উদ্ধার হওয়ার পর আমাদেরকে বেশিক্ষণ রাস্তায় অপেক্ষা করতে হল না। সেই দাড়ি-টুপি এবং চশমা ওয়ালা বৃদ্ধ আমাদেরকে এক যোদ্ধার গাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে পেছন পেছন আসতে লাগল। সেই যোদ্ধা গাড়িতে উঠেই প্রথমে আমাদেরকে বলল, গুল গাদ্দাফী ক্যাল্ব। অর্থাত, বল গাদ্দাফী কুত্তা। আমরা সবাই-ই সম্মতিসূচক একটা হাসি দিলাম, কিন্তু প্রথমে কেউই উচ্চারণ করলাম না। গাদ্দাফীঢর এই মুহূর্তের নীতি খারাপ, কিন্তু জন্মের পর থেকে তো তার দেশেই খেয়ে পরে বড় হচ্ছি, এতো সহজে তাকে এভাবে গালি দেই কিভাবে? যোদ্ধাটা বলল, ও তার মানে তোমরা গাদ্দাফীর সৈন্য? দিলাম কিন্তু না নামিয়ে। অগত্যা আমরা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে স্বীকার করলাম, সাহ্, গাদ্দাফী মোশ কইয়েস। কাতির ন্যাস ম্যাত। হারাম হ্যাদা! অর্থাত, ঠিক, গাদ্দাফী ভালো না। প্রচুর মানুষ মরেছে। এটা হারাম! গাড়িতে উঠেই আব্বু নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়েছিল। এবার আমাকে বলল, চেক এবং ব্যাংকের কাগজপত্রগুলো কোথায়? আমার মনে পড়ল সেগুলো তো খাটের উপরেই রয়ে গেছে, আনা হয় নি। আব্বুর মন আবার খারাপ হয়ে গেল, কিন্তু এখন আর কিছুই করার নেই।
মিনিট বিশেক চলার পরে জীপটা সাবা'তাশের অস্থায়ী হসপিটালে (সিরতের সতেরো কিমি পশ্চিমে) এসে পৌঁছল। দেখলাম সেখানে মুক্তারা এবং হিরণ ভাইরাও আছে। আমাদের গাড়ি থামার সাথে সাথেই দুইজন সাংবাদিক এসে আমাদের ঘিরে ধরল। একজন এএফপির, অন্যজন জার্মান একটা ডকুমেন্টারী মেকার, সে ভিডিও করছে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগল, আর আমিও যতদূর সম্ভব উত্তর দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই মুক্তারা এবং হিরণভাইরা সহ আমাদের সবাইকে আবার গাড়িতে তোলা হল। এবার নাকি আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে বাওয়াবাত খামসিনে (গেট অফ ফিফটি, সিরত থেকে পঞ্চাশ কিমি পশ্চিমে) অবস্থিত আরেকটি অস্থায়ী হাসপাতালে। যেতে শুনলাম কিভাবে মুক্তাদের এবং হিরণভাইদের উদ্ধার করা হয়েছে। বিদ্রোহীরা তাদের লোহার দরজার সামনে এসে গুলি করা শুরু করতেই খান আল্লাহু আকবার বলে চিতকার শুরু করে। খানের আল্লাহু আকবার শুনেই হোক আর ভেতরে নারী-শিশুদের চেঁচামেচিতেই হোক, বিদ্রোহীরা সাথে সাথে থেমে যায় এবং ভদ্রভাবে দরজা খুলতে বলে। হিরণ ভাই আর ভাবী আগেই ভয়ে আধামরা হয়েছিল, দরজা খোলার সাথে সাথেই সে দৌড়ে গিয়ে এক যোদ্ধার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়। যোদ্ধাটা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ফ্যামিলি বলেই বোধহয় আমাদের চেয়ে হিরণ ভাইরা এবং মুক্তাদেরকে বিদ্রোহীরা আরো বেশি সময় দিয়েছে জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য। কিন্তু লাভ কিছুই হয় নি, মুক্তারা তেমন কিছুই নিতে পারে নি। শাহীন তো মোটে লুঙ্গি পরেই চলে এসেছে। যা কিছু নেওয়ার কান্নাকাটির মধ্যে দিয়েও হিরণ ভাই-ই নিয়েছে।
