somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... তুমি এলে না বলে.. আজ আমাদের ঈদ নয় ----------------------

সেদিন ইদ ছিল। আগের দিন সন্ধেবেলায় ছাদের উপর থেকে চাঁদও দেখলাম। বহু বছর পরে। প্রতিবারেই তো সেই রাত এগারোটার পরে মসজিদ থেকে বলে দেওয়া হয়, অমুক জায়গায় চাঁদ দেখা গেছে, অতএব কাল ঈদ! মসজিদে মসজিদে তার বহু আগেই যদিও সারা হয়ে গিয়ে থাকে তারাবির নামাজ। কিন্তু সেদিন চাঁদ দেখা গেল আর আমিও দেখলাম। ঝকঝকে আকাশে একফালি চাঁদ। ঈদের চাঁদ। লোডশেডিংএর নীরবতায় দূরের মসজিদ থেকে মাইকের আওয়াজে ভেসে এল পরদিনের নামাজের সময়। বারে বারেই.. কোথাও কোনো শব্দ নেই.. এমন দিনে এমন নীরবতায় আধখানা শেষ হওয়া চারতলা বাড়িটিতে বাড়ির কারিগরেরা গান ধরল। কী আশ্চর্য, ওরা ঈদের গান গাইছে..কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারি না, আঞ্চলিক টান, কিন্তু ইদের চাঁদ কথাটা বারে বারে ঘুরে ঘুরে আসে গানের মধ্যে। আহারে.. বছরকার দিনটিতেও ওরা বুঝি বাড়ি যেতে পারল না..

আজ আমাদের ঈদ নয়.. তুমি এলে না বলে.. তুমি বললে, আমাদের ঈদ পরে হবে, তুমি এলে তবে ঈদ হবে..বাবুটা তবু রেড রোডের জামাতে গেল আর ভিজে কাক হয়ে বাড়ি ফিরল। আমি তবু খানিকটা সেমুই রাঁধলাম ও নামাজ সেরে ফিরে খাবে বলে। কিন্তু সক্কলে তো আজ ঈদ করছে.. ভাইয়া তাই ফোন করে জানতে চায় কী রান্না করেছি.. আব্বা বলে, সকলেই আছে তুমি শুধু নেই.. এই সেদিন বাড়ি থেকে ঘুরে আসা সত্বেও আম্মা জানতে চায়, কবে বাড়ি যাব? আমি বিছানার দিকে তাকাই, ওতে পাতা আছে কালোর উপর কাঁথার ফোঁড়ের নকশী চাদরখানি, আমার মায়ের দেয়া। ওতে আমার মায়ের হাতের ছোঁয়া যেন এখনো লেগে.. প্রতি শাবান মাসের এক তারিখে ওটা আমার বিছানায় পাতি, আজও পেতেছি, আমার মা আজ ইদ করছে বলে.. আমার চোখ ভিজে আসে শুধু-মুদুই.. ফোনের ওপাশ থেকে শুনতে পাই পিচ্চিগুলোর কলকলানি। ছোট্ট অপুটার ও ও আমি এখান থেকেই শুনতে পাই। ফোনের ওধারে..

বেলা এগারোটা বাজতে বাজতেই মুখ ভার হয় আকাশের আর নামে অঝোর ধারা সাথে গুরু গুরু, দ্রিমি দ্রিমি.. এমন বৃষ্টিময় দুপুরে আমি বাথরুমের খুপরি জানালায়, কিচেন কাউন্টারে জল ঢেলে দিই ইচ্ছেমতন। এমনি দিনে ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়, জল ঢাললে সোজা গিয়ে পড়বে তিনতলা-দোতলার সব চৌখুপরিতে, আর একতলা থেকে তিনতলার সব নারীকন্ঠে একযোগে অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকবে চারতলার বাসিন্দা মুসলমানটির উপরে। তুমুল বৃষ্টিতে আজ কারোর কোনো চেঁচামেচির সুযোগ নেই <img src=" style="border:0;" /> আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে <img src=" style="border:0;" />

কখন তোমার আসবে টেলিফোন.. -------------------------
ফোন। আমার ফোনটা বছরে দু'বার বাজে। সারাদিন ধরে বাজে। এসএমএসের পর এসএমএস আসে সারাদিন ধরে, বছরে দু'বার। এমনি সময়েও বাজে তবে সেগুলো বেশির ভাগই হয় কোনো বীমা কোম্পানীর নয় কোনো ক্রেডিট কার্ডের নয় এয়ারটেলের। আর এসএমএস গুলো এমনি দিনে পাঠায় এয়ারটেল বা পাড়ার ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের নানান অফার দিয়ে। কিন্তু বছরে দু'বার আমার ফোন বাজে আর সারাদিন ধরে বাজে। এসএমএস আসে আর সারাদিন ধরে আসে। আমার জন্মদিনে আর ঈদের দিনে। ভোর ভোর ফোনের ওধারের গলা শুনে চিনতে পারি না, ওটা রূপক'দার গলা। কখনো তো কথা হয় না, চিনব কী করে! সেই বাংলালাইভের বাংলা আড্ডার আলাপ। বছরে দু-একবার দেখা হয়ে যায় কোনো কমন বন্ধুর বাড়ির বৈঠকখানায়। তোর নাকি জ্বর হয়েছে? কী যে করিস, বছরকার দিনে অসুখ বাঁধিয়ে বসে! আমার বুকের ভেতরটায় কেমন চিনচিন করে ওঠে.. ফোনে একের পর এক উৎকন্ঠিত আওয়াজ সব.. শুভেচ্ছায় শুভেচ্ছায় ভরে ওঠে অর্কুটের পাতা, উপচে ওঠে মোবাইলের ইনবক্স.. বেশির ভাগ নম্বরই চিনতে পারি না, চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনখানির সাথে চুরি গেছে সব নম্বরগুলিও। প্রতি ঈদের মত আজও এসএমএস আসে সিডনি থেকে, ইন্দ্রাণী, আমার আই-মশাই। যে কখনোই আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে ভোলে না, ঈদে বা জন্মদিনে। আমার চোখ বুজে আসে। ঝুম মেরে বসে থাকি। নাহ.. আসে না সেই ফোনটি.. কতো কত্তো কাজ..


কন্টিনিউয়েশন অফ বিশ্বকর্মা পুজো ----------------------------
সেদিন হঠাৎ করেই হাজির হয়েছিলাম শাশ্বতদের বিশ্বকর্মা পুজোয়। খেয়াল ছিল না, যে ওদের পুজো আছে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যপার আছে। শুভেন্দু'দা রিতিমত টেনে টুনে বসিয়ে দেন দুপুরের খাওয়ায়, বিকেল পাঁচটায়।ইলিশ মাছ, মুন্না'র দোকানের খাসি আর চাটনি। পুজোর আনন্দে লুকিয়ে পাঁইট গিলে নেওয়া প্রবীরবাবুর আতিথেয়তার আতিশয্যে খাসির ঝোলে আমার জামা-কাপড় একশা। পরদিন শুভেন্দু'দার ফোন, ইলিশের মাথাগুলোর তো একটা গতি করতে হবে, চলে আসুন দুপুরবেলা, সন্ধেটাও এখানেই কাটাবেন। ইলিশের মাথার গতি করতে গিয়ে চলে আসে আরো কয়েক পিস ইলিশ মাছ আর সাথে কচু শাক। উড়ে বামুন জানে না কী করে রাঁধতে হয় কচুর শাক। দশ আঁটি কচু শাক কোটা-বাছা আর রান্না করতে হয় শুভেন্দু'দাকেই। ইলিশের মাথা দিয়ে বিশ্বকর্মা পুজোর কন্টিনিউয়েশনে নেমন্তন্ন পায় আরো দশ-বারো জন। আবারো লাঞ্চ বিকেল পাঁচটায়। আধপচা লিভার পুরোটা না পচে যায় সেই ভয়ে এক হপ্তা শুভজিত সুরাবিহীন। এলজোলামের ঘুম। সন্ধ্যেয় স্বপন'দার ট্রিট, ব্লেন্ডার্স প্রাইড। একটা এসএমএস। কাল তোমাকে হলে দেখতে চাই..! অপরিচিত নম্বর। কে হতে পারে? আরে হ্যাঁ, কাল অনুশ্রীদির গান আছে না বিড়লা অ্যাকাডেমি মঞ্চে? সেখানকারই কেউ? মোবাইল হারিয়ে এই এক যন্ত্রণা হয়েছে, কে ফোন করছে, কে এসএমএস করছে কিস্যু বোঝা যায় না। আসে জোশি, সাথে কাটোয়া কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক নন্দিতা। বেচারী নন্দিতা, জোশি তার একটা ফিল্মে নন্দিতাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিতে রাজী হয়েছে, নন্দিতা ধোঁয়া ফোকা ছেড়ে দেবে এই শর্তে! ব্লেন্ডার্স প্রাইড, শুভেন্দু'দা আর আর এক গোল টেবিল ভর্তি ধোঁয়ার মাঝখানে চুপচাপ বসে থাকে ব্লেন্ডার্সের গ্লাস হাতে নিয়ে।

কম্পিউটারে মৌসুমী ভৌমিক। আমি শুনেছি সেদিন নাকি তুমি তুমি তুমি তুমি মিলে তোমরা সদলবলে সভা করেছিলে.. প্রথমে গুনগুন পরে গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে শমীকও। আমাদের সভা শেষ হলে মঈন ভাইয়ের গাড়ি পাঁক খেতে খেতে লোক নামায়, মন্দিরতলা, উল্টোডাঙা, রুবী, নাকতলা। তারপর পার্ক সার্কাসের গ্যারাজ।

মাঝরাতে ফোনে শুভজিত। ক্লান্ত, বিষন্ন আওয়াজ। রিনিকে একটা ফোন করবে প্লিজ! রিনি আমার ফোন আজকাল আর ধরে না.. আমি চুপ করে থাকি লোডশেডিংএর অন্ধকারে.. শুভ'র হাতটা ধরে..কষ্টের রং নাকি নীল.. এখনও কী শুভ নীল হয়ে আছে..]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/29014649 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/29014649 2009-09-23 12:02:14
চিরকুট কাল তুমি বললে, আজ দার্জিলিং-এ বৃষ্টি হয়েছে আর বললে, কাল কলকাতায় বর্ষা নামবে..


হুমম.. খানিকটা বৃষ্টি কলকাতায়ও হয়েছিল বটে, তবে বর্ষা কি নেমেছিল? ওইটুকু বৃষ্টিকে কী তুমি বর্ষা বলো! এই খানিকটা হাঁক-ডাক, অন্ধকার চেরা বিদ্যুতের কয়েকটা চমক, কয়েক ফোঁটা জল আর রাতের কালো আকাশ আরো খানিকটা কালো। তবে এমন রাতে ঘুম ভালো হয়।


আবহাওয়া দপ্তরের হিসেবমতো বর্ষা চলে আসার কথা কিন্তু ওই দপ্তরের হিসেব সহসা মেলে না এখানে, সে তুমি জানো। কাজেই আরো খানিক অপেক্ষা করা যাক বরং..


আরে বাহ! এখানে দেখি অটো সেভড হয়ে যায় লেখা!


অর্কুটের চিরকুট, ফেসবুকেও চিরকুট। এই চিরকুটগুলো চিঠি আর হয়ে ওঠে না।
এই দেখো, এও চিরকুট হয়েই রয়ে গেল!

ঘুম পাচ্ছে..





]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28965154 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28965154 2009-06-16 00:07:41
প্রাণের বান্ধব রে...
এখানে নন্দীগ্রাম নিয়ে গোটা পশ্চিমবাংলা উত্তাল। বনধ, মিছিল। বিক্ষোভ। পাল্টা মিছিল। পুলিশ। লাঠি। লকআপ। নন্দীগ্রাম গণহত্যা কেন, যে কোন প্রকারের অত্যাচারই নিন্দনীয়। কাওকে হত্যা করার কোন অধিকারই কারোর নেই। তবুও মানুষ মানুষকে মারে নির্বিচারে। গণধর্ষণ হয় প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রতিবাদের ভাষা এক একজনের এক একরকম। কেউ মোমবাতি জ্বালান, কেউ মিছিলে হাঁটেন, কেউ বা বনধ ডাকেন।

আমি কোনদিন কোন মিছিলে যাইনি। নন্দীগ্রামে গণহত্যা, শাসকদলের অত্যাচারের প্রতিবাদে লাখো মানুষের ঐ নীরব মিছিলেও আমার যাওয়া হয়নি। অথচ মন পড়েছিল ওখানেই। মিছিলে গেছেন এমন বন্ধুর ফোনে বারবার ফোন করে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাব বলে তৈরি হয়েও যাওয়া হয়নি। ঠিক সাহস করতে পারিনি। বরাবরের কূপমুন্ডুক আমি তাই সম্পূর্ণ অরাজনৈতীক প্রতিবাদ মিছিলেও যাইনি। বাড়িতে থেকেই চোখ রেখেছি টিভির পর্দায়, খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছি এদিক ওদিক। ব্যাস। ওটুকু...

অনেকে চলচ্চিত্র উৎসব বয়কট করেছেন নন্দীগ্রামের প্রতিবাদে। অনেক বড় বড় নামী দামী নাম সে লিষ্টে। আমার চেনা একজনও বললেন, বয়কট করেছেন। সত্যি কথা বলতে কী, আমার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না বা হয়নি। বছরে এই একবারই এভাবে সিনেমা দেখার সুযোগ আসে আর এবছর তো আমার হাতে ডেলিগেট পাস! কিন্তু তবু ভাবছিলাম, সত্যি কি সিনেমা দেখব? অন্তত এটুকু করি, এই সরকারের আয়োজিত এই উৎসবে না যাই...

রবিবার ১১তারিখে অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসএর সামনে থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল বেরুনোর কথা। কারা আসবেন সেই মিছিলে সেসব কিছুই জানি না। শুভজিত শুধু বলেছিল, বেলা দুটোর মধ্যে অ্যাকাডেমির সামনে চলে এসো। শুভজিত নিজে বয়কট করেছে এই ফেষ্টিভ্যাল (আমার জানামতে)। মিছিলে যাব নাকি সিনেমা দেখব এই নিয়ে দোলাচলে আমি দোদুল্যমান মন নিয়ে বেলা দুটোর মধ্যেই অ্যাকাডেমির সামনে গিয়ে হাজির হই। সেখানে পরিচিত একজনের সাথে দেখা হয়। আমি তাঁকে চিনি আমার বরের সহকর্মী হিসেবে, মিছিলে যাচ্ছ কী জানতে চেয়ে শুনলাম, সকালের শোয়ে সিনেমা দেখে এখন বিক্ষোভে যোগ দিতে এসেছি, মিছিল শেষে আবার টুক করে ঢুকে পড়ব সিনেমা দেখতে! শুনে আমি নিশ্চিন্ত মনে সিনেমা দেখতে ঢুকে যাই নন্দন চত্বরে। যাই মন দিয়ে সিনেমা দেখি গে..

খানিকক্ষণের জন্যে দুপুরবেলা সেদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে লগইন করতেই চট্টগ্রামের অর্কুট বন্ধু জাভেদ নক করলো, এখানে তো সাইক্লোন আসছে, তোমাদের ওদিকে কী খবর? এখানে সেদিন খটখটে রোদ। জাভেদ বললো, কী হবে জানি না তবে পূর্বাভাস যা দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে অবস্থা খারাপ হবে। পরদিন সকালে আব্বাকে ফোন করি ততক্ষণে কালো হয়েছে কলকাতার আকাশও। সাইক্লোনের পূর্বাভাস এখানকার কাগজেও। আব্বা বলেন, ঝড় আসছে, বিকেলের দিকে বা তারও পরে ভাঙবে, এখনো শুধু সাজছে। তবে এবার বোধ হয় চিটাগাং বেঁচে গেল! শুনে আমি স্বার্থপরের মত নিশ্চিন্ত হই। সবার খোঁজ খবর নিয়ে ফোন রেখে মন দিই নিজের কাজে। সন্ধের ঝড়ো বাতাস আর শিরশিরে ঠান্ডায় ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দেশের কথা ভাবি। বন্ধ জানালার কপাট কাঁপে বাতাসে, বারে বারেই মনে হয় এই বুঝি খুলে গেল বন্ধ ছিটকিনি...মন খারাপ হয়, চিন্তা হয়। কে জানে কী অবস্থায় আছে দেশের মানুষ...

একলা একলা নন্দন চত্বরের এ'হল ঐ হল ঘুরে ঘুরে সিনেমা দেখলাম এই ক'দিন। প্রথম দু'দিন অবশ্য আমার বরও ছিলেন ঐ চত্বরেই কিন্তু এক হলে নয়। আমি নন্দন ১এ তো উনি শিশির মঞ্চে। সিনেমা শেষ হলে বেরিয়ে এসে পরের সিনেমা শুরু হওয়ার মাঝের খানিকটা সময় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ফোঁকা, কী দেখলে কেমন দেখলে জাতীয় দু-চারটে কথা। দুপুরের খাওয়াটা ঐ দু-তিনদিন একসাথেই হয়েছে ৩টের শো শুরু হওয়ার আগে বেশ খানিকটা সময় হাতে থাকে বলে। একা একা একটানা অনেকগুলো সিনেমা দেখাটা নিজের কাছেই কেমন জানি অদ্ভুত লাগছিল। মন খারাপও যে হত না তা নয়। সব সিনেমাই যে খুব ভালো লেগেছে বা খুব মন দিয়ে দেখেছি তা তো নয়। মন এদিক ওদিক ছোটাছুটি তো করেই বা করবেই। চোখ সিনেমার পর্দায় মন চলে যায় কোথায় কোথায়...

নন্দন ২য়ে সিনেমা দেখতে গেলেই মনে পড়ে নাসরীনের কথা। উড়ে যায় নিশিপক্ষী নামের একটা সিনেমা এসেছিল দু বছর আগের ফেষ্টিভ্যালে। সেখানেই নাসরীনের সাথে আলাপ। ওর কোন এক উপন্যাসের চিত্ররূপ বলে নাসরীন আমন্ত্রিত ছিল ফেষ্টিভ্যালে। নাসরীনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হওয়ার কোন কারন ছিল না কিন্তু তবু হয়েছিল। ওর ছেলেমানুষি ওর পাগলামো ওর প্যাশনআমার ভীষণভাবে মনে পড়ে। আমার নিজের এক খুব ব্যক্তিগত এক কারনেও ওকে খুব মনে পড়ে আমার। প্রায়শই। এই উৎসবে বারে বারেই নাসরীনকে মনে পড়েছে... অজান্তেই নন্দন চত্বরের এদিক ওদিক চোখ গেছে... ও কী আছে এখানেই?







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28746071 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28746071 2007-11-18 00:38:36
১৩তম চলচ্চিত্র উৎসব ও আমার সিনেমা দেখা
সিনেমা দেখলাম আজকে ৬টা যার মধ্যে ২টো শর্ট। ডার্ক নাইট আর টু অন ব্রীজ। প্রথমটি খুবই ভালো লেগেছে, দ্বিতীয়টি বেশ মজার। ( পরে এই লেখাতেই সিনেমাগুলির একটু ডিটেল যোগ করে দেব) ।

ফার্নান্ডো ই সোলানাসের দ্য ক্লাউড, জাফার পানাহির অফসাইড, ব্রাজিলের সিনেমা আই রিমেম্বার, আমাস গিতাইয়ের প্রমিসড ল্যান্ড।
খুব ভালো লেগেছে অফ সাইড। সিনেমা দেখতে গিয়ে কোন চাপ নেই। আমাস গিতাইয়ের সিনেমা আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, হল ছেড়ে পালিয়ে এসছি শেষের খানিকটা বাকি থাকতে। গরু ছাগলের মত নিলামে কিনে নিয়ে একদল মেয়েকে পাচার করার গল্প।

সিনেমার গল্প সময় নিয়ে লেখার ইচ্ছে রইল।


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28744858 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28744858 2007-11-12 07:44:23
ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...
আবার এমনও হয়, হঠাত্ করে মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হয় কেঊ যেন জানালা দিয়ে ঘরে এসে ঢুকেছে, আর দাঁড়িয়েছে খুব কাছে এসে৷ তাকিয়ে আছে অপলক,নি:শ্বাস ফেলছে গায়ের পরে...আমি পাগলের মত দৌঁড়ুই, সোজা সামনের ঘরে, যেখানে মিষ্টি ঘুমিয়ে আছে ...দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি দরজা ধরে, কাঁপি থরথর থরথর... খানিক দাঁড়িয়ে থেকে চেষ্টা করি ধাতস্থ হওয়ার৷ ফিরে আসি নিজের ঘরে, ঘরের বাতি জ্বালিয়ে জানালাগুলো টেনে বন্ধ করি পর্দাগুলো টেনে দিই ভালো করে, একটুও ফাঁক-ফোকর যেন না থাকে৷ পাশ বালিশ টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ি গুটিসুটি মেরে, যতখানি গুটিয়ে শোওয়া যায়!

আমার ভীষণ ভয় করে, ভীষণ ভয়! স্বপ্নেরা অনবরত ভয় দেখায়...কেউ যেন কাটা-ছেঁড়া করে আমায়...ছুরি কাঁচি চালায় যখন তখন ...যত্র তত্র... কোন অষুধ দেয় না, দেয় না কোন অ্যানেস্থেশিয়া ..কিছু একটা অপারেশন চলছে, আমি সেটা দেখি... আমারই উপর চলছে কাটা-ছেঁড়া...ব্যথার আশঙ্কায় আমি চীত্কার করি...ব্যথাহীন ব্যথায় নীল হয়ে যাই... ঘুম ভেঙে যায় আমার ঘুম ভেঙে যায়...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28743976 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28743976 2007-11-09 15:30:12
ক্রিং ক্রিং টেলিফোন হ্যালো হ্যালো হ্যালো...
আমি একছুট্টে চলে যাই ছেলেবেলায়, খুঁজতে থাকি চেনা মুখগুলো। বিস্মরণের গলিগুলোতেও ঘুরে আসি একপাক। আতিপাতি করে খুঁজি সব ঘিঞ্জি গলি। কিন্তু কোথাও আমি খুঁজে পাই না আনোয়ারকে।

আমি সত্যিই চিনতে পারি না। তবে একটা আবছা অবয়ব ফুটে ওঠে আর মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে যায়, আনোয়ার! রোগা ঢ্যাঙ্গা আর কালো? ওপাশ থেকে জোরালো হাসির শব্দ আসে, হ্যাঁ হ্যাঁ! সেই রোগা ঢ্যাঙ্গা কালো আনোয়ার! এই তো মনে আছে! ব্যস, ঐটুকুই! আর কিছু মনে পড়ে না। আইএসডি ফোন কানে নিয়ে বেশি চিন্তাও করা যায় না। ওদিকে ফোন হাতবদল হয়েছে বুঝতে পারি। এবারে নারীকন্ঠ ভেসে আসে। আমি আনোয়ারের মিসেস। আপনি তো সামরান। ওর ছেলেবেলার বন্ধু! আপনার কথা আমার সাহেবের কাছে এতো শুনেছি এতো শুনেছি যে আপনাকে কোনদিনও না দেখেও আপনাকে ভীষণ চেনা মনে হয় আর খুব আপন মনে হয়। আপনি ভালো আছেন তো?

আমার অবাক হওয়ার পালা তো কেবল শুরু! কি বলব না বলব ঠিক যেন ভেবে না পেয়েই বলি, ভালো আছি, আপনাকে তো চিনি না, আপনার নামও জানি না কিন্তু আপনি আমার কথা শুনেছেন, আর আপন বলে ভেবেছেন। কি বলব বুঝতে পারছি না! শুনলাম আমার নাকি একটা ছবিও আছে আনোয়ারের কাছে। সাদায় কালোয় ফুলছাপ ফ্রক পরা এক ছোট্ট মেয়ের ছবি। ওপাশের নারীকন্ঠ আবার জানতে চায়, আপনি এখন কেমন হয়ছেন দেখতে?

কেমন? যেদিক দিয়ে হেঁটে যাই, লাইন দিয়ে সব লাশ পড়ে । দুজনের সম্মিলিত হাসির শব্দে বুঝতে পারি, ওরা ফোন লাউডস্পিকারে রেখেছে! আনোয়ারের স্ত্রী বলে, আপনি কী এখনো আগের মতই অহংকারি? অহংকার? আমার? জবাব আসে, আপনি নাকি খুব অহংকারি ছিলেন। কাউরে পাত্তাই দিতেন না! আমি হেসে ফেলি। আর্জি আসে, ঢাকায় গেলে যেন একবার অবশ্যই অবশ্যই দেখা দেই। অনেকক্ষণ ধরে যে প্রশ্নটা ঠোঁটের ভেতরে আটকে ছিল, বেরিয়ে আসে, আমার ফোন নম্বর কোথায় পেলেন? ফোন নম্বর? চাইলে পাওয়া যায় না এমন কিছু কি এই দুনিয়ায় আছে? তুমি মনে রাখো নাই, ভুইলা গেসো, সেটা অন্য কথা!

সত্যিই লজ্জ্বিত হই। এমন এক বন্ধু, যে সেই ছোটবেলার ছবি এখনো গুছিয়ে রেখেছে, আমাকে মনে রেখেছে, আর এত বছর পরে খুঁজেও বের করেছে তার কথা একটুও মনে না পড়ার জন্যে লজ্জ্বিত হই। ঢাকায় গেলে দেখা করব কথা দিই। ওরা ফোন ছাড়ে আন্তরিকতার উত্তাপ ছড়িয়ে। ভালো থাকার শুভাকাঙ্খা উড়ে আসে যেন সেই ছেলেবেলা থেকে। আমার চোখ ভিজে আসে অজান্তেই!

নাহ। আনোয়ারের শুধু নামটুকু আর একটা আবছা অবয়ব ছাড়া আমার আর কিছুই এখনো মনে পড়ে না। কাল রাত থেকে খুঁজেই চলেছি আনোয়ারকে...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28737071 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28737071 2007-10-12 01:59:29
যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...
বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি বলছিলেন কোথাও বাইরে বেড়াতে যেতে। বাইরে বলতে যে কোন একটা লোকাল ট্রেন ধরে উঠে বসা আর পছন্দমত একটা ষ্টেশন দেখে নেমে পড়া। রিকশা করে খানিক এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আবার ফেরত ট্রেন ধরে ফিরে আসা। আমি ঠিক সাহস করে উঠতে পারছিলাম না এধরণের অ্যাডভেঞ্চারে অভ্যস্ত নই বলে। কোথাও একটা গেলাম আর আটকে গেলাম তাইলে তো চিত্তির!

টেলিফোনের বিল প্রতিমাসেই উর্ধমুখী দেখে বিয়ের জন্যে বেশ সিরিয়াসলি ভাবনা চিন্তা চলছিল। বিয়েটা যখন করবই তো করে ফেললেই চুকে যায়! এভাবে ফোনওয়ালদের প্রতিমাসে ১২-১৪হাজার করে দেওয়ার কোন মানে নেই! তো আমরা ঠিক করলাম বিয়েটা করেই ফেলি! তো আমরা মোটামুটি বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে সেদিন বেরোলাম বিয়ের ব্যবস্থা করতে। মোল্লা মৌলভি, কোর্ট কাচারি ঘুরে ফিরে ব্যবস্থাদি করতে বেলা দুপুর । ক্ষিদেও পেয়েছে বেশ। ধর্মতলার এক রেষ্টুরেন্টে ঢুকে রুটি-মাংস খেয়ে বললাম, চল একটু বাজারের দিকে। একটু কেনাকাটা তো করতে হবে, বিয়ে বলে কথা! বাজারের দিকে এগিয়েও তিনি বললেন বাজার তো কালও করতে পারবে, আজকে চল না কোথাও একটু বাইরে! মুখের দিকে তাকিয়ে আমার আর না করতে মন সরল না। তবুও বললাম, বেলা দুটো বাজে, এখন গিয়ে ফিরতে পারব? ত্বরিত জবাব এল, হ্যাঁ হ্যাঁ। চল তো! এগোলাম বাসগুমটির দিকে । এই প্রায় বিকেলে লোকাল ট্রেনে প্রচন্ড ভীড় হবে বলে বাসে যাওয়াই সাব্যস্ত হল। সেটা নভেম্বরের শেষ। ছোট দিন, বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায় কিন্তু ঐ মুখের দিকে তাকিয়ে খুব বেশি ভাবনা চিন্তা করতে মন চাইল না সেদিন আর।

যাব কোথায়? বলল, গাদিয়াড়া যাবে? সেখানে গঙ্গা আছে! আমরা যেখানেই যাব সেখানে একটা নদী তো থাকতেই হবে। শহরের এই ভীড়, ধোঁয়া থেকে দূরে, কোথাও একটা খোলা জায়গায়, নদীর ধারে দু'দন্ড গিয়ে বসব এই আকাঙ্খায় চেপে বসলাম এক বাসে। গন্তব্য গাদিয়াড়া। গঙ্গাপারের এক গ্রাম। বাসগুমটির টিকিটবাবুর কাছ থেকে জেনে নেওয়া হয়েছে, যেতে ঘন্টা দেড় লাগবে। মনে মনে হিসেব করে নিলাম, এখন দুটোর একটু বেশি বাজে, মোটামুটি চারটে-সোয়া চারটে নাগাদও যদি পৌঁছুই তো ঘন্টাখানেক সেখানে ঘুরে-ফিরে সন্ধের আগেই ফেরত বাসে চেপে বসা। একটু রাত হয়ে যাবে হয়ত ফিরতে, ঠিক আছে! বাস ছাড়ল প্রায় তিনটে বাজিয়ে।

সকালে বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় একটা চাদর কাঁধে ফেলে নিয়েছিলাম, গলায় একটু ব্যথা ভাব আছে বলে। যদিও ঠান্ডা পড়েনি এই নভেম্বরে পড়েও না কিন্তু আমার আবার ঠান্ডা একটু বেশিই লাগে। তাই চাদর, যদি দরকার লাগে ভেবে। বাস শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে এগোতেই হাল্কা ঠান্ডা বোঝা গেল। চাদর ভালমতন জড়িয়ে পাশের মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে কত কথা যে বলে গেলাম দুজনে। বাস চলছে তো চলছেই। ঘড়ির দিকে চোখ যায় অজান্তেই। পাঁচটা বেজে গেলো! 'হ্যাঁগো, এখানেই তো পাঁচটা বাজল, আমরা পৌঁছুব কখন আর ফিরব কখন?' 'কী জানি, ঐ ব্যাটা তো বলল, ঘন্টা দেড় লাগবে যেতে!' সামনে ছোট্ট এক নদী দেখা যায়, বললাম, এখানেই নেমে পড়ি, খানিক পরে এই রাস্তা থেকেই ফেরার বাস ধরে ফিরে যাব নাহয়! কিন্তু শুনশান জায়গা দেখে নামার সাহস হল না। আবার মগ্ন হই কথায়। বাস চলে। আর চলে।

শীত আসি আসি করছে। শেষ নভেম্বরের ছোট বেলা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। সন্ধ্যা ঘনায়। গাদাগাদি ভিড়ের বাস ক্রমশ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ নেমে যেতে থাকে যার যার গন্তব্যে। আমাদের কথাও কমে যেতে থাকে ক্রমশ। শহর থেকে বহুদূরে কোন এক গাদিয়াড়ার উদ্দেশ্যে বাস এগিয়ে যেতে থাকে গ্রামের পরে গ্রাম পেরিয়ে। কখনো ফাঁকা মাঠের উপর দিয়ে যাওয়া রাস্তা বেয়ে তো কখনো ঘন বসতিপূর্ণ কোন গ্রামের ভিতর দিয়ে। টিমটিমে বাতি জ্বলে ছোট্ট দোকানঘরে। কৃষকের ঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে চুরিয়ে বেরিয়ে আসে হলুদ আলোর ছিটে। রাস্তার পাশে হাত পা ছড়িয়ে কোথাও কোথাও পড়ে আছে খড়ের কাঠামো, দেবীমুর্তির। কোনটা দেবী সরস্বতী তো কোনটা দেবী দূর্গার। ছোট ছোট মন্দির দেখা যায়, কোনটা শিবের তো কোনটা কোন দেবীমায়ের। দ্রুত পেছনে সরে যায় দু'পাশের দৃশ্য। অন্ধকার ঘন হয়।

অবশেষে বাস এক রাস্তার শেষ মাথায় এসে থামল। ঘড়ির কাঁটা তখন ছ'টা ছুঁই ছুঁই। আমার মুখের কথা থেমেছে অনেকক্ষন। টিমটিমে বাতি জ্বলছে খুঁটির উপর শুধু চালের নিচে। দু-একজন যাত্রী, যারা এই শেষ অব্দি এসেছেন তাঁরা দ্রুতপায়ে বাস থেকে নেমে এগিয়ে গেছেন যার যার গন্তব্যে। গুটিগুটি পায়ে আমরা বাস থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, কোথায় এলাম। বাস যেখানে এসে থেমেছে রাস্তার সেখানে শেষ। এখান থেকেই বাস আবার ঘুরবে কলকাতার দিকে। ফেরার টিকিট কাটা হোক আগে ভেবে বাসের কন্ডাক্টরের খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল পাশের চায়ের দোকানে সে গিয়ে বসেছে জুত করে। টিকিটের কথা বলতে জানা গেল এটা লাষ্ট বাস ছিলো, এখান থেকে কোন বাস আজ আর যাবে না। কাল সকাল ছ'টায় প্রথম বাস!

