
অলস লোককে আলসেমির সুযোগ করে দিলে যা হয় আর কি ! লেহ্য চোষ্য পানীয় সহযোগে দিনগুলি খুব ভালো কাটছিলো। ভাবছিলেন, এই সেদিন পর্যন্ত সে ছোকরা ১৪, ৭০০ টাকা বেতনে পেটে ভাতে খেয়ে না খেয়ে কাটাতো, সে এখন চটাং চটাং করে রাজসিক জীবন ধারণের কথা বলছে কি করে?
তবে কি প্রাইজবন্ড জিতেছে সে? নাকি লটারি?
কোনটাই না। শ্রেফ একটা জিনিস ত্যাগ করেছি মাত্র। খুব বড় জিনিস না, আবার খুব ছোটও না।
কি লোভ হচ্ছে?/ জানতে চান এই রহস্য? আরে বিনি পয়সায় লেখাটা পড়ছেন যখন, তো জেনে নিন।
সেটা হচ্ছে সত্যবাদিতা। কি দরকার ফালতু এই জিনিসটা রেখে? দেশের দুটা চ্যানেল আর একটা পত্রিকা এই ফালতু জিনিসটা পুষে রেখে এখন ফাপড়ে আছে। বাকিরা দেখুন তো কি সুখে আছে
আরে দেশের সিংহ ভাগ মানুষের মধ্যেই যখন এ নিয়ে মাথাব্যাথা নেই, তো আমি কোন্ খাঞ্জা খা এর বংশধর যে বিপরীত ধারায় চলবো?
যেদিন থেকে সত্যকে ছেড়ে দিয়েছি, সেদিন থেকে অভাব, বাপ বাপ করে পালিয়েছে। অভাব না থাকলে কর্মের প্রয়োজন নেই। আর কর্ম না থাকলে আলসেমির জন্য উপলক্ষ্যের প্রয়োজন হয় না।
যাই হোক। সেদিনও বেশ জম্পেশ করে এসির ঠান্ডা হাওয়ার নীচে নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ ফোন।
- বাচ্চু ভাই। আপনাকে আসতে হবে একটু।

কি মুশকিল ! মাত্র স্বপ্নের মধ্যে এক উর্বশিকে ফিট দিতে যাচ্ছি, এই সময় কোন বেরসিক বেয়াক্কেল বাগড়া দিলো?
অন্য কেউ হলে কিঞ্চিত অশ্রাব্য ভাষা প্রয়োগ করা যেতো। কিন্ত এযে স্বয়ং শামিম ভাই। গলা শুনে বুঝতে পারলাম, কোথাও সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে।
তিনি ফোনে কিচ্ছু বলতে চাইলেন না। শুধু বললেন বুবুর নাকি কঠিন সমস্যা।
হতেই হবে। এমন করে ভারতের নফরগিরি করলে, দেশ মাতৃকার অভিশাপ লাগবে বৈ কি ! তাছাড়া নির্বিচারে এত লোক মেরে ফেললে, তারও প্রায়াশ্চিত্ত করতে হবে, নাকি?
কি করবো? ভাই হই। বোনটা যতই পাষন্ড আর খন্নাস হোক, ফেলে তো দিতে পারি না। মনটা হু হু করে উঠলো।।
আর ছেলে মেয়ে দুটাও হয়েছে তেমনি। এতদিন খবর নেই। যেই বিদেশে হাতে হাতকড়া পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি মায়ের কাছে এসে ম্যা ম্যা করছে। ছেলেটা তো বিদেশি বৌটাকে শুদ্ধ তালাক দিয়ে এসেছে।
আর বুবু ছোট বোন যে ছোট বোন, সে আরেক কাঠি সরেস। আর কত খাবি? রক্তের সম্পর্কটা দেখলি না? আমু তোফায়েল সুরঞ্জিতকে দিয়ে ব্লাকমেইল করে নিজের বোনকে শুসছিস? ছি ছি ছি !
