জানি না কোন মনিষি কথাটা বলেছিলেন। তবে সেটা ধ্রুব সত্য। ব্যাতিক্রম হলো শুধু বস্তাপচা হিন্দি কিংবা ঢাকাই ছবির বেলায়।
ঘটনাবহুল কয়েকটি দিন এত দ্রুত পার হয়ে গিয়েছে যে লেখার বিষয় নির্বাচনটিই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
১৯৭৫ সালে পট পরিবর্তনের সেদিনের নায়কদের মধ্যে পাঁচজনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হবার পর, দেশে তো বটেই ব্লগেও দফায় দফায় পোস্ট এসেছে। কেউ আনন্দিত উল্লাসিত হয়েছে, কেউ কেউ বিরাগ পোষন করেছেন। এটা যার যার ব্যাক্তিগত মতামত এবং মত প্রকাশের অধিকার বলেই জ্ঞান করছি।
প্রশ্ন করবেন, শিরোনামের সাথে এসবের সম্পর্ক কি? তা নিশ্চই আছে, শুধু খানিকটা ধৈর্য্য ধরে রাখলেই জানাতে পারবো।
১৯৭৫ সালটা নানা কারণেই অত্যন্ত ঘটনাবহুল। বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সম্ভবত এতটা ঘটনাবহুল বছর, স্বাধীনতার পর আর আসেনি।
সব কয়টা দেয়া তো সম্ভব নয়। তাই ১৫ই আগস্টের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত কিছু ঘটনা তুলে ধরছি।
২রা জানুয়ারি পুর্ব বাংলা কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সিরাজ সিকদার পুলিশের হেফাজতে খুন। এর আগে দুর্নীতি, অবাধ লুঠতরাজ, চোরাচালান, আইন শৃংখলার চরম অবনতি, অপশাসন ও ভারতীয়দের সেবাদাসের ভুমিকায় অবতীর্ণ হবার কারণে, সিরাজ শিকদার এবং তার আন্ডারগ্রাউন্ড বাহিনী, আঃ লিগের বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধবস্থার সৃস্টি করেছিল। সে সময় এই সর্বহারারাই ছিল আঃ লিগের একমাত্র প্রতিদ্বন্দি। যার কারণে সাপে নেউলে অবস্থানে ছিল এই দুই দল। ১৫অই আগস্টের পর যে ঘটনাপ্রবাহ, তার পর এই সর্বহারাদের আরেক নেতা কর্ণেল তাহেরের হাত ধরে জেনারেল জিয়ার ক্ষমতায় আরোহন এবং পরে কর্ণেল তাহেরের ফাঁসির মাধ্যমেই এই সর্বহারাদের ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়া হয়। ।
২৫শে জানুয়ারি ১৯৭৫ এ মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বাংলাদেশের সংবিধানকে বাকশাল নামের একনায়কতন্ত্রে বেধে ফেলা হয়। নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবে অনেক জ্ঞানপাপি এখন বলে বেড়ান যে, বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগেই নাকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল। কথাটা ঢাহা মিথ্যা।
১৫ই আগস্ট থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত যেভাবে ক্ষমতার পালা বদল হচ্ছিল, তাতে সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ একদিকে বিভ্রান্ত হয়েছিল, অন্যদিকে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
যুদ্ধবিধবস্ত একটি স্বাধীন দেশে শোকের সাগর পাড়ি দেয়া লাখ লাখ মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কস্টসাধ্য কাজ হলেও অসাধ্য ছিল না। সেজন্য প্রয়োজন ছিল ধৈর্য্য প্রজ্ঞা আর মেধার সম্বনয়।
কোটি কোটি সাধারণ মানুষের চোখের মণি বঙ্গবন্ধুর কাছে তাই ছিল আকাশ ছোয়া প্রত্যাশা। স্বাধীনতার নয়টি মাস জেলে বন্দি থাকার ফলে, বাংলাদেশের উপর বয়ে যাওয়া কেয়ামত চোখে না দেখলেও, সবই শুনেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তার অবর্তমানে তার নামে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনাকারিরা স্বভাবতই ছিলেন তার চরম আস্থাভাজন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার অনুপস্থিতিতে তার দলের ভেতরেই যে অনৈক্য আর বিভাজন সৃস্টি হয়েছিল, সেটা তার জানা ছিল না।