আমাদের মতোই তাদেরকেও বিদ্রোহীরা একই ভাবে কভারিং ফায়ার দিয়ে রাস্তা পার করিয়েছে। ঘর থেকে বেরোনোর সময়ই দুইজন যোদ্ধা মুক্তা এবং হিরণের মেয়েকে কোলে নিয়ে নেয়। তাদের বাবা-মায়েরা অবশ্য বাচ্চাগুলোকে হাতছাড়া করতে চাইছিল না, গাদ্দাফী বাহিনীর প্রচার করা বিদ্রোহীদের অমানবিকতার কাহিনী, মানুষকে ধরে ধরে জবাই করার কাহিনী কেউই ভুলে নি। তবে বিদ্রোহীরা অনেকটা জোর করেই বাচ্চাগুলোকে কোলে নিয়ে দৌড়ানো শুরু করে। আমিনুর আংকেলরা নিজেরাই দৌড়াতে পারছিল কিন্তু হিরণ ভাই এবং ভাবী দুজনেই কান্নাকাটির জন্য দৌড়াতে পারছিল না। তাদেরকে দুজন করে যোদ্ধা দুপাশ থেকে ধরে ধরে রাস্তা পার করে নিয়ে গেছে। বিদ্রোহী যোদ্ধাদের প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্য দিয়ে বাচ্চাদুটোকে রাস্তা পার করার যে বর্ণনা খান দিল, সেটা যেকোন ঐতিহাসিক বীরত্বের কাহিনীকে হার মানায়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এএফপির সাংবাদিকটার তোলা যে ছবিটি পাওয়া গেছে, সেটাও যেকোন যুদ্ধের ফিল্মের ম্যাগনেট অংশকে হার মানায়। হিরণের মেয়েকে নিয়ে দৌড়ানো যোদ্ধাটি এক পর্যায়ে বুলেটের খোসায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তখনও সে বাচ্চাটিকে কোল থেকে ছাড়ে নি।
রাস্তার ওপারে যাওয়ার পর হিরণ ভাই আর ভাবী পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। বিদ্রোহীরা তাদের মাথা ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুইয়ে দেয়। ভেজা জামা-কাপড়ে তারা দুজন কাঁদছে আর সেই টুপি-দাড়ি এবং চশমাওয়ালা বৃদ্ধ তাদেরকে সান্তনা দিচ্ছে - এএফপির বরাত দিয়ে এই ছবি এবং সংক্ষিপ্ত ফুটনোট পরদিন ১৮ ই অক্টোবর, ২০১১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো এবং দৈনিক যুগান্তরে ছাপা হয়। ফেইসবুকের কল্যাণে এই ছবি সারা দুনিয়া ছড়িয়ে পড়লে হিরণভাইদের দেশের বাড়িতে চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে এসব কিছুই আমরা জানতে পেরেছি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আরও অনেক পরে।
আরো আধ ঘন্টা চলার পর আমরা খামসিনে এসে পৌঁছলাম। পুরো রাস্তাজুড়ে সাধারণ গাড়ি একটাও চোখে পড়েনি, চোখে পড়েছে শুধু যুদ্ধের গাড়ি, বিদ্রোহীদের পতাকাবাহী, এন্টি এয়ারক্রাফট, মেশিনগান ফিট করা হাজার হাজার গাড়ি, মেইন রোড ধরে শুধু তাদের মিছিল আসছে আর যাচ্ছে। যেই পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র বিদ্রোহীদের কাছে, তারা তো শুধু দেশের ভেতরে না, বাইরের শক্তির সাথেও যুদ্ধ করার সামর্থ থাকার কথা! অথচ তারা কি না সিরতের মতো ছোট একটা শহরই দখল করতে পারছে না। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য লাগল পুরো পঞ্চাশ কিমি রাস্তায় কিছুদূর পরপর শুধু তিন রং-এর চাঁদ-তারা খচিত পতাকা, গাদ্দাফীর সবুজ পতাকার কোন চিহ্নও নেই! বিদ্রোহীরা মাত্র কয়েকশত, সব এলাকা গাদ্দাফীর দখলে, বিরোধীরা শুধু সাহারা দিয়ে বাইপাস করে একেকটা এলাকায় অল্প কিছুক্ষণের জন্য ঢুক ভিডিও করে নিয়ে জাজিরাতে প্রচার করে - গাদ্দাফী মিডিয়ার এইসব অপপ্রচারের সারশূণ্যতা আজ নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করলাম।
চশমাওয়ালা সেই বৃদ্ধ আমাদেরকে বলে গেল, ঐ যে ওখানে হেলিকপ্টার আছে, তোমরা যদি চাও হেলিকপ্টারে করে তোমাদেরকে মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তোমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থোওয়াররাই (বিপ্লবী যোদ্ধারা) করবে। এছাড়া যদি দেশে যেতে চাও তাহলে ঐ যে রেডক্রসের অফিস, ওদের সাথে যোগাযোগ করলে বিনা খরচে দেশে পাঠিয়ে দিবে। আমাদের দেশে বা মিসরাতায় যাওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই। আম্মু আর তিথি কোথায় আছে এখনও জানি না, সিরতের যত কাছাকাছি থাকতে পারি, ততই তাদেরকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
খামসিনে আমরা প্রথমদিন অনেকটা উদ্বাস্তুর মতোই কাটালাম। খাবার-দাবারের কোন অভাব হল না, যত খুশি তত খাও - এরকম অবস্থা, তবে থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যা। হসপিটালের দায়িত্বে থাকা ডাঃ আব্দুর রহমান বলল, এটা হসপিটাল, সিভিলিয়ানদের আশ্রয়কেন্দ্র না, তোমরা ফ্রন্টলাইন থেকে কোন রিকোয়েস্ট লেটার ছাড়া এখানে কিভাবে এলে সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। সে কয়েক জায়গায় ওয়্যারলেস দিয়ে যোগাযোগ করল, কিন্তু কোন লাভ হল না। তার কথাবার্তায় ফ্রন্টলাইন কমান্ডারদের প্রতি
অসন্তোষ প্রকাশ পেতে লাগল। সে বলতে লাগল, বিলিভ মি, দেয়ার ইজ নো সিস্টেম, নো প্রি-প্ল্যান্ড অ্যারেঞ্জমেন্ট ইন দিস রেভিউলিউশন। অনলি উই আর ইন দ্যা রাইট পাথ, সো ইভরিথিং ইজ হ্যাপেনিং বাই গড'স উইল। ইউ নো, হাউ ত্রিপলী ওয়াজ ক্যাপচার্ড? দ্যা এনটিসি অফিশিয়ালস হ্যাড এ কম্বাইন প্ল্যাড টু অ্যাটাক ত্রিপলী ইন এ সিসটেম্যাটিক ওয়ে। বাট হোয়েন দ্যা রেবেলস এন্টার্ড জাওইয়া, ২৫ কিলোমিটার্স ফ্রম দ্যা ক্যাপিটাল, দে সেইড, উই ডোন্ট নীড অ্যানি প্ল্যান। উই আর নীয়ার অ্যান্ড উই নো উই ক্যান ক্যাপচার ত্রিপলী। উই ফীল ইট। অ্যান্ড দে রিয়েলি ক্যাপচার্ড ত্রিপলী উইথইন এ নাইট! আই মেট ওয়ান অফ দেম, হি সেইড, আই ডোন্ট নো, হাউ আই এন্টার্ড দ্যা গ্রীণ স্কয়ার। উই অয়্যার আউটসাইড অ্যান্ড সাডেনলি উই ফাউন্ড আওয়ার সেলভস ইন সাইন দ্যা মার্টায়্যার্স স্কয়ার!