যাই হোক, কোনমতে ফ্রেস হয়ে দৌড়ালাম। বুবুর বিপদে আমি না দাড়ালে কে দাঁড়াবে? তার চারিদিক ঘিরে তো শুধু ভারতপন্থি চাটার দল।
গিয়ে দেখি হুলুস্থল কারবার। প্রাণ গোপাল বাবু একবার এ ঘর আরেকবার ও ঘর করছেন। কাকে যেন কল করছেন। দলিয় বিবেচনায় তো ডাক্তারি করছো বাপু। কিন্ত ভুয়ার উপর কতদিন আর? এক সময় ধরা খেতেই হবে।
বসার ঘরে অনেককেই দেখলাম। চাতক পাখির মত চেয়ে আছে। ওদিকে শামিম ভাই আমাকে আসতে বলে নিখোজ হয়ে আছেন। আমি আবার পেটে দানাপানি না দিয়েই এসেছি। প্লান ছিল দুপুরে খেয়ে দেয়ে আবার আরেকটা ঘুম দেবো।
আর মেনুটাও ছিল দুর্দান্ত। মেঘনার টাটকা পাঙ্গাস মাছের টক ঝোল। বড় চিতলের পেটির দোপেয়াজা। শুটকি আর শাক। সজনে দিয়ে ঘন ডাল। আরো কি কি যেন ।
কোথায় ভুড়িভোজন করবো। তা না। এসে এক গাদা যমের অরুচির মুখগুলি দেখতে হচ্ছে।
বসে বসে হাত পায়ের শেকর গজিয়ে যখন গাছ হবে হবে করছে, তখন আর পারা গেলো না। উঠেই নিজেই বুবুর দরজার সামনে ডাক দিলাম
- বুবু... ও বুবু...
-অ্যাঁই কেডা রে?
-বুবু আমি বাচ্চু।
-চাচ্চু? চাচ্চু কেডা? আমারা চাচা ল্যাংড়া নাসের রে তো আমার বাপের লগেই মাইরা ফেলছে রে এ এ এ এ। ও বাবা ও চাচা।
আরে কি মুশকিল? বুবুর কি বুদ্ধিভ্রম হয়েছে? কিসের মধ্যে কি?
এই সময় দেবদুত হয়ে শামিম ভাইয়ের পদার্পণ।
-যাক আপনি এসে পড়েছেন বাচ্চু ভাই। ওই দিকে নেত্রির হাল তো কেরাসীন।
-কেরাসীন সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্ত সমস্যাটা কি?
- ওই পুরানো সমস্যাটা। কানে ঠিকমত শুনছেন না। প্রাণ বাবু যতটা পারছেন করছেন। আর এই সময় বোঝেনই তো, দেশের বাইরে গেলে তকতা পালটে গেলে? আমরা সবাই তো ধনে প্রাণে গেছি।
-খুবই সত্যি কথা? কিন্ত আমি কি করবো? আমি কি ডাক্তার নাকি?
- শুধু কানে সমস্যা হলেও চলতো। ইয়ে মানে মাথাটাও কেমন জানি হয়ে গেছে। কেউকে বিশ্বাস করতে পারেন না। ডাক্তার বললো, এই সময়ে আপন জনের সঙ্গ থাকলে ভালো হয়।
- কিন্তু ভাগ্নে ভাগ্নি তো দেশেই।
- আরে কিসের কি? ওদের দেখলে আরো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। এই তো সেদিনই মেয়েকে বললেন,
"আ লো আবাগির বেটি ! তোর বিয়া দিতে গিয়া আমার জামাই এর ১২টা বাজছে। তোর শশুরকে রাজাকার থেইকা মুক্তিযুদ্ধা বানাইছি। মন্ত্রি করছি। ট্যাকা বানানের মেশিন দিয়া দিছি। আর তুই আর তোর আকাইমা ভাদাইমা জামাই মিলা বিদেশেও চুরি ধারি কইরা আমার আর আমার বাপের নাম ডুবাইলি? দুর হ চোখের সামনে থেইকা। "
