somewherein... blog badh bhangar awaaj recent posts http://www.somewhereinblog.net http://www.somewhereinblog.net/config_bangla.htm copyright 2006 somewhere in... ন্যাটো লিফলেট
লিফলেটগুলো অবশ্য সাধারণ মানুষের হাতে পড়া একটু কঠিন ছিল। কারণ যেখানে লিফলেট পড়ত, সাথে সাথে গাদ্দাফী বাহিনীর লোকেরা সেখানে গিয়ে সব লিফলেট জড়ো করে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিত, যেন সাধারণ মানুষ লিফলেটে কি লেখা আছে সেটা জানতে না পারে। কাউকে লিফলেট কুড়িয়ে নিতে দেখলেও ধমকে তার কাছ থেকে সেটা নিয়ে নেওয়া হত। তাই অধিকাংশ লিফলেটই আমার সংগ্রহে নেই। যেই কয়টা আছে সেগুলো এখানে দিলাম।







উপরের প্রথম দুইটা লিফলেট ত্রিপলী দখল হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সিরতে ফেলা হয়। এগুলোর উল্টো পিঠে সিরতের মানুষকে বিদ্রোহীদের সাথে মিলে গিয়ে নতুন করে লিবিয়া গড়ার আহ্বান জানানো হয়। সামনের পিঠে বড় করে লেখা আছে লিবিয়া ওয়াহদা, ওয়া শা'ব্‌হা ওয়াহদা। অর্থাত্‍ লিবিয়া ইজ ইউনাইটেড অ্যান্ড ইটস পিপল ইজ ইউনাইটেড।




এটাতে সিরতবাসীকে এই এফএম রেডিওর সংবাদ শুনতে বলা হয়। এখানে বিদ্রোহীদের সর্বশেষ অগ্রগতির সংবাদ বলা হতো এবং ন্যাটো কোথায় কোথায় বোমা মারবে সেটাও বলা হত।








এটা ফেলা সিরত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। প্রথম পাতায় বলা হয়েছে, তোমরা কি জান লিবিয়াতে এখন কি হচ্ছে? গাদ্দাফী সরকার এখন আর দেশ পরিচালনা করছে না। ন্যাশনাল ট্রান্জিশনাল কাউন্সিলই এখন জাতিসংঘ সহ পুরো বিশ্ব সমর্থিত সরকার। এটাই হচ্ছে লিবিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি। বেনগাজী, মিসরাতা, তবরুক্ব, আজদাবিয়া, জিনতান, জাওইয়া, গারিয়ান, তারহুনা, গাদামেস, জিলিতন, খোম্‌স, জোয়ারা, ব্রেগা, রাস লানূফ, জোফরা, উদ্দান, হুন এবং সাবহা স্বাধীন হয়েছে। এবং রাজধানী ত্রিপলীও এখন এনটিসির হাতে।

আর দ্বিতীয় পাতায় আছে, যুদ্ধ বন্ধ কর এবং নতুন লিবিয়ার নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য কাজ শুরু কর। কেন তোমরা এমন লোকের জন্য যুদ্ধ করছ, যে তার নিজের পরিবারকে নিরাপদে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে অথচ একই সাথে তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বলছে? ...





আর শেষ লিফলেটটা হচ্ছে আফ্রিকান মার্সেনারীদের উদ্দ্যশ্যে ফেলা, যারা শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফীর পক্ষে লড়ে যাচ্ছিল। নোটের ছবিটা আসলে এক দিনারের নোটের ছবি। এখানে বলা হয়েছে, এটাই হচ্ছে সেই টাকা যার লোভে তোমরা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছ, কিন্তু এই টাকা আর গাদ্দাফীর নিয়ন্ত্রণে নেই। সে নিজেই আইসিসির ওয়ারেন্টপ্রাপ্ত পলাতক আসামী।


গতকাল অনেকদিন পর আকাশে হেলিকপ্টারের আওয়াজ শুনলাম। শুনেই ন্যাটোর অ্যাপাচির কথা মনে পড়ে গেল। ভাবলাম একটা পোস্ট দিয়েই দেই ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29537212 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29537212 2012-02-08 15:33:36
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৮ (শেষ) সকাল দশটার দিকে আমরা খামসিন থেকে বের হয়ে সিরতের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। সাথে প্রচুর পরিমাণ খাবার-দাবার। যাচ্ছি একটা ট্রাকের পেছনে চড়ে। খামসিনের চেক পয়েন্ট থেকে এই বিদ্রোহীরা এই ট্রাকওয়ালাকে রিকোয়েস্ট করে আমাদেরকে উঠিয়ে দিয়েছে। রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় দেখলাম যুদ্ধের গাড়ি তেমন নেই, কিন্তু সাধারণ পিকআপে আর ট্রাকে করে মানুষ দামী দামী গাড়ি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন সহ দামী দামী জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বিভিন্ন দোকানপাট এবং বড়লোকদের বাড়ি থেকে লুটপাট করা জিনিস এগুলো।

ট্রাকওয়ালা আমাদেরকে জাফরান জাজিরার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। বিদ্রোহীদের কয়েকটা গাড়ি এসে আমাদের পাশে থামল, কিন্তু গাড়িতে উঠালো না। বরং বলল, আমরা কেন এসেছি? সিরত মানুষের বসবাসের যোগ্য না। সিরতে হয়তো কাউকে থাকতেই দেওয়া হবে না। হয়তো পুরো সিরতটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু একটু পরেই বিদ্রোহীদের অন্য দুইটা পিকআপ এসে আমাদেরকে তুলে নিল। পিকআপের পেছনে যেখানে আমরা উঠলাম সেখানে দেখি একটা তলোয়ার রাখা। দেখেই কেমন যেন ভয় ভয় লাগে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার! সবার হাতে হাতে রাইফেল, সেটাকে মোটেই ভয় লাগছে না, কিন্তু গাড়িতে তলোয়ার দেখেই মনে হচ্ছে এরা বুঝি তালেবানপন্থী। তবে এরাও আমাদের সাথে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করল। আমাদের সাথেই প্রচুর খাবার-দাবার, এরা নিজেদের গাড়ি থেকে বাচ্চাদের হাতে আরো বিস্কিটের প্যাকেট, দুধের প্যাকেট ধরিয়ে দিল।

গাড়িদুটো আমাদের গলির মুখে এসে থামল, আমরা গাড়ি থেকে জিনিসপত্র নামাচ্ছি, ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের পেছনে কামালের ভাই মোহাম্মদের গাড়ি এসে থামল। মোহাম্মদের পাশে মোত্তালেবও আছে। দুজেই নেমে এসে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরল। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম আম্মু আর তিথি কোথায়। বলল সবাই ভালো আছে, নিরাপদে আছে। গার্বিয়াতেই আছে বুড়ীদের সাথে। মনের গভীরে যে অনিশ্চয়তা আর অজানা একটা শংকা ছিল, এক মুহূর্তেই সেটা দূর হয়ে গেল। মোহাম্মদ, মোত্তালেব সহ আমরা ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। এলাকার প্রতিটা ঘরের দরজা খোলা। আমাদের ঘরে ঢুকে দেখি পুরা ঘর একেবারে লন্ডভন্ড। জিনিসপত্র, কাপড়-চোপড়, কাগজ-পত্র সবকিছু মাটিতে, ঘরের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। তাড়াতাড়ি গিয়ে দেখলাম চালের বস্তাগুলো জায়গা মতোই আছে। লুটপাটকারীরা তার নিচে উঁকি মারে নি, তাই নিচে লুকানো আমাদের মূল টাকাপয়সাগুলো বেঁচে গেছে। ব্যাংকের কাগজগুলোও পাওয়া গেল মাটিতে। কিন্তু জরুরী অবস্থার জন্য হাতের কাছে রাখা আব্বুর দুই হাজার দিনার (প্রায় এক লাখ টাকা), আব্বুর ওয়েল্ডিং মেশিন, দামী মোবাইল ফোনগুলো, বাংলাদেশী স্কুলের ওয়াইম্যাক্ম ডিভাইস যেটা আমার কাছে রাখা ছিল, সবই গেছে। তবে টিভি, কম্পিউটার, প্রিন্টার এসব ভারী জিনিস কিছুই নেয় নি। বেডরুমের লোহার দরজা লক করা ছিল, সেটা গুলি করে ভাঙ্গা হয়েছে। সেই গুলি আয়না ভেদ করে পেছনের দেয়ালে ঢুকে গেঁথে আছে।

প্রথমে ভেবেছিলাম আমার সাতশ দিনারও বুঝি গেছে, কিন্তু একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম। ব্যাপারটা হচ্ছে, আমার রুমে একটা তাক এবং দুটো টেবিল ছাড়াও তিনটা বড় বড় বক্স ভরা বই খাতা আর কাগজ-পত্র ছিল। লুটপাটকারীরা প্রথমে বাক্সগুলো উল্টে সব খাতাপত্র মাটিতে ফেলেছে। এরপর তিন ধাপ বিশিষ্ট তাকের উপরের দুটোর সবকিছুও ফেলেছে। কিন্তু এতক্ষণে তারা কিছুই না পেয়ে ধরে নিয়েছে এর কাছে বইখাতা ছাড়া অন্য কিছুই নেই। তাই তারা নিচের তাকটি আর চেকই করে নি। আর তাই সেটার মধ্যে থাকা আমার সাতশ দিনার বেঁচে গেছে। লুটপাট নিশ্চয়ই মিসরাতার লোকেরাই করেছে, কিন্তু একটা জিনিস প্রমাণ হল যে সৈন্যরা যুদ্ধ করতে আমাদের ঘরে ঢুকেছিল, তারা লুটপাট করেনি। কারণ তারা আমাকে এই জায়গায় কিছু একটা লুকিয়ে রাখতে দেখেছিল।

কিছুটা গোছগাছ করা শুরু করতেই মোত্তালেব আর মোহাম্মদ বলল, তারা এখন গার্বিয়াতে ফিরে যাবে। আমরাও তাদের সাথে চললাম। যাওয়ার সময় দেখলাম এলাকার ভেতরে এখনও অলিতে গলিতে দলবেঁধে লুটপাটকারীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জায়গায় জায়গায় যারা গাদ্দাফীর পক্ষে বেশি বাড়াবাড়ি করেছিল, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন জ্বলছে। অনেক ঘুরে শেষ পর্যন্ত গার্বিয়াতে গিয়ে হাজির হলাম। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই বুড়ী আমাদেরকে দেখে চিত্‍কার করা শুরু করল, ওয়েন হাসিনা, তা'ল ইয়া হাসিনা, জা' তালহা, জ' তাহা! অর্থাত্‍, হাসিনা (আম্মুর নাম) কোথায়, হাসিনা এদিকে আসো, তালহা এসেছে, ত্বোহা এসেছে!

বুড়ীর চিত্‍কার শুনে আম্মু আর তিথি ছুটে এল। আম্মু আমাকে আর তালহাকে, আর তিথি আব্বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। ঘরের মধ্যে আমি মোটামুটি দয়ামায়াহীন, কঠোর, নিষ্ঠুর ধরনের মানুষ হিসেবেই পরিচিত, কিন্তু সেই আমিও চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। আমার চোখও ঝাপসা হয়ে এল, চশমা খুলে হাতে নিতে হল। দীর্ঘ ২২ দিন পর আমরা একে অন্যের দেখা পেলাম। লিবিয়ার যুদ্ধ আরও দুদিন আগে শেষ হলেও আমাদের যুদ্ধ শেষ হল আজ। অবসান ঘটল সকল রকম অনিশ্চয়তার।

পৃথিবীতে কি কাকতালীয় বলে কিছু আছে? এটা কি কাকতালীয়, নাকি আল্লাহ‌্‌র অনুগ্রহ? আমরা যদি আর দশ মিনিট পরে ঘরে পৌঁছতাম, বা মোহাম্মদ যদি আর দশ মিনিট আগে ঘরে পৌঁছত, তাহলেই আর কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের দেখা হতো না। মোহাম্মদ যখন ফিরে গিয়ে বলত, আমাদের ঘর খোলা, ঘরে লুটপাট হয়েছে, কিন্তু আমরা ঘরে নেই, তখন আম্মুর অবস্থাটা কি হতো?

আম্মুদের কাছ থেকে জানতে পারলাম, তারা প্রথম দিকে খাবারের বেশ কষ্ট করেছে, কিন্তু আমাদের মতো এতো জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে নি। প্রথমে দিন আ'তেফ হামজা সহ রক্বম তালাতা থেকে বের হয়ে গার্বিয়াত-এর দিকে যাত্রা শুরু করতেই তারা দেখতে পায় সেদিকের সবগুলো রাস্তা বিদ্রোহীদের দখলে। রাস্তায় বিদ্রোহীরা গাড়ি থামিয়ে প্রতিটি ব্যাগ চেক করেছে, কিন্তু কারো কিছুই নেয় নি, কাউকে কিছু বলে নি। এরপর গার্বিয়াতে এসে দেখে গার্বিয়াতও সম্পূর্ণ তাদেরই দখলে। আ'তেফ, বুড়ী, উলা এরা সিরতের শতশত মানুষের মতোই সম্পূর্ণ গাদ্দাফীর সাপোর্টের, স্বভাবতই প্রথম প্রথম বিদ্রোহীদের ভয়ে অস্থির ছিল। কিন্তু দিনে দিনে বিদ্রোহীদের আচার-ব্যবহার দেখে ধীরে ধীরে সবাই সাহস ফিরে পেয়েছে। কয়েকদিন যাওয়ার পর বিদ্রোহীরা নিজেরাই ঘরে এসে প্রচুর খাবার-দাবার দিয়ে গেছে। কয়েকটা পয়েন্টে নিয়মিতভাবে ত্রাণ দেওয়া হয়, আ'তেফ এমনিতে বিদ্রোহীদেরকে দেখতে না পারলেও সময় মতো গিয়ে সেখান থেকে খাবার-দাবার নিয়ে আসে।

গার্বিয়াতে দুদিন কাটিয়ে সোমবার আমরা ঘরে ফিরে এলাম। সারাদিন গোছগাছ করে সময় কাটালাম। এলাকা এখনও ফাঁকা। দুই-একজন করে মানুষ ফিরে এসে ঘরবাড়ি দেখে আবার ফিরে যাচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষের বাসাই বসবাসের অযোগ্য। দেখা গেল সিরতের প্রতিটা বাসাতেই লুটপাট হয়েছে। একটা বাসাও বাকি রাখে নি তারা। চুরি এখনও হচ্ছে, তবে খালি বাড়িগুলোতেই। যেসব বাসায় মানুষ আছে, সেসব বাসায় কেউ ঢুকছে না। আলিম আংকেলদের সাথে দেখা হল মুক্তাদের বাসায়। জানা গেল তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গার্বিয়াতেই ছিল। এখন তারাও বাসায় ফিরে এসেছে। নবী স্যার, রমজান আংকেল আর সৌরভরাও গার্বিয়াতে তাদের সাথে একই জায়গায় গিয়ে উঠেছিল। কিন্তু পরে তারা ত্রিপলীতে চলে গেছে।

মঙ্গলবার সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে আমি আর শাওন ভাইয়া গেলাম সৌরভদের বাসায়, দামী জিনিসপত্র কিছু পেলে ঘরে এনে রাখব। তা না হলে দেখা যাবে সেগুলোও চুরি হয়ে গেছে। এক সময় তো ওরা ফিরে আসবেই, তখন জিনিসগুলো কাজে লাগবে। আমরা একটা গ্যাস সিলিন্ডার, কম্পিউটার, হীটার এনে মাত্র ঘরে ঢুকেছি, এমন সময় দেখি রমজান আংকেল, নবী স্যার আর সৌরভের আব্বা কালন আংকেল এসে হাজির। কেউ আমরা কারো আত্মীয় না, তবুও সবার চোখেই পানি। জানা গেল, তারা আসলে ত্রিপলীতে যায় নি, বিদ্রোহীরা তাদেরকে মিসরাতার কাছাকাছি একটা আবাসিক এলাকায় আশ্রয় দিয়েছে। ঐ এলাকাতে বিদ্রোহীদের একটা ক্যাম্প আছে এবং সেখানকার চারতলা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটে সিরত থেকে পালিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদেরকে স্থান দেওয়া হয়েছে। তারা সেখানে যাওয়ার পর থেকে গত তিন সপ্তাহ পর্যন্ত তাদের খাবার-দাবার থেকে যাবতীয় ব্যবহার্য প্রতিটি জিনিস বিদ্রোহীরাই দিয়েছে। কোন কিছুর অভাব সেখানে তাদের ছিল না। তাদের কাছ থেকে আরও জানতে পারলাম বেনগাজীর বিদ্রোহীরা সরকার আংকেলদের এলাকায় ঢুকে তাদেরকে এবং আজিম আংকেলদেরকে উদ্ধার করেছে। তারা এখন বেনগাজীতেই আছে। মোটামুটি বাংলাদেশীরা সবাই নিরাপদেই আছে। সবাই-ই কম বেশি ঝুঁকির মধ্যে দিনগুলো কাটিয়েছে, কিন্তু কেউই হতাহত হয় নি, এটাই সবচেয়ে বড় কথা।


ডিসেম্বর ২০১১

যুদ্ধ শেষ হয়েছে দেড় মাস হল। সিরতে ফেরার পর প্রথমে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি সহ পুরো শহরের যে অবস্থা ছিল, যেভাবে প্রতিটা কারেন্টের পিলার ভেঙ্গে পড়েছে, যেভাবে রাস্তাঘাট ভেঙ্গেচুরে ছিল, ভেবেছিলাম তাতে কারেন্ট আর নেটওয়ার্ক আসতে বছর খানেক সময় লেগে যাবে। আর পুরো শহরকে পূর্বের অবস্থায় তুলতে সময় লাগবে দশ বছর। কিন্তু দেখা গেল বাস্তবে সেরকম হয়নি। কুরবানীর ঈদের আগেই রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা হয়ে গিয়েছিল, ঈদের পরপরই কারেন্ট এবং নেটওয়ার্কের কাজও শুরু হয়ে গেল। নভেম্বরের মাঝামাঝিতেই পুরো শহরে কারেন্ট এবং নেটওয়ার্ক চলে এল। শহরে লোকজনও ফিরতে শুরু করল। দোকান পাটও মোটামুটি চালু হওয়া শুরু করল, জিনিস পত্রের দামও সহনীয় পর্যায়ের। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের অর্থাত্‍ মে-জুন মাসের মতো। এছাড়া ত্রাণ তো আছেই। যাদের একটু সময়, ধৈর্য্য এবং গাড়ি আছে, তারা শুধুমাত্র ত্রাণের খাবার দিয়েই রাজার হালে দিন কাটিয়ে দিতে পারে।

