" কি ব্যাপার তুহিন? ইন্ডিয়া থেকে কবে ফিরলা?"
" এই তো মামা, কয়েকদিন আগে।"
"তা, কোথায় কোথায় ঘুরলা?"
"কোলকাতা, দিল্লি, আগ্রা আর জ়েপুর।"
"জ়েপুর? সেটা আবার কোথায়?"
"আরে ভাইয়া, ঐ যে রাজস্থানের রাজধানি।"
"ওহ জয়পুর ! তো জ়েপুর বলছো কেন?"
"হিন্দিতে তো জ়েপুরই বলে"
যার সাথে কথা বলছিলাম, সে হলো আমার দুর সম্পর্কের বালক বয়সি ভাগ্নে। শিক্ষিত এবং সরকারি পদে আসিন মা বাবার সন্তান। যে পাড়ায় থাকে, সেটি দেশের জ্ঞানি গুণি সংস্কৃতিমনা মুক্তচিন্তার মানুষদের বিচরণভুমি। সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি বালক, আজ হয়তো একটি মাত্র শব্দকে অন্য একটি ভাষায় রুপান্তর করে বলছে। কাল যে সে তার পুরো ভাষাটিকেই বদলে ফেলবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়?
শুধু ভাগ্নের কথা বলি কেন? এই বয়সি অনেক ছেলে মেয়ের মুখেই হিন্দি উচ্চারনে বাংলা বলতে শুনেছি। যেমন সৌরভকে বলে, সাওরাভ, শচিনকে বলে বলে সাচিন, মাস্তানকে বলে দাদা ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া সাধারণ বাংলা অনেক শব্দ এদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হলেও, হিন্দি শব্দগুলি যেন এদের কাছে পান্তাভাত।
স্বাধীনতার পর আমাদের প্রতিবেশি উর্দুভাষি ঢাকার আদিবাসি পরিবারকে দেখতাম, নিজেদের ভেতর ফিস ফিস করেই উর্দু বলতে। ওদের বাসায় আত্মিয় স্বজন আসলে, ওদেরকেও উচ্চস্বরে উর্দু বলতে নিরুৎসাহিত করা হতো। পাছে, পাকিস্থানি দালাল মনে করে, ওদের উপর হামলা হয়।
বাংলার প্রতি এমনই ছিল আমাদের তীব্র আবেগ ও ভালোবাসা।
ফি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই ফুলে ফুলে আর হাজারো মানুষের শ্রদ্ধায় ভরে যায় ভাষা শহিদদের রক্তে রাঙানো শহিদ মিনার। ব্যাস সেদিনটা পেরুলেই যে কে সেই। একরাশ অবজ্ঞা আর অবহেলায় হাতের বাম দিকে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে সরিয়ে রাখি।
আকাশ সংস্কৃতিকে "মুক্ত" করার নামে জাতিয়তাবাদিদের এক মন্ত্রি খাল কেটে স্যাটেলাইটের কুমির এনেছিলেন। আর সে ধাক্কায় শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনি গরিব, তরুন বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই মোটামুটি হিন্দি রপ্ত করে ফেলেছেন। শুধু হিন্দি রপ্ত করেই ক্ষান্ত দেননি, বরং নেশাগ্রস্তের মত হিন্দি ছবি বা সিরিয়াল না দেখলে, বিশেষ করে আমাদের কন্যা-জায়া-জননিদের দল, গভীর বিষাদে নিমজ্জিত হন। তরুণ তরুণীদের আড্ডার আলোচনার একটা অংশ জুড়েও থাকে ওই হিন্দি নিয়েই আড্ডা। অনেকে আবার বাংলার সাথে হিন্দি মিশেল দিয়েও কথা বলতে পছন্দ করেন।
স্বল্প বসনা আকর্ষনীয় সৌন্দর্যের অধিকারি অভিনেত্রি আর আবেগ উস্কিয়ে দেয়া কাহিনী নিয়ে সিনেমা আর সিরিয়ালের মাধ্যমে, ভারতের সংখ্যালঘু কিন্তু প্রবল প্রতাপশালি হিন্দি বলয় যত সহজে আমাদের হিন্দির প্রতি আকৃষ্ট করতে পেরেছে, স্বাধীনতাপুর্ব বাংলাদেশের মানুষদের দিনের পর দিন, জেল জুলুম আর বুলেট দিয়েও তৎকালিন পঃ পাকিস্থানি শাসকরা সে কাজটি করাতে পারেনি।