ছেলেটা কি যেন বলতে যাচ্ছিল। নেত্রি আরো ফায়ার হলেন। বললেন,
"তুই চুপ থাক গোলাইম্মা। তোর বাপে কি কোটি কোটি টাকা রাইখা গেছে যে বিদেশ ফুটানি কইরা বেড়াইছোস? এহহ ! সাদা বেটি লইয়া রঙ্গ তামাশা? মাতাল হইয়া গাড়ি কইরা ঘুড়া? কেন রে হারামযাদা? বিদেশে লাখ লাখ লোক গতর খাইটা মা বাপ রে পালে। আর তোরে পালতে গিয়া আমার কত বেলাইনে পয়সা কামাইতে হইলো। কি লাভ? এখন জেলের ভাত খাওয়ার ডরে আমার কাছে আইছোস লুকাইতে? নিমকহারাম জানি কুনহানকার। তুইও দূরে গিয়া মর।"
সত্যি এ ভয়াবহ অবস্থা দেখছি। ওদিকে ভালো মন্দ খেয়ে খেয়ে আমার চেহারাতেও জেল্লা এসেছে। পেটে মেদ আর মুখে বেশ একটা তেলচকচকে ভাব এসেছে। আল্লাহই জানে আমাকে দেখলে কি ভাবে বুবু। যাই হোক। বিপদে আমার মাথা ভালোই খেলে।
ঢুকলাম বাঘের খাচায়। যা দেখলাম তাতে আমার আক্কেল গুড়ুম। সামরিক পোষাকে বুবু পায়চারি করছেন, আর মাঝেমাঝে ডান হাত তুলে হিটলারি স্যালুট দিচ্ছেন।
- বুবু কেমন আছো?
- ওহ বাচ্চু? কেমন আছোস ভাই। বাহ। চেহারা দেখি খুইলা গেছে। তুই ও কি হারাম কামানো শিখা গেসোছ নাকি?
এই সেরেছে। মরলাম মনে হয়।
মুখে দুঃখ দুঃখ ভাব করে বললাম
- কিযে কও না বুবু। বেতন যা পাই, দুই বেলা খাইতে পারি না। সস্তায় ফর্মালিন দেওয়া মাছ খাইয়া মুখে চর্বি আর পেটে পানি জমছে। ডাক্তার দেখামু, সেই পয়সাও নাই।
বলেই চোখে আঙ্গুল দিলাম। ঢাকা শহরে বাতাসের অনুতে অনুতে জীবানু। সেই বাতাস খাওয়া আঙ্গুল চোখে যেতেই জীবানু বাবাজিরা নেত্য করতে শুরু করাতেই চোখে পানি এসে গেলো। বিনা গ্লিসারিনেই অশ্রু।
- থাউক থাউক কান্দিস না ভাই। হালালের এক পয়সাও ভালো। আর ফর্মালিন দেয়া কিছু খাইস না। আমি শামিমরে বইলা দিমুনে। তোর সপ্তাহের বাজারটা সেই ই দিয়া আইবোনে।
- তোমারে খুব অস্থির দেখতেছি বুবু। আমার তো ভাল লাগে না এই সব দেখতে।
- আর কইস না রে ভাই। চারিদিকে খালি শত্রু আর শত্রু। কেউরে বিশ্বাস করতে পারি না। দাড়া তোরে কই। নাইলে শান্তি পাইতেছিনা। তার আগে ক বাইরের ঘরে কেডা কেডা বইসা আছে?
- ইয়ে তাপস আর ইনু রে দেখলাম।
- অ্যাঁ? পাপোস আর মিনু? এই বঙ্গভবনে পাপোস আইলো কোই থেইকা? আর মিনু ওই রাজশাহির মেয়র ছিলো না? ওই এইখানে কেন? পল্টি দিবো নাকি?
গলার স্বর একটু চড়িয়েই বললাম ইনু আর তাপস। বোধ করি ডোজ বেশি হয়ে গিয়েছিলো।
- ও ! তো এই কথাটা এত জোরে কওনের কি হইলো?