ঈদের পরপরই আমি মিসরাতা হয়ে ত্রিপলীতে এলাম। মিসরাতা এবং ত্রিপলীর অবস্থা পুরাই স্বাভাবিক। ত্রিপলীর অধিকাংশ এলাকাতে কোন যুদ্ধই হয় নি। বিদ্রোহীদের ঢুকতে যতটুকু দেরি হয়েছিল, মানুষের পতাকা পাল্টাতে দেরি হয় নি। প্রতিটা অলিতে-গলিতে নতুন পতাকা, পতাকার রং-এর ডিজাইন, দেয়ালচিত্র। ত্রিপলীর বাংলাদেশীরাও সবাই নিরাপদেই আছে। শুধু একজন মাত্র ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘ দিন যাবত বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ, যিনি স্কুলটির জন্য এক অপরিহার্য ব্যাক্তিত্ব, সেই মজিদ স্যার, ডাঃ আব্দুল মজিদ নিখোঁজ। তিনি মিলিটারি হসপিটালের ডাক্তার ছিলেন। ত্রিপলী দখলের আগের দিনও তার সাথে আমার ফোনে কথা হয়েছিল। সেদিন তার চেম্বারের পাশের বিল্ডিং-এ ন্যাটো বোমা ফেলেছিল। তার রুমের দরজা ছিটকে এসে ভেতরে পড়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে তার কিছু হয়নি। কিন্তু ত্রিপলী দখলের বেশ কিছুদিন পরই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাকে তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাসও বলছে তারা যথাসাধ্য যোগাযোগের চেষ্টা করছে। কিন্তু দীর্ঘ আড়াই মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একবারের জন্যও কেউ তার সাথে দেখা করতে পারে নি, ফোনেও কথা বলতে পারে নি। দূতাবাস সম্পর্কে খুব উচ্চ ধারণা মানুষের কখনোই ছিল না। তারা যতই দাবি করুক তিনি ভালো আছেন, অন্তত ফোনে একবার তার কন্ঠস্বর শোনার আগ পর্যন্ত তিনি বেঁচে আছেন কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া সহজ নয়।

প্রতিটা বিপ্লবের কিছু ঋণাত্মক দিকও আছে। সে দিক গুলোই যেন এখন এক এক করে ফুটে উঠছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ হয় একজন নেতাকে সামনে রেখে, যেই নেতার নির্দেশ সবাই মেনে চলে। কিন্তু লিবিয়ার যুদ্ধে কোন নেতা ছিল না। যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর একটা কমিটি গঠন করে গাদ্দাফীর সরকার থেকে পদত্যাগ করা বিচারমন্ত্রী মোস্তফা আব্দুল জলিলকে প্রধান ঘোষণা করা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যোদ্ধাদের উপর তার প্রভাব ছিল খুবই সামান্য। যোদ্ধারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট গ্রুপের নেতৃত্বে। আর তাই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে সব যোদ্ধাকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো আসলে কেউ নেই। সবাই-ই একেকজন নেতা। প্রতি রাতেই বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের সংবাদ পাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের উপর যদিও খুব একটা প্রভাব পড়ে না, কিন্তু রাতে কেউই প্রয়োজন না থাকলে নিজ এলাকা ছেড়ে দূরে কোথাও যেতে চায় না।

সবচেয়ে
বড় সমস্যা অস্ত্র। বিদেশী শক্তি যেন লিবিয়ার মাটিতে ঢুকার সাহস না পায়, সেজন্য গাদ্দাফী অস্ত্রভান্ডার খুলে দিয়েছিলেন। তার পক্ষের মানুষেরা দুই হাতে অস্ত্র নিয়েছে। তার আশা ছিল তার পক্ষের প্রতিটা লোক তাকে বাঁচানোর জন্য অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। সেটা হয় নি, কিন্তু অস্ত্রগুলো হাতে হাতে রয়ে গেছে। এই অস্ত্র উদ্ধার করা এখন অসম্ভব ব্যাপার। গাদ্দাফীর পক্ষের লোকেরা সুযোগ পেলেই এইসব অস্ত্র ব্যবহার করে গোলমাল সৃষ্টি করবে, এই অজুহাত দেখিয়ে যোদ্ধারাও অস্ত্র জমা দিচ্ছে না। অজুহাতটা অবশ্য সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়। কারণ সিরতের বেশিরভাগ মানুষ এখন পর্যন্ত এই বিপ্লবকে মেনে নেয় নি। এই মুহূর্তে তারা অবশ্য অস্বাভাবিক রকম নিশ্চুপ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা অপেক্ষা করছে নতুন একটা পাল্টা বিপ্লবের, যেটা ঘটতে হয়তো খুব বেশি দেরি হবে না।

এমনিতে দেশটা কিছুটা গণতান্ত্রিক পথের দিকে এগুচ্ছে। ঈদের এক সপ্তাহ আগে ত্রিপলী ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা যারা গত সেমিস্টার পড়তে পারেনি, তাদেরকে সুযোগ দেওয়ার জন্য আন্দোলন করেছে, ডীনের অফিস ঘেরাও করেছে, ডীনের পদত্যাগ দাবি করেছে, যেটা গাদ্দাফীর আমলে অকল্পনীয় একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু এখন প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ব্যাপারে আন্দোলন হচ্ছে, মিছিল বের হচ্ছে। উপজাতীয় আমাজিগরা আন্দোলন করছে মন্ত্রীসভায় তাদের থেকে একজন প্রতিনিধি না নেওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে। সিরতবাসী মিছিল করছে বেনগাজী রেডিওতে সিরতের জনগণের আদি নিবাস সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করার প্রতিবাদ হিসেবে। ত্রিপলীবাসী আন্দোলন করছে মিসরাতা এবং জিনতানের যোদ্ধাদের ত্রিপলী ছাড়তে বাধ্য করার জন্য। কিন্তু কথা হচ্ছে আন্দোলন গুলো কতদিন শান্তিপূর্ণ থাকবে! অস্ত্র যেহেতু আছে, সেগুলোর ব্যবহার হবেই। আজ, নয়তো কাল। বড়জোর নির্বাচন পর্যন্ত হয়তো শান্তিপূর্ণভাবে কাটবে। নির্বাচনে যে দল হেরে যাবে, সে কি তার সশস্ত্র জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতাটা দখল করতে চাইবে না? প্রতিশোধ নিয়ে উন্মুখ হয়ে থাকা গাদ্দাফীর ভক্তরা কি সেই সুযোগটা ছেড়ে দিবে? হেরে যাওয়া দলটি কি তখন তাদেরকে সাথে নিয়ে দল ভারী করার সুযোগটা হাতছাড়া করবে?

অস্ত্র বড়ই ধ্বংসাত্মক জিনিস। নিরীহ মানুষের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ করার পরিণতিতে গাদ্দাফী নিজে ধ্বংস হয়েছে, আর সেই অস্ত্র পুরো দেশে বিলিয়ে দিয়ে দেশটাকেও ধ্বংস করে দিয়ে গেছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29500648 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29500648 2011-12-11 13:17:41
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৭
মিনিট বিশেক চলার পরে জীপটা সাবা'তাশের অস্থায়ী হসপিটালে (সিরতের সতেরো কিমি পশ্চিমে) এসে পৌঁছল। দেখলাম সেখানে মুক্তারা এবং হিরণ ভাইরাও আছে। আমাদের গাড়ি থামার সাথে সাথেই দুইজন সাংবাদিক এসে আমাদের ঘিরে ধরল। একজন এএফপির, অন্যজন জার্মান একটা ডকুমেন্টারী মেকার, সে ভিডিও করছে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগল, আর আমিও যতদূর সম্ভব উত্তর দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরেই মুক্তারা এবং হিরণভাইরা সহ আমাদের সবাইকে আবার গাড়িতে তোলা হল। এবার নাকি আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে বাওয়াবাত খামসিনে (গেট অফ ফিফটি, সিরত থেকে পঞ্চাশ কিমি পশ্চিমে) অবস্থিত আরেকটি অস্থায়ী হাসপাতালে। যেতে শুনলাম কিভাবে মুক্তাদের এবং হিরণভাইদের উদ্ধার করা হয়েছে। বিদ্রোহীরা তাদের লোহার দরজার সামনে এসে গুলি করা শুরু করতেই খান আল্লাহু আকবার বলে চিতকার শুরু করে। খানের আল্লাহু আকবার শুনেই হোক আর ভেতরে নারী-শিশুদের চেঁচামেচিতেই হোক, বিদ্রোহীরা সাথে সাথে থেমে যায় এবং ভদ্রভাবে দরজা খুলতে বলে। হিরণ ভাই আর ভাবী আগেই ভয়ে আধামরা হয়েছিল, দরজা খোলার সাথে সাথেই সে দৌড়ে গিয়ে এক যোদ্ধার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দেয়। যোদ্ধাটা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ফ্যামিলি বলেই বোধহয় আমাদের চেয়ে হিরণ ভাইরা এবং মুক্তাদেরকে বিদ্রোহীরা আরো বেশি সময় দিয়েছে জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য। কিন্তু লাভ কিছুই হয় নি, মুক্তারা তেমন কিছুই নিতে পারে নি। শাহীন তো মোটে লুঙ্গি পরেই চলে এসেছে। যা কিছু নেওয়ার কান্নাকাটির মধ্যে দিয়েও হিরণ ভাই-ই নিয়েছে।

আমাদের মতোই তাদেরকেও বিদ্রোহীরা একই ভাবে কভারিং ফায়ার দিয়ে রাস্তা পার করিয়েছে। ঘর থেকে বেরোনোর সময়ই দুইজন যোদ্ধা মুক্তা এবং হিরণের মেয়েকে কোলে নিয়ে নেয়। তাদের বাবা-মায়েরা অবশ্য বাচ্চাগুলোকে হাতছাড়া করতে চাইছিল না, গাদ্দাফী বাহিনীর প্রচার করা বিদ্রোহীদের অমানবিকতার কাহিনী, মানুষকে ধরে ধরে জবাই করার কাহিনী কেউই ভুলে নি। তবে বিদ্রোহীরা অনেকটা জোর করেই বাচ্চাগুলোকে কোলে নিয়ে দৌড়ানো শুরু করে। আমিনুর আংকেলরা নিজেরাই দৌড়াতে পারছিল কিন্তু হিরণ ভাই এবং ভাবী দুজনেই কান্নাকাটির জন্য দৌড়াতে পারছিল না। তাদেরকে দুজন করে যোদ্ধা দুপাশ থেকে ধরে ধরে রাস্তা পার করে নিয়ে গেছে। বিদ্রোহী যোদ্ধাদের প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্য দিয়ে বাচ্চাদুটোকে রাস্তা পার করার যে বর্ণনা খান দিল, সেটা যেকোন ঐতিহাসিক বীরত্বের কাহিনীকে হার মানায়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এএফপির সাংবাদিকটার তোলা যে ছবিটি পাওয়া গেছে, সেটাও যেকোন যুদ্ধের ফিল্মের ম্যাগনেট অংশকে হার মানায়। হিরণের মেয়েকে নিয়ে দৌড়ানো যোদ্ধাটি এক পর্যায়ে বুলেটের খোসায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল, কিন্তু তখনও সে বাচ্চাটিকে কোল থেকে ছাড়ে নি।

রাস্তার ওপারে যাওয়ার পর হিরণ ভাই আর ভাবী পুনরায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। বিদ্রোহীরা তাদের মাথা ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুইয়ে দেয়। ভেজা জামা-কাপড়ে তারা দুজন কাঁদছে আর সেই টুপি-দাড়ি এবং চশমাওয়ালা বৃদ্ধ তাদেরকে সান্তনা দিচ্ছে - এএফপির বরাত দিয়ে এই ছবি এবং সংক্ষিপ্ত ফুটনোট পরদিন ১৮ ই অক্টোবর, ২০১১ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো এবং দৈনিক যুগান্তরে ছাপা হয়। ফেইসবুকের কল্যাণে এই ছবি সারা দুনিয়া ছড়িয়ে পড়লে হিরণভাইদের দেশের বাড়িতে চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে এসব কিছুই আমরা জানতে পেরেছি যুদ্ধ শেষ হওয়ার আরও অনেক পরে।

আরো আধ ঘন্টা চলার পর আমরা খামসিনে এসে পৌঁছলাম। পুরো রাস্তাজুড়ে সাধারণ গাড়ি একটাও চোখে পড়েনি, চোখে পড়েছে শুধু যুদ্ধের গাড়ি, বিদ্রোহীদের পতাকাবাহী, এন্টি এয়ারক্রাফট, মেশিনগান ফিট করা হাজার হাজার গাড়ি, মেইন রোড ধরে শুধু তাদের মিছিল আসছে আর যাচ্ছে। যেই পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র বিদ্রোহীদের কাছে, তারা তো শুধু দেশের ভেতরে না, বাইরের শক্তির সাথেও যুদ্ধ করার সামর্থ থাকার কথা! অথচ তারা কি না সিরতের মতো ছোট একটা শহরই দখল করতে পারছে না। সবচেয়ে অবিশ্বাস্য লাগল পুরো পঞ্চাশ কিমি রাস্তায় কিছুদূর পরপর শুধু তিন রং-এর চাঁদ-তারা খচিত পতাকা, গাদ্দাফীর সবুজ পতাকার কোন চিহ্নও নেই! বিদ্রোহীরা মাত্র কয়েকশত, সব এলাকা গাদ্দাফীর দখলে, বিরোধীরা শুধু সাহারা দিয়ে বাইপাস করে একেকটা এলাকায় অল্প কিছুক্ষণের জন্য ঢুক ভিডিও করে নিয়ে জাজিরাতে প্রচার করে - গাদ্দাফী মিডিয়ার এইসব অপপ্রচারের সারশূণ্যতা আজ নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করলাম।

চশমাওয়ালা সেই বৃদ্ধ আমাদেরকে বলে গেল, ঐ যে ওখানে হেলিকপ্টার আছে, তোমরা যদি চাও হেলিকপ্টারে করে তোমাদেরকে মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তোমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থোওয়াররাই (বিপ্লবী যোদ্ধারা) করবে। এছাড়া যদি দেশে যেতে চাও তাহলে ঐ যে রেডক্রসের অফিস, ওদের সাথে যোগাযোগ করলে বিনা খরচে দেশে পাঠিয়ে দিবে। আমাদের দেশে বা মিসরাতায় যাওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই। আম্মু আর তিথি কোথায় আছে এখনও জানি না, সিরতের যত কাছাকাছি থাকতে পারি, ততই তাদেরকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

খামসিনে আমরা প্রথমদিন অনেকটা উদ্বাস্তুর মতোই কাটালাম। খাবার-দাবারের কোন অভাব হল না, যত খুশি তত খাও - এরকম অবস্থা, তবে থাকার জায়গা নিয়ে সমস্যা। হসপিটালের দায়িত্বে থাকা ডাঃ আব্দুর রহমান বলল, এটা হসপিটাল, সিভিলিয়ানদের আশ্রয়কেন্দ্র না, তোমরা ফ্রন্টলাইন থেকে কোন রিকোয়েস্ট লেটার ছাড়া এখানে কিভাবে এলে সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। সে কয়েক জায়গায় ওয়্যারলেস দিয়ে যোগাযোগ করল, কিন্তু কোন লাভ হল না। তার কথাবার্তায় ফ্রন্টলাইন কমান্ডারদের প্রতি
অসন্তোষ প্রকাশ পেতে লাগল। সে বলতে লাগল, বিলিভ মি, দেয়ার ইজ নো সিস্টেম, নো প্রি-প্ল্যান্‌ড অ্যারেঞ্জমেন্ট ইন দিস রেভিউলিউশন। অনলি উই আর ইন দ্যা রাইট পাথ, সো ইভরিথিং ইজ হ্যাপেনিং বাই গড'স উইল। ইউ নো, হাউ ত্রিপলী ওয়াজ ক্যাপচার্ড? দ্যা এনটিসি অফিশিয়ালস হ্যাড এ কম্বাইন প্ল্যাড টু অ্যাটাক ত্রিপলী ইন এ সিসটেম্যাটিক ওয়ে। বাট হোয়েন দ্যা রেবেলস এন্টার্ড জাওইয়া, ২৫ কিলোমিটার্স ফ্রম দ্যা ক্যাপিটাল, দে সেইড, উই ডোন্ট নীড অ্যানি প্ল্যান। উই আর নীয়ার অ্যান্ড উই নো উই ক্যান ক্যাপচার ত্রিপলী। উই ফীল ইট। অ্যান্ড দে রিয়েলি ক্যাপচার্ড ত্রিপলী উইথইন এ নাইট! আই মেট ওয়ান অফ দেম, হি সেইড, আই ডোন্ট নো, হাউ আই এন্টার্ড দ্যা গ্রীণ স্কয়ার। উই অয়্যার আউটসাইড অ্যান্ড সাডেনলি উই ফাউন্ড আওয়ার সেলভস ইন সাইন দ্যা মার্টায়্যার্স স্কয়ার!

