথা বলে না ৷ এখন আর ওদের উঠোনের উপর দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলের দল ভয় পায় না, মইজুদ্দিন যে ওদের আর হাঁক দেয় না ৷

আমাদের বাড়িতে বিয়ে ৷ ছোটফুফুর৷ দাদাজি হজ্বে যাবেন তার আগেই ছোটফুফুর বিয়ে সেরে রেখে যেতে চান৷ দাদি গাছ কাটিয়ে লাকড়ি করাচ্ছেন নজু চাচাকে দিয়ে৷ পাড়ার মেয়ে বৌ রা ঢেকিতে মশলা গুড়ো করছে সারাদিন ধরে৷ গামলা ভর্তি ধনে,জিরে পুকুরের জলে ধুয়ে এনে রোদে শুকানো হয়েছে পাটি পেতে, ঝাল ঝাল লাল লংকা রোদে শুকিয়ে মুচমুচে করা হয়েছে যাতে করে গুড়ো ভাল হয়, মিহি হয়৷ ঢেকিতে লংকা গুড়ো করার সময় নাকে মুখে কাপড় বেঁধে নেয় যারা গুড়ো করে তা সত্বেও হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো চলতেই থাকে৷ বড় ফুফু মেজ ফুফুরা সব তাদের শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছে৷ ছোটফুফু সারাদিন উত্তরের ঘরে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে থাকে, ঘরে কেউ এলে মাথার ঘোমটা আরও টেনে দেয়৷ কাকিমা এসে বলে, কি গো, তুমি যে অ্যাত্তো বড় ঘোমটা বাপের বাড়িতেই দিসো তো জামাইর বাড়ি গিয়া কি করবা? অহন বহুত সময় আছে, ঘাড় ব্যাঁকা হইয়া যাইব ঘোমটা দিয়া বইয়া থাকতে থাকতে! অহন সোজা হও আর এট্টু ঘুইরা ফিরা বেড়াও! ছোট ফুফু আরও ঝুঁকে বসে৷ রাতে ছোটফুফু আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুই দেখছস তারে? আমি বলি, হ, দেখছি, সুন্দর না! ছোটফুফু আর কিছু বলে না৷

সতীর শীতল শব বহুদিন কোলে লয়ে যেন অকপট
উমার প্রেমের গল্প পেয়েছে সে; চন্দ্রশেখরের মত তার জট
উজ্জ্বল হতেছে তাই সপ্তমীর চাঁদে আজ পুনরাগমনে; ( জীবনানন্দ দাশ)
লাল নীল সবুজ হলুদ কাগজের ফুল কেটে কেটে সব দেওয়ালে লাগানো হল, দরজায় জানালায় ঝুলছে ঐ একই কাগজের কাটা ঝালর, রঙীন কাগজের শেকল বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল সারা বাড়িতে৷ সবকটা ঘরের মেঝেতে আল্পনা আঁকল কাকিমা৷ আজকে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ৷ সারা বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন৷ কাকিমা বসে হলুদ বাটছে শিলে, এই হলুদ ছোটফুফুকে মাখানো হবে৷ পাশেই গোল হয়ে বসে মেয়েরা সব বিয়ের গীত গাইছে ৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷
মেথি বাটো মেন্দী বাটো তুমি শুন্দা বাটো রে ৷৷
হাঁটু পানিত নাইম্যা কইন্যায় হাঁটু মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত, দেখো নয়ন মেইল্যা রে ৷৷
কোমর পানিত নাইম্যা কইন্যায় কোমর মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত দেখো নয়ন মেইল্যারে ৷৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷
ওদের মধ্যে আছে মেজফুফু৷ এক হাতে নিজের বা ঁকান চেপে রেখেছে আর ডাঁন হাত দিয়ে ধরে রেখেছে পাশে বসে গীত গাইতে থাকা জমজম ফুফুর গলা৷ একই ভাবে জমজম ফুফুও নিজের বা ঁহাতে কান চেপে রেখে ডাঁন হাতে জড়িয়ে রেখেছে তার পাশের জনের গলা৷ উঠোনে কলাগাছ কেটে এনে বিয়ের গোসলের "মাওরা' সাজানো হয়েছে৷ চারকোনায় চারটে কলাগাছ পুঁতে ঘিরে দেওয়া হয়েছে রঙীন কাপড়ে, কলাগাছে জড়ানো হয়েছে লাল নীল সবুজ কাগজের শেকল আর ছোট ছোট তেকোনা করে কাটা কাগজ৷ সেই মাওরার ভেতরে আছে ছোট্ট চৌকি, সেটাও কাগজ আর আল্পনায় সাজানো৷ সেখানে বসিয়ে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ মাখানো হবে আর তারপরে বিয়ের গোসল৷ লালপাড় হলুদ শাড়ি বুকের উপরে গিঁট দিয়ে পেঁচিয়ে পরা৷ হাতে৷ গলায়৷৷ কানে মাথায় হলুদ গাঁদা আর লাল গোলাপ দিয়ে বানানো গয়না পরা ছোটফুফুকে ছোটকাকা কোলে করে সেই মাওরার ভেতরে নিয়ে বসিয়ে দিল সাজানো চৌকির উপরে৷ প্রথমে দাদি তারপরে মা, কাকিমা আর তারপরে ফুফুরা সব একে একে ছোটফুফুর মুখে হাতে পায়ে খানিকটা করে হলুদ মাখিয়ে দিল, হাতে হলুদ নিয়ে প্রথমে সেই হলুদ নিজের কপালে ছুঁইয়ে তারপরে সেই হলুদ কনের মুখে হাতে পায়ে মাখিয়ে দিল সবাই৷ আমিও এক খাবলা হলুদ নিয়ে আগে নিজের কপালে ছুঁইয়ে নিলাম যেমন করে দাদি আর অন্য সকলে করেছে, আর তারপরে ছোটফুফুকে মাখিয়ে দিলাম সেই হলুদ ৷ মাওরার বাইরে গোল হয়ে বসে পাড়ার মেয়ে বউরা তখনো গাইছে বিয়ের গীত৷ সাথে আছে মেজফুফু আর তার সই জমজম ফুফু ৷
তোল তোল পালকি তোল রে, আমি যামু তোমার দেশে ৷৷
তোমার দেশে গেলে রে আমি পানি কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়াদীঘি হে আমি পানি সেথায় পাব ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷
তোমার দেশে গেলে আমি খানা কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়া হোটেল আমি খানা সেথায় খাব রে ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷


