গল্প - ইফতার - প্রণব ভট্ট - দ্বিতীয় পর্ব
পূর্ববর্তী পর্ব থেকে চলমান ...
দয়াময়ীদের স্কুলের নাম ছিল শিমুলতলী মডার্ন হাইস্কুল। সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি শহরে মেয়েদের জন্য দূরে থাক, ছেলেদের জন্যই সাধারণত এ রকম হাইস্কুল থাকে না! শিমুলতলীতে সেটা সম্ভব হয়েছিল এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির কারণে। তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে, নিজেরা পয়সা খরচ করে স্কুলটা করেছিলেন। শিক্ষক জোগাড় করার দায়িত্বও তারাই পালন করেছিলেন। তার পরের পর্ব ছিল স্কুলের জন্য সরকারি স্বীকৃতি আদায়। এর জন্যও অবশ্য কাঠখড় কম পোড়াতে হয়নি। তাও সম্ভব হয়েছিল। এর পেছনে একটা বড় কারণ ছিল, পরপর কয়েক বছর ধরে শিমুলতলী মডার্ন হাইস্কুলের ভালো রেজাল্ট।
দয়াময়ী ক্লাস ওয়ান থেকে ওই স্কুলের ছাত্রী। সে যখন ক্লাস সেভেনে, তখনই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস হয়ে আসেন জাহানারা বেগম। পুরনো হেডমাস্টার চলে গেলে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি দেখেশুনে তাকে নিয়োগ দেন। এই হেডমিস্ট্রেস ছিলেন কড়াপ্রকৃতির মানুষ। বড় কড়াপ্রকৃতির। আগের প্রধান শিক্ষক রাজীব হোসেনের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই চলে না। প্রথম দিনই অ্যাসেম্বলির সময় ছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘মেয়েরা শোনো, তোমাদের প্রথমেই একটা কথা জেনে রাখা দরকার। আমি নিয়মকানুনের সামান্য অবনতিও বরদাশত করব না। পান থেকে চুন খসে পড়ুক, এটা আমি পছন্দ করি না, বুঝতে পারছ?’
বুঝতে সময় লাগেনি দয়াময়ীদের। হেডমিস্ট্রেস নিজে ক্লাস নিতেন খুব কমই। দু-একটা যা নিতেন তাও ক্লাস নাইনের। তবু পুরো স্কুলে তার উপস্থিতি সব সময় টের পাওয়া যেত। তিনি আপাদমস্তক কালো বোরকা পরতেন। শুধু ক্লাসে এসেই বোরকা খুলতেন। বোরকা ছাড়া তাকে ক্লাসের বাইরে কেউ কখনো দেখেছে বলতে পারবে না, স্কুলের বাইরে দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। যদি এমন হতো, তিনি ক্লাস নেওয়ার সময়ও বোরকা পরে থাকতেন, তবে তার চেহারাটা কেমন, সেটা স্কুলের কারোরই জানা হতো না।
চেহারাটা ছিল অত্যন্ত গম্ভীর। তাকে কেউ কখনো হাসতে দেখেছে, এমন দাবি করতে পারবে না। স্কুল-বিল্ডিংয়ের এমাথা-ওমাথা ঘুরতেন তিনি। কড়া নজর রাখতেন চারদিকে। দেখতেন সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলছে কি না, হচ্ছে কি না। একবার হেদায়েত স্যার ক্লাস এইটে ভাব-সম্প্রসারণ করতে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে প্রচণ্ড নাকাল হতে হয়েছিল হেডমিস্ট্রেসের হাতে, ‘আপনি কি বাসায় ঘুমানোর সময় পান না?’
হেদায়েত স্যারের তখন তোতলামি আরম্ভ হয়ে গেছে, ‘জি ম্যাডাম, জি ...’
‘তাও ভালো যে বাড়ি থেকে বালিশ নিয়ে আসেননি!’