(প্রথম পর্ব শেষ)
-------------------------------------------------------------------------------
দ্বিতীয় পর্ব
যে সময়ে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছিল, সে সময় সারা বিশ্বে চলছিল দুই "বড়" এর খেলা। ( কম্যুনিজমের পতনের পরই শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক খেলার অবসান ঘটেছিল)। আর সংগত কারণেই সেই খেলায় ময়দানে স্বাধীনতার পক্ষ্যে বিপক্ষ্যে দুই বড় এর মধ্যে চলছিল গুটি চালাচালি। সে কারণেই প্রবাসি বাংলাদেশ সরকারের মধ্যেও ছিল দুই বৃহৎ শক্তির স্থানীয় খেলোয়াড়রা।
এই দুই পক্ষ ছাড়াও ভারতীয় সরকার ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া করার জন্য চেলেছিল নতুন চাল। সেটা হলো শুধুমাত্র আওয়ামি লিগের বাছা বাছা কর্মিদের নিয়ে আলাদা একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠন। নাম দেয়া হয়েছিল মুজিব বাহিনী। বিশ্লেষকরা অনুমান করে থাকেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরেও যেন ভারতীয়দের স্বার্থ সংরক্ষনের জন্য নীতি নির্ধারক মহল এবং বুদ্ধিজীবি মহলে তো বটেই প্রয়োজনে যেন এই বাহিনি ভারতের পক্ষ্যে ঠ্যাংগাড়ে বাহিনির কাজ করতে পারে।
পরাজয় ঠেকাতে একজন বড় চেস্টা করেছিল, যাতে তাদের চরম মিত্র পাকিস্থানের বিভক্তি ঠেকানো যায়। এজন্যই স্বাধীনতার একদম প্রায় শেষভাগ পর্যন্তও তাদের ভক্ত খন্দোকার মোশতাককে দিয়ে পাকিস্থানের সাথে একটা কনফেডারেশনের চেস্টা চালিয়েছিল। কিন্তু মুক্তিপাগল বাঙ্গালিদের স্বাধীনতার জন্য অনড় অবস্থান, সে চেস্টাকে সম্পুর্ন বিফল করে দেয়। তার সাথে প্রতিদন্দ্বি অন্য বড়র সমর্থন তো ছিলই।
সেদিন যে বড়র সেই প্রচেস্টা ভন্ডুল হয়ে গিয়েছিল, কথায় বলে ওই জাতির প্রতিশোধ স্পৃহা মরে যায় না কোনদিনও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তারা চুপ করে থাকলেও তাদের প্রতিশোধ স্পৃহার পরিকল্পনা থেকে বাংলাদেশ বাদ যায়নি।
দেশ স্বাধীন হবার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বত্রই ছিল বিশৃংখলা। আর এখানেই আওয়ামী লিগ সবচেয়ে বড় ভুল করে বসলো। প্রশাসনের রন্ধ্যে রন্ধ্যে যোগ্য লোকের অভাব ছিল ( কারণ পাকিস্থানিরা কোনদিনও বাঙ্গালিদের উচ্চ পদে আসীন হতে দেয়নি)। তবুও বাঙ্গালিদের মধ্যে কম যোগ্যতা সম্পন্ন হলেও কিন্ত অভিজ্ঞ লোকের অভাব খুব একটা ছিল না। কিন্তু সে পথে না গিয়ে তৎকালিন নেতৃবৃন্দ,
যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতার বাছ বিচার না করেই শ্রেফ দলীয় বিবেচনায় যাকে খুশি তাকে প্রশাসনে ইচ্ছে মত উচ্চপদে বসিয়ে রীতিমত প্রশাসনকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। ( এখনও সচিবালয়ে যারা তোফায়েল ক্যাডার নামে পরিচিত।)
ভারতের নিজ হাতে গড়া মুজিব বাহিনী, স্বাধীনতা যুদ্ধে একট গুলি না ছুড়লেও, স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক মদদপুস্ট হয়ে সবার উপর ছড়ি ঘুরানো শুরু করলো। ( এমনই একজন মুজিব বাহিনীর সদস্য পরবর্তিতে সন্ত্রাস করে ধনকুবের তো বটেই, অর্থবলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান পদে পর্যন্ত আসীন হয়ে সম্পদ চুষে খেয়েছিল)।
