
কিছু কিছু ব্যাপারে আমি জিরো টলারেন্সের পক্ষপাতি। মেয়েদের উত্যক্ত করা তার মধ্যে একটি। ব্লগে এ নিয়ে অসংখ্য লেখা এসেছে। যার ফলে ইভ টিজিং এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আদর্শ ভেদে সব পক্ষই একমত পোষন করেন। ব্যাপারটা খুবই আশাব্যাঞ্জক। কেননা মতভেদের কারণে আমরা অনেক গুরুত্বপুর্ন ইস্যুতে এক হতে পারি না।

ইভটিজারদের শাস্তি দানের ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অনেকের লেখাতেই উঠে এসেছে। এমন কিন্তু নয় যে এর বিরুদ্ধে আইন নেই। আমাদের দেশের আইন যথেষ্ঠ শক্তিশালি। কিন্তু তার প্রয়োগ ঘটে না বলে আপাতদৃস্টিতে এ ব্যাপারে আইনকে ঠুটো জগন্নাথ মনে হতে পারে। আসলে মোটেও সে রকম কিছু নয়। কিন্তু যারা প্রয়োগ করবে, তাদের প্রতি সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রন থাকার কারনে সবকিছু তারা হুকুমের অপেক্ষায় বসে থাকেন। আর এভাবেই আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনির নিজস্ব কর্ম পরিধি নিয়ে আস্থার অভাব দেখা যায়। সাথে যখন বাংলাদেশে জামিন নামের (উপযুক্ত মুল্যে ক্রয়যোগ্য) অদ্ভুতুড়ে সিস্টেম চালু আছে, তখন কুচ পরোয়া নেই বলে অনেকেই সুযোগের পুর্ণ সদ্বব্যাবহার করে থাকে।

বয়সসন্ধি কালে, নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষনবোধ হবেই। এটাই স্বাভাবিক জীবনের নিয়ম। কিন্তু এর পেছনে যে দ্বায়িত্ববোধ জড়িত, সেটা শেখার জন্য যা পরিবেশের দরকার সেটা নেই। আর সেই শিক্ষা গ্রহন করার জন্য যে মানসিক পরিপক্কতা দরকার, বয়সের কারণে সেটাও সম্ভব না।
এক সময় বাবা মার কঠিন শাসনে ইতি উতি চলতো ভয়ে ভয়ে। এমনকি মহল্লার লোকজনের চোখ ফাকি দিয়েও হয়তো শ্রেফ চোখের দেখা দেখার জন্য ছেলেরা সুযোগ খুজে বেড়াতো। আর স্কুলগুলিতে শিক্ষক শিক্ষিকারাও ওই বয়সের শারিরিক হাতছানি যেন নিয়ন্ত্রনের বাইরে না চলে যায় সে ব্যাপারটা দ্বায়িত্বের সাথেই লক্ষ্য রাখতেন।
এজন্য শিক্ষার্থিদের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাস্ত করে রাখা হতো। খেলাধুলা, সংগিত / বিতর্ক প্রতিযোগিতা, হাতের কাজ, চিত্রাংকন ইত্যাদি বিষয়ে ছাত্র ছাত্রিরা ব্যাস্ত থাকতো বলে, যৌন বিষয়ক ভাবনাটি ব্যাপক হয়ে উঠতে পারেনি কোনদিনই।
এর পরেও যে, বড় ভাই, কিংবা নিকট বয়োঃজোষ্ঠ্য আত্মিয়র গোপন ভান্ডারে থাকা, সচিত্র যৌন সাহিত্যের চর্চা হতো না, তেমন না। এমনকি ওই বয়সে, বয়সে বড় কোন বন্ধুর হাত ধরে পতিতা গমনও ব্যাতিক্রম কিছু ছিল না। হস্তমৈথুনও ছিল ওপেন সিক্রেট। ঘরের কাজের ছেলে, কিংবা সিনিয়ার অভিজ্ঞ কোন লোকের মারফতে ছেলেরা এই অভ্যাসটি ঠিকই রপ্ত করে ফেলতো। আর নারীদের বিশেষ চোখে দেখার ব্যাপারটি বন্ধু মহলের সবচেয়ে চর্চিত আড্ডার বিষয় ছিল, সেটাও সত্য কথা। কিন্ত ঢালাওভাবে ভাদ্র মাসের কুকুরের মত উন্মত্ততার শুরু অনেক পরে।