বিকেল বেলা হঠাত করে কবীর আংকেলের সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি সিরতের মুজাম্মা হসপিটালে চাকরি করতেন, গত দশদিন আগে বিদ্রোহীরা ওখান থেকে তাকে উদ্ধার করে। এরপর থেকে তিনি এখানেই আছেন। একটা কন্টেইনারে থাকেন, খাওয়া-দাওয়ার কোন সমস্যা নেই, কিন্তু ক্যান্টিনের কাজকর্মে টুকটাক হেল্প করতে হয়। রাতের বেলা ক্যান্টিনের পরিচালক তথা এই পুরো ক্যাম্পটার পরিচালক খেইরী নিজে এসে আমাদেরকে বলে গেল, এটা এমনিতে আশ্রয়কেন্দ্র না, তবে আজ রাতের জন্য সমস্যা নেই, থাকা যাবে। কিন্তু আগামী কাল থেকে থাকতে হলে ক্যান্টিনের কাজে সাহায্য করতে হবে। আমরা সহজেই রাজি হয়ে গেলাম। ফ্যামিলি দুটোর জন্য একটু আড়ালে একটা তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হল, আর আমরা চারজন, সাথে খান আর শাহীন পেলাম একটা কন্টেইনার।

পরদিন কাজে হাত দিয়ে দেখলাম যে সিরতে যত সৈন্য যুদ্ধ করছে তার একটা অংশের জন্য এখানে প্রতিদিন খাবার তৈরি করা হয়। প্রায় ষোল-সতেরশো লোকের রান্না, সেগুলো প্যাক করা, বিশাল বিশাল হাড়ি পাতিল গুলো ধোয়া - সবই করছে ভলান্টিয়াররা। এদের মধ্যে বেশ কজন স্কুলের ছাত্রও আছে। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন যে হাজার হাজার বোতল পানি, জুস, দুধ, পনির, টুনা ফিশ যা কিছু আসে, তার সবই মিসরাতার বিভিন্ন ধনী লোকেরা, ব্যবসায়ীরা যুদ্ধের জন্য দান করছে, তাদের ভাষায় ফী সাবিলিল্লাহ্‌। সবার একটাই লক্ষ্য - গাদ্দাফীকে হটাও।

কাজে লেগে গেলাম আমরা। প্রথম দিন সুযোগ পেয়ে আমাদেরকে প্রচুর খাটালো, কিন্তু আমাদের অসন্তোষ বুঝতে পেরে পরিচালক খেইরী বলে দিল, কাল থেকে তোমরা শুধু ধোয়াধুয়ির কাজে থাকবে, কেউ ডাকলেউ অন্য কাজে যাবে না। বলবে খেইরী নিষেধ করেছে। তালহার অবশ্য কাজ করার দরকার নেই, কিন্তু তবুও সে খাবার প্যাকিং করার কাজে স্বেচ্ছায় যোগ দিল। কাজ করতে আমাদের মজাই লাগত, কাজ চলার মধ্যেই হয়তো একজন চিতকার করে উঠল, তাকবীর! সাথে সাখে বাকিরা সমস্বরে বলে উঠে আল্লাহু আকবার! একবার শুরু হলে একটানা মিনিট পাঁচেক চলতে থাকে। শ্লোগানটার একটা আলাদা টান আছে, আমাদের মজাই লাগতে থাকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা লক্ষ করলাম ক্যান্টিনের দরজার সামনেই মাটিতে গাদ্দাফীর একটা ছবি বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সবাই প্রতিবার ঢুকতে বের হতে সেটা পাড়িয়ে যাচ্ছে।

এদিন ফ্রেঞ্চ লিবারেশন পত্রিকার সাংবাদিক লুক ম্যাথিউ এবং জার্মান নেভেস ডয়েচল্যাড পত্রিকার সাংবাদিক মার্টিন আমার সাক্ষাত্কার নিল। মার্টিন অনেকটা রোবট টাইপের, ঠিকমতো প্রশ্নও করতে জানে না। অদ্ভুথ অদ্ভুত অগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে লাগল। তবে লুক বেশ আন্তরিক ছিল। লুক যখন শুনল যে গত তিনমাস ধরে দেশের কারো সাথে আমাদের যোগাযোগ নেই, তারা জানেও না আমরা বেঁচে আছি না মারা গেছি, তখন সে নিজের ব্যায়বহুল স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে কথা বলার জন্য আমার হাতে দিয়ে কফি খেতে চলে গেল। আমি সংক্ষেপে আমার খালাতো ভাই বাবুকে আমাদের বর্তমান অবস্থার কথা জানিয়ে দিলাম। তবে আম্মুরা একজায়গায়, আমরা অন্য জায়গায়, কারো খবর কেউ জানি না - এটা ইচ্ছে করেই চেপে গেলাম। খামোখা দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়ে কি লাভ?

পরদিন এএফপির সেই মহিলা সাংবাদিকের সাথে আবার দেখা হয়ে গেল। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমার কথা মনে আছে? দেখা গেল আমার নাম, আব্বুর পড়ে যাওয়ার ঘটনা সবই তার মনে আছে। জানতে পারলাম তার নাম ডাফনে বেনোয়ে (Daphne Benoit)। আমাকে বলল, ইউ আর অন মাই স্টোরি, আই হ্যাভ অলরেডি সাবমিটেড ইট। সে আমাকে তার ইমেইল লিখে দিয়ে বলল, যুদ্ধ শেষ হলে তাকে ইমেইল করলে সে আর্টিকেলটা পাঠিয়ে দিবে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মেইল করার পর ঠিকই পাঠালো, কিন্তু দেখলাম নামগুলোকে সে খিচুড়ী পাকিয়ে ফেলেছে। আমার নাম ত্বোহা, আরবিতে তাহাও বলে অনেকে, লিবিয়ান পদ্ধতিতে আমার ফ্যামিলি নেম হয়ে দাঁড়িয়েছে আব্বুর শাহ‌জাহান নামের প্রথম অংশ শাহ। এখান থেকে সিলেক্ট করে ডাফনে আমার নামটা বানিয়েছে তাহা সাহা! আমিনুর আংকেলের নাম লিখেছে মোহাম্মদ নূর‍!

সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বিদ্রোহীদের চরিত্রের আরেকটা চমত্‍কার দিক লক্ষ করলাম। তারা সাংবাদিকের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েই সরে যাচ্ছে। সাংবাদিকের সাথে যা খুশি তা বলার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আমার! প্রতিটা সাংবাদিককেই আমি বলছিলাম যে আমাদের ফ্যামিলির এক অংশের কোন খোঁজ এখনও পাইনি, তারা যদি সিরতে যায়, তাহলে যেন একটু মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে গার্বিয়াত এলাকায় কোন বাংলাদেশী ফ্যামিলি আছে কি না? সবাই-ই নোটবুকে টুকে নিল, কিন্তু দেখেই বুঝা যাচ্ছিল আসলে কিছুই করবে না, স্টোরি লিখেই ব্যাপারটা ভুলে যাবে। একমাত্র ডাফনেই যা একটু বাড়তি আগ্রহ দেখালো। সে তার নোট বুকে আমাকে দিয়ে ইংরেজতে এবং আরবিতে গার্বিয়াত এলাকাটার নামের বানান লিখিয়ে নিল। যুদ্ক থেকে ফিরে কয়েক সৈন্যকেও বললাম আম্মুদের কথা, কিন্তু এইসব সৈন্য জীবনে কখনও সিরতে আসে নি। গার্বিয়াত বা রক্বম এতনীন কোন এলাকার নামই তারা জানে না। তাদেরকে জিজ্ঞেস করছিলাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার আর কত বাকি, তারা বলতে লাগল মাত্র এক বর্গকিমি এলাকা বাকি আছে, দুদিনেই হয়ে যাবে।

২০শে অক্টোবর, ২০১১।
ত্রিপলী দখলের ঠিক দুমাস পূর্ণ হল।
সেই সাথে শুরু হল লিবিয়া যুদ্ধের সবচেয়ে স্মরনীয় দিন।

সকাল আটটার দিকে দীর্ঘদিন তিন সপ্তাহ পর পঞ্চাশকিমি দূর থেকেই আমরা ন্যাটোর বোমার আওয়াজ পেলাম। ডাফনে কে জিজ্ঞেস করলাম, সে কিছুই জানে না, এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। ক্যান্টিনের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, তারা বলল, না ন্যাটো না, বিদ্রোহীরাই মিসাইল মারছে। আমি মনে মনে হাসলাম। ন্যাটো তো কখনও এদের বেশি কাছাকাছি মারেনি, তাই এখনও শব্দজ্ঞান হয় নি, আর আমরা পুরো একটা মাস শব্দগুলো শুনতে শুনতে এক্সপার্ট হয়ে গেছি। কোন সন্দেহ নেই এগুলোর ন্যাটোর বোমা হামলার আওয়াজ!

সকালের এগারোটার দিকে একজন এসে বলল, জাজিরা বলছে বিদ্রোহীরা সিরতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। কেউ অবশ্য তেমন গুরুত্ব দিল না, জাজিরা যে বিদ্রোহীদের পক্ষে অতিরঞ্জিত সংবাদ প্রচার করে, এটা এরাও জানে। সাড়ে এগারোটার দিক থেকে ফ্রন্টলাইন থেকে ফিরে আসা যোদ্ধাদের মুখ থেকে কিছুক্ষণ পরপর একেকটা সংবাদ পাওয়া যেতে লাগল। কেউ বলছে, গাদ্দাফী সম্ভবত ধরা খেয়েছে, কেউ বলছে, গাদ্দাফী না, তার ছেলে মৌতাসেম। আবার কেউ বলছে জানা জায়নি কে, তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেউ ধরা খেয়েছে। মৌতাসিম যুদ্ধের প্রথম থেকে সিরতে আছে এবং নিজেই যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে, এটা সিরতের সবাই জানত। অনেকেই তাকে দেখেছেও। নবী স্যার, সৌরভ, খান এরাও দাবি করে তারা মৌতাসেমকে দূর থেকে দেখেছে। কিন্তু গাদ্দাফী সিরতে আছে সিরতের লিবিয়ানরাও জীবনে কখনও কল্পনা করে নি।

দুপুর ঠিক একটার সময় আমি তালহাকে নিয়ে ক্যান্টিন এরিয়া থেকে বেরিয়া হসপিটাল এরিয়ার সামনে গেলাম। সেখানেই আহত এবং মৃত যোদ্ধাদের আনা হয়। তাদের কাছেই লেটেস্ট সংবাদ পাওয়া যায়। ঠিক যখন আমার ঘড়িতে একটা বাজার শব্দ হল, তখন হসপিটালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে, যে ওয়্যারলেসে কথা বলছিল, সে লাফিয়ে উঠে চিত্‍কার করে বলতে লাগল, শিদ্দেনা গাদ্দাফী! হামদুলিল্লাহ্, শিদ্দেনা গাদ্দাফী! অর্থাত্‍ গাদ্দাফীকে আমরা ধরেছি। উত্তেজনায় সে লাফাচ্ছিল, এর মধ্যই তার মুখ থেকে আরো জানা গেল, তাকে একজন কমান্ডার ওয়্যারলেসে এই মাত্র জানিয়েছে গাদ্দাফীকে রক্বম এতনীন থেকে ধরে ফেলা হয়েছে এবং তাকে এখন খামসিনের এই ক্যাম্পটার ভেতরেই নিয়ে আসা হচ্ছে। সাথে সাথে ডাক্তার-নার্স, যোদ্ধা, স্বেচ্ছাসেবী সবাই যে উল্লাস শুরু করল, সেটা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। কতজনে কোলাকুলি করতে লাগল, বিশ-ত্রিশজন সাথে সাথে মাটিতে সেজদায় পড়ে গেল। কয়েকজন হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল, আর কাঁদার মধ্যে মধ্যেই বলতে লাগল, হামদুলিল্লাহ্‌! হামদুলিল্লাহ্‌! হাউয়্যেলনা আত্‌তাগীয়া! অর্থাত,অত্যাচারীকে সরিয়েছি! কে কার সাথে কোলাকুলি করছে না, কোন হিসেব নেই। আমাদের সাথে জড়িয়ে ধরে কয়েকজন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। কেউ হয়তো, ছেলে হারিয়েছে, কেউ ভাই, কেউ বাবা। অনেকে গত আটমাস ধরেই ঘর ছেড়ে যুদ্ধে ময়দানে ময়দানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজ তাদের স্বপ্ন সফল হল!

মিনিট দশেকের মধ্যেই ফ্রন্ট তেকে সৈন্যরা ফিরে আসতে শুরু করল। এসেই তারা সব ধরনের অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আকাশের দিয়ে ফাঁকা ফায়ার করতে লাগল। এরা অনেকেই গাদ্দাফীকে ধরারর জায়গাটিতে উপস্থিত ছিল। একজন হেলমেট পরা সৈন্য (লিবিয়াতে এরকম হেলমেট পরা যোদ্ধা প্রায় দেখাই যায় না, বেশিরভাগই সাধারণ মানুষ, তাদের হেলমেট পরার অভ্যাস নেই) আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে কথা বলল। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম গাদ্দাফী হয়তো মেরে ফেলা হয়েছে। সে বলল, গাদ্দাফীকে একটা ড্রেনেজ সিস্টেমের পাইপের ভেতর থেকে চুল ধরে টেনে বের করা হয়, সে নিজে দেখেছে। সে হাসতে হাসতে বলল, গাদ্দাফী তার ভাষণে বলেছে আমাদেরকে দ্বার দ্বার (প্রতিটা দরজা), বেত বেত (প্রতিটা ঘর), জাংগা জাংগা (প্রতিটা ইঞ্চি) থেকে তার লোকেরা খুঁজে বের করবে। আর আমরা এখন তাকেই হোফরা হোফরা (গর্তে গর্তে) খুঁজে বের করেছি।

এর দশ মিনিট পরেই যোদ্ধাদের হাতে হাতে গাদ্দাফীকে ধরার ভিডিও দেখা যেতে লাগল। আমরা যখন হুমড়ি খেয়ে ভিডিওটা দেখার চেষ্টা করছি, তখন হঠাত লক্ষ করলাম একটা পিকআপ এরিয়াতে ঢুকল, তার সাথে সাথেই মেইন গেটটা বন্ধ করে দেওয়া হল। সবাই পিকআপটার পেছনে দৌড়াতে লাগল, আমরাও সাথে দৌড় দিলাম। পিকআপের পেছনে কেউ একজন শুয়ে আছে, যে একবার কাছে গিয়ে দেখছে সেই আর দাঁড়াচ্ছে না, মুখ বিকৃত করে ঘুরে চলে আসছে। এক সময় আমিও সামনে যাও্য়ার সুযোগ পেলাম। গিয়ে দেখি রক্তে ভেজা আধমরা একটা মানুষ। মরার পথেই, এখনও একটু হাত নাড়াচ্ছে। মুখটা ঢাকা ছিল, এক মুহূর্তের জন্য সরালো। ঠিক চিনতে পারলাম না, তবে সবাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এ হচ্ছে গাদ্দাফীর বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী, দীর্ঘকালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধান, আবুবকর ইউনূস জাবের। পাশেই হসপিটাল, কিন্তু কেউ চিকিত্‍সার নামও মুখে আনল না, যেভাবে পিকআপের পেছনে করে এনেছিল, সেভাবেই নিয়ে গেল। এভাবে করেই নাকি ২০০ কিমি দূরে অবস্থিত মিসরাতা পর্যন্ত নেওয়া হবে।

মানুষের উল্লাস কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ল। লাশ কয়জনেই সহ্য করতে পারে, হোক না সেটা চিরশত্রুর লাশ। বিশ মিনিটের মধ্যেই আরকটা গাড়ি এসে ঢুকল। এবার গাড়িটা যেখানে এস থামল, আমরা ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। তাই মানুষের ভীড় এসে পৌঁছানোর আগেই আমরা দেখতে পেলাম। লম্বা একটা শরীর, সবুজ প্লাস্টিক ক্লথ, যেগুলো সাধারণত কনস্ট্রাকশনের কাজে ব্যবহৃত হয়, তা দিয়ে ঢাকা। দেখেই আমার সন্দেহ হল এটা নিশ্চয়ই মৌতাসেম। কিছুক্ষণ পরেই শরীর থেকে প্লাস্টিক সরালো। সেই অবিকল মৌতাসেম। সুন্দর চেহারা, দাড়ি ভর্তি মুখ, কিছুটা শুকিয়ে গেছে। ঠিক গলার মধ্যে একটা গুলির ছিদ্র। জিন্সের প্যান্ট আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরনে, রক্তে আর বালিতে মাখামাখি জামাকাপড়। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম , পায়েও একটা গুলি খেয়েছে সে। বাকিরা বলল, পিঠেও নাকি একটা গুলির গর্ত আছে। মৌতাসেমকেও একইভাবে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল। বাতাসে যাতে প্লাস্টিক উড়ে না যায়, সেজন্য একটা লম্বা কাঠের টুকরা শরীর এবং মুখের উপরে ফেলে দিল একজন। মানুষ কুকুর-বিড়াল মারা গেলেও আরেকটু যত্নের সাথে লাশটা ফেলে দেয়।

গাদ্দাফীকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত এখানে আনা হল না। শোনা যেতে লাগল, গাদ্দাফীকে ঘটনাস্থলেই ক্ষিপ্ত যোদ্ধারা কিলিয়ে ঘুষিয়ে মেরে ফেলেছে। তার লাশ সিরত থেকে সরাসরি মিসরাতায় নিয়ে যাওয়া হবে। বিকেলের দিকে গাদ্দাফীকে ধরার এবং মারার পুরো ভিডিও দেখতে পেলাম। সে এক বর্বরতার দৃশ্য, অমানবিকতার দৃশ্য। গর্ত থেকে চুল ধরে টেনে তুলে মুখে অনবরত ঘুষি, চড় আর লাথির লাথি মারছে যোদ্ধারা, রক্তে ভেসে যাচ্ছে গাদ্দাফীর মুখের এক পাশ, সে অবস্থায়ই সে বলছে, হারাম 'আলেক, হারাম 'আলেক! কয়েকজন অবশ্য বলছিল মেরো না, একে জীবিত রাখতে হবে, কিন্তু কে শোনে কার কথা? যোদ্ধাদের মধ্যে প্রথম থেকেই গাদ্দাফীর বিরুদ্ধে যেরকম ক্ষোভ দেখছিলাম, তাতে গাদ্দাফীকে ধরতে পারলে যে সেখানেই মেরে ফেলা হবে, সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু সেই হত্যাকান্ড যে এরকম অমানবিক হবে, সেটা ভাবতে পারিনি।

গাদ্দাফীকে হত্যা করার জন্য অসংখ্যবার দেশের ভেতর এবং বাহির থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই প্রায় অলৌকিকভাবে সে বেঁচে গেছে। সর্বশেষ এই বছরও ন্যাটোর বোমায় তার ছেলে সাইফুল আরাব এবং তিন নাতি-নাতনী মারা গেছে, কিন্তু একই বাসায় থেকেও সে বেঁচে গেছে। গত একমাস ধরে সে রক্বম এতনীনেই ছিল। কিন্তু হাজার হাজার মিসাইলেও তার কিছু হয় নি। এমন কি, আজ সকালে সে যখন চল্লিশটা গাড়ির বহর নিয়ে সিরত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন ন্যাটোর বোমায় সেখানের ১৩টা গাড়ি বিধ্বস্ত হয়। এখানেও তার কিছু হয় নি। সে দৌড়ে বেরিয়ে পাইপের ভেতরে গিয়ে লুকায়। সম্ভবত তার নিয়তিই ছিল, এতো সহজে সে মরবে না। মানুষের লাথি-ঘুসি খেয়েই মরবে।

বিকালের দিক থেকেই সব সৈন্যরা একে একে সিরত থেকে ফিরে যেতে শুরু করল। কিন্তু এবার সিরতের দিতে যেতে লাগল সাধারণ পিকআপে করে অস্ত্র হাতের অন্যান্য মানুষ, দেখলেই বুঝা যায় এরা যুদ্ধ করে নি। এরা সম্ভবত যাচ্ছে সিরত লুটপাট করতে। ক্যাস্পের জিনিসপত্র গোছগাছ করা শুরু হয়ে গেল। জানলাম যুদ্ধ শেষ, তাই পরশুদিন সকালেই ক্যাম্প বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা নিজেরাও সিরতে ফিরে যাওয়ার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলাম।


... চলবে ...


