somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ২

২৬ শে নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্ব এখানে - লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ১

১৬ই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। আগের দিন রাতের বেলা ছাড়াছাড়া ভাবে ঘুম হয়েছিল, তবুও খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। নাস্তা করে এলাকাটা দেখতে বের হয়ে আবিষ্কার করলাম পুরো এলাকা ফাঁকা। রাতে রাতেই বেশির ভাগ মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। মেইন রোডে গিয়ে দেখি রাস্তার দুপাশের গাছগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে উপড়ে পড়ে আছে। দুপাশের দোকানগুলোর দরজা, দেয়াল ভেঙ্গে রাস্তায় পড়ে আছে। কাঁচের টুকরার জন্য রাস্তায় হাঁটা যাচ্ছে না। এলাকার প্রায় প্রতিটা দোতলা-তিনতলার বাড়ির দেয়ালে কয়েকটা করে গুলির ছিদ্র। আশেপাশের বাঙ্গালিদের বাসায় গিয়েও একটু খোঁজ-খবর নিলাম। সৌরভরা, মুক্তারা, হীরণ ভাইরা - সবাই-ই ভালো আছে।

ঘরে ফিরে এসে গোসল টোসল সেরে যখন মাত্র ভাবছি আজ জুমার নামাজ পড়তে যাওয়া উচিত হবে কি না, তখনই আবার ধুপ-ধাপ শব্দ শুরু হয়ে গেল। বাড়িওয়ালার বোন উ'লা জানালা দিয়ে চিতকার করে বলল, বিদ্রোহীরা ১৭ কি.মি. পর্যন্ত এসে গেছে। আম্মু তাড়াতাড়ি মাটির চুলায় রান্না চাপিয়ে দিল, যেন গোলাগুলি শুরু হলে ঘরের বাইরে থাকা না লাগে। আধঘন্টা না পেরোতেই শব্দ আরো জোরালো হয়ে উঠল। বাড়িওয়ালার ভাই আ'তেফ এসে বলল তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হতে। এলাকায় কোন লিবিয়ান নেই। বিদ্রোহীরা যদি এলাকায় ঢুকে পড়ে তাহলে সর্বনাশ। পুরুষদেরকে ধরে ধরে জবাই করবে আর মহিলাদেরকে ধরে নিয়ে যাবে। কাজেই এলাকায় থাকা যাবে না, অন্য কোথাও যেতে হবে। আব্বু জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবে, উত্তরে আ'তেফ বলল সে জানে না। আগে গাড়িতে উঠা যাক এরপর দেখা যাবে। কিন্তু ঘরে থাকা যাবে না।

লিবিয়ান প্রচার মাধ্যম যুদ্ধের প্রথম থেকেই প্রচার করে আসছে, বিদ্রোহীরা মানুষ জবাই করে, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, নারী নির্যাতন করে। এমনকি মার্চ-এপ্রিলের দিকে মোবাইল ফোনে করা কয়েকটা ভিডিওতে একজনকে জবাই করে পুরো গলা আলাদা করে ফেলছে এবং অপর একজনের কলিজা বের করে ফেলছে - এরকম দৃশ্য দেখাও গেছে। কিন্তু সব বিদ্রোহীই অমানুষ - এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করিনি। একেবারে প্রথম দিকে যখন বিদ্রোহ শুরু হয় তখন স্বভাবতই গুন্ডা-বদমাশরাও তাতে যোগ দিয়েছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা না থাকার সুযোগে তারা কিছু অঘটন ঘটিয়েছেও। কিন্তু গত ছয়-সাত মাসে বিদ্রোহীরা এনটিসির অধীনে কিছুটা হলেও সংগঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রথম যখন নির্যাতনগুলো ঘটে তখনও সেটা শুধুই বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু এখন পুরোমাত্রায় যুদ্ধ। কাজেই বিদ্রোহীরা এসে শহর দখল না করে লুটপাট, খুন-খারাপি আর নারী-নির্যাতন করবে - এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু নিজেদের জীবন নিয়ে কথা। তাই আ'তেফের সাথে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। আব্বুর ঘর ছাড়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমি শুধুমাত্র আম্মু এবং তিথির কথা চিন্তা করেই জোর করে রাজি করালাম। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে গতকাল ঠিক আমাদের বাসার সামনে থেকে যেভাবে আরপিজি মেরেছে, আজও যদি সেভাবে মারে, তাহলে বিরোধীরা শিওর আমাদের বাসা লক্ষ করে মিসাইল মারবে। আর ভাগ্য যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে ন্যাটোও মেরে বসতে পারে।

