কিছু দিন আগে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছি। আমার মা-বাবা দুই জনই শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বলে এই পেশার প্রতি কিছুটা দুর্বলতা ছিল । কিন্তু এই দুর্বলতা যে এতটাই বেশি তা আমি প্রথম বুঝতে পারি , যেদিন Unilever এ যোগদানের সু্যোগ ফিরিয়ে দেই। চারপাশের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব অনেকেই আমাকে বারবার ভুল হচ্ছে বলে সাবধান করেছিল, যদিও আমার মা-বাবা সব সময়ের মত সিদ্ধান্তের ভার আমার উপর ছেড়ে দেন।
কিন্তু, শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর আমি অনুধাবন করতে পারলাম এই দেশে আসলে শিক্ষার নামে কি হচ্ছে। তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত ছাত্ররা প্রথম বর্ষের কোর্সের কিছুই জানে না। এমন কি Electrical materials পড়াতে গিয়ে আমাকে ইলেকট্রন বিন্যাস পড়াতে হয়েছে, যা কিনা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ানোর কথা। দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্ররা Electrical Circuit 1 পড়ে আসলেও super node, super mesh এর নাম শুনে নি। তার চেয়েও ভয়ংকর হলো তাদের অনেকেই আগের বিষয়গুলোতে A+ পাওয়া।
এতো গেলো ছাত্রদের চিত্র, একাডেমিক মিটিং এ আমাদের বলা হলো সর্বোচ্চ নাম্বার নিশ্চিত করতে এবং এর ফলে আরো বেশি ছাত্র ভর্তি হবে। ছাত্ররা পড়া না পারলে এড়িয়ে যেতে। আর রেজিস্ট্রেশনের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই, মনে হয় পরীক্ষার আগের দিনও যাবে । সে কি শিখলো সেটা মূখ্য না।
সব বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে চিত্রটা এরকম না হলেও, ৮০% এর ক্ষেত্রে এটাই। দেশে ৫০ টির উপর বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তার মানে কি পরিমাণ সার্টিফিকেট বাণিজ্য হচ্ছে ??
যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র কম থাকতো সেক্ষেত্রে যাকে যখন ইচ্ছা ভর্তি করা যেত, কিন্তু এইখানে আমার ডিপার্টমেন্টে ১২০০ ছাত্র। আর এর মাঝে ১২ জনও ২০% শিক্ষা গ্রহণ করার সামর্থ্য রাখে বলে মনে করি না । সিনিয়রদের সাথে আলাপচারিতায় জানলাম যা ক্লাসে পড়ান, হুবুহু তা পরীক্ষায় দেন। এ সব কিছু বিবেচনায় নিজেকে এখন এই প্রতারণা কৌশলে সহায়তাকারী, নব্য প্রতারক মনে হচ্ছে।
আরেক চিত্র আরো ভয়ংকর, দেশের সবচেয়ে নাম করা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য বুয়েট ও আইবিএ থেকে ছাত্র ভাড়া করা হয়। বুয়েট ১০০০০ আর আইবিএ ১৫০০০। মেয়েদের ক্ষেত্রে ৫০০০ করে অতিরিক্ত, কারণ প্রক্সি পরীক্ষা দিতে মেয়েদের সহজে রাজী করানো যায় না। সব-ই মূল পরীক্ষার্থীর, কিন্তু ছবি প্রক্সি পরীক্ষার্থীর। পরবর্তীতে ভর্তি প্রক্রিয়ায় জড়িতরা ছবি বদলে দেয়।
কিন্তু আমি অন্তত আরেকটা চাকরি না পাওয়া অবধি পদত্যাগ করতে পারছি না। কারণ, সেক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবেরা আবার আমাকে আগের ভুল ধরিয়ে দিবে। আর বাস্তবতা হলো বেকারত্বের বোঝা নিয়ে বাঁচা অসম্ভব। দোয়া করেন যাতে আমি এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।
নিজের বের হয়ে আসার কথাটা-ই স্বার্থপরের মত বললাম। কারণ, এই চক্র আমার-আপনার পক্ষে ছিন্ন করা অসম্ভব। রাষ্ট্র-ই যেখানে এই দুর্নীতির পৃষ্ঠপোষক। শুনলাম ৬২ হাজার এ+ পেয়েছে, তাদেরকে অভিনন্দন। কিন্তু নির্মম সত্য হলো বিশ হাজারও এ+ পাওয়ার যোগ্য না। আর ভবিষ্যতে তারা ভর্তি হবে কোথায় ??
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মে, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


