বাংলায় একটা কথা আছে, তেলে জলে মেশেনা। তেলের সাথে কেবল যে একমাত্র জল এরই বৈরীতা রয়েছে, তাই নয়, তেল এর সাথে বেগুন এর সম্পর্কও খুব একটা সূখকর নয়। ‘তেলে বেগুনে’ জ্বলে ওঠার কথা নিশ্চয়ই সবাই জানেন এবং প্রায়ই শুনে থাকবেন। লেখার মত এত বিষয় থাকতে কেনইবা তেল, জল কিংবা তেল আর বেগুন কিংবা তাদের পারষ্পরিক সম্পর্ক নিয়ে লাগলাম, শ্রদ্ধেয় পাঠকের মনে সে প্রশ্নটা উঠতেই পারে।
কথাটাকে মনে করিয়ে দিল অতি সা¤প্রতিক একটা ঘটনা। ঘটনাটি হলো, বিগত কিছু দিন আগে ‘আমার দেশ’ দৈনিক পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী তনয় যুবরাজ জয় আর প্রধানমন্ত্রীর খনিজ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড: তৌফিক এলাহি চৌধুরী বিশাল অংকের টাকা ঘুঁষ নিয়ে মার্কিন একটা কোম্পানিকে বাংলাদেশে ক¤েপ্রসার বাসানোর কাজ দিয়েছেন, তাও আবার বিনা টেন্ডারে এবং স্বয়ং সংশ্লিষ্ঠ বিভাগীয় প্রধানের আপত্তিকে উপেক্ষা করেই, মর্মে একটা খবর প্রকাশ ও সেব্যাপারে সংশ্লিষ্ঠদের প্রতিক্রিয়া দেখে।
উল্লেখ্য, খবরটি ‘আমার দেশ’ এর খবÍ নয়। পেট্রোবাংলারই জনৈক কর্মচারী আবু সিদ্দিক (বেচারা লগী বৈঠার ভয়ে যে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, সেটা বোঝায় যায়) পেট্রোবাংলারই প্যাডে প্রধানমন্ত্রী সমীপে লিখিত অভিযোগ করেছেন। তাও আবার কবে, কার মাধ্যমে, এবং কোথায় কত টাকা মার্কিন ডলার এ লেন দেন হয়েছে, তার দিন তারিখ উল্লেখ করে! অভিযোগ পেয়ে সংশ্লিষ্ঠ অধিদপ্তর আর মন্ত্রনালয় নিজেদের মধ্যে চিঠি চালাচালি করেছে সরকারি স্মারক নম্বর ব্যবহার করেই। কে তদন্ত করবে, আর কে করবে না, বা করতে অপারগ, সে বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এর মধ্যে টানাপোড়েন হচ্ছে। কেউই এই বিষয়ে তদন্ত করতে চাইছেনা।
কারণ? তাদের নিজেদের সরকারি মোমোতেই আছে, তা হলো, অভিযোগ যাঁদের উপরে উঠেছে তারা হলেন, তাঁদের ভাঁষায়, খুবই ‘স্পর্শকাতর ব্যক্তি’। বিষয়টা সরকারের আজ্ঞাবহ মিডিয়াকর্মরা ঠিকই জানত। কিন্তু তারা এ বিষয়ে কোন খবরই জাতিকে জানান দেননি। তারা বরং ব্যস্ত ছিলেন তারেক আর কোকার বিরুদ্ধে তাদের কল্পিত ও তদন্ত করেও কোন সত্যতা না পাওয়া অভিযোগগুলোকেই আবার নতুন করে আওড়াতে!