আ'তেফের চেঁচামেঁচি আর তাড়াহুড়ায় আমরা দুপুরের খাবার না খেয়েই, কোন রকম জামাকাপড় না নিয়ে শুধুমাত্র পাসপোর্ট, কাগজপত্র এবং কিছু টাকাপয়সা ও স্বর্ণগয়না যে ব্যাগে ভরা ছিল, সেই ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দুটো গাড়ি তৈরি হল। একটা আ'তেফের ভলভো - সেটাতে আ'তেফ, উলা আর আ'তেফের স্ত্রী মবরুকা। অন্যটা টয়োটা পিকআপ। চালাবে মোত্তালেব, পাশের সীটে আব্বু, পেছনের সীটে আম্মু, তিথি আর মোত্তালেব-আ'তেফের মা হালিমা বুড়ী। পিছনের খোলা জায়গায় মালপত্র, খাবার-দাবার, তার সাথে উঠলাম আমি, তালহা, খালাতো ভাই শাওন, একটা মিসরী বুড়া এবং একজন মৌরতানী নিগ্রো। কালাশনিকভ রাইফেল নেওয়া হল চারটা, গুলি নেওয়া হল এক বালতি। রাইফেল একটা আ'তেফের গাড়িতে, একটা মোত্তালেবের সাথে, একটা আম্মুদের সীটের নিচে আর একটা নিল মৌরতানী ব্যাটা। সে বলল তার নাকি সামরিক ট্রেনিং আছে, প্রয়োজনে সে চালাতে পারবে।

আমার প্রথম থেকেই ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছিল না। কারণ লিবিয়ার যুদ্ধে গাদ্দাফী প্রথম থেকেই তার পক্ষে আফ্রিকান নিগ্রো মার্সেনারীদের ব্যবহার করে আসছিল। কারণ খুবই সহজ - লিবিয়ান সৈন্যদেরকে বিদ্রোহীদের দমন করতে পাঠালে তারা যদি গিয়ে দেখে বিদ্রোহীরা হচ্ছে তাদেরই ক্বাবিলার (গোত্রের) লোক, তাহলে তারা সাইড চেঞ্জ করে ফেলতে পারে। কিন্তু মার্সেনারীদের ক্ষেত্রে সেরকম কিছু ঘটবে না। আর তাই বিদ্রোহীরা এই মার্সেনারীদের উপরেই সবচেয়ে বেশি ক্ষ্যাপা। তাদেরকে পেলেই নির্বিচারে গুলি করে মারে। তবে বাস্তবে মার্সেনারীর সংখ্যা যতটা না বেশি, তার চেয়ে বেশি ছিল এ বিষয়ক প্রচারণা। শোনা যায় বিদ্রোহীরা কোন এলাকা দখলের পর সেখানে নিরীহ নিগ্রোদেরকে পেলেও তাদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে বলে, বল্ তোরা গাদ্দাফীর ভাড়াটে সৈন্য। এরপর সেই দৃশ্য ভিডিও করে মিডিয়াতে প্রচার করে।

যাই হোক, আমরা যাত্রা শুরু করার সময়ই দেখতে পেলাম আমাদের এলাকার ভেতরে জায়গায় জায়গায় পাঁচ-ছযজন করে যোদ্ধারা হেঁটে হেঁটে পজিশন নেওয়ার মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে। প্রায় সবার হাতেই কালাশনিকভ এবং পিঠে রকেট লঞ্চার। গলি থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি শহরের বাইরে পশ্চিম দিকে যেতে লাগল। ওদিক থেকেই বিদ্রোহীরা আক্রমণ করবে, কিন্তু ওদিক কিছু মাজরা (ফার্ম) আছে, সেখানে গিয়ে হয়তো আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। মেইন রোড দিয়ে এগুতো পারলাম না, সেখানে রোডব্লক। বিভিন্ন মানুষের মাজরার ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে ফিরে এগুতে লাগলাম। অবশেষে দূর থেকে একটা পাকা রাস্তা দেখা গেল (ম্যাপে ৬) যেটা পার হলেই আমরা কামালের শ্বশুরবাড়ির মাজরায় গিয়ে উঠতে পারব।