আমরা এক অদ্ভুত উন্মত্ততায় ছুটছি। যেন ট্রেন ছুটে যাবে। ফলে জীবনের গতি বেড়ে নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়েছে। বাবা মা, কাজের চাপে লক্ষ্য রাখতে পারেন না তার সন্তানেরা কি করছে। টাকার নেশায় বিভোর শিক্ষক শিক্ষিকারা সন্তানসম ছাত্রছাত্রিদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্য কিছু শিক্ষা দিচ্ছেন না। অথচ ছাত্রছাত্রিরা ঘরের চেয়ে শিক্ষায়তনেই বেশি সময় ব্যয় করে থাকে।
.jpg)
আর এই দিকভ্রান্ত উঠতি বয়সি ছেলে মেয়েদের আদর্শ হিসেবে গড়ে উঠছে ফ্যাশন মডেল কিংবা চলচিত্রের নায়ক নায়িকা। যদিও তারকাখ্যাতির আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে অনেক ইতিহাস, যা জানাজানি হলে, তাদের তারকা খ্যাতি থাকতো না। আর এই তারকাদের সিংহভাগই যে পড়াশুনায় মেধাশুন্য বলে জীবিকার প্রয়োজনে সং সেজে আছে, সেকথাটিও উঠতি ছেলে মেয়েরা জানে না।

মরার উপর খাড়ার ঘা এর মত মহামারি আকারে বিজাতিয় অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমাদের চিরচারিত যে ঐতিহ্য আমরা লালন করে রেখেছিলাম, তা প্রায় ধবংসের পথে।
পথভ্রান্ত, দিশেহারা এই সন্তানদের ভেতরের যে হতাশা, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, ইভ টিজিং এর মতই কিছু বিকৃত ক্রিয়ার মাধ্যমে।
খেলার জন্য মাঠ নেই, ঘরে বাবা মার স্নেহ ভালবাসা নেই, শিক্ষায়তনে শিক্ষক শিক্ষিকাদের আন্তরিকতা নেই, মেধা বিকাশের পথগুলি প্রায় অবরুদ্ধ।এর মধ্যে কানের কাছে সারাদিন খালি সেক্সের আলাপ। গানে সেক্স, নাটকে সেক্স, ছবিতে সেক্স, ইন্টারনেটে সেক্স, মায় এমনকি সেলফোনেও সেক্স। এত্ত সেক্সের মধ্যে যৌনতা ছাড়া মাথায় আর কি থাকবে? ফলাফল স্থান কাল ভেদে কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়াই তাদের হরমন উচ্চমাত্রায় প্রকাশিত।

