আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা করি। লেকচারার থেকে অ্যাসিস্টেন্ট প্রফেসর হয়েছি| বেতন বাড়েনি‚ যন্ত্রণা বেড়েছে| আমাকে দূর-দূরান্তরে পরীক্ষা নিতে পাঠানো হচ্ছে| পটুয়াখালী‚ বরিশাল‚ ফরিদপুর| কলেজগুলোতে পড়াশোনা হয় না বললেই চলে| প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের সুযোগ-সুবিধাও নেই| ছাত্ররা কিছুই পারে না| অতি সহজ প্রশ্নে মাথা চুলকায়‚ ঘাড় চুলকায়| মাথা এবং ঘাড় থেকে প্রশ্নের উত্তর আসে না|
অনার্স পরীক্ষা দিচ্ছে এমন ছেলেকে যখন জিজ্ঞেস করি‚ পানির ফর্মূলা কী? সে আমতা আমতা করে বলে‚ H2O| যেন তার সন্দেহ আছে আসলেই H2O কিনা| তারপর জিজ্ঞেস করি‚ D2O কী? যারা কেমিস্ট্রি জানেন না তাদের বলছি‚ D2O হচ্ছে হেভি ওয়াটার| হাইড্রোজেন অ্যাটমে প্রটোন থাকে একটা‚ এখানে দুটা| D হলো হাইড্রোজেনের একটা Isotope. অতি সহজ এই প্রশ্নে পরীক্ষার্থী পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে বলে‚ স্যার হচ্ছে D2O ঢাকার পানি| তাহলে রাজশাহীর পানির ফর্মূলাটা কী? স্যার R2O| বরিশালের পানি? স্যার B2O| বরগুনার পানি? এইবার ছাত্র উৎসাহী| সে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে| সে হাসিমুখে জবাব দেয়‚ বরগুনার পানিরও স্যার একই ফর্মূলা B2O|
আমি হতাশ চোখে পরীক্ষার্থীর দিকে তাকিয়ে থাকি| ইন্টারনাল একজামিনার হাত কচলাতে কচলাতে বলেন‚ পাস করিয়ে দিতে হবে স্যার| গরিবের ছেলে| কষ্ট করে লেখাপড়া করছে| ভাবটা এ রকম যে‚ ধনীর ছেলেমেয়েদের কেমিস্ট্রি জেনে পাস করতে হবে| গরিবের ছেলের পাসটা প্রয়োজন| কেমিস্ট্রি জানা প্রয়োজন না|
বাইরে পরীক্ষা নিতে গেলে ভাইভা বিষয়ক অতি ক্লান্তিকর অবস্থার ভেতর যেতে হয়| ছাত্রদের ফেল করাতে ইচ্ছা করে না‚ আবার পাস করাতেও ইচ্ছা করে না| ভাইভা নিতে কষ্ট| থাকা-খাওয়াতেও কষ্ট|
এক্সটারনাল শিক্ষকদের থাকার জায়গা হয় সাধারণত ল্যাবরেটরির লাগোয়া ঘরে| উদাহরণ বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ| সেখানে পরীক্ষা নিতে গিয়ে ওই ঘরে অনেকদিন থেকেছি| একবার ভূতও দেখেছিলাম| যেসব কলেজে এ রকম কোনো ঘর নেই সেখানে থাকার ব্যবস্থা হয় কোনো শিক্ষকের বাসায়| ভদ্রলোক হয়তো পরিবার-পরিজন নিয়ে বাস করছেন‚ সেখানে মূর্তিমান উপদ্রবের মতো অচেনা অজানা একজন মানুষ থাকতে আসেন| যাকে আপন করে নেওয়া যায় না‚ আবার দূরেও ঢেলে রাখা যায় না|
এক্সটারনাল ভদ্রলোক ইচ্ছা করলেই ভাইভায় প্রচুর ফেল করিয়ে ঝামেলা করতে পারেন| একবার কেমিস্ট্রির এক শিক্ষকের বাসায় আমার থাকার জায়গা হলো| ভদ্রলোকের বাসায় একটা বাথরুম| সেই বাথরুম স্বামী-স্ত্রীর শোবার ঘরের সঙ্গে এটাচড| আমার আবার রাতে কয়েক দফা বাথরুমে যেতে হয়| ভদ্রলোক অবশ্য খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে বললেন‚ আমার শোবার ঘরের দরজা খোলা থাকবে|
আপনার যতবার ইচ্ছা বাথরুমে যাবেন| কোনো সমস্যা নেই| দীর্ঘ ভূমিকা দিলাম‚ এখন মূল গল্পে আসি| আমি পরীক্ষা নিতে গেছি পটুয়াখালীতে| ল্যাবরেটরির পাশের টিচার্স রুমে খাট পেতে আমার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে| গরমকাল| বেশির ভাগ সময় ইলেকট্রিসিটি নেই| ফ্যান চলে না|
প্রথম রাতে একফোঁটা ঘুম হলো না| বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি| রাত তিনটায় মশারির ভেতর থেকে বের হলাম| সঙ্গে সঙ্গে শত শত মশা আমাকে ছেঁকে ধরল| আবার মশারির ভেতর ঢুকলাম| গরমে টিকতে না পেরে আবার বের হলাম| মশাদেরকে বললাম‚ তোমরা যারা এখানে আছ তারাই আমার রক্ত খাও‚ বাইরে থেকে কাউকে ডেকে এনো না| ঘরটাকে আমার মনে হলো হাজতখানা| এই হাজতে সাতটা রাত পার করতে হবে ভেবে খুবই দমে গেলাম| এর হাত থেকে উদ্ধার পাওয়া যায় কীভাবে? হঠাৎ করে মনে হলো একটা নদী কল্পনা করলে কেমন হয়?
