ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশে সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করেছে বলে তাঁরা দাবী করেন। একটা বিতর্ক আজো রয়ে গেছে সর্বত্র- আসলেই কি এ ব্যাংকটি সুদমুক্ত ব্যাংকিং করে, নাকি ঘুরিয়ে খায়?
এ ব্যাপারে ইতি পূর্বে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। কয়েকজন ব্লগার বেশ কিছু প্রশ্ন করেছেন। তাই পাঠকদের সুবিধার্তে রিপোস্ট করলাম ।
ব্লগে যারা সত্যিকারে ইসলামী ব্যাংকিং ও ট্রেডিশানাল ব্যাংকিং এর পার্থক্য জানতে চান, তাদের জন্য এই লেখা। ব্যাংকিক বিষয়টা একটা বড় বিষয়, তাই জানার জন্য বেশ পড়াশোনা করা প্রয়োজন। এখানে সার সংক্ষেপে কিছু বিষয় অবতারনা করা হলো।
সুদ আর মুনাফার পার্থক্য হলো:
আপনি দশ কেজি আলু পাইকারী বাজার থেকে ১৫ টাকা কেজি দরে কিনে ১৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেন। তাহলে, কেজি প্রতি লাভ হলো ২ টাকা, দশ কেজিতে মোট লাভ ২০ টাকা। আপনার যাতায়াত, নাস্তা ও অন্যান্য বাবদ খরচ হলো ৫ টাকা। তাহলে ১৫০ টাকা মুলধনে নেট লাভ ১৫ টাকা।
অপরদিকে, আপনি কাউকে ১৫০ টাকা ধার দিলেন এই শর্তে যে, সে আপনাকে এক মাস পরে পরে ১৭০ টাকা ফেরত দিবে। তাহলে এখানে আপনার কোন পরিশ্রম ব্যাতিত লাভ হলো ২০ টাকা, যা ষ্পস্ট সুদ। কারণ, এখানে টাকার পরিবর্তে আপনি বাড়তি টাকা নিয়েছেন, মাঝখানে কোন ক্রয়-বিক্রয় জড়িত নেই।
আপাত: দৃষ্টিতে বাইরে থেকে লাভ করার দুইটা পদ্ধতি একই মনে হলেও লাভের পদ্ধতিগত ভিন্নতার কারণে একটা হালাল, অপরটা হারাম।
নিচে আরেকটা ঊদাহরণ দেয়া হলো:
কেউ মুরগী জবাই করল, আল্লাহর নাম না নিয়ে কোন দেব দেবী বা শয়তানের নামে। মুরগীটা কেটে কুটে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে রান্না করে পরিবেশন করা হল। অত:পর কোন মুমিন ব্যক্তি তা খেল যা হারাম, অথচ বাইরে থেকে তা হালাল মনে হবে যদি কেউ জবাইয়ের সময়ের ব্যাপারটা না জানেন।
আবার, কেউ মুরগী জবাই করল, আল্লাহর নাম নিয়ে। মুরগীটা কেটে কুটে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে রান্না করে পরিবেশন করা হল। অত:পর কোন মুমিন ব্যক্তি তা খেল যা হালাল, অথচ বাইরে থেকে দেখলে দুইটা ব্যাপার একই রকম, পূর্বেরটার সাথে এর পার্থক্য হলো শুধু জবাইয়ের পদ্ধতি।
সুদ ও মুনাফা বাইরে থেকে শুনতে একই মনে হলেও; সুদ হারাম কারন এতে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষিত হয়না, সুদ দূর্বলের উপর সবলের জুলুম। এখানে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষিত হয়না।
মুনাফা হালাল, কারন মুনাফা করতে হয় শরীয়া অনুমোদিত পদ্ধতিতে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারী উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে। দেশে বর্তমান ইসলামী ব্যাংকগুলো শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংকিং চালু করেছে, সকল ক্ষেত্রে তারা শরীয়া পুরোপুরি বাস্তবায়ন করছে, এটা নিশ্চত ভাবে বলা যায়না, তবে তারা চেষ্টা করছে- এটাই সবচেয়ে আশার দিক।
ইসলামী ব্যাংকগুলো লাভ করে ক্রয়-বিক্রয় ও ভাড়া - মূলত: এই দুই প্রক্রিয়ায়। অনেকে বলেন, ব্যাংকতো কোন ক্ষতি বহন করেনা, তাহলে এখানে শরীয়া পালিত হলো কি করে? বিষয়টা ভুল ধারণা থেকে বলা হয়। ব্যাংক লাভ ও ক্ষতি শেয়ারের ব্যাপারটা নির্ভর করে বিনিয়োগ মোডের উপর। যেমন: দোকান থেকে আপনি ডিম কিনে আনার পরে ডিম ভেংগে গেল। এখন দোকানির কাছে গিয়ে আপনি যদি আবার তার কাছে ডিম চান, সে তা দিবেনা। কারণ, আপনার হাতে ডিম বুঝিয়ে দেয়া পর্যন্ত