বিকেল বেলা হঠাত করে কবীর আংকেলের সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি সিরতের মুজাম্মা হসপিটালে চাকরি করতেন, গত দশদিন আগে বিদ্রোহীরা ওখান থেকে তাকে উদ্ধার করে। এরপর থেকে তিনি এখানেই আছেন। একটা কন্টেইনারে থাকেন, খাওয়া-দাওয়ার কোন সমস্যা নেই, কিন্তু ক্যান্টিনের কাজকর্মে টুকটাক হেল্প করতে হয়। রাতের বেলা ক্যান্টিনের পরিচালক তথা এই পুরো ক্যাম্পটার পরিচালক খেইরী নিজে এসে আমাদেরকে বলে গেল, এটা এমনিতে আশ্রয়কেন্দ্র না, তবে আজ রাতের জন্য সমস্যা নেই, থাকা যাবে। কিন্তু আগামী কাল থেকে থাকতে হলে ক্যান্টিনের কাজে সাহায্য করতে হবে। আমরা সহজেই রাজি হয়ে গেলাম। ফ্যামিলি দুটোর জন্য একটু আড়ালে একটা তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হল, আর আমরা চারজন, সাথে খান আর শাহীন পেলাম একটা কন্টেইনার।
পরদিন কাজে হাত দিয়ে দেখলাম যে সিরতে যত সৈন্য যুদ্ধ করছে তার একটা অংশের জন্য এখানে প্রতিদিন খাবার তৈরি করা হয়। প্রায় ষোল-সতেরশো লোকের রান্না, সেগুলো প্যাক করা, বিশাল বিশাল হাড়ি পাতিল গুলো ধোয়া - সবই করছে ভলান্টিয়াররা। এদের মধ্যে বেশ কজন স্কুলের ছাত্রও আছে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন যে হাজার হাজার বোতল পানি, জুস, দুধ, পনির, টুনা ফিশ যা কিছু আসে, তার সবই মিসরাতার বিভিন্ন ধনী লোকেরা, ব্যবসায়ীরা যুদ্ধের জন্য দান করছে, তাদের ভাষায় ফী সাবিলিল্লাহ্। সবার একটাই লক্ষ্য - গাদ্দাফীকে হটাও।
কাজে লেগে গেলাম আমরা। প্রথম দিন সুযোগ পেয়ে আমাদেরকে প্রচুর খাটালো, কিন্তু আমাদের অসন্তোষ বুঝতে পেরে পরিচালক খেইরী বলে দিল, কাল থেকে তোমরা শুধু ধোয়াধুয়ির কাজে থাকবে, কেউ ডাকলেউ অন্য কাজে যাবে না। বলবে খেইরী নিষেধ করেছে। তালহার অবশ্য কাজ করার দরকার নেই, কিন্তু তবুও সে খাবার প্যাকিং করার কাজে স্বেচ্ছায় যোগ দিল। কাজ করতে আমাদের মজাই লাগত, কাজ চলার মধ্যেই হয়তো একজন চিতকার করে উঠল, তাকবীর! সাথে সাখে বাকিরা সমস্বরে বলে উঠে আল্লাহু আকবার! একবার শুরু হলে একটানা মিনিট পাঁচেক চলতে থাকে। শ্লোগানটার একটা আলাদা টান আছে, আমাদের মজাই লাগতে থাকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা লক্ষ করলাম ক্যান্টিনের দরজার সামনেই মাটিতে গাদ্দাফীর একটা ছবি বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সবাই প্রতিবার ঢুকতে বের হতে সেটা পাড়িয়ে যাচ্ছে।
এদিন ফ্রেঞ্চ লিবারেশন পত্রিকার সাংবাদিক লুক ম্যাথিউ এবং জার্মান নেভেস ডয়েচল্যাড পত্রিকার সাংবাদিক মার্টিন আমার সাক্ষাত্কার নিল। মার্টিন অনেকটা রোবট টাইপের, ঠিকমতো প্রশ্নও করতে জানে না। অদ্ভুথ অদ্ভুত অগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগল। তবে লুক বেশ আন্তরিক ছিল। লুক যখন শুনল যে গত তিনমাস ধরে দেশের কারো সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই, তারা জানেও না আমরা বেঁচে আছি না মারা গেছি, তখন সে নিজের ব্যায়বহুল স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে কথা বলার জন্য আমার হাতে দিয়ে কফি খেতে চলে গেল। আমি সংক্ষেপে আমার খালাতো ভাই বাবুকে আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে দিলাম। তবে আম্মুরা একজায়গায়, আমরা অন্য জায়গায়, কারো খবর কেউ জানি না - এটা ইচ্ছে করেই চেপে গেলাম। খামোখা দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়ে কি লাভ?