গুগল ম্যাপ থেকে নেওয়া ছবি



ছবির বর্ণনা:
(২) - আমাদের বাসা
নীল দাগ - যেদিক দিয়ে বিদ্রোহীরা প্রথমদিন বিকেলে ঢুকেছিল
(১) সমুদ্রের পাড়ের উঁচু রাস্তা দিয়ে যে পর্যন্ত এসে ফেরত গিয়েছিল
হলুদ দাগ (২ থেকে ১ পর্যন্ত) আমাদের বাসার সামনে থেকে বিদ্রোহীদের গাড়ি লক্ষ করে আরপিজি মারার পথ
(৫) কুশার সামনের গোলচত্বর, তালহা খুবজা কিনতে গিয়ে যেখানে গাদ্দাফী বাহিনীকে পজিশন নিতে দেখেছিল
(৪) এখান থেকে বিদ্রোহীরা দুই ভাগ হয়ে একগ্রুপ সমুদ্রের পাড়ের রাস্তা ধরে (১) এগিয়েছে, অন্যগ্রুপ সোজা এগিয়ে (৩) পর্যন্ত থেমে আক্রমণ করছিল
লাল দাগ - যে রাস্তা ধরে আমরা পালিয়েছি
(৬) যে জায়গায় আমরা বিদ্রোহীদের হাতে ধরা খেয়েছি



এতক্ষণ রাস্তায় একটা গাড়িও চোখে পড়েনি। কিন্তু এই প্রথম পাকা রাস্তাটার উপরে কয়েকটা যুদ্ধের গাড়ি (টয়োটা এবং মিতসুবিশী পিকআপ এবং আর্মি জীপ) চোখে পড়ল। মনে হল সেগুলো টহল দিচ্ছে। আমরা ধরেই নিলাম এগুলো গাদ্দাফীর সৈন্যদের গাড়ি। কারণ বিরোধীরা এই পর্যন্ত আসলে আর কিছু না হোক অন্তত কিছু গোলাগুলি তো হতো! তাছাড়া বিরোধীরা এতো ধীরে সুস্থে গাড়ি চালিয়ে টহল দেওয়ারও কথা না। মাজরা থেকে উঠে আমরা যেই মুহূর্তে রাস্তাটা অতিক্রম করে অন্যপাশের মাজরায় যাব, ঠিক তখনই হঠাত করে প্রচন্ড বেগে চারটা গাড়ি আমাদের পাশে চলে এল এবং আমাদেরকে লক্ষ করে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ওয়াজ্ঞেফ! ওয়াজ্ঞেফ! অর্থাত, থাম! থাম! গাড়িগুলোর দিকে তাকাতেই আমার কেমন যেন সন্দেহ হতে লাগল। কারণ একটা গাড়ির পেছনে যেভাবে হেভী মেশিনগান ফিট করা এবং তার সামনে যেরকম পুরু লোহার পাতের ঢাল দেওয়া, সেটা শুরু জাজিরাতে বিরোধীদের গাড়িতেই দেখেছি। গাদ্দাফী বাহিনীর কাছে কখনও দেখিনি।

মোত্তালেব গাড়ি থামাতে না থামাতেই গাড়ি চারটাও থেমে গেল এবং সেগুলো থেকে যোদ্ধারা নেমে দৌড়ে আমাদের দিকে আসতে লাগল আর চিতকার করে বলতে লাগল, ইনজিল! হাইয়া, ইনজিল! খাল্লি শুফ ইয়াদাইকুম! অর্থাত, নাম! তাড়াতাড়ি নাম! হাতগুলো দেখতে দাও! প্রত্যেকের হাতে রাইফেল, কয়েকজন সেগুলো লোড করে নিল। ইয়ংবয়সী ফর্সা একটা ছেলে, যে দলটার নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সে পকেট থেকে ৯.৫ মি.মি. পিস্তল বের করে সেটাও লোড করে নিল। ততক্ষণে আমার চোখে পড়ে গেছে ফর্সা ছেলেটার মাথায় বিরোধীদের পতাকার রংয়ের ক্যাপ। আমার মনে হতে লাগল এই বুঝি আমাদের জীবনের শেষ দিন। কারণ তখনও আমাদের পাশে সেই মৌরতানী নিগ্রোটা রাইফেলটা হাতে ধরেই বসে আছে। সামান্য একটু ভুল বুঝাবুঝির কারণে এখন গোলাগুলি শুরু হয়ে যেতে পারে। আর এতো কাছ থেকেগুলি মিস হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নেই। আমি তাড়াতাড়ি নেমে তালহা আর শাওনভাইয়াকেও নামতে বললাম। ততক্ষণে বিদ্রোহীরা এসে মৌরতানী লোকটার কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গেছে এবং মোত্তালেবের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আমি তালহা, আব্বু আর শাওনভাইয়াকে আস্তে আস্তে বললাম, আমরা একটু দুই হাত দূরে থাকি যেন ওরা বুঝতে পারে আমরা একটা ফ্যামিলি এবং আমরা অস্ত্রশস্ত্রের সাথে জড়িত না। কিন্তু আমার নিষেধ সত্ত্বেও তালহা গাধাটা বারবার সামনে গিয়ে বিরোধীদের সাথে মোত্তালেবের তর্কাতর্কি শোনার চেষ্টা করছিল।

