প্রখাত ইংরেজ সাহিত্যিক, চিন্তাবীদ ‘জর্জ অরওয়েল’ তাঁর লেখা ‘হোয়াই আই রাইট’ নামক গ্রন্থে তিনি কেন লিখেন? কেন লেখা লেখি করেন? সে বিষয়ে লেখার পাশাপাশি অন্যান্য লেখকরা কেন লেখালেখি করেন, সে বিষয়েও অনেক কথাই লিখেছেন। একজন লেখক এর মনস্তাত্বিক বিশ্লেষন তিনি করেছেন তাঁর নিজের দৃষ্টিভংগি থেকে। সেখানে তিনি চারটি কারণ এর উল্লেখ করে বলেছেন, এই চারটি কারণের যে কোন এক বা একাধিক কারণেই একজন লেখক লেখালেখি করে থাকেন। কারণগুলো তিনি তাঁর নিজের আক্বিদা, বিশ্বাস আর দৃষ্টিভংগীতে বিশদ ভাবে বলেছেন।
তাঁর উক্ত গ্রন্থে মি: জর্জ একজন লেখকের তৃপ্তি, সফলতা, ব্যর্থতা, তার প্রাপ্তি, এসব নিয়েও কম বেশী কথা লিখেছেন। যাঁরা বই্িট পড়েছেন বা নিকট ভবিষ্যতে তা পড়বেন, তাঁরা সেসব বিষয় জানবেন। কাজেই সেটা নিয়ে আমার কোন আলোচনা আজকের এই নিবন্ধে নয়। তার পরেও এই লেখায় সে বিষয়ের অবতারণা করলাম এই কারণে যে, আজ আমিও এই লেখা লেখি নিয়েই দু কথা লিখব।
মনুষ্য সমাজ তার বিবর্তিনের ক্রমপর্যায় পার হতে হতে এমন একটা পর্যায়ে এসে আজ দাঁড়িয়েছে যে, যেখানে যুক্তি আর বিশ্লেষন হলো মতাদর্শ তৈরী হবার বা তা পরিবর্তিত হবার একমাত্র মাধ্যম। বিশ্বে আজ পর্যন্ত যতগুলো বিপ্লবের কথা আমরা জানি, তার সবগুলো হয়েছে মানুষের মনোজগতে এক ধরণের পরিবর্তনের সুত্র ধরে। আর এই পরিবর্তনটা সাধিত হয় কোন্ একটা বিশেষ মতাদর্শকে কেন্দ্র করেই।
এমনিতেই কোন পরিবর্তন আসেনা সমাজে। মানুষ সহজে কোন পরিবর্তনকে মেনে নিতে চায়না, যদিনা তার সাথে তার মতাদর্শের মিল না থাকে , না থাকে কোন সম্পৃক্তত। আর এই মানসিক সম্পৃক্ততাটা তৈরীই হয় চিন্তা, বিশ্বাস আর আক্বীদার জগতে পরিবর্তন এর মাধ্যমে। এটাই মানুষের সহজাত মানবিক প্রবৃত্তি। এর কোন ব্যতয় নেই। তবে জোর করে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে কোন বিশেষ মতাদর্শের প্রতি টেনে নেয়া হলে সে কথা অবশ্য আলাদা। প্রশ্ন হলো, কি ভাবে এই পরির্বতনটা আসবে ব্যাপক জনগোষ্ঠির মনের মাঝে, তাদের চিন্তা আর চেতনার জগতে?