পরদিন এএফপির সেই মহিলা সাংবাদিকের সাথে আবার দেখা হয়ে গেল। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার কথা মনে আছে? দেখা গেল আমার নাম, আব্বুর পড়ে যাওয়ার ঘটনা সবই তার মনে আছে। জানতে পারলাম তার নাম ডাফনে বেনোয়ে (Daphne Benoit)। আমাকে বলল, ইউ আর অন মাই স্টোরি, আই হ্যাভ অলরেডি সাবমিটেড ইট। সে আমাকে তার ইমেইল লিখে দিয়ে বলল, যুদ্ধ শেষ হলে তাকে ইমেইল করলে সে আর্টিকেলটা পাঠিয়ে দিবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মেইল করার পর ঠিকই পাঠালো, কিন্তু দেখলাম নামগুলোকে সে খিচুড়ী পাকিয়ে ফেলেছে। আমার নাম ত্বোহা, আরবিতে তাহাও বলে অনেকে, লিবিয়ান পদ্ধতিতে আমার ফ্যামিলি নেম হয়ে দাঁড়িয়েছে আব্বুর শাহজাহান নামের প্রথম অংশ শাহ। এখান থেকে সিলেক্ট করে ডাফনে আমার নামটা বানিয়েছে তাহা সাহা! আমিনুর আংকেলের নাম লিখেছে মোহাম্মদ নূর!
সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বিদ্রোহীদের চরিত্রের আরেকটা চমত্কার দিক লক্ষ করলাম। তারা সাংবাদিকের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েই সরে যাচ্ছে। সাংবাদিকের সাথে যা খুশি তা বলার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আমার! প্রতিটা সাংবাদিককেই আমি বলছিলাম যে আমাদের ফ্যামিলির এক অংশের কোন খোঁজ এখনও পাইনি, তারা যদি সিরতে যায়, তাহলে যেন একটু মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে গার্বিয়াত এলাকায় কোন বাংলাদেশী ফ্যামিলি আছে কি না? সবাই-ই নোটবুকে টুকে নিল, কিন্তু দেখেই বুঝা যাচ্ছিল আসলে কিছুই করবে না, স্টোরি লিখেই ব্যাপারটা ভুলে যাবে। একমাত্র ডাফনেই যা একটু বাড়তি আগ্রহ দেখালো। সে তার নোট বুকে আমাকে দিয়ে ইংরেজতে এবং আরবিতে গার্বিয়াত এলাকাটার নামের বানান লিখিয়ে নিল। যুদ্ক থেকে ফিরে কয়েক সৈন্যকেও বললাম আম্মুদের কথা, কিন্তু এইসব সৈন্য জীবনে কখনও সিরতে আসে নি। গার্বিয়াত বা রক্বম এতনীন কোন এলাকার নামই তারা জানে না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার আর কত বাকি, তারা বলতে লাগল মাত্র এক বর্গকিমি এলাকা বাকি আছে, দুদিনেই হয়ে যাবে।
২০শে অক্টোবর, ২০১১।
ত্রিপলী দখলের ঠিক দুমাস পূর্ণ হল।
সেই সাথে শুরু হল লিবিয়া যুদ্ধের সবচেয়ে স্মরনীয় দিন।
সকাল আটটার দিকে দীর্ঘদিন তিন সপ্তাহ পর পঞ্চাশকিমি দূর থেকেই আমরা ন্যাটোর বোমার আওয়াজ পেলাম। ডাফনে কে জিজ্ঞেস করলাম, সে কিছুই জানে না, এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ক্যান্টিনের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বলল, না ন্যাটো না, বিদ্রোহীরাই মিসাইল মারছে। আমি মনে মনে হাসলাম। ন্যাটো তো কখনও এদের বেশি কাছাকাছি মারেনি, তাই এখনও শব্দজ্ঞান হয় নি, আর আমরা পুরো একটা মাস শব্দগুলো শুনতে শুনতে এক্সপার্ট হয়ে গেছি। কোন সন্দেহ নেই এগুলোর ন্যাটোর বোমা হামলার আওয়াজ!