বিদ্রোহীরা মোত্তালেবের হাতের রাইফেলটা নিতে চাইল, কিন্তু মোত্তালেব সেটা দিতে রাজি হল না। মোত্তালেব এমনিতে প্রথম থেকেই বিদ্রোহীদের সাপোর্টার, কিন্তু অস্ত্র কে হাতছাড়া করতে চায়? একজন মোত্তালেবকে জিজ্ঞেস করল, অস্ত্রের কার্ড আছে? কোথা থেকে অস্ত্র পেয়েছ? মোত্তালেব চালাকি করে উত্তর দিল, দেশের অস্ত্র। দেশ দিয়েছে। লোকটা তখন বলল, দেশ মানে কি? মোয়াম্মারের অস্ত্র? মোত্তালেব মাথা নাড়িয়ে বলল, হ্যাঁ।
লোকটা তখন বলল, মোয়াম্মার? ওয়েন মোয়াম্মার? মোয়াম্মার হ্যাদা গেদিম, খালাস! তাউয়া মাজলেজ। মাজলেস গাল এসলাহ মামনুয়া। খালাস, আতিনী এসলাহ।
অর্থাত, মোয়াম্মার? কোথায় মোয়াম্মার? সে তো পুরানো কাহিনী, শেষ! এখন কাউন্সিল ক্ষমতায়। কাউন্সিল বলেছে সাধারণ মানুষের কাছে অস্ত্র নিষিদ্ধ। ব্যাস, অস্ত্র দিয়ে দাও।
মোত্তালেব তারপরেও বাড়াবাড়ি করতে লাগল। তখন একজন যোদ্ধা তার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ইয়া খুইয়া, আতিনী এসলাহ, ওয়া ওয়েন তিব্বী, এমশি। মা'ক আ'ইলা, মানিশ কাল্লেম হাজা। অর্থাত, ভাই, অস্ত্র দিয়ে দাও, এরপর কোথায় যেতে যাও, যাও। তোমাদের সাথে ফ্যামিলি আছে, আমরা কিছু বলব না। একজন যোদ্ধা আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথাকার? বললাম, বাংলাদেশী। হাতে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল, ভালো। আরেকজন পিকআপের পেছনে মালপত্রের মধ্যে একনজর তাকিয়েই একটা বালতি তুলে নিল। সেই বালতিতেই গুলি ভরা ছিল। গাড়ির ভেতরেও হয়তো তার চেক করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু উঁকি দিয়ে যখন দেখল ভেতরে মহিলা, তখন আর চেক করল না। শুধু হাত উঁচু করে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, মাতখাফ্‌শ, মাতখাফ্‌শ। অর্থাত, ভয় পেওনা, ভয় পেওনা।

এই চরম পরিস্থিতির মধ্যেও তালহা কয়েকবার আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ফেলল, বিদ্রোহীরা কী ভালো, না? আসলেই! আমিও বিদ্রোহীদের ব্যবহারে অবাক না হয়ে পারলাম না। গত ছয় সাত মাস ধরে লিবিয়ান টিভিতে আর সিরতের লিবিয়ানদের মুখে বিরোধীদের সম্পর্কে যেসব ভয়ংকর কাহিনী শুনেছি, তার সাথে কোন মিলই নেই। কাঁধের উপর হাত দিয়ে, ভাই সম্বোধন করে, এতো ভদ্রভাবে কথা বলা, কোন বিদ্রোহী গ্রুপের কাছ থেকে আশা করা যায় - এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। মোত্তালেবের সাথে তর্কাতর্কি হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু এমন সময় হঠাত আশেপাশে কোথাও একটা শেল এসে পড়ল। তার প্রায় সাথে সাথেই একের পর এক গুলি এসে আশেপাশের গাছে এবং ল্যাম্প পোস্টের উপরের দিকে বাড়ি খেতে লাগল। দুইজন বিদ্রোহী যোদ্ধা একটা গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে কান ফাটানো শব্দে ফায়ার করতে শুরু করল। আর আমাদেরকে ঘিরে থাকা যোদ্ধারা বলতে লাগল, যাও ভাগো। তাড়াতাড়ি পালাও, সাবধানে যেও। মিসাইল এসে পড়তে পারে। মোত্তালেবও এবার রাইফেলটা ছেড়ে দিল। গাড়িতে উঠে বসে স্টার্ট দিয়ে সে গাড়িটা ছেড়ে দিল, পিছনে কে উঠতে পেরেছে সেটা না দেখেই। সবাই অবশ্য উঠে পড়েছে, আমি শুধু তালহাকে উঠিয়ে দিতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম। গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। আমি সকল নিয়ম-নীতি ভংগ করে দৌড়ে এসে একটা লাফ দিয়ে পুরো শরীর নিয়ে একসাথে পিকআপটার পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