হেদায়েত স্যার যেন পাথর হয়ে যান।
‘আপনার লজ্জা হওয়া উচিত, আপনার ছাত্রীরা লেখাপড়া করছে আর আপনি ঘুমাচ্ছেন।’
আরেকবার ক্লাস টেনের এক মেয়ে ক্লাসে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ছিল। জানালা দিয়ে সেটা লক্ষ করে ভেতরে এসে মেয়েটাকে হাতেনাতে ধরে ফেললেন জাহানারা বেগম।
‘এটা দেখছি প্রেমের উপন্যাস! তোমাদের কি এখন প্রেমের উপন্যাসের ক্লাস চলছে?’
কেউ কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি ভেউ ভেউ করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে।
‘না, কাঁদলে চলবে না। আমাকে তোমার বোঝাতে হবে, তুমি ক্লাসে বসে এই বই কেন পড়ছিলে!’
মেয়েটার কান্না থামে না। পরের সিদ্ধান্ত ছিল আরো কঠিন। গার্জিয়ানকে ডেকে পাঠিয়ে মেয়েটাকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বহিষ্কার করেন তিনি।
বিয়ের পর দয়াময়ী এসব গল্প করেছিল হেমন্তর কাছে। ছোটবেলার গল্প করতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই ভালোবাসে। হেমন্ত যদিও তেমন কিছু বলত না, সে বলত, ‘আমার কোনো ছোটবেলা নেই, আমার কোনো গল্পও নেই। আমি প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি।’
দয়াময়ী তার ছোটবেলার গল্প করত। তার বড়দা আর দু দিদির কথা, তার এলাকা আর স্কুলের বান্ধবীদের কথা, তার স্কুল আর স্কুলের শিক্ষকদের কথা। আরো নানা গল্প। জাহানারা বেগমের গল্প হেমন্তকে বিশেষভাবে শোনায় দয়াময়ী, ‘বুঝেছ, ওই মহিলাকে দেখলে আমাদের সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেত!’
‘এটা তো ভালো, খুব ভালো। শিক্ষকদের ভয় করবে না ছাত্রছাত্রীরা?’
‘ভয় না শ্রদ্ধা, কোনটা করবে?’
‘দুটোই।’
‘কেউ শ্রদ্ধা করত না, বুঝেছ? কেউ তাকে শ্রদ্ধা করত না। সবাই ভয় পেত।’
‘একটু বোধহয় মেজাজি ছিলেন, না?’
‘একটু মানে! তিনি ছিলেন চলমান বিভীষিকা। ছাত্রছাত্রীরা এক-আধটু দুষ্টুমি করবে না, অল্প-স্বল্প ফাঁকি দেবে না, বলো?’
‘আচ্ছা, একটু নাহয় বেশিই মেজাজি ছিলেন তিনি। কিন্তু তাই বলে স্যার ক্লাসে এসে ঘুমাবেন, ক্লাস টেনের ছাত্রী ক্লাসে বসে উপন্যাস পড়বে, এসব তাকে কেন মেনে নিতে হবে? বিশেষ করে তুমিই যখন বলছ মেজাজি ছিলেন তিনি! যদিও এসব সব স্কুলে সব সময়ই হয়।’
‘শুধু এটুকু! তোমাকে তো তার আসল কথা বলাই হয়নি!’
দয়াময়ীর আজও মনে আছে সব। কিছুই ভোলেনি। সে যখন ক্লাস সেভেনের শেষ দিকে, জাহানারা বেগম হঠাত্ একদিন তাদের ক্লাস নিতে এলেন। সেটা ছিল ইসিএ বা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ ক্লাস। ওই ক্লাসে তারা গান গাইত, আবৃত্তি করত, নাটক করত, আরো কত মজা করত! জাহানারা বেগম ওসবের ধার দিয়েও গেলেন না, এক-এক করে সবার নাম জিজ্ঞেস করলেন, কার রোল নম্বর কত, সেটাও জেনে নিলেন। তারপর দয়াময়ীকে বললেন, ‘এই স্কুলে আরো অনেক হিন্দুধর্মের মেয়ে পড়ে, তুমি জানো?’