বিঃদ্রঃ আগামী পর্বটাই শেষ পর্ব।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29500184 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29500184 2011-12-10 18:38:32
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৬ (সবচেয়ে ভয়ংকর পর্ব) সারাদিন প্রচন্ড যুদ্ধ চলল। সন্ধ্যার সময় যখন গোলাগুলির আওয়াজ কমে এল, তখন আমাদের বাসা থেকে ছয়-সাতশো মিটার দূরে অবস্থিত রমজান আংকেলদের এলাকা থেকে হঠাত আল্লাহু আকবার শ্লোগান শোনা যেতে লাগল। আমাদের বুকের মাঝে রক্ত যেন ছলকে উঠল। তারমানে কি বিদ্রোহীরা আরও এগিয়ে আসছে? যুদ্ধ কি শেষ হয়ে আসছে? মাগরিবের ওয়াক্তের প্রায় বিশ মিনিট পরে যুদ্ধ পুরাপুরি থামল এবং ঘরে আসার পর দীর্ঘ তিন সপ্তাহের মধ্যে এই দিন আমরা প্রথম কোন আজান শুনতে পেলাম। মাগরিব এবং এশার মধ্যবর্তী সময়টাতেও আল্লাহু আকবার শ্লোগান শোনা যেতে লাগল। বিদ্রোহীদের দুঃসাহস দেখে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম। কারণ আমাদের বাসার ঠিক পেছনেই তখনও গাদ্দাফী বাহিনী অবস্থান করছিল।

যদিও লিবিয়া যুদ্ধের দুই পক্ষই লিবিয়ান, দুই পক্ষই মুসলমান, তাই দুই পক্ষেরই আল্লাহু আকবার শ্লোগান দেওয়ার অধিকার আছে। বরং গাদ্দাফী বাহিনীর এই শ্লোগানটা আরও বেশি দেওয়ার কথা ছিল, কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী তাদের যুদ্ধটা হচ্ছে ক্রুসেড, ইহুদী-খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে গাদ্দাফী বাহিনীর একমাত্র শ্লোগান হচ্ছে "আল্লাহ্‌, মোয়াম্মার ওয়া লিবিয়া ওয়া বাস" অর্থাত্‍ "আল্লাহ্, মোয়াম্মার (গাদ্দাফী), অ্যান্ড লিবিয়া, দ্যাটস অল‌"। অপরদিকে বিদ্রোহীদের একমাত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দুই আঙ্গুল দিয়ে বিজয় সূচক ভি চিহ্ন প্রদর্শন করা এবং সেকেন্ডে সেকেন্ডে আল্লাহু আকবার বলা। ওরা অবশ্য দুই আঙ্গুল দেখানোর অর্থ অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে। বলে দুইটা আঙ্গুলের অর্থ হচ্ছে নাসর আও শুহাদা, অর্থাত বিজয় অথবা শাহাদাত।

১৬ই অক্টোবর ২০১১।
এদিন যুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেল। সকালের দিকে "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ" শোনা যাচ্ছিল, দুপুরের দিক থেকে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আবার হতাশ হয়ে পড়লাম। আর কতদিন দুই পক্ষের এরকম টম আ্যান্ড জেরী খেলা চলতে থাকবে? এদিকে আমাদের জমানো পানিও শেষ হয়ে আসছে। সাত দিন ধরে গোসল না করে আছি। বিকেলের দিকে সবাই মিলে আমিনুর আংকেলদের বাসায় গেলাম। সবারই একই কথা - এভাবে আর থাকা সম্ভব না। পানি শেষ হয়ে গেলে তো না খেয়েই মরতে হবে। একদিন দল বেঁধে বেরিয়ে পড়া উচিত। হাঁটতে হাঁটতে বিদ্রোহীদের এলাকায় গিয়ে পৌঁছতে পারলে ওরা একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই করবে। কিন্তু কোন সময় রওয়ানা দিব? এখন তো চব্বিশ ঘন্টাই গোলাগুলি হয়! তাছাড়া জায়গায় জায়গায় স্নাইপার লুকিয়ে আছে, মেশিনগান হাতে ওঁত পেতে আছে দুই পক্ষের যোদ্ধারাই। ইচ্ছে করে হয়তো গুলি করবে না, কিন্তু যদি দূর থেকে দেখে না চিনতে পেরে ভালোমতো যাচাই না করেই ভুল সন্দেহ করে গুলি করে দেয়? কারোই তো জানার কথা না, এই ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যেও এখানে এখনও কোন সিভিলিয়ান আটকে পড়ে আছে! কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই আমরা ঘরে ফিরে এলাম।

১৭ই অক্টোবর, ২০১১।
সিরত যুদ্ধের ঠিক একমাস পূর্ণ হল।
আর শুরু হল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দিনটি।

সকাল নয়টা
নাস্তা সেরেই আমি প্রতিদিনের মতো একবার দরজাটা খুলে বাইরের দিকে উঁকি দিয়েই দেখতে পেলাম গাদ্দাফী বাহিনীর এক নিগ্রো সৈন্য আ'তেফের বাড়ির ভিতর ঢুকছে। আমাকে দেখার আগেই আমি তাড়িতাড়ি দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে গেলাম।

সকাল সাড়ে নয়টা
আব্বু বলল, যে হারে প্রতিদিন মিসাইল এসে পড়ছে, তাতে বাইরের কাঠের দেয়াল আর টিনের ছাউনির তৈরি স্টোররুমটার উপরে যদি একটা এসে পড়ে, তাহলে সেটা তো ধ্বংস হবেই, সেখানে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা আমাদের কয়েক হাজার দিনার, স্বর্ণ-গয়না সহ যাবতীয় সম্পত্তি সব লন্ডভন্ড হয়ে যাবে। তাই সেগুলো সেখান থেকে তুলে এনে ঘরের ভেতরে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা উচিত। আমি খুব একটা রাজি ছিলাম না, কারণ ঘরের ভেতরের ঢালাই ভাঙ্গা, নতুন করে ঢালাই দেওয়া বেশ সময়ের ব্যাপার, প্রচন্ড শব্দ হবে, তাছাড়া নতুন ঢালাইয়ের রং পৃথকভাবে চেনা যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম। আব্বু গর্ত করা শুরু করল। আমরা কিছু কাঠ আর একটা হাতুড়ি-বাটাল এনে পাশে রাখলাম, যেন গাদ্দাফী বাহিনী শব্দ শুনে দেখতে আসলে যেন বলতে পারি, আমরা লাকড়ির চুলায় রান্না করার জন্য কাঠ ফাঁড়ছি।

এদিন সকাল থেকেই যুদ্ধের শব্দে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। আমাদের বাসার তিনদিকে তিনটা মেশিনগান ফিট করে গাদ্দাফী বাহিনী নিয়মিত ফায়ার করত, তারমধ্যে একটা ছিল আমাদের বাসা থেকে ত্রিশ-চল্লিশ মিটার দূরে, ঠিক মুক্তাদের বাসার অপরদিকের বাড়িটার দোতলা। এদিন সকালে কিছুক্ষণ সেখান থেকে ফায়ার চললেও হঠাত করে বন্ধ হয়ে গেল। অন্য দুটো অবশ্য থেমে থেমে চলতে লাগল, কিন্তু আমার সন্দেহ হতে লাগল সেগুলোর অবস্থানও ক্রমাগত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে হঠাত হঠাত থেমে থেমে ঠাশ, ঠাশ করে সিঙ্গেল কতগুলো নতুন ধরনের গুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। ধরে নিলাম এগুলোই হচ্ছে স্নাইপারদের গুলির আওয়াজ।

বেলা এগারোটা
আব্বুর কাজ মোটামুটি শেষ হয়ে গেল। আব্বু জায়গাটার উপরে ছোট একটা চৌপায়া টুল রেখে সেটার উপর কতগুলো চালের বস্তা রেখে দিল। এবার কিছুটা নিশ্চিত, তবে কেউ যদি নিচে উঁকি দেয় তাহলে মাটির রং-এর পার্থক্য বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হবে না।

বেলা সাড়ে এগারোটা
কাজ শেষ হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই আমাদের বাসা থেকে একটু পশ্চিমে যেখানে সুদানী, মৌরতানীসহ বিভিন্ন নিগ্রো ব্যাচেলরদের কয়েকটা মেস ছিল, সেদিক থেকে জোরে জোরে বেশ কিছু মানুষের আল্লাহু আকবার ধ্বনি পেতে লাগলাম। আমরা পুরাপুরি হতভম্ভ হয়ে গেলাম। আল জাজিরাতে শোনা বিদ্রোহীদের আল্লাহু আকবার শ্লোগান দেওয়ার স্টাইল এবং সুরের সাথে বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। অর্থাত লিবিয়া যুদ্ধের বিদ্রোহীরা রক্বম এতনীনে আমাদের বাসার মাত্র ৫০ মিটারের মধ্যে ঢুকে গেছে! কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? সকাল নয়টা বাজেও গাদ্দাফীর সৈন্যকে আ'তেফের বাসায় আমি নিজে দেখেছি! কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই শব্দ আরো এগিয়ে আসতে লাগল। উত্তেজনায় আমাদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। আমার রুমের ভেতর মাটিতে শুয়ে আমরা মেইন গেটের দিকে তাকিয়ে রইলাম। দরজার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় নিচর ফাঁকা দিয়ে একটা একটা করে নয়টা বুট গুণতে পারলাম। মাত্র নয়জন? নাকি আরো আছে? কিন্তু কথা হচ্ছে এতো দুঃসাহস এরা পেল কোথা থেকে? গাদ্দাফী বাহিনীকে আরো দুই সপ্তাহ আগেও, যখন এলাকাটা পুরা তাদের দখলে ছিল, তখনও দেখেছি পা টিপে টিপে নিঃশব্দে দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে হাটছে। আর এরা কিনা আজ এসেই এরকম বীরদর্পে রাস্তার মধ্যে দিয়ে চিতকার করে আল্লাহু আকবার শ্লোগান দিয়ে হাঁটছে!

দশ মিনিট পরে, আমাদের বাসার পূর্ব দিকের রাস্তা, যেদিকে গাদ্দাফী বাহিনীর মূল ঘাঁটি, সেদিক থেকেও আল্লাহু আকবার ধ্বনি আসতে লাগল। আমার সন্দেহ হতে লাগল এরা কি আসলেই বিদ্রোহী, নাকি গাদ্দাফী বাহিনীর নতুন কোন চাল? কিছুক্ষণ পর সুদানী মেসগুলোর দিক থেকে মানুষের চেঁচামেচির আওয়াজ আসতে লাগল। কান পেতে শোনার চেষ্টা করে যতটুকু বুঝতে পারলাম, একজন আরেকজনকে ধমকে জিজ্ঞেস করছে, অস্ত্র কোথায় রেখেছ? গতকাল কোথায় ছিলে? এখানে কি কর? বুঝতে পারলাম সম্ভবত কোন মার্সেনারী ধরা পড়েছে, নয়তো কোন নিরীহ নিগ্রোকে সন্দেহ করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এর প্রায় সাথে সাথেই মুক্তাদের বাসার সামনে থেকেও চিতকার চেঁচামেঁচির শব্দ কানে আসতে লাগল।

দুপুর বারোটা
আমাদের বাসার ঠিক সামনে থেকে ছয় সাতজন বিদ্রোহী যোদ্ধার কথাবর্তা আমাদের কানে আসতে লাগল। শুনলাম একজন বলছে, ছাউয়ের ছাউয়ের! অর্থাত, ছবি তোল, ছবি তোল! এর পরপরই শুনলাম আরেকজন বলছে, মাত্ দির্‌শ জাহমা, কুল এতনীন খোশ বুইউত। অর্থাত, ভীড় করো না, প্রতি দুইজন করে বাড়িগুলোতে ঢুক। আমি একবার ভাবলাম আব্বুকে বলি, আমরা আল্লাহু আকবার শ্লোগান দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে বলি আমাদেরকে উদ্ধার কর, তাহলে আশা করা যায় কোন একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক সাহস হল না। যদি দরজা খুলছে দেখেই বিদ্রোহীদের কোন স্নাইপার শূট করে দেয়? অথবা যদি তারা আমাদেরকে উদ্ধার না করে এখানেই রেখে চলে যায় এবং আমাদের বের হওয়ার দৃশ্যটা যদি গাদ্দাফী বাহিনী দেখে থাকে, তাহলে পরদিন আমাদের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা কে দিবে?

দুপুর সাড়ে বারোটা
বুড়ীর বাড়ির দেয়াল টপকে কে যেন ভেতরে ঢুকল। প্রায় সাথে সাথে বুড়ীর বাড়ি থেকে আমাদের বাসায় ঢুকার যে কাঠের গেট, সেটাতে লাথির পর লাথির এসে পড়তে লাগল। আতংকে কয়েক সেকেন্ড আমরা কেউ নড়তে পারলাম না। তারপর আমি সংবিত ফিরে পেয়ে লাফিয়ে উঠলাম। আব্বুকে বললাম, যাই দরজা খুলে দেই। নাহলে দরজা ভেঙ্গে ঢুকতে হলে ওরা আরো ক্ষেপে যাবে। আব্বু আমাকে যেতে না দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, সাদিক, অ্যাহনা বাংলাদেশী। অর্থাত, বন্ধু, আমরা বাংলাদেশী। যোদ্ধাদের লাথি দেওয়া এক মুহূর্তের জন্যও থামল না। সেই অবস্থাতেই চিতকার করে বলতে লাগল, তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বেরিয়ে আস, তাড়াতাড়ি! আব্বু দরজা খুলে দিল। পেছনেই আমরা সবাই - আমি, তালহা, শাওন ভাইয়া। রাইফেল উঁচিয়ে ভেতরে ঢুকল দুই যোদ্ধা - দুজনের চেহারাই একই রকম, সম্ভবত দুই ভাই - ইয়া লম্বা-চওড়া, মুখে তালেবান স্টাইলের লম্বা দাড়ি। চেহারা দেখেই আমি হজম হয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকেই দুজনে চিতকার করে বলতে লাগল, বের হও, এক্ষুণি বের হও! আমরা আমাদের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করলাম, তারা কোন কথাই শুনল না। জিজ্ঞেস করতে লাগল আর কে আছে সাথে, অস্ত্র কোথায়? একজন ঘরে ঢুকে চট করে ঘরটা চেক করে নিল। আরেকজন আব্বুর আর আমার হাত শুঁকে দেখল বারুদের গন্ধ পাওয়া যায় কি না। যখন কিছুটা বুঝাতে পারলাম আমরা একেবারেই সাধারণ মানুষ, তখন একজন বলতে লাগল, তোমরা কি পাগল? এই অবস্থার মধ্যে কেউ ঘরে থাকে? তাড়াতাড়ি বের হও!

আমরা খালি হাতে শুধু স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে যোদ্ধা দুইজনের সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। ওমর ক্বাসেমদের বাসার সামনে এসে দেখি বিশ-পঁচিশ জনের একটা গ্রুপ দাঁড়িয়ে-বসে অপেক্ষা করছে। প্রায় সবাই-ই ইয়ং বয়সী। সবার চেহারাই সাধারণ, আল-ক্বায়েদার মত না। আমার সাহস অনেকটাই ফিরে এল। ভয়ের পরিবর্তে বরং আনন্দ হতে লাগল। অবশেষে যুদ্ধ বোধহয় শেষ হতে যাচ্ছে! কয়েক জন সিগারেট খাচ্ছে, জুস খাচ্ছে, একজন আবার ভিডিও-ও করছে। আমাদেরকে দেখেই সবাইআল্লাহু-আকবার আল্লাহু-আকবার শ্লোগান দেওয়া শুরু করল। আমরাও দুই আঙ্গুল দেখিয়ে তাদের সাথে সুর মেলালাম। কয়েকজনে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলতে লাগল, বাঙ্গালা! মিয়া মিয়া! অর্থাত, বাংগালিরা, তোমরা ভালো। দুয়েকজন আমাদের দিকে ছুটে এল। এলাকার কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। একজন জিজ্ঞেস করল, গাদ্দাফী বাহিনী কোথায় কোথায় আছে? আমরা একবারে নিঁখুত বর্ণনা দিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু গ্রুপ কমান্ডার, দাড়ি এবং চশমাওয়ালা ওয়্যারলেস হাতে থাকা লোকটা বলল, থাক ছেড়ে দেও। বেচারারা বাংলাদেশী, নিরীহ মানুষ, কিছু জানে না।

বিদ্রোহীদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম আমাদেরকে এই মুহূর্তে ঘরে থাকতে দিবে না, পাশেই কোথাও নিয়ে যাবে। আব্বু সাহস করে বলে ফেলল, আমাদের সাথে কোন কাগজপত্র নেই, অন্তত আইডি কার্ডগুলো বাসা থেকে নিয়ে আসি? গাদ্দাফী বাহিনীর অসহযোগিতা দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, ভাবিনি রাজি হবে, কিন্তু ঠিকই রাজি হয়ে গেল। ছয় সাত জনের একটা দল এল আমাদের সাথে। আমরা আইডি কার্ডগুলো নিয়ে নিলাম। আব্বু আমাকে বলল, আমার ট্রাংকে থাকা দেশের ব্যাংকের কাগজপত্র গুলো বের করে সাথে নিয়ে নিতে। আমি মাত্র বের করে পাশে খাটের উপর রাখলাম, এমন সময় একজন যোদ্ধা আমাকে ডেকে নিয়ে নিয়ে গেল, তারা কামালের মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা আরপিজিটা খুঁজে পেয়ে গেছে। আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল, এটা কার অস্ত্র, আর কোথায় কোথায় লুকানো আছে? আব্বু করলা গাছের উপরে লুকিয়ে রাখা রাইফেলটাও দেখিয়ে দিল। এরমধ্যে আরেকজন গিয়ে বুড়ীর বাড়ির মাটির নিচ থেকে আরেকটা রাইফেল তুলে নিয়ে এল। এদের চোখে বোধহয় জাদু আছে! আমরাও জানতাম না যে এখানে কিছু লুকানো আছে!

