(মুঃ আখতার হুসাইন, সদালাপ নামের সাইটে ভিন্নধর্মী লেখক হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যই এই লেখার অবতারনা। আর স্থানাভাবে লেখাটা কিছূটা এডিট করা হয়েছে)
যারা ক্ষমতায় যেতে পারেনা বা যাদের ক্ষমতায় যাবার সম্ভাবনা নেই তারা সব সময় জন-মানুষ তথা মেহনতী মানুষের রাজনীতি করে। অন্ততঃ এ কথাটা মুখে মুখে প্রায়ই বলে থাকেন। এই মেহনতী মানুষ তথা জন-মানুষের রাজনীতির নামে ধোকাবাজী করে যারা বা যিনিই ক্ষমতায় গিয়েছেন তারা বা তিনি ক্ষমতার রাজনীতিই করেছেন—জনমানুষের কথা তিনি বা তারা মনে রাখেনননি। সোজা কথায়, যিনি লংকায় গিয়েছেন তিনিই দশ মাথাওয়ালা রাবণ হয়ে গেছেন। দশ মাথার কূবুদ্ধি আর কুড়ি হাতে লুটে-পুটে জনমানুষের হাঁড়-মাংস খুবলে খেয়েছেন। ছত্রিশ বছর ধরে এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। তবে ইদানিং তাদের অনেকের কয়লা বের হচ্ছে।
ছোট একটি গল্প বলে শেষ করছিঃ এক স্ত্রী তার বখে যাওয়া ছেলেটাকেই শেষ পর্যন্ত মাদ্রাসাতে পড়িয়ে ইয়া বড় আলিম বানানোর জন্য স্বামীর কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করলো। স্বামী এক বাক্যে “না” বলে বসে রইল। স্ত্রী বারবার কথাটা সামনে আনে আর স্বামী বেচারা তা ঠেলে দেয় শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেটাকে দেওবন্দ নামক স্থানে আলিম বানানোর জন্য পাঠালো। সেই ছেলেটি পাকিস্তান আফগানিস্তান ঘুরে তিন বছরের লেখাপড়া সাত বছরে শেষ করে শরীরে কিছু শুকনা ক্ষত ঘায়ের চিহ্ন নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল।
ছেলে আসছে শুনে মা খুব খুশী। নানাবিধ খাবার তৈরির কাজে মা ব্যস্ত। বাপ একজন চাকরকে সাথে নিয়ে নদীর ঘাটে গেল। নৌকার ছইয়ের উপর একগাদা ইটের মতো মোটা আর পাটার মতো মোটা পাটাতন কিতাব দেখে বাপের চক্ষু ছানাবড়া। চেলে বাপকে লম্বা করে আসসালামু আলাইকুম বললো। বাপের সালামের জবাবে ছেলে বিরক্ত হয়ে ঐ নদীর ঘাটে দাঁড়িয়েই কীভাবে শুদ্ধ উচ্চারণে সালামের উত্তর দিতে হয় তার কসরত করালো। ঘণ্টাখানিক এভাবে বাপ-বেটার শুদ্ধ উচ্চারণের মহড়া চলার পরে বাপ চাকরকে কিতাবগুলো নিতে বলতেই ছেলে তেড়ে এলো। চাকরকে দিয়ে এই কিতাব বহন করানো যাবেনা। এবার ঐ বৃদ্ধ বাপের পালা।কিতাব গুলো যেই না ধরতে গেছে তখনই ছেলে জানতে চাইলো বাপের অজু আছে কি না! বাপ নেমে গেল নদীর কিনারায় অজু করার জন্য। ছেলে আঁড়চোখে তাকিয়ে বাপের অজু করা দেখে বিরক্ত হয়ে নিজেই কিনারায় এসে কীভাবে শরীয়তী অজু করতে হয় তার মহড়া দিল। ঠাণ্ডা পানি, হু হু বাতাস আর শরীরে পানি লেগে বাপের শরীরে কাপুনী দিল।
অজু শেষে বাপ তার মাথায় একেক করে সবগুলো কিতাব মাথায় নিল।এক মন বোঝা তখন দুই মন মনে হলো। কামার বুড়া হলে লোহা শক্ত হয়ে যায়—একথা হাড়ে হাড়ে টের পেল। যাহোক, ছেলে সামনে হাটে বাপ আর চাকর পেছনে। কিছুক্ষণ পরে বাপের ইতিউতি আচরণ দেখে ছেলে তার কারণ জানতে চাইল। বাপ জানলো যে তার ডায়াবেটিক্স এবং খুবই জোরে প্রস্রাব চেপেছে যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। কিতাব মাথায় নিয়ে পেশাব করা যাবেনা বিধায় সে কিতাব চাকরকেই ঘাড়ে নিতে হলো। সন্মানের যদি কিছু হয় এই ভয়ে ছেলে সব বোঝা চাকর আর বাপের মাঝে ভাগ করে নিল।