এর উত্তরটা বোধ হয় কোন সচেতন মানুষকে, বিশেষ করে, কোন সচেতন মুসলমানকেই আর বলে দিতে হবেনা। যুগে যুগে নবী, রাসুল ও তাঁদের অনুসারীদের সমাজ সংষ্কার এর যে কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে তার দিকে, সে ইতিহাাসের গতিধারার দিকে যদি কেউ একবার নজর বুলিয়ে নেন, তা হলেই তাঁর কাছে পুরো বিষয়টা জলবৎতরলং পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠবে।
কেবলমাত্র নবী রাসুলদের মত মহান ব্যক্তিদের কথাইবা বলি কেন, যে কোন সামাজিক বিপ্লবের ইতিহাসের গতিধারা যদি একটু খেয়াল করেন, তা হলেই দেখবেন যে, সেই বিপ্লবের গোড়াতেই ছিল একটা জাতি বা তার বৃহৎ একটা অংশকে উদ্বুদ্ধ করে বা কৌশলে প্রচার প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত করে বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে জবরদস্তিমুলকভাবে একটি বিশেষ আদর্শের প্রতি ধাবিত করার ঘটনা। তার পরেই কেবল এসেছে সমাজ বিপ্লব, একটা পরিবর্তন।
ইসলামের ইতিহাস যদি আমরা ঘেঁটে দেখি, তা হলে দেখতে পাব, এখানে একমাত্র যে পদ্ধতিটি অবলম্বন করা করা হয়েছে, তা হলো, মানুষের কাছে জ্ঞান, তথ্য আর যুক্তির মাধ্যমে প্রকৃত সত্যটাকে তুলে ধরা হয়েছে। আর এর পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তার নিজের চিন্তার জগতে। স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে তাকে ভেবে দেখার। বিচার বিশ্লেষন করার।
এর অনিবার্য পরিণতি যেটা হয়েছে তা এই যে, দলে দলে মানুষ প্গংপালের মত এসে এই আদর্শের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। এর জন্য সে নিজের পরিবার পরিজন, ব্যবসা- বানিজ্য, ক্ষমতা-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি, সবকিছুই হাঁসিমুখে বিসর্জন দিয়েছে! এমনকি নিজের জীবনকেও অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। দিয়েছে যে, সে ইতিহাস আমাদের সামনেই রয়েছে শত শত, তা আর নতুন করে বলার কোন অপেক্ষা রাখেনা।
তারা এমনটি করতে পেরেছিল এই কারণে যে, তাঁদের মনোজগতে একটা পরিবর্তন সূচিত হয়েচিল। এই পরিবর্তনটা এমনিতেই হয়নি। এর জন্য কাউকে না কাউকে তাঁদের সামনে তথ্য, জ্ঞান, আর যুক্তি তুলে ধরতে হয়েছিল। আমাদের প্রিয় রাসুলুল্লাহ সা: কি তাঁর পুরোটা জীবন এই কাজটিই করেন নি? ইসলামি বিপ্লব, যার কথা আমরা বার বার বলে থাকি, পুরো মানব সভ্যতাকেই যে বিপ্লবটা চিরদিনের জন্যই বদলে দিয়ে গেছে, তার বিস্তার কি এ পথেই হয়নি? তার প্রতিষ্ঠাও কি এ পথে আসেনি?
আসলে এর উত্তর সবারই জানা। এটাই বাস্তবতা যে, মানুষের মনোজগতে কোন পরিবর্তন আনতে হলে যুক্তি, তথ্য, আর তত্ব দিয়ে তার জ্ঞান এর জগতকে সমৃদ্ধ করে দিতে হবে। তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে ভেবে দেখতে, তার বিবেক কি বলে সংশ্লিষ্ঠ বিষয়ে? তার নিজের ভেতরের যে সত্তা, সেই সত্তাটা কি বলে? সে প্রশ্নের উত্তর তাকেই খুজে বের করতে দিতে হবে।
এ ভাবেই আসে ব্যক্তির মানসিক পরিবর্তন, পরিবর্তন হয় চিন্তা আর চেতনার জগত। এই পরিবর্তনটাই তাকে পরিচালিত করে থাকে তার পথে। সে স্বিদ্ধান্ত নেয়, কোন পথে সে যাবে? কোন পথে সে তার নিজের জীবনকে পরিচালিত করবে? কোন পথে সে তার সমাজকে পরিচালিত করতে চাইবে?
একটা সময় ছিল যখন প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার প্রচলন ছিলনা। আবার কখনও যদিওবা তা ছিল, তা ছিল সীমিত। আজ পরিস্থিতি এমনটাই দাঁড়িয়েছে যে, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমই হলো চিন্তা, যুক্তি, তত্ব, আর তথ্যকে সাধারণ মানুষের কাছে ুতলে ধরার, তা পৌছে দেবার, একমাত্র কার্যকর মাধ্যম ।
এই মাধ্যমকে ভর করেই কার্ল মার্কস আর এঞ্জেল তাদের মতাদর্শকে তুলে ধরেছেন। কি ভাবে একটা বিশাল গোষ্ঠিকে উজ্জীবিত করেছেন, তা কি আমাদের চোখের সামনে নেই? কিভাবে ডারউইন এর মানবতা বিধ্বংসি একটা ভূল মতবাদ পুরো মানব গোষ্ঠির এক বিরাট অংশকে তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করেছে, কিভাবে সেই বিভ্রান্ত গোষ্ঠিই এই মতবাদকে তাদের আরাধ্য, অবধারিত বিশ্বাস এ পরিণত করে নিয়েছে, তা কি আমরা নিজেদের চোখেই এই বিশ্বে আমাদের চারিপাশে দেখছি না?