হাতের আঙুল তুলে ও দেখিয়ে দিল ঐ দ্যাখো, নদী! তাই তো! নদী দেখতেই তো এখানে আসা... কিন্তু নদী দেখা গেল না। ঘুটঘুটে অন্ধকারকে যা খুশি তাই বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। আমি তাই ধরে নিলাম সামনের ঐ অন্ধকারই গঙ্গা।

বাকিটুকু অপরজনের ভাষ্যে<img src=" style="border:0;" />br />
...রুমাল তুমি হও না দ্রুতগামী বাস, সে রসিক মানুষ বসে হাসবেন কেবল, জালেতে মুখ লাগিয়ে, এই ভাবে দেখলেই আমার ছাগলের সিং ঘষার কথা মনে পড়ে, উপস্থিত বুদ্ধিবিহীন আমি তাকেই বাসের গতিবিধির কথা জিজ্ঞাসা করি, এই তো এই ঘন্টা দেড়, শীতকাল, যদিও সে হরপ্পা সভ্যতার কথা,আমার বান্ধবীটি সারা রাস্তা তার অলঙ্কার ছড়াতে ছড়াতে যায়, যেন রামচন্দ্র আলসেতে বসে দেখে চলেছেন আনাকারেনিনা,আরে আরে আমাদের জন্য মর্তে ধেয়ে আসছেন নদী, সুতরাং গন্তব্যের শেষে একটা নদী থাকবেই, থাকবেই, আরে সে সব টেলিভিশন মার্কা প্রচার নয়, এই তুলির আঁচড়ে পানেসারজি এঁকে দিচ্ছেন নদী...

... অমাবস্যার রাতে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে পীচের রাস্তাকেও নদী প্রমাণ করতে পারেন নীলস বোর,সুতরাং ফেরার বাস যে এই সাড়ে ছয়টায় পাওয়া যাবে না, জানা কথা, আরে বিধাতা তো সব জেনেই বসে আছেন কি না,আমরা একটা হোটেলে প্রবেশ করি, হ্যাঁ এখানেও কোন প্রাপ্ত বয়স্ক চিত্রমালা নেই,আপনারা উঠেপড়ুন ...

... এবং আমরা ফিরে আসি,কলকাতায়,এই ভাবে সেই ভাবে, 50 কিমি অটোতে ও খুলে যাওয়া শারীরিক যন্ত্রপাতি কুড়াতে কুড়াতে, যাক সে সব গুরুত্ত্বপূর্ণ নয়। আসলে আমার কিছু-কিছু জিনিস ভালো লাগে না, তা শতবার বলেও,লিখেও আপনি বোঝাতে পারবেন না, তখন বেরিয়ে পড়ুন, টাইটানিক চিরকালই ডুবে যায়, ভরসা রাখুন...

ও শ্রেয়াদি, এর চাইতে বেশী লেখা গেল না আজ, কিছুতেই না,বাইরে বেশ বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে, অন্ধকার রাস্তায় হু হু , আরে তোমার খেলা তুমি নিয়ে সাজাচ্ছো, বাতাসে বেশ পুজো পুজো ভাব, দোলনায় আরেকটু দুলে নিন মাধবী...

আমাদের গল্পটা-আমাদেরই থাক, তাই জায়গাটার নাম গাদিয়াড়া হোক, যেখানে আমরা আসলে কোনোদিনই যাইনি...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28735246 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28735246 2007-10-03 12:37:47
ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে..
শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরছি আমি। অসুস্থ শ্বশুরমশাইকে দেখতে এসেছিলাম ৷ বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ তিনি, দুদিন আগে ফোন করে শাশুড়ি বলেন, তোমার বাবার শরীরটা বেশ খারাপ। শরীর প্রায়শই খারাপ থাকে তবু এভাবে তো বলেন না ওঁরা। জানতে চাই, আমি কী একবার বাড়িতে আসব মা? শাশুড়ি বলেন, আসবে? তা এসো! কবে যাব জেনে নিয়ে তিনি বলেন, এলে আর সেদিন ফিরে যাবে না, সেইমত ব্যবস্থা করে এসো ৷ সম্মতি জানাই ৷ রবিবারে নাকি ট্রেন এমনিতেই কম থাকে ৷ তায় প্রতিটি ট্রেনই দশ-পনের মিনিট করে লেট থাকে, প্ল্যাটফর্মে অস্থির পায়চারীরত সাদা চুড়িদার কামিজ পরা একটি মেয়ে নিজের মনেই বলে যায়৷ আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চায় লাষ্ট ট্রেন কখন গেছে৷ হেসে ফেলি আমি, লাষ্ট ট্রেন দেখতে পেলে তো আমি তাতেই চেপে বসতাম আর এতক্ষণে হাওড়ার কাছাকাছি চলেও যেতাম! এবারে মেয়েটিও হেসেই ফেলে৷

পাশে নামিয়ে রাখা ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হই এটাকে বয়ে সেই বাড়ি অব্দি নিয়ে যেতে হবে ভেবে ৷ দেখতে ছোট হলেও ব্যাগটি বেশ ভারী ৷ গাছের নারকোল, দু'রকমের আচারের শিশি, কাগজি লেবু কী নেই এতে! আর সেই বই দুটো ও তো আছে, সময় কাটানোর কথা ভেবে যে দুটো আমিই সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম অথচ একবারও খুলে দেখিনি! মন প্রসন্ন হয় ভোরবেলায় ছাদ থেকে কুড়িয়ে আনা আমের গুটিগুলো ও শাশুড়ি দিয়ে দিয়েছেন ভেবে! ক্ষুদ্র এক জিনিস, যার কোন মূল্যই নেই, আমি কুড়িয়ে না আনলে সেগুলো ছাদেই পড়ে থেকে শুকিয়ে যেত আর তারপর ঝরা পাতা ঝাট দেওয়ার সময় ওরাও চলে যেত শুকনো পাতাদের সাথে৷

ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই ছাদে চলে গিয়েছিলাম৷ ঘুরে ঘুরে চারপাশ দেখি, দাঁড়িয়ে থাকি রেলিং ধরে ৷ এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে একা রাত্রিবাস আমার৷ ও'র কথা ভাবি, গতকাল দুপুর থেকে আজ এই ভোর অব্দি এক মুহুর্তের জন্যেও সে মন থেকে সরেনি৷ রাতে আধো ঘুম আধো জাগরনের মাঝেও সে ছিল৷ কথা বলেছে, খুনসুটি করেছে, আদর করেছে৷ সে কী তবে স্বপ্ন ছিল!

খানিক পরেই শাশুড়িও উঠে আসেন ছাদে, হাতে অ্যালুমিনিয়ামের জাগ ভর্তি জল, টবে দেবেন ৷ শুকনো মরে যাওয়া গাছ সব, কয়েকটা ফণিমনসা শুধু বেঁচে আছে জল ছাড়াই৷ জলের জাগ শাশুড়ি মায়ের হাত থেকে নিয়ে একটু একটু করে সব কটা টবেই জল দেই৷ মা বলেন, হাঁটুতে ব্যাথা, কোমরে ব্যাথা, ছাদে উঠতে পারি না এখন আর, গাছগুলো সব শুকিয়ে গেল গো! এই ক্ষরায় কী গাছ বাঁচে জল ছাড়া! আমি শুনি, এই ছাদ নাকী ও'র খুব প্রিয়৷ অনেক আগে, যখন ও বাড়িতে থাকতো, বেশির ভাগ সময়ই এই ছাদে কাটাতো৷ মাদুর পেতে বই নিয়ে ছাদে চলে আসতো, ঘন্টার পর ঘন্টা ছাদেই থাকতো সে৷ তখন নাকি অনেক গাছ ছিলো ছাদে৷ দু'বেলা গাছেরা জল পেত, ইট আর সিমেন্টের এই ছাদে ছিল এক ছোট্ট বাগান৷ তবে সাজানো নয়৷ ইতস্তত: ছড়ানো ছিল সব টব৷ এখানে ওখানে৷ ঠিকই তো! যে বাগানে সে সময় কাটায়, যে যায়গা ও'র প্রিয়, সেই বাগান সাজানো হতেই পারে না!



(ডায়রিতে লিখে রাখা অনেকদিন আগের কিছু কথা। ।
সচলায়তনে প্রকাশিত। প্রথম পাতার জন্যে নয়। )

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28729592 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28729592 2007-09-05 19:10:49
হেঁটে যাই চাঁদের সাথে... হাত ডোবাই পাঁকে, খোঁজ করি পদ্মের।
মেলে না... মেলে না...
কাঁদা ঘাটাই সার হয়। ক্লান্তি আসে, তবু থামি না।
ঘেঁটেই চলি ঘেঁটেই চলি...
একসময় গড়িয়ে পড়ি খড়ের গাদায়, আমার ছেলেবেলার খড়ের গাদায়...
কী হবে পদ্ম তুলে! বরং এইখানে শুয়ে থাকি খানিক চুপটি করে। কেউ দেখতে পাবে না আমায়...

একসময় আমি চাঁদের সাথে হেঁটে বেড়াতাম। সরু চাঁদ,মোটা চাঁদ, আধখানা চাঁদ। পূর্ণচন্দ্র। সন্ধেবেলায় আকাশে চাঁদ উঠলেই আমার পাগল পাগল লাগত। চাঁদ যেন আমায় ডাকছে। কতদিন আমি একা একা কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে পড়েছি চাঁদের সাথে। আমিও হাঁটি চাঁদও হাঁটে। আমি থামলে চাঁদও থামে। একসময় বাড়ির কথা মনে পড়ত। পরদিনের স্কুলের পড়া। বাড়ি ফিরে মা'য়ের বকুনি কখনোবা মৃদু উত্তম মধ্যম। ফিরে আসতাম ঘরে। ওমা! চাঁদও ফিরছে! হ্যাঁ। চাঁদও ফিরত আমার সাথে। এসে জনালার কোণটিতে চুপটি করে দাড়িয়ে পড়ত। আমার ঘুম আসত আর চাঁদও কখন যেন চলে যেত আমার জানালা থেকে...

স্বধীনতার ষাট বছর। সিক্সটি ইয়ারস অফ বিইং ফ্রী।
আকাশে ঘুড়িদের মেলা। সাদা ঘুড়ি, লাল ঘুড়ি, সাদায় কালোয় ছোট ছোট দাগ কাটা ঘুড়ি, সবুজ কমলা আর সাদায় তেরঙা ঘুড়ি,রাণীরঙা ঘুড়িরা সব উড়ে বেড়াচ্ছে ছাদের মাথা থেকে, সামনের ছোট মাঠ থেকে, টালির চালের নিচের একচিলতে পা রাখার জায়গা থেকে। ঘুড়িদের রঙে ধূসর আকাশে রঙের মেলা। স্বাধীন বলেই গলা সমান উঁচু দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে ঢুকে পড়েন বাবাটি, উড়ে গিয়ে পড়ে যাওয়া ঘুড়িটি কুড়োতে। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি হাফ প্যান্ট আর কিটোস পরা শিশুটি অপেক্ষা করে দেওয়ালে এধারে, ঘুড়িটির অপেক্ষায়।

পথশিশুটি সুতোর প্রান্তটি হাতে নিয়ে দৌড়য় ঘুড়ির পেছন পেছন। উড়ে আসা একটি ঘুড়ি কেটে দেয় তার ঘুড়িটিকে। ঘ্যাচাং। ঘুড়ি তবু উড়ে। বাতাসের ডানায় ভর করে ঘুড়ি উড়ে চলে। একসময় আর পারে না। পানাভর্তি ডোবায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। ঘুড়ির পেছন পেছন দৌড়ুতে দৌড়ুতে পথশিশুটি এসে দাঁড়ায় ডোবার ধারে। মলিন মুখ। আরেকটি ঘুড়ি কেনার স্বাধীনতা তার যে নেই...

আমি এখনও চাঁদের সাথে হাঁটি। জানালা পেরিয়ে নেমে পড়ি পাশের বাড়ির ছাদে। সেখান থেকে এ'ছাদ ও'ছাদ পেরিয়ে সোজা উঠে পড়ি ফ্লাইওভারে। হেঁটে হেঁটে বিদ্যাসাগর সেতু। ওপারে আলো ঝলমল কলকাতা। চাঁদের আলো ম্লান হয়ে যায় সে আলোতে, প্রায় দেখাই যায় না। মরা, ফ্যাকাশে সাদা নিয়নের আলোয় ভেসে যায় বিদ্যাসাগর সেতুও। তবু আমি ঠিক দেখতে পাই চাঁদকে। ঐ তো! আমার সাথেই হাঁটছে সেও...

ভরা গঙ্গা উপচে উপচে পড়ে দুপাশে। ঘোলা জলও চিক চিক করে চাঁদের আলোতে। আমার বড় সাধ হয় আমি নৌকোয় করে খানিক বেড়িয়ে আসি গঙ্গায়। কিন্তু না, আজ থাক । আরেকদিন হবে। অন্য কোনদিন...
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725904 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725904 2007-08-15 14:06:41
তিতাস কোন নদীর নাম নয়-শেষ পর্ব
সখিনার আবার ছেলে হল৷ হাসন আলি মরে যাওয়ার কিছুদিন পরেই সখিনা আবার বিয়ে করে৷ পূবপাড়ার কাশেমকে৷ যার সাথে সখিনার বহু বছরের "পিরীত' ৷ এবারেও সে শ্বশুর বাড়ি যায় না ৷ তবে এবার আর তার স্বামী ঘর জামাই হয় না ৷ সে তার নিজের বাড়ি আর মইজুদ্দিনের বাড়ি দু বাড়িতেই থাকে ৷ তার নিজের বাড়িতেও তার একটা বউ আছে৷ মইজুদ্দিন এখন আর উঠোনে বসে বাঁশ চেঁছে বেত তোলে না ৷ বেশির ভাগ সময়েই নিজের ঘরের সামনে হুকো হাতে ঝুম মেরে বসে থাকে৷ সখিনা ঠেলে তুললে উঠে গিয়ে স্নান করে, খায় আবার এসে ঝুম মেরে বসে৷ কারও সাথে কথা বলে না ৷ এখন আর ওদের উঠোনের উপর দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় ছেলের দল ভয় পায় না, মইজুদ্দিন যে ওদের আর হাঁক দেয় না ৷

আমাদের বাড়িতে বিয়ে ৷ ছোটফুফুর৷ দাদাজি হজ্বে যাবেন তার আগেই ছোটফুফুর বিয়ে সেরে রেখে যেতে চান৷ দাদি গাছ কাটিয়ে লাকড়ি করাচ্ছেন নজু চাচাকে দিয়ে৷ পাড়ার মেয়ে বৌ রা ঢেকিতে মশলা গুড়ো করছে সারাদিন ধরে৷ গামলা ভর্তি ধনে,জিরে পুকুরের জলে ধুয়ে এনে রোদে শুকানো হয়েছে পাটি পেতে, ঝাল ঝাল লাল লংকা রোদে শুকিয়ে মুচমুচে করা হয়েছে যাতে করে গুড়ো ভাল হয়, মিহি হয়৷ ঢেকিতে লংকা গুড়ো করার সময় নাকে মুখে কাপড় বেঁধে নেয় যারা গুড়ো করে তা সত্বেও হ্যাচ্চো হ্যাচ্চো চলতেই থাকে৷ বড় ফুফু মেজ ফুফুরা সব তাদের শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছে৷ ছোটফুফু সারাদিন উত্তরের ঘরে মাথায় ঘোমটা টেনে বসে থাকে, ঘরে কেউ এলে মাথার ঘোমটা আরও টেনে দেয়৷ কাকিমা এসে বলে, কি গো, তুমি যে অ্যাত্তো বড় ঘোমটা বাপের বাড়িতেই দিসো তো জামাইর বাড়ি গিয়া কি করবা? অহন বহুত সময় আছে, ঘাড় ব্যাঁকা হইয়া যাইব ঘোমটা দিয়া বইয়া থাকতে থাকতে! অহন সোজা হও আর এট্টু ঘুইরা ফিরা বেড়াও! ছোট ফুফু আরও ঝুঁকে বসে৷ রাতে ছোটফুফু আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুই দেখছস তারে? আমি বলি, হ, দেখছি, সুন্দর না! ছোটফুফু আর কিছু বলে না৷

সতীর শীতল শব বহুদিন কোলে লয়ে যেন অকপট
উমার প্রেমের গল্প পেয়েছে সে; চন্দ্রশেখরের মত তার জট
উজ্জ্বল হতেছে তাই সপ্তমীর চাঁদে আজ পুনরাগমনে; ( জীবনানন্দ দাশ)
লাল নীল সবুজ হলুদ কাগজের ফুল কেটে কেটে সব দেওয়ালে লাগানো হল, দরজায় জানালায় ঝুলছে ঐ একই কাগজের কাটা ঝালর, রঙীন কাগজের শেকল বানিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হল সারা বাড়িতে৷ সবকটা ঘরের মেঝেতে আল্পনা আঁকল কাকিমা৷ আজকে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ৷ সারা বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন৷ কাকিমা বসে হলুদ বাটছে শিলে, এই হলুদ ছোটফুফুকে মাখানো হবে৷ পাশেই গোল হয়ে বসে মেয়েরা সব বিয়ের গীত গাইছে ৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷
মেথি বাটো মেন্দী বাটো তুমি শুন্দা বাটো রে ৷৷
হাঁটু পানিত নাইম্যা কইন্যায় হাঁটু মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত, দেখো নয়ন মেইল্যা রে ৷৷
কোমর পানিত নাইম্যা কইন্যায় কোমর মান করে রে ৷৷
পূর্ণিমার চাঁন নামলো পানিত দেখো নয়ন মেইল্যারে ৷৷
তুমি পান বাটো, হলদি বাটো তুমি ক্ষীরা বাটো রে ৷৷
ওদের মধ্যে আছে মেজফুফু৷ এক হাতে নিজের বা ঁকান চেপে রেখেছে আর ডাঁন হাত দিয়ে ধরে রেখেছে পাশে বসে গীত গাইতে থাকা জমজম ফুফুর গলা৷ একই ভাবে জমজম ফুফুও নিজের বা ঁহাতে কান চেপে রেখে ডাঁন হাতে জড়িয়ে রেখেছে তার পাশের জনের গলা৷ উঠোনে কলাগাছ কেটে এনে বিয়ের গোসলের "মাওরা' সাজানো হয়েছে৷ চারকোনায় চারটে কলাগাছ পুঁতে ঘিরে দেওয়া হয়েছে রঙীন কাপড়ে, কলাগাছে জড়ানো হয়েছে লাল নীল সবুজ কাগজের শেকল আর ছোট ছোট তেকোনা করে কাটা কাগজ৷ সেই মাওরার ভেতরে আছে ছোট্ট চৌকি, সেটাও কাগজ আর আল্পনায় সাজানো৷ সেখানে বসিয়ে ছোটফুফুর গায়ে হলুদ মাখানো হবে আর তারপরে বিয়ের গোসল৷ লালপাড় হলুদ শাড়ি বুকের উপরে গিঁট দিয়ে পেঁচিয়ে পরা৷ হাতে৷ গলায়৷৷ কানে মাথায় হলুদ গাঁদা আর লাল গোলাপ দিয়ে বানানো গয়না পরা ছোটফুফুকে ছোটকাকা কোলে করে সেই মাওরার ভেতরে নিয়ে বসিয়ে দিল সাজানো চৌকির উপরে৷ প্রথমে দাদি তারপরে মা, কাকিমা আর তারপরে ফুফুরা সব একে একে ছোটফুফুর মুখে হাতে পায়ে খানিকটা করে হলুদ মাখিয়ে দিল, হাতে হলুদ নিয়ে প্রথমে সেই হলুদ নিজের কপালে ছুঁইয়ে তারপরে সেই হলুদ কনের মুখে হাতে পায়ে মাখিয়ে দিল সবাই৷ আমিও এক খাবলা হলুদ নিয়ে আগে নিজের কপালে ছুঁইয়ে নিলাম যেমন করে দাদি আর অন্য সকলে করেছে, আর তারপরে ছোটফুফুকে মাখিয়ে দিলাম সেই হলুদ ৷ মাওরার বাইরে গোল হয়ে বসে পাড়ার মেয়ে বউরা তখনো গাইছে বিয়ের গীত৷ সাথে আছে মেজফুফু আর তার সই জমজম ফুফু ৷
তোল তোল পালকি তোল রে, আমি যামু তোমার দেশে ৷৷
তোমার দেশে গেলে রে আমি পানি কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়াদীঘি হে আমি পানি সেথায় পাব ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷
তোমার দেশে গেলে আমি খানা কোথায় পাব রে??
আমার বাপের আছে জোড়া হোটেল আমি খানা সেথায় খাব রে ৷৷
তোল তোল পালকী তোল রে আমি যাব তোমার দেশে রে ৷৷


-5-


তাঁকে ডেকে এনে এখন এই শীতের শেষ রাতে
হাল্কা অন্ধকারের পোষকে মুখোমুখি বসিয়ে রেখে
আমার সবিনয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটাতে ইচ্ছা করছে৷
আচ্ছা বলুন তো: আপনার কাছ থেকে জীবন বেশি
গ্রহণ করেছে, না আপনি? কনফিউজ করে থাকলে
আমি ব্যাপারটা স্পষ্ট করছি- এই ধরুন আপনি সারা
জীবন আত্মা খরচ করে, দৈহিক শ্রম দিয়ে যে বাসনা
নির্মাণ করে পেছনে ফেলে ছলে গিয়েছিলেন- তার কতটুকু
আপনি ফেরত্ পেয়েছেন, আদৌ পেয়েছেন কি?
আপনি নতুন বাড়ির কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন?
( ঋত্বিক ঘটক শ্রদ্ধাস্পদেষু/ফিউরি খন্দকার; চিত্রালী 20 ফেব্রুয়ারী, 1976)

দাদাজি হজ্বে চলে গেলেন ৷ আমরা সবাই ঢাকায় গেলাম দাদাজিকে প্লেনে তুলে দিতে৷ চল্লিশ দিনের জন্যে দাদাজি যাচ্ছেন তাই আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছে সবাই এসে দেখা করে গেল দাদাজির সাথে৷ ঢাকায় যাওয়ার আগের দিন সবাইকে দাওয়াৎ করে খাওয়ানো হল৷ আমাদের পাড়ার সবাই এসেছিলো সেই দাওয়াৎএ৷ বাংলা উঠানে শামিয়ানা টাঙিয়ে পুরুষদের বসার ব্যবস্থা আর ভিতর বাড়ির উঠানে মেয়েদের৷ পাড়ার লোক ছাড়াও এল গ্রামের লোক, প্রতি বাড়ি থেকে দুজনকে আসতে বলে এসেছিল বড়কাকা৷ আর ছিল গরীব ভিখিরিরা৷ বাড়ি থেকে বেরুনোর আগে দাদাজি বড় মৌলভি সাহেবের ক্কবরের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রার্থনা করে গেলেন, আমাদের বাড়ির সব পুরুষেরা আর যারা এসেছিল বিদায় দিতে তাঁরাও যোগ দিলেন সেই প্রার্থনায়৷ বাড়ির সব মেয়েদের সাথে আমিও জানলায় দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই প্রার্থনা৷ আর তারপর সবাই মিলে খাল পার করে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল দাদাজিকে৷ দাদাজি এখন এক সপ্তাহ থাকবেন ঢাকার হাজী ক্যাম্পে, তারপরে প্লেন ধরে যাবেন হজ্বে ৷ এই ক্যাম্পে সারা দেশ থেকে হজ্জ্বযাত্রীরা এসে জমায়েত হন, নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করেন ৷

ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷ ৷

এবাড়িতে প্রতিবছর মহররমে খিচুড়ি রাঁধা হয় বড় বড় সব হাড়িতে৷ রান্নাঘরে প্রচন্ড দ্রুততায় কাজ করে চলেছে আহাদালির মা বুবু, হাসিনার মা বুবু ও তার মেয়ে হাসিনা৷ তিনমুখো চুলোয় রান্না হচ্ছে একসাথে তিন হাড়ি খিচুড়ি, কাকিমা ঘুরে গেল রান্নাঘর৷ বাইরে সে মুর্গী কাটার তদারকি করছে৷ এবছর মহররমে স্পেশাল থাকছে খিচুড়ির সাথে ভুনা মুর্গীর গোশত৷ আজ আমাদের বাংলা উঠোনের শেষ মাথায় পুকুরের পুবপার ঘেঁষে স্থাপন করা হবে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর ৷ দাদাজি বলেন, "নেও' গাড়া হবে৷ রেজিষ্টি অফিসে গিয়ে দাদাজি বাংলা উঠোনের আর্ধেকটা ওয়াকফ করে দিয়েছেন৷ এই উঠোনে আর কারো কোন অধিকার থাকল না৷ এখানে মসজিদ হবে, আজ সেই মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে ৷ বাড়িভর্তি লোকজন ৷ মসজিদের "নেও' গাড়া হবে বলে দাওয়াত্ পেয়ে সবাই এসেছে ৷ আমিও এসেছি শ্বশুরবাড়ি থেকে ৷ বড়কাকা গিয়ে বলে এসেছিলেন আমার শ্বশুরবাড়িতে, শাশুড়ি আসতে পারেননি, আমি আর আমার স্বামী এসেছি৷ প্রতি বছরই এবাড়িতে মহররমের দিনে খিচুড়ি রান্না হয় বড় বড় সব হাড়িতে, সেদিন বাড়িতে সবার অবারিত দ্বার৷ পাড়া-পড়শী, ফকির-মিসকিন,বাড়ির লোক, সবাই একই খাবার খায়,খিচুড়ি৷ ছোলার ডাল, আলু আর ক্ষেতের আলোচাল দিয়ে রান্না খিচুড়ি৷ দাদি উপর থেকে নামান তুলে রাখা ডজন ডজন মেলামাইনের বাসন৷ নজুচাচা সেগুলো বড় প্লাষ্টিকের গামলায় করে নিয়ে যায় পুকুরে৷ ধুয়ে নিয়ে চলে যাবে সোজা বাংলা উঠোনে৷ সেখানেই খাওয়ানো হবে ফকির মিসকিন আর অতিথিদের৷ একই রকম সব থালায় একই খাবার খাবে সবাই আজকের দিনে৷ আজ স্পেশাল মেনু হিসেবে মুর্গী আছে৷ দাদাজী সাদা কাজ করা পাআবী আর ছোট ছোট চেকের লুঙ্গি পরে বসে আছেন বাংলা ঘরের বারান্দায় তার হাতলওয়ালা কাঠের চেয়ারটিতে৷ সামনে ওঠোনে শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, সেখানে আছে বাজারের ডেকরেটারের দোকান থেকে আনা কয়েক ডজন প্লাষ্টিকের চেয়ার৷ অতিথিরা আসছেন, দাদাজীর সাথে এসে কথা বলে গিয়ে বসছেন সামনে পেতে রাখা সব চেয়ারে৷ আমি মাঝে মাঝেই দাদির ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বাংলা উঠোনের দিকে দেখছি৷ চোখে পড়ছে বসে থাকা অতিথিরা নিজেদের মধ্যেই কথা বলছেন, নজু চাচা ব্যস-সমস্ত হয়ে একবার বাংলা উঠোন তো আরেকবার ভেতর বাড়ি করছে৷ দাদাজী মুখে এক উজ্জ্বল হাসি নিয়ে তার পুরনো কাঠের হাতলওয়ালা চেয়ারটিতে বসে বসেই তদারক করছেন সবকিছু৷ রাজমিস্ত্রী বুড়ো করিম আর আলি হোসেন৷ খানিক পরেই জুম্মার নামাজ আর তারপরে দাদাজী নিজের হাতে রাখবেন মসজিদের প্রথম ইটটি৷ দেবেন একমুঠো বালি আর এক হাতা মাখানো সিমেন্ট৷ দাদাজী তার স্বপ্নের মসজিদের আজ "নেউ' গাড়বেন ৷

দু'কূলে তার বৃক্ষেরা সব
জেগে আছে;
গৃহস্তের ঘর-বাড়ি
ঘুমিয়ে গেছে,-
শুধু পরান মাঝি বসে আছে
শেষ খেয়ার আশায় ৷
যায়, বয়ে যায়৷৷