-5-


তাঁকে ডেকে এনে এখন এই শীতের শেষ রাতে
হাল্কা অন্ধকারের পোষকে মুখোমুখি বসিয়ে রেখে
আমার সবিনয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে ইচ্ছা করছে৷
আচ্ছা বলুন তো: আপনার কাছ থেকে জীবন বেশি
গ্রহণ করেছে, না আপনি? কনফিউজ করে থাকলে
আমি ব্যাপারটা স্পষ্ট করছি- এই ধরুন আপনি সারা
জীবন আত্মা খরচ করে, দৈহিক শ্রম দিয়ে যে বাসনা
নির্মাণ করে পেছনে ফেলে ছলে গিয়েছিলেন- তার কতটুকু
আপনি ফেরত্ পেয়েছেন, আদৌ পেয়েছেন কি?
আপনি নতুন বাড়ির কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন?
( ঋত্বিক ঘটক শ্রদ্ধাস্পদেষু/ফিউরি খন্দকার; চিত্রালী 20 ফেব্রুয়ারী, 1976)

দাদাজি হজ্বে চলে গেলেন ৷ আমরা সবাই ঢাকায় গেলাম দাদাজিকে প্লেনে তুলে দিতে৷ চল্লিশ দিনের জন্যে দাদাজি যাচ্ছেন তাই আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছে সবাই এসে দেখা করে গেল দাদাজির সাথে৷ ঢাকায় যাওয়ার আগের দিন সবাইকে দাওয়াৎ করে খাওয়ানো হল৷ আমাদের পাড়ার সবাই এসেছিলো সেই দাওয়াৎএ৷ বাংলা উঠানে শামিয়ানা টাঙিয়ে পুরুষদের বসার ব্যবস্থা আর ভিতর বাড়ির উঠানে মেয়েদের৷ পাড়ার লোক ছাড়াও এল গ্রামের লোক, প্রতি বাড়ি থেকে দুজনকে আসতে বলে এসেছিল বড়কাকা৷ আর ছিল গরীব ভিখিরিরা৷ বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে দাদাজি বড় মৌলভি সাহেবের ক্কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রার্থনা করে গেলেন, আমাদের বাড়ির সব পুরুষেরা আর যারা এসেছিল বিদায় দিতে তাঁরাও যোগ দিলেন সেই প্রার্থনায়৷ বাড়ির সব মেয়েদের সাথে আমিও জানলায় দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই প্রার্থনা৷ আর তারপর সবাই মিলে খাল পার করে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল দাদাজিকে৷ দাদাজি এখন এক সপ্তাহ থাকবেন ঢাকার হাজী ক্যাম্পে, তারপরে প্লেন ধরে যাবেন হজ্বে ৷ এই ক্যাম্পে সারা দেশ থেকে হজ্জ্বযাত্রীরা এসে জমায়েত হন, নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করেন ৷

ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷ ৷

এবাড়িতে প্রতিবছর মহররমে খিচুড়ি রাঁধা হয় বড় বড় সব হাড়িতে৷ রান্নাঘরে প্রচন্ড দ্রুততায় কাজ করে চলেছে আহাদালির মা বুবু, হাসিনার মা বুবু ও তার মেয়ে হাসিনা৷ তিনমুখো চুলোয় রান্না হচ্ছে একসাথে তিন হাড়ি খিচুড়ি, কাকিমা ঘুরে গেল রান্নাঘর৷ বাইরে সে মুর্গী কাটার তদারকি করছে৷ এবছর মহররমে স্পেশাল থাকছে খিচুড়ির সাথে ভুনা মুর্গীর গোশত৷ আজ আমাদের বাংলা উঠোনের শেষ মাথায় পুকুরের পুবপার ঘেঁষে স্থাপন করা হবে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর ৷ দাদাজি বলেন, "নেও' গাড়া হবে৷ রেজিষ্টি অফিসে গিয়ে দাদাজি বাংলা উঠোনের আর্ধেকটা ওয়াকফ করে দিয়েছেন৷ এই উঠোনে আর কারো কোন অধিকার থাকল না৷ এখানে মসজিদ হবে, আজ সেই মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে ৷ বাড়িভর্তি লোকজন ৷ মসজিদের "নেও' গাড়া হবে বলে দাওয়াত্ পেয়ে সবাই এসেছে ৷ আমিও এসেছি শ্বশুরবাড়ি থেকে ৷ বড়কাকা গিয়ে বলে এসেছিলেন আমার শ্বশুরবাড়িতে, শাশুড়ি আসতে পারেননি, আমি আর আমার স্বামী এসেছি৷ প্রতি বছরই এবাড়িতে মহররমের দিনে খিচুড়ি রান্না হয় বড় বড় সব হাড়িতে, সেদিন বাড়িতে সবার অবারিত দ্বার৷ পাড়া-পড়শী, ফকির-মিসকিন,বাড়ির লোক, সবাই একই খাবার খায়,খিচুড়ি৷ ছোলার ডাল, আলু আর ক্ষেতের আলোচাল দিয়ে রান্না খিচুড়ি৷ দাদি উপর থেকে নামান তুলে রাখা ডজন ডজন মেলামাইনের বাসন৷ নজুচাচা সেগুলো বড় প্লাষ্টিকের গামলায় করে নিয়ে যায় পুকুরে৷ ধুয়ে নিয়ে চলে যাবে সোজা বাংলা উঠোনে৷ সেখানেই খাওয়ানো হবে ফকির মিসকিন আর অতিথিদের৷ একই রকম সব থালায় একই খাবার খাবে সবাই আজকের দিনে৷ আজ স্পেশাল মেনু হিসেবে মুর্গী আছে৷ দাদাজী সাদা কাজ করা পাআবী আর ছোট ছোট চেকের লুঙ্গি পরে বসে আছেন বাংলা ঘরের বারান্দায় তার হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারটিতে৷ সামনে ওঠোনে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, সেখানে আছে বাজারের ডেকরেটারের দোকান থেকে আনা কয়েক ডজন প্লাষ্টিকের চেয়ার৷ অতিথিরা আসছেন, দাদাজীর সাথে এসে কথা বলে গিয়ে বসছেন সামনে পেতে রাখা সব চেয়ারে৷ আমি মাঝে মাঝেই দাদির ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বাংলা উঠোনের দিকে দেখছি৷ চোখে পড়ছে বসে থাকা অতিথিরা নিজেদের মধ্যেই কথা বলছেন, নজু চাচা ব্যস-সমস্ত হয়ে একবার বাংলা উঠোন তো আরেকবার ভেতর বাড়ি করছে৷ দাদাজী মুখে এক উজ্জ্বল হাসি নিয়ে তার পুরনো কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে বসে বসেই তদারক করছেন সবকিছু৷ রাজমিস্ত্রী বুড়ো করিম আর আলি হোসেন৷ খানিক পরেই জুম্মার নামাজ আর তারপরে দাদাজী নিজের হাতে রাখবেন মসজিদের প্রথম ইটটি৷ দেবেন একমুঠো বালি আর এক হাতা মাখানো সিমেন্ট৷ দাদাজী তার স্বপ্নের মসজিদের আজ "নেউ' গাড়বেন ৷

দু'কূলে তার বৃক্ষেরা সব
জেগে আছে;
গৃহস্তের ঘর-বাড়ি
ঘুমিয়ে গেছে,-
শুধু পরান মাঝি বসে আছে
শেষ খেয়ার আশায় ৷
যায়, বয়ে যায়৷৷

জলেখাবিবির বাগে এখন আর মেলা বসে না৷ জলেখা বিবির মৃত্যুর পর তার ছেলে মেয়েরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করার সময় এই বাগ নিয়ে সমস্যা হয়, কে পাবে এই বাগ৷ কেউই দাবী ছাড়তে রাজী না হওয়াতে বাগ বিক্রী কিরে দেওয়াই সাব্যস্ত হয় ৷ সেই বাগ কিনে নিয়ে সেখানে এক নতুন মাদ্রাসা শুরু করে বাবা ও বড়কাকা৷ অল্প খানিকটা জায়গায় একখানা টিনের ঘর তুলে এবছরই সেখানে চালু হয় এক লোয়ার মাদ্রাসা ৷ প্রথম বছরে তাতে ছাত্র হয়েছে বত্রিশজন, এদের প্রয়োজনীয় খাতা পেন্সিল বই দেওয়া হয় মাদ্রাসার তরফ থেকে৷ সামনের বছর এরা যখন পাশ করে দ্বিতীয় শ্রেনীতে যাবে ততদিনে তোলা হবে আরেকটি ঘর আর ভর্তি নেওয়া হবে নতুন ছাত্র প্রথম শ্রেনীতে৷ সেই মাদ্রাসার শিক্ষক এসেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ৷ তিনি এবাড়িতেই থাকেন, খান আর মাদ্রাসায় পড়ান ৷ মাঝেই মাঝেই বড়কাকা ঐ বাচ্চাগুলোর জন্যে চকোলেট নিয়ে হাজি হন মাদ্রাসায়, ঘুরে ফিরে কথা বলেন ছোট ছোট ছেলেগুলির সাথে ৷ কেউ বা নালিশ জানায়, হুজুরে খালি মারে, বেত দিয়া! কাকা মাদ্রাসার শিক্ষককে, নিষেধ করেন ওদের বেত দিয়ে না মারতে ৷

কে জানে কবে কে নাম রেখেছে
তিতাস তোমার;
যে নামেই ডাকি তোমায়
তুমি কন্যা মেঘনার৷

বিজলীবাতি এসেছে শাহবাজপুরে ৷ তবে আমাদের তিতাসের জলবিদ্যুত্ কারখানা "ওয়াব্দা'র বিজলী নয়৷ বিজলী এসেছে দূরের শাহজীরবাজার পল্লী বিদ্যুত্ কারখানা থেকে৷ সেটি নাকি অনেক বড় আর সেই পল্লীবিদ্যুত্ কারখানার বিজলী পৌঁছে গেছে আশে পাশের সমস্ত গ্রামে এমনকি সেই মেদীর হাওর পর্যন্ত যত গ্রাম আছে তার সবকটিতেই৷ ফলে আমাদের তিতাসের এই জলবিদ্যুত্ কারখানা ওয়াব্দা এখন আর কোন কাজে লাগছে না ৷ কিছু লোক এখনও আছে সেখানে, যারা দেখাশোনা করে এই এলাকার বিদ্যুত্ পরিষেবা ৷ গ্রামের কোথায় ঝড়ে খুঁটি ওল্টালো, কোথায় তার ছিঁড়ল৷ মাঝে মাঝে লোকজন দূর থেকে গাড়ি করে আসে ওয়াব্দায় পিকনিক করতে৷ তিতাসের পুরনো ব্রীজ ভেঙে নতুন ব্রীজ হয়েছে ৷ এ ব্রীজ আরও বড়, আরও চওড়া৷ নতুন ব্রীজের উপর থেকে এখন ওয়াব্দাকে দেখলে মনে হয় যেন ছাড়া (পোড়ো) বাড়ি৷ সেই বাগান নেই,ঝা চকচকে সেই বিল্ডিং পুরনো হয়ে হয়েছে জরাজীর্ন, দেখাশোনার অভাবে ৷

ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷৷

একতলা পাকাবাড়ির ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাকার থাম৷ বেশ উঁচু সেই থামের মাথায় জালি দিয়ে ঘেরা দুখানা মাইক৷ মসজিদের মাইক৷ পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল, নজুচাচার ছেলে৷ উত্তরগাঁওয়ের নতুন প্রাইমারী স্কুলে সে পড়ায়৷ নিয়ম করে মসজিদে এসে পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল৷ সুমধুর সেই আজানের ধ্বনি সেই মাইকের ভেতর দিয়ে চলে যায় অনেকটা দূর অব্দি৷ মসজিদের একপাশে ছোট্ট এক ঘর, যাতে থাকেন মসজিদের ইমাম, জসিম হুজুর৷ পাশ করে মাদ্রাসা থেকে বেরুনোর পরেও জসিম হুজুর এবাড়ি থেকে চলে যায়নি৷ মসজিদের ইমাম হিসেবে তাকে চাকরী দিয়ে এবাড়িতেই রেখে দিয়েছেন দাদাজী৷ আছে অরেকটি ছেলে, রফিক৷ যে এবাড়িতে থেকে বাজারের হাই মাদ্রাসায় পড়ে, তার তিনবেলা খাওয়া দাওয়া এবাড়িতেই৷ জসিম হুজুর সকাল বেলায় মসজিদের গ্রীল দিয়ে ঘেরা বারান্দায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আরবী পড়ায়৷ এর জন্যে জসিম হুজুর আলাদা মাইনে পান৷ জসিম হুজুর মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি গেলে তখন রফিক মুন্সি নামাজ পড়ায়৷

মোষের মতন কালো সাঁঝ
নামে তীরে;
আবহমান উলুধ্বনি
বাজে ঘরে ঘরে,-
পোহালে রাত ফর্সা ভোর
আসে নদীর নামায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷

আমাদের বাড়িতে মসজিদ হওয়ার পর থেকে বিয়ে শাদীতে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে জোরে গান বাজনা করতে দেন না দাদাজী, মসজিদ থেকে শোনা যায় বলে৷ বাড়ির মেয়েরা তবু দাদিকে পটিয়ে গীতের আসর বসায়, দাদি বলে, বেশি জোরে সুর তুলিস না, মসজিদ থেইক্যা যেমুন না হুনা যায়! গোল হয়ে বসে এখনও গীত গায় মেয়ে বউরা, কিন্তু সে যেন বড় ভয়ে ভয়ে৷ বড় মৌলভী সাহেবের এই বাড়িতে একটা ধর্মীয় আবহ বরাবরই ছিল কিন্তু এখন যেন সেটা বড় বেশি বেশি চেপে বসছে মানুষের উপরে৷ সামনের বাড়ির নজরুল ইসলামের ছোট ভাই কালা বিয়ে করে সংসারী হয়েছে ৷ করাত কলে চাকরী নিয়ে সে চলে গেছে শহরে৷ তার বাবা মুসা পাগলার ভাঙা বেড়ার ঘর ফেলে দিয়ে সেখানে দেওয়ালের উপর টিনের চাল দিয়ে তোলা নতুন ঘরে থাকে তার বৌ৷ সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে বাড়ি এলেও এখন সে বাড়িতে আর মুর্শিদি গান হয় না৷ আমাদের খালের উপর পাকা পুলে ছেলে ছোকরাদের আড্ডা বসে বিকেলে ৷ ছোট্ট পুলের রেলিংএ বসে ছেলের দল মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনা ছোলাভাজা, বাদামভাজা খায় ৷ কেউ কেউ এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে ধরায় একটা ক্যাপষ্টেন, তরপর সেটা হাতে হাতে ঘোরে৷ কেউ দেখে ফেলার আগেই উড়ে যায় ধোঁয়া৷ বড় পুল হয়েছে মোড়াহাটির সামনে ৷ এখন আর কোন বুড়ো মানুষকে অপেক্ষা করতে হয় না, কখন কোন দয়ালু মাঝি পার করে দেবে এই খালটুকু৷ মোড়ে, যেখানে এই বড় মৌলভি পাড়ার রাস্তা আর মোড়াহাটির রাস্তা এসে এক জায়গায় মিশেছে সেখানে হয়েছে এক ছোট্ট বাজার, মৌলবীবাজার৷ মোস্তাক ডাক্তারের চেম্বার কাম ডিসপেন্সারি সহ এই বাজারে পাওয়া যায় প্]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725597 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725597 2007-08-13 22:17:00
বিদিত লাল দাস'এর গান শোনা
ঢাকা থেকে সদ্য সদ্য কিনে আনা বিদিত লাল দাসের সিডি চালিয়ে সুমেরুকে গানও শুনিয়ে দিলাম আর ঠিক করলাম যাব গান শুনতে! সুমেরুর সেদিন শ্যুট ছিল, বললো, তাড়াতাড়ি শেষ করে পৌঁছে যাবে হল'এ। আমি আগে থাকতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম, টিকিট দিয়ে নয়, অনুষ্ঠানটি সকলের জন্যে অবারিত দ্বার। অপেক্ষার সময়টুকু হলের বাইরের সিঁড়িতে বসে ঝাল ঝাল 'ঘটিগরম' (গরম গরম মশলা চানাচুর) খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। অপেক্ষা অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার, অপেক্ষা সুমেরুর শ্যুট সেরে হলে আসার।

