
আন্তর্জাতিক কথাটার অর্থ কি? সোজা বাংলায় সমগ্র বিশ্বের সব কয়টি দেশের সমন্বয়ে যা, সেটাই আন্তর্জাতিক। কিন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক কথাটার অর্থ বোধ হয় একটু অন্যরকম।
তবে বিশ্ব রাজনীতিতে যাবার আগে, নিজের দেশের দিকে কিছুটা তাকাই। ভারতীয় ছবিতে অভিনয় করার সুবাদে আমাদের রুপালি পর্দার দুই একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হিসেবে মিডিয়ায় পরিচিতি পেয়েছেন। আবার কোলকাতার আনন্দবাজার গোষ্ঠির মতলবের আনন্দ পুরস্কার পেয়েও দেখি অনেক লোকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্নতা লাভ করে ফেলেছেন। এই দুই ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক শব্দটির আভিধানিক অর্থটা ঠিক মেলে না।
বিশ্বখ্যাত সেবামুলক প্রতিষ্ঠান রেডক্রস নামে আন্তর্জাতিক হলেও কিন্তু এই নামে মুসলমান বিশ্বে সেবামুলক প্রতিষ্ঠান নেই। আছে রেড ক্রিসেন্ট নামে।
এবার আসি আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে। শুরু করছি সদ্য বাসি হওয়া সংবাদ দিয়ে। ইরানের পারমানবিক কর্মসুচি নিয়ে নাকি আন্তর্জাতিক মহল খুবই উদবিগ্ন। এবং ইরান যদি তার পারমানবিক কর্মসুচি চালিয়ে যায়, তাহলে নাকি আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে তার বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হবে। প্রধান পাচটি খলিফা দেশের মধ্যে অবশ্য দুটি দেশ ( রাশিয়া ও চীন) একই মনভাব ব্যাক্ত করে না। ল্যাটিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশই সেটা সমর্থন করেছে, এমনও নয়। আফ্রিকার দেশগুলি এক্ষেত্রে কি অবস্থান নিয়েছে সেটা জানা যায়নি। এশিয়ার মধ্যে আমেরিকার একান্ত সুহ্রদ জাপান, কোরিয়া ছাড়া কেউ এব্যাপারে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। (ইসরাইলের নাম আসছে না, কারণ নির্দিস্ট সীমানা ছাড়া কোন দেশ হতে পারে না)। ইউরোপের একদা পশ্চিমা জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলি ( ব্যাতিক্রম বৃটেন, জার্মানি আর ফ্রান্স) আলাদা করে কিছু বলেনি।
প্রশ্ন হলো, তাহলে কোন পৃথিবীর আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ইরানের পারমানবিক কর্মসুচি গ্রহনযোগ্য হচ্ছে না?
কয়েক বছর আগে, একই আন্তর্জাতিক মহল, বেশ চোখ রাঙ্গিয়েই বলেছিল, ফিলিস্তিনি ভুখন্ডে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল উদ্বাস্ত শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনকারি ফিলিস্তিনিরা সে পথেই এগুলো। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে কিনা সেটা দেখার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এলেন। এবং নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে সার্টিফিকেট দিলেন। কিন্ত যেই হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে ক্ষমতায় এলো, তখনই এই আন্তর্জারিক মহল, ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। কেননা হামাস নাকি কট্টর ইসলামপন্থি। মুখে গণতন্ত্র বলে ফেনা তোলা আন্তর্জাতিক মহলের কি দারুণ দ্বৈতাচার।
অথচ ভারতে কট্টর ব্রাক্ষ্মনবাদিরা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আন্তর্জাতিক মহলের সাথে ভারতের বেশ দহরম মহরম শুরু হয়েছিল। অধুনা হন্ডুরাস থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ঘাড়ে ধরে দেশ থেকে বের করে দেবার পরেও দেখি, গণতন্ত্রপ্রেমিক আন্তর্জাতিক মহলের মুখে টু শব্দটি নেই। আবার বাংলাদেশে যে দুই বছর বিশ্ব ব্যাংকের কেরানী দিয়ে দেশ শাসিত হলো, সেখানেও আন্তর্জাতিক মহল রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
কম্যুনিস্টপন্থি বলে অনেক বছর ধরে কিউবাকে আন্তর্জাতিকভাবে এক ঘরে করে রাখা হয়েছে। আবার তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে অগণতান্ত্রিক শাসন চললেও, তাদের সাথে আন্তর্জাতিক মহলে কি দারুণ সখ্যতা !
এক লকারবির ঘটনায়, বিলিয়ান বিলিয়ান ডলার দিয়ে, এবং নিজেদের পারমানবিক কারখানা, আন্তর্জাতিক মহলের কাছে হস্তান্তর করার পরেই, গাদ্দাফির লিবিয়া, আন্তর্জাতিক মহলে আবার আদর আপ্যায়ন পাওয়া শুরু করেছিল। কিন্ত সেই মধুচন্দ্রিমার হঠাৎ অবসান ঘটেছে, যখন লকারবি ঘটনার অভিযুক্ত স্কটল্যান্ডের আদালত কর্তৃক মুক্তি পেয়েছে। অথচ হাজার হাজার নরহত্যার দায়ে অভিযুক্ত সাবেক বসনিয়ান প্রেসিডেন্ট বিলিজানা প্লাসভিককে কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই মুক্ত দেয়া হয়েছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক মহলের পক্ষ থেকে কোন রোষ/দ্বিমত প্রকাশের কোন খবর পাওয়া যায়নি।
তথ্যসুত্রঃ Click This Link
এই আন্তর্জাতিক মহল, উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক কর্মসুচি বন্ধে কত সময় ব্যায় করে আলোচনার আয়োজন করে। সিরিয়া বা ইরান সেই পথে ধাবিত হলে, তার ঘুম হারাম হয়ে যায়। অথচ সেই ষাটের দশক থেকে আন্তর্জাতিক আশির্বাদপুস্ট ইসরাইল নামের কট্টর ইহুদিদের ভুখন্ডটি যে ইতিমধ্যে একটি পারমানবিক অপশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, সেটা ভুলেও আন্তর্জাতিক মহল মুখে আনে না।
আগ্রাসনের প্রতিবাদের অন্যপন্থা গ্রহনে বাধাগ্রস্থ কোন জনগোষ্ঠি যখন নিজেদের প্রাণকেই আত্মরক্ষার শেষ অস্ত্র বলে প্রয়োগ করে, তখন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে, এরা সন্ত্রাসি, সভ্যতার শত্রু, মানবতার শত্রু। কিন্ত যখন এই আন্তর্জাতিক মহলই যখন মিথ্যে অপবাদের মাধ্যমে, স্বাধীন সার্বভৌম দেশে আগ্রাসন চালিয়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে, বাস্তচ্যুত করে, তখন তারা হয়ে যায় মানবতাবাদি এবং সভ্যতার ধারক বাহক রক্ষক।
আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলতেও, খাড়া বড়ি থোড় আর থোর বড়ি খাড়া। আন্তর্জাতিক মহলের চড়া গলার সুর ছাড়া অন্যপক্ষ্যের আকুতি সেখানে প্রকাশিত হয় না।
সব দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছে, আমাদের মর্দ। তাই সে আন্তর্জাতিক মহলের সদস্য সংখ্যা গুণে যা পেলো, তার সাথে শিরোনামের হু বুহু মিল রয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