জলেখাবিবির বাগে এখন আর মেলা বসে না৷ জলেখা বিবির মৃত্যুর পর তার ছেলে মেয়েরা সম্পত্তি ভাগাভাগি করার সময় এই বাগ নিয়ে সমস্যা হয়, কে পাবে এই বাগ৷ কেউই দাবী ছাড়তে রাজী না হওয়াতে বাগ বিক্রী কিরে দেওয়াই সাব্যস্ত হয় ৷ সেই বাগ কিনে নিয়ে সেখানে এক নতুন মাদ্রাসা শুরু করে বাবা ও বড়কাকা৷ অল্প খানিকটা জায়গায় একখানা টিনের ঘর তুলে এবছরই সেখানে চালু হয় এক লোয়ার মাদ্রাসা ৷ প্রথম বছরে তাতে ছাত্র হয়েছে বত্রিশজন, এদের প্রয়োজনীয় খাতা পেন্সিল বই দেওয়া হয় মাদ্রাসার তরফ থেকে৷ সামনের বছর এরা যখন পাশ করে দ্বিতীয় শ্রেনীতে যাবে ততদিনে তোলা হবে আরেকটি ঘর আর ভর্তি নেওয়া হবে নতুন ছাত্র প্রথম শ্রেনীতে৷ সেই মাদ্রাসার শিক্ষক এসেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে ৷ তিনি এবাড়িতেই থাকেন, খান আর মাদ্রাসায় পড়ান ৷ মাঝেই মাঝেই বড়কাকা ঐ বাচ্চাগুলোর জন্যে চকোলেট নিয়ে হাজি হন মাদ্রাসায়, ঘুরে ফিরে কথা বলেন ছোট ছোট ছেলেগুলির সাথে ৷ কেউ বা নালিশ জানায়, হুজুরে খালি মারে, বেত দিয়া! কাকা মাদ্রাসার শিক্ষককে, নিষেধ করেন ওদের বেত দিয়ে না মারতে ৷

কে জানে কবে কে নাম রেখেছে
তিতাস তোমার;
যে নামেই ডাকি তোমায়
তুমি কন্যা মেঘনার৷

বিজলীবাতি এসেছে শাহবাজপুরে ৷ তবে আমাদের তিতাসের জলবিদ্যুত্ কারখানা "ওয়াব্দা'র বিজলী নয়৷ বিজলী এসেছে দূরের শাহজীরবাজার পল্লী বিদ্যুত্ কারখানা থেকে৷ সেটি নাকি অনেক বড় আর সেই পল্লীবিদ্যুত্ কারখানার বিজলী পৌঁছে গেছে আশে পাশের সমস্ত গ্রামে এমনকি সেই মেদীর হাওর পর্যন্ত যত গ্রাম আছে তার সবকটিতেই৷ ফলে আমাদের তিতাসের এই জলবিদ্যুত্ কারখানা ওয়াব্দা এখন আর কোন কাজে লাগছে না ৷ কিছু লোক এখনও আছে সেখানে, যারা দেখাশোনা করে এই এলাকার বিদ্যুত্ পরিষেবা ৷ গ্রামের কোথায় ঝড়ে খুঁটি ওল্টালো, কোথায় তার ছিঁড়ল৷ মাঝে মাঝে লোকজন দূর থেকে গাড়ি করে আসে ওয়াব্দায় পিকনিক করতে৷ তিতাসের পুরনো ব্রীজ ভেঙে নতুন ব্রীজ হয়েছে ৷ এ ব্রীজ আরও বড়, আরও চওড়া৷ নতুন ব্রীজের উপর থেকে এখন ওয়াব্দাকে দেখলে মনে হয় যেন ছাড়া (পোড়ো) বাড়ি৷ সেই বাগান নেই,ঝা চকচকে সেই বিল্ডিং পুরনো হয়ে হয়েছে জরাজীর্ন, দেখাশোনার অভাবে ৷

ঘুমের মতন নীরবে নদী
যায়, বয়ে যায়৷৷

একতলা পাকাবাড়ির ছাদের উপর দাঁড়িয়ে আছে এক গোলাকার থাম৷ বেশ উঁচু সেই থামের মাথায় জালি দিয়ে ঘেরা দুখানা মাইক৷ মসজিদের মাইক৷ পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল, নজুচাচার ছেলে৷ উত্তরগাঁওয়ের নতুন প্রাইমারী স্কুলে সে পড়ায়৷ নিয়ম করে মসজিদে এসে পাঁচবেলা আজান দেয় শামসুল৷ সুমধুর সেই আজানের ধ্বনি সেই মাইকের ভেতর দিয়ে চলে যায় অনেকটা দূর অব্দি৷ মসজিদের একপাশে ছোট্ট এক ঘর, যাতে থাকেন মসজিদের ইমাম, জসিম হুজুর৷ পাশ করে মাদ্রাসা থেকে বেরুনোর পরেও জসিম হুজুর এবাড়ি থেকে চলে যায়নি৷ মসজিদের ইমাম হিসেবে তাকে চাকরী দিয়ে এবাড়িতেই রেখে দিয়েছেন দাদাজী৷ আছে অরেকটি ছেলে, রফিক৷ যে এবাড়িতে থেকে বাজারের হাই মাদ্রাসায় পড়ে, তার তিনবেলা খাওয়া দাওয়া এবাড়িতেই৷ জসিম হুজুর সকাল বেলায় মসজিদের গ্রীল দিয়ে ঘেরা বারান্দায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের আরবী পড়ায়৷ এর জন্যে জসিম হুজুর আলাদা মাইনে পান৷ জসিম হুজুর মাঝে মাঝে ছুটিতে বাড়ি গেলে তখন রফিক মুন্সি নামাজ পড়ায়৷

মোষের মতন কালো সাঁঝ
নামে তীরে;
আবহমান উলুধ্বনি
বাজে ঘরে ঘরে,-
পোহালে রাত ফর্সা ভোর
আসে নদীর নামায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷

আমাদের বাড়িতে মসজিদ হওয়ার পর থেকে বিয়ে শাদীতে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে জোরে গান বাজনা করতে দেন না দাদাজী, মসজিদ থেকে শোনা যায় বলে৷ বাড়ির মেয়েরা তবু দাদিকে পটিয়ে গীতের আসর বসায়, দাদি বলে, বেশি জোরে সুর তুলিস না, মসজিদ থেইক্যা যেমুন না হুনা যায়! গোল হয়ে বসে এখনও গীত গায় মেয়ে বউরা, কিন্তু সে যেন বড় ভয়ে ভয়ে৷ বড় মৌলভী সাহেবের এই বাড়িতে একটা ধর্মীয় আবহ বরাবরই ছিল কিন্তু এখন যেন সেটা বড় বেশি বেশি চেপে বসছে মানুষের উপরে৷ সামনের বাড়ির নজরুল ইসলামের ছোট ভাই কালা বিয়ে করে সংসারী হয়েছে ৷ করাত কলে চাকরী নিয়ে সে চলে গেছে শহরে৷ তার বাবা মুসা পাগলার ভাঙা বেড়ার ঘর ফেলে দিয়ে সেখানে দেওয়ালের উপর টিনের চাল দিয়ে তোলা নতুন ঘরে থাকে তার বৌ৷ সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে বাড়ি এলেও এখন সে বাড়িতে আর মুর্শিদি গান হয় না৷ আমাদের খালের উপর পাকা পুলে ছেলে ছোকরাদের আড্ডা বসে বিকেলে ৷ ছোট্ট পুলের রেলিংএ বসে ছেলের দল মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনা ছোলাভাজা, বাদামভাজা খায় ৷ কেউ কেউ এদিক ওদিক তাকিয়ে চট করে ধরায় একটা ক্যাপষ্টেন, তরপর সেটা হাতে হাতে ঘোরে৷ কেউ দেখে ফেলার আগেই উড়ে যায় ধোঁয়া৷ বড় পুল হয়েছে মোড়াহাটির সামনে ৷ এখন আর কোন বুড়ো মানুষকে অপেক্ষা করতে হয় না, কখন কোন দয়ালু মাঝি পার করে দেবে এই খালটুকু৷ মোড়ে, যেখানে এই বড় মৌলভি পাড়ার রাস্তা আর মোড়াহাটির রাস্তা এসে এক জায়গায় মিশেছে সেখানে হয়েছে এক ছোট্ট বাজার, মৌলবীবাজার৷ মোস্তাক ডাক্তারের চেম্বার কাম ডিসপেন্সারি সহ এই বাজারে পাওয়া যায় প্]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725597 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725597 2007-08-13 22:17:00
বিদিত লাল দাস'এর গান শোনা
ঢাকা থেকে সদ্য সদ্য কিনে আনা বিদিত লাল দাসের সিডি চালিয়ে সুমেরুকে গানও শুনিয়ে দিলাম আর ঠিক করলাম যাব গান শুনতে! সুমেরুর সেদিন শ্যুট ছিল, বললো, তাড়াতাড়ি শেষ করে পৌঁছে যাবে হল'এ। আমি আগে থাকতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানলাম, টিকিট দিয়ে নয়, অনুষ্ঠানটি সকলের জন্যে অবারিত দ্বার। অপেক্ষার সময়টুকু হলের বাইরের সিঁড়িতে বসে ঝাল ঝাল 'ঘটিগরম' (গরম গরম মশলা চানাচুর) খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। অপেক্ষা অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার, অপেক্ষা সুমেরুর শ্যুট সেরে হলে আসার।

ঢাকায় গীতালীতে যখন পুরনো লোকসংগীতের সংগ্রহ দেখছিলাম তখন হঠাৎই চোখ পড়ে 'বিদিত লাল দাস' নামটির উপর। এক বিস্মৃত নাম। নামটি দেখামাত্রই একসাথে ভিড় করে এলো অনেক স্মৃতি। এক পিচ্চি টেলিভিশনের সামনে বসে আছে বিশেষ করে লোকসংগীতের অনুষ্ঠানের সময় ধরে। টিবি রুমে আর কেউ নেই। প্রতিদিন একই সময়ে একই চিত্র। তখন ভাল মন্দ বুঝতাম না, গানের কথাও খুব একটা বুঝতাম না শুধু গান শুনতাম। ভাল লাগত সুর। লোকসংগীতের সুর। সিডিতে ঐ নামটি দেখামাত্র কিনে ফেললাম, গান কেমন হবে, ভাল কী মন্দ কোন চিন্তা না করেই। এমনকি ওখানে সিডি চালিয়ে গান শুনিওনি যেমন অন্য সব সিডি শুনে তারপরে কিনেছি।

২৯শে জুলাই সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান, প্রয়াত লোকসংগীত শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর জন্মতিথি। সেই উপলক্ষ্যে ৩১শে জুলাই মধুসুদন মঞ্চে লোকভারতী ও পশচিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠান। 'লোকভারতী' নির্মলেন্দু চৌধুরী'র নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান যা এখন চালাচ্ছেন উৎপলেন্দু চৌধুরী। উৎপলেন্দু চৌধুরী নির্মলেন্দু চৌধুরীর সুপুত্র। বিদিত লাল দাস আর নির্মলেন্দু চৌধুরী প্রায় সমসাময়িক ছিলেন, উৎপলেন্দু বিদিত লাল দাসকে নিজের গুরু বলে অভিহিত করলেন। তো নির্মলেন্দু চৌধুরীর এই স্মরণ সভায় লোকভারতী নিয়ে আসে বিদিত লাল দাস'কে। তাঁকে সম্বর্ধনা দেয় লোকভারতী ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার। পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী হাজির ছিলেন বিদিত লাল দাস'কে সন্মান জানাবেন বলে। ফুলের তোড়া, মানপত্র আর একটি স্মারক দেন সুভাষবাবু। বিদিত লাল বাবুর গায়ে শাল জড়িয়ে দেন উৎপলেন্দু চৌধুরী।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার বেশ আগে পৌঁছে গেছিলাম বলে জায়গা পেয়ে যাই একেবারে সামনে, দ্বিতীয় সারিতে। প্রথম সারিতে বসে বেশ কয়েকজন নিজেদের মধ্যে আলাপচারিতায় মগ্ন সিলেটি ভাষায়। এঁরা সব সিলেট থেকে এসেছেন বিদিত লালবাবুর সঙ্গে। সে এক অদ্ভুত অনুভব। সেই কোনকালে ছেড়ে চলে আসা সিলেটের মানুষ আর সিলেটি ভাষা তাও এই খোদ কলকাতায় বসে! সেই অনুভূতির কথা বলে বোঝানো যায় না।

গাঢ় নীল পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা পরা বিদিত লাল দাস এলেন অনুষ্ঠান শুরুর ঠিক আগে, সামনের সারিতে এসে বসলেন। যথেষ্ট বয়েস হয়েছে, কথা বলতে গেলে গলা কাঁপে, হাত দিয়ে কিছু ধরতে গেলে কাঁপে হাত। শুধু যখন গান গাইতে শুরু করেন তখন উদাত্ত গলার আওয়াজে গমগম করে হলঘর। আর নাগাড়ে গেয়ে যান আটখানি গান। তাঁর গানের সাথে তবলা বাজাবেন বলে সিলেট থেকে সঙ্গে এসেছেন তাঁরই গানের স্কুলের তবলা শিক্ষক টিংকু। হৃদরোগী বিদিত লাল দাস একা গান গাইতে পারেন না বলে মঞ্চে তাঁর সাথে থাকেন গানের সঙ্গী ( নামটি ভুলে গেছি), যদিও বিদিত লাল দাসের গলা ছাপিয়ে তার গলা একবারও শোনা যায় না, আলাদা করে বোঝা যায় না।

বন্দনা গান দিয়ে শুরু করেন তিনি,
পরথমে মে বন্দনা করি আল্লা রসুল
হজরত ওয়ালীরে দিলাম .....
মাই ফাতেমা হযরত আলী হাসান আর হুসেন
মাতার উপর তুইলা রইলাম...
তার বাদে বন্দনা করি বাবা শাজলাআআআআআআআআআললললললললললল
তিনশ ষাইট আউলিয়া বন্দি...
(কথাগুলো মনে পড়ছে না বলে ডট ডট দিয়ে দিলাম, ক্ষমা করবেন)
এই 'বাবা শাজলাল' বলে তিনি গলা যে উচ্চতায় নিয়ে যান এখনো, সেটা না শুনলে বলে বোঝানো যাবে না। একে একে গেয়ে যান আটখানি গান। প্রতিটি গানের পরে করতালিতে ফেটে পড়ে হল। মঙ্গলবারের সন্ধ্যায়ও সেই হল পুরো ভর্তি ছিল। চরম মুগ্ধতায় শুনে যাচ্ছিলাম একের পর এক গান। মনে হচ্ছিল, এই গান যদি এভাবেই চলতে থাকত! পরক্ষণেই নিজেই লজ্জা পাচ্ছিলাম নিজের এই স্বার্থপর চিন্তায়। অসুস্থ শিল্পী এতদূর থেকে এসেছেন আটখানি গান শুনিয়েছেন, এই কী যথেষ্ট নয়! সেই কোন ছেলেবেলায় যাঁর গান টেলিভিশনে দেখেছি-শুনেছি আজ সামনে বসে তাঁর গান শুনছি-দেখছি তাও কলকাতায় বসে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী কিছু হতে পারে!



(আরও কয়েকজন সেই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন, মুগ্ধ করেছেন আগরতলার এক কিশোরী শিল্পী। তার কথা পরে অন্য কোনদিন, অন্য কোন সময়ে।)


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725156 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28725156 2007-08-11 16:26:57
তিতাস কোন নদীর নাম নয় - ৪র্থ পর্ব
জলেখা বিবির "বাগ'এ প্রতিবার মেলা বসে শীতকালে৷ বিশাল এক ফলের বাগান, সকলে যারে বাগ বলে৷ মেলায় আসে নাগরদোলা, সাপের খেলা,বাঁদরনাচ আরও নানারকমের খেলা৷ দূর দূর থেকে লোকজন তাদের পসরা নিয়ে আসে৷ থাকে পোড়া মাটির সরা, কলসি, হাঁড়ি আর নানা রকমের পুতুল, বিভিন্ন রকমের খেলনা, রঙিন কাগজ দিয়ে বানানো কুমির হাঙর আর রবারের সাপ৷ থাকে নানা রকমের খাবারের দোকান আর থাকে জুয়া৷ সারাদিন মেলায় সব খেলনা পোড়ামাটির জিনিসপœ বিœ² হিয়, ছেলের দল স্কুল ফিরতি মেলা থেকে কাগজের হাঙর কুমির আর বাতাসা কিনে বাড়ি ফেরে৷ সন্ধ্যা ঘনালে সেখানে বসে জুয়ার আসর আর সাথে তাড়ি, গাঁজা৷ বিকেল বিকেল দাদি আহাদালির মা বুবুকে পয়সা দিয়ে মেলায় পাঠায় মাটির কলসি,সরা আর খোলা কিনে আনার জন্যে৷ এই খোলাগুলো দেখতে হাঁড়ির মত হলেও হাঁড়ি নয় ৷ এর মুখটা একদম খোলা থাকে অনেকটা কড়াইএর মত৷ যাতে চিতই পিঠে বানানো হয়৷ আহাদালির মা বুবুরা এই খোলাতেই রুঁটি সেঁকে৷ সারা বছরের মাটির মাটির জিনিসপত্র দাদি এই মেলা থেকেই কিনিয়ে রাখে ৷ এই মেলার মাটির কলসি, সরা , খোলা নাকি খুব ভাল হয়, দাদি বলে ৷ আমি মেলায় যাই পুতুল কিনতে ৷ মাটির পুতুল, নানা আকারের নানা ডিজাইনের ৷ মা পুতুল, মেয়ে পুতুল, ছেলে পুতুল আর বাবা পুতুল ৷ আর ছোট্ট ছোট্ট সব হাড়ি-কুড়ি,বাসন-পত্র আর থাকে ছোট উনুন ৷ দুমুখো তিন মুখো পোড়া মাটির উনুন ৷ আহাদালির মা বুবু আমাকে নিয়ে গোটা মেলাটা এক চক্কর ঘুরে চলে আসে মাটির হাড়ি কলসিওয়ালাদের কাছে৷ সে কেনে তার দরকারি জিনিসপত্র আর সবার শেষে আমার জন্যে আমার পুতুল বাসনপত্র আর দুমুখো উনুন ৷ সি এন্ড বি সড়কের ধারে যে বাজার বসে তাতেও এই মাটির পুতুল পাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে আর আমাকে কে নিয়ে যাচ্ছে! মেলার একধারে একটা জায়গা একদম ফাঁকা পড়ে আছে, কিছু জিনিসপত্র ইতস্তত: ছড়ানো, ভাঙা বোতল, গেলাস আর রঙ বেরঙের ছবি আকা কিছু কাগজ, যাতে রাজা রাণীর ছবি আঁকা৷ হাতে নিয়ে দেখতে গেলে বুবু বারন করে, বলে, ওতে হত দিয়েন না আম্মা, সারা রাইত হারামিরা এইখানে জুয়া খেলসে আর গাঞ্জা তাড়ি খাইসে! জিজ্ঞেস করে জানতে পারি এই রাজা রাণীর ছবি আঁকা কাগজগুলোকে বলে "তাস' এগুলো দিয়ে জুয়া খেলে৷ কি করে খেলে তা অবশ্য বুবু বলতে পারলো না তবে গাঞ্জা আর তাড়িটা কি জিনিস সেটা বুবু জানে৷ তার ছেলে আহাদালিও নাকি রাতে এখানে বসে তাড়ি খেয়ে নেশা করে আর সারাদিন বাড়িতে পড়ে পড়ে ঘুমায়! খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে যেমন গুড় হয় তেমনি তালের রস জ্বাল দিয়ে তাড়ি হয়, যা খেলে লোকের নেশা হয় ৷ নেশাটা কেমন জিনিস সেটা অবশ্য বুবু ঠিকঠাক বোঝাতে পারলো না ৷ গাঁজাও নাকি সেরকমই নেশার বস্তু, তামাক যেরকম হুকোর মধ্যে দিয়ে খায় এও সেইরকমই ছিলিমের মধ্যে দিয়ে খায় ৷ পড়ে থাকা গাঁজার ছিলিমও দেখা যায় মেলার মধ্যে ৷

জসিম হুজুর আমাদের বাড়িতে থেকে বড় মাদ্রাসায় পড়ে৷ আর একবছর পর সে মৌলভি হয়ে যাবে, এখনও সে ছাত্র ৷ দাদি সব সময়েই এরকম একজন ছাত্র বাড়িতে রাখেন, যে আমাদের বাড়িতে থাকে খায় আর পড়াশোনা করে ৷ কোন ছেলে অনেক দূরের কোন গ্রাম থেকে আসে ৷ একটু বড় বয়েসে এলে সে বেশিদিন থাকে না ৷ কয়েক বছরে তার পড়া শেষ হলে সে চলে যায় আর তার জায়গায় আসে অন্য আরেকজন ৷ জসিম হুজুরকে আমি দেখছি অনেকদিন ধরেই ৷ দাদি বলেন সামনের বছর জসিম চলে যাবে আর তার জায়গায় আরেকজন আসবে৷ পাঁচবেলা আজান দেওয়ার সাথে সাথে জসিম হুজুর আরেকটা কাজ করে, ভোরবেলা আমাদের বাংলা ঘরে এই পাড়া সহ আশে পাশের পাড়া থেকেও ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা আসে আরবি পড়তে, জসিম হুজুর এদের সবাইকে আরবি পড়ায় ৷ সকালের এই এক ঘন্টা পড়ানোর জন্যে দাদাজি জসিম হুজুরকে মাইনে দেন ৷ সব ছেলে মেয়েরা সুর কউ কোরাঅন শরীফ পড়ে তো কেউ আমপারা ৷ যারা আমপারা পড়ে তারা সেটা শেষ হলেই কোরাঅন শরীফ পড়া শুরু করবে ৷ অত বড় ঘরখানায় দু সারি করে ছেলে মেয়েরা সব বসে ৷ জসিম হুজুর প্রথমেই সুরা ফাতেহা দিয়ে শুরু করে, "আলহামদুলিল্লাহ হিরাব্বিল আ'লামিন৷ আর রাহমানির রাহিম ৷ মালিকি ইয়াওমিŸনি৷ ইয়্যাকা না'বুদু অ ইয়্যাকা নাশতায়িন ৷ ইহদিনাস সিরাতাল মুশতাকিন৷ সিরাতাল্লাযীনা আন আমতু আলাইকুম ৷ গাইরুল মাঘ্দু বিআলাইকুম ৷ অলাŸউউয়াল্লীন ৷ আমীন ৷' পড়িয়ে তারপর যার যার পড়া শুরু করতে বলে আর পড়ার শেষে সকলে একসাথে দরুদ পড়ে , "আল্লাহুম্মা সালিয়ালা সায়্যিদিনা ও নাবীয়ানা ও শাফিয়ানা ও মাওলানা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহে সাল্লাল্লাহু ওয়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৷' দুই হাত তুলে দোয়া করে পড়া শেষ করে ৷ পড়ার মাঝখানে সে হাতে একখানা বেত নিয়ে শুধু চারপাশে ঘোরে, কেউ চুপ করে থাকলে তাকে বেত উঁচু করে ধমকে বলে, অ্যাই, পড়স না ক্যান? আওয়াজ কই গলার? অমনি সে পড়া শুরু করে!


-4-


আকাশ আজো ঢেউয়ের মুখোমুখি,
নদীর উজান ভেজায় ক'টি তারা ৷
অন্ধকারে স্রোতের কশাঘাতে
হটাত্ বুঝি বুকের মাঝে নেই,
আমার পাশে চলার ছিল যারা ৷ ( নির্মলেন্দু গুণ )

একে একে অনেকগুলো অঘটন ঘটে গেল এই পাড়ায়৷ সখিনার স্বামী বুড়ো হাসন আলি হঠাত্ করে মরে গেল ৷ বিকেলবেলা উঠোনে বসেছিল হঠাত্ অসুস্থ বোধ করে ৷ খানিকক্ষণের মধ্যেই মাটিতে গড়াগড়ি ৷ তার কি কষ্ট হচ্ছে সেটুকুও সে বলতে পারে নি ৷ ধড়ফড় করতে করতে শেষ ৷ উঠোনে হাত পা ছড়িয়ে বুক চাপড়ে কাঁদছিল সখিনা, তার ছেলে মেয়ে তিনটে এক কোণে বসে আছে বুড়ো মইজুদ্দিনের কাছে৷ মইজুদ্দিন চুপ করে বাচ্চা তিনটেকে আগলে বসে আছে ৷ আশে পাশের বাড়ির মেয়েরা এসে সখিনাকে উঠোন থেকে তুলে ঘরের ভিতরে নিয়ে চলে গেল৷ সখিনার স্বামীর এখন দাফন কাফন হবে, পাড়ার পুরুষেরা এসে সে বন্দোবস্ত করতে লাগল ৷ ঘরের ভেতর থেকে শুধু সখিনার হেঁচকির আওয়াজ ভেসে আসছে ৷ আহাদালির মা বুবু আমার হাত ধরে বলল চলেন আম্মা, ঘরে যাই, আফনের দাদি আবার খুঁজতে আরম্ভ করব ৷

ওপাড়ার মুসা লস্করের ছেলে লিয়াকত চাচা মরে গেল সাপের কামড় খেয়ে৷ পাশের বেতঝাড়ে বেত কাটতে গিয়েছিল সে৷ বিষাক্ত সাপে ছোঁবল দেয় তাকে৷ কিচ্ছু করা যায়নি লিয়াকত চাচার জন্যে ৷
ক্বালা আলক্বিহা ইয়া মূসা ৷৷
ফাআলক্বাহা ফাইযা হিয়া হাইয়্যাতুন তাস্আ ৷৷
ক্বালা খুয্হা ওয়ালা তাখাফ্ সানুয়ীদুহা সীরারাহাল ঊলা ৷৷ ( সূরা তা-হা, 19-21 আয়াত)
[ আল্লাহ বলেছেন, হে মুসা, তুমি লাঠি নিক্ষেপ কর৷ তিনি তা নিক্ষেপ করলেন, তখন তা অজগর সর্প হয়ে বিচরণ করতে লাগল৷ আল্লাহ বলেছেন, তুমি এটাকে ধর ভয় পেয়োনা; আমি প্রথম বার একে লাঠিতে পরিণত করে দিচ্ছি ] ওঝা এসে অনেক চেষ্টা করেছে বিষ নামানোর, কিছুই করতে পারেনি সে ৷ গোটা শরীর ক্রমশ নীল হয়ে গেছে লিয়াকত চাচার, মুখ দিয়ে গ্যাজলা উঠছে আর চোখ দুটো উল্টে যাচ্ছে খুব দ্রুত ৷ চার হাত পা মাটিতে দাঁপিয়ে দাঁপিয়ে ধীরে ধীরে শান্ত হয়েছে সে ৷ এদিকে যতখানি দাঁপিয়েছে লিয়াকত চাচা তার চাইতে বেশি বুক চাপড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদেছে তার মা,বাবা ৷ বড় কাকা খবর পেয়ে সাইকেল নিয়ে বাজারের হাসপাতাল থেকে ডাক্তার নিয়ে এসেছে কিন্তু তখন আর কিছু করার ছিল না কারও ৷

ছেলের শোকে পাগল হয়ে গেল বুড়ি মা ৷ আর শোকে শোকে কয়েক মাসের ভেতর মরে গেল মুসা লস্কর৷ পাশের বাড়ির সুজন তার বউ বাচ্চা নিয়ে এসে দখল নিল তার চাচার বাড়ি বাগান আর পুকুরের৷ জমি-জমার দখল আগেই নিয়েছিল সে৷ মুসা দাদার অত সাধের বাগান শুকিয়ে যেতে লাগল অযত্নে ৷ বুড়ি দাদি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় এ বাড়ি ও বাড়ি, যেখানে সন্ধ্যে হয় সেখানেই আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়ে ৷ সুজনের বউ সাফিনা সরাদিন বাড়িতে পাড়ার মেয়েদের নিয়ে আড্ডা দেয় পান খায় আর মোড়লি করে ৷ মুসা লস্করের বাগানে বসে পাড়ার ছেলে ছোকরাদের নিয়ে জুয়া খেলে সুজন ৷



(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723240 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723240 2007-07-29 15:03:32
কি লিখি আমি : পান আপনি হামানদিস্তাতেই কেন ছেচে খাবেন? ইচ্ছা করলে এমনিই তো খেতে পারেন! দাদুর তো চাপার দাঁত ছিল না তাই ছেচে খেত, আপনি কেন ছেচতে যাবেন?
: নাহ.. এমনি খেতে ইচ্ছা করে না। আম্মা যেরকম হামানদিস্তায় ছেচে খেতো , ঐর'ম খেতে ইচ্ছা করে।
: তাইলে একটা হামানদিস্তা কিনে আনলেই তো পারেন।
: তা পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। তোমার দাদুর হামানদিস্তাটা কই আছে কার কাছে আছে কে জানে!