সকালের এগারোটার দিকে একজন এসে বলল, জাজিরা বলছে বিদ্রোহীরা সিরতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কেউ অবশ্য তেমন গুরুত্ব দিল না, জাজিরা যে বিদ্রোহীদের পক্ষে অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচার করে, এটা এরাও জানে। সাড়ে এগারোটার দিক থেকে ফ্রন্টলাইন থেকে ফিরে আসা যোদ্ধাদের মুখ থেকে কিছুক্ষণ পরপর একেকটা সংবাদ পাওয়া যেতে লাগল। কেউ বলছে, গাদ্দাফী সম্ভবত ধরা খেয়েছে, কেউ বলছে, গাদ্দাফী না, তার ছেলে মৌতাসেম। আবার কেউ বলছে জানা জায়নি কে, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ ধরা খেয়েছে। মৌতাসিম যুদ্ধের প্রথম থেকে সিরতে আছে এবং নিজেই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, এটা সিরতের সবাই জানত। অনেকেই তাকে দেখেছেও। নবী স্যার, সৌরভ, খান এরাও দাবি করে তারা মৌতাসেমকে দূর থেকে দেখেছে। কিন্তু গাদ্দাফী সিরতে আছে সিরতের লিবিয়ানরাও জীবনে কখনও কল্পনা করে নি।
দুপুর ঠিক একটার সময় আমি তালহাকে নিয়ে ক্যান্টিন এরিয়া থেকে বেরিয়া হসপিটাল এরিয়ার সামনে গেলাম। সেখানেই আহত এবং মৃত যোদ্ধাদের আনা হয়। তাদের কাছেই লেটেস্ট সংবাদ পাওয়া যায়। ঠিক যখন আমার ঘড়িতে একটা বাজার শব্দ হল, তখন হসপিটালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে, যে ওয়্যারলেসে কথা বলছিল, সে লাফিয়ে উঠে চিত্কার করে বলতে লাগল, শিদ্দেনা গাদ্দাফী! হামদুলিল্লাহ্, শিদ্দেনা গাদ্দাফী! অর্থাত্ গাদ্দাফীকে আমরা ধরেছি। উত্তেজনায় সে লাফাচ্ছিল, এর মধ্যই তার মুখ থেকে আরো জানা গেল, তাকে একজন কমান্ডার ওয়্যারলেসে এই মাত্র জানিয়েছে গাদ্দাফীকে রক্বম এতনীন থেকে ধরে ফেলা হয়েছে এবং তাকে এখন খামসিনের এই ক্যাম্পটার ভেতরেই নিয়ে আসা হচ্ছে। সাথে সাথে ডাক্তার-নার্স, যোদ্ধা, স্বেচ্ছাসেবী সবাই যে উল্লাস শুরু করল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কতজনে কোলাকুলি করতে লাগল, বিশ-ত্রিশজন সাথে সাথে মাটিতে সেজদায় পড়ে গেল। কয়েকজন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল, আর কাঁদার মধ্যে মধ্যেই বলতে লাগল, হামদুলিল্লাহ্! হামদুলিল্লাহ্! হাউয়্যেলনা আত্তাগীয়া! অর্থাত,অত্যাচারীকে সরিয়েছি! কে কার সাথে কোলাকুলি করছে না, কোন হিসেব নেই। আমাদের সাথে জড়িয়ে ধরে কয়েকজন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কেউ হয়তো, ছেলে হারিয়েছে, কেউ ভাই, কেউ বাবা। অনেকে গত আটমাস ধরেই ঘর ছেড়ে যুদ্ধে ময়দানে ময়দানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ তাদের স্বপ্ন সফল হল!