স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বত্রই তখন স্বজন হারানোর হাহাকার আর বেঁচে থাকবার সংগ্রাম। তবুও নতুন আশায় বুক বেধে সবার মধ্যে মুক্তির নিঃশ্বাস। সামরিক বাহিনীর সদস্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যারা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, তাদের চোখের সামনে এই মুজিব বাহিনীর ছড়ি ঘোরানো আর অবাধ লুটপাট আর মাৎসন্যায় চালিয়ে যাচ্ছিল। সেই সাথে ভারতীয় বাহিনীর অবাধ লুটপাট। আর তার প্রতিবাদ করার কারণে ৯ নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর জলিলকে দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কারারুদ্ধ করা হয়।
পাকিস্থানের সাথে মৈত্রিতার সুবাদে গণচীনও আমাদের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল । কিন্ত এর পরেও চীনপন্থি কম্যুনিস্টরা দেশ মাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। শুধু চীনপন্থি বলে তাদের মুল্যায়ন তো দুরে থাক বরং স্বাধীনতার পর তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য তৎকালিন মস্কোপন্থি বাংলাদেশ সরকারের মদদে খোদ আওয়ামী লিগ এবং মুজিব বাহিনী একযোগে কাজ শুরু করে। আর অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই চীনপন্থিরা অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়েই দেয়া শুরু করাতে আইন শৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছিল।
আগেই বলেছি আমাদের প্রশাসনের দুর্বলতা ছিল প্রকট। তার মধ্যে দলীয় লোকজনের খাই মেটাতে ত্রাহি মধুসুদন অবস্থা। এর উপরে আবার মুজিব বাহিনির অস্ত্র হাতে পেশিশক্তির প্রদর্শনি। সাথে যোগ হয় পাকিস্থানিদের হাতে বঞ্চিত সাধারণ মানুষের নতুন করে বঞ্চনার শুরু। যতদিন বঙ্গবন্ধু দেশের বাইরে ছিলেন, ততদিন তারা এই আশায় বসেছিল, যে বঙ্গবন্ধু ফেরত আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম।
হিমালয় সমান জনপ্রিয়তায় আসীন হলেও, প্রাশাসনিক দক্ষতায় বঙ্গবন্ধুর অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। কারণ সারা জীবন যিনি বিরোধী দলে থেকে আন্দলন সংগ্রাম করেছেন, তার পক্ষ্যে যুদ্ধে বিধবস্ত একটি দেশের হাল ধরা সহজ কাজ ছিল না। ( একবার কিছুদিনের জন্য তিনি মন্ত্রি হয়েছিলেন বটে, কিন্ত দুর্নীতির অভিযোগে তাকে অপসারণ করা হয়েছিল। অনেকে অবশ্য এটাকে পাকিস্থানিদের বৈষম্যমুলক আচরন ঢাকার কৌশল বলে মনে করেন।)
বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরা পর, আঃ লিগ আর তার অঙ্গসংঠনের সাথে পাল্লা দিয়ে তার আত্মীয়স্বজনও অবাধ লুটপাটে নেমে পড়ে। বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসেরের ( ৭৫ এর অভ্যুত্থানে নিহত) বিরুদ্ধে দুর্ভিক্ষের সময় চাল চোরাচালানের অভিযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে ফজলুল হক মণি ছিলেন যেন সর্বেসর্বা। কি লুটপাটে কি অত্যাচারে সবখানেই শেখ মণির 'অবদান" ছিল। তাই এমন কি আঃ লিগের মধ্যে অনেকেই শেখ মণির কথায় উঠবস করার কারণে বঙ্গবন্ধুর উপর অভিমান করেছিলেন। এই শেখ মণির সাথে মতের অমিল হবার কারণেই কিন্ত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তাজউদ্দিনকেও মন্ত্রিসভা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই সাথে বঙ্গবন্ধু তনয় শেখ কামাল, ভোট জালিয়াতি, বিরোধিদের ঠ্যাঙ্গানো, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস এবং নারী নির্যাতনের যে ধারা সৃস্টি করে গিয়েছে, তার ধারা আজও ছাত্রলীগের মধ্যে বিদ্যমান।