বাপ একটু দূরে ঝোপের আড়ালে গেল । বসার সাথে সাথে ছেলে আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? গাছ-পালা আল্লাহর জিকির করে। উয়েগরে মুকির উপরি মুইতপের পারব্যা না”। ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? এদিক মুক ফিরে তুমি মুইতপের পারব্যা না। এই সুদা আব্দুল ক্বাদির জিলানীর মাজার, ভুল্যা গিছাও।” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার আবার পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাবা কী করতিছ্যাও, আ?এদিক কান্দাহার ইলাকা বাবা, আমাগের সব জেহাদী বুজুর্গানে দ্বীন এহন এই ইলাকায়, উয়েগরে দিক মুক ফিরে তুমি মুতার সাহস দিখাও ক্যাম্বা কোরে?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো আবার পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাবা কী করতিছ্যাও, তুমি কি কিবলা ভুলে গিছ্যাও?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো আবার পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ?তুমি কি জানু না যে ইদিক ফুরফুরা শরীফের পীর সাহেবের মাজার?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো আবার পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? তুমি কি জানু না ইদিক খাজা মঈনুদ্দিন চিশতীর মাজার?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো আবার পাঁচ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? িদিক খান জাহান আলীর মাজার সিডা কি তুমি জানোনা?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো এবার দশ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? ইদিক বাবা আদমের মাজার সিডা কি তুমি জানোনা?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো আবার দশ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিল। বাপ স্থির হয়ে বসার সাথে সাথে ছেলে আবার আর্তনাদ করে উঠলো, “বাজান, কী করতিছ্যাও, আ? ইদিক হযরত শাহ জালালের মাজার সিডা কি তুমি জানোনা?” ছেলের ধমকে বাপ ঘড়ির কাঁটার মতো এবার দশ ডিগ্রী ঘুরে অবস্থান নিয়ে দেখলো যে সে যেখান থেকে ঘোরা শুরু করেছিল সে অবস্থানেই ফিরে এসেছে।পায়ের চাপে একটা গোলাকার চক্র তৈরী হয়ে গেছে। বাপের তখন ফাটে ফাটে অবস্থা। ছেলের এই কাণ্ডতে বাপ রেগে পেশাব না করেই উঠে এসে আবার কিতাবগুলো মাথায় নিয়ে বাড়ীর পথে যাত্রা দিল।
ছেলে আসছে এ খবরে মায়ের মনে আনন্দ আর ধরে না। ছেলের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য মায়ের দৌড়াদৌড়ির শেষ নেই। স্ত্রীর এই আনন্দ-উচ্ছল হাসি দেখে স্বামী বারবার স্ত্রীর সহাস্য মুখের দিকে বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। এক পর্যায়ে স্বামীর কাছে স্ত্রী এসে বলে উঠলো, “কী গো, মন খারাপ করে বোসে আছ কেন? সুনার ছাওয়াল আমার আলেম হয়া আয়ছে। আমি খুব খুশী। আল্লাহ আমার মনের সাধ পুরে করেছে। তুমি খুশি হও নাই?” স্বামী তার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি খুশী ওইছি কি ওই নাই তা মুতার সময় টের পাব্যানে।”
বিঃ দ্রঃ- ছত্রিশ বছর ধরে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের নেতারা এটা না ওটা, এভাবে নয় ওভাবে, এ নয় সে, আমি না তুমি এসব বলে বলে আমাদেরকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘড়ির কাঁটার মতো আগের জায়গায় নিয়ে এসেছে। তারা এতোদিন যা বলেছে আমরা তা শুনেছি। যা করতে বলেছে তা করেছি। কিন্তু, আমাদের ফাটে ফাটে অবস্থার কোন শেষ বা পরিবর্তন নেই। তারা এখনো আমাদের শরীরে পেশাব-পায়খানার মতো চেপে আছে। আমরা চাই তারা বের হয়ে যাক। স্থির হয়ে একটু বসার সুযোগ দিলে আমরা তাদেরকে অনায়াসে ত্যাগ করতে পারবো। আমরা ভুল করে যে আগুন খেয়েছি সে আগুন কয়লা হয়ে বের হলেও আমরা সে কয়লা বের করতে চাই। আর জ্বলতে পারিনা—সম্ভব না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