ফারাবীর দর্শন চেতনা, রুমী কিংবা ইবনে রুশদ এর অন্তর্ভেদী ভাবনা কি আজও বিশ্বের মানুষকে আলোড়িত করেনা, করেনি কি মধ্য যুগের পুরো ইউরোপকেই? গাজ্জালীর চিন্তা কি আজও ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে চিন্তার খোরক জোগায়না? কিন্তু সেতো অতিত ইতিহাস। আমাদের বর্তমান প্রজন্মের ক’জন এইসব মহান ব্যক্তিদের নাম জানে? ক’জন তাঁদেরকে চেনে?
চিন্তা আর দর্শনের ভূবনে আমরা আমাদের বিচরণ ছেড়েছি বলেই না এ দায়িত্বটা তুলে নিয়েছে অন্য কেউ। আর সেই ‘অন্য কেউ’দের দল পুরো বিশ্বটাকে কোন পর্যায়ে এনে দাঁড় দিয়েছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে কি আর? তারা কি বিপ্লব এর পর বিপ্লব, রেভিউলিশন এর পর রেভিউলিশন ঘটিয়ে মানবতাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করায়নি?
কেউ কি, বিশেষ করে, কোন সচেতন মুসলমান কি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারবেন? মানবতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বটে, তবে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মুসলমানরা, ইসলাম এর অনুসারীরা। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বললে তো অনেক কমই বলা হয়। বরং বলা চলে, মুসলমানরা আজ দ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
আজ থেকে পঞ্চাশ ষাট বৎসর আগে যাদের জন্ম, যাঁরা হিন্দু, মুসলমান বা খৃষ্টান যে কোন একটা ধর্মীয় আবহের মধ্যে জন্ম নিয়ে বড় হয়েছেন, তারা এই বিশ্বটা কি ভাবে দ্রুততার সাথে ধর্মীয় দৃষ্টিকোন বিচারে অষহিষ্ণু হয়ে উঠল, তা নিজের চোখেই দেখেছেন। একদিন যে ইসলামকে সারা বিশ্ববাসী শান্তির ধর্ম হিসেবে জেনেছেন, সেই বিশ্ববাসীই আজ সেই একই ধর্মকেই জানে সন্ত্রাসের ধর্ম হিসেবে!
যে ইসলাম এর আগমনই হলো মানুষকে সকল অশান্তি থেকে, সকল ধরণের পরাধীনতা থেকে, সকল ধরণের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করার জন্য, যে ইসলাম এর আগমনই হলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরুৃ করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিয় এবং আন্তর্জাতিক জীবনেও সাম্য, শন্তি, আর স্থীতি প্রতিষ্টার জন্য, আজ সেই ইসলামকেই দেখা হচ্ছে অশান্তির ধর্ম হিসেবে! বিশ্বের কোনে কোনে এমনও ঘটনা দেখা যাচ্ছে যে, মুসলমানরা তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে মুসলিম পরিচয়ে রাস্তা ঘাটেও বের হতে পারছেনা।
ফলে তারা নিজেদের বেশ ভূষাই কেবল বদলচ্ছেন না, বরং নিজেদের ইসলামি নামটাকেও বিকৃত করে বদলে ফেলছেন। এর একটা সামাজিক, মনস্তাত্বিক, সং®কৃতিক, রাজনৈতিক, আদর্শিক আর নৃত্বাত্বিক প্রভাব অবশ্যই পড়বে এই জাতিসত্তার উপরে। পড়বে কি, ইতিমধ্যেই তা ফলতে দেখা যাচ্ছ্।ে যাঁদের দেখার চোখ আছে, তাঁরা ঠিকই তা দেখতে পারছেন। এ এক সর্বনাশা প্রক্রিয়া! একে রুখতেই হবে। আজকের দিনে এটাইতো সবচেয়ে বড় জেহাদ হওয়া উচিৎ
কিন্তু আজকের মুজাহিদরা দিকে দিকে হোঁচট খেয়ে বেড়াচ্ছে। জেহাদ এর নামে তারা নিরীহ নরনারীকে হত্যা করে বেড়চেচ্ছ। কলংক এঁকে বেড়াচ্ছে ইসলাম এর কপালে। তাদেরই বা দোষ দিয়ে লাভ কি? শতাব্দীর অজ্ঞানতার আঁধাÍ যে এখনও কাটেনি, এখনও যে তাদের বেশীরভাগ জনগোষ্ঠির কাছে ইসলাম এর যথার্থ চিত্রই পরিষ্কার হয়ে উঠেনি! তারা যে এখনও জানেই না যে, ইসলাম কেবল মুসলমানের ধর্ম নয়, বরং ইসলাম হলো মানুষের ধর্ম। সকল মানুষের!