আবেগের কারনে আর দুরদর্শিতার অভাবে বঙ্গবন্ধু, এই অনাচার অবিচার লুটপাট সন্ত্রাস কোন কিছুকেই বন্ধ করতে পারেননি। তাই তিনি বাধ্য হয়ে আইন শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে লাল নীল বাহিনী গঠন করেন। সবচেয়ে নিন্দনীয় কাজ ছিল, মুজিব বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে রক্ষিবাহিনী গঠন করে, ওদের অতীত এবং বর্তমান সন্ত্রাসকে আইনি বৈধতা প্রদান। আর এই আইনের বলেই চীন পন্থি কম্যুনিস্ট থেকে শুরু করে আওয়ামী লিগ বিরোধিতাকারি মাত্রই রক্ষিবাহিনীর শিকারে পরিনত হলো। ফলাফল? বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় ধস।
বঙ্গবন্ধুর চারিপাশে বন্ধু কেউ না থাকলেও স্তাবকের অভাব ছিল না। চাটুকারদের অহনিশি স্তুতিবাক্য শুনে শুনে তিনি নিজেও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই দেশের সাধারণ মানুষ ও বঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায়ত্ব ক্ষোভ কিংবা অভিযোগ, কোন কিছুই তাকে আন্দোলিত্ করেনি। তবে যখন বুঝতে পেরেছিলেন, তখন তার প্রশাসনকে বদলে দেবার মত অবস্থা আর ছিল না। তাই চাটুকারদের পরামর্শে শেষ মরণ কামড় দেবার মত্ বাকশাল গঠন করে শেষ রক্ষা করার চেস্টা করেছিলেন।
আগেই বলেছি, তাদের কথা অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় একটি বড় দেশের আঁতে ঘা লেগেছিল। তারা প্রতিশোধ নেবার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। আর সেই সুযোগকে তড়ান্বিত করার লক্ষ্যে দুর্ভিক্ষের সময় তাদেরই দেয়া চালবাহি জাহাজকে চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তেই দেয়নি। ফলে ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ আরো প্রকট আকার ধারণ করে।
নেতাদের ক্রমাগত ব্যার্থতা, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, লুটপাট, সন্ত্রাস অন্যদিকে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস, সব মিলিয়ে যেন বাংলাদেশের মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ওদিকে সেনাবাহিনীর প্রতি বৈমাত্রিয় আচরন করার ফলে, স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েও রুটি রুজি হারানোর আশংকায় ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। ততদিনে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেয়া কর্ণেল তাহেরের কারণে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের মধ্যেও আওয়ামী লিগ বিরোধি কম্যুনিস্টপন্থিদের অভ্যুদয় ঘটে গেছে। আর খোদ প্রশাসনে তো খন্দকার মোশতাকের মত মানুষ ছিলই।
তৎকালিন সরকারের পক্ষ্যে খুব কাছে থাকা ভারতীয়রা এব্যাপারে মাথা ঘামায়নি। ততদিনে তারা তো ২৫ বছরের গোলামি চুক্তিতে বাংলাদেশকে বেধে ফেলেছিল। ফারাক্কা চালু করে অদুর ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে ব্ল্যাকমেইল করার পরিকল্পনা সফল করেছিল। কোন কিছু না দিয়েই বেরুবাড়ি হাতে পেয়ে গিয়েছিল। ( সেখান থেকেই ভারতীদের কিছু না দিয়ে সব কিছু আদায়ের বদ অভ্যাস তৈরি হয়েছিল।) রাস্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুটপাট আর চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চুষে ছিবড়ে করে দিয়েছিল। তাছাড়া ইন্দিরার কথা অমান্য করে বঙ্গবন্ধুর ও আই সি সম্মেলনে যোগদান কিংবা বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্যদলের