ঢাকায় গীতালীতে যখন পুরনো লোকসংগীতের সংগ্রহ দেখছিলাম তখন হঠাৎই চোখ পড়ে 'বিদিত লাল দাস' নামটির উপর। এক বিস্মৃত নাম। নামটি দেখামাত্রই একসাথে ভিড় করে এলো অনেক স্মৃতি। এক পিচ্চি টেলিভিশনের সামনে বসে আছে বিশেষ করে লোকসংগীতের অনুষ্ঠানের সময় ধরে। টিবি রুমে আর কেউ নেই। প্রতিদিন একই সময়ে একই চিত্র। তখন ভাল মন্দ বুঝতাম না, গানের কথাও খুব একটা বুঝতাম না শুধু গান শুনতাম। ভাল লাগত সুর। লোকসংগীতের সুর। সিডিতে ঐ নামটি দেখামাত্র কিনে ফেললাম, গান কেমন হবে, ভাল কী মন্দ কোন চিন্তা না করেই। এমনকি ওখানে সিডি চালিয়ে গান শুনিওনি যেমন অন্য সব সিডি শুনে তারপরে কিনেছি।

২৯শে জুলাই সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান, প্রয়াত লোকসংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর জন্মতিথি। সেই উপলক্ষ্যে ৩১শে জুলাই মধুসুদন মঞ্চে লোকভারতী ও পশচিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান। 'লোকভারতী' নির্মলেন্দু চৌধুরী'র নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান যা এখন চালাচ্ছেন উৎপলেন্দু চৌধুরী। উৎপলেন্দু চৌধুরী নির্মলেন্দু চৌধুরীর সুপুত্র। বিদিত লাল দাস আর নির্মলেন্দু চৌধুরী প্রায় সমসাময়িক ছিলেন, উৎপলেন্দু বিদিত লাল দাসকে নিজের গুরু বলে অভিহিত করলেন। তো নির্মলেন্দু চৌধুরীর এই স্মরণ সভায় লোকভারতী নিয়ে আসে বিদিত লাল দাস'কে। তাঁকে সম্বর্ধনা দেয় লোকভারতী ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী হাজির ছিলেন বিদিত লাল দাস'কে সন্মান জানাবেন বলে। ফুলের তোড়া, মানপত্র আর একটি স্মারক দেন সুভাষবাবু। বিদিত লাল বাবুর গায়ে শাল জড়িয়ে দেন উৎপলেন্দু চৌধুরী।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার বেশ আগে পৌঁছে গেছিলাম বলে জায়গা পেয়ে যাই একেবারে সামনে, দ্বিতীয় সারিতে। প্রথম সারিতে বসে বেশ কয়েকজন নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মগ্ন সিলেটি ভাষায়। এঁরা সব সিলেট থেকে এসেছেন বিদিত লালবাবুর সঙ্গে। সে এক অদ্ভুত অনুভব। সেই কোনকালে ছেড়ে চলে আসা সিলেটের মানুষ আর সিলেটি ভাষা তাও এই খোদ কলকাতায় বসে! সেই অনুভূতির কথা বলে বোঝানো যায় না।

গাঢ় নীল পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা পরা বিদিত লাল দাস এলেন অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগে, সামনের সারিতে এসে বসলেন। যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, কথা বলতে গেলে গলা কাঁপে, হাত দিয়ে কিছু ধরতে গেলে কাঁপে হাত। শুধু যখন গান গাইতে শুরু করেন তখন উদাত্ত গলার আওয়াজে গমগম করে হলঘর। আর নাগাড়ে গেয়ে যান আটখানি গান। তাঁর গানের সাথে তবলা বাজাবেন বলে সিলেট থেকে সঙ্গে এসেছেন তাঁরই গানের স্কুলের তবলা শিক্ষক টিংকু। হৃদরোগী বিদিত লাল দাস একা গান গাইতে পারেন না বলে মঞ্চে তাঁর সাথে থাকেন গানের সঙ্গী ( নামটি ভুলে গেছি), যদিও বিদিত লাল দাসের গলা ছাপিয়ে তার গলা একবারও শোনা যায় না, আলাদা করে বোঝা যায় না।

বন্দনা গান দিয়ে শুরু করেন তিনি,
পরথমে মে বন্দনা করি আল্লা রসুল
হজরত ওয়ালীরে দিলাম .....
মাই ফাতেমা হযরত আলী হাসান আর হুসেন
মাতার উপর তুইলা রইলাম...
তার বাদে বন্দনা করি বাবা শাজলাআআআআআআআআআললললললললললল
তিনশ ষাইট আউলিয়া বন্দি...
(কথাগুলো মনে পড়ছে না বলে ডট ডট দিয়ে দিলাম, ক্ষমা করবেন)
এই 'বাবা শাজলাল' বলে তিনি গলা যে উচ্চতায় নিয়ে যান এখনো, সেটা না শুনলে বলে বোঝানো যাবে না। একে একে গেয়ে যান আটখানি গান। প্রতিটি গানের পরে করতালিতে ফেটে পড়ে হল। মঙ্গলবারের সন্ধ্যায়ও সেই হল পুরো ভর্তি ছিল। চরম মুগ্ধতায় শুনে যাচ্ছিলাম একের পর এক গান। মনে হচ্ছিল, এই গান যদি এভাবেই চলতে থাকত! পরক্ষণেই নিজেই লজ্জা পাচ্ছিলাম নিজের এই স্বার্থপর চিন্তায়। অসুস্থ শিল্পী এতদূর থেকে এসেছেন আটখানি গান শুনিয়েছেন, এই কী যথেষ্ট নয়! সেই কোন ছেলেবেলায় যাঁর গান টেলিভিশনে দেখেছি-শুনেছি আজ সামনে বসে তাঁর গান শুনছি-দেখছি তাও কলকাতায় বসে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী কিছু হতে পারে!