নদীর পাড়ে একটা গাছের নিচে আমি বসে আছি| উথাল পাতাল হাওয়া নদীর উপর দিয়ে উড়ে আসছে| এমন হাওয়া যে আমার সামান্য শীত শীত ভাব হচ্ছে| আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মশক বানিহীকে সম্পূর্ণ অগ্রহ্য করে নদী কল্পনা শুরু করলাম| নদীর একটা সুন্দর নামও দিলাম- ময়ূরাক্ষী| যারা আমার লেখার পড়ছেন তারা হয়তো পুরোপুরি বিশ্বাস করবেন না যে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার গরম লাগা কমে গেল|
নদীর প্রবল হাওয়ায় মশারা উড়ে গেল| আমার খানিকটা শীত শীতও করতে লাগল| তৈরি হলো হিমু‚ যে যেকোনো অবস্থায় কল্পনার নদী ময়ূরাক্ষীর কাছে চলে যেতে পারে| হিমুকে নিয়ে লেখা আমার পন্সথম উপন্যাসটির নাম ময়ূরাক্ষী| ময়ূরাক্ষীর হিমু আমি নিজে| প্রথম লেখা হিমুবিষয়ক বইয়ে ময়ূরাক্ষী নদী কীভাবে চলে এল‚ একটু দেখা যাক|
‘ছোটবেলার কথা| ক্লাস সিক্সে পড়ি| জিওগ্রাফি পড়ান মফিজ স্যার| তিনি ক্লাসে ঢুকলে চেয়ার-টেবিলগুলো পর্যন্ত ভয়ে কাঁপে| স্যার মানুষটা ছোটখাটো‚ কিন্তু হাতের থাবাটা বিশাল| আমাদের ধারণা ছাত্রদের গালে চড় বসাবার জন্য আল্লাহতালা স্পেশালভাবে স্যারের এই হাত তৈরি করে দিয়েছেন| স্যারের চড়েরও নানা নাম ছিল - রাম চড়‚ শ্যাম চড়‚ যদু চড়‚ মধু চড়|
এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন চড় হচ্ছর রাম চড়‚ সবচেয়ে নরমটা হচ্ছে মধু চড়| স্যার সেদিন পড়াচ্ছেন - বাংলাদেশের নদ-নদী| ক্লাসে ঢুকেই আমার দিকে আঙুল বাড়িয়ে বললেন‚ এই একটা নদীর নাম বল তো| চট করে বল| মফিজ স্যার কোনো প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণের জন্য আমার মাথাটা পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়| কান ভোঁ ভোঁ করতে থাকে| মনে হয় মাথার খুলির ভেতর জমে থাকা কিছু বাতাস কানের পর্দা ফাটিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে|
কী ব্যাপার চুপ করে আছিস কেন? নাম বল| আমি ক্ষীণস্বরে বললাম‚ আড়িয়াল খাঁ| স্যার এগিয়ে এসে প্রচণ্ড চড় বসিয়ে দিলেন| খুব সম্ভব রাম চড়| হুঙ্কার দিয়ে বললেন‚ এত সুন্দর সুন্দর নাম থাকতে তোর মনে এল আড়িয়াল খাঁ? সব সময় ফাজলামি? কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাক| আমি কানে ধরে সারাটা ক্লাস দাঁড়িয়ে রইলাম| ঘন্টা পড়ার মিনিট পাঁচেক আগে পড়ানো শেষ করে স্যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন| আমার দিকে তাকিয়ে বললেন‚ কাছে আয়|
আরেকটি বড় খাবার জন্য আমি ভয়ে ভয়ে স্যারের কাছে এগিয়ে গেলাম| তিনি বিষন্ন গলায় বললেন‚ এখনো কানে ধরে আছিস কেন? হাত নামা| আমি হাত নামালাম| স্যার ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন‚ তোকে শাস্তি দেওয়াটা অন্যায় হয়েছে‚ খুবই অন্যায়| তোকে নদীর নাম বলতে বলেছি‚ তুই বলেছিস| আয় আরও কাছে আয়‚ তোকে আদর করে দেই|
স্যার এমন ভঙ্গিতে মাথায় এবং পিঠে হাত বুলাতে লাগলেন যে আমার চোখে পানি এসে গেল| স্যার বিব্রত গলায় বললেন‚ আমি তোর কাছ থেকে সুন্দর একটা নদীর নাম শুনতে চেয়েছিলাম‚ আর তুই বললি আড়িয়াল খাঁ| আমার মেজাজটা গেল খারাপ হয়ে| আচ্ছা এখন সুন্দর একটা নদীর নাম বল| আমি শার্টের হাতায় চোখ মুছতে মুছতে বললাম ময়ূরাক্ষী|
ময়ূরাক্ষী? এই নাম তো শুনিনি| কোথাকার নদী? জানি না স্যার| এই নামে আসলেই কি কোনো নদী আছে? জানি না স্যার| স্যাল হালকা গলায় বললেন‚ ‘আচ্ছা থাক| না থাকলে নেই| এটা হচ্ছে তোর নদী| যা জায়গায় গিয়ে বস| এমনিতেই তোকে শাস্তি দিয়ে আমার মনটা খারাপ হয়েছে| তুই তো দেখি কেঁদে কেঁদে আমার মন খারাপটা বাড়াচ্ছিস| আর কাঁদিস না|
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৪:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