প্রস্থানের বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ, এই দুই কারণেই তারা বঙ্গবন্ধুর উপর খানিকটা হলেও অসন্তুস্ট ছিল। তাই নেপথ্যে চলতে থাকা ষড়যন্ত্রের কথা আচ করলেও, সেটা তারা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেনি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চারিদিকে ক্ষোভ রাগ আর হতাশা, অন্য পক্ষ্যের নির্লিপ্ততা, সবকিছুই নিজেদের অনুকুল বলে নিশ্চিত হবার পরই সেই বড় দেশটি কিস্তি মাত করে দেয়া। তাই দেখা যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলেও, ক্ষমতায় আসীন হয় আওয়ামী লিগেরই নেতারা, যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেই বড় দেশের পক্ষে ছিল। সেই বড় দেশের ইশারাতেই আরো খুন হয়ে যান প্রতিদন্দ্বি দেশটির পক্ষ্যের নেতারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর, মেরুকরণের প্রভাবে এভাবেই দুর্বল রাস্ট্রগুলি হয়ে পড়ে দুই পরাশক্তির খেলার পুতুল হয়ে। তাদের ইচ্ছায় অনেকে ক্ষমতায় আসীন হয়, কেউ ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, দুর্বল রাস্ট্রের মধ্যে এদের মদদদাতার অভাব হতো না কোনদিনও।
শিরোনামে ওই যে বললাম, বড়লোকের প্রেম বালির বাঁধ। আলোচ্য পরাশক্তির প্রেমও যেমন বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে তেমনি নিষ্ঠূরভাবে পদদলিত করা। এক সময় তাদের চোখের মণি ইরাকের সাদ্দামকে ব্যাবহার করে স্বার্থোদ্ধারের পর, এরা সাদ্দামকে ফাসিতে ঝোলাতে সময় নেয়নি। আফগানিস্তানের কারজাই এর মুখে কিছুটা দেশপ্রেমের কথা শোনার পর, সেখানে আরো বিদেশি সৈন্য পাঠিয়ে পরোক্ষ হুমকি দিয়ে রেখেছে। পাকিস্তানের ভেতর তালেবান সৃস্টিতে অনবদ্য অবদান রেখে স্বার্থ উদ্ধারের পর, এখন নিজেরাই তালেবান নিধনে নেমে পড়েছে।
যাদের দিয়ে এই একই পরাশক্তিটি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করিয়ে সোভিয়েত বলয়মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল, তাদেরকেই আজ ফাঁসিতে ঝুলাতে এই পরাশক্তির সায় দিতে বিন্দুমাত্র সংকোচ করেনি। বরং তাদের দেশে ১৮ বছর রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থি এমন একজন প্রাক্তন সেনা সদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য ফেরত পাঠিয়েছে।
ক্ষমতার লোভে শেখ হাসিনাকেও দেখা যাচ্ছে এই পরাশক্তির সাথে বেশ দহরম মহরম করতে। যারা কিনা তার পিতার হত্যায় সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল। আজকে হাসিনাকে ওই পরাশক্তি যতই খাতির করুক না কেন, অতীতের ঘটনাপ্রবাহ সাক্ষি দেবে যে, স্বার্থ ফুরালে হাসিনার সময়ও শেষ হয়ে যাবে। ফাঁসির আদেশ প্রাপ্ত ১২ জনের মধ্যে মাত্র ৫ জনের ফাসি হয়েছে। বাকি ৭ জনকে যে হাসিনার বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর কৌশল নেবে না ঐ পরাশক্তি সে নিশ্চয়তা কোথায়?
এজন্য বলা প্রয়োজন যে, ৫ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আত্মসন্তষ্টিতে নিমজ্জিত হবার আগে, এমন দেশে ৭৫ পুর্ববর্তি অবস্থার পুনরাবৃত্তি রোধ না করলে, আরেকটা ১৫ই আগস্ট হতে বাধ্য। কেননা বড়লোকের প্রেম সে বালির বাঁধ। স্বার্থের সময় কাছে টানা আর স্বার্থ শেষ ছুড়ে ফেলা আর স্বার্থের বিরুদ্ধে গেলে নিকেশ করে দেয়া, এই করেই তো তারা অভ্যস্থ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