সাথে যখন আবার বাংলা চলচিত্রে বড়লোকের কন্যার গরিবের ছেলের প্রতি বাই ডিফল্ট প্রেম, তখন অশিক্ষিত বস্তির উঠতি পোলাপানও ধরে নেয় শিক্ষিত সুন্দরি ধনীর দুলালি তাদের প্রেম পড়তে বাধ্য। তখন স্থুল কায়দায় প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়া মাত্রেই জিগাংসা শুরু হয়।
সমস্যার কথা বলেই খালাস দেয়াটা অবিচার করা হবে। সমাধানের অনেক পথই আছে। আমার বুদ্ধি বিবেচনায় যতটা কুলায়, ততটা বলছি।
১। সবচেয়ে প্রথমে ঘর ঠিক করতে হবে। ছেলে মেয়েদের শাসন না করার যে কুপ্রথা সুশিল জ্ঞানে আপন করে নেয়া হয়েছে, সেটা বাদ দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের শাসন করার অধিকার বাবা মায়ের আছে। যাদের দেখে এই সুশিলিয় কুপ্রথাকে অনুসরন করা হচ্ছে, সে সব দেশে পরিবারতন্ত্র তো আছেই, সাথে নৈতিকতা আর মুল্যবোধ শুন্যের কোঠায় নেমেছে। সেই ধবংসের পথে আমরা যাবো কেন?
ইগো ভুলে বাপ মায়ের উচিত হবে, তাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে নালিশের প্রতিকার করা। অনেক সময় দেখা যায় বাপ মায়ের আশকারাতেই সন্তানরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে।
আর সন্তান জন্ম দিয়ে সঠিক লালন পালন শিক্ষায় বড় করে তুলতে কেউ অক্ষম হলে, তাকে সন্তান জন্ম দানে রাস্ট্রিয়ভাবেই অনুৎসাহিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে সন্তান জন্ম নিষিদ্ধ করে দেয়া যেতে পারে।
২। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক শিক্ষিকাদের রেটিং পদ্ধতি চালু করতে হবে। যার মুল্যায়ন করবে অভিবাবকরা। আর একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকুরিরত শিক্ষক শিক্ষিকাদের শুধু একটি মাত্র প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করতে বাধ্য করতে হবে।
খেলাধুলার পর্যাপ্ত ব্যাবস্থা ছাড়া কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই পরিচালনা করতে দেয়া উচিত না।
শিক্ষা ব্যাবস্থায় অবশ্যই ধর্মীয় আর নৈতিকতা শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
৩। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বিজাতিয় প্রভাবমুক্ত করতে হবে। ইন্ডিয়ান চ্যানেল সম্পুর্ন নিষিদ্ধ করতে হবে। সাথে হিন্দি সিনেমাকেও। তবে ইন্ডিয়ান বাংলা ছবি চলতে পারে। আর পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরনে যে সব সংগিত গোষ্ঠি গড়ে উঠেছে, তাকেও বিদায় জানাতে হবে। তবে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারন করে যদি দেশীয় কলার সাথে সামান্য বিদেশি মেশাতে হয়, তাহলে অবশ্য সমস্যা নেই।
৪। আঠারো পিস দাড়ি গজানোর আগেই, পিচ্চিদের হাতে সময়ের দাবির অযুহাতে সেলফোন তুলে ধরার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। সবাই জানেন এই সেলফোনের আসল উদ্দেশ্যে কিভাবে ব্যাহত হচ্ছে। লাভের চেয়ে ক্ষতিই যখন বেশি তখন এটা প্রাপ্তবয়স্কদের হাতে থাকাই বাঞ্চনিয়।
৫। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশাকে খুব বেশি উৎসাহিত করার মানে নেই। তেল আর আগুন পাশাপাশি থাকলে আগুন জ্বলবেই। আর সে আগুনে নারী পুরুষ আর তার আশে পাশের সবাই পুড়ে মরবে।
৬। স্কুল কলেজের সামনে ছেলেদের ভীড় করা চলবে না। কোন অবস্থাতেই না। এই নিয়মের ব্যাতয় ঘটলে আইনের প্রয়োগ স্বাধীন ও কঠোরভাবে দমনের অধিকার পুলিশকে দিতেই হবে।
৭। যারা ধর্মীয় কাজে জড়িত তারা শুধু মিলাদ পড়িয়েই কিংবা পুজা পাঠ করিয়েই দ্বায়িত্ব শেষ করতে পারবেন না। তাদেরকে সমাজ গঠনে এগিয়ে আসতেই হবে। মসজিদে, মন্দিরে, গির্জায় প্যাগোডায়, ধর্মীয় নৈতিকতা নিয়ে যথেষ্ঠ বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে। তবে সেটা যেন শ্রেফ নারীকে অবমুল্যায়ন মরে না হয়, সে বিষয়ে সতর্কতা অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।
সবার সম্মিলিত প্রচেস্টায় আমাদের সমাজ এই কলুষ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। নতুবা অধুনিকতার নামে, প্রগতিশিলতার নামে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসালে, আমাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, সংস্কৃতি আর ভাষা তো রসাতলে যাবেই, সাথে সেই অসুস্থতা আমাদেরকে আদিম যুগেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের সচেতনতার মাত্রাই ঠিক করে দেবে, আমরা সামনে যাবো নাকি পেছনে।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