(আরও কয়েকজন সেই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন, মুগ্ধ করেছেন আগরতলার এক কিশোরী শিল্পী। তার কথা পরে অন্য কোনদিন, অন্য কোন সময়ে।)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725156 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725156 2007-08-11 16:26:57
তিতাস কোন নদীর নাম নয় - ৪র্থ পর্ব
জলেখা বিবির "বাগ'এ প্রতিবার মেলা বসে শীতকালে৷ বিশাল এক ফলের বাগান, সকলে যারে বাগ বলে৷ মেলায় আসে নাগরদোলা, সাপের খেলা,বাঁদরনাচ আরও নানারকমের খেলা৷ দূর দূর থেকে লোকজন তাদের পসরা নিয়ে আসে৷ থাকে পোড়া মাটির সরা, কলসি, হাঁড়ি আর নানা রকমের পুতুল, বিভিন্ন রকমের খেলনা, রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো কুমির হাঙর আর রবারের সাপ৷ থাকে নানা রকমের খাবারের দোকান আর থাকে জুয়া৷ সারাদিন মেলায় সব খেলনা পোড়ামাটির জিনিসপœ বিœ² হিয়, ছেলের দল স্কুল ফিরতি মেলা থেকে কাগজের হাঙর কুমির আর বাতাসা কিনে বাড়ি ফেরে৷ সন্ধ্যা ঘনালে সেখানে বসে জুয়ার আসর আর সাথে তাড়ি, গাঁজা৷ বিকেল বিকেল দাদি আহাদালির মা বুবুকে পয়সা দিয়ে মেলায় পাঠায় মাটির কলসি,সরা আর খোলা কিনে আনার জন্যে৷ এই খোলাগুলো দেখতে হাঁড়ির মত হলেও হাঁড়ি নয় ৷ এর মুখটা একদম খোলা থাকে অনেকটা কড়াইএর মত৷ যাতে চিতই পিঠে বানানো হয়৷ আহাদালির মা বুবুরা এই খোলাতেই রুঁটি সেঁকে৷ সারা বছরের মাটির মাটির জিনিসপত্র দাদি এই মেলা থেকেই কিনিয়ে রাখে ৷ এই মেলার মাটির কলসি, সরা , খোলা নাকি খুব ভাল হয়, দাদি বলে ৷ আমি মেলায় যাই পুতুল কিনতে ৷ মাটির পুতুল, নানা আকারের নানা ডিজাইনের ৷ মা পুতুল, মেয়ে পুতুল, ছেলে পুতুল আর বাবা পুতুল ৷ আর ছোট্ট ছোট্ট সব হাড়ি-কুড়ি,বাসন-পত্র আর থাকে ছোট উনুন ৷ দুমুখো তিন মুখো পোড়া মাটির উনুন ৷ আহাদালির মা বুবু আমাকে নিয়ে গোটা মেলাটা এক চক্কর ঘুরে চলে আসে মাটির হাড়ি কলসিওয়ালাদের কাছে৷ সে কেনে তার দরকারি জিনিসপত্র আর সবার শেষে আমার জন্যে আমার পুতুল বাসনপত্র আর দুমুখো উনুন ৷ সি এন্ড বি সড়কের ধারে যে বাজার বসে তাতেও এই মাটির পুতুল পাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে আর আমাকে কে নিয়ে যাচ্ছে! মেলার একধারে একটা জায়গা একদম ফাঁকা পড়ে আছে, কিছু জিনিসপত্র ইতস্তত: ছড়ানো, ভাঙা বোতল, গেলাস আর রঙ বেরঙের ছবি আকা কিছু কাগজ, যাতে রাজা রাণীর ছবি আঁকা৷ হাতে নিয়ে দেখতে গেলে বুবু বারন করে, বলে, ওতে হত দিয়েন না আম্মা, সারা রাইত হারামিরা এইখানে জুয়া খেলসে আর গাঞ্জা তাড়ি খাইসে! জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এই রাজা রাণীর ছবি আঁকা কাগজগুলোকে বলে "তাস' এগুলো দিয়ে জুয়া খেলে৷ কি করে খেলে তা অবশ্য বুবু বলতে পারলো না তবে গাঞ্জা আর তাড়িটা কি জিনিস সেটা বুবু জানে৷ তার ছেলে আহাদালিও নাকি রাতে এখানে বসে তাড়ি খেয়ে নেশা করে আর সারাদিন বাড়িতে পড়ে পড়ে ঘুমায়! খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে যেমন গুড় হয় তেমনি তালের রস জ্বাল দিয়ে তাড়ি হয়, যা খেলে লোকের নেশা হয় ৷ নেশাটা কেমন জিনিস সেটা অবশ্য বুবু ঠিকঠাক বোঝাতে পারলো না ৷ গাঁজাও নাকি সেরকমই নেশার বস্তু, তামাক যেরকম হুকোর মধ্যে দিয়ে খায় এও সেইরকমই ছিলিমের মধ্যে দিয়ে খায় ৷ পড়ে থাকা গাঁজার ছিলিমও দেখা যায় মেলার মধ্যে ৷