পা'টা পড়ল একেবারে বেকায়দা ভাবে। হয়তো মচকে গেছে, কিন্তু সেদিকে লক্ষ করার মতো অবস্থা তখন নেই। এবড়ো-থেবড়ো কাঁচা রাস্তা দিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চলছে, আর আমরা পিকআপের পেছনে সবাই মাথা নিচু করে শক্ত করে একজন আরেকজনকে ধরে বসে আছি। মাথার উপর দিয়ে, কানের পাশ দিয়ে শাঁই শাঁই করে শিস কাটার মতো শব্দ করে বুলেট উড়ে যাচ্ছে। এর আগে শুধু মাসুদ রানাতেই এরকম বর্ণনা পড়েছিলাম, নিজের জীবনে কখনো ঘটবে, সেটা কল্পনাও করিনি।

গাড়ি এসে থামল কামালের শ্বশুরবাড়ির মাজরায়। নেমে দেখি আম্মু, তিথি, উলা, মবরুকা, বুড়ি সবার মুখ ফ্যাকাশে, চোখেমুখে কান্নাকান্না ভাব। যে বিরোধীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এতো আয়োজন, ঘর থেকে বেরোতে না বেরোতেই সেই বিরোধীদের হাতে পড়লে অবশ্য এরকমই হওয়ার কথা। একমাত্র মোত্তালেবের উল্লাস দেখার মতো। সে খুশি যে, বিরোধীরা শহরে ঢুকে পড়েছে। আ'তেফের চেহারার দিকে অবশ্য একেবারেই তাকানো যাচ্ছিলনা। সে মাথায় হাত দিয়ে এক কোনায় বসে রইল। আ'তেফ ছিল একেবারে খাঁটি গাদ্দাফীর পক্ষে। বিরোধীদের হাতে এভাবে ধরা খেয়ে সবগুলো অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে, এটা সে কল্পনাও করে নি। অবশ্য স্বান্তনার কথা একটাই, আম্মুদের সীটের নিচে যে রাইফেলটা ছিল, সেটা বেঁচে গেছে। বিরোধীরা গাড়ির ভেতরে চেক করেনি, তাই এটা দেখতেও পায় নি।

বিদ্রোহীরা আসলে কেমন হয়, সেটা দেখার শখ অনেক দিন ধরেই ছিল। আজ সেটা পূরণ হল, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যে এমন ভয়াবহ হবে, সেটা কে জানত? আমাদের ধারণা হল, আমরা নিরাপদ স্থানে এসেছি, কিন্তু কামালের স্ত্রী মাস্তুরার ভাই ওমর আর মোস্তফা জানাল, বিদ্রোহীরা নাকি এখান থেকে মাত্র এক কিমি দূরে একটা মাজরায় ঘাঁটি তৈরি করেছে। কাজেই এই জায়গাও নিরাপদ না। বিরোধীরাও যেকোন সময় তল্লাশী করতে আসতে পারে, অথবা গাদ্দাফী বাহিনীও মিসাইল মারতে পারে। আমরা এক নতুন অপরিচিত জায়গায় বসে বসে আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।


... চলবে ...




সিরত যুদ্ধের আরও কিছু কিছু ছবি -

এই রাস্তাতেই আমরা বিদ্রোহীদের হাতে ধরা খাই



যুদ্ধ চলছে



যুদ্ধ চলছে



বিদ্রোহীরা পজিশন নিয়ে আছে



আরপিজি মেরে ফেরত আসছে



হাইডলার রোডে যুদ্ধ চলছে



বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফীর এক সৈন্য



হাইডলার রোড - গাড়ির উপরে ক্রস চিহ্ন যেন ন্যাটো বোমা না মারে



শহরের রাস্তায় মিসাইলের খোসা পড়ে আছে

৯টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×