তবে ‘আমার দেশ’ খবরটি ফাঁস করে দিয়েছে। উত্থাপিত অভিযোগ এর কোন সত্যতা আদৌ আছে কিনা, সেটার ব্যাপারে তাঁরা একটা কথাও বলেনি। তাঁরা কেবল এতটুকু বলেছে যে, উক্ত অভিযোগ নিয়ে সরকারের মন্ত্রনালয় আর দপ্তর অধিদপ্তর এর মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছে।
‘আমার দেশ’ কেবল এতটুকুই বলেছে। আর তাতেই যেন বাংলাদেশে এক প্রলয়ংকারী সূনামী হয়ে গেছে! দেশের আনাচে কানাচে থেকে চেনামহল এমন ত্বরস্বরে চেঁচিয়ে উঠেছে, যেন একদল পাগলা সারমেয়! পত্রিকাটির সার্কুলেশন কত? সেটা আমার জানা নেই। তবে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক দিকটি বিবেচনা করলে এটা ধরে নেয় কোনমতেই অসঙ্গত হবেনা যে, তার সার্কুলেশন সংখা কোনমতেই পাঁচ লক্ষের বেশী হবেনা। বড়জোর এই পাঁচলক্ষ পাঠকই ‘আমার দেশ’ এর এই খবরটি পড়েছিল। তাদের মুখে শুনে আরও না হয় পাঁচ থেকে দশ লক্ষ লোক খবরটি জেনেছিল।
কিন্তু এখনতো পুরো দেশেরই কোটি কোটি মানুষ খবরটি জেনে গেছেন। যে প্রক্রিয়ায় তারা তা জেনেছেন, সেই প্রক্রিয়াটির কথা মনে করেই আমার তেল আর বেগুন এর পাষ্পরিক সম্পর্কের কথা মনে পড়ে গেছে। আর সেই বিষয়টিই এই লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি। ‘আমার দেশ’ পত্রিকাটি পড়ে যতজন বিষযটি জেনেছেন, তার চেয়ে কয়েক শত কিংবা হাজারগুন বেশী মানুষ জেনেছেন, খবর প্রকাশের পরে এই দলটির নেতা কর্মীদের তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা দেখে! সাধু সাধু!! একেই বলে ‘বুমেরাং’এই ‘হাইপার রিএ্যক্টিভিটিই’ বলে দেয় ‘ডালমে যে কুছ কালা হায়!’
তেমনটা বোঝার আরও সঙ্গত কারণ আছে। সূধী পাঠকের হয়ত স্মরণ থাকতে পারে যে, এই ড: তৌফিকই বিগত আওয়ািমি সরাকরের ক্ষমতাকালে জ্বালানী সচিব এর দায়িত্ব পালন করেছেন। আর তিনিই ছিলেন বহুল আলোচিত নাইকো ঘূঁষ কেলেংকারির মূল নায়কদের একজন। উক্ত দূর্ণীতি মামলায় বিগত ত্বত্তাবধায়ক সরকারের আমলে দীর্ঘ তদন্ত প্রমান সাপেক্ষে দোষী সাবস্ত হয়ে তিনি জেলও খেটেছেন।
অবশ্য ক’দিন আগে ক্ষর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী মহোদয় এই ড: তৌফিক সন্মন্ধে সুন্দর এক সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ড: এলাহি নাকি সততার এক উ্জ্জল দৃষ্টান্ত! কেন তিনি সততার উজ্জল দৃষ্টান্ত? সে কথাও তিনি বলেছেন। তাঁর মতে ড: তৌফিক’কে ত্বত্তবাধায়ক সরকার ধরে নিয়ে জোর জুলুম করে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলতে চাপ দিয়েছিল, তার পরেও ‘বাপকা বেটা’ এই ড: সাহেব শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কোন কথাই বলেন নি। আর সেটাই নাকি তাঁর সততার উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। ধরনী দ্বিূধা হও!
যাহোক, মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই ব্ক্তব্য সরাসরি আদলতের প্রতি এক ধরনের উষ্মা প্রকাশ কিনা, আদালতের রায় এর প্রতি ব্যঙ্গ কিনা, সেটা অবশ্য বিজ্ঞজনেরাই ভালো বলতে পারবেন, আমার সে কথায় গিয়ে কোন কাজ নেই, আর সে পরিসরও এটা নয়। আমি বরং আসল কথাই ফিরে আসি। আর তা হলো আদালতে ব্যাপক অনুসন্ধান, তথ্য প্যমান উপস্থার পর্যালোচনা যুক্তি তর্ক বিচার বিশ্লেষন শেষে যাকে দোষী বলে রায় দিল যাকে রাষ্ট্রিয় সম্পত্তি আত্বসাঃ কার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হলো যাকে, সাজাও দেয়া হলো, সেই একই দাগী আসামি, আদালত কর্তৃক প্রমানিত রাষ্ট্রিয় সম্পত্তি বিসর্জন দিয়ে নিজের স্বার্থ আদায়ে পারঙ্গম একজনকে আবারও এই সরকার খোদ প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা বানিয়েছে!