৬৮বছর বয়েসের বাবা আমার এখনো আকুল হন মায়ের হামানদিস্তার জন্য। সেটায় করে মায়েরই মতন করে পান ছেচে খাওয়ার জন্য। আমার গলা বুজে আসে। কথা সরে না। বাবাকে বলি,পরেরবার আমি হামানদিস্তা নিয়ে আসব আপনার জন্য, আপনি সেটায় দাদুর মতন করে পান ছেচে খাবেন।

হাসি তবুও ম্লান। মনে মনে তখনও খোঁজ সেই হামানদিস্তার।

ঝটিতি ঘুরে আসা এবাড়ি, ওবাড়ি। টেবিলভর্তি খাবারে ইলিশ হাজির এবেলা ওবেলা। তবু কে জানে কেন লাগে শূণ্য শূণ্য। মন পড়ে থাকে ভাপ ওড়া চিতই আর হাসের ভুনা গোশতে।

পতেঙ্গার সমুদ্রে আমি আমার কৈশোরকে খুঁজে পাই না। যদিও প্রতিবার চট্টগ্রামে গিয়ে আমি একবার পতেঙ্গায় অবশ্যই যাই। প্রতিবারই দেখি একটু একটু করে বদলে যাওয়া এই ছোট্ট সমুদ্রতট। জোয়ারে যার সৈকত বলে কিছু থাকে না। জল এসে আছড়ায় বাধানো পারে, ফেলে রাখা বোল্ডারে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হুটোপাটি করে তৈরী হয়ে চলে যাই পতেঙ্গায়। ভোরবেলাকার সূর্য ওঠা দেখি বোল্ডারের উপরে বসে থেকে। ভাটা থাকলে হাঁটি সৈকতের এমাথা ওমাথা। অনেকক্ষণ থাকি। বেলা মাথার উপরে ওঠা পর্যন্ত। এবারে অনেকদিন পরে বিকেলে পতেঙ্গা গেলাম। বহুবছর পরে। এই বিকেলবেলার পতেঙ্গা যে এত বদলেছে ধারণা ছিল না। সমুদ্রের ধার ধরে বোল্ডারের এপারে যেন বাজার বসেছে। অনেকটা মেলার মতন কিন্তু মেলা নয়। আবার ঠিক বাজারও নয়। ঠান্ডা পানীয় বিক্রেতা বালতিতে করে রকমারী সব বোতল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই না বাজার না মেলাময়। রকমারী সব পানীয়ের নামের শেষে আসে বীয়ার এমনকি বাংলা মদেরও নাম। তবে এই নামগুলো এরা উচ্চারন করে আস্তে। অন্য লোকের কান বাঁচিয়ে।

এই পতেঙ্গা আমার চেনা নয়। এর সাথে আমার আলাপ হয়নি কখনও। সারাদিনের টিপটিপ বর্ষণের পরে এই বিকেলে বৃষ্টি থামলেও আকাশে মেঘের ঘনঘটা। ভরা জোয়ারের সমুদ্র যেন ফুঁসছে। সোঁ সোঁ গর্জনে আছড়ে আছড়ে ঢেউ এসে ভাঙছে বোল্ডারে। কয়েকটি ছেলে হাত ধরাধরি করে বোল্ডারের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্নানের চেষ্টায় মগ্ন। জোয়ারের সময় সৈকত বলে কিছু থাকে না এখানে কিন্তু তাই বলে কী স্নান হবে না! হাত ধরাধরি করে বোল্ডারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সমুদ্রস্নান করে ওরা। দুলে দুলে গান গায়। সাবধানী নজর রাখে ঢেউএর দিকে। জোরে ঢেউ এলেই শক্ত করে ধরে একে অন্যের হাত। সমুদ্র দেখতে আসা মানুষেরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে ওদের স্নান করা দেখে। উচ্ছাস বাড়ে ওদের। গান গায় দুলে দুলে। যদিও সমুদ্রের গর্জন ভেদ করে বেশিদূর যেতে পারে না ওদের আওয়াজ। মেঘলা আকাশের বুক চিরে সাঁ করে উড়ে যায় ফাইটার প্লেন। নিমেষেই হারায় দিগন্তে। ফাইটার প্লেনের ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়াও মিলায় ধীরে ধীরে।

কর্ণফুলীকে তবু খানিকটা চেনা যায়। যদিও তার চেহারাও অনেক বদলেছে। একধারের পার বাধানো আগেও ছিল তবে এমন ঝা চকচকে ভাবটা ছিল না। এই জায়গাটা আমার বেশ লাগে। জলের ধারে গেলে এমনিতেও আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। চুপ করে বসে থাকতেই বেশি পছন্দ করি। এই নদীর একটা গল্প আছে না? মনে করার চেষ্টা করি। রাজার মেয়ে সম্ভবত কানফুল হারিয়েছিল এখানে, যার থেকে নদীর নাম কর্ণফুলী। এরকমই কিছু একটা গল্প শুনেছিলাম ছোটবেলায়। কি নাম ছিল সেই রাজার মেয়ের? রাজার নামই বা কি ছিল? মনে পড়ছে না। এখন এই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে সেই গল্পটাও আর কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কাওকে প্রশ্ন করে জেনে নেব ভেবেও হয়ে ওঠে না। খানিক পরেই ভুলে যাই। মনে মনে ঢেউ গুনি। এক, দুই, তিন। খানিক পরেই আর ঢেউ গোনার ইচ্ছেটাও থাকে না। বসে থাকি রেলিং এর পরে। ঘোলা জলে কোন রঙের ছায়া নেই। ঘন, জলভরা ধূসর মেঘে ঢাকা আকাশের কোথাও কোথাও উঁকি দেয় হালকা নীল। নদীর ওপারে যাওয়ার সুপ্ত ইচ্ছে মাথাচাড়া দেয়।কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে , বেলার দিকে তাকিয়ে জেগে ওঠা ইচ্ছে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

এবারে আমার আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হলো না। দেশে যাওয়া তাই অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গেল। একটু ঘুরে তাকালেই দেখতে পাই বর্ষার জল থইথই করছে পুকুরের পার ধরে। ভোরবেলাতে মাছওয়ালাদের হেঁকে যাওয়া, কৃষকবধুর হাতে বিক্রী করতে নিয়ে আসা ডিমপাড়া মুর্গীটি। কান পাতলেই শুনতে পাই, পনিইইইইর নিবেন, অষ্টগ্রামের পনির। বাঁশের ঝাঁকায় লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা ঘিয়ে রঙের পনির এসে হাজির হয় টক টক গন্ধ নিয়ে। জানলা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট এক মেয়ে একছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল পনিরওয়ালার কাছে গিয়ে। চিতইয়ের মাঝে ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে দেওয়া পনির যে তার খুব পছন্দ!

ঘুরে ঘুরে সিডি, ডিভিডি কিনি সারা দিনমান। এ দোকান ও দোকান। এই মার্কেট ঐ মার্কেট। পাগলের মত ঘুরে ঘুরে লিষ্ট মিলিয়ে ডিভিডি খুঁজতে খুঁজতে একসময় সব অর্থহীন হয়ে যায়। বসে থাকি চুপচাপ। দোকানীর দেওয়া মগভর্তি কফি খেতে থাকি যতক্ষণ পর্যন্ত সবটুকু কফি শেষ না হয়। বিস্বাদ লাগে তবুও খাই। ব্যস্ত হই ঘরে ফেরার তরে।

চলমান দূরভাষের ওধারে মা। খানিক কথা বলেন, অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। আমি বুঝতে পারি নীরব কান্নায় হাতের ফোন ভেজাচ্ছেন মা। আমার মা। থেমে থেমে কথা বলেন, অনেকক্ষণ কথা বলে আবারও চুপ করেন মা। নাড়ী ছেঁড়ার তীব্র ব্যথায় নি:শব্দে কাঁদি আমি। একটুও শব্দ করি না। কোথাও যেতে দিই না কোন শব্দকে। বাইরে অঝোর বৃষ্টি । রক্তক্ষরণে ক্ষয়ে যেতে যেতে প্রবল শীতে আক্রান্ত হই আমি।






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723129 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28723129 2007-07-28 23:35:11
তিতাস কোন নদীর নাম নয় - ৩য় পর্ব
সুখ কি এখন শুকপাখি যে
পালিয়ে যাবে শিকল ছিঁড়ে?

বুকের খাঁচায় সুখের বাসা
সামনে সবুজ স্বপ্ন হয়ে ক্ষেতের ফসল
অন্ধকারের সঙ্গে এখন পা কষে আলো জ্বালা

অশ্রু নদীর পারে যেন
স্বপ্ন দেখার নৌকো বাঁধা ৷ ( শক্তি চট্টোপাধ্যায় )

তিতাসের চরে বসেছে জলবিদ্যুত্এর কারখানা ৷ ওয়াব্দা ৷ কি সুন্দর সব টাওয়ার বানিয়েছে অর কি সুন্দর ঐ লাল ইটের বাড়ি ৷ যার ভিতরে বসেছে সব মেশিন, সব না কি বিদেশ থেকে আনা৷ এখান থেকে নাকি বিদ্যুত্ বানাবে আর গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলবে বিজলী বাতি৷ কিন্তু কবে?? এখানে তো বিকেল হলেই ঘরে ঘরে হ্যারিকেন সাফ করে মেয়ে বউরা ৷ ন্যাতা দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করে কাঁচের চিমনি, তেল ভরে লন্ঠনে৷ হাত দিয়ে ছিঁড়ে নেয় জ্বলে যাওয়া সলতের মুখ ৷ কবে ঐ ওয়াব্দাতে বিজলী বানানো শুরু হবে আর কবে আমাদের এই গ্রামে আলো জ্বলবে কে জানে! কাকাও কিছু বলতে পারে না, বলে, কাম তো হইত্যাসে, দেখা যাক কবে বাত্তি জ্বলে এই শাহবাজপুরে৷ তিতাসের পার ঘেষে সব ইটখোলা বসেছে ৷ তিতাসের মাটির ইট নাক খুব ভালো হয়, দাদাজি বলেছে ৷ ব্রীজের উপর বসে ছেলে ছোকরারা সব ইটখোলর দিকে তাকিয়ে থাকে ৷ ওয়াব্দার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ বাদামের খোলা ভেঙে ভেঙে ফ্যালে তিতাসের জলে ৷ আমি বেশির ভাগ সময়েই আসা যাওয়ার পথে তিতাসকে দেখি, গাড়ির ভিতর থেকে ৷ কখনও ঐ ব্রীজের উপরে দাঁড়াইনি, ওখানে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খাই নি ৷ ওয়াব্দাকেও আমি দেখি এই ব্রীজের উপর থেকে, চলন্ত গাড়ির ভিতর থেকে ৷ আমার বড় ইচ্ছা করে, নৌকায় চড়ে তিতাসের ঐ চরে গিয়ে ওয়াব্দার ভিতরে যেতে, ঐ টাওয়ারের মাথায় চড়তে৷ যেখানে দাঁড়িয়ে মিস্ত্রীরা সব কাজ করে ৷ কিন্তু আমি যে মেয়ে! আমার তাই তিতাসের পারে যাওয়ার অনুমতি নেই ৷ ওয়াব্দাতে যাওয়ার অনুমতি নেই ৷ এই তো কিছুদিন আগেই ওয়াব্দাতে সিনেমার শ্যুটিং হয়েছে ৷ পুরো গ্রামের লোক সব শ্যুটিং দেখতে গেছে ওয়াব্দাতে ৷ ব্রীজের উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খেতে খেতে শ্যুটিং দেখেছে গ্রামের সব ছেলে ছোকরারা ৷ দল বেঁধে মেয়ে বউরাও সব গেছে শ্যুটিং দেখতে৷ কিন্তু আমি যেতে পারিনি ৷ আমি যে বড় মৌলভি বাড়ির মেয়ে! আমার যে মানায় না রাস্তায় দঁড়িয়ে শ্যুটিং দেখার, ব্রীজের রেলিংএ বসে বাদামভাজা খাওয়া ৷

দখিণগাঁও এর সাজ্জাদ চাচাদের বাড়িতে এবছর সব সিনেমার নায়ক নায়িকারা এসে উঠেছে ৷ ববিতা, রোজি সামাদ, আনোয়ার হোসেন ৷ পুরো গ্রামে ঘুরে ঘুরে ওরা শ্যুটিং করছে৷ যেখানে কাজ হচ্ছে সেখানেই নাকি সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি ৷ পুরো গাঁ ভেঙে পড়ে সেই শ্যুটিং দেখতে৷ এই যে বড় কাকিমা, যাকে কি না আমি অ্যাত্তো ভালবাসি, সে কি না আমার সাথে অ্যাত্তো বড় বিশ্বাসঘাতকটা করলো? রাতের খাবার টেবিলে দিয়ে চুপ করে মা, কাকিমা আর বড়কাকা তিনজনে মিলে সাজ্জাদ চাচাদের বাড়ি গিয়ে ববিতা,রোজি সামাদদেরকে দেখে এসেছে! আর আমাকে একটি বারও বলেনি!! শুনে অব্দি আমার কান্না আর থামে না ৷ কাকিমা বলে, কাঁদিস না, কাকাকে দিয়ে পাঠাবো তোকে আজ ৷ কিন্তু ঠিক সেদিনকেই কাকা কি একটা কাজে চলে গেল শহরে! রোজ বিকেলের রান্না রাঁধতে এসে আহাদ আলির মা বুবু গল্প করে, সে দুপুরে কাজ সেরে গিয়ে শ্যুটিং দেখে এসেছে ৷ আমি বলি, অ বুবু, আমারে লইয়া যাও না! আহাদ আঅলির মা বুবু বলে, মাইয়ো গো! আফনেরে লাইয়া গেলে আমারে আর এই বাড়িত ঢুকতে দিব নি? থাক আম্মা, আফনের যাওন লাগব না, হেরা তো শুনসি আফনেগো পুস্কুনি তে আইয়া সিনেমা বানাইব! ওমা! সত্যি তো! পরদিন সক্কাল থেকে আমাদের পুকুর লোকে লোকারণ্য ৷ লাইন দিয়ে কতগুলো গাড়ি এসে দাঁড়ালো খালপাড়ে আর তার থেকে একে একে লোকজন নেমে শুকনো খাল হেঁটে পেরিয়ে সব এসে থামলো আমাদেরই পুকুরপাড়ে! আর ঐ পুতুল পুতুল দেখতে মেয়ে দুটো! ওমা! এ যে ববিতা! ছোট ফুফু গিয়ে তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে এল ৷ ববিতা তো কথাই বলে না! রাঙানো ঠোঁটে শুধু একটুখানি হাসে ৷ সারাদিন ধরে পুকুরে শ্যুটি ংহল৷ ববিতা স্নান করছে পুকুরে, তারই ফোটো তুলল ইয়া বড় এক ক্যামেরা দিয়ে ৷ আর ববিতা, যে কি না সাঁতারও জানে না ৷ সে এইটুকু জলে বারবার গিয়ে এমন ভাব করছে যেন সাঁতার কাটছে! ঐ নাকি শ্যুটি! ংধ্যাত্৷ সারাটা দিনই মাটি হল আমার ৷

- ছাওয়ালের বাপ কোন হানে আছে দিদি?
- জানি না ৷
- বলি মইরা তো যায় নাই?
- জানি না ৷
- আমি কই বিয়া তো একডা হইছিল দিদি?
- জানি না ৷
- পোড়া কপাল কই এই ছাওয়লডা আইছে একটা বিয়া অইয়াতো?
- জানি না ৷
- খালি জানি না জানি না জানি না৷ তুমি দিদি কিছুই জান না ৷
( তিতাস একটি নদীর নাম/ চিত্রনাট্য- ঋত্বিক কুমার ঘটক)

আমাদের বাড়িতে সখিনাকে ঢুকতে বারন করে দিল দাদি ৷ সন্ধ্যেবেলায় আহাদালির মা বুবু রাঁধতে এসে গল্প করলো, সখিনার প্যাট হইসে গো আম্মা ৷ হের লাইগাই তো আফনের দাদি সখিনারে আফনেগো বাড়িত আইতে মানা করসে৷ আমি জিজ্ঞেস করি আহাদালির মা বুবু কে, পেট হইলে কি হয় বুবু? বুবু বলে, আস্তে কন আম্মা, আফনের দাদি হুনলে আমারেও আর বাড়িত ঢুকতে দিব না ৷ সখিনায় কুকাম করসে, হের লাইগা সখিনার পেট হইসে ৷ অহন সখিনারে একঘইরা কইরা দিব হগ্গলে মিল্যা ৷ হাইন্জা বেলায় বিচার হইব সখিনার, পঞ্চায়েত বইব ৷ বুবু আরও বলল, সখিনা পিরীত করে পুবহাটির কাশেমের লগে, আইজকা নতুন না, বহুতদিনের পিরীত, হাসন আলি, মইজুŸনি হগ্গলে হগ্গলতা ( সবাই সবকিছু) জানে, কিন্তু কেউ কিসু কয় না, কইলেই কি সখিনায় হুনব, যে দজ্জাল মাইয়া ৷ আগের তিনডা পোলাপানও ঐ কাশেইম্যার ৷ সব জাইন্যাও হাসন আলি চুপ কইরা থাহে, হের তো যাওনের জায়গা নাই ৷ কই যাইব? বাড়ি ঘর নাই দেইখাই তো ঘরজামাই হইয়া আইসিল, তয় এইবার হাতে নাতে ধরা পড়সে সখিনা, হের বাপ আর মরদে কিসু না কইলেও পাড়ার মাইনসে ছাড়ত না ৷ আমি রাতে পেরে কাকিমাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অ কাকিআম্মা, সখিনারে বলে একঘইরা কইরা দিব? একঘইরা কি জিনিস গো? কাকিমা খুব রেগে গিয়ে বলল, কেডায় কইসে তোরে এইগুলি? আমি বললাম, আহাদালির মা বুবু কইতেসিলো তো রাঁধতে আইসিল যখন, সখিনায় বলে কুকাম করসে হের লাইগা হেরে একঘইরা কইরা দিব হগ্গলে মিল্যা, কাকিমা আরও রেগে গিয়ে বললো, আহদালির মায় অত কথা তোর কাছে কিয়ের লাইগ্যা যে কয় আল্লায় জানে,কাইল সকালে আইলে জিগামু হেরে, পুলাপানের লগে অত কতা অত কেচ্ছা কিয়ের! তারপর আমাকে দিল বকুনি,তুই ঘুমা এখন, অত কথায় কান দেওনের দরকারটা কি তোর? এবার কাকার পালা ৷ কাকাকে বললো, তোমার ঐ পঞ্চায়েতে যাওন লাগতো না ৷ খাইয়া লইয়া ঘুমাও গিয়া!

মুন্সিবাড়ির লিয়াকতের মায়ের একটা ফলের বাগান আছে ৷ সেই বাগানে ন্যাশপাতি, কমলা, জাম্বুরা ( বাতাবী লেবু ), কামরাঙা , তুতফল আর পেয়ারার গাছ গোটা বাগান জুড়ে ৷ লিয়াকতের মা দাদি এক অদ্ভুত বাংলায় কথা বলে, দাদি কলিকাতার মেয়ে ৷ মুসা লস্কর এই দাদিকে বিয়ে করে কলিকাতা থেকে নিয়ে গেসল ৷ তো দাদি কলিকাতার শুদ্ধ বাংলা আর আমাদের দেশের ভাষা মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভাষায় কথা বলে৷ আমরা, পোলাপানেরা বহু চেষ্টা করেও দাদিকে নকল করতে পারি না, দাদি হেসে কুটিপাটি হয় আমাদের সেই চেষ্টা দেখে৷ নিজের ছেলে-পুলে নাই৷ দেওরের ছেলেকে নিজের ছেলে বলে মানুষ করেছে ৷ সেই ছেলে শহরে থেকে কলেজে পড়ে৷ বাড়ি আগলে থাকে দুই বুড়ো-বুড়ি ৷ দাদি নানা রকম আচার বানায় আর সেগুলো কাঁচের বৈয়ামে ভরে প্রায় দিনই উঠোনে শুকোতে দেয় ৷ জলপাইয়ের আচার, বড়ই ( কুল) এর আচার, তেঁতুল এর আচার, আমের আচার ৷ আমার সবচাইতে ভাল লাগে দাদির কুলের আচার ৷ বৈয়ামভর্তি তেলের মধ্যে লাল লাল কুল ৷ বড়ই এর ফাঁকে ফাঁকে রশুনের কোয়া আর শুকনো লংকা ও দেখা যায় ৷ দাদির কাছে যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই তার গাছের ঐ ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারা কিন্তু আচার আর কামরাঙাও কম লোভনীয় নয় ৷ যখন পেয়ারা বা কামরাঙা থাকে না তখন মহানন্দে সেই আচার খাই ৷ মুসা দাদা বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরে ঘুরে গাছের চারা যোগাড় করে আর দিনের অর্ধেক সময় ঐ বাগানেই কাটায় ৷ আমি আর চায়না দুপুরবেলাতে গিয়ে হাজির হই যখন দাদি পানের বাটা নিয়ে শীতল পাটিতে বসে পান খায় আর হাতপাখা ঘোরায় ৷ আমাকে দেখেই মুসা দাদা বলে ওঠে, আইসো বুবু? আইয়ো! তোমার দাদির কাছে বইয়া একটু পাঙ্খার বাতাস খাও৷ আমি খানিকক্ষণ বসে দাদাকে বলি, দাদা বাগানে যাই? দাদা বলে শবরি ( পেয়ারা) খাইবা তো? যাও! দাদার এই পেয়েরা গাছগুলো বাগানের ধার ধরে লাগানো, গাছগুলো খুব একটা উঁচু নয় আর বেশ ডাল পালা ছড়ানো ৷ তাতে ফলে আছে আমার মুঠিতে আঁটে না এমন সব পেয়ারা ৷ কিছু একদম কাঁচা, কিছু ডাঁসা আর কিছু পাকা ৷ আমি ভালবাসি ডাঁসাগুলো আর চায়নার আবার কাঁচা পছন্দ ৷ দাদার আবার শর্ত আছে, গাছে বসে পেয়ারা খাওয়া চলবে না, তাতে করে নাকি পেয়ারাতে পোকা হয়, কাজেই গাছ থেকে যত খুশি পেয়ারা পাড়ো আপত্তি নেই কিন্তু খেতে হবে নেমে এসে ৷ ফ্রকের কোঁচড়ে পেয়ারা নিয়ে হজইর হই দাদির কাছে, কোঁচড়ের সাইজ দেখে দাদি আন্দাজ করে কত পেয়ারা পাড়া হল, বলে অ বুবু, তোমার তো প্যাডে (পেটে )বেদনা হইব অ্যাত্তো শবরি খাইবা তো! আমি দাদিকে আশ্বাস দি, কিসসু হইবো না দাদি, আমি তো রোজ খাই!

ফেরার পথে উঁকি দিই জামশেদ পাগলার বাড়িতে৷ জামশেদ ইসমাইল লস্করের ছেলে, ছোটবেলা থেকেই পাগল হয়ে বাড়ি থেকে চলে যায়, চম্পা বলে এখন নাকি সে হাইকোর্টের মাজারে ভিক্ষা করে৷ চম্পা জামশেদ পাগলার ছোট বোন ৷ আমাদের বাড়ির সাথে ঝগড়া ওদের বাড়ির, জমি নিয়ে৷ ওরা আমাদের বসতবাড়ির বেশ খানিকটা জমি দখল করে রেখেছে রাতারাতি সেখানে টিনের ঘর তুলে নিয়ে৷ বড়কাকার সাথে ঝগড়া হওয়াতে বড়কাকা মাধবপুর থানায় গিয়ে মামলা করে দিয়েছে ইসমাইল লস্করের নামে ৷ সেই থেকে ওদের বাড়ির কেউ আমাদের বাড়ি আসে না ৷ দাওয়াত্ দিলেও আসে না ৷ কিন্তু চম্পা আমার বন্ধু ৷ মুন্সিবাড়িতে ঘুরতে গেলে ওর সাথেই তো যাই , মুন্সিবাড়ির পুকুরে স্নান করার ইচ্ছে হলেও চম্পাই সঙ্গী হয়৷ চম্পার বড় বোন রওশন আরা ছোট ফুফুর বন্ধু, দুজনে লুকিয়ে গল্প করে, গল্পের বই আদান প্রদান করে, শরত্চন্দ্র, নীহারন গুপ্ত ফাল্গুনি মুখোপাধ্যায়ের বই৷ সেগুলো আবার আমিই দিয়ে আসি কিংবা নিয়ে আসি ৷ রওশন ফ্ফুর কাছে আছে রিক্শাওয়ালা, মইষাল বন্ধু, অমর প্রেম জাতীয় বই ৷ সেগুলো সে আমার হাতে দেয় না, নিজেই ছোটফুফুকে দেয় বিকেলবেলা যখন ছোটফুফু পাশের আহমদ দাদাদের বাড়িতে আসে কিংবা পুকুরপাড়ে যায়৷ একবার দুজনে লুকিয়ে একটা বই পড়ছিলো যে বইটা রওশন ফুফু তার শাড়ির আঁচলের তলায় করে নিয়ে এসেছিলো ৷ সেদিন আমিও ছোটফুফুর সাথে বসেছিলাম আহমদ দাদাদের উঠোনে, রওশন ফুফু এসে বললো, এই সামি, যা চম্পার চম্পা লগে ঘুইরা আয় গিয়া! রওশন ফুফুর হাব ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম কিছু একটা গোপন ব্যপার আছে যা সে আমার সামনে বলতে চায় না ৷ আমি বললাম না, আমি আইজকা তোমাগো লগে থাকুম! ছোটফুফু তখন বললো আচ্ছা থাক তবে ওদিক ফিরে বোস আমি তোর মাথার উকুন বেছে দিই! আমার মাথায় যদিও উকুন আছে কিন্তু ছোটফুফু কক্ষণো সেটা বেছে দেয় না! আমি চুপ করে ওদিক ঘুরে বসে পড়লাম ছোটফুফুর কথামত৷ রওশন ফুফু ফিসফিস করে বলল এই দ্যাখ! আঁচলের তলা থেকে একটা বই বার করে নিজেই পাতা উল্টে উল্টে দেখাতে লাগলো! সাথে সাথেই ছোটফুফু বললো, রোশনি, আমি যাই বাড়িত, আইজকা আর বইতাম না! আমাকে নিয়ে ছোটফুফু উঠে চলে এল ওখান থেকে৷ কি হয়েছে, ওখান থেকে উঠে পালিয়ে এল কেন, বারবার ছোটফুফুকে জিজ্ঞেস করলেও সে কিছুই বললো না আমাকে ৷

চম্পা খুব ভয় করে ওর আব্বাকে, ইসমাইল লস্কর যদিও আমাকে দেখলে কিছু বলে না কিন্তু তবু চম্পা বেশ ভয়ে ভয়ে থাকে বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় ৷ এই চম্পাদের বাড়িতে একটা তালগাহ আছে বেশ উঁচু গাছ ৷
তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে ৷
এই গাছের তাল কেউ খায় না খুব তেতো বলে, ধপাস করে তাল পড়েছে শুনেও কেউ দৌড়ায় না তাল কুড়োবে বলে ৷ মাঝে মাঝে গাছ থেকে ডাল ছেঁটে নিচে ফেলে রতন,চম্পার বড় ভাই ৷ সেই ডাল থেকে অনেকেই পাতা কেটে নিয়ে যায় পাখা বুনবে বলে ৷ রওশন ফুফু খুব ভাল পাখা বোনে ওদের গাছের শুকনো পাতা দিয়ে ৷ পাতা থেকে বেত তুলে নিয়ে ( সরু বেতের আকারে কেটে নেওয়া পাতা) বিভিন্ন রঙে চুবিয়ে নানা ডিজাইন বানায় সে পাঁখায় ৷ ফুল, লতা,পাতা মাছের ছবি ৷ বেশ অনেক কটা পাঁখা বোনা হয়ে গেলে পাশের বাড়ির আহমদ দাদা সেই পাঁখাকে গোল করে কেটে সরু বাঁশের বেত দিয়ে বাঁধিয়ে দেয় পাঁখা আর ডাঁটি লাগিয়ে দেয়, যাকে আহমদ দাদা বলে "চাকানো"৷ সেই পাখা লোকে বাড়ি এসে কিনে নিয়ে যায় একসঙ্গে ছ'টা আট'টা ৷ এই হাতে বোনা পাখাগুলো বাজারে পাওয়া যায় না ৷ এই পাড়ায়, গ্রামে কে কে পাখা বোনে সেটা ব্যপারীরা জানে ৷ তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পাখা সংগ্রহ করে আর তারপর কাছে, দূরের সব বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে সেই পাখা বিক্রী করে ৷ রওশন আরার হাতের বোনা পাখার বেশ চাহিদা ব্যাপারীদের কাছে৷ রওশন ফুফু বিভিন্ন রঙীন কাপড়ের ঝালর কুচি দিয়ে দিয়ে লাগায় বাধানো পাখার বাইরের দিকে৷ পাখার ভেতরে আঁকে ফুল, লতা-পাতা পাখি ৷ বড় বড় ফোঁড়ে রঙিন সুতোয় নিজের নাম লিখে একটা পাখা সে উপহার দিয়েছে ছোটফুফুকে ৷

একদিন সকালবেলা হঠাত্ ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল মুসা পাগলার বাড়ির সামনে রাজমিস্ত্রী এসেছে ৷ মুসা পাগলার ছোটছেলে কালা রাতে স্বপ্ন দেখেছে ওদের বাড়িতে এক পীর'এর কবর আছে আর সেই পীর স্বপ্নে কালাকে আদেশ দিয়েছেন তার কবর যেন বাঁধিয়ে দেওয়া হয়! আমরা সবাই দেখলাম আমাদের বাড়ির বাংলা উঠোনে ( বার বাড়ির উঠোন) যেভাবে বড় মৌলভি সাহেব আর তাঁর বিবিসাহেবের কবর বাঁধানো আছে ঠিক তেমনি করেই ওদের বাড়িতেও কবর বাঁধানো হচ্ছে খেজুর গাছ কেটে দিয়ে ৷ খেজুর গাছ নাকি কবরের উপরে ছিল, স্বপ্নে কালা এরকমই দেখেছে কাজেই সক্কাল সক্কাল উঠেই কেটে ফেলল সে নিজেই ঐ খেজুরের গাছ আর তারপর মিস্ত্রী নিয়ে এসে ইট গেঁথে দাঁড় করিয়ে দিল বাঁধানো কবরের ধাঁচে৷ ওদিকে তার বাবা মুসা পাগলা সমানে ছেলে উপরে চেঁচামেচি করে যাচ্ছে, ছেলেকে অভিসম্পাত করছে এই বলে, তুই রাইতে গাঞ্জা খাইয়া ঘুমাইসত আর সক্কাল সক্কাল উইঠ্যাই ফলন্ত খেজুর গাছ কাইট্যা বাড়ির ভিতরে মাজার বানাইত্যাসত৷ অত মিছা কতা আল্লায় সইত না রে কাইল্যা৷ করিস না বাপ আমার, ছাইড়া দে ৷৷ এই বাড়িত কোন কবর নাই, কোন মাজার নাই, কি কারণে তুই এমুন করতাসত? কিন্তু তার ছেলে কোন কথা শুনছে না সে একমনে তার কাজ করেই যাচ্ছে, মাঝে মাঝে শুধু চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছে এবাড়ির কবরের মত হচ্ছে কি না ৷ আমাদের বাড়ির সবাই চুপ করে দেখছিল, দাদাজি সবাইকে ধমকে দিল, কেন এরকম কাজ কম্মো ফেলে দিয়ে সবাই তামাশা দেখছে? সবাই যার যার কাজে চলে গেল ৷ দাঁড়িয়ে গেল চায়নাদের বাড়িতে মাজার ৷ প্রায় রাতেই সেখানে সাধু সন্ন্যাসী পীর ফকির আসে আর গাঁজা ভাং খেয়ে সবাই মুর্শিদি গান গায় ৷

কাছে নেও না দেখা দেও না
আর কতকাল থাকি দূরে ৷৷
মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে ৷৷
ময়াজালে বন্দী হয়ে আর কতকাল থাকিব ৷৷
মনে ভাবি সব ছাড়িয়া তোমারে খুঁজে নিব
আশা করি আলো পাব ডুবে যাই অন্ধকারে
কেমনে চিনিব তোমারে, মুর্শিদ ধন হে
কেমনে চিনিব তোমারে ৷৷

আমাদের আটচালা টিনের বাংলা ঘরের বারন্দায় দাঁড়িয়ে যখন জায়গির মুন্সি আজান দেয় নামাজের তখন সামনের মুসা পাগলার বাড়িতে তার ছোটছেলে কালা দলবল নিয়ে মুর্শিদি গান করে ৷
শুনলে কথা মনের ব্যথা
দূর হইয়া যায় চিরতরে
মুর্শিদ রূপে জানো তারে ৷৷
এইবার নিরাকারে আপনে আহা
আকারে মানুষ করে কাবা ৷
স্বরূপেতে রূপ মিশাইয়া
জীবের মূর্তি ধারণ করে ৷
মুর্শিদ রূপে জানো তারে ৷৷