অস্ত্র খোঁজাখুঁজিতে সাহায্য করতে গিয়ে আমরা নিজেদের কাজ কিছুই করতে পারলাম না। কয়েকজন চেঁচামেঁচি শুরু করল, তাড়াতাড়ি কর! একজনে বলতে লাগল, টাকা-পয়সা আর মোবাইল সাথে নিয়ে নাও। কিন্তু এত চেঁচামেচি আর টেনশনে আমাদের কারো মাথাই ঠিকমতো কাজ করছিল না। আমার ট্রাংকের ভেতর ৭০০ দিনার (৩৫০০০ টাকা) ছিল, আমি ট্রাংক খুলে যখন টাকা বের করছি তখন দেখি আমার চারপাশে চারজন অস্ত্রধারী যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। বের করলে এখনই যদি থাবা দিয়ে নিয়ে যায়, তাহলে? আমি তাই অন্যান্য কিছু কাগজপত্র সহ টাকাগুলো বইয়ের তাকের খাতা-বইয়ের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম। ততক্ষণে আবারও চিতকার শুরু হয়ে গেল, তাড়াতাড়ি! আমরা বেরিয়ে এলাম। কেউই কিছু নিতে পারে নি। একমাত্র তালহা দুটো সাইডব্যাগ নিয়েছে, কী আছে সেগুলোর ভিতর, কে জানে? তালহা একটু ছোট বলে কেউ তাকে বিরক্ত করে নি, তার মাথাই সবচেয়ে ঠান্ড ছিল। দেখছিলাম উল্টো সে-ই বিদ্রোহীদেরকে জিজ্ঞেস করছে, তোমাদের আসতে এতো দেরী হল কেন? অন্যান্য ফ্রন্টের কী অবস্থা? বেন-ওয়ালিদ দখল করতে পেরেছ? সাইফুল ইসলামকে ধরতে পেরেছ? বিদ্রোহীরাও দেখি তার সবগুলো প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাবও দিচ্ছে!

বিদ্রোহীরা আমাদেরকে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল। ঘরের দরজাগুলো বন্ধ করলাম, কিন্তু মেইন গেটটা বন্ধ করতে নিষেধ করল। দুইজন যোদ্ধা আমাদের সাথে সাথে চলল আমাদেরকে নিরাপদে কোথাও পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তারা বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল আর কোন ফ্যামিলি এলাকায় আটকে আছে কি না? আমরা মুক্তাদের বাসাটা দেখালাম, কিন্তু বাসাটা খালি। কেউই কোন উত্তর দিতে পারল না। একজন বলল, চিন্তা করো না, হয়তো অন্য গ্রুপ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। বুঝলাম এরা অনেকগুলো প্রুপ একইসাথে প্রতিটা অলিতে গলিতে ঢুকেছে। আরেকটু সামনে গিয়ে এর প্রমাণ পেলাম। ইশতেইলাদের বাড়ির সামনে আরো বিশ-ত্রিশজন, আরেকটু সামনে আরো দশ-পনেরো জন - এরকম প্রতিটা গলিতেই বিদ্রোহীরা ভর্তি। শুধু এই এলাকার ভেতরেই অন্তত দুই-তিনশ বিদ্রোহী।

আজ গোলাগুলি শুধু একদিক থেকেই আসছিল - গাদ্দাফী বাহিনীর দিক থেকে। তারা অনেক দূর থেকে গুলি করছিল, মাঝে মাঝে রকেটও মারছি। সেগুলো এসে আশেপাশেই পড়ছিল। তাই আমাদেরকে মাথা নিচু করে দৌড়ে দৌড়ে যেতে হচ্ছিল। প্রতিটা বিপজ্জনক গলি বা রাস্তা পার হওয়ার আগে যোদ্ধা দুজন আমাদেরকে থামিয়ে দিচ্ছিল, তারপর ওয়ান, টু, থ্রি বলে আমাদেরকে নিয়ে দৌড়ে পার হচ্ছিল। রাস্তায় যতগুলো গ্রুপের সাথে দেখা হচ্ছিল, সবগুলো গ্রুপের ইয়ং বয়সী ছেলেরা, যারা সম্ভবত যুদ্ধের আগে ভার্সিটির ছাত্র ছিল, আমাদেরকে লক্ষ করে ইংরেজীতে বলছিল, ইউ আর নাউ ইন সেইফ জোন! অথবা, কাম অন, ইউ আর ফ্রি নাউ! অথবা, ডোন্ট অরি, নো বডি ইজ গোয়িং টু হার্ট ইউ! কিন্তু এরকম মুহূর্তে শান্ত থাকা কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব না। মাথার উপর দিয়ে শাঁই শাঁই করে গুলি চলছে, আর আমরা মাথা নিচু করে দৌড়াচ্ছি। আব্বু এমনিতে খুবই শক্ত ধরনের মানুষ, কিন্তু সম্ভবত বয়স হয়েছে বলেই বিদ্রোহীরা ঘরে ঢুকার পর থেকেই লক্ষ করছিরাম আব্বু পুরাপুরি ঘাবড়ে গেছে। আশপাশ থেকে কেউ একটা কথা বলছে, আব্বু সাথে সাথে চমকে উঠে তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। তারাও অবশ্য বুঝতে পারছিল। তাই বারবার বলছিল, ভয় পাচ্ছ কেন, আমরা তোমাদেরকে বাঁচানোর জন্যই এসেছি। তোমরাও মুসলিম, আমরাও মুসলিম।

একটা লম্বা গলির সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। একপাশের দেয়ালটা খুবই নিঁচু, মাত্র কোমর পর্যন্ত। আর পেছন দিয়ে অনেক দুর পর্যন্ত ফাঁকা। রাস্তাটাও এবড়ো-থেবড়ো। মাথা অস্বাভাবিকভাবে নুঁইয়ে দ্রুত দৌড়াতে হচ্ছিল। আব্বুর মেরুদন্ডে একটা অপারেশন করতে হয়েছিল বছরখানেক আগে, এমনিতেই দৌড়াতে পারে না, এখানে দৌড়াতে গিয়ে মারাত্মক একটা আছাড়া খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে আব্বুর নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়ে গেল। একেবারে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, যে ভয়াবহ মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে, ব্রেইনে না এফেক্ট করে! যোদ্ধা দুজনও ফিরে এল, জিজ্ঞেস করল গুলি খেয়েছে কি না? আমি বললাম না, শুধু পড়ে গেছে আর ভয় পেয়ে গেছে। আব্বুকে উঠিয়ে আমি ধরে ধরে নিতে লাগলাম আর স্বান্তনা দিতে লাগলাম।

প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্য দিয়ে মাথা নিচু করে দৌড়ে পালাচ্ছি আমরা। নীল শার্ট পরা আমি, লাল টি শার্ট পরা তালহা, সাদা শার্ট পরা আব্বু আর তার পাশে শাওন ভাইয়া। (ম্যাপে ৮ নম্বর জায়গায়)


এবার সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ। বিন হাম্মাল মসজিদের সামনে যে উঁচু ইলেক্ট্রিক্যাল অফিস, তার আড়ালে থোওয়ারদের (বিপ্লবীদের) মূল ঘাঁটি, আর অলি-গলির ভেতর দিয়ে আমরা এসে উপস্থিত হয়েছি তার সামনের মেইন রোডের অপর পাশে। এই মেইন রোড ধরে পূর্বদিকে কয়েকশো মিটার সামনেই কয়েকটা ট্রাক আড়াআড়ি ফেলে দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা, সেই ব্যারিকেডের ওপাশ থেকে গাদ্দাফী বাহিনী বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে চলছে। আমরা দেখতে পারছি গাদ্দাফী বাহিনীর বুলেটগুলো এসে ইলিক্ট্রিক্যাল অফিসের বিল্ডিংয়ে এসে বিল্ডিংটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। মাথার উপর দিয়ে শিস কেটে উড়ে চলে যাচ্ছে, কারেন্টের পিলার, রাস্তার লাইটপোস্টে এসে বাড়ি খাচ্ছে, আশেপাশে মাটিতেও এসে পড়ছে। এই অবস্থার মধ্য দিয়েই আমাদের রাস্তাটা পার হতে হবে।

আমরা রাস্তার ওপাশে এসে দাঁড়াতেই উল্টোপাশের বিল্ডিংয়ের আড়াল থেকে কানে হেভী এয়ারফোন লাগানো একটা ছেলে বেরিয়ে এসে মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে ট্রাকগুলো লক্ষ করে একটা আরপিজি মেরে আবার ধীরস্থির ভাবে আড়ালে চলে গেল। সাথে সাথে প্রচন্ড শব্দ আর ধোঁয়ায় চারদিক ভরে গেল। তার সাথে সথেই আরেকজন একটা লাইট মেশিন গান নিয়ে আড়াল থেকে বের হল। তার পেছনে দুজন দাঁড়িয়ে রইল মেশিনগানের বেল্ট ধরে। বেরিয়েই সে মেশিনগান দিয়ে কভারিং ফায়ার করা শুরু করল আর সাথে সাথে ওপাশ থেকে বাকিরা আমাদেরকে ইশারা করল রাস্তা পার হওয়ার জন্য। তালহা একটু ছোট, তাই একজন জন যোদ্ধা তালহার হাত ধরে দৌড়ানো শুরু করল। গুলি আসছিল বাম দিক থেকে, এই যোদ্ধা নিজে দাঁড়ালো বাম দিকে আর তালহাকে রাখল ডান পাশে। গুলি খেলে নিজে খাবে, তবুও আমাদেরকে রক্ষা করবে।

মেশিনগানোর কান ফাটানো ফায়ারিং-এর কভারে আমরা দৌড়ানো শুরু করলাম। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। রাস্তা যে এতো চওড়া হয়, সেটা জীবনে কখনও বুঝতে পারি নি। পায়ের নিচে লক্ষ লক্ষ বুলেটের খোসা, পা পিছলে পিছলে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে আমরা যেন অনন্তকাল ধরে দৌড়াচ্ছি আর দৌড়াচ্ছি, রাস্তা আর শেষ হচ্ছে না। সবাই দৌড়ে পার হয়ে গেল কিন্তু আব্বু দৌড়াতে পারছিল না। আমি আব্বুকে ধরে ধরে পার করতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম। রাস্তা তখনও পাঁচ-ছয় মিটার বাকি, আর এমন সময় গুলির বেল্ট গেল শেষ হয়ে! আমার মনে হতে লাগল এই বুঝি আমার জীবনের শেষ মুহূর্ত! মনে মনে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু পড়তে পড়তে অবশেষে নিরাপদেই জায়গাটা পার হয়ে এলাম।

হিরণ ভাইয়ের মেয়ে (ডানে) এবং আমিনুর আংকেলের মেয়ে মুক্তাকে (বামে) কোলে করে রাস্তা পার করে দিচ্ছে বিদ্রোহীরা। (ম্যাপে ৯ নম্বর রাস্তাটা)। লক্ষ করুন, গুলি আসছে ডান দিক থেকে, তাই যোদ্ধা দুজনই বাচ্চাদুটোকে বামপাশে কোলে নিয়েছে। এই একই রাস্তা দিয়ে এর দশ মিনিট পরে আমরাও একইভাবে দৌড়ে রাস্তাটা পার হয়েছি।


রাস্তা পার হয়ে এসে থামতেই দেখি শত শত গাড়ি, হাজার হাজার যোদ্ধা, অ্যাম্বুলেন্স, খাবারের গাড়ি, কোন জিনিসের অভাব এই পাশে নেই। চশমা পরা একটা ডাক্তার আমার দিকে ছুটে এল। জিজ্ঞেস করতে লাগল আব্বুর কি হয়েছে? কোন চিকিত্সা লাগবে কি না? বললাম শুধু নার্ভাস হয়ে গেছে। সে জবাব দিল, ভয়ের কিছু নেই। ইউ আর কমপ্লিটলি সেইফ নাউ। উই উইল লুক আফটার ইউ। কয়েকজনে আমাদেরকে ধরে খাবারের গাড়ির দিকে নিয়ে গেল। হাতে তুলে দিতে লাগল প্যাকিং করা খাবার, ঠান্ডা পানির বোতল, জুসের প্যাকেট, দুধের প্যাকেট, যার কোনটাই গত দুই মাস ধরে আমরা চোখে দেখি নি। মনে হতে লাগল রাস্তার ওপাশটা যেন জাহান্নাম, মধ্যের রাস্তাটা যেন পুল সিরাত, সেটা পাড়ি দিয়ে আমরা যেন জান্নাতে এসে পৌঁছেছি। খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম এরপর আমাদেরকে কোথায় নেওয়া হবে সেই সিদ্ধান্তের জন্য।


... চলবে ...


ম্যাপ। ১ নম্বর রমজান আংকেলদের এলাকা, ২ নম্বর সুদানীদের মেস, ৩ আমাদের বাসা, ৪ ওমর ক্বাসেমদের বাসা, ৫ মুক্তাদের বাসা, ৬ ইশতেইলাদের বাসা, ৭ আব্বু যেখানে আছাড় খেয়েছে, ৮ আমাদের ছবিটা যেখানে তোলা হয়েছে, ৯ সেই ভয়াবহ রাস্তাটা, ১০ সেইফ জোন, ১১ ইলেক্ট্রিক্যাল অফিস, ১৩ যে ট্রাকগুলোর আড়াল থেকে গাদ্দাফী বাহিনী ফায়ার করছিল।


অনেকটা এভাবেই আমাদেরকে কভারিং ফায়ার দেওয়া হয়েছে


অনেকটা এভাবেই আরপিজি মেরে আমাদের রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে (এই ছবি ম্যাপের ১২ নম্বর জায়গার)


একসাথে এতো অস্ত্রধারী বিদ্রোহী দেখে আতংকিত হয়ে কান্নাকাটি শুরু করেছে হিরণ ভাই এবং ভাবী। (ম্যাপে ১০ নম্বর জায়গায়, ইলেক্ট্রিক্যাল অফিসের সামনে)। তাদের গায়ের জামা ভেজা কারণ তাদের আতংকিত অবস্থা দেখে বিদ্রোহীরা তাদের মাথা পানি দিয়ে ধুইয়ে দিয়েছে। চিত্রে পাশের বৃদ্ধ তাদেরকে সান্তনা দিচ্ছে। এই বৃদ্ধই আমাদেরকে খাবার দিয়েছে। এই ছবিটা ১৮ই অক্টোবর তারিখে দৈনিক প্রথম আলো এবং যুগান্তরে প্রকাশিত হয়।


প্রথম আলোতে প্রকাশিত ছবি


যুগান্তরে প্রকাশিত ছবি



রাস্তা পার হওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছে খান, কোলে মুক্তা, হিরণ ভাই, হিরণ ভাবী। তাদের হাতে বিদ্রোহীদের দেওয়া খাবারের কিছু অংশ।


আমাদেরকে উদ্ধারের পরপরই আমাদের বাসার আরেকটু সামনের যুদ্ধ। এই জায়গার যুদ্ধে চারজন বিদ্রোহী মারা যায় এবং বেশ কয়জন আহত হয়। (ম্যাপে ১৪ নম্বর, রাস্তাটার ওপারেই গাদ্দাফী বাহিনীর মূল ঘাঁটি)


আমাদেরকে উদ্ধারের পরপরই আমাদের বাসার আরেকটু সামনের যুদ্ধ। এই জায়গার যুদ্ধে চারজন বিদ্রোহী মারা যায় এবং বেশ কয়জন আহত হয়। (ম্যাপে ১৪ নম্বর, রাস্তাটার ওপারেই গাদ্দাফী বাহিনীর মূল ঘাঁটি)


আমাদেরকে উদ্ধারের পরপরই আমাদের বাসার আরেকটু সামনের যুদ্ধে গুলি খেয়েছে এক বিদ্রোহী সেনা। এই জায়গার যুদ্ধে চারজন বিদ্রোহী মারা যায় এবং বেশ কয়জন আহত হয়। (ম্যাপে ১৪ নম্বর, রাস্তাটার ওপারেই গাদ্দাফী বাহিনীর মূল ঘাঁটি)

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29499505 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29499505 2011-12-09 17:09:40
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৫ লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৪

৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার। সকাল নয়টার দিকে আমরা শামীমদের বাসা থেকে বেরিয়ে আমাদের বাসার দিকে যাত্রা শুরু করলাম। রক্বম ওয়াহেদে অবস্থিত ন্যাটোর বোমায় বিদ্ধস্ত একটা স্কুল, বিদ্রোহীদের মিসাইলে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ওয়াহদা ব্যাংক এবং মেইন রোডের দুপাশে লুটপাট হওয়া দোকানপাটগুলো দেখতে দেখতে আমরা এগোচ্ছিলাম। রাস্তাগুলো গাড়ি চলার অযোগ্য। রকেট পড়ে জায়গায় জায়গায় রাস্তা গর্ত হয়ে আছে। হাইডলার রোড থেকে শুরু করে রক্বম ওয়াহেদ এবং রক্বম এতনীনের সামনের মেইড রোড এক থেকে দেড় ফিট পানির নিচে তলিয়ে আছে। সম্ভবত গোলার আঘাতে জায়গায় জায়গায় ফেটে যাওয়া পানির পাইপের কারণেই এ অবস্থা। বোঝা গেল, রক্বম তালাতা এবং সাওয়াবার দিকেই এখনও যা কিছু মানুষের বসবাস আছে, রক্বম ওয়াহেদ প্রায় ফাঁকা। আর রক্বম এতনীন যেন একটা নির্জন ভূতুড়ে নগরীর কংকাল। পুরো রক্বম এতনীনে মাত্র একটা ফ্যামিলি ছাড়া আর কাউকে দেখতে পেলাম না।

রাস্তার গার্ডরা এদিন আমাদের থামিয়ে পরিচয় এবং গন্তব্য জানতে চাইল, কিন্তু বাধা দিল না। বাসার কাছাকাছি পৌঁছে দেখতে পেলাম আমাদের বাসার পূর্বে যে রাস্তাটা সমুদ্রের পাড়ে উঠে গেছে, তার অপর পাশে মাতব্বর আংকেলদের বাসার ঠিক সামনে গাদ্দাফী বাহিনী বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বসে আছে। বোঝা গেল এই এলাকাতে এটাই গাদ্দাফী বাহিনীর মূল ঘাঁটি। সেখানে যে লিবিয়ান কমান্ডার, সে শাওন ভাইয়ার পূর্ব পরিচিত। সেও আমাদেরকে বাধা দিল না। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম মাতব্বর আংকেলরা আরো আগেই বাসা ছেড়ে চলে গেছে। বাসা পর্যন্ত যেতে আমাদের বেশ ঝামেলা হল। রাস্তাগুলো উঁচু করে মাটি ফেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া জায়গায় জায়গায় পানিও জমে আছে। অবশেষে বাসায় এসে পোঁছলাম। বাসার কাছাকাছি আসতেই দেখি আমাদের মিনি বিড়ালটা আমাদেরকে দেখে পাগলের মতো মিঁয়াও মিঁয়াও চিত্‍কার করছে। দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরেও সে আমাদের বাসা ছেড়ে যায় নি।