- আর কইয়ো না বুবু। সস্তার খাওন খাইয়া আমার গলায় কোন কন্ট্রোল নাই। মাফ কইরা দিও।
-আচ্ছা হইলো। শুন, আমি না রাইতে ঘুমাইতে পারি না।
- ঘুমাইতে কেমনে পারবা। এতজনের এত হুকুম আর আবদার রাখতে গেলে তো ঘুম হারাম হওনের কথাই।
- তাও ঠিক ! এর মধ্যে নাস্তিকগুলারে নিয়া আরেক জ্বালা। হুদা কামে ইসলামের পিছে লাইগা এতগুলি হুজুররে খুন করাইলো। এখন যদি হুজুর গুলি মিলাদ্দ টিলাদ না পড়ায়, তাইলে সমস্যা না? হায়াত মৌতের কথা কি কওন যায়।
- এহ কইলেই হইলো? টিভিতে দেখছি না, কত হুজুর তোমার পিছে আছে।
- আরে ওইগুলি কিসের হুজুর? মুখে দাড়ি আর মাথায় টুপি দিয়া হুজুর সাজছে। একটারে দেখলি না, আছিলো বাইদ্যা। বানাছিলাম হুজুর। কিসের কি ! এইগুলিও অই রকমই।
- তুমি কি ডরাইছো বুবু?/
- ঠিক ডরান না বাচ্চু। ঘুমাইলেই শুনি খালি জিকির। এর পর বোমা গুলি চিতকার চেচামেচি। তখন ঘুম আসে না আর। না ঘুমাইয়া কি মাথা ঠিক রাখা যায়?
- হু তাও ঠিক। কিন্ত এই কামটা করতে গেলা কেন?
- না কইরা কি করমু? আমি দ্যাশের ভালো চাই বইলাই তো ২০২১ সাল পর্যন্ত খেদমত করতে চাইছি। তোরা হুজুর। তোগো বাগড়া দেওনের কি কাম? যেইখানে তোগো ভাবিই কোন কথা কইতাছে না, সেই খানে হুজুর হইয়া আমার লগে বেয়াদবি? তাছাড়া শিং সাবও ফুন কইরা কইলো, এত এত হুজুর দেখলে ওবামা ভাইও বিলা খাইবো। চান্স আছে, এক ঢিলে দুই পাখি মাইরালাও। রামপন্থি বামগুলিও খুশি হইবো আবার আম্রিকান সাহেবরাও বুঝবো আমি ওগো ক্রুসেডের সংগি। এখন আমারে ঠেকাইবো কেমন?
- হু, দেশের মানুষ যা খুশি কউক। বিদেশি হুজুররা কিন্তু খুব খুশি হইছে। দেখো না জাতিসঙ্ঘ থেইকা দুতা আইসা, ভাবিরে এমুন ডলা দিছে, যে এখন ঠিকই আলোচনায় বইতে রাজি হইছে।
- হে হে হে। ঠিকই কইছোস। এখন আমারে ঠ্যাকায় কেডা?
- কিন্তু বুবু তুমি আর্মির ড্রেস পড়ছো ক্যান?
- আরে বোকা বুঝোস না? আর্মির চিফ তো আসলে আমি। ওই কিশোরগইঞ্জা হামিদ তো নাম কা ওয়াস্তে। তাই ভাবলাম পোষাকে কেমন লাগে দেখি।
আচ্ছা শোন, চল আমরা হেফাজত হেফাজত খেলি।
- মানে কি বুবু?
- মানে তুই হেফাজতে এক্টিং করবি, আর আমি র্যাব হমু। টিভিতে র্যাব ছাত্র লীগ পুলিশ এগো গুল্লি কইরা মানুষ মারা দেখতে দেখতে আমারও শখ হইছে আমি গুল্লি করমু। কিন্ত কেউরে পাইনা। কেউ রাজি হয় না। তুই আইছোস। তোরে নিয়া প্রেকটিস করি।
বুবুর খেয়াল। মানা করি কি করে? কিন্ত একি, কোমড়ের কাছ থেকে পিস্তল বের করে কথা নেই, বার্তা নেই সিধা গুড়ুম গুড়ুম গুলি ক্করা শুরু করলো।
কিছু বলার আগেই কপালে গুলি এসে লাগলো। আআআআআ করে আর্তচিৎকারে আমি চিৎপটাং।
নাহ সিলিং এর আস্তরটা ঠিক করাতেই হবে। নইলে ঘুমের মধ্যেই কোন সময় পুরো ছাদ ধসে পড়ে সত্যি সত্যি ভবলীলা সাঙ্গ হবে কে জানে?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