মিনিট দশেকের মধ্যেই ফ্রন্ট তেকে সৈন্যরা ফিরে আসতে শুরু করল। এসেই তারা সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আকাশের দিয়ে ফাঁকা ফায়ার করতে লাগল। এরা অনেকেই গাদ্দাফীকে ধরারর জায়গাটিতে উপস্থিত ছিল। একজন হেলমেট পরা সৈন্য (লিবিয়াতে এরকম হেলমেট পরা যোদ্ধা প্রায় দেখাই যায় না, বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ, তাদের হেলমেট পরার অভ্যাস নেই) আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে কথা বলল। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম গাদ্দাফী হয়তো মেরে ফেলা হয়েছে। সে বলল, গাদ্দাফীকে একটা ড্রেনেজ সিস্টেমের পাইপের ভেতর থেকে চুল ধরে টেনে বের করা হয়, সে নিজে দেখেছে। সে হাসতে হাসতে বলল, গাদ্দাফী তার ভাষণে বলেছে আমাদেরকে দ্বার দ্বার (প্রতিটা দরজা), বেত বেত (প্রতিটা ঘর), জাংগা জাংগা (প্রতিটা ইঞ্চি) থেকে তার লোকেরা খুঁজে বের করবে। আর আমরা এখন তাকেই হোফরা হোফরা (গর্তে গর্তে) খুঁজে বের করেছি।
এর দশ মিনিট পরেই যোদ্ধাদের হাতে হাতে গাদ্দাফীকে ধরার ভিডিও দেখা যেতে লাগল। আমরা যখন হুমড়ি খেয়ে ভিডিওটা দেখার চেষ্টা করছি, তখন হঠাত লক্ষ করলাম একটা পিকআপ এরিয়াতে ঢুকল, তার সাথে সাথেই মেইন গেটটা বন্ধ করে দেওয়া হল। সবাই পিকআপটার পেছনে দৌড়াতে লাগল, আমরাও সাথে দৌড় দিলাম। পিকআপের পেছনে কেউ একজন শুয়ে আছে, যে একবার কাছে গিয়ে দেখছে সেই আর দাঁড়াচ্ছে না, মুখ বিকৃত করে ঘুরে চলে আসছে। এক সময় আমিও সামনে যাও্য়ার সুযোগ পেলাম। গিয়ে দেখি রক্তে ভেজা আধমরা একটা মানুষ। মরার পথেই, এখনও একটু হাত নাড়াচ্ছে। মুখটা ঢাকা ছিল, এক মুহূর্তের জন্য সরালো। ঠিক চিনতে পারলাম না, তবে সবাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এ হচ্ছে গাদ্দাফীর বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী, দীর্ঘকালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান, আবুবকর ইউনূস জাবের। পাশেই হসপিটাল, কিন্তু কেউ চিকিত্সার নামও মুখে আনল না, যেভাবে পিকআপের পেছনে করে এনেছিল, সেভাবেই নিয়ে গেল। এভাবে করেই নাকি ২০০ কিমি দূরে অবস্থিত মিসরাতা পর্যন্ত নেওয়া হবে।
মানুষের উল্লাস কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ল। লাশ কয়জনেই সহ্য করতে পারে, হোক না সেটা চিরশত্রুর লাশ। বিশ মিনিটের মধ্যেই আরকটা গাড়ি এসে ঢুকল। এবার গাড়িটা যেখানে এস থামল, আমরা ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাই মানুষের ভীড় এসে পৌঁছানোর আগেই আমরা দেখতে পেলাম। লম্বা একটা শরীর, সবুজ প্লাস্টিক ক্লথ, যেগুলো সাধারণত কনস্ট্রাকশনের কাজে ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে ঢাকা। দেখেই আমার সন্দেহ হল এটা নিশ্চয়ই মৌতাসেম। কিছুক্ষণ পরেই শরীর থেকে প্লাস্টিক সরালো। সেই অবিকল মৌতাসেম। সুন্দর চেহারা, দাড়ি ভর্তি মুখ, কিছুটা শুকিয়ে গেছে। ঠিক গলার মধ্যে একটা গুলির ছিদ্র। জিন্সের প্যান্ট আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরনে, রক্তে আর বালিতে মাখামাখি জামাকাপড়। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম , পায়েও একটা গুলি খেয়েছে সে। বাকিরা বলল, পিঠেও নাকি একটা গুলির গর্ত আছে। মৌতাসেমকেও একইভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। বাতাসে যাতে প্লাস্টিক উড়ে না যায়, সেজন্য একটা লম্বা কাঠের টুকরা শরীর এবং মুখের উপরে ফেলে দিল একজন। মানুষ কুকুর-বিড়াল মারা গেলেও আরেকটু যত্নের সাথে লাশটা ফেলে দেয়।
গাদ্দাফীকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত এখানে আনা হল না। শোনা যেতে লাগল, গাদ্দাফীকে ঘটনাস্থলেই ক্ষিপ্ত যোদ্ধারা কিলিয়ে ঘুষিয়ে মেরে ফেলেছে। তার লাশ সিরত থেকে সরাসরি মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। বিকেলের দিকে গাদ্দাফীকে ধরার এবং মারার পুরো ভিডিও দেখতে পেলাম। সে এক বর্বরতার দৃশ্য, অমানবিকতার দৃশ্য। গর্ত থেকে চুল ধরে টেনে তুলে মুখে অনবরত ঘুষি, চড় আর লাথির লাথি মারছে যোদ্ধারা, রক্তে ভেসে যাচ্ছে গাদ্দাফীর মুখের এক পাশ, সে অবস্থায়ই সে বলছে, হারাম 'আলেক, হারাম 'আলেক! কয়েকজন অবশ্য বলছিল মেরো না, একে জীবিত রাখতে হবে, কিন্তু কে শোনে কার কথা? যোদ্ধাদের মধ্যে প্রথম থেকেই গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে যেরকম ক্ষোভ দেখছিলাম, তাতে গাদ্দাফীকে ধরতে পারলে যে সেখানেই মেরে ফেলা হবে, সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু সেই হত্যাকান্ড যে এরকম অমানবিক হবে, সেটা ভাবতে পারিনি।
গাদ্দাফীকে হত্যা করার জন্য অসংখ্যবার দেশের ভেতর এবং বাহির থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই প্রায় অলৌকিকভাবে সে বেঁচে গেছে। সর্বশেষ এই বছরও ন্যাটোর বোমায় তার ছেলে সাইফুল আরাব এবং তিন নাতি-নাতনী মারা গেছে, কিন্তু একই বাসায় থেকেও সে বেঁচে গেছে। গত একমাস ধরে সে রক্বম এতনীনেই ছিল। কিন্তু হাজার হাজার মিসাইলেও তার কিছু হয় নি। এমন কি, আজ সকালে সে যখন চল্লিশটা গাড়ির বহর নিয়ে সিরত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন ন্যাটোর বোমায় সেখানের ১৩টা গাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এখানেও তার কিছু হয় নি। সে দৌড়ে বেরিয়ে পাইপের ভেতরে গিয়ে লুকায়। সম্ভবত তার নিয়তিই ছিল, এতো সহজে সে মরবে না। মানুষের লাথি-ঘুসি খেয়েই মরবে।
বিকালের দিক থেকেই সব সৈন্যরা একে একে সিরত থেকে ফিরে যেতে শুরু করল। কিন্তু এবার সিরতের দিতে যেতে লাগল সাধারণ পিকআপে করে অস্ত্র হাতের অন্যান্য মানুষ, দেখলেই বুঝা যায় এরা যুদ্ধ করে নি। এরা সম্ভবত যাচ্ছে সিরত লুটপাট করতে। ক্যাস্পের জিনিসপত্র গোছগাছ করা শুরু হয়ে গেল। জানলাম যুদ্ধ শেষ, তাই পরশুদিন সকালেই ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা নিজেরাও সিরতে ফিরে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলাম।
... চলবে ...
বিঃদ্রঃ আগামী পর্বটাই শেষ পর্ব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