(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28720751 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28720751 2007-07-13 12:35:44
তিতাস কোন নদীর নাম নয় - ২য় পর্ব
আমাদের বাড়ির সামনে যে ছোট খাল আছে সেটাই গড়িয়ে গড়িয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে বয়ে গিয়ে পড়েছে তিতাসে ৷ তিতাস অব্দি যেতে যেতে কোথাও সেই খাল খুবই সরু হয়েছে কোথাও বা হয়েছে বেশ চওড়া ৷ বড় মৌলভি পাড়া যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে ফসলের মাঠ৷ এই মাঠ বহুদূরে গিয়ে শেষ হয়েছে মেদীর হাওরে ৷ "মেদী' এক বিশাল হাওর ৷ শুকনো মরশুমে সেটা আদিগন্ত এক ফসলের মাঠ কিন্তু বর্ষায় কোথাও মাটির চিহ্নটুকুও থাকে না ৷ শুধু জল অর জল ৷ সেখানে কোন গ্রাম নেই, কোন মানুষের বাস নেই ৷ শীতকালে সেখানে প্রচুর পাখি আসে, নানা জাতের হাঁস আর পাখি৷ কোথাও হাঁটু তো কোথাও কোমর কোথাও বা বুক অব্দি জলে থাকে প্রচুর মাছ৷ হাঁসেরা সেই জলে ভেসে বেড়ায়, আকাশ থেকে গোত্তা খেয়ে জলে নেমে আসে ধবল বক, মাছের সন্ধানে ৷ ঐ সময়টায় আশে পাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে সেই হাঁস,পাখি শিকার করতে৷ নিশুতি রাত কেঁপে ওঠে গুলির শব্দে৷ ছপ ছপ শব্দ হয় জলের উপর বৈঠার ৷ নৌকো এগোয় সেদিকে, গুলি খেয়ে যেখানে ধনেশ কিংবা বালিহাঁসটা পড়ল ৷ হাওর অব্দি যেতে যেতে পড়ে ছোট ছোট গ্রাম, কুসনি, বুড্ডা, মলাইশ৷ আর পড়ে ছোট ছোট বাথান৷ বর্ষায় এই গোটা মাঠ ডুবে যায় ৷ সামনের ঐ ছোট খাল তখন এক ছোট নদী হয়ে যায় ৷ মাটির সড়ক থেকে খাল পেরিয়ে এই পাড়ায় আসতে নৌকো লাগে তখন ৷ ছোট ছোট কোষা নৌকো দাঁড়িয়ে থাকে লম্বা বাঁশে দড়ি বেঁধে ৷ পশ্চিমের ঐ মোড়াহাটিতে যেতেও নৌকাই ভরসা৷ সেই কবে থেকে শুনছি পুল হবে৷সি এন্ড বি ধারে দিঘীর পাড়ে যেতে যেরকম পুল আছে আমাদের এখানেও হবে সেরকম পুল৷ ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এর ইলেকশনের জন্যে ভোট চাইতে এসে দখিনগাঁওএর খালেদ ও বলে গেছে আর ইউনুস জোতদারেও বলে গেছে, এবারের ইলেকশনে পাশ করে সবার আগে নাকি আমাদের এই পুল বানিয়ে দেবে৷ আমাদের এই খালেও হবে আর মোড়াহাটির সামনেও হবে৷ দাদাজিকে তাঁরা দুজনেই আলাদা আলাদা সময়ে দলবলসহ এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে গেছে আর বলে গেছে দাদাজি যেন এপাড়ার মানুষকে বলে দেন তাদের ভোটটা তাঁকেই দিতে! দাদাজি বলেছেন, যাও মিঞা, কাম কর গিয়া, দ্যাশের মানুষের লাইগা কাম করলে হেরা নিজেরাই তোমারে ভোট দিব, আমার কইয়া দেওন লাগত না কাওরে! দুজনকেই একই কথা বলে বিদায় করেছেন ৷

আমাদের পাড়ার সামনের এই সরু খাল মোড়াহাটির সামনে গিয়ে বেশ চওড়া হয়ে চলে গেছে মাঠের পাশ দিয়ে কুসনির দিকে৷ মোড়াহাটির লোকেরা বাঁশের সাঁকো বানিয়ে রেখেছে ঐ খালের উপর ৷ লম্বা একটা বাঁশ নিচে থাকে আর একটা থাকে কোমরসমান উচ্চতায়, দুপাশে আড়া আড়ি বাধা থাকে আরও দুটো করে বাঁশ যাতে করে সাঁকোর ব্যালেন্স ঠিক থাকে, নিচের বাঁশে পা রেখে কোমরের কাছের বাঁশে হাত দিয়ে ধরে ব্যালেন্স করে করে পেরিয়ে যাওয়া ৷ খাল যেখানে বেশি চওড়া সেখানে একটার গায়ে আরেকটা বাঁশ বেধে সাঁকো লম্বা করা হয় ৷ ছেলেপুলেরা ঐ সাঁকো দিয়েই খাল পার করে কিন্তু বুড়োরা তা পারে না৷ তাদের জন্যে নৌকৈ সম্বল ৷ কিন্তু পারের কড়ি খুব বেশি না হলেও কম নয় আর ওদের অনেকের জন্যেই ঐ সামান্য পারের কড়ি দেওয়াতাও সম্ভব হয় না৷ এপারে দাঁড়িয়ে মাঝিকে অনুরোধ করে, ও বাপজান, দ্যাও না আমারে পার কইরা, তোমারে আল্লায় দিব! কেউ পার করে আল্লায় দেবে এটা মেনে নিয়ে, কেউ আবার ঠাট্টা তামাশাও করে, বলে, যাও যাও, গিয়া আল্লারে কও, পরে না দিয়া অহনই দিতে! বুড়ো মানুষটি তখন পরের নৌকার মাঝির কাছে গিয়ে একই অনুরোধ জানায় আর পারের কড়ি উপরওয়ালা পরে কখনও দিয়ে দেবেন এই আশ্বাস দেয় ৷

মোড়াহাটির এই সাঁকোটা একটা মজার জিনিস ৷ আমাদের এপাড়া, পাশের নেতুলহাটি, ওপাশের মুন্সিবাড়ি আর সামনের মোড়াহাটির সমস্ত ছেলে-মেয়েরা ঐ বাঁশের সাঁকো থেকে জলে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ে, স্নান করে দাঁপাদাঁপি করে ৷ ঘন্টার পর ঘন্টা তারা ঐ খালের জলে স্নান করে, ডুব সাঁতার দেয়, জলের খেলা খেলে, ছোঁয়া ছুঁয়ি ৷ সাঁতরে গিয়ে একজনকে ছুঁয়ে দিলে সে চোর৷ আর সেই চোরের হাত থেকে বাঁচার জন্যে সবাই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে৷ চোর আসছে দেখলে সে ডুবসাঁতার দেয় ছড়া কেটে,

এগুলো কি? মলাই!
পানির তলে পলাই!

চোর বেচারা কখনো সাঁতরে গিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করে কখনও বা ডুব সাঁতার দিয়ে৷ যাকে ছুঁয়ে দিল সে আবার চোর ৷ আমরা, এই মৌলভি বাড়িরে পোলা-পানেরা ওখানে যেতে পারি না৷ আমাদের দৌড় এই বাঁধানো পুকুর অব্দি, এখানেই আমাদের স্নান, সাঁতার, ডুবসাঁতার আর ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা ৷৷৷

এগুলো কি? মলাই
পানির তলে পলাই!

কিন্তু পুকুরের জলে স্নান করে কি মন ভরে? সামনের ঐ ডুবে যাওয়া মাঠ আর নদী হয়ে ওঠা খাল যে ডাকে হাতছানি দিয়ে, আয় ৷৷ আয় ৷৷ কিন্তু যেতে পারি না ৷ দাদি কিংবা বড়কাকা দেখে ফেললে হয়ে যাবে৷ কাকা তো শাসিয়ে রেখেছে, যদি ঐ খালের জলে পা ও ডুবিয়েছি তো পুকুরে স্নান করাও বন্ধ! আচ্ছা বড়কাকাটা কোথাও চলে যায় না কেন? কিন্তু বড়কাকা কোথাও যায় না আর ঠিক স্নানের সময়টাতেই তার পুকুরের চারধার ঘুরে ঘুরে দেখার প্রয়োজন পড়ে, খালের পানি কতটা বাড়ল?? পুকুরের পাড় ভাঙছে কি?? কাঁঠালগাছটার গোড়ায় কি পানি চলে আসছে?? সেবার তো তেঁতুলগাছটা মরেই গেল!

এই গ্রামের যত ছেলে আছে তারা বিকেল হলেই তিতাসের ব্রীজে গিয়ে আড্ডা দেয় ৷ বাজার থেকে বাদামভাজা, ছোলাভাজা ঠোঙায় করে নিয়ে যায় আর রেলিংএ বসে খায় ৷ কেউ কেউ যায় গুরুজনেদের লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকতে৷ আমার খুব ইচ্ছে করে ঐ ব্রীজে যেতে, অমনি করে ঐ রেলিংএ বসে বাদামভাজা ছোলাভাজা খেতে ৷ কিন্তু আমি যে মেয়ে! আমার তাই ব্রীজে যাওয়া বারন ৷ আর তিতাস ও তো গ্রামের ঠিক বাইরে দিয়েই গেছে ৷ কেন রে তিতাস! তুই কি আরেকটু ভেতর দিয়ে যেতে পারতিস না? তাহলে তো আমি চুপটি করেই ঘুরে আসতে পারতাম কাওকে কিচ্ছুটি না বলে! কিন্তু গ্রাম পেরিয়ে ওখানে গিয়ে আবার ফিরে আসতে যে সময় লাগবে তাতে তো পাড়াসুদ্ধু হই চই ফেলে দেবে দাদি আর বড়কাকা মিলে! যেন আমি হারিয়েই গেছি! এখানে কি ছেলেধরা আছে যে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে? কিন্তু দাদি আর বড়কাকাকে কে বোঝাবে? মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে যে গ্রামে ছেলেধরা এসেছে, কখনও অমুকদের বাড়ির ছেলে হারিয়েছে তো কখনও তমুকদের বাড়ির, কিন্তু সেসব মেলার সময় হয় ৷ আর কাকিমা বলে, ছেলেধরা ফরা কিসসু নয়, মেলায় যাœআদলের সাথে ছেলে নিজেই পালিয়েছে ৷ যাœআদলের সাথে পালালে ইশকুলেও যেতে হয় না আর ক্ষেতের কাজও করতে হয় না ৷ দাদি বলে, এও একধরনের ছেলেধরাই তো৷ গ্রামের ছেলেদের যাœআর পার্ট করতে দেওয়ার নাম করে তাদেরকে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া, আর যে ছেলেটি যাচ্ছে সে যে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছে এও তো যাœআদলের লোকেদের জানা ৷ এবারে যেমন আহাদালির মা বুবুর ছোটছেলে পালাল বাড়ি থেকে ৷ মেলা শেষ হওয়া অব্দি সে রোজ মেলায় যেত, যাœআর একই পালা সে রোজ দেখত আর বাড়ি এলেই তার মায়ের সাথে রোজ ঝগড়া হত, ক্ষেতের কাজে না গিয়ে ছেলে সারাদিন মেলায় পড়ে থাকে বলে৷ মেলা যেদিন শেষ সেদিন ছেলে আর বাড়ি ফিরল না ৷ আহাদালির মা বুবু সারাদিন ছোটাছুটি করে সারা গাঁ খুঁজল, সন্ধ্যেবেলায় আমাদের বাংলা উঠোনের মাটিতে পড়ে বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগল এই বলে, আমার পোলারে আইন্যা দ্যাও, আমার পোলারে আইন্যা দ্যাও ৷

আমাদের এই গ্রামের নাম শাহবাজপুর ৷ এক ফকিরের নামে গ্রামের নাম৷ ফকির শাহবাজ শাহ নাকি আটশ বছর আগে এই গ্রামে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে ৷ তার আস্তানা ছিল তিতাসের পারে, সেই ফকির শাহবাজ শাহর নামে এই গ্রামের নাম শাহবাজপুর ৷ আমাদের পাড়ার নাম বড় মৌলভিপাড়া ৷ বড় মৌলভি সাহেব নামেই সবাই চিনতো তাকে, তার নামেই এই পাড়ার নাম বড় মৌলভি পাড়া ৷ এই পাড়ার নাম লস্কর পাড়াও হতে পারতো কারন মৌলভি বাড়ির চারপাশে যারা আছেন বেশির ভাগই সব লস্কর আর লস্কর বাড়ির লোক ৷ দু-চার ঘর আছে যারা খেটে খায়, পুরুষেরা অন্যের ক্ষেতে আর মহিলারা বাড়িতে ৷ যখন মৌলভি সাহেব এখানে আসেন তখন লস্কর বাড়ির নাকি খুব জমজমাট অবস্থা ছিল ৷ সে দুশো বছর আগের কথা ৷ ঢাকার ফরিদবাগ থেকে এসেছিলেন তিনি ৷ ঘুরতে ঘুরতে শাহবাজপুরে এসে স্থির করেন যে এখানেই থেকে যাবেন ৷ যে জায়গাটি তিনি পছন্দ করেন থাকবেন বলে সেটি গ্রামের উত্তর ভাগ৷ উত্তর গাঁও নামেই পরিচিতি ৷ খালপাড়ের জায়গাটি তিনি কিনে নেন লস্করদের কাছ থেকে ৷ জায়্গাটা খালি পড়েই ছিল ঝোপ-ঝাড় আর গাছ পালাতে জঙ্গল হয়েছিল ৷ লস্করেরা জমিটি মৌলভি সাহেবকে দান করতেই চেয়েছিল পূণ্যও হবে আর এই জঙ্গল আবাদও হবে মানুষের উপস্থিতিতে এই ভেবে ৷ মৌলভি সাহেব জমিটি দান না নিয়ে কিনে নেন আর সেখানে জঙ্গল সাফ করে বসত শুরু করেন ৷ বসত শুরু করার কিছুদিন পরে তিনি লস্কর বাড়িরই মেয়েকে বিয়ে করেন ৷ এই মৌলভি সাহেব আমার দাদাজীর দাদাজী ৷


(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28720743 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28720743 2007-07-13 12:02:23
তিতাস কোন নদীর নাম নয় যায়, বয়ে যায়৷৷
দু'কূলে তার বৃক্ষেরা সব
জেগে আছে;
গৃহস্তের ঘর-বাড়ি
ঘুমিয়ে গেছে,-
শুধু পরান মাঝি বসে আছে
শেষ খেয়ার আশায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷
কে জানে কবে কে নাম রেখেছে
তিতাস তোমার;
যে নামেই ডাকি তোমায়
তুমি কন্যা মেঘনার৷
মোষের মতন কালো সাঁঝ
নামে তীরে;
আবহমান উলুধ্বনি
বাজে ঘরে ঘরে,-
পোহালে রাত ফর্সা ভোর
আসে নদীর নামায়৷
যায়, বয়ে যায়৷৷ ( যে নদীর নাম তিতাস/ উত্সর্গ পত্র- ঋত্বিকমঙ্গল, বাংলা একাডেমী ঢাকা,2001)

খুব একটা বড় নয় পাড়াটা, পনেরো কুড়ি ঘর মানুষের বাস ৷ গ্রামের ভেতরে ছোট্ট আরেক গ্রাম ৷ এই গ্রামে আমার পূর্ব পুরুষের বাস ৷ আমরা থাকি এ'পাড়ায়, গ্রামের ভিতরের আরেক ছোট্ট গ্রামে ৷ গ্রামের ভিতরের সেই গ্রামে এ ঢুকতে প্রথম বাড়িটাই আমাদের ৷ হাতের ডানদিকে এর পরে নজরুল ইসলামেরা থাকে৷ নজরুল ইসলামের বুড়ো মা, বাপ ছোট ভাই তাজুল ইসলাম বোন সেলিনা, চায় না ৷ চার ভিটায় চারটে ঘর৷ নজরুল ইসলাম বিয়ে করে বউ এনেছে চর থেকে, তিতাসের চর৷ বৌ সব সময় এক হাত ঘোমটা টেনে রাখে৷ দুই হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি আর কোমরে বিছা৷ সে শাড়ি পরে গোড়ালির বেশ খানিকটা উপরে ৷ সারাদিন এই ঘর ঐ ঘর করে, একচালায় বসে রাঁধে আর যখন কাজ থাকে না তখন বসে বসে কাঁথায় ফুল তোলে৷ নকশী কাঁথা বানায় বৌ ৷ তার ঐ এক হাত লম্বা মাথার কাপড় তখন কপাল পর্যন্ত উঠে৷ দেখা যায় বৌএর নাকে নোলক গলায় তক্তিছড়া৷ নজরুল ইসলামের এই বৌ আমায় আম্মা বলে ডাকে৷ আমার খুব মজা লাগে৷ আমারে আম্মা ডাকো ক্যান জিজ্ঞেস করলে বৌ মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে, আফনেরে আম্মাই তো কমু, আফনে যে আমাগো সাব বাড়ির মাইয়া! শামসুল নজরুল ইসলাম চাচার ছেলে, ছোট্ট ছেলেটা অসম্ভব দুষ্টু৷ দু দন্ড সে মায়ের কাছে থাকে না, সারাক্ষণই ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক৷ ন্যাংটো ছেলের কোমরে কালো সুতোয় বাঁধা একটা ছোট্ট রূপোর ঘন্টা৷ পুঁচকে শামসুল কোথয় যায় না যায় মা যেন সর্বক্ষণ সেটা জানতে পারে তাই সে ছেলের কোমরে ঘন্টা বেঁধে দিয়েছে৷ ছেলে যেদিকেই যায় ঝুম ঝুম শব্দ হয় সেই ঘন্টা থেকে৷ তাদের বাড়ির ডানপাশ দিয়ে গেছে ছোট্ট খাল৷ সুদিনে সেই খালে জল থাকে না কিন্তু বর্ষার নিথর জল উঠে আসে বাড়ির উঠোন অব্দি৷ বউ ছেলেকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে থাকে সে ঐ খালের দিকে যায় কি না৷ তার সজাগ কান সর্বদাই ছেলের কোমরের ঐ ঘন্টায়৷

নজরুল ইসলাম আমাদের বাড়িতে বছর বান্ধা মুনিষের কাজ করে৷ সারাদিনে তিন চার বার ঘুরে ঘুরে নজরুল ইসলামদের বাড়িতে যাই, নজরুল ইসলামদের বাড়ির দাদা মুসা লস্কর , সবাই যাকে মুসা পাগলা বলে ডাকে৷ কেন যে সবাই দাদাকে পাগলা বলে! দাদা তো কাওকে বকে না, কারোর সাথে ঝগড়া করে না দাদা সারাদিনই শুয়ে বসে গান করে,
বাড়ি বাড়ি কর তোমরা
এই বাড়ি তো বাড়ি নয়
আসল বাড়ি গোরস্থানে
একবার যেন স্মরণ হয়৷
দাদি সারাদিনই তার ঘরের ভিতরেই থাকে৷ সারাদিন হাতে একটা সেলাই নিয়া থাকে, কোন সময় একটা কাঁথা তো কোন সময় ছেঁড়া কোন জামা ৷ আমি গেলে সসম্মানে পিড়া এগিয়ে দেয় বসার জন্যে ৷ আমি চুপ করে বসে থাকি দাদিদের ঘরে ৷ ওদের ঘরে কোন খাট-পালঙ নাই, ঘরের চারপাশে দড়ি টানানো আছে তাতে জামা কাপড় ঝোলে আর ঘরের কোনায় গুটিয়ে রাখা থাকে মাদুর, আর কিছু কাঁথা বালিশ ৷ কিছু কাঠের পিড়ি আছে নিজেও ওতেই বসে অর কেউ গেলে তাকেও পিড়ি পেতে দেয় বসার জন্যে ৷ দাদির ঘরের কোনায় ভাঙা কলসিতে খড়ের উপর বসে আছে এক মুর্গী ৷ যে ডিমে তা দিচ্ছে, দাদি বলেছে দুই সপ্তা হইয়া গ্যাসে আর এক সপ্তা গেলেই বাচ্চা লইয়া উঠব এই খুপাওয়ালা লাল মুর্গী ৷ তেরখানা ডিম নিয়ে বসেছে এবার এই লাল মুর্গী, দাদি খুব চিন্তায় আছে, কোন ডিম নষ্ট হয়ে যায় কি না সেই দুশ্চিন্তা ৷ প্রতিবারই নাকি দু-একটা ডিম নষ্ট হয়, ডিম ফুটে যখন বাচ্চা বেরোতে থাকে তখনও মুর্গী ডিমের উপরেই বসে থাকে, একটা একটা করে বাচ্চা সারাদিন ধরে বেরোয় ৷ কখনো লাফিয়ে লাফিয়ে এক আধটা কলসির বাইরে নিচে পড়ে গেলে দাদি গিয়ে তাকে আবার কলসিতে তুলে দেয় ৷ অর ঐ খোঁপাওয়ালা লাল মুর্গী তখন গরর গরর করতে থাকে, দাদি মুর্গিকেই বকে দ্যায়, ঐ চুপ কর! আন্ডা লইয়া তো বইয়া রইসস, ছানা যে নিচে পইড়া গ্যাসে খবর আসে নি? ওম না পাইয়া যদি মইরা যায় ছানা?? বকুনি খেয়েও মুর্গী চুপ করে না৷ গরর গরর করতেই থাকে৷ খানিক পর পরই দাদি এসে মুর্গীর ডানা ধরে তুলে দেখে, ক'টা ছানা বেরুলো ৷ সবকটা ডিম না ফোটা অব্দি দাদির শান্তি নেই ৷ দাদির ঘরে কোনায় এরকম আরও তিনখানা ভাঙা মাটির কলসি রাখা আছে, তাতে মুর্গীরা এসে ডিম পেড়ে রেখে যায় ৷ দাদি ঐ ডিম কাওকে খেতে দেয় না আর বিক্রীও করে না ৷ সে বাচ্চা ফোটাবে ঐ ডিম দিয়ে৷ ডিমে সে নিজেও হাত দেয় না আর অন্য কাওকেও ছুঁতেও দেয় না, ডিমে হাত দিলে কিংবা ছুঁলে 'ওম' ভেঙে যায়, তখন সেই ডিমে আর বাচ্চা ফুটবে না৷ ৷ ঐ ভাঙা কলসিগুলো সে ঢেকে রাখে কুলো দিয়ে ,মুর্গীর আসার সময় হলে কুলো সরিয়ে দেয় অর নিজে দোর আগলে বসে থাক কোন সময় দাদি কিসসা শোনায়৷ লস্কর বাড়ির কিসসা ৷ এই পাড়ার কিসসা ৷ গাঁওয়ের ভিতরের ছোড আরেক গাঁওয়ের কিসসা ৷

নজরুল ইসলামদের বাড়ির তিন চারটে বাড়ি পরেই কবরস্থান৷ জয়গাটাকে সবাই 'দখিন পাড়' বলে৷ এসামুদ্দিন মিঞার পুকুরের দক্ষিণ পারে ঐ কবরস্থান৷ বেশ চওড়া এক জায়গা সেটা ৷ বাঁশের ঝাড়ে ছেয়ে আছে গোটা কবরস্থান ৷ দিনের বেলায়ও গা ছমছম করে সেদিকে যেতে ৷ এসামুদ্দিন মিঞা মাষ্টার ছিলেন গ্রামের হাইস্কুলের ৷ বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে তিনি নাকি ছাত্র যোগাড় করতেন ৷ কেউ একদিন স্কুলে না গেলে সন্ধ্যেবেলায় তিনি তার বাড়ি পৌঁছে যেতেন, কেন সে স্কুলে গেল না খোঁজ নিতে ৷ এই পাড়ায় মেয়েদের নাকি স্কুলে পাঠানোর রেওয়াজ ছিল না, বলেন এসামুদ্দিন মাষ্টারের স্ত্রী, আমি যাকে বড়মা বলি ৷ তিনি বলেন,এই পাড়ায় আজ মেয়েরা স্কুলে যায়, স্কুল পাশ কইরা টাউনের কলেজে যায়, কেউ কেউ আবার গ্রামেরই স্কুলের মাষ্টারনি হয় সব তোর বড়বাপের লাইগা ৷ তোর বড় বাপে যদি মাইয়াগো স্কুলে পাঠানোর লাইগা চেষ্টা না করত, নিজে বাড়ি বাড়ি ঘুইরা মাইয়াগোরে ধইরা ধইরা ইশকুলে না পাঠাইতো তয় আইজও এই পাড়ার সব মাইয়া অশিক্ষিত মুর্খ থাকতো!

আমি এসামুদ্দিন মাষ্টারকে কোনদিন চোখে দেখিনি, তিনি মারা গেছেন বহু বছর আগে, কত বছর সেটাও বলতে পারেন না বড়মা ৷ ভুলে ভুলে যান৷ সাদা শাড়ি গিট দিয়ে কোমরে বেঁধে পরে থাকেন৷ গায়ে ব্লাউজও নেই৷ গেটে বাতে কাবু হয়ে বেশির ভাগ সময়েই মাটির মেঝেতে খড়ের উপর পাতা বিছানায় শুয়ে শুয়ে পুরনো দিনের গল্প করেন৷ ব্যাথা কম থাকলে ঢেকিতে ধান বানেন ৷ শোলার বেড়ার বাইরে থেকেই শোনা যায় ধেকিতে ধান বানার শব্দ ৷ আমি বুঝতে পারি বড়মার আজকে ব্যাথাটা কম ৷ এপাড়ায় চালকল নেই, ধান ভাঙাতে হলে নিয়ে যেতে হবে বাজারে ৷ আর বাজার বেশ দূরে, তার উপরে কখন সেই চালকলে কারেন্ট থাকবে সে কেউ জানে না ৷ রহিম আলি তাই ধান নিয়ে যেতে চায় না বাজারে ৷ বলে এই কয়ডা চাল তো ভাঙাইবেন, তার লেইগ্যা অত দূরে যামু আর ফিরত আমু কারেন্ট না থাকলে তার থেইক্যা বরং ঢেকিত কয়ডা পাড় দিয়া বাইন্যা ফেলাইন ধানডা! আমি দিয়া দিমু নে ঢেকিত পাড়৷ কিন্তু ঢেকিতে পাড় দেওয়ার জন্যে রহিম আলিকে খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ তাই বড়মা ঠুক ঠুক ধান বানেন (ধান ভেঙে চাল করা) সকাল থেকে ৷ ধান বানা হলে সেই চালে ভাত রাঁধবে নুরুন্নাহার ৷ নুরুন্নাহার বড়মার মেয়ে ৷ একবার সে পাগল হয়ে গিয়েছিল তাই তাকে আর শ্বশুরবাড়িতে নেয় না ৷ নুরুন্নাহার ফুফু তাই বাপের বাড়িতেই থাকে ৷ বড়মা বলে নুরুন্নাহার ফুফু এখন নাকি আর পাগল নয় শুধু মাঝে মাঝে একটু মাথার গন্ডগোল হয় ৷ তখন সে কাওকে চিনতে পারে না, নিজের মাকেও নয়, সারাদিন শুধু লাভলি লাভলি বলে চীত্কার করে কাঁদে ৷ লাভলি নুরুন্নাহার ফুফুর মেয়ে ৷ শ্বশুর বাড়ির লোকেরা পাগল বলে বৌকে বাপের বাড়ি ফেরত পাঠিয়েছে কিন্তু ছোট্ট লাভলিকে তারা দেয়নি ৷ বড়মা বলে, মেয়ে কাছে থাকলে নাকি নুরুন্নাহার ফুফুর মাথাও খারাপ হত না৷ লাভলিকে তোমরা লইয়া আসো না ক্যান বড়মা? বড়মা বলে, তারা দিব কিয়ের লাইগ্যা? আমার পুড়া কপাল, মাইয়াডার মাথায় দোষ পড়লো, নইলে সোনার সংসার আসিল নুরুন্নাহারের ৷ সোনার সংসার কাকে বলে ভেবে না পেয়ে আমি চুপ করে থাকি ৷

বড়মার দুই ছেলেই শহরে থাকে৷ রফিক কাকা ওষুধের কোম্পানিতে চাকরী করে আর শফিক কাকা কলেজে পড়ে ৷ আমি বড়মাকে বলি, তুমি শহরে চইলা যাও না ক্যান কাকাগো কাছে? বড়মা বলে, রফিকের বেতন যে বড় কম, শফিকের কলেজের পড়া, বাসা খরচ এর পরে আমরা যদি যাই তো সংসার ক্যামনে চলব? বাড়িত থাকলে তো রহিম আলিরে দিয়া ক্ষেতের কাম করাই তো বছর ভরা চাল কিনা লাগে না খালি আনাজ-তরকারি কিনা, তাও বেদনা কম থাকলে আমি নিজে মাচা বাইন্ধ্যা শিম, লাউ, কুমড়ার গাছ তুইলা দেই ৷ বেশির ভাগ দিনেই মাচার লাউ, কুমড়ো রান্না করে নুরুন্নাহার ফুফু ৷ মাঝে মাঝে নুরুন্নাহার ফুফু পুকুর থেকে তুলে আনে কলমি শাক, কোনদিন বা পুকুরের ঢাল থেকে বেছে বেছে তুলে হাইসা শাক ৷ যেদিন তার মাথা গরম হয় সেদিন সে সারাদিন কাঁদে মেয়ের জন্যে ৷ সেদিন আর রান্না হয় না বড়মার ৷