জসিম হুজুর আমাদের বাড়িতে থেকে বড় মাদ্রাসায় পড়ে৷ আর একবছর পর সে মৌলভি হয়ে যাবে, এখনও সে ছাত্র ৷ দাদি সব সময়েই এরকম একজন ছাত্র বাড়িতে রাখেন, যে আমাদের বাড়িতে থাকে খায় আর পড়াশোনা করে ৷ কোন ছেলে অনেক দূরের কোন গ্রাম থেকে আসে ৷ একটু বড় বয়েসে এলে সে বেশিদিন থাকে না ৷ কয়েক বছরে তার পড়া শেষ হলে সে চলে যায় আর তার জায়গায় আসে অন্য আরেকজন ৷ জসিম হুজুরকে আমি দেখছি অনেকদিন ধরেই ৷ দাদি বলেন সামনের বছর জসিম চলে যাবে আর তার জায়গায় আরেকজন আসবে৷ পাঁচবেলা আজান দেওয়ার সাথে সাথে জসিম হুজুর আরেকটা কাজ করে, ভোরবেলা আমাদের বাংলা ঘরে এই পাড়া সহ আশে পাশের পাড়া থেকেও ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা আসে আরবি পড়তে, জসিম হুজুর এদের সবাইকে আরবি পড়ায় ৷ সকালের এই এক ঘন্টা পড়ানোর জন্যে দাদাজি জসিম হুজুরকে মাইনে দেন ৷ সব ছেলে মেয়েরা সুর কউ কোরাঅন শরীফ পড়ে তো কেউ আমপারা ৷ যারা আমপারা পড়ে তারা সেটা শেষ হলেই কোরাঅন শরীফ পড়া শুরু করবে ৷ অত বড় ঘরখানায় দু সারি করে ছেলে মেয়েরা সব বসে ৷ জসিম হুজুর প্রথমেই সুরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে, "আলহামদুলিল্লাহ হিরাব্বিল আ'লামিন৷ আর রাহমানির রাহিম ৷ মালিকি ইয়াওমিŸনি৷ ইয়্যাকা না'বুদু অ ইয়্যাকা নাশতায়িন ৷ ইহদিনাস সিরাতাল মুশতাকিন৷ সিরাতাল্লাযীনা আন আমতু আলাইকুম ৷ গাইরুল মাঘ্দু বিআলাইকুম ৷ অলাŸউউয়াল্লীন ৷ আমীন ৷' পড়িয়ে তারপর যার যার পড়া শুরু করতে বলে আর পড়ার শেষে সকলে একসাথে দরুদ পড়ে , "আল্লাহুম্মা সালিয়ালা সায়্যিদিনা ও নাবীয়ানা ও শাফিয়ানা ও মাওলানা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহে সাল্লাল্লাহু ওয়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷' দুই হাত তুলে দোয়া করে পড়া শেষ করে ৷ পড়ার মাঝখানে সে হাতে একখানা বেত নিয়ে শুধু চারপাশে ঘোরে, কেউ চুপ করে থাকলে তাকে বেত উঁচু করে ধমকে বলে, অ্যাই, পড়স না ক্যান? আওয়াজ কই গলার? অমনি সে পড়া শুরু করে!


-4-


আকাশ আজো ঢেউয়ের মুখোমুখি,
নদীর উজান ভেজায় ক'টি তারা ৷
অন্ধকারে স্রোতের কশাঘাতে
হটাত্ বুঝি বুকের মাঝে নেই,
আমার পাশে চলার ছিল যারা ৷ ( নির্মলেন্দু গুণ )

একে একে অনেকগুলো অঘটন ঘটে গেল এই পাড়ায়৷ সখিনার স্বামী বুড়ো হাসন আলি হঠাত্ করে মরে গেল ৷ বিকেলবেলা উঠোনে বসেছিল হঠাত্ অসুস্থ বোধ করে ৷ খানিকক্ষণের মধ্যেই মাটিতে গড়াগড়ি ৷ তার কি কষ্ট হচ্ছে সেটুকুও সে বলতে পারে নি ৷ ধড়ফড় করতে করতে শেষ ৷ উঠোনে হাত পা ছড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিল সখিনা, তার ছেলে মেয়ে তিনটে এক কোণে বসে আছে বুড়ো মইজুদ্দিনের কাছে৷ মইজুদ্দিন চুপ করে বাচ্চা তিনটেকে আগলে বসে আছে ৷ আশে পাশের বাড়ির মেয়েরা এসে সখিনাকে উঠোন থেকে তুলে ঘরের ভিতরে নিয়ে চলে গেল৷ সখিনার স্বামীর এখন দাফন কাফন হবে, পাড়ার পুরুষেরা এসে সে বন্দোবস্ত করতে লাগল ৷ ঘরের ভেতর থেকে শুধু সখিনার হেঁচকির আওয়াজ ভেসে আসছে ৷ আহাদালির মা বুবু আমার হাত ধরে বলল চলেন আম্মা, ঘরে যাই, আফনের দাদি আবার খুঁজতে আরম্ভ করব ৷

ওপাড়ার মুসা লস্করের ছেলে লিয়াকত চাচা মরে গেল সাপের কামড় খেয়ে৷ পাশের বেতঝাড়ে বেত কাটতে গিয়েছিল সে৷ বিষাক্ত সাপে ছোঁবল দেয় তাকে৷ কিচ্ছু করা যায়নি লিয়াকত চাচার জন্যে ৷
ক্বালা আলক্বিহা ইয়া মূসা ৷৷
ফাআলক্বাহা ফাইযা হিয়া হাইয়্যাতুন তাস্আ ৷৷
ক্বালা খুয্হা ওয়ালা তাখাফ্ সানুয়ীদুহা সীরারাহাল ঊলা ৷৷ ( সূরা তা-হা, 19-21 আয়াত)
[ আল্লাহ বলেছেন, হে মুসা, তুমি লাঠি নিক্ষেপ কর৷ তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, তখন তা অজগর সর্প হয়ে বিচরণ করতে লাগল৷ আল্লাহ বলেছেন, তুমি এটাকে ধর ভয় পেয়োনা; আমি প্রথম বার একে লাঠিতে পরিণত করে দিচ্ছি ] ওঝা এসে অনেক চেষ্টা করেছে বিষ নামানোর, কিছুই করতে পারেনি সে ৷ গোটা শরীর ক্রমশ নীল হয়ে গেছে লিয়াকত চাচার, মুখ দিয়ে গ্যাজলা উঠছে আর চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে খুব দ্রুত ৷ চার হাত পা মাটিতে দাঁপিয়ে দাঁপিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছে সে ৷ এদিকে যতখানি দাঁপিয়েছে লিয়াকত চাচা তার চাইতে বেশি বুক চাপড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছে তার মা,বাবা ৷ বড় কাকা খবর পেয়ে সাইকেল নিয়ে বাজারের হাসপাতাল থেকে ডাক্তার নিয়ে এসেছে কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না কারও ৷