এলাকার ভেতর দিয়ে আসার সময়ই লক্ষ করেছিলাম প্রতিটা বাড়ি খালি, কিন্তু বাড়িগুলোর দরজা-জানালা সব খোলা। তখন কারণটা বুঝতে পারিনি। আমাদের বাসায় ঢুকে দেখলাম বাসার সামনে যে উঠোনটা আছে, তার একপাশের দেয়াল ভাঙ্গা, অন্যপাশে একটা কাঠের দরজা ছিল বুড়ীর বাড়িতে যাওয়ার জন্য, সেটাও খোলা। স্পষ্টতই, গাদ্দাফীর যোদ্ধারা প্রতিটা বাসার ভেতরে ঢুকে নিজেদের প্রয়োজন মত দেয়ালগুলো ভেঙ্গে রাস্তা তৈরি করে নিয়েছে, যেন জরুরী অবস্থায় যেকোন দিক দিয়ে আসা যাওয়া করতে পারে। উঠানে মাটির চুলাটার পাশেই একটা করলা গাছ লাগানো ছিল, সেই গাছের চালার উপরে দেখলাম একটা কালাশনিকভ রাইফেল রাখা। নামালে কোন ঝামেলায় পড়ি, আব্বু তাই সেটাকে না নামিয়ে গাছের পাতাগুলো দিয়ে আরো ঢেকে ঢুকে রাখল।

বাসার অবস্থা কাহিল। ধুলাবালি আর বুলেটের খোসায় উঠান ভর্তি হয়ে আছে। সেগুলো পরিষ্কার করে তাড়াতাড়ি লাকড়ির চুলায় রান্না চড়িয়ে দিলাম, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে আর বাহিরে রান্না করা যাবে না। রান্নাবান্না সেরে পাশের মুক্তাদের বাসায় গেলাম তাদের খোঁজ নিতে। দেখলাম ওরা ভালোই আছে। মুক্তার আব্বা আমিনুর আংকেলের দুইজন বন্ধু খান এবং শাহীনও তাদের সাথে আছে। এছাড়া আরেকটু দূরে রাস্তার মুখে থাকত হিরণ ভাইয়ের ফ্যামিলি, তারাও মুক্তাদের বাসায় এসে উঠেছে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম নবী স্যাররা, রমজান আংকেলরা আর আলিম আংকেলরা সবাই সিরতের দক্ষিণে অবস্থিত গার্বিয়াত নামক এলাকায় গিয়ে উঠেছে। ঐ এলাকার অধিবাসীরা অধিকাংশই ফারজানী ক্বাবিলার, এবং তারা ভেতরে ভেতরে বিদ্রোহীদের পক্ষে আছে। কাজেই আশা করা যায়, ঐ এলাকায় যুদ্ধ হবে না এবং তারা নিরাপদেই থাকবে। সৌরভদের কথা কেউ বলতে পারল না। তারাও হয়তো গার্বিয়াতে গিয়ে থাকতে পারে, অথবা ইবনে সীনা হসপিটালের আবাসিক ভবনেও গিয়ে উঠতে পারে।

জাফরানের দিকে বেশ কদিন ধরে যুদ্ধ হয় নি, এদিনও হল না। তবে রক্বম তালাতার দিক থেকে সারাদিনই যুদ্ধের আওয়াজ পাওয়া যেতে লাগল। সারাদিন আমরা ঘরেই কাটালাম আর দেখলাম আশেপাশে গাদ্দাফীর সৈন্যরা হেঁটে হেঁটে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। মাতব্বর আংকেলের বাসার সামনে দেখা কমান্ডারটা লিবিয়ান হলেও এলাকার ভেতরে যেসব সৈন্য ঘুরছিল, তাদের অধিকাংশই নিগ্রো। হয়তো চাদ, নাইজার বা মৌরিতানিয়ার, অথবা তাওয়ার্গার আফ্রিকান বংশোদ্ভুত লিবিয়ান। তাদের অনেককেই দেখলাম টহল দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দরজা খোলা বাসার ভেতরে ঢুকছে এবং বস্তায় ভরে বিভিন্ন জিনিস ভরে নিয়ে যাচ্ছে।


শনিবারে সকাল থেকে রক্বম তালাতার দিক থেকে ভয়াবহ যুদ্ধের আওয়াজ আসতে লাগল। সারাদিন প্রচন্ড যুদ্ধ চলল। রবিবার বিকেলে আ'তেফ আর হামজা বাসায় ফিরল। জানাল রক্বম তালাতায় থাকা সম্ভব না। সেখানে জয়নবের বাবাদের সামনের বাসাতেই মিসাইল পড়েছে। সেই বাসার দেয়ালের ভাঙ্গা টুকরা জয়নবের বাবাদের বাসায় এসে ঢুকেছে। এছাড়া বিদ্রোহীরা সিরতবাসীকে আত্মসমর্পন করার নইলে সিরত ছেড়ে যাওয়ার জন্য ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছে। তাই বুড়ীরা এবং জয়নবের বাবারা সবাই আগামীকাল ভোরেই ঘর ছেড়ে গার্বিয়াতে তাদের এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠবে। আম্মু আর তিথিকে তারা তাদের সাথেই নিয়ে যাবে, কিন্তু গাড়িতে জায়গা হবে না বলে আমাদেরকে নিতে পারবে না। যদি পরে সুযোগ পায় তাহলে এসে আমাদেরকে নিয়ে যাবে। আ'তেফ আর হামজা যাওয়ার সময় বুড়ীর বাড়ির স্টোরের চাবি আমাদেরকে দিয়ে বলে গেল যুদ্ধ যখন চলবে না তখন সময় বুঝে আ'তেফের বাসা থেকে জামা-কাপড়, কার্পেট ইত্যাদি এনে স্টোরে রাখতে। আ'তেফের বাসাটা এই এলাকার সবচেয়ে বিলাসবহুল বাসার মধ্যে একটা। কিন্তু প্রথম দিকের গোলাগুলিতেই তার বাসার বিভিন্ন কাঁচের দেয়াল, জানালা ভেঙ্গে পড়ে গেছে, মূল দরজা ভেঙ্গে গেছে। তার ভয় যেকোন সময় একটা শেল এসে পড়লে ঘরে আগুন ধরে যেতে পারে। যাওয়ার সময় আমাদেরকে প্রয়োজনে স্টোর থেকে তেল-চিনি সহ বিভিন্ন খাবার জিনিস ব্যবহার করতেও বলে গেল।

পরদিন সোমবার থেকে জাফরানের দিকেও যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তবে যুদ্ধ শুধু বিকেল বেলাই হতো। সন্ধ্যার আগে আগে হঠাত প্রচন্ড আকার ধারণ করত, এরপর হঠাত করেই আবার থেমে যেত। সকালের দিকে আমরা আ'তেফের বাসায় গিয়ে তার কাপড়-চোপড়গুলো সরিয়ে আনতাম। কিন্তু দু'দিন না যেতেই একটা জিনিস লক্ষ করলাম, রাতের বেলা আ'তেফের বাসায় মানুষ ঢোকে। কারণ প্রতিদিন গিয়েই দেখি কিছু না কিছু জিনিস নেই। অবশ্য বেশির ভাগই খাবার-দাবার আর ছোটখাটো দামি জিনিস। টিভি, স্যাটেলাইট রিসিভার সহ দামি জিনিসগুলো বাঁচানোর জন্য একদিন আমি সেগুলো একটা রুমে ঢুকিয়ে সেই রুমটা লক করে তার চাবি বাথরুমে লুকিয়ে রাখলাম। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি হিতে-বিপরীত। সেই রুমের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে সব জিনিসপত্র উলোট-পালট করে তন্ন তন্ন করে তল্লাশী চালানো হয়েছে। রাতের বেলা কারেন্ট থাকে না, ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারের মধ্যেও প্রতিদিন কে ঢুকে সেটা একটা রহস্যই বটে! পরদিনই অবশ্য রহস্যের আংশিক সমাধান হল। সকালে গিয়ে দেখি আ'তেফের রান্নাঘরে একটা রকেট লঞ্চারের রকেটের প্যাকেট রাখা, একেবারে নতুন, এখনও খোলা হয়নি। সম্ভবত যে সৈন্যটা ঢুকেছিল সে তল্লাশী চালানোর জন্য প্যাকেটটা এখানে রেখে গিয়েছিল, পরে ভুলে গেছে। এদিন গিয়ে দেখি ফ্রিজের মধ্যে হাফ কেজি বাটারের যে প্যাকেটটা ছিল, সেটাও গায়েব। আমাদের ঘরে নাশতা করার কিছু নেই, আর গাদ্দাফীর সৈন্যরা কি না পাশের ঘরে ঢুকে মানুষের ঘর থেকে খাবার চুরি করে নিয়ে যায়! কাজেই এদিন আমরা আ'তেফের রান্নাঘর থেকে কফির বোতল, টুনা মাছ সহ টুকটাক যেসব খাবার ছিল, সেগুলো নিয়ে গেলাম। শুধু কিছু পেঁয়াজ-রসুন ছিল, সেগুলো নিলাম না। পরদিন গিয়ে দেখি সেগুলোও নেই।

ঘরে আমাদের জীবন প্রচন্ড একঘেঁয়েমির মধ্যে কাটতে লাগল। সকাল ছয়টা-সাতটার দিকে ঘুম থেকে উঠে লাকড়ির চুলায় রুটি বানানো শুরু করি। নাশতা খেয়ে সেরেই আবার ভাত আর তরকারি রান্না শুরু করে দেই। তরকারি বলতে গাছের পেঁপে, করলা আর ডাল। রান্না-বান্নার কাজ মূলত শাওন ভাইয়াই করে, আমি মাঝেমাঝে সাহায্য করি। দুপুরের খাওয়া শেষ হতে না হতেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আমরা সবাই ঘরের একেবারে মাঝখানে তিথির রুমটাতে মাটিতে ম্যাট্রেস বিছিয়ে তার উপরে বসে থাকি। আশেপাশে মিসাইল এসে পড়তে থাকে, মেশিনগানের একটানা শব্দে কান বন্ধ হয়ে আসতে থাকে। এর মধ্যে আমরা বসে বসে আল্লাহ‌্‌ আল্লাহ্‌ করতে থাকি। ঘর থেকে তো বের হতে পারিই না, ঘরের ভেতরও একটু জোরে কথা বলতে পারি না। কারণ আমাদের বাসার ঠিক সামনে থেকেই গাদ্দাফীর তিন-চারটা সৈন্য ফায়ার করতে থাকে। মাঝে মাঝে গুলি ভরার জন্য বুড়ীর গ্যারেজেও ঢুকে যায়। ছোট্ট একটা বাসার মধ্যে দিনের পর দিন বন্দীর মতো কাটানোটা অসহ্য হয়ে উঠে। মাঝে মাঝে মনে চায় ডাক ছেড়ে কাঁদি। প্রচন্ড একাকীত্বে হতাশ মানুষ কেন আত্মহত্যা করে, তার কিছুটা এখন অনুমান করতে পারি।

সন্ধ্যার দিকে যুদ্ধ থেমে যায়, কিন্তু শুরু হয় ন্যাটোর উড়াউড়ি। এরা যে কি জন্য উড়ে, কে জানে? ১৯শে মার্চ, যেদিন গাদ্দাফী বাহিনী শত শত ট্যাংক নিয়ে বেনগাজী ঢুকে পড়ছিল, সেদিন সেই ট্যাংকগুলো ধ্বংস করাই সম্ভবত ন্যাটোর একমাত্র কাজের কাজ ছিল। কিন্তু এরপর থেকে যত আক্রমণ করেছে, তার অধিকাংশই অপ্রয়োজনে। এপ্রিল মে'র দিকে তো বিদ্রোহীদের উপরও বেশ কয়েকবার ন্যাটো হামলা করেছে। সিরতে ন্যাটো যতগুলো হামলা করেছে, তার অধিকাংশই খালি জায়গায় অথবা বিভিন্ন আর্মি অফিসারের ফাঁকা বাড়িতে, অথবা এমন অস্ত্রভান্ডারে যেখান থেকে মাত্র কয়েকদিন আগে সব অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রোযার মাসে একদিন সিরতের একটা রেস্ট হাউজে গাদ্দাফীর দুই ছেলের পরিবার এসে উঠেছে, এরকম একটা গুজব শোনা গেল। সেদিন ন্যাটো ঐ এলাকায় লিফলেট ফেলল যেন সাধারণ মানুষ ঐ এলাকা ছেড়ে চলে যায়, ওখানে হামলা করা হবে। ঠিকই তার দুই দিন পর, যখন গাদ্দাফীল ছেলের পরিবার ঐ এলাকা ছেড়ে চলে গেল, ভেতরে রাখা অস্ত্র-শস্ত্র সরিয়ে ফেলা হল, তারপর ন্যাটো ওখানে বোমা মারল। ন্যাটোর মূল উদ্দেশ্য মনে হয় লিবিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ধ্বংস করা, যেন পশ্চিমা দেশগুলোই যুদ্ধের পরে রিকনস্ট্রাকশনের কাজগুলো পায় আর সেই সাথে লোক দেখানো বোমা মেরে যুদ্ধটাকে যথাসম্ভব দীর্ঘায়িত করা।

এই যেমন এখন সিরতে যে যুদ্ধটা চলছে, গাদ্দাফী বাহিনী অল্প কয়েকটা জায়গা থেকে মিসাইল মারছে। রক্বম তালাতায় শামীমদের বাসার পেছনের সেই গাছপালা ঢাকা বাড়িটা থেকে, আর রক্বম এতনীনে মাতব্বর আংকেলের বাসার সামনে থেকে। এছাড়া আরো কয়েকটা হাতে গোনা দোতলা বাড়ির ভেতর থেকে। আমরা আ'তেফের দোতলায় উঠে জানালা দিয়ে তাকালে দিনের বেলাতেও স্পষ্ট দেখতে পাই আগুনের গোলা ঠিক কোথা থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়ে পড়ছে। আর দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা উড়ে ন্যাটো সেটা দেখতে পায় না? এই কয়েকটা পয়েন্টে বোমা মারলেই যুদ্ধটা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু ন্যাটো এখানে না মেরে মারে অপ্রয়োজনীয় জায়গায়। তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, আফগানিস্থান, ইরাক আর পাকিস্তানে ন্যাটো যেরকম উল্টাপাল্টা সাধারণ জনগণের উপর আক্রমণ করে, লিবিয়াতে সেরকম করে নি। জুন মাসের দিকে ব্রেগায় একটা রেস্ট হাউজে ষোলজন ঈমামের উপর, জুলাইয়ে ত্রিপলীতে একটা বিল্ডিংয়ে ২২ জনের উপর, জিলিতনে আরেকটা পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে ৮৫ জনের উপর, এরকম পাঁচ-ছয়টা কেস ছাড়া বাকি সবগুলো মিলিটারিদের উপর এবং মিলিটারি সম্পর্কিত জায়গাতেই মেরেছে। ত্রিপলী দখল হওয়ার দিন পর্যন্ত লিবিয়াতে ন্যাটো মোট বোমা মেরেছে সাড়ে সাত হাজার। এর মধ্যে গোটা দশেক যদি সিভিলিয়ানদের উপর পড়ে, তবে ন্যাটোর বিশ্বব্যাপী ভূমিকার তুলনায় সেটাকে কমই বলতে হবে।

প্রথম সপ্তাহটা মোটামুটি একই রকম কাটল। দুপুরের পর যুদ্ধ শুরু হয়ে সন্ধ্যার দিকে থেমে যায়। কিন্তু ৭ অক্টোবর শুক্রবার থেকে রুটিন পরিবর্তন হয়ে গেল। এদিন ভোর ছয়টার সময় যুদ্ধ শুরু হয়ে সারাদিন চলল। এরপর থেকে প্রতিদিনই সকাল দশটার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়, সারাদিন চলে সন্ধ্যার দিকে শেষ হয়। এই গোলাগুলির মধ্যে লাকড়ির চুলায় রান্না করা অসম্ভব তাই আমরা বুড়ীর স্টোরে একটা অর্ধেক ভরা গ্যাস সিলিন্ডার পেলাম, সেটা এনে ব্যবহার করা শুরু করলাম। সারাদিন আমরা রান্নাবান্না ছাড়া বাকি পুরো সময়টা তিথির রুমে নিচে বসে থাকি। সন্ধ্যার পর শুধু এশার আজানের জন্য অপেক্ষা করি। আশেপাশের মসজিদগুলোদে পরিত্যাক্ত, তাই অনুমান করে আটটার দিকে নামাজ পড়ে খেয়েই শুয়ে পড়ি। আগে শুধু দিনেই যুদ্ধ হতো। কিন্তু এখন দু ঘন্টা ঘুমানোর পরেই মিসাইলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। রাত দশটা-এগারোটার দিকে একবার ঘন্টা খানেকের জন্য আবার রাত তিনটা-চারটার দিকে আরেকবার ঘন্টা খানেকের জন্য মিসাইল আক্রমণ শুরু হয়।