পুকুরের ঠিক দক্ষিণপারে কবরস্থানের গায়ে গায়ে সখিনাদের বাড়ি ৷ সখিনা মইজুদ্দিন লস্করের মেয়ে৷ মাইজুদ্দিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠায়নি, পাকা চুল আর মুখভর্তি পাকা দাড়ির হাসন আলিকে ঘরজামাই করে বাড়িতে এনে রেখেছে৷ হাসন আলি জন খাটে ৷ ফসল বোনার সময় সে রোজ কাজ পায়, আবার ধান কাটার সময়েও তার কাজ থকে, কিন্তু বছরের বেশ অনেকটা সময় হাসন আলি বেকার থাকে ৷ তখন সে বাড়ির উঠোনে বসে ফুড়ুত্ ফুড়ুত্ হুকো টানে৷ মইজুদ্দিন বুড়ো সারাদিন উঠোনে বসে বাঁশ চেঁচে চেঁচে বেত বানায়৷ সখিনা সেই বেতে চাটাই বোনে, গোলা বানায় ৷ ধানের গোলা ৷ সখিনা যাকে বলে 'টাইল'৷ সখিনার বানানো এই টাইল বেশি বড় নয়, মাঝারি আকারের সব টাইল৷ হাসন আলি সেই চাটাই, টাইল নিয়ে সপ্তায় দু'দিন দূরের হাটে যায়৷ একদিন চান্দুরা তো আরেকদিন জলসত্বর ৷ সি এন্ড বি'র বড় সড়ক ধরে গেলে গ্রামের ডানদিকে জলসত্বর আর বাঁদিকে চান্দুরা ৷ সপ্তাহে দু দিন করে ওখানে বড় হাট বসে, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে, কেউ বিক্রী কিরতে তো কেউ কিনতে ৷ বুড়ো হাসন আলি বাঁশের ভারার দুদিকে সখিনার বোনা ধানের গোলা, চাটাই বিক্রী কিরতে নিয়ে যায় ৷ সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে সেদিন সে, কারন তাকে তো হাটে হেঁটেই পৌছুতে হবে, ঐ গোলা সমেত কোন গাড়ি তাকে তুলবে না, কাঁধে ঝোলানো ধানের গোলা নিয়ে দুলতে দুলতে হাঁটে বুড়ো হাসন আলি ৷ সখিনাদের বাড়িতে কোন বেড়া বা আড়াল নেই ৷ বাড়ির পেছনে কবরস্থানের বাঁশের ঝাড় শুরু হয়েছে সখিনার ঘরের ঠিক পেছন থেকে৷ দু'খানা খড়ের ঘর, একটাতে থাকে বুড়ো মইজুদ্দিন আর অন্যটাতে সখিনা ৷ মইজুদ্দিনকে ভয় পায় না এমন ছেলে-পুলে এপাড়ায় অন্তত নেই ৷ কবরস্থানের ওপারের পূবপাড়ায় যাওয়ার শর্টকাট রাস্তা মইজুদ্দিনের উঠোনের উপর দিয়েই৷ উত্তরগাঁওয়ের প্রাথমিক স্কুল কবরস্থান পেরিয়ে পূবহাটিতে ৷ এই পাড়ার সব ছেলে-মেয়েরাই স্কুলে যায় সখিনাদের বাড়ির উপর দিয়ে ৷ মইজুদ্দিন বেশির ভাগ সময়েই চুপ করে থাকে কিন্তু যখনই কোন ছেলে-মেয়ে তার তোলা বেতের উপরে পা রাখে তখনই সে তাদের হাতের ঐ কাটারি নিয়েই তাড়া করে, ঘরের ভিতর থেকে সখিনা চেঁচায়, বাপজান ও বাপজান, এইবার ক্ষ্যামা দ্যাও না! আর কত চেল্লাই বা ঐ পুলাপানেগো লগে? মইজুদ্দিন গজগজ করতে করতে আবার বাঁশ চেঁচে বেত তুলতে বসে৷ আমি ভেবে পাই না, যে মইজুদ্দিনের সাথে কেউ কথা পর্যন্ত বলে না ভয়ে, সেই মইজুদ্দিননকে সখিনা কি রকম বকুনি দেয় আর মইজুদ্দিনও মেয়ের বকুনি খেয়ে চুপ করে যায়, শান্ত হয়ে বসে কাজ করতে ৷

সখিনা ছাগল পোষে ৷ ছোট দুটো বাচ্চা সহ একটা ছাগল৷ সখিনা যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ঐ ছাগল তিনটে বাঁধা থাকে তার একচালা রান্নাঘরের পাশে৷ আর সুযোগ পেলেই সে তার ছাগল এনে আমাদের পুকুর পারে ছেড়ে দিয়ে যায়৷ ছাগলগুলো ইচ্ছে মতন ছোট গাছগুলোকে মুড়িয়ে দেয়, বড়কাকা কতবার রাগ করেছে সখিনার পরে৷ বারণ করেছে ছাগল যেন পুকুরপারে না ছাড়ে, সখিনা চুপ করে শোনে আর ছাগল নিয়ে চলে যায় কিন্তু পরদিনই আবার ছাগল ছেড়ে দিয়ে যায় পুকুরপারে৷ বড়কাকা বলে রেখেছে এবারে যেন ছাগল এনে বাড়িতে বেঁধে রাখা হয় অর সখিনা ছাগল চাইতে এলে যেন না দেওয়া হয় ৷ আমি মনের আনন্দে পরদিন ছাগল ধরে এনে উঠোনের ছোট আমগাছে বেঁধে রাখলাম ৷ কিন্ত কাকা বাড়ি আসার আগেই কখন যে সখিনা এসে ছাগল ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে টেরটিও পাই নি ৷



(চলবে)
শারদীয়া মৈত্রেয়ী ২০০৬ -তে প্রকাশিত
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718950 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718950 2007-07-02 21:20:55
'দৃষ্টিতে আর হয় না সৃষ্টি আগের মত গোলাপ ফুল শুধু এই গানটার জন্যে খুঁজে ফেলেছি প্রায় সব ক'টা ওয়েবসাইট, পাইনি কোথাও।

কারো কাছে আছে কি ফিরোজা বেগম'এর
'দৃষ্টিতে আর হয় না সৃষ্টি আগের মত গোলাপ ফুল
কথায় সুরের ফুল ফোটাতাম হয় না এখন আর সে ভুল'

কারো কাছে থাকলে তুলে দেন না প্লিজ। কিংবা কোথায় পাওয়া যাবে তার সন্ধান।

আগাম ধন্যবাদ।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718509 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718509 2007-06-29 22:32:14
এখানে এখন ঘনঘোর বর্ষা
আকাশের কোণে কালো মেঘ জমেই আছে, যখন খুশি গোটা আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে আর ঝমঝম বৃষ্টি নামিয়ে দিচ্ছে গাছের পাতায়, পুকুরের জলে, বাড়ির ছাদে,জামডালে বসে থাকা কালো কোকিলের পরে। ভিজে কাক কোকিল মাঝে মাঝেই কুউ উ উ বলে ডাক ছাড়ছে তারপর আবার বসে ভিজছে... লালরঙা চোখ মেলে তাকিয়ে এদিক ওদিক পানে কি যেন খোঁজে আর ঝিমোয়...

ভিজে জামা কাপড় ডাই হয় ঘরের একোণে, ওকোণে। মাঝে মাঝে একটুশখানি রোদ ঝিকমিকিয়ে ওঠে, আমি ঝটপট জামা কাপড় শুকোতে দিই, জানালা দিয়ে আকাশ দেখি আর দিনদুপুরে গান শুনি, শাওন রাতে যদি...

এখন এই ভরসন্ধ্যেবেলা পশ্চিমের আকাশটা লালে লাল। দূরে দূরান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মেঘেরাও গায়ে মেখেছে সূর্যাস্তের এই লাল। কাছের মেঘেরা মুখ কালো করেই আছে আর কি জানি কি এক অজানা কারণে তারা কালো করে দিতে চাইছে দূরের ঐ লাল মেঘেদেরও! সোঁ সোঁ উতল হাওয়ায় যেন নেচে বেড়াচ্ছে কাছে-দূরের উঁচু নারকোল গাছেরা। মাঝে মাঝে জোর বাতাস এলে এমন নুয়ে পড়ছে যে দেখলে ভয় হয়, মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়ল বলে!

পানকৌড়িদের বেশ মজা এই বর্ষায়। তারা বেশ এপুকুর ওপুকুরে করে বেড়ায় উড়ে উড়ে। মাঝে মাঝেই ডুবসাঁতার দেয় দুটিতে, খানিক পর ভেসে ওঠে ইতিউতি তাকায় আর আবার ডুবকি। পাশের জমিতে কাজ করতে থাকা রাজমিস্ত্রিদের থোড়াই কেয়ার করে তারা!

পেছনের তিনখানা পুকুরই টইটুম্বুর হয়ে যায় খানিক বৃষ্টির জলে। আর টানা বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, এই পুকুরের জল পাড় ডিঙিয়ে মিতালী পাতায় ঐ পুকুরের জলের সাথে। পাথর ফেলে করা ঐ ঘাট ডুবে যায়। জল থইথই পাশের এই খালি পড়ে থাকা এক চিলতে জমি।

বর্ষার চাঁদ কী ভীষণ উজ্জল। বৃষ্টি কমতেই সে দেখা দেয় মেঘের ফাঁক দিয়ে। একটু দূরেই জ্বলজ্বল করে সন্ধ্যেতারা, যেন সঙ্গ দেয় চাঁদকে। মেঘেরা ঘুরে বেড়ায় ইতিউতি। হয়তো এখুনি ঢেকে যাবে এই চাঁদ সন্ধ্যেতারাকে সঙ্গে নিয়ে তবু যতক্ষণ সে আছে, ঝকমকিয়ে আছে... ঝলমলিয়ে আছে...






]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718487 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28718487 2007-06-29 20:11:39
মৃদু মন্দে মন্দারমণি - শেষভাগ গাঢ় লাল হাফ ইটের দেওয়ালের উপর গাঢ় সবুজ দরমার বেড়া আর মাথায় সাদা অ্যাসবেষ্টাসের চাল দেওয়া এই কটেজগুলির পোষাকী নাম গার্ডেন রিট্রিট ৷ কালো কাঁচের জানালাগুলোর ধারগুলো সবুজে রাঙানো ৷ কালো কাঁচের মাথা নিচু দরজা আর দুটো করে জানালা ৷ ঘরের ভিতরে ঢুকতেই দেখা গেল নীল আর সাদা চৌকো চৌকো খোপকাটা ছাপওয়ালা স্যাটিন কাপড়ের চাঁদোয়া টাঙানো অ্যাসবেষ্টাসের নিচে ৷ আধো আধো আলো আঁধারির খেলা সেখানে ৷ লাল, সবুজ, নীল আর সাদা র ংসাথে কালো কাচের দরজা জানালা৷ সব মিলে মিশে সৃষ্টি করেছে এক অদ্ভুত রঙ্গ ৷ গরমটাকে উপেক্ষা করতে পারলে শুধু এই রংএর খেলা দেখেই হয়ত কাটিয়ে দেওয়া যেত একটি বেলা ৷ কিন্তু না ৷ এই গরমকে উপেক্ষা করা গেল না কিছুতেই৷ আসবাব বলতে এক প্রশস্ত বিছানা, ছোট একখানি সাইড টেবল, কাঁচের আর দু'খানি প্লাষ্টিকের চেয়ার ৷ জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে চোখে পড়ে এক মরা বেগুনের বাগান ৷ এবড়ো-খেবড়ো শুকনো ধুলোময় বালুমাটিতে বাগানসুদ্ধু গাছগুলো মরা ৷ দাঁড়িয়ে আছে কে জানে কার, কিসের সাক্ষী হয়ে ৷ কাদের এই বাগান? এই কটেজ মালিকেরই কি? এখানকার এই কটেজের ব্যবসা দেখতে দেখতে কারও একটুও হয়ত সময় হয়নি ঐ গাছেদের গোড়ায় একটু জল দেওয়ার ৷ শুকিয়ে গেছে তাই এক বাগানভর্তি বেগুনগাছ! মরা বেগুনের বাগানের পাশেই সবুজ পত্রবহুল এক নিমগাছ৷ কী অদ্ভুত!

মন্দারমণিতে এখনও বিদ্যুত্ পৌঁছোয়নি ৷ তাতে কি? জেনারেটর আছে কী করতে৷ হোটেল, কটেজ সবই চলে জেনারটরে ৷ নামমাত্র খরচে যে যেভাবে পারে কটেজ তুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে সেখানে ব্যবসা করতে৷ দরমার বেড়া, অ্যাসবেষ্টাসের চালের মাথা নিচু সেই সব কটেজে ঢুকলে জাহান্নামের আগুনের আঁচ খানিকটা টের পাওয়া যায় ৷ জেনারেটরে চলা পাখার বাতাস যেন আগুন ছড়ায় সেই কটেজে ৷ যারা চার অংকে বিল মেটাতে পারবেন তাঁরা ওঠেন রোজভ্যালীর চারতারা হোটেলে, সেখানে ঘরগুলো তাপানুকূল ৷ আমাদের মত পাতি মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সম্বল ঐ জাহান্নামসম কটেজ ৷

সেখানে করে খাচ্ছেন এখন বেশ কিছু মানুষ ৷ কেউ বা দিয়েছেন বিস্কুট, সফট ড্রিংকস, চিপসের দোকান তো কেউ কিনেছেন গাড়ি৷ মারুতী ভ্যান, টাটাসুমো নিদেনপক্ষে একটি অ্যাম্বাসেডর ৷ গাড়ি কেনার টাকা এসেছে ফসলী জমি বিক্রী করে ৷ সেইসব জমি আবার কিনে সেখানে ঢালাও চলছে মাছের ব্যবসা ৷ তৈরিই হয়েছে সব ভেড়ি৷ বাগদা, পোনা, তেলাপিয়ারা সেখানে বড় হয় মানুষের দেওয়া খাবার খেয়ে ৷ জমি বিক্রী করে যাঁরা গাড়ি কিনেছেন তাঁরাও ভালই করে খাচ্ছেন৷ দশ কিলোমিটার মতন রাস্তা কলকাতা দীঘা মহাসড়ক থেকে৷ যেতে হয় চাউলখোলায় নেমে৷ ট্রেকার আর ইঞ্জিনচালিত ভ্যানরিক্সা ছাড়া যাতায়াতের একমাত্র সম্বল এই গাড়িগুলি ৷ চড়া ভাড়ায় দল বেঁধে মানুষ চাপেন এই গাড়িগুলোতে ৷ হোটেল, কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন গাড়ির মালিকেরা গাড়ি নিয়ে ৷ বেড়াতে আসা যাত্রীদের পৌঁছে দিয়ে আসেন এঁরা কাঁথি, জুনপুট, দীঘা ৷ দশ কিলোমিটার দূরের চাউলখোলায় যেতে একটি মারুতী ভ্যান ভাড়া নেয় দুশো পঞ্চাশ টাকা, কাঁথি নিয়ে গেলে নেয় সাড়ে চারশো টাকা ৷ যাঁরা ফোন করে হোটেল-কটেজ বুক করে আসেন, তাঁরা চাইলে এই সব গাড়িগুলো এসে তাঁদের নিয়ে যায় কাঁথি, জুনপুট কিংবা দীঘা থেকে৷ ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো রাস্তার ঝাঁকুনি কিংবা ধুলো থেকে অনেকটাই বাঁচিয়ে দেয় এই গাড়ি৷ গরমের কথা বলাই বাহুল্য ৷

অনেকেই একবেলার জন্যে এসে ঘুরে যান এই মন্দারমণিতে ৷ গাড়ি করে সকাল সকাল এসে ঘুরে বেড়িয়ে, সমুদ্রস্নান করে আবার ফিরে যাওয়া জুনপুট, দীঘা কিংবা কলকাতায় ৷ চমত্কার দীর্ঘ সৈকত, প্রবল গর্জনে আছড়ে পড়া সমুদ্র আর দূরে বিস্তৃত নারকেল বন৷ একটু নীরবতা প্রার্থীদের বেড়াতে আসার জন্যে আদর্শ স্থান৷ সাথে গাড়ি থাকলে ঘুরে আসা যায় আঠেরো কিলোমিটার লম্বা এই বিচ, যার সাথে সাথেই এগিয়েছে নারকেলের বনও৷ গাড়ি না থাকলে চুপটি করে বসে পড়া যায় কোথাও একটা জায়গা দেখে নিয়ে ৷ তবে যাঁরা রাত্রিবাস করবেন না তাঁদের এখানে বেলা বেশি না করাটাই শ্রেয় ৷ নইলে মিস করতে হতে পারে কলকাতা ফেরার সাড়ে চারটের লাষ্ট বাসটি ৷ যেমন আমরা করেছিলাম ৷ তারপর? একটি বাসের অপেক্ষায় হা পিত্যেশ! মেচেদা, হলদিয়া৷ যাহোক কিছু একটা ! সময় বুঝে আকাশের কোণে জমে ওঠে ঘন মেঘ, ঘন কালো ৷ দেখতে দেখতেই তা ছড়িয়ে যায় গোটা আকাশে , দেয় গুরুগম্ভীর ডাক আর নেমে আসে অঝোর বৃষ্টি৷ রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকা, টিনের চাল ভেদ করে মাথায় বৃষ্টির ফোটারা এসে পড়ে টুপটাপ টুপটাপ৷ কিছুই না পেয়ে অগত্যা উল্টো দিকের বাস ধরে যেতে হবে দীঘায় আর যাওয়ার আগে অবশ্যই মনে মনে একটা হিসেব করে নিতে হবে, হাতে এক্সট্রা সময় আর পয়সাকড়ি আছে তো!

মফিজুল৷ মারুতী ভ্যানের মালিক ৷ নিজেই গাড়ি চালিয়ে পর্যটকদের নিয়া আসা যাওয়া করে, কাঁথি, জুনপুট, দীঘা ৷ আবার ফিরে আসে মন্দারমণি৷ মফিজুলের বাড়ি সোনামুই'তে৷ গ্রামের নামটি কি সোনামুখী? না না ৷ সোনামুখী নয়, সোনামুই! মফিজুলদের একসম বিঘা তিরিশ জমি ছিল ৷ সম্পন্ন চাষী পরিবার৷ কিন্তু এখন আর নেই সেই জমি ৷ সমুদ্র খেয়ে নিয়েছে ওদের চাষের জমি ৷ এখনও খানিকটা বেঁচে আছে৷ বিঘে দশ মতন৷ তবে এও যেতে পারে সাগরের পেটে যে কোন সময় ৷ সময় থাকতে মফিজুল তাই বেঁচে থাকা জমিটুকু বিক্রী করে দিয়েছে মাছের ব্যবসা করতে আসা একজনের কাছে, সেই টাকায় মফিজুল কিনেছে এই গাড়ি আর একটি ট্রাক্টর ৷ গাড়িটি সে নিজেই চালায় ৷ ট্রাক্টর ভাড়ায় খাটে৷ যাত্রীর আশায় মফিজুল যখন দাঁড়িয়ে থাকে কটেজের সামনে তখন পরম মমতায় পালকের ঝাড়ন দিয়ে ধুলো ঝাড়ে গাড়ির গা থেকে ৷ নরম কাপড় দিয়ে মুছে মুছে চকচকে করে তোলে সে তার গাড়ির শরীর৷ মফিজুলদের গ্রামে এখনও বিদ্যুত্ যায়নি ৷ মন্দারমণি থেকে মাইল পাঁচেক দূরে বিদ্যুত্এর শেষ খুঁটিটি দাঁড়িয়ে আছে ৷ এরপরে আর কবে এগোবে তা মফিজুল জানে না৷ তবে এগোবে এটুকু জানে৷ কারণ, যেভাবে বাইরের মানুষ মন্দারমণিতে আসছে, মাছের ব্যবসা, হোটেলব্যবসা করছে, তাদের নিজেদের তাগিদেই তারা বিদ্যুত্এর জন্যে দৌড়-ঝাঁপ করবে আর আলো নিয়ে আসবে এটা মফিজুলের বিশ্বাস ৷

-:-]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28716755 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28716755 2007-06-20 13:07:06
মৃদু মন্দে মন্দারমণি
ছোট বড় নানা সাইজের নানা আকারের অজস্র অজস্র ঝিনুক ছড়িয়ে আছে সৈকতে৷ কুড়িয়ে নেওয়ার কেউ নেই৷ প্রতিটি ঢেউএর সাথেই আসছে আরও ঝিনুক৷ ছোট্ট নুড়ির মত দেখতে আস্ত ঝিনুকও দেখলাম কিছু কিন্তু অ্যাত্ত নরম! হাতে নেওয়ামাত্রই সেগুলো ভেঙে যায়৷ সৈকতে যদ্দূর ঢেউ আছড়ে পড়ছে, তদ্দূর অব্দি বালি ঠান্ডা, ভেজা ভেজা৷ আর তারপরেই শুকনো তপ্ত বালি৷ খালি পা রাখতেই মনে হল যেন ফোস্কা পড়ল পায়ে! এই তপ্ত বালিতেও কিছু মানুষ বসে আছেন৷ কেউ বা বেড়াতে এসেছেন, কেউ বা ওখানকারই লোক৷ দুজন মানুষকে দেখলাম খানিকটা বালি সরিয়ে তাতে প্লাষ্টিক বিছিয়ে জল ঢেলে দিয়েছেন দু-তিন গামলা৷ ছোট্ট, খুব ছোট্ট এক পুকুর যেন! তাতে কিলবিল কিলবিল করছে ভীষণ ছোট্ট সব মাছ, ইঞ্চিখানেক লম্বা সাপ৷ মানুষটি বসে বসে কিছু একটা বেছে আলাদা করছেন আর সেই আলাদা করে তুলে রাখা অতি ক্ষুদ্র মাছগুলি তুলে রাখছেন পাশেই রাখা প্লাস্টিকের গামলাভর্তি জলে৷ খানিক দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেও বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করব ভেবেও কিছু বললাম না, একাগ্র মানুষটির মনযোগ নষ্ট করতে মন চাইল না বলে৷ ডাবওয়ালারা ভিজে গামছা গায়ে মাথায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে গরম বালিতে৷ বিচের দিকে এগুনো যে কোন মানুষকে দেখেই এগিয়ে আসছে তারা সাইকেল নিয়ে, ডাব খান বাবু ডাব৷ ডাব খাবেন না? তবে বিয়ার খান! তোমরা বিয়ারও রাখো নাকি? জানতে চাইলে জবাব এলো, হ্যা ঁদিদি, রাখি৷ যা চান সবই পাবেন! কি চাই বলুন!

চারিদিকে তাকিয়ে দেখি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বেশ কিছু মানুষ৷ কেউ বসে আছেন একেবারে জলের ধারটি ঘেঁষে, কোলে একেবারেই ছোট বাচ্চা৷ কর্তা গিন্নি দুজনেই জলের ধারে বসে আছেন৷ ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলে যেটুকু স্নান হয় ওটুকুতেই তারা খুশি৷ স্কুলপড়ুয়া তিনটি ছেলে নেমে গেছে অনেকটা জলে৷ ঢেউএর সাথে সাথে ওরা ডুবছে ভাসছে৷ মাঝে মাঝে দেখাও যাচ্ছে না ওদের৷ আবার দেখা যায়, ঐ যে! ওরা লাফাচ্ছে! আমার মনে হল, এভাবেই তো সমুদ্রে স্নান করতে এসে ডুবে যায় অনেকে৷ মাঝে মাঝেই খবরের কাগজে থাকে সেই সব খবর৷ কিন্তু ঐ বাচ্চাগুলোর কোনদিকে কোন খেয়াল নেই৷ বিশাল উঁচু উঁচু ঢেউএর মাথায় চেপে চেপে তার চলে যাচ্ছে দূরে আরও দূরে!

একটু উঁচু জায়গায় চটি রেখে এগিয়ে যাই জলের দিকে৷ ঝিনুক কোড়োতে কুড়োতে৷ দু'হাত ভরে ওঠে নিমেষেই৷ এত ঝিনুক এতো এতো ঝিনুক! এক সময় মনে হয় থাক, কী হবে! ক'টা ঝিনুক আমি সাজিয়ে রাখব? থাক ওরা এখানেই৷ সমুদ্র এখানে খুব কাছে ডাঙা থেকে৷ খুব খুব কাছে৷ বিছিয়ে আছে এক সাগর জল নিয়ে৷ শুয়ে আছে৷ ঘোলাটে জল নিয়ে ধুসর সমুদ্র বিছিয়ে আছে দৃষ্টিসীমার বাইরে অব্দি৷ এই সমুদ্রকে, এই বিছিয়ে থাকা বিস্তীর্ণ জলরাশিকে এখানে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়৷ সত্যি সত্যিই ছোঁয়া যায়! হাতে নেওয়া যায় আঁজলাভর্তি জল৷ যদিও নিমেষেই আবার তা গড়িয়ে নেমে যায় সাগরেই! একমুঠো বালি তুলে আনি আমি জলের ভেতর থেকে, মুঠো খোলার আগেই বালি নেমে যায় জলের সাথে ৷ আমি দেখতে পাই আমার হাতে ছোট্ট এক নুড়ি আর একটা ছোট্ট ঝিনুক, জ্যান্ত! আমি ওকে আবার জলেই ফিরিয়ে দিই, নুড়িটিকেও ৷ এই সমুদ্র গায়ে মেখে জলপরী হওয়া যায়৷ ঢেউ ভেঙে ভেঙে যদিও খুব বেশিদূর এগুতে পারি না আমি৷ ঢেউ আমাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসে ডাঙায়, যেন ফিরিয়ে দিয়ে যায় ৷ যেন বলে, ওরে কোথায় যাচ্ছিস, ডুবে যাবি যে! নোনা জলে জ্বালা করে ওঠে চোখ ৷


ছোট ছোট চারটি গ্রাম নিয়ে এই মন্দারমণি ৷ দাদনপাত্রবার, সোনামুই, মন্দারমণি ( চতুর্থ গ্রামের নামটি ভুলে গেছি)৷ পাশাপাশি ছোট্ট ছোট্ট সব গ্রাম, আগে সমুদ্রের কাছে ছিলনা বোধহয় এখন বেশীর্ভগ্টাই সমুদ্রে অল্প একটু অংশ পড়ে আছে বাইরে, তাও ক'দিন আছে বলা যায় না৷ সমুদ্রতীরবর্তী সব গ্রামে ছিল নোনা জলের ভেড়ি৷ "রোজভ্যালী'র মালিকেরা মন্দারমণিতে মাছের ব্যবসা করতে গেছিলেন বছর পাঁচেক আগে৷ সস্তার জমি কিনে মাছের ভেড়ি করলেন তারা৷ একটি দুটি ঘর তৈরী হল একটি গেষ্টহাউস মতন৷ যেখানে মাছ কিনতে আসা লোকজন এসে রাত্রিযাপন করতেন৷ সৈকতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদেরও নিয়ে আসতে লাগলেন৷ ঘর বাড়তে লাগল গেষ্টহাউসের আর কিছুদিনের মধ্যেই সেই গেষ্টহাউস রূপ নিল এক চারতারা হোটেলের৷ সমুদ্রের একেবারে ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে সেই হোটেল৷ মাছের ব্যবসা করতে আসা রোজভ্যালী সেখানে শুরু করল হোটেলব্যবসা৷ দেখাদেখি সেখানে দাঁড়িয়ে গেল আরও কিছু হোটেল, কটেজ৷ রমরমা ব্যবসা৷ কোন হোটেলে, কটেজে একটি ঘরও খালি থাকে না সেখানে এখন জানাল গার্ডেন রিট্রিট নামের রঙচঙে কটেজের কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার বিশুবাবু৷

পাঁচখানা ঘর নিয়ে পাঁচমাস আগে হয়েছে এই গার্ডেন রিট্রিট কটেজ৷ রাস্তার ধারে খনিকটা জায়গা গোল করে ঘিরে নিয়ে মাথায় খড়ের ছাউনি দিয়ে রিসেপশন কাম সিটিংপ্লেস৷ পাশেই একটা লম্বাটে ঘরমত জায়গা, তারও মাথায় খড়েরই ছউনি৷ চারপাশ আদ্ধেকটা ঘেরা৷ কাঠের খুঁটির উপরে দাঁড়িয়ে আছে এই খাওয়ার ঘরের ছাউনি৷ খাওয়ার ঘরের পাশেই ডানধার ধরে একের পর এক ছোট ছোট এক কামরার ঘর, কটেজ৷ সাথে একফালি বাথরুম৷ সারি দিয়ে একের পর এক ঘর, শেষমাথার ঘরখানিতে আমরা ঠাঁই নিয়েছিলাম একবেলার জন্যে৷ এই ঘরের পেছনে কাজ চলছে আরও পাঁচখানি ঘরের৷ তবে এই ঘরগুলি ইটের৷ কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, লাল ইটের ঘরগুলি প্রায় তৈরী ৷



(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28716650 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28716650 2007-06-19 18:55:31
হোম ভায়োলেন্স ও এক প্রতিবাদী নারীর কথা
সরকার বাহাদুর আইন করসে, আইন পাস ও হইয়া গেসে বহুদিন হইল। কিন্তু কথা হইল, কয়টা কেইস এই পর্যন্ত ফাইল হইসে? তাইলে কি সম্সত হোম ভায়োলেন্স থাইমা গেল কেইসের ডরে? থামে নাই যে হেইডা একটা দুধের শিশুও জানে। ত্য় এত সুবিধা দেওয়া সত্বেও কেন মহিলারা কেইস করে না? যেখানে ৩দিনের মধ্যে শুনানি হইব?

এই জায়গায় আসে নারীগো আর্থ-সামাজিক নিরাপত্বার প্রশ্ন। কেইস নাহয় ঠুইকা দিল কিন্তু এরপরে? সরকারে নাহয় কিসু উত্তম মধ্যমও দিল জামাইয়েরে ধইরা নিয়া। একখান ফায়সালাও শুনাইয়া দিল কিন্তু তারপরে? সাংসারিক শান্তির (???!!!) কি হইব? কই যাইব হেই নারী পোলাপান লইয়া? বাপের বাড়ি? ভুইলা যান! এই কেইস, কোর্ট কাচারীর পরে যে আর একলগে থাকন যায় না হেইডা তো হগ্গলেই জানে। তাইলে যাইব কই হেই মাইয়া?

কিন্তু এক মহিলা বিয়ার ১৭বছর পরে এই দু:সাহস ( পড়েন সত্তসাহস) দেখাইসেন ( সেলাম, লাল সেলাম)। ঘরে তাঁর তিনখান পোলা মাইয়া। বড় পোলায় মাধ্যমিক দিব। তাঁর অভিযোগ : স্বামীর অস্বাভাবিক যৌন ক্ষিদা সে আর মিটাইতে পারতেসে না, রাজী ও না। ছেলে-মেয়ে বড় হইসে, তাগো সামনেও যখন তখন মরদে চড়াও হয়, সুখ-অসুখ মানে না, পোলাপান মানে না এমনকি মাসিক ও মানে না। আর বৌএ রাজী না হইলেই দে মাইর দে মাইর। মহিলা এর আগেও চেষ্টা করসেন যেন এই অত্যাচার বন্ধ করতে পারেন কিন্তু পারেন নাই। শেষমেষ নারী কমিশনের দ্বারস্থ হন আর এই ঘাট ঐ ঘাটের পানি খাইয়া এক সহৃদয় উকিলের সাহায্যে কেইস ফাইল করেন। এই আইন পাস হওনের পরে এই প্রথম কেইস হোম ভায়োলেন্সের। কাজেই কাগজের হেডলাইন হইল এই খবর। তিনদিনের মধ্যে শুনানির হুকুম। মহিলা ডাইভোর্সেরও আবেদন করলেন একই সাথে।

এই মহিলার নিজস্ব কোন রোজগার নাই মানে ইনি একজন গৃহিনী। ঘর সংসারেই নিজের জীবন কাটাইসেন। ছেলে মেয়েও এখনও পর্যন্ত দাঁড়ায় নাই কেউ যে মায়ের ভরন-পোষণের দায় নিতে পারে। তবুও মহিলা সাহস করে, ভবিষ্যতের চিন্তা না করে প্রকাশের আলোয় নিয়ে আসেন তাঁর স্বামীর অত্যাচারের কাহিনী।

শেষ পর্যন্ত কি হইসে আমি জানি না। মহিলাটি সুবিচার পেলেন কিনা, অত্যাচারী স্বামীর কি হইল কাগজওয়ালারা আর জানানোর প্রয়োজন মনে করেন নাই ( আমার চোখে অন্তত পড়ে নাই) । আশা করি ইনি সুবিচার পাইসেন। তাঁর ভবিষ্যত যেন সুন্দর হয় এই প্রার্থনা আন্তরিক। সুখে না থাকুন শান্তিতে যেন থাকেন এই প্রতিবাদী নারী।

কথা হইল তাইলে কি এই একজন নারীই অত্যাচারিত হচ্ছিলেন? আর্থ-সামাজিক ভাবে কমপ্লিটলি স্বাবলম্বি কিছু নারীকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, যাঁরা স্বামীর বিবাহ ভির্ভূত সম্পর্ককেও চুপাচাপ মেনে নেন আর এক সুখী দম্পতি হওয়ার অভিনয় অহরহ করে যান। কেন? কেন করেন তাঁরা এরকম?