ছেলের শোকে পাগল হয়ে গেল বুড়ি মা ৷ আর শোকে শোকে কয়েক মাসের ভেতর মরে গেল মুসা লস্কর৷ পাশের বাড়ির সুজন তার বউ বাচ্চা নিয়ে এসে দখল নিল তার চাচার বাড়ি বাগান আর পুকুরের৷ জমি-জমার দখল আগেই নিয়েছিল সে৷ মুসা দাদার অত সাধের বাগান শুকিয়ে যেতে লাগল অযত্নে ৷ বুড়ি দাদি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ি ও বাড়ি, যেখানে সন্ধ্যে হয় সেখানেই আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ে ৷ সুজনের বউ সাফিনা সরাদিন বাড়িতে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে আড্ডা দেয় পান খায় আর মোড়লি করে ৷ মুসা লস্করের বাগানে বসে পাড়ার ছেলে ছোকরাদের নিয়ে জুয়া খেলে সুজন ৷



(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723240 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723240 2007-07-29 15:03:32
কি লিখি আমি : পান আপনি হামানদিস্তাতেই কেন ছেচে খাবেন? ইচ্ছা করলে এমনিই তো খেতে পারেন! দাদুর তো চাপার দাঁত ছিল না তাই ছেচে খেত, আপনি কেন ছেচতে যাবেন?
: নাহ.. এমনি খেতে ইচ্ছা করে না। আম্মা যেরকম হামানদিস্তায় ছেচে খেতো , ঐর'ম খেতে ইচ্ছা করে।
: তাইলে একটা হামানদিস্তা কিনে আনলেই তো পারেন।
: তা পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। তোমার দাদুর হামানদিস্তাটা কই আছে কার কাছে আছে কে জানে!

৬৮বছর বয়েসের বাবা আমার এখনো আকুল হন মায়ের হামানদিস্তার জন্য। সেটায় করে মায়েরই মতন করে পান ছেচে খাওয়ার জন্য। আমার গলা বুজে আসে। কথা সরে না। বাবাকে বলি,পরেরবার আমি হামানদিস্তা নিয়ে আসব আপনার জন্য, আপনি সেটায় দাদুর মতন করে পান ছেচে খাবেন।

হাসি তবুও ম্লান। মনে মনে তখনও খোঁজ সেই হামানদিস্তার।

ঝটিতি ঘুরে আসা এবাড়ি, ওবাড়ি। টেবিলভর্তি খাবারে ইলিশ হাজির এবেলা ওবেলা। তবু কে জানে কেন লাগে শূণ্য শূণ্য। মন পড়ে থাকে ভাপ ওড়া চিতই আর হাসের ভুনা গোশতে।

পতেঙ্গার সমুদ্রে আমি আমার কৈশোরকে খুঁজে পাই না। যদিও প্রতিবার চট্টগ্রামে গিয়ে আমি একবার পতেঙ্গায় অবশ্যই যাই। প্রতিবারই দেখি একটু একটু করে বদলে যাওয়া এই ছোট্ট সমুদ্রতট। জোয়ারে যার সৈকত বলে কিছু থাকে না। জল এসে আছড়ায় বাধানো পারে, ফেলে রাখা বোল্ডারে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হুটোপাটি করে তৈরী হয়ে চলে যাই পতেঙ্গায়। ভোরবেলাকার সূর্য ওঠা দেখি বোল্ডারের উপরে বসে থেকে। ভাটা থাকলে হাঁটি সৈকতের এমাথা ওমাথা। অনেকক্ষণ থাকি। বেলা মাথার উপরে ওঠা পর্যন্ত। এবারে অনেকদিন পরে বিকেলে পতেঙ্গা গেলাম। বহুবছর পরে। এই বিকেলবেলার পতেঙ্গা যে এত বদলেছে ধারণা ছিল না। সমুদ্রের ধার ধরে বোল্ডারের এপারে যেন বাজার বসেছে। অনেকটা মেলার মতন কিন্তু মেলা নয়। আবার ঠিক বাজারও নয়। ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা বালতিতে করে রকমারী সব বোতল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই না বাজার না মেলাময়। রকমারী সব পানীয়ের নামের শেষে আসে বীয়ার এমনকি বাংলা মদেরও নাম। তবে এই নামগুলো এরা উচ্চারন করে আস্তে। অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে।

এই পতেঙ্গা আমার চেনা নয়। এর সাথে আমার আলাপ হয়নি কখনও। সারাদিনের টিপটিপ বর্ষণের পরে এই বিকেলে বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ভরা জোয়ারের সমুদ্র যেন ফুঁসছে। সোঁ সোঁ গর্জনে আছড়ে আছড়ে ঢেউ এসে ভাঙছে বোল্ডারে। কয়েকটি ছেলে হাত ধরাধরি করে বোল্ডারের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্নানের চে