দিন যত এগোতে লাগল, যুদ্ধের তীব্রতা ততই বাড়তে লাগল। সারাদিন প্রচন্ড রকেট হামলা আর গোলাগুলির পর সন্ধ্যার সময় যখন থামে, তখন ওয়ালের উপর দিয়ে উঁকি মেরে দেখি পুরা রক্বম এতনীনে আগুনের ধোঁয়ার জন্য কিছু চোখে দেখা যাচ্ছে না। শব্দ শুনে অনুমান করছিলাম বিদ্রোহীরা সম্ভবত একদিকে হাইডলার আর অন্যদিকে বিন হাম্মাল মসজিদ পর্যন্ত ঢুকে গেছে। ন্যাটোর উপড়াউড়ি দেখে সেটা আরো পরিষ্কার বুঝা গেল। আগে ন্যাটো এতো উপর দিয়ে উড়ত যে দেখাই যেত না, কিন্তু এখন একেবারে পরিষ্কার দেখা যায়। আর এখন ঠিক আমাদের মাথার উপর দিয়েই, অর্থাত শুধু রক্বম এতনীন আর রক্বম ওয়াহেদের উপর দিয়েই বারবার ঘুরে ঘুরে উড়ে। কিন্তু কথা হচ্ছে মাত্র এই এতটুকু এলাকাই যদি দখল করা বাকি থাকে, তাহলে বিদ্রোহীরা এখনও দখল করতে পারছে না কেন? মূল যারা লিবিয়ান, তাদের অধিকাংশই পালিয়েছে। যুদ্ধ যারা করছে তাদের অধিকাংশই আফ্রিকান মোরতাজাক্বা (মার্সেনারি)। আমরা যতটুকু দেখছি, আমাদের এলাকাটায় গাদ্দাফীর সৈন্যের সংখ্যা খুব বেশি হলে পঞ্চাশ জন। পুরো সিরতে এই মুহূর্তে গাদ্দাফীর সৈন্য সংখ্যা খুব বেশি হলে তিনশ জন। এই কয়জনকে বিদ্রোহীরা হারাতে পারছে না! তবে কি এতোদিন ধরে যেগুলোকে আমরা গাদ্দাফীর মিডিয়ার প্রপাগান্ডা মনে করতাম, সেগুলোই আসলে সত্য। পশ্চিমা মিডিয়ার সংবাদগুলোই প্রপাগান্ডা? বিদ্রোহীরা আসলেই সংখ্যায় খুবই কম? মাত্র কয়েকশো? কিন্তু তাহলে মাত্র এক রাতের মধ্যে ত্রিপলী দখল করল কিভাবে? একই সাথে সিরত, সাবহা আর বেনওয়ালিদের মতো তিনটা শব্তিশালী শহর আক্রমণ করার মতো সাহস পেল কিভাবে? আমি কোন যুক্তি খুঁজে পাই না।

১০ তারিখের দিকে যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করল। এখন প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই যুদ্ধ চলে। কামালের বাসায় আগেই একদিন একটা রকেট পড়ে দুইটা রুম পরা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এদিন সন্ধ্যার সময় আ'তেফের বাড়িতেও দুইটা মিসাইল এসে ঢুকে একতলা-দোতলা দুটোকরই ধ্বংস করে দিল। প্রচন্ড শব্দে আর গরম বাতাসের ঝাপটায় আমরা কেঁপে উঠলাম। ঘরের ভেতর কুপি বাতি জ্বলছিল, সেটাও নিভে গেল। এই প্রথম আমাদের এতো কাছাকাছি মিসাইল পড়ল। মিসাইল যখন দূরে পড়ে, তখন পড়ার আগে কয়েক সেকেন্ড ধরে শোঁ করে বাতাস কেটে যাওয়ার একটা শব্দ শোনা যায়, এরপর ফাটার আওয়াজটা আসে। কিন্তু যখন একেবারে কাছে পড়ে, তখন শোঁ শব্দটা শুনা যায় না, কিছু বুঝে উঠার আগেই একেবারে হঠাত করেই প্রচন্ড শব্দে ফেটে পড়ে।

পরদিন ১১ তারিখ দুপুরে আমি আমার টিনের ছাদওয়ালা রুমটাতে বসেছিলাম। হঠাত উঠোনের ঠিক বাইরেই একটা রকেট এসে পড়ল, ধোঁয়ায় চারদিক ভরে গেল, রকেটের ভাঙ্গা লোহার টুকরাগুলো উঠানে এসে পড়তে লাগল। আমি একটা চিতকার করে লাফিয়ে তিথির রুমে গিয়ে ঢুকলাম। এর কিছুক্ষণ পরেই আশেপাশে একেবারে কাছেই আরো কয়েকটা মিসাইল এসে পড়ল, সেগুলো পড়ার সাথে সাথে ঘরের ছাদ আর ছাদে ঝুলানো সিলিং ফ্যান এমন ভাবে কাঁপতে লাগল, মনে হল যেন ছাদ ভেঙ্গে মাথার উপর এসে পড়বে। তারপর দিন ১২ তারিখে ঘুম থেকে উঠে দেখি লাইনে পানি নেই। হয়তো বিদ্রোহীরা লাইন কেটে দিয়েছি, অথবা মিসাইল পড়ে কোথাও পাইপ ফেটে গেছে। আশেপাশে পানি আছে কি না দেখার জন্য একটু বের হলাম, দেখি মুক্তাদের বাসার সামনে সালেম মেরোয়াহ্‌দের বাসার দোতলার বারান্দা ভেঙ্গে পড়ে আছে, মোহাম্মদের বাসার একপাশের দেয়াল ভেঙ্গে আছে। তার সামনে ওমর ক্বাসেমদের বাড়ির দোতলার ভেতরে আগুন জ্বলছে। আমার আরেকটু সামনে গিয়ে দেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু দেখি গাদ্দাফী বাহিনীর পনের-বিশ জন নিগ্রো সৈন্য লাইন ধরে দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে সামনের দিকে যাচ্ছে সম্ভবত কোন অ্যাটাক করার জন্য।

আশেপাশে বোমা পড়ার কম্পনে আমাদের বেডরুমের কাঠের জানালাটা প্রায় ভেঙ্গে যাচ্ছিল। দুপুরের দিকে আব্বু যখন সেটা ঠিক করছিল, তখন শব্দ শুনতে পেয়ে দুইজন সৈন্য দেয়াল টপকে আমাদের বাসায় ঢুকে গেল। দুজনই আমাদের দিকে রাইফেল তাক করে ধরে আছে। এলাকার লিবিয়ান যোদ্ধা হলে কথা ছিল না, তারা সবাই আমাদেরকে চিনে, কিন্তু এরা আফ্রিকান, জীবনে কখনো দেখিনি। তারাও আমাদেরকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, কি করছি, আর কে আছে, বিদ্রোহীদের দেখেছি কি না, ইত্যাদি। তাদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম বিদ্রোহীরা খুব কাছে এসে গেছে, রাতের বেলা তারা গোপনে এই এলাকাতেও ঢোকে। সৈন্য দুটো আমাদেরকে জিজ্ঞেস করল এলাকায় বাংলাদেশী আর কে আছে। আমরা মুক্তাদের বাসাটা দেখানোর জন্য হুট করে দরজা খুলতে যেতেই সে ধমকে উঠল আস্তে দরজা খোলার জন্য। তারপর নিজের হাতেই খুব ধীরে ধীরে দরজা খুলে একটু মুখ বের করে দুই পাশে উঁকি মারল। তারপর দেয়াল ঘেঁষে ঘেঁষে হেঁটে চলে যেতে লাগল। আমাদেরকে বলে গেল ঘর থেকে যেন বের না হই, আর যদি জেরদানদেরকে (ইঁদুরগুলোকে, অর্থাত বিদ্রোহীদেরকে) দেখি তাহলে যেন তাদেরকে জানাই।

দুপুরের দিকে হিরণ ভাই আমাদের বাসায় এল পানি আছে কি না দেখার জন্য। হিরণ ভাই জানাল সকালে সে তার বাসার সামনের বাগানে গিয়েছিল গাছ থেকে লাউ-টাউ কিছু পাওয়া যায় কি না, দেখতে। এমন সময় চার-পাঁচজন গাদ্দাফীর সৈন্য এসে তার গলার মধ্যে রাইফেল ধরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল, তার ঘর চেক করল। পরে যখন বুঝতে পারল যে সে সাধারণ মানুষ তখন ধাক্কা দিয়ে বলল, যেখানে ছিলা সেখানে যাও। আর যদি কখনো বাইরে দেখি সোজা গুলি করে দিব। হিরণ ভাই তখন বলল, ঘরে পানি নাই, তাছাড়া যেভাবে মিসাইল পড়ে, ঘরে থাকা সম্ভব না। সৈন্যগুলো বলল, সেটা আমরা জানি না। ঘরে ঢুকে বসে থাক। আমরা কিছু করতে পারব না।

১৩ তারিখ আমাদের বাসার দুই পাশের দরজার সামনে আরো দুটো মিসাইল পড়ল। লোহার তৈরি দুটো দরজাই গরম লোহার টুকরার আঘাতে ছিদ্র ছিদ্র হয়ে গেল। এদিন বুড়ির বাসার দেয়ালেও একটা রকেট এসে পড়ল, কিন্তু ফাটল না। মোহাম্মদের বাসার একপাশে আগেরদিন একটা পড়েছিল, এদিন উল্টাপাশেও একটা ১০৬ মিমি মিসাইল এসে পড়ল। বোমার আঘাতে মোহাম্মদের দুটো দরজাই ভেঙ্গে গেল। দেখার জন্য আমরা ভেতরে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি এর মধ্যেই কেউ এসে ম্যাট্রেস, কার্পেট, জামা-কাপড় উল্টেপাল্টে তল্লাশী চালিয়ে গেছে। কামালের বাসায় আগেই মিসাইল পড়েছিল। এদিন সেটা দেখতে গিয়ে দেখি সেখানে একইভাবে তল্লাশী চালানো হয়েছে। এছাড়া সেখানেও একটা আরপিজির রকেটের প্যাকেট দেখতে পেলাম। আ'তেফের বাসায় এদিন আর ঢুকতে পারলাম না। কারণ বাহির থেকেই বুঝতে পারলাম কেউ একজন ভেতরে আছে। আগে শুধু রাতের বেলাই আ'তেফের বাসায় ঢুকত, এখন দিনের বেলাও ঢুকে। বাসাটার সিঁড়িঘরে উঠলে পুরো এলাকাটা নজরে পড়ে। তাই সম্ভবত একজন স্নাইপার মাঝে মাঝে ওখানে ওঠে। এদিন বিকেলে আমার টিনের রুম ছিদ্র হয়ে একটা বুলেট ঢুকে ঘরের ভেতর পড়ল। ভাগ্য ভাল, ঐ মুহূর্তে কেউ ঐ রুমে ছিলাম না।

১৪ই অক্টোবর, ২০১১। আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। সারাদিন যুদ্ধ চলার পর এদিন রাত তিনটার দিকে হঠাত প্রচন্ড মিসাইল আক্রমণ শুরু হল। এবং সবগুলো মিসাইল একেবারে আমাদের ঘরের আশেপাশেই পড়ছে। শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে মিসাইলগুলো মারা হচ্ছে এক কিমি এরও কম দূর থেকে। একেকটা মিসাইল পড়ার সাথে সাথে পুরো ঘর ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে উঠছে। আর তার প্রায় সাথে সাথেই মিসাইলের ছোট টুকরাগুলো আমাদের ছাদে এবং উঠানে এসে পড়ছে। শুয়ে থাকা অসম্ভব, আমরা উঠে সিদ্ধান্ত নিলাম, হামজার নতুন তৈরি করা বাসায় গিয়ে ঢুকব। যে হারে মিসাইল আসছে, যেকোন মুহূর্তে আমাদের ঘরেও পড়তে পারে। আর একটা পড়লেই পুরানো আমলের বাড়ির ছাদ একেবারে ধসে যাবে। ঘুটঘুটে অন্ধকার, তাই আমরা কুপি বাতি জ্বালিয়ে একজন একজন করে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটা করে মিসাইল পড়ে, সাথে সাথে একজন করে দৌড়ে হামজার বাড়িতে ঢুকে যাই। আমরা হামজার বাড়িতে ঢুকার সাথে সাথেই গাদ্দাফী বাহিনী খুব কাছ থেকেই মেশিনগানের ফায়ার শুরু করল। আমরা প্রচন্ড ঘাবড়ে গেলাম। কারণ রাতের বেলা মিসাইল আক্রমণ নিয়মিত ঘটনা, কিন্তু মেশিনগানের ফায়ার এই প্রথম। আমাদের সন্দেহ হল, আমাদের কুপিবাতির আলো দূর থেকে দেখে ফেলে সন্দেহ করে বসে নি তো? মাটিতে বসে বসে আমরা মনে মনে দুরূদ পড়তে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহীদের দিক থেকেও পাল্টা ফায়ার শোনা যেতে লাগল। সাথে সাথে মনে হল রমজান আংকেলদের বাসার দিক থেকে বিরোধীদের চিতকার-চেঁচামেঁচির আওয়াজও শুনতে পাচ্ছি। বিদ্রোহীরা সম্ভবত রাতের অন্ধকারেই ঢুকে যেতে চেষ্টা করছে। আমাদের ভয় হল, এখন যদি বিদ্রোহীরা এই এলাকায় ঢুকে পড়ে, আর কোন ভাবে টের পায় এই বাসার ভেতরে কেউ আছে, তাহলে নিঃসন্দহে ব্রাশ ফায়ার করে দিবে। কারণ ওরা তো আর জানে না, শহরের ভেতরে এখনও কোন সিভিলিয়ান আছে। তাই আমরা এই প্রচন্ড মিসাইল আক্রমণ আর মেশিনগানের গোলাগুলির মধ্যেই আবারও বাতি না জ্বালিয়েই হাতড়ে হাতড়ে ঘরে ফিরে এলাম। সেদিন আমাদের বাসার ১০০ মিটার পরিধির মধ্যে অন্তত দুই-তিন শো মিসাইল মারল বিদ্রোহীরা। আল্লাহ‌্‌র অশেষ রহমতে আমাদের উপর একটাও পড়ল না। কিছুক্ষণ পরেই ধীরে ধীরে মিসাইলগুলো আরেকটু পূর্ব দিকে, অর্থাত রক্বম এতনীনের ভিতর দিকে গিয়ে পড়তে লাগল। বুঝতে পারলাম, বিদ্রোহীরা একটা একটা করে এলাকা ক্লিয়ার করছে। বুঝতে পারলাম সিরত যুদ্ধ শেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। কিন্তু এই শেষটা কি আমাদের জন্য ভালো হবে না খারাপ হবে? প্রথমে যখন ন্যাটো বোমা মারত, তখন আমি মোটেই ভয় পেতাম না। মনে হতো, কত বড় দেশ, এর মধ্যে ঠিক কি আমাদের উপরেই বোমা এসে পড়বে? প্রবাবিলিটি বলে একটা কথা আছে না? কিন্তু এখন যে হারে মিসাইল পড়ছে, প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মনে হয়, আজই বুঝি জীবনের শেষ রাত। এতোদিন যে বেঁচে আছি, সেটাই তো ভাগ্য! এই যুদ্ধ আর নার্ভে সহ্য হচ্ছে না। মনে হচ্ছে মরলে মরি, তবুও যেন বিদ্রোহীরা ঢুকে যায়, তবুও যেন যুদ্ধটা শেষ হয়!

... চলবে ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29497778 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29497778 2011-12-06 21:50:58
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৪ লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ১
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ২
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৩

'আশরিনে আমাদের দিনগুলো মোটামুটি ভালোই কাটছিল। প্রথম দিন আমাদেরকে বেশ ভালোই আপ্যায়ন করল। দুপুরে একটা খারুফ (ভেড়া) জবাই করে মাকরোনা দিয়ে খেতে দিল। বিকেলে আবার খুবজা দিয়ে চা। দিনের বেলাটা আমাদের ভালোই কাটল। বাসা থেকেই সমুদ্র দেখা যায়। বিকেলের দিকে বাচ্চাকাচ্চা সহ আমরা সবাই সমুদ্রে গেলাম। যুদ্ধের কোন চিহ্নও এই এলাকাতে নেই। ন্যাটোর ফাইটারও এদিকে আসে না। শুধু অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো খুব নিচে দিয়ে উড়ে, একেবারে পরিষ্কার দেখা যায়। রাতের বেলা জেনারেটর চালানো হল, ফলে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পরে আমরা প্রথম টিভি দেখতে পারলাম। এমনিতে লিবিয়া যুদ্ধের ব্যাপারে জাজিরা সবসময়ই বিদ্রোহীদের পক্ষে কিছুটা অতিরঞ্জিত সংবাদ পরিবেশন করত, কিন্তু সিরতের ব্যাপারে দেখি তেমন কিছুই বলল না। শুধু বলল যে বিদ্রোহীরা সিরতের পূর্বে অবস্থিত আবুহাদীও দখল করে ফেলেছে এবং সেখানে অবস্থিত লিবিয়ার সবচেয়ে বড় ক্যান্টমনেন্টটি এখন বিদ্রোহীদের দখলে। তবে যুদ্ধ শুধু সিরতে না, একই সাথে বেনওয়ালিদ এবং সাবহাতেও চলছে।

পরেরদিন সকালে কামালের চাচা ওমর শেগলুফদের বিশাল যৌথ পরিবারের সবাই 'আশরিনে এসে হাজির হল। তারা সাবা কিলোতে ছিল এবং বেশ ভালো অবস্থাতেই ছিল। গতকাল আমরা চলে আসার পরপরই বিদ্রোহীরা সাবা কিলোর প্রতিটা বাসায় যায় এবং ঘরে ঘরে অস্ত্র তল্লাশী করে। তবে তাদের ব্যবহার ছিল খুবই ভালো। গোলাগুলি তো দূরের কথা, কারো সাথে তারা উঁচু গলায় পর্যন্ত কথা বলে নি। বরং সবাইকে জিজ্ঞেস করেছে কারো খাবার-দাবারের ঘাটতি আছে কি না, কোন সাহায্য লাগবে কি না। ওমর শেগলুফদের বাসায় যে গ্রুপটা গিয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন আবার তাদের পূর্বপরিচিত। তারা শেগলুফদের বাসায় দুপুরের খাবার খেয়েছে, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট এবং মেশিনগান ফিট করা গাড়িগুলো দরজার সামনে থামিয়ে রেখেই। শেগলুফের নাতি-নাতনীরা সেইসব গাড়ির উপর চড়ে খেলাধুলা পর্যন্ত করেছে।

কিন্তু আজ সকাল থেকেই গাদ্দাফী বাহিনী সাবা কিলো এলাকাটা লক্ষ করে গ্র্যাড মিসাইল মারতে থাকে। তিনটা মিসাইল তাদের বাসার কাছাকাছি পড়ে। তার পরপরই শেগলুফরা এখানে চলে আসে। শেগলুফদের পরপরই হারাগা, বুসেফী এবং বু'আরাবীয়ারাও চলে এলো এখানে। এতো মানুষ দেখে বাড়ির মালিক মোহাম্মদ হাদীয়ার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। রাতে ঘুমানোর সময় দেখা গেল শুধু পুরুষের সংখ্যা ষাট-সত্তর জন। ভেতরে মহিলা এবং বাচ্চাকাচ্চা হিসেব করলে সব মিলিয়ে মোট দেড় থেকে দুইশো মানুষ হবে। ঘুমানোর সময় দেখা গেল সবার জায়গা হচ্ছে না। কাজেই যাদের গাড়ি আছে তারা গাড়িতে গিয়ে ঘুমালো।