‘জি ম্যাডাম।’ দয়াময়ী ভয়ে ভয়ে বলে।
‘কিন্তু আর কোনো ক্লাসে কোনো হিন্দু মেয়ে ফার্স্ট গার্ল না, একমাত্র তুমিই ফার্স্ট গার্ল, এটা জানো?’
এটা জানা ছিল না দয়াময়ীর, সে তাই না-সূচক মাথা নাড়ে।
‘এটা মনে রেখো।’ হেডমিস্ট্রেস বলেন, বলে দয়াময়ীর দিকে তাকিয়ে হাসেন। তারপর ক্লাসের অন্য ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমরাও মনে রেখো।’
দয়াময়ীর বক্তব্য, তার প্রতি হেডমিস্ট্রেসের হাসিটা ছিল তাচ্ছিল্যের।
‘তাচ্ছিল্যের কেন হবে?’ হেমন্ত এটা অনেকবার জানতে চেয়েছে। দয়াময়ী বলেছে, ‘হাসিটা তো তুমি দেখনি, আমিই দেখেছি, আমিই জানি।’
‘আর তোমাকে যে বললেন, তুমিই একমাত্র ফার্স্ট গার্ল, হিন্দু মেয়ে হিসেবে এটা যে তোমাকে মনে রাখতে বললেন, এটাকে তুমি কী বলবে?’
‘এটাকে কি উত্সাহ দেওয়া বলতে চাও? আমার কাছে ওটাও তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষের।’
‘কেন? আমার তো মনে হয় উনি তোমাকে তোমার পজিশন ধরে রাখার ব্যাপারে উত্সাহী করতে চেয়েছেন।’
‘আরে না, ওনার ভঙ্গিতেই তাচ্ছিল্য ছিল। তা ছাড়া ক্লাসের অন্য মেয়েদেরও বললেন আমার ব্যাপারটা মনে রাখতে। এর মানে কী? এটা কি আমার বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা না?’
‘উসকে যদি তিনি দিতে চান, দিতে পারেনই। তা হলেই তো তোমাদের মধ্যে লেখাপড়ার লড়াইটা জমবে। আর একজন শিক্ষকের সেটাই তো কাজ। সবাইকে সবার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া, যেন তাদের ভেতর একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাটা শুরু হয়।’
দয়াময়ী হাসে।
‘হাসছ কেন?’
‘তুমি যা বলছ তার সবই ঠিক আছে। আমি মেনেও নিচ্ছ। কিন্তু আমার একটা কথা তোমাকে শুনতে হবে। একজন শিক্ষক পড়াশোনায় ভালো করার জন্য একজন ছাত্রীকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উসকে দিতে পারেন। কিন্তু সেই উসকানিটা তিনি কি ধর্মীয় আইডেনটিটির নামে দেবেন?’
হেমন্ত চুপ হয়ে যায়।
‘উনি তো আরো নানাভাবে বলতে পারতেন। ওদের বলতে পারতেন-তোমাদের কি বুদ্ধি নেই, তোমাদের কি ভালো রেজাল্ট করার ক্ষমতা নেই, তোমরা কি দয়াময়ীকে ছাড়িয়ে যেতে পার না? কিন্তু তা তিনি করলেন না। এটা কি একজন শিক্ষকের কাজ?’
হেমন্ত মৃদু গলায় বলে, ‘আসলে একেক জনের ভঙ্গি একেক রকম ...’
‘তার ভঙ্গিটা সাম্প্রদায়িক।’ দয়াময়ী জোর গলায় বলে, ‘তিনি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা স্পষ্ট বিভাজন করতে চাইতেন। তুমি এটা বুঝতে পারছ না!’
চলবে ...
একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?
হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন
আসলে কেউ ফেরে না।
মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর
যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্য ড্রাগ কিং

সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।
খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন
সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে
আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।