আচ্ছা, পুরনো কোন কেইস কি নতুন করে খোলা যায়?

যে নারীর কথা এইমাত্র বললাম, এইরকমই অত্যাচারিত কোন নারী, যে এর চাইতেও অনেক অনেক বেশি অত্যাচার সহ্য করে শেষমেষ একা হয়ে যান স্বামীকতৃক তালাক পেয়ে? সেও মিথ্যা অভিযোগে? তাঁর কোন সহায় সম্বল ছিল না। পরামর্শ দেওয়ার মত কেউ ছিল না। চুপচাপ পড়ে পড়ে শুধু মার খেয়েছে, যৌন নিপিড়ন সয়েছে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। সহ্য করেছে স্বামীর একাধিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক। সেই লোকটা এখন দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে লম্বা দাড়ি নিয়ে। পাঁচবেলা মসজিদে যায়, নামাজ পড়ে। হজ্জ্বও সম্পাদন করে এসেছে। কাজেই সব পাপ ধুয়ে মুছে গেছে তার। বালিকা বধূ ঘরে এসেছে আবার পঞ্চাশোর্ধ সেই হাজী সাহেবের। বিনা বিচারে অবাধে ঘুরে বেড়াবে সে একটা মেয়ের জীবন শেষ করে দিয়ে?

মেয়েটি যে উকিল মহাশয়ের কাছে গিয়েছিল তিনি শুধু তার খোরপোষের ব্যবস্থা করেছেন, লম্পট স্বামীর বিচারের ব্যবস্থা নয়। বোকা মেয়েটা তাই মেনে নিয়ে চুপচাপ ঘরে ফিরে এসেছে। তার বারোমেসে সঙ্গী হয়েছে ঘুমের ওষুধ। এখ হঠাত্ত তার মনে প্রশ্ন জেগেছে, এভাবেই ঐ হাজী সাহেব হয়ে ঘুরে বেড়াবে নির্বিবাদে?

মানুষ কি বলে এ নিয়ে?

বিবেক কি বলে?

ঐ খোরপোষের জন্যে, তার ছেলে মেয়ের বাবা বলে সে কী জাষ্ট ছেড়ে দেবে ঐ লম্পট হাজীকে?



]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28714650 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28714650 2007-06-05 03:10:02
এইসব দিন ও রাত এডিটরুমের শীতলতায় কাটছাট ছাটকাট... সকাল থেকে রাত, কখনো বা মাঝরাত কখনো বা পরদিন সকাল অব্দি...

টেবলে ঠান্ডা হয় বারে বারে গরম করা খাবার, বাসি হয়। অবশেষে ভোররাতে তারা স্থান পায় রেফ্রিজারেটরে। শুকিয়ে রং হারায় হিমসাগর, চিমসে হয়। শুকায় পলিব্যাগে মুড়ে রাখা মুজাফফরপুরের লিচুরাও...

এই গরমেও আমার ঘরের পর্দারা থাকে টানা। বাইরের গরম বাতাস, ততধিক গরম ফ্যানের বাতাসে এদিক ওদিক ওড়ে তারা। আমি চমকে চমকে উঠি, ভয় পাই। জল খাই। ঘড়ি দেখি। দেশ থেকে পাঠানো প্রিয় মানুষের সংক্ষিপ্ত বার্তায় জানতে পারি, আমার সাথে জ্বীন আছে... যে নাকি আমাকে ছেঁড়ে কোথাও যায় না... যাবে না... সেজন্যেই কি আমি এমন চমকে চমকে উঠি? মনে হয় কে যেন আছে... ঐ জামডালে... কোকিলকন্ঠে তবে কি সেই ডাকে? কে জানে...

মাঝে মাঝে ঐ মাঝরাতেও চাতক দৃষ্টিতে আকাশে খোঁজার চেষ্টা করি মেঘ , কোথাও কি সে জমলো? এক টুকরো? নাহ...নীরব নিস্তব্ধ রাত... কেউ কোথাও নেই... মাঝে মাঝে শুনশান নীরবতা ভেঙে শুধু কুকুরেরা ডাকে, দলবদ্ধভাবে...

প্রেশার কুকারের তীব্র সিটি জানান দেয়, সেদ্ধ হয়ে গেছে মুশুর ডাল। পেছনের পুকুরে জলকেলি করে তিনটি হাঁস। একটা হাঁস একটু দূরে চলে যায় সাঁতার কেটে। জলেই মিলিত হয় অপর দুটি। বারে বারেই ডুব দেয় জলে, পাখনা নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঝেড়ে ফেলে মিলনের চিহ্ন, জল... ফিরে আসে অন্যটি, একসাথে আবার তারা খেলা করে...

গামছপরা দুটি লোক দড়ি দিয়ে বেধে ফ্যালে জলের সমস্ত আগাছা, কচুরিপানা আর গাঢ় জমে থাকা শ্যাওলা, দেখা দেয় পরিস্কার টলটলে জল। এবারে কি তবে এই পুকুরটাও বুজিয়ে ফেলা হবে? পাশেই চলে ইমারত তৈরীর প্রস্তুতি, বড় ছাঁকনিতে অবিরাম ছাঁকা হয় বালি, সেই বালিতে মিশে যায় শ্রমিকের ঘাম, জমিমালিকের স্বপ্ন। শ্রমিক মেয়েটি কোমরে হিল্লোল তুলে এগোয় ইটের বোঝা মাথায় নিয়ে। কাজ থেমে যায় শ্রমিক পুরুষদের... সবকটি চোখ আটকে যায় ডুরে শাড়ি পরা ঐ কালো মেয়েটির দেহভঙ্গীমায়...

আমি আজকাল একটু স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছি। খুঁজে পেতে কিনে আনি ওট, সুগারফ্রী চিনি। খাই না দুধ চা। লিকার চায়ে একটুশখানি সুগারফ্রী। দুধে ডোবা কর্নফ্লেক্স আমার ব্রকফাষ্ট। মাছের ঝোল, সেদ্ধ আনাজ বড়জোর চিকেন ষ্টু। নো রেডমিট! ব্যায়ামাগারে গিয়ে হাঁটি, যাতে নাকি মানুষে হাঁটে না, মেশিনই মানুষকে নিয়ে হাঁটে! উত্তাল মিউজিক চলে। কান ফাটানো শব্দে। বাজনার তালে তালে শীত্তকার করে নারী। জোরে, ক্রমশ আরও জোরে...বাড়তেই থাকে সেই কানফাটানো আওয়াজ। আমার চোখ স্থির সামনে রাখা প্লাজমা টিভিতে। আমি হাঁটতে থাকি নাকি আমাকে নিয়ে হাঁটে মেশিন! রিমোট হাতে আমি শুধু পাল্টাতে থাকি চ্যানেল।

ব্যাথার ওষুধ শরীরে জল ধরে রাখে... এই সব ব্যাথা বেদনাদের সাথে আমার বড় ভাব। পরকীয়া প্রেম। লুকিয়ে থাকে অভ্যন্তরে। কেউ দেখতে পায় না। শুধু আমি জানি, তারা আছে। এখানে ওখানে, শরীরের আনাচে কানাচে... ফোনের ওধারে ডাক্তার বন্ধু চিন্তিত হয়, বাড়লো কি ইউরিক অ্যাসিড? থাইরয়েড যেন অবিলম্বে চেক করি...

ভালো লাগে না...

এইসব কিছুই ভালো লাগে না...

জৈষ্ঠের এই দমচাপা গরমে মানুষ তো মানুষ ক্লান্ত কুকুরেরাও। রাস্তায় খানিকটা জমা জলে গা ডুবিয়ে পাশাপাশি পড়ে থাকে তিনটি কুকুর, চুপচাপ, শান্ত।

সবুজ জামগুলো সব কালচে হয়ে উঠেছে, আর ক'টা দিন। ব্যাস। লোক এসে গাছ ঝাঁকিয়ে পেড়ে নিয়ে যাবে সব জাম। গাছমালিকের কিছু নগদ প্রাপ্তিযোগ। গাছভর্তি তালও বোধ হয় বিক্রিই হয়ে গেল! আর জামরুলও। বাগানের মাঝে টানানো ঐ দোলনা আর নিস্তব্ধ দুপুরে কিশোরী মেয়েটির দোল খাওয়া শুধু উসকে দিয়ে যায় কিছু স্মৃতি...







]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713829 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713829 2007-06-01 11:44:57
বেড়ানোর জায়গা সেই কবে থেকে আমি আর উমা প্ল্যান করছি
কখনো পুরী তো কখনো দীঘা৷ নিদেনপক্ষে
মুর্শিদাবাদ কিন্তু যাওয়া আর হয়ে উঠলো না
এখন অব্দি৷ আজকে হঠাত্ উমা এসে বলল,
কোথায় যাবি বলছিলি, নিচের মুদির দোকানে
টিকিট দিচ্ছে, তিনমাস পরের ডেটের টিকিট ৷
আসলে, যে কোন জায়গার টিকিট পাঁচশো
টাকায় দিচ্ছে ৷ আমি একটু অবাক হলাম,
মুদির দোকানে টিকিট দিচ্ছে? উমা বলল,
হ্যাঁরে, দেখে এলাম যে ৷ আরও বললো,
আমি যেতে পারবো না, তুই ঘুরে আয় ৷
ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন ? তো বলল,
মবিনের শরীরটা ভালো নেই, তাই যাব না ৷

খুব অবাক হলাম, মবিনের শরীর ভালো নেই?
সে কি! মবিন মারা গেছে সেও তো দু বছর
মুখে কিছু না বলে ওর সাথে নিচে গেলাম
টিকিট আনতে৷ টিকিট তো আনতে যাচ্ছি
কিন্তু যাবটা কোথায়? উমাই নাম বলল
একটা জায়গার, আমি বহু চেষ্টা করেও
তার নাম উচ্চারণ করতে পারছি না,
বললাম, ওখানে কি আছে সেখানে?
ওটা নাকি একটা পাহাড়ি শহর, ঠান্ডা ৷
খুব সুন্দর সুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণা আছে,
নদী আছে, পাহাড়ের গায়ে সব কটেজ,
তাতে থাকার ব্যবস্থা ৷ শুনে ঘাবড়ে গেলাম
একটু, সে নিশ্চয়ই বেশ খরচের ব্যপার রে,
আমি বোধহয় এখন পেরে উঠব না রে, উমা
অভয় দিল, বলল, আরে আরে এখন তো নয়,
এখন শুধু টিকিট কিনে রাখ, যাওয়া তো
তিনমাস পর! আর যাবি যখন, তখন
একবার মাজারে ঘুরে আসিস ৷ মাজার?
উমা বোঝাল, ওখানে এক মাজার আছে,
পীরের দরগাহ ৷ সেখানে সব মানত পূর্ণ হয়,
ওখানকার পানিতে সব রোগ সারে,
আমি যেন ওর জন্যে এক বোতল পানি
মনে করে নিয়ে আসি, আর মানত করি
মবিনের জন্যে৷ টিকিটের পয়সা পকেটে
আছে কি না, আপাতত, দেখতে আমি
হাত ঢোকাই পকেটে৷ নিজেই অবাক হই,
খুব, ও মা! এই জিনসটা কখন পরলাম?

পকেটে পাঁচশো টাকার দুটো নোট,
তাতে তো দুটো টিকিট হবে! তাইলে
কে কে যাবে? উমাকে বলতেও সংকোচ
হচ্ছে, কিন্তু না বললেও নয় ৷ আরে!
উমা যে আজ সবজান্তা! সে বললো,
দুটো টিকিটই কাট নারে বাবা৷ তোর
আর সুমেরুর ৷ কোথাও তো যাসনি দুজনে৷
এই ফাঁকে ঘুরে আয় ৷ মাথা নেড়ে নেড়ে
সায় দিই, পকেটের ঐ দুটো নোট দিয়ে,
দুখানা টিকিট কাটি ৷ ভয়ে ভয়ে
আবার জিজ্ঞেস করি, যদি যেতে না পারি
তাইলে এই টিকিটের কি হবে? উমা বললো,
এখানে এরা টিকিট বিক্রি করে শুধু,
ফেরত নেয় না, অবশ্য তুই না গেলে
টিকিট দুটো ষ্টেশনে গিয়ে ফেরত দিয়ে দিস,
কোন অসুবিধা হবে না ৷ উমা চলে যায় ৷
আমি একটু অবাক হই, প্লেনের টিকিট
ষ্টেশনে গিয়ে ফেরত দেব! তাকিয়ে দেখি
পাশেই মাংসের দোকান৷ আমি এখানে
মাংসের দোকান কবে হল ভাবতে ভাবতে
বাড়ির পথে হাঁটতে থাকি ৷ যে সিঁড়িটা
দিয়ে উঠছি সেটা আমার বাড়ির সিঁড়িই তো?
হ্যাঁ ৷ নয়তো আবার কি৷ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে
থাকি উপরে৷ যে ফ্লোরে এসে সিঁড়ি শেষ
সেখানে আমার ফ্ল্যাট নেই! গেল কোথায়?
খুঁজতে থাকি ৷ লম্বা এক করিডোর দিয়ে
এমাথা ওমাথা হেঁটেও নিজের ফ্ল্যাট খুঁজি ৷
খুঁজে না পেয়েও বুঝতে পারি না যে
ভুল বাড়িতে ঢুকেছি ৷ করিডোরের দুপাশে
সব বন্ধ দরজা, যার একটামাত্র পাল্লা খুলে
এক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসেন আর
আমাকে চিনতে পারেন ৷ তুমি এখানে?
আমি অসহায় ভাবে বলি, আমার ফ্ল্যাট!
তিনি বলেন, তুমি তো এক বছর আগেই
এই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছ, ভুলে গেলে নাকি?


সামনের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে গিয়ে
ডানদিকের রাস্তা ধরে গেলেই নাকি
আমি আমার বাড়ি পেয়ে যাব, ঠিকঠাক;
বলে দিলেন সেই ভদ্রলোক৷ আমি নেমে
হাঁটতে হাঁটতে যেখানে পৌঁছুলাম; সেটা
একটা ছোট্ট রেলষ্টেশন ৷ যেখান থেকে
খেলনা ট্রেনের মত দেখতে ট্রেনগুলো
হুঁশ হাঁস বেরিয়ে যাচ্ছে ৷ সেই ট্রেনে
কোন মানুষ নেই ৷ আমি একটা ট্রেনে
চেপে বসি ৷ ভাবনা চলতে থাকে, উমা!
আমাকে হিল ষ্টেশনের টিকিট কেটে দিল,
আমার গরম জামা-কাপড় লাগবে না?
আর আমি বেড়াতে যাব ,আমার শপিং
করা লাগবে না? উমা অবশ্য বলে দিয়েছে
এই ব্লু জিনসটার সাথে একটা লেবুরঙা কুর্তা
খুব ভাল লাগবে, আমি নিজের মনেই ভাবি,
উমাকেই বলব, আমার শপিং করে দিতে,
এখনও তো আমার তিনমাস সময় আছে ৷

ট্রেন থেকে নেমে সামনে বেঁকে থাকা
একটা রাস্তা দেখতে পাই, কোথায় যাচ্ছি?
সে চিন্তা আর মাথায় নেই, এগিয়ে যাই
ঐ রাস্তায় আমি এঁকে-বেঁকে যাই ৷ আরে!
আমার বাড়ি এই রাস্তার শেষ মাথায়?
কি যে হচ্ছে আমার কে জানে ৷ ঘরে ফিরে
ওকে দেখতে পাই না ৷ এখনও বাড়ি ফেরেনি ৷
আমার মাথা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রনায় ৷ আজকাল;
রোজ ও দেরী করে বাড়ি ফেরে৷ রাত বাড়লে,
ঘুমিয়ে পড়ি ৷ টুংটাং ঘন্টা বাজে দরজায় ৷

ও আমার দিকে তাকায় না, কথা বলে না ৷
আমি আবার এসে শুয়ে পড়ি ৷ যন্ত্রবত্ ৷
মিষ্টি একটা পাহাড়ি গন্ধ এসে লাগে নাকে ৷
স্নায়ু অবশ করা একটা গন্ধ ৷ ওদিকে
পাশ ফিরে ও শুয়ে আছে, বুঝতে পারি
ও মদ খেয়ে এসেছে ৷ এভাবে কি রোজ
রোজ ও মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে, আর এসে
পাশ ফিরে শুয়ে থাকে? ঠান্ডা ৷ আমি ওকে
জিজ্ঞেস করি, তুমি কি মদ খেয়েছ?
ও কোন কথা বলে না ৷ আমি ওকে ধরে
আমার দিকে ফিরিয়ে দিতেই সেই গন্ধটা
স্পষ্ট টের পাই, এতক্ষণ যেটা হালকা
আবছা ছিল, টয়ট্রেনে, জিনসের পকেটে ৷
মনে হল এই গন্ধটা আমি আজকাল
রোজ পাই৷ আমি জোরে জোরে চেঁচাই,
তুমি মদ খেয়ে এসেছ৷ আবার আজকে ৷
এবার ওর শার্টের কলার ধরে ওকে
আর গোটা ট্রেনকে ঝাঁকুনি দিতে থাকি ৷
ও কোন কথা বলে না ৷ কোন কু উউউ,
ঝিকঝিক আসেনা কানে; এই রাতে ৷
আমার বেড়াতে যাওয়ার ট্রেন আজকাল
কোন কথা বলে না আর আমার সাথে।



( জিকো'র নির্বাচিত দু:স্বপ্ন পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে এই লেখাটি ব্লগে দিলাম, এই লেখাটি রোহণ কুদ্দুসের 'সৃষ্টি' তে প্রকাশিত।)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713763 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713763 2007-05-31 23:56:53
জেগে আছে বাংলাদেশ- শেষ পর্ব হেথা হিয়া ওঠে বিরহে বিকুলি',
মিলনে হারাই দু'-দিনেতে ভুলি,
হদৃয়ে যথায় প্রেম না শুকায়
সে অমরায় মরে স্মরিও৷৷
কিন্তু আমার এখন গানেও উত্সাহ নেই৷ ঘরে ফিরে আসি, তেলের বাটি চিরুণী হাতে আম্মু আসে, বিনুনী খুলে চুলে তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেয় আম্মু, রোজকার মত ৷ আর তার কথা মানে সব আমার বিয়ের ভাবনা, কেমন হবে সে আয়োজন ৷ আব্বু আমার জন্যেও ভেবে রেখেছে আর সেই ভাবনা বাস্তবায়নের জন্যে আব্বু গুটিগুটি পায়ে সেদিকে এগুচ্ছেও ৷ প্রায় সন্ধ্যেতেই আব্বুর বন্ধু সৈয়দ কাকু এসে বসে আব্বুর কাছে, নতুন নতুন পাœরে খোঁজ নিয়ে আসে কাকু, সাথে পাত্রের ছবি সহ বায়োডাটা ৷ যেগুলো আব্বুর পছন্দ হয় সেগুলো এক পাশে রেখে বাদবাকিগুলো আব্বু ফেরত দেয় ৷ পরে ভাবনা চিন্তা করে যোগাযোগ করবে সৈয়দ কাকুর সাথে ৷ আমার সত্যিই কিছু ভেবে দেখার কিছু ছিল না ৷ সব ভাবনা আব্বু ভেবে রেখেছে, আমাদের সব ভাবনাই আব্বুই ভাবে ৷ আমি তবু আম্মুর সাথে দোকানে যেতে পারি, জ্যামিতির নকশা দেওয়া কাপড় পছন্দ করে কিনে আনতে পারি ৷ অমন জ্যামিতির নকশার মধ্যে আমি দেখতে পাই তিরতির করে করে জল ঝরা ছড়া ৷ ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া পাহাড় ৷ গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আর মাঝে মাঝে আনারসের বন ৷ এ সব ভাবতে আমার কোন বাধা নেই ৷ জ্যামিতির ছাপ ছবির শড়িগুলি যেন বেদনার রঙে আঁকা ৷ শাড়িগুলি যেন আমার হারিয়ে যাওয়া কিশোরীবেলা ৷ আমার হারিয়ে যাওয়া গানেরা, হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ ৷


কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
কুহু কুহু কুহরে পাহাড়ী কুহু
পিয়াল ডালে পল্লব বীণা বাজায়
ঝিরিঝিরি সমীরন তালে তালে তালে,তালে তালে
সেই জল ছলছল শুনে ডাকিয়া
সাড়া দেয় মনপারে সাড়া দেয় , বাঁশি রাখালিরা
পল্লীর প্রান্তর উঠে শিহরি
বলে, চঞ্চলা কে গো তুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুম। ।

-<img src=" style="border:0;" />br />
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713683 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713683 2007-05-31 15:08:36
জেগে আছে বাংলাদেশ - ৪
-3-

পরজনমে দেখা হবে প্রিয়!
ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও৷৷


এ জনমে যাহা বলা হ'ল না,
আমি বলিব না, তুমিও ব'লো না!
জানাইলে প্রেম করিও ছলনা,
যদি আসি ফিরে, বেদনা দিও৷৷



হাউজিং এষ্টেটের আমাদের এই বাড়িটার সামনে পেছনে দুটো বারান্দা ৷ সামনের বারান্দার গ্রীলএর হাফ রেলিং পেরিয়েই ছোট্ট একটুখানি লন, তাতে ছোট্ট একটু বাগান৷ কিছু গাছ বাগানের মাটিতে আর কিছু গাছ টবে ৷ এই বাগানটা ভাইয়ার, গাছগুলো ও ওরই লাগানো ৷ বাগানের শেষে যেখানে আমাদের বাড়ির সীমানা সেখানে ইটের হাফ দেওয়াল, ছোট্ট কাঠের গেট৷ গেট ছাড়িয়ে সামনে দিয়ে রাস্তা, হাউজি ংএষ্টেটের তিন নম্বর রোড, পাশাপাশি এরকম চারখানি রাস্তা সমান্তরালভাবে গেছে, এক, দুই, তিন, চার ৷ প্রতিটা রাস্তাই ডানদিক দিয়ে গিয়ে পড়েছে বড় রাস্তায় আর বাঁদিক দিয়ে শেষ হয়েছে ছোট এক টিলার গায়ে, আমরা যাকে পাহাড় বলি ৷ হাউজিং এর এই শেষ মাথায়, পাহাড়ের নিচে আমাদের খেলার মাঠ ৷ এই হাউজিং এর প্রায় সব ছেলে মেয়েরাই এখানে খেলতে আসে৷ দিনের বেলা কচি কাঁচারা খেলে, সন্ধ্যের পরে বড়রা বাতি জ্বালিয়ে শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলেন আর গরমকালে চেয়ার পেতে বসে শুধুই আড্ডা দেন ৷ হাউজিং এর এই রাস্তাগুলো যেখানে শেষ হয়ে বড় রাস্তায় পড়েছে সেখানে একটু ছোট্ট বাজার মত আছে সব কটি রাস্তাতেই৷ হাউজিং এর লোকজন ওখান থেকেই দরকারী ছোটখাট জিনিসপœ কিনে আনেন ৷ রাস্তার দুধারে বাড়ি, কোনটা একতলা কোনটা দোতলা ৷ প্রতিটা বাড়ির সামনেই ছোট্ট এক টুকরো বাগান, ঠিক যেমনটি আমাদের বাড়ির সামনে আছে৷ এই তিন নম্বর রোডের পেছন দিয়ে সমান্তরালভাবে গেছে এক সরু ঝর্ণা, আমরা সিলেটিরা যাকে 'ছড়া' বলি ৷ আমাদের বাড়ির ঠিক পেছন দিয়েই গেছে এই ছড়া, এমনিতে খুবই সরু, শুধুই তিরতিরে এক জলরেখা ৷ ওদিকের পাহাড় থেকে নেমে এসেছে , এই হাউজিং এষ্টেটের বুকের উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর, কোথাও খুব সরু তো কোথাও বা খানিকটা চওড়া হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে একেবারে শেষ হয়েছে সুর্মায় ৷ আম্মু বলে, রিকাবী বাজারের যে বাড়িটাতে আমার জন্ম হয়েছিল, সেও নাকি এই ছড়ার পারেই ছিল! ছোট্ট আমার কাঁথা কাপড় ঐ ছড়া থেকেই ধুয়ে আনত জামশিদা বুবু ৷ ছড়ার পারের সেই বাড়িতে আম্মুরা তখন ভাড়া থাকত, আমার জন্মের কিছুদিন পরেই এবাড়িতে উঠে আসা হয়, সব চাইতে মজার ব্যপার, এখানেও বাড়িটি সেই ছড়ার পারেই ৷ পেছনের বারান্দায়ও হাফ রেলিং, গ্রীলের, আর তারপরেই খানিকটা দূর থেকেই শুরু হয়েছে ঢাল, নেমে গেছে ছড়ায় ৷ যখন খুব বর্ষা হয়, তখন ছড়ার জল উঠে আসে বাড়ির একেবারে পেছন অব্দি ৷ ঘোলা, ময়লা জল ৷ আম্মু বলে, পাহাড় ধুয়ে নেমে আসে এই পানি, ময়লা তো হবেই ৷ ছড়ার ওপাশে যতদূর চোখ যায় ঘন জঙ্গল ৷ অচেনা সব গাছ, ছোট বড়, অন্ধকার হয়ে থাকে দিনের বেলাতেও ৷ পেছনের এই বারান্দা, তিরতির করে বয়ে যাওয়া ঐ ছড়া আর ওপাশের ঘন জঙ্গল, সবই আমার খুব প্রিয়৷ আমার যখন খুব মন খারাপ হয়, আমি এসে এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি, রেলি ংএ হেলান দিয়ে৷ পাশের বাড়িতে গানের মাষ্টার একই গান তুলিয়ে যায় রুনা আপাকে৷ ' আমারে চোখ-ইশারায় ডাক দিলে হায় কে গো দরদী,/ খুলে দাও রংমহলার তিমির-দুয়ার ডাকিলে যদি৷৷' আমাদের বাড়িতে গান বাজনার চল নেই, তাই আমি বারান্দার এসে শুনি ৷ কত তো গান আছে সে গুলো কেন শেখায় না মাষ্টার? একঘেয়ে লাগে, আমি চুউপ করে ঘরে এসে বসে থাকি৷ আজকাল আমার খুব ঘন ঘন মন খারাপ হয় ৷ নি:শব্দে কেটে যায় প্রহর ৷

ভাইয়া ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে গিয়ে ভর্তি হয়েছে বুয়েটে, ঢাকায় ৷ আবার হষ্টেল ৷ ভাইয়ার সেই ট্রাঙ্কের গায়ে এবারে ক্যাডেট কলেজের বদলে বুয়েটের নাম ঠিকানা লেখা৷ কায়সার আহমেদ ৷ বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি ৷ নজরুল ইসলাম হল ৷ ঢাকা ৷ ক্যাডেট কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে রিতিমত বাকযুদ্ধ হয়েছে আব্বুর সাথে ভাইয়ার এবং ভাইয়াকে সব কটা ইনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে হয়েছে, আব্বুর খুব ইচ্ছে ছিল ভাইয়া যেন বুয়েটে পড়ে, তাই হয়েছে, ভাইয়া বুয়েটেই ভর্তি হয়েছে ৷ তবে ভাইয়া একটুও মন খারাপ করে বসে থাকে না, বলে, দাঁড়া, ক'দিন লাগবে পাশ করে বেরুতে, তারপর আমি এখানেই ফিরছি, সিলেটে৷ ভাইয়া কবে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কী না? আমি আর এ নিয়ে ভাবি না ৷ হয়ত দেখা গেল, ভাইয়া যখন ফিরে আসবে পাশ করে, তার আগেই আব্বু অন্য কিছু প্ল্যান করে ফেলেছে ভাইয়ার জন্য ৷ ওবাড়ির রুনা আপুর বিয়ে হয়েছে লন্ডননিবাসী সাদেক ভাইয়ার সাথে৷ রুনা আপু নিজেও এখন লন্ডননিবাসিনী৷ কলেজে পড়তে গিয়ে রুনা আপুর দেখা হয় শিরিনের সাথে, বন্ধুত্ব হয়, শিরিন সাদেক ভাইয়ার ছোট বোন, একই ক্লাসে পড়ত রুনা আপুর সাথে৷ তখন সাদেক ভাইয়া মাঝে মাঝেই কলেজে আসে ছোটবোনকে পৌঁছে দিতে অথবা কলেজ থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে৷ কলেজেই দেখা হয় রুনা আপুর সাথে সাদেক ভাইয়ার, মন জানাজানি হতেও সময় লাগেনি ৷ সাদেক ভাইয়ার বাড়ির লোকেদেরও অপছন্দ হয় না রুনা আপুকে৷ বড়দের মারফত বিয়ের প্রস্তাব আসে রুনা আপুদের বাড়িতে, খালাম্মা খালুজীরও অপছন্দের কারণ ছিল না, লন্ডননিবাসী হোটেলমালিক সাদেক ভাইয়ার সাথে রুনা আপুর বিয়ে হয়ে যায় ৷ আমিও গেছিলাম খালাম্মা আর খালুজীর সাথে সিলেট এয়ারপোর্টে, রুনা আপুকে প্লেনে তুলে দিতে৷ সিলেট থেকে রুনা আপু যাচ্ছে ঢাকায়, ওদের লন্ডনের ফ্লাইট রাতে, বিকেলটা ওরা ঢাকা এয়ারপোর্টেই থাকবে ৷ সাদেক ভাইয়া খালাম্মা আর খালুজী দুজনকেই বলেছিল ওদের সাথে ঢাকায় যেতে, পরদিনের ফ্লাইটে আবার ওঁরা সিলেটে ফিরে আসবেন কিন্তু ওঁরা কেউই যেতে চাননি ঢাকায়, এখান থেকেই মেয়ে জামাইকে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরবেন ৷ জরির কাজ করা লাল জর্জেট শাড়ি আর ঝকঝকে সোনার গয়নায় সুন্দরী রুনা আপু কখনও লন্ডন যাওয়ার আনন্দে হাসিতে উচ্ছ্বল তো কখনও কেঁদে আকুল খালাম্মা-খালুজী আর সবাইকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে ৷ কানে কানে আমাকে বলে গেল যাওয়ার আগে, রুকুরে, টুটুভাই তোকে সত্যিই খুব ভালবাসে, একটু ভেবে দেখিস ৷ আমি জড়িয়ে ধরি রুনা আপুকে, চোখের জল চাপার চেষ্টা করেও পারি না, নি:শব্দে কাঁদতে থাকি রুনা আপু আর আমি ৷ আমি দেখতে পাই আমার নজরুলগীতিরা ঐ চলে যাচ্ছে, আমাকে ছেড়ে ৷