বাস্তবের প্রয়োজনেই ভাষা শিক্ষা প্রয়োজন। যেমন আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে আমাদের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। আবার যারা মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছেন, তাদের আরবি জানা থাকলে, সেটি তাদের জন্য সুবিধা বয়ে আনতে পারে।
কোন বিশেষ ভাষার প্রতি আমার বিরাগ নেই। কিন্তু হিন্দি শিখে আমাদের কি লাভ? খোদ ভারতের বিশাল অংশে হিন্দি সমাদ্রিত নয়। তাদের প্রত্যকটি রাজ্যে আলাদা আলাদা ভাষা রয়েছে, এবং সেখানকার অধিবাসিরা সে ভাষায় কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। যেমন গুজরাটে গুজরাটি, মুম্বাইতে মারাঠি, বিহারে বিহারে, রাজস্থানে রাজপুত, ইত্যাদি।দক্ষিণ ভারতে বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে সেখানকার স্থানীয় অধিবাসিদের সাথে হিন্দি বললে তাদের চরম বিরাগের মুখোমুখি হবে যে কেউ। এটা আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। উঃ পুর্ব ভারতে হিন্দি বোলচাল, প্রাণঘাতি প্রমানিত হয়েছে অনেকবার। তাছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিন্দির উপযোগিতা বা গ্রহনযোগ্যতাও কোথায়?
স্বীকার করছি, এই উপমহাদেশে হিন্দি সিনেমার মত জাকজমকপুর্ণ আর ব্যায়বহুল চলচিত্র বানানো হয় না। তাই বলে, সেটি উপভোগের জন্য হিন্দিতে এমন আসক্ত হতে হবে কেন? তাও না হয় মেনে নেয়া গেল, কিন্তু তাই বলে আমাদের ভাষাকে ধীরে ধীরে হিন্দিতে রুপান্তরিত করতে হবে কেন?
অনেকে বলবেন, আরে কিছু পোলাপান না হয় দুই একটি হিন্দি শব্দ বলেই ফেলেছে, তাতে কি? উহু, আজকের পোলাপানই আগামিকালের নাগরিক। তাদের উপরেই দ্বায়িত্ব পড়বে আমাদের দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার গুরুদায়িত্ব। আজ তারাই যদি বাংলার প্রতি এমন উদাসীন হয়, তবে ভবিষ্যতে কি হবে? পশ্চিম বাংলার বাংগালিদের দিকে তাকিয়ে দেখুন। রাস্ট্রভাষাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে তারা নিজ ভাষাকেই হারিয়ে ফেলছে। তাদের পত্র পত্রিকায় দেখবেন, অনেক বাংলা শব্দ হিন্দি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তাদের বোলচালেও বাংলার সাথে হিন্দি মিশেল। যেমন ঝগড়াকে বলে কাজিয়া, গমকে বলে গেও, চাল হয়েছে চাওল, লাথি হয়েছে লাথ, বালিশ হয়েছে তাকিয়া। এককালের বাংগালিদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির তীর্থভুমি পশ্চিম বংগে আজ বাংগালিদের অস্তিত্ব প্রমান করতে গঠন করতে হয়েছে "আমরা বাংগালি" নামের সংগঠন। বাংলায় সাইনবোর্ড লেখার দাবিতে অনেকদিন পর্যন্ত আন্দোলনও করতে হয়েছে। বিশিস্ট জনপ্রিয় লেখক, সুনিল গঙ্গপাধ্যায় তাই অসংকোচে বলেছেন, বাংলাদেশের লোকজনের কারণেই পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা খেয়ে পড়ে বেঁচে আছেন। ভাবুন অবস্থা।
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন নিচের লিঙ্কে
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