তারা জানেই না যে, জেহাদতো শুরু হয় নিজের সত্তার সাথে অহর্ণীশ লড়াই করে যাবার মাধ্যমে। তারা এটাও জানেনা যে, নিজেকে ইসলাম এর জ্ঞান এ না সাঁজিয়ে, নিজের চরিত্রটাকে ইসলাম এর রং এ না রাঙ্গিয়ে জেহাদ এ নামাটা আর কিছুই নয়, শয়তানেরই আরও একটা প্ররোচনা, আরও একটা উস্কানী। যার মাধ্যমে জান্নাত নয়, মেলে নিশ্চিত জাহান্নাম!
চিন্তা আর চেতনার জগতে এই স্বচ্ছতা না এনেই কোন কোন মুসলমান জেহাদে নেমে গেছে! তাদেও কাছে পৌছে দিতে হবে ইসলঅম এর স্বচ্ছ সলীল জ্ঞান। তুলে ধরতে হবে যুক্তি, তথ্য আর বিশ্লেষন। কিন্তু কাজটা করবেটা কে? প্রিন্ট আর ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার যুগে বসে মুসলমনরা ঠিকই পত্র পত্রিকা বই পড়ে, তবে তা কেবল উপন্যাস আর থ্রীল ভর্তি কল্প কাহিনী মাত্র। যেখানে ইসলাম এর কোন দিকনির্দেশনা নেই। নেই কারণ, এ্ বিষয়ে লেখালেখিইবা করেন ক’জন?
আজ কোথায় সেই লেখক যারা তাদের লেখায় তুলে ধরবেন মুসলিম জাতিসত্তার দিক নির্দেশনা? বিশ্বের এমন কোন অ্গংন নেই যেখানে একজন মুসলমানকে চিত্রিত করা হচ্ছেনা সন্ত্রাসী হিসেবে, এমন কোন স্থান নেই যেখানে একজন মুসলমানকে চিত্রিত করা হচ্ছেনা সমাজবিরোধি হিসেবে। এমন কোন দেশ নেই, এমন কোন ভাঁষা নেই, যে দেশ, আর যে ভাঁষায় বিধর্মীরা ইসলামকে উপস্থান করছেনা সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেব!
তার পরেও যেন কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। নেই কোন কার্যকর উদ্যোগ। সব যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। ইন্টারনেট খুললেই চোখে পড়ে, রাসুলুল্লাহ সা: এর মহান সাহাবিদের বিরুদ্ধে চলছে বিষোদ্গার। আজও সাহাবি আবু হুরায়রা রা:, হযরত আয়েশা রা: এঁর মত সাহাবীদের বিরুদ্ধে, ইসলাম এর বিরুদ্ধে চলছে বিভৎস মিথ্যাচার, তার পরেও কোন প্রতিবাদ নেই।
এসব দেখেও যদি মুসলমানরা কলম হাতে তুলে না নেন, তবে জানতে ইচ্ছে করে, আর কবে তা করবেন তাঁরা? আর কতটা বিপর্যয়ের পরে এসে তাঁরা মাঠে নামবেন? কবে হাতে তুলে নেবেন কলম? কবে? আর কবে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