(আগামী খন্ডে সমাপ্য)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713252 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713252 2007-05-29 13:59:52
জেগে আছে বাংলাদেশ - ৩
আমি টুটুকে ভাই কিংবা ভাইয়া কিছুই বলি না ৷ আজ অব্দি তো কথাই বলিনি ওর সাথে! টুটু না কী ভাইয়াকে বলেছে, তোর বোনের খুব অহংকার! ইশশ! আবার অহংকার বলা হচ্ছে! না, না, আমার একটুও অহংকার নেই৷ কেন হবে? টুটুটা সত্যিই কী বোকা ৷ আমি টুটুকে পছন্দ অপছন্দ কিছুই করি না৷ ভালবাসা? না ৷ সে আমি বুঝতেই পারি না, ভালবাসা বস্তুটা কী৷ তবে যেটুকু বুঝি, টুটু যদি সকালে, বিকেলে আর আমি যতক্ষণ বাড়ি থাকি ততক্ষণ ঐ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে না থাকে তবে আমার ভাল লাগবে না, লাগে না ৷ কোনদিন এরকম হয় না যে আমি স্কুলে যাচ্ছি, স্কুল থেকে ফিরছি অথচ টুটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই ৷ বছরে একবার টুটু বাড়ি যায় ৷ ওর কলেজ তখন বেশ কিছুদিনের ছুটি থাকে৷ কিসের ছুটি অতশত আমি জানি না৷ কিন্তু ও যায় ৷ এবারেও গেছে ৷ কিন্তু এখন কি কলেজের ছুটিতে গেছে? ছুটিতে তো এই কিছুদিন আগেই একবার ঘুরে এল, আর এখন তো সবার পরীক্ষা সামনে! তবে? এই কয়েকদিন আমার খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে ৷ সকাল ঘুম থেকে উঠে স্কুল যাওয়া অব্দি বারে বারেই ঘুরে ফিরে বারান্দায় আসি, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে নেই জেনেও৷ বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার সময় তিন নম্বর রোডের মুখ থেকেই টুটুদের বারান্দায় চোখ যায়, টুটু নেই ৷ কবে আসবে? কে জানে! কাওকে জিজ্ঞেস করব সেই উপায়ও নেই ৷ রুনা আপুকে জিজ্ঞেস করতেই পারি কিন্তু রুনা আপু এমন হই হই করে উঠবে যে সে এক কান্ড হবে৷ বরং খালাম্মার উলের বোনাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলে খালাম্মাই রাজ্যের গল্প করবে আর সেই গল্পের ফাঁক দিয়ে টুটুর কথাও আসবেই, কিচ্ছুটি জিজ্ঞেস করার দরকারই পড়বে না ৷ আমি নিজের ঘরের ভেতর বসেই সোয়েটার বুনি ভাইয়ার জন্যে, বারে বারে ঘর পড়ে যায়, ডিজাইনে ভুল হয়৷ জানি খালাম্মার কাছে গেলে উনি সুন্দর করে দেখিয়ে দেবেন৷ কিন্তু আমি যাই না ৷ কি হবে গিয়ে? এর আগেও আমি দুটো সোয়েটার বুনেছি ভাইয়ার জন্যে ৷ কিন্তু সেগুলো নাকি ছোট সব ৷ ভাইয়া প্রতিবার বাড়ি ফিরলে টের পাই সে দু-তিন ইঞ্চি বেড়েছে , কিন্তু তাই বলে ছোট? রুনা আপু বলে শহরের ফ্যাশান না কি আলাদা তাই ভাইয়া নেয় না! এগুলো সব পুরোনো ডিজাইন ৷ খালাম্মা কেন পুরানো ডিজাইন বোনেন? টুটুকে বললেই তো সে নতুন ডিজাইন এঁকে দেয়, তার এমন হাত! ভাইয়া অবশ্য ফ্যাশনের কথা স্বীকার করে না, বলে শহরে নাকি শীতই পড়ে না, তুই অন্য কারো জন্যে বোন ৷ আমি আর কার জন্যে বুনতে পারি? প্রতিবারই ভাবি আর বুনব না , তবু বুনি ভাইয়ার জন্যে ৷ আগের উল খুলে নতুন ডিজাইন তুলি খালাম্মার কাছে ৷ কিন্তু ঘরে ফিরলেই সেই গোলমাল ৷


আমি কিন্ত টুটুর কথা জানার জন্যে আমি খালাম্মার কাছে গিয়ে বসি না, রুনা আপুর ঘরে গিয়ে তার বিছানায় বসে থাকি ৷ রুনা আপু মন দিয়ে পড়ছে পরীক্ষার পড়া ৷ পড়া না ছাই! কানে ওয়াকম্যান লাগিয়ে নজরুলগীতি শুনছে , আজকাল যে রুনা আপু সন্ধ্যাবেলায় হারমনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায় না,
বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে৷৷
বা
ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয় ৷
সেটা অবশ্য পরীক্ষার জন্যে নয় ৷ আম্মুই গিয়ে খালাম্মাকে বলে তার গানে অন্য ঈশ্বরের কথা আছে, সেই গান গাওয়া ঠিক নয় ৷ খালাম্মা হাসি মুখে মেনে নিয়েছেন, আগের মাষ্টার ছাড়িয়ে দিয়েছেন ৷ পরীক্ষার পর নতুন মাষ্টার আসবেন নজরুলগীতি শেখাতে৷ একমাœ টুটুই প্রতিবাদ করেছিল কিন্তু ধোপে টেকেনি ৷ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সমস্ত ক্যাসেট জলে ফেলে দিয়ে নজরুলগীতির ক্যাসেট কিনে আনা হয়েছে ৷ পরীক্ষার পড়ার ফাঁকে ফাঁকে এখন সেগুলোই শোনে রুনা আপা ৷
হেথায় নিমেষে স্বপন ফুরায়,
রাতের কুসুম প্রাতে ঝ'রে যায়,
ভালো না বাসিতে হদৃয় শুকায়,
বিষ-জ্বালা-ভরা হেথা অমিয় ৷৷
আর মুখের সামনে ধরে রেখেছে খোলা একটা খাতা ৷ উঁকি দিয়ে দেখলাম সেও পড়ার খাতা কিছু নয়, রুনা আপুর লেখার খাতা ৷ রুনা আপু কবিতা লেখে ৷ কবিতা ছাড়া আর যা লেখে সে ঠিক গল্পও নয় আবার কবিতাও নয় ৷ তবে রুনা আপুর লেখা কবিতার চাইতে তার এই না কবিতাগুলো ই আমার বেশি ভাল লাগে৷ কান থেকে থেকে ওয়াকম্যান নামিয়ে রেখে রুনা আপু বলে, কীরে, মন খারাপ? টুটুভাইয়ের জন্যে? বলে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ে ৷ আমার মন আরও খারাপ হয়ে যায় ৷ এর মধ্যে এত হাসার কী হল! খানিক হেসে টেসে নিয়ে রুনা আপু ধীরে সুস্থে বলল, দেশে খালাম্মার শরীর খুব খারাপ, ঢাকায় নিয়ে গেছে অপারেশনের জন্যে, গলব্লাডার স্টোন৷ অনেকদিন ধরেই ভুগছে এবার বাড়াবাড়ি হওয়াতে অপারেশনের জন্যে ঢাকায় নিয়ে গেছে ৷ খালুজীর সরকারী চাকরী, বেশিদিন ছুটি নেওয়ার উপায় নেই, তাই টুটু পড়াশোনা, টিউশনি আর বারান্দায় হাজিরা দেওয়া সব বন্ধ করে ঢাকায় গেছে মায়ের চিকিত্সা করাতে ৷

(চলবে)]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713053 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28713053 2007-05-28 11:31:23
জেগে আছে বাংলাদেশ-২
টুটুর খালাম্মা উল বোনেন, অলমোষ্ট বারো মাস বোনেন, শুধু যখন প্রচন্ড গরম পড়ে, হাতের ঘামে উলে ফেঁসে ফেঁসে যায়, তখন কিছুদিন বন্ধ থাকে এই উলবোনা ৷ প্রতিবছর খালাম্মা সোয়েটারগুলোকে খোলে, যেগুলোকে আগের বছর বানিয়েছিল, টুটুর জন্যে, খালুজীর জন্যে আর রুনা আপুর জন্যে৷ হাতের লম্বা লম্বা টানে উল ছাড়িয়ে নিতে থাকে সোয়েটার থেকে,এক অদ্ভুত কায়দায় ছাড়িয়ে নেওয়া উলের গোলা বানায় হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, ডিমের মত আকারে, বড় বড় সব গোলা, লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি, সাদা আর সবুজ ৷ ডিম্বাকৃতি সব গোলা ৷ দুটো তিনটে গোলা একসাথে নিয়ে খালাম্মা বোনে, দু ঘর লাল, মাঝের চার ঘর সাদা কিংবা সবুজ, আবার দু ঘর লাল ৷ ফুটে ওঠে বকুল ফুল খালাম্মার সোয়েটারে৷ তেকোণা ষ্টোলে খালাম্মা ফুটিয়ে তোলে বড় বড় কদমের ফুল৷ যার গা থেকে ঝুলছে গোল গোল কদম, গলার দিকটায় গোল একটা বড় ফুটো, যাতে মাথা গলিয়ে সেই ষ্টোল গায়ে দেয় রুনা আপু৷ আমি বসে খালাম্মার বোনা দেখি, কখনও বা নিজেও একটু হাত লাগাই, চেষ্টা করি খালাম্মারই মত তাড়াতাড়ি হাত চলাতে উলের কাঁটায়, কিন্তু হয় না৷ গত বছর আমিও বুনেছি একটা সোয়েটার, ভাইয়ার জন্যে৷ প্যাচানো সাপ উঠে গেছে সেই সোয়েটারের ঝুল থেকে গলা অব্দি, নিচে চার ইঞ্চি চওড়া বর্ডার, হাতের বর্ডার দু ইঞ্চি, তেকোণা গলার বর্ডার দেড় ইঞ্চি৷ গাঢ় কচুয়া ( সবুজ) রঙের জমিতে সাপগুলো হলুদ৷ বোনার সময় আটকালেই এক ছুটে খালাম্মার কাছে, বুনতে গিয়ে মাঝে মাঝেই একটা ঘর ছেড়ে দিতাম, সাথে সাথে বুঝতে পারতাম না যে একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছি বোনার সময়, বেশ কয়েক লাইন বোনা হয়ে গেলে যখন বুঝতে পারতাম, তখন ছুট খালাম্মার কাছে, খালাম্মা সেপটিপিন দিয়ে সেই ঘর এক লাইন এক লাইন করে তুলে আবার কাঁটায় তুলে দিয়ে শুধরে দিত বোনার ভুল ৷


-2-

বড়ো বেদনার মত বেজেছ হে তুমি আমার প্রাণে,
মন যে কেমন করে মনে মনে তাহা মনই জনে ৷৷
তোমারে হদৃয়ে করে আছি নিশিদিন ধরে,
চেয়ে থকি আঁখি ভরে মুখের পানে ৷৷
বড়ো আশা, বড়ো তৃষা, বড়ো আকিঞ্চন তোমারি লাগি ৷
বড়ো সুখে, বড়ো দুখে, বড়ো অনুরাগে রয়েছি জগি ৷
এ জন্মের মতো আর হয়ে গেছে যা হবার,
ভেসে গেছে মন প্রাণ মরণ-টানে ৷৷





আমি বড় একলা হয়ে গেছি যখন থেকে ভাইয়া ক্যাডেট কলেজে পড়তে গেছে৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ ৷ চট্টগ্রামের কাছে ৷ সেই কতদূর! বছরে দু বার মাত্র ওদের ছুটি৷ তাও রোজার ঈদে পনের দিন আর কোরবানীর ঈদে মাœ এক সপ্তাহ৷ ভাইয়ার ছুটির আগেই আব্বু চট্টগ্রাম চলে যায় আর দু'দিন পর ভাইয়াকে সাথে নিয়ে ফেরে ৷ কি বিশাল এক লোহার ট্রাঙ্ক ভাইয়ার, তাতে বড় বড় করে সাদা রং দিয়ে লেখা , কায়সার আহমেদ ৷ একাদশ শ্রেণী ৷ ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ, চট্টগ্রাম ৷ একপাশে ইংরেজী আর একপাশে বাংলায় লেখা ৷ প্রতিবার ভাইয়া বাড়ি ফেরার সময় এই ট্রাঙ্ক নিয়ে ফেরে আবার এটা সাথে করে নিয়ে যায় ৷ আমি ভাইয়াকে কয়েকবার বলেছিও, হ্যাঁরে ভাইয়া, তুই এত্ত বড় একটা ট্রাঙ্ক প্রতিবার নিয়ে আসিস আর নিয়ে যাস? ছোট একটা স্যুটকেসে করে জামাকাপড় নিয়ে এলে কি হয়? ভাইয়া বলে, ওর ওখানে রেখে আসার সিষ্টেম নেই৷ সব ছাত্রেরই একটা করে এরকম ট্রাঙ্ক আছে আর প্রত্যেকেই সেটা বাড়ি নিয়ে যায় আর নিয়ে আসে আর প্রত্যেকের ট্রাঙ্কেই নাকি সাদা বা কালো কালিতে নাম লেখা থাকে ৷ সেই ট্রাঙ্কে ভাইয়ার যাবতীয় জিনিসপত্র ৷ বই খাতা, জামা কাপড় এমনকি খেলার সরামও৷ ভাইয়া ক্রিকেট খেলে ৷ তার ব্যাট, বল, স্ট্যাম্প, প্যাড, গ্লাভস সব থাকে এই ট্রাঙ্কের ভেতর ৷ ভাইয়া যখন বাড়ি ফেরে তখন সবচাইতে বেশি আনন্দ হয় আমার ৷ এই পনের আর সাত মোট বাইশ দিন আমার কোথাও যেতে নেই মানা ৷ দুই ঈদের সময় আমার স্কুলও ছুটি থাকে কাজেই পড়ার টেনশনও থাকে না ৷ ভাইয়া আসার আগেই আমি ছুটির পড়া করে রাখি, ভাইয়া এলে যেন বই নিয়ে বসতে না হয়৷ আমার ছুটি অবশ্য শুরুও হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই, ভাইয়া আসারও আরও পনের দিন আগে থাকতে৷ প্রায় দিনই সকাল সকাল খাওয়া দাওয়া সেরে আমি আর ভাইয়া বেরিয়ে পড়ি ৷ কোনদিন কাছের লাক্করতলা চা বাগানে, কোনদিন বা আরেকটু দূরে , বাগান ছাড়িয়ে পাহাড়ের দিকে ৷ ছোট ছোট টিলাগুলৈ আমাদের পাহাড়৷ শহর থেকে একটু দূরের দিকে গেলেই মনিপুরীদের দেখা পাওয়া যায় ৷ প্রতিটা পাহাড়ের গায়েই থাক কেটে কেটে লাগানো আনারসের বাগান, ওদের বাগান ৷ ছোট ছোট টিলার উপর ওদের ঘর বাড়ি৷ পায়ে চলা সরু পথ বেয়ে একটু উঠে গেলেই চোখে পড়ে নিকোনো ঊঠোন, খড়ের চালের মাটির বাড়ি৷ নাক বোঁচা ফর্সা ন্যাংটো শিশুরা ঘুরে বেড়ায় উঠোনে, আমাদের দেখলেই এক ছুটে ঘরে ঢুকে যায় আর তারপর উঁকি দেয় দরজার আড়াল থেকে৷ প্রায় প্রতিটা উঠোনেই চারপেয়ে চৌকির মত একটা জিনিস থাকে, যাতে ওরা, মনিপুরী মেয়েরা সুতো বেঁধে বোনার কাজ করে ৷ সেই চৌকির কাঠামোর চারপাশে ছোট ছোট পেরেক গাঁথা থাকে ৷ সুতোর লাছি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আটকে দেয় সেই পেরেকগুলোতে ৷ তারপর ওর মধ্যেই ফুটিয়ে তোলে, গাছ, লতা, পাতা, পাখী আর পাহাড় ৷ আনারসের বাগান ৷ সরু সুতোয় বোনা গুলো হয় গায়ের চাদর, মোটা সুতোয় বোনাগুলো বিছানার চাদর, আরেকটু মোটাগুলো হয় কম্বল ৷ যেগুলো ওরা কাঁধের ঝোলায় পুরে শহরে নিয়ে গিয়ে বিক্রী করে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে ৷


(চলবে)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712943 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712943 2007-05-27 19:46:38
জেগে আছে বাংলাদেশ রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
চমকিয়া জাগে ঘুমন্ত বনভূমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
দুরন্ত অরণ্যা গিরি নির্ঝরিনী
রঙ্গে সঙ্গে লয় বনের হরিণী
শাখায় শাখায় ঘুম ভাঙায়
ভীরু মুকুলের কপোল চুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি
রুমঝুম রুমঝুম কে বাজায় জল ঝুমঝুমি



প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় টুটুকে দেখি৷ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়৷ কখনো বারান্দার থামে হেলান দিয়ে তো কখনো বা রেলিংএ ভর দিয়ে৷ এটা ওর রোজকার নিয়ম, যখন থেকে ও এখানে এসেছে, তখন থেকেই দেখছি ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে৷ না৷ টুটু সারাদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে না, আমি স্কুলে চলে গেলেই ও বাড়িরে ভেতরে চলে যাবে৷ নিজে কলেজে যাওয়ার জন্যে রেডি হয়ে বারান্দার নিচেই হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হিরো সাইকেলটা নিয়ে চলে যাবে কলেজে৷ আমি যখন স্কুল থেকে ফিরি তখনও আবার দেখি, ও এসে দাঁড়িয়েছে৷ কখন বাড়ি ফেরে কলেজ থেকে জানি না তবে আমি বাড়ি ফেরার আগেই ও ফিরে আসে আর এসে দাঁড়ায় বারান্দায়৷ এই দৃশ্যের সাথে এখন মোটমুটি সকলেই পরিচিত৷ সবাই জানে, টুটু কখন, কোন সময়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে৷ এই নিয়ে বেশ হেনস্থাও হয়েছে ওর, আম্মুই সেটা করেছে৷ ওদের বাড়ি গিয়ে বহুবার নালিশ করে এসেছে ওর খালার কাছে, কেন ও এভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে আমার স্কুলে যাওয়া-আসার সময়, আর বিকেলে খেলার সময়৷ নালিশ করার পর দু-একদিন বন্ধ থেকেছে ওর বারান্দায় এসে দাঁড়ানো, তারপর আবার যে কে সেই৷ মুর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের বারান্দার দিকে চোখ রেখে৷ এছাড়া আর কোন উত্পাত নেই৷ মোড়ের মাথায় আমি রিকশা থেকে নামার আগেই চোখ যায় ওদের বারান্দার দিকে৷ জানি ও দাঁড়িয়েই থাকবে তবু একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া৷ হুঁ, ও আছে, আমি এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে, স্কুলব্যাগ কাঁধে ঝোলানো, চশমাটা একবার শুধু-মুদুই খুলে আবার চোখে পরি, বুকের ওপরে পড়ে থাকা দুই বিনুনীর একটাকে হালকা ঝটকায় পাঠিয়ে দিই পেছনে, পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই বাড়ির দিকে ওর পানে একবারও না তাকিয়ে৷ অনুভব করতে পারি ওর নিষ্পলক চাউনি অনুসরণ করছে আমায়, হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও সোজা হয়ে দাঁড়লো, না তাকিয়েও টের পাই৷ সামনে তাকিয়ে দেখি আম্মু দাঁড়িয়ে আছে জানালায়, রোজ যেমন থাকে৷ দরজাটা খোলা, রোজ যেমন থাকে৷ বাতাসে পর্দাটা উড়ছে৷ ছোট্ট কাঠের গেট পেরিয়ে আমি ঢুকে যাই ভেতরে৷ আম্মু এগিয়ে এসে হাত বাড়ায় কাঁধের ব্যাগ নেবে বলে, রোজ যেমন নেয়৷

বিকেলে এখন আর খেলতে মাঠে যাই না৷ আম্মুর অনেক বকাঝকা আর শাসনেও যা হয়নি ইদানিং নিজে থেকেই সেটা হয়েছে৷ এখন আর খেলতে যেতে ইচ্ছে করে না৷ বই নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসে থাকাটা বরং অনেক বেশি ভাল লাগে আজকাল৷ তবে বারান্দায় গিয়ে খুব যে একটা বসতে পারি তা নয়৷ পাশের বাড়ির টুটুর জন্যে,ঐ ছেলেটির জন্য আমি বারান্দায় বসতে পাই না, বারান্দাটা যেন আমার নয়, ওর৷ ও আমায় বিরক্ত করে না একদমই৷ কোন উটকো মন্তব্য তো ও আজ অব্দি করেনি আর সেই একবার এক চিঠি লেখা ছাড়া আর কোন চিঠিও লেখেনি৷ আম্মু সবই জানে, তবুও ঘুরে ফিরেই বারান্দায় আসবে নিজের ঘুম নষ্ট করে৷ আমি তাই সামনের এই বসার ঘরের সোফায় আধশোয়া হই, সাথে বই৷ মাঝে মাঝেই চোখ যায় সামনের বাড়ির বারান্দার দিকে, টুটু কি আছে? না! ওর এখন পড়াতে যাওয়ার সময়, এমন ভাবেই আমি জেনে যাই, সারাদিনে সে কি করে৷ বিকেলে দুটো টিউশনি করে টুটু৷ আমাদের এই হাউজিং এষ্টেটেরই দু'নম্বর রোডের কোথাও একটা পড়াতে যায় ও, সপ্তায় পাঁচদিন৷ আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এলেই ও বেরিয়ে যায় সাইকেলে চেপে, টিউশনিতে৷ আমি ওবাড়ির খালাম্মার কাছ থেকেই গল্প শুনেছি৷ টুটু তার বড় আপার ছেলে৷ টুটুর মা, বাবা গ্রামে থাকেন৷ যেখানে কোন কলেজ নেই৷ টুটু তার গ্রামের স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে খালার বাসায় এসেছে কলেজে পড়বে বলে৷ সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা৷ বছর তিন তো হবেই! টুটু আসার আগে আমি প্রায় রোজই যেতাম খালাম্মার কাছে, স্কুল থেকে ফিরে, ছুটির দিনে যখন তখন৷ টুটু আসার পরেও যেতাম৷ টুটু কখনই আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেনি৷ আমি প্রথম টুটুকে দেখে বেশ মজা পেয়েছিলাম৷ ফর্সা ভ্যাদভ্যাদে গায়ের রং, মাথার কোকড়ানো চুল তেল চুপচুপে, ছোট্ট একটা গোঁপও আছে৷ টুটুর অত ফর্সা গায়ের রং দেখে কী আমার হিংসে হয়েছিল! আমাকে যদিও কেউ কালো বলে না কিন্তু ফর্সাও কেউ কোনমতেই বলতে পারে না, বলে উজ্জ্বল শ্যাম! উজ্জ্বল শ্যাম না ছাই, আমি জানি, আমি কালো, খুব বেশি হলে শ্যামলা বলা যায় আমাকে৷ ঢ্যাঙা টুটু শার্টের সাথে লুঙ্গি পরে থাকে বাড়িতে, গোড়ালির উপরে সেই লুঙ্গির ঝুল৷ টুটু এত ঢ্যাঙা যে লুঙ্গি ওর নিচে আর নামে না৷ খালার বাসায় থাকতে আসার এক মাসের মধ্যেই টুটু আমায় চিঠি লেখে৷
" রুকু,
আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি আমার মন চুরি করেছ৷ আমি কি তোমার মন চুরি করতে পেরেছি?
যদি আমিও তোমার মনকে চুরি করতে পেরে থাকি তো আমার এই চিঠির উত্তর তুমি আমার বইয়ের ভেতরে রেখে যেও৷
তোমার চিঠির অপেক্ষায় রইলাম৷
তোমার,
জাহিদ৷'

আমি সেই প্রথম জানতে পারলাম যে ওর ভাল নাম জাহিদ৷ না৷ টুটুর চিঠির উত্তর আমি বইয়ের ভেতর রেখে আসিনি৷ উত্তর দেব এমনটাও ভাবিনি৷ চিঠিটা রেখে দিয়েছিলাম পড়ার টেবিলে৷ গল্পের বই পড়ছি কী না চেক করতে এসে সেই চিঠি বাজেয়াপ্ত করে আম্মু৷ ভাল মন্দ কোন কথা জিজ্ঞেস না করেই বিনুনী ধরে এক হ্যাচকা টান আর সপাট চড় দু"গালে৷ কোন দোষ না করেই আমি মার খেলাম সেদিন, টুটু আমাকে চিঠি লিখেছিল বলে৷ এক ছুটে আমি টুটুর খালার বাসায়, উলের গোলা কোলে নিয়ে সোয়েটার বুনছিলেন খালাম্মা, সারাদিনই তিনি বোনেন৷ ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঘটনার বর্ণনা দিলাম আমি৷ খালাম্মা উঠে গিয়ে দরজার ওপাশ থেকে কান ধরে ঘরে নিয়ে এলেন টুটুকে৷ আমাকে আসতে দেখে নি:শব্দে দরজার ওপাশে এসে দাঁড়িয়েছিল টুটু, খালাম্মা বললেন, দ্যাখ, কি করেছিস! প্রচন্ড রাগে আমি মুখ ফিরিয়ে ছিলাম টুটুর দিক থেকে , খালাম্মা আবার বললেন, তুই কাঁদছিস কেন, মার তো খেয়েছে রুকু৷ আমি জানলাম, আমি মার খেলে টুটুও কাঁদে৷ টুটু বলল, আর হবে না আম্মি৷ জানলাম, টুটু তার খালাকে আম্মি বলে ডাকে৷ দরজার ওপাশে আম্মুর গলা পেলাম, রুকু, উঠে এসো! তাকিয়ে দেখলাম গম্ভীর মুখে আম্মু দাঁড়িয়ে আছে দরজায়৷ খালাম্মা বললেন, আপা, আপনি রুকুকে কেন মারলেন? ও কি দোষ করেছে? আম্মু কোন কথার জবাব না দিয়ে হাত ধরে আমাকে বাড়ির দিকে এগোল৷ বেরুনোর সময় আমি তাকালাম টুটুর দিকে, গভীর কালো দুটো চোখ নিষ্পলক তাকিয়ে আমার দিকে, যেন বলছে, রুকু, আর হবে না! ঘরে ফিরে আমার বিনুনী খুলে দিল, ভিজে তোয়ালেতে মুখ মুছিয়ে দিল আর বলল, তুই ওকে চিঠি লিখিসনি তো? ঘাড় নেড়ে জানালাম, না, আমি লিখিনি৷ আম্মু তখন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে আমাকে সামনে বসিয়ে তেলের বাটি আর চিরুণী হাতে নিয়ে আমার চুলে তেল দিতে বসল রোজকার মত আর আমাকে পাঠ দিল ছেলেদের সম্পর্কে, সেই আমি প্রথম জানলাম, ছেলেগুলো এরকমই হয়৷ মেয়েদের চিঠি লেখে, ফুসলায় আর তারপরে নষ্ট করে দেয়৷


(চলবে)
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712679 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712679 2007-05-26 21:46:51
অর্কুট একটা সময় প্রচুর সময় দিয়েছি অর্কুটকে। প্রচুর স্ক্র্যাপ, প্রচুর বন্ধু। দিব্যি লাগত। কিন্তু ইদানিং টানটা কমে এসেছিল। কমে এসেছিল স্ক্র্যাপ, আড্ডা। ভাল লাগছিল না।

কিছুদিন আগেও ভেবেছিলাম ডিলিট করে দেওয়ার কথা কিন্তু আমার ৬৪টি পাঙ্খার কথা ভেবে মন সায় দেয় নাই। বারো হাজার স্ক্র্যাপ ডিলিট করেই ক্ষান্ত দিয়েছিলাম।

আজ উড়িয়েই দিলাম। সকাল সকাল। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712313 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712313 2007-05-24 11:50:24
আনারসি ঘাঘা
পাতাগুলো খোলা তরোয়ালের মত, হাওয়ায় দুলত শিরশির করে। ঐ যে কয় না মড়ার পরে খাঁড়ার ঘা, পাতার গায়ে খোদা খোদা গোলাপকাঁটার মত। একবার লাগলে অমন তরবারীর নকশা থেকে যায় গায়ের উপর। আনারস মরশুমি ফল। একসময় সে তার তরবারী নিয়ে ভ্যানিশ হয়ে যায়। আমার দেহের ট্যাটুও বেশিদিন টেকে না।

আনারস ছিল খুব মিষ্টি।

পাহাড়ের ধাপে ধাপে চাষ হত। গায়ে ছিল হাজার হাজার চোখ। সবকিছু নজর রাখত, কমপ্লিট ডেটাবেস। সবুজ থেকে আস্তে আস্তে রং ধরত আনারসে। এবার নিশ্চয়ই তোরা আমায় খাবি! চোখ রাঙাত আনারস।

আনারসে ছিল খুব রস।

কাটতে গেলেই হেসে গড়িয়ে পড়ত। কুটিপাটি। তখনও হাজারে হাজারে চোখ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে, তোরা কি বোকা! আমায় যদি না খেতিস আমি হতাম তোদের পাহারাদার! তরোয়াল বাগিয়ে তোদের বেড়ায় বসে থাকতাম, কেউ ঢোকার সাহস পেত না।

আনারস খুব মজার।

ব্যাটা নিধিরাম সদ্দার, ঢাল নাই কেবল তরোয়াল। আর বড় বড় কথা। সেইসব ফুট মিষ্টি না। সারাদিন চলতে ফিরতে ফটাস ফটাস ফোটে তাই আদার কুচি আর চিনি মিশায়ে চাটনি বানায়ে ফেললাম। আনারসের চাটনি।

মজা টের পাইসে।

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712233 http://www.somewhereinblog.net/blog/thikthakblog/28712233 2007-05-23 21:18:42