সুধী পাঠক, ব্যাপারটা কে কেমন একটু অন্যরকম বলে মনে হচ্ছেনা? এটাকে কি আমরা এক ধরণের পুরষ্কার হিসেবে ধরে নিতে পারি? খেয়াল করে দেখুন, ত্বত্তাবধায়ক সরকার আমলে আওয়ামি লীগ এর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল রিমান্ডের চাপে সুবোধ বালকের মত পট পট করে সব বলে দিয়েছেন, তাঁর নেত্রী কার কার কাছ থেকে মাসে কত টাকা নিতেন, কার কাছ থেকে এককালীন কত টাকা নজরাণা নিয়েছেন সব ফাঁস করে দিয়েছেন। তার শাস্তিও তিনি পেয়েছেন। তিনি যে কেবল সাধারণ সম্পাদক পদটিই হারিয়েছেন তাই নয়, তিনি তার দলে একেবারে কোনঠাসা হয়ে রয়েছেন।
এই সেই জলিল সাহেব, বিগত আওয়ামি লীগ সরকারের আমলে যাঁর মুখ দিয়ে খই ফুটত, বিরোধি দলে থাকার সময় যিনি কথা কথায় ‘এক টান মেরে’ সরকার ফেলে দিতেন ! যার হাতে সব সময় তখন ‘তুরুপের তাস ’ থাকত, যখন তখন যিনি আলিটমেটামও দিতেন! তার আজকের এই অবস্থা কেবলমাত্র একটা কারণেই, তা হলো তিনি চাপ এর মুখে অবিচলতার প্রমান দিতে পারেন নি বরং কোন কোন তহবীল হতে নেত্রীর ঝাঁপিতে ‘মা লক্ষী’ এসে উঠতেন, তা সবই পট পট ফাঁস করে দিয়েছেন!
আরও একজন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আপন ফুপাতো ভাই, শেখ শহিদুল হক সেলিম, আ্রওয়ামি পরিবার ও দলের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। বিগত ত্বত্তাবধায়ক সরকারের আমলে আর্মির হাতে ধরা খেয়ে তিনিও আজম যে চৌধুরী থেকে কোটি কোটি টাকা ঘুঁষ নিয়েছেন , তাঁর বোন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোটি টাকা ঘুঁষ নিয়ে দিয়েছেন, তা কেবল স্বীকারই করেন নি, বরং তিনি কিভাবে টাকা নিয়েছেন? কোন চেক কোন একাউন্টে জমা হয়েছে, সব পট পট করে ফাঁস করে দিয়েছেন! এখনও ইন্টারনেটে সে সব স্বীকারোক্তি বহাল ত্ববিয়তেই বিদ্যমান আছে, যে কোন লোক ইচ্ছে করলেই যে কোন সময় তা শুনে নিতে পারেন। যাহোক, শেখ সেলিম এর এই স্বীকারোক্তির কারণে তাঁকেও বর্তমান ডিজিটাল সরকারের কোন গুরুত্বপূর্ণ পদেই রাখা হয়নি। এটাও এক ধরণের শাস্তি বটে।
কিন্তু এর বিপরিতে জনাব তৌফিক এলাহি চৌধুরি সাহেব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনেক বিশস্থতার প্রমান দিয়েছেন। আর্মির হাতে ধরা খেয়েছেন, (পর্দার আড়ালে আরও কত কি খেয়েছেন, হজম করেছেন, তা অবশ্য আমরা সঠিক জানিও না!) জেল খেটেছেন, তবুও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তেমন কিছুই বলেন নি, কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যই দেন নি। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজের আপন ফুপাতো ভাই, নিজ দলের সাধারণ সম্পাদক এর মত লোকজন সব ফাঁস কওে দিয়েছেন সেখানে ড: তৌফিক কোন তথ্যই দেন নি! আনুগত্যেও নমুনা বটে! আর এই ধরণে অকৃত্রিম আনুগত্যের কারণে তাঁর উপরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের এক ধরনের কৃতজ্ঞতা থাকতেই পারে। আর সেই কৃতজ্ঞতার পুরষ্কার স্বরুপই হয়ত তিনি আবার সেই একই দাগী আসামিকেই সেই একই মন্ত্রনালয় এর দায়িত্ব দিয়ে উপদেষ্টা বানিয়েছেন!