বিক্রেতার দায়িত্ব, বুঝে নেয়ার পরে সকল দায় দায়িত্ব ক্রেতার। সুতারাং, বুঝা গেল- ক্রয় বিক্রয় পদ্ধতিতে বিনিয়োগ নিলে ব্যাংক পন্য বুঝে দেয়ার পরে কোন ক্ষতির দায় নেবেনা, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আপনার যদি ভালো ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকে এবং সৎ ও নির্ভরযোগ্য লোক হন, তাহলে মুশারাকা (অংশীদার ভিত্তিক, কিছু মুলধন ব্যাংকের, কিছু আপনার ) বা মুদারাবা (সম্পূর্ণ টাকা ব্যাংক বিনিয়োগ করবে, আপনি শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করবেন) পদ্ধতিতে ব্যাংক বিনিয়োগ দিতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে ক্ষতি মুলধন অনুপাতে এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সুম্পর্ন ক্ষতি ব্যাংক বহন করবে, কিন্তু লাভ শেয়ার হবে পারষ্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে যা ব্যবসা শুরুর আগেই সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
বিস্তারিত জানার জন্য শামজ্জোহা লিখিত:
'ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা" বইটি পড়ুন।
পাঠকদের সুবিধার জন্য প্রশ্নোত্তর যুক্ত করে দিলাম।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৫৮ প্রশ্নোত্তর বলেছেন:
ব্যাংক মানে কি? ব্যাঙ্ক কি ক্রয়-বিক্রয় করে বা ভাড়া দেয়?
জবাব ০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২০
লেখক বলেছেন: জি জনাব, ইসলামী ব্যাংকগুলোর যার সত্যিকার ভাবে শরীয়া মেনে চলে, অনেক কষ্ট করে লাভ করতে হয়। এজন্যই লোকজন বলে, ইসলামী ব্যাংক কাউকে টাকা দেয়না, এটা অতি সত্য কথা। তারা হয় আপনাকে পণ্য দিবে বা বাড়ি বা গাড়ির ক্ষেত্রে সেটা কিনে ভাড়া দিবে আপনার কাছে। আপনি আস্তে আস্তে ভাড়া ও মুলধন শোধ করতে থাকবেন- এভাবেই একসময় পুরো বাড়ি/গাড়ির মালিকানা আপনার হয়ে যাবে।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২২ কুম্ভকর্ণ বলেছেন: এনজিও গুলাও একই কাজ করে, তাহলে তাদেরটা সুদ হল কেন? মাওলান শামসুল হক ফরিদপুরি প্রথমে ইসলামী ব্যাংকের সাথে ছিলেন, তারপর ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ইসলামী ব্যাংকেরটাও সুদ।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৬
লেখক বলেছেন: এনজিওরা শরীয়া মেনে চলেনা, তাই এটা সুদ। বিশেষ কোন ব্যাক্তির দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়না যে, সুদ আর লাভ একই জিনিষ। শামসুল হক সাহেবের চেয়ে বিশ্বের অনেক বড় বড় ইসলামী ব্যাক্তিত্ব বিশ্ব ব্যাপি ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে কাজ করছেন। এটা বাংলাদেশী মৌলভিদের কোন প্রোডাক্ট নয়- কথাটা মনে রাখবেন।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৩ শাহীন - চট্টগ্রাম বলেছেন: ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশে সুদবিহীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার পথিকৃত। এই ব্যাংকের সাফল্য নিঃসন্দেহে খুশীর সংবাদ। আমরা ইসলামি ব্যাংকের উত্তরোত্তর সমৃদ্বি কামনা করছি। জবাব দিন|মুছে ফেলুন |
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৪৫ নাবিক বলেছেন: ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলো ১৯৮০ সালের পরে। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী মারা যান তার অনেক আগে।
কুম্ভকর্ণ বলেছেন: "মাওলান শামসুল হক ফরিদপুরি প্রথমে ইসলামী ব্যাংকের সাথে ছিলেন, তারপর ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ইসলামী ব্যাংকেরটাও সুদ।"
কুম্ভকর্ণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা তথ্য দেবেন না প্লীজ।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৫৫ সত্যদা বলেছেন: ভাল বলেছেন।
আমরাতো জানি মাওলানা এবং বিজ্ঞ আলেম গণ বলেছেন..