কোন স্বাভাবিক বিচার বিবেক বুদ্ধির মানুষ কি আদালত কর্তৃক প্রমানিত একজন দাগী আসামিকে আবার চৌকিদার বানায়? শেয়ালকেই কি আবার কেউ তার মুরগী পাহারায় নিয়োজিত করে? কিন্তু আমাদের ডিজিটাল সরকার তা করেছে! এই বিশাল বাংলাদেশে তারা আর যোগ্য লোক পান নি, দূর্ণীতির দায়ে আদালতে জেল খাটা বিশ্ব বেহায়া এরশাদ হলেন বর্তমান সরকারের মিত্র! জোট এর সাথী!! আদালত কর্তৃক প্রমানিত ও ঘোষিত আর এক দাগী জেলখাটা ড: তৌফিক হলেন এই সরকারের, তথা দূর্ণীতি নির্মূল এ বদ্ধপরিকর, ডিজিটাল সরকার এর উপদেষ্টা!
যে সরকার দূর্ণীতি দমনে আন্তরিক, দূর্ণীতির বিরুদ্ধে জেহাদ এ নেমেছে, কোন কোন মহলের কথিত দূর্ণীতির বিরুদ্ধে দিন রাত গলা ফাটিয়ে ফেলেন, সেই সরকার এর কাছেই কি আবার কেউ এমন বৈপরিত্য কল্পনা করেন? না সেটা করতেই পারেন! পুরো জাতি জানে, অথবা বলা চলে, জানতে পেরেছে স্বয়ং আওয়ামী নেতা নেত্রীদের সুবাদে যে, তাদের নেতা নেত্রীরা দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কোটি কোটি টাকা অবৈধ আয় করেছেনূ, তার তথ্য প্রমানসহ জাতির সামনে তা তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সেগুলো এতটাই অকাট্য যে, তা অস্বীকার করার কোন জো’ই নেই। কারোরই নেইূ। সেই তাদেরই বিরুদ্ধে আবার একই রকম অভিযোগ যখন উঠেছে, আবার সেই তাঁদেরই কেউ কেউ মাত্র কিছুদিন আগেও আদালত কর্তৃক দোষী ও দূর্ণীতিবাজ প্রমানিত, সেই তাঁরা যখন সরকারের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেই অভিযোগ এ অভিযুক্ত হন, তখন যে কোন সরকার আর দেশপ্রেমিক নাগরিকই চাইবে অভিযোগ এর সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্ত হোক।ূ অন্তত’ সরকারকে, সরকার প্রধানকে, বিতর্কের উর্ধে রাখতে হলেও। কিন্তু সেটা না করে বরং করা হচ্ছে উল্টো!
ূএখানেই দেশবাসীর যত ক্ষোভ আর সন্দেহ। এই সন্দেহ আর কেউ নয়, স্বয়ং সরকারই তৈরী করে দিচ্ছেন। অবাক করার মত বিষয় হলো, আওয়ামি লীগ দলীয় রাজনীতিবীদরাও এ ব্যাপারে খামোশ থাকার পথ ধরেছেন! এতে যে তাঁদের দলীয় রাজনীতির বারোটা বাজবে, আর তার শীকার তাঁরাই হবেন সর্বাগ্রে, সেটা বোধ হয় তারা বুঝেই উঠতে চাইছেন না!
শেখ হাসিনা একদিন নিশ্চয়ই রিটায়ার করবেন। তাঁর পুত্র যুবরাজ জয়ও তো সেই ফ্লোরিডায় বসে আয়েশে বিনাশ্রমে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার এর হিঁসেব কষবেন। কিন্তু এই বাংলাদেশটায় বসে রাজনীতির চড়াই উতরাই পেরুতে হবে এইসব রাজনীতিবীদকেই, এই আওয়ামি লীগকেই। দলটির নেতা কর্মীদের মনে রাখতে হবে, নেতা নেত্রীর চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়েও বড় হলো দেশ।
কিন্তু দিন বদলের দিন বলে কথা! এইসব দিন বদলের দিনে নীতি-রাজনীতি, দেশপ্রেম, সততা, এসবের সংগা থেকে শুরু করে বিশ্বজনীন যে কোন মানবিক বৈশিষ্ঠের চিরন্তন ধারণাই পাল্টে যায়! তবেই না এটা ‘দিন বদলের দিন’!! যে সরকার এমনটা করেন, সেই সরকারই হলেন ‘দিন বদলের সরকার’!!!ূ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