সুদ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ই সমান অপরাধী।
বিষয়টি কি সত্য? যদি সত্য হয় তবে বাংলাদেশ ব্যাংককে আপনারা ব্যাংকিং লাইসেন্স এর কারণে যে সুদ প্রদান করেন তা কতটুকু বৈধ বা হালাল???
০৯ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:০১
লেখক বলেছেন: এজন্য ব্যাংক দায়ী নয়, দায়ী রাষ্ট্র ব্যবস্থা। যতদিন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হচ্ছেনা, বর্তমান সরকারী নিয়মনীতি মেনেই কাজ করতে হবে- এটাই ইসলামের বিধান। মক্কা বিজয়ের আগে রাসুল কাবা শরীফের কোন মূর্তি ভাংগার আদেশ দেননি।
০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:৪৭ প্রশ্নোত্তর বলেছেন:
আমি আমার জমিতে বাড়ী বানাব, ইসলামী ব্যাঙ্ক কিভাবে লোন দিবে?
০৯ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:০৬
লেখক বলেছেন: এক্ষেত্রে আপনাকে বাড়ির প্ল্যান পাশ করে মোট নির্মান খরচের উপর ভিত্তি করে ব্যাংকের কাছে বিনিয়োগের আবেদন করতে হবে। ব্যাংক জমির দাম ও নির্মান খরচসহ মোট মূল্য হিসাব করে ব্যাংক ও আপনার মালিকানার অংশ হিসাব করবে। মনে করুন, আপনার জমির দাম ৩০ লাখ, নির্মান খরচ ৭০ লাখ, ব্যাংক বিনিয়োগ করল ৫০ লাখ। তাহলে উভয়ের অংশ শতকরা ৫০ ভাগ। এ হিসাবে ব্যাংক তার মালিকানার রিডিউসিং ব্যালেন্ষ পদ্ধতিতে মোট ভাড়া হিসাব করে মাসিক কিস্তি নির্ধারন করে দিবে। আপনাকে বাড়ি নির্মান শেষে মাসিক কিস্তিতে ভাড়া ও মূলধনের একটা অংশ শোধ করতে হবে। যত শোধ করতে থাকবেন, ব্যাংকের মালিকানার অংশ তত কমতে থাকবে, এবং নির্দিষ্ট সময় পরে পুরো মালিকানা আপনার হয়ে যাবে।
ধন্যবাদ প্রশ্নের জন্য।
০৯ ই জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:০৭ আবূসামীহা বলেছেন: কুম্ভকর্ণ বলেছেন: "মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরি প্রথমে ইসলামী ব্যাংকের সাথে ছিলেন, তারপর ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
নাবিক বলেছেন: ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলো ১৯৮০ সালের পরে। মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী মারা যান তার অনেক আগে।
কুম্ভকর্ণ ভুল তথ্যদিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করবেন না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