পরদিন সকাল থেকে খাবার-দাবারের পরিমাণ কমতে লাগল। সকালে ছোট এক টুকরা খুবজার সাথে চা, দুপুরে হয়তো সামান্য একটু মাকরোনা, রাতে হয়তো সামান্য একটু কুসকুসি। কোন বেলাই খাবারে পেট ভরে না। কয়েকদিন এভাবে কাটানোর পর লক্ষ করলাম আমাদের শরীর দুর্বল হয়ে আসছে। বেশিরভাগ সময় ঘরে শুয়ে বসে কাটাতে হতো, যখন উঠে দাঁড়াতাম তখন হঠাত করে মাথা ঘুরে উঠত। মনে হতো যেন মাথা ঘুরে পড়ে যাব। দেয়াল ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কিছুটা স্বাভাবিক হতো। জাতিসংঘ কেন যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশে "হাই প্রোটিন" আটা আর "হাই প্রোটিন" বিস্কিট পাঠায়, এই প্রথম সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।

'আশরিনে আমরা ছিলাম সর্বমোট পাঁচদিন - রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। ২৩শে সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালবেলা পূর্ব দিকের পঞ্চাশ কি.মি. আরো দুইটা পরিবার এসে মোহাম্মদ হাদীয়াদের এই বাসায় আশ্রয় নিল। এদিকে তাদের খাবারও যাচ্ছে শেষ হয়ে। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে সেটাও কেউ জানে না। কাজেই কামালরা সিদ্ধান্ত নিল এখানে আর থাকার দরকার নেই। সবাই ভাগাভাগি হয়ে অন্যান্য জায়গায় গিয়ে উঠবে। কামাল তার পরিবার নিয়ে হয়তো রক্বম তালাতার দিকে কোথাও গিয়ে উঠবে। আর আ'তেফের পরিবার, হামজা, বুড়ি আর উলা গিয়ে মোহাম্মদের পরিবারের সাথে তার শ্বশুর বাড়িতে উঠবে। এটাও রক্বম তালাতায়, সিরতের একেবারে সেন্টারে।

সমস্যা হল আমাদেরকে নিয়ে। আম্মু আর তিথিকে নিয়ে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু আমরা পুরুষরা গিয়ে তাদের সাথে উঠাতে মোহাম্মদের আপত্তি। এমনিতেই মানুষ অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে, তার উপর ঐ বাড়িতে আমরা অনেকটা বাইরের মানুষ। শোনা যাচ্ছে সিরতের পশ্চিম দিকে, অর্থাত্‍ আমাদের বাসার দিকে গত তিন দিন ধরে কোন যুদ্ধ হয় নি, বিদ্রোহীরা প্রচন্ড গ্র্যাড আক্রমণের মুখে পিছু হটেছে। তাই আপাতত সেদিকটা কয়েকদিনের জন্য নিরাপদ। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আম্মুরা মোহাম্মদের স্ত্রী জয়নব এবং উলা ও বুড়ির সাথে জয়নবের বাবাদের বাড়িতে থাকবে আর আমরা চেষ্টা করব বাসায় চলে যেতে। আমাদের সাথে যাবে হামজা।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রওয়ানা হলাম আমরা। আম্মুরা জয়নবের বাবাদের বাড়ির সামনে নেমে গেল। আমরা হামজার গাড়িতে করে এগোতে লাগলাম। এলাকার ভেতর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে এগোতে গিয়ে হামজার একেবারে বারোটা বেজে গেল। কারণ বিদ্রোহীরা যেন এলাকার ভেতরে সহজে ঢুকতে না পারে সেজন্য প্রতিটা অলিতে গলিতে এক্সকাভেটর ব্যবহার করে মাটি ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। প্রতিটা এলাকা থেকে বের হওয়ার মাত্র একটাই পথ খোলা আছে। রক্বম তালাতা থেকে বের হওয়ার পথে শামীম-শাওনদের বাসা পড়ে। হামজাকে এক মিনিটের জন্য গাড়ি থামাতে বলে আমি নেমে দৌড় দিলাম ওদের বাসার দিকে। ওদের বাসার কাছাকাছি ত্বরীক সাওয়াবার (সাওয়াবা রোড) মোড়ে গাদ্দাফী বাহিনীর চার-পাঁচ জন সৈন্যের একটা অস্ত্রধারী দল পাহারা দিচ্ছিল। আমাকে দৌড়াতে দেখেই অস্ত্র উঁচিয়ে আমার দিকে ছুটে এল। আমাকে থেমে আইডি কার্ড দেখিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হল। আর কথা না বাড়িয়ে ছেড়ে দিল গার্ডগুলো, কিন্তু আমি বুঝে ভবিষ্যতে আরও সাবধানে চলা ফেরা করতে হবে। যুদ্ধগ্রস্ত দেশে দৌড়ানোর স্বাধীনতাও সীমাবদ্ধ।

শামীমরা কেউ বাসায় নেই, জুমার নামাজ পড়তে গেছে। শুধু ওর মা সরকার ম্যাডাম বাসায় আছে। জানতে পারলাম ওদের বাসাটা শহরের একেবারে কেন্দ্রে হওয়ায় বিদ্রোহীরা গোলাগুলি এখনও এতো দূরে এসে পৌঁছাতে পারেনি। এখনও মোটামুটি নিরাপদই আছে এলাকাটা। জানতে পারলাম অন্য সব বাংলাদেশীরাও সবাই ভালো আছে। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। রক্বম তালাতা, রক্বম ওয়াহেদ পার হয়ে রক্বম এতনীনের কাছাকাছি আসা মাত্রই দেখলাম গলিতে গলিতে গাদ্দাফীর সৈন্যরা পজিশন নিয়ে আছে। বালির বস্তা স্তুপাকারে রেখে পেছনে মেশিনগান ফিট করে বসে আছে। মাকমাদাস সুপার মার্কেট পার হওয়ার পর আর মেইন রোড দিয়ে এগোতে পারলাম না। রোডব্লক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। পাশের নিচু রাস্তা দিয়ে ঢুকে যেই মাত্র ইউ মার্কেটকে পাশ কাটিয়েছি, তখনই আবার বাধা পড়ল।

এবার গাদ্দাফীর পক্ষের এক সৈন্য পথ আটকালো। হাতের রাইফেল গাড়ির দিকে তাক করে ধরে বলল, যে দিক থেকে এসেছ সে দিকে ফিরে যাও। সামনে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। সামনে যেতে পারবে না। হামজা বুঝাতে চেষ্টা করল আমাদের যাওয়ার অন্য কোন জায়গা নেই। বাসায় যেতেই হবে। অন্তত চাল-আটা আনার জন্য যেতে হলেও যেতে হবে। কিন্তু সৈন্যটা কোন কথাই শুনল না। হামজা শেষবারের মতো চেষ্টা করল। গাড়ি নিয়ে সৈন্যটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করল। সৈন্যটা সাথে সাথে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে রাইফেল লোড করে আমাদের দিকে তাক করে চিত্‍কার করে বলতে লাগল, ফিরে যেতে বলেছি। ফিরে যাও। তা না হলে দিলাম গুলি করে। উপায় না দেখে হামজা গাড়ি ঘুরিয়ে নিল।

বাসায় যেতে না পেরে আমরা আবার ফিরে এসে শামীমদের বাসার সামনে নেমে গেলাম। হামজা আমাদের নামিয়ে দিয়ে জয়নবের বাবাদের বাড়িতে চলে গেল। শুক্রবার বিকেলটা আমাদের ভালোই কাটল। অনেকদিন পরে দুপুরে পেট ভরে ভাত খেলাম মুরগীর মাংস দিয়ে। রক্বম তালাতার দিকে এখনও কিছু কিছু জায়গায় হঠাত্‍ হঠাত্‍ মুরগী এবং কিছু তরী-তরকারী পাওয়া যায়। শুক্রবার পুরাদিনও কোন যুদ্ধ হল না। শামীমদের কাছ থেকে জানতে পারলাম আমরা 'আশরিন যাওয়ার পরদিন থেকেই যুদ্ধ বন্ধ। শনিবার সকালে তাই আমরা ঘুম থেকে উঠে আরকবার বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম গাড়ি হয়তো ঢুকতে দিচ্ছে না, হেঁটে গেলে হয়তো ঢুকতে দিতে পারে। সকাল আটটার দিকে আমরা শামীমদের বাসা থেকে বের হলাম। রাস্তায় অর্ধেক যেতে যেতেই হঠাত্‍ করে ন্যাটোর উড়াউড়ি শুরু হয়ে গেল। হাইডলার এলাকার দিকে ন্যাটো পরপর ছয় সাতটা বোমা মারল। বেশিরভাগ দোকানপাট, যাদের বড় বড় গ্লাসের দেয়াল ছিল সেগুলো আগেই বোমার কম্পনে অথবা গুলির আঘাতে ভেঙ্গে পড়ে গিয়েছিল। ছোটখাটো যে কাঁচগুলো অবশিষ্ট ছিল, ন্যাটোর বোমার কম্পনে সেগুলোও ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হল। আমরা মাথা বাঁচানোর জন্য ফুটপাথ ছেড়ে ভেতরের রাস্তায় ঢুকে গেলাম।

গতকাল যে পর্যন্ত যেতে পেরেছিলাম, আজ তার আগেই আমাদের থেমে যেতে হল। অন্য একজন যোদ্ধা আমাদেরকে গতকালের মতোই রাইফেল উঁচু করে আমাদের থামালো। বললাম আমাদের বাসা রক্বম এততীনে। থাকার অন্য কোন জায়গা নেই, এখন কোথায় যাব? গার্ড উত্তর দিল, সেটা আমি জানি না। কিন্তু সামনে যেতে পারবে না। ফিরে যাও। ঘরের কথা ভুলে যাও। ওটা এখন যুদ্ধক্ষেত্র। ফিরে আসার সময় ভার্সিটিতে আমাদের সহপাঠী আকরামের সাথে দেখা করলাম। আকরামরা গাদ্দাফী ক্বাবিলার, তার বড় ভাই যুদ্ধ করছে। তাই ভাবলাম সে হয়তো কোন সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেও একই কথা বলল, ঘরের কথা ভুলে যাও। যদি টাকা পয়সা বা জরুরী কিছু আনতে হয় তাহলে সন্ধ্যার পরে আমি দশ মিনিটের জন্য হয়তো যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারি, কিন্তু ওখানে থাকতে পারবে না। থাকার জায়গার বেশি সমস্যা হলে আমাদের বাসায় এসে উঠতে পার। আকরামের সাথে কথা বলতে বলতেই দূর থেকে মর্টারের শব্দ আসতে লাগল। দেরী না করে আমরা আবার শামীমদের বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। বাসার পৌঁছার সাথে সাথেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। তবে আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম জাফরান বা রক্বম এতনীনের দিকে যুদ্ধ হচ্ছে না, হচ্ছে আবুহাদীর দিকে।

সারাদিন যুদ্ধ চলল। বিকেলের দিকে রক্বম তালাতার দিকেও কিছু মিসাইল এসে পড়তে লাগল। মাথার উপর দিয়ে মেশিনগানের গুলি শিস কেটে উড়ে যেতে লাগল। আমরা সময় কাটানোর জন্য উঠানে বসে মনোপলি খেলছিলাম। দৌড়ে তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে গেলাম। সন্ধ্যার পরপরই যুদ্ধ থেমে গেল। কিন্তু সাথে সাথেই ন্যাটোর উড়াউড়ি শুরু হয়ে গেল। আশেপাশেই বেশ কয়েকটা বোমা মারল ন্যাটো। পাশের বাসা থেকে প্লাস্টারের গুঁড়া খসে এসে শামীমদের উঠানের মধ্যে পড়ল। বিকেল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল, রাতে বৃষ্টি শুরু হল। রাত তিনটার দিকে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেল। কারণ বৃষ্টির পানি ঘরের ছাদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে আমাদের গায়ে এসে পড়ছে। সেই সাথে খুব কাছেই কোথাও থেকে গাদ্দাফী বাহিনী বিরোধীদের লক্ষ করে মিসাইল মারছে।

পরদিন রবিবার সকালে ইউনিভার্সিটি থেকে পাঁচজন বাংলাদেশী ক্লিনার এল শামীমদের বাসায়। তারা জানালো গতকাল ইউনিভার্সিটির সামনে তুমুল যুদ্ধ হয়েছে। বিদ্রোহীরা জাজিরাত আবুহাদী (আবুহাদির চত্বর), যেটা আমাদের ইউনিভার্সিটি এক কি.মি. দূরে, সেখানে অবস্থান নিয়ে আক্রমণ করতে থাকে আর গাদ্দাফী বাহিনী ইউনিভার্সিটির আড়াল থেকে তাদের উপর পাল্টা আক্রমণ করতে থাকে। বাংলাদেশী সবাই অক্ষত আছে, কিন্তু ইউনিভার্সিটির অবস্থা শেষ। ন্যাটো বোমা মেরেছে ভার্সিটির হোটেলের উপর। আর বিদ্রোহীদের রকেট গিয়ে পড়েছে বিভিন্ন ভবনে, যার মধ্যে আমাদের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডীন এর অফিসও আছে। আজ সকাল থেকে পুরা ইউনিভার্সিটি এলাকায় গাদ্দাফী বাহিনীর কোন যোদ্ধাও নেই। তাই তারা তাড়াতাড়ি পালিয়ে এসেছে। শামীমের আব্বা সরকার আংকেল তাদেরকে নিয়ে বের হল একটা আপাতত থাকার জন্য একটা বাসা খুঁজে দেওয়ার জন্য। এদিনও সারাদিন যুদ্ধ চলল, সম্ভবত ইউনিভার্সিটি রোডেই।

সোমবার বিকেলে আমি আর আব্বু প্রচন্ড যুদ্ধের মধ্যে দিয়েও ঘর থেকে বের হলাম আশে পাশে কয়েকদিনের জন্য কোন বাসা ভাড়া পাওয়া যায় কি না খুঁজে দেখতে। আরেকজনের বাসায় আর কতদিন থাকা যায়? বের হওয়ার সময় এলাকা মোটামুটি শান্তই ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখি রাস্তায় গাদ্দাফীর যোদ্ধারা ছোটাছুটি করছে, যাদের অর্ধেকের মতোই নিগ্রো। যোদ্ধাদেরকে এড়িয়ে চলার জন্য আমরা শামীমদের বাসার চারটা গলি পেছনের একটা গলির ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাত্‍ দেখি সেখানে গাছপালায় ঢাকা একটা বাড়ি থেকে দলে দলে যোদ্ধারা ভারী মেশিনগান, আরপিজি, আর গুলির বেল্ট নিয়ে বের হচ্ছে। আমার ইচ্ছা ছিল স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে চলে যাব, তাহলে হয়তো কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আব্বু এতগুলো সৈন্য দেখে হঠাত্‍ করে থমকে দাঁড়ালো। তাই দেখে একজন সৈন্য রাইফেল উঁচিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, কোথায় থাকি, এখানে কি করছি। থাকার জায়গা নেই, তাই বাড়ি খুঁজছি - এটা জানাতেই সে ধমকে উঠে বলল, এটা বাড়ি খোঁজার সময়? গুলি খেতে না চাইলে তাড়াতাড়ি ভাগো। সৈন্যদের ভাব-ভঙ্গিতেই বোঝা যাচ্ছিল কিছু একটা ঘটছে - বাসায় ফিরে শামীমদের পাশের বাসার পুলিশের চাকরি করা লোকটা জানালো বেনগাজীর বিদ্রোহী যোদ্ধারা 'আশরিন দখল করে ফেলেছে। তারা এখন সওয়াবার দিকে এগোচ্ছে।

সোমবারে অবশ্য আর নতুন করে যুদ্ধ হল না, কিন্তু ন্যাটো বেশ কয়েকটা বোমা মারল একেবারে আশেপাশেই। মঙ্গল এবং বুধবারটাও প্রায় একই রকম কাটল। সকাল এগারোটার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়, গাদ্দাফী বাহিনী সামনের শা'বিয়া পার্ক থেকে এবং পেছনের সেই গাছপালা ঢাকা বাড়িটা থেকে নিয়মিত প্রচন্ড আক্রমণ করে, সেই মিসাইল মারার শব্দে পুরো ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। বিদ্রোহীদের রকেট মাঝে মাঝেই আশেপাশে এসে পড়ে, আর মাঝে মাঝেই মেশিনগানের গুলি ঘরের উপর দিয়ে শাঁই শাঁই শব্দে উড়ে যায়। পরিস্থিতি যখন বেশি খারাপ হয়, তখন কিছুক্ষণ "লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্‌জোয়ালামিন" পড়ি, এছাড়া বেশির ভাগ সময়ই আমরা মনোপলি খেলে আর গল্প করে সময় কাটাই। অবশ্য গল্প করার মতো বিষয় এখন একটাই - গাদ্দাফীর পক্ষ আর বিপক্ষ। ১৫ই ফেব্রুয়ারি আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন প্রথমে আমি গাদ্দাফীর পক্ষেই ছিলাম। সুন্দর একটা দেশ চলছে, খামোখা সেই দেশে অশান্তি সৃষ্টি করার দরকারটা কি? কিন্তু ১৭ এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি যখন বেনগাজিতে খালি হাতে মিছিল করা মানুষের উপর মেশিনগানের গুলি চালানো হল, ২০ ফেব্রুয়ারি যখন মিসরাতায় খালি হাতে মিছিল করা মানুষের উপর আবারও গুলি করা হল, তখন থেকেই আমি গাদ্দাফীর বিপক্ষে।

মূলত আন্দোলন শুরুর আগে লিবিয়ানদের মধ্যে গাদ্দাফীর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। গাদ্দাফী যদি আন্দোলনের শুরুতেই ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচন দিয়ে দিত, কোন সন্দেহ নেই জনগণ গাদ্দাফীকেই আবার নির্বাচিত করত। কিন্তু গাদ্দাফী নির্মমভাবে আন্দোলন দমন করতে গিয়ে যত মানুষ মেরেছে, গুণোত্তর হারে মানুষ তত গাদ্দাফীর বিপক্ষে চলে গেছে। শামীম-শাওনদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য ভিন্ন। প্রথমদিকে যখন বিদ্রোহীরা একের পর এক শহর দখল করে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা বিদ্রোহীদের পক্ষে ছিল। আমাদের তখন বিবিসি, সিএনএন আসত না, তাই ভার্সিটিতে ওদের মুখ থেকেই বিদ্রোহীদের অগ্রগতি এবং গাদ্দাফী বাহিনীর অত্যাচার এবং মিডিয়াতে মিথ্যাচারের সংবাদগুলো পেতাম। কিন্তু ন্যাটোর আক্রমণ শুরুর পর, এপ্রিল-মে-জুনের দিকে যখন বিদ্রোহীদের অগ্রগতি থেমে গেল এবং গাদ্দাফী বাহিনী কিছু শহর পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হল, তখন শামীম-শাওনের সুর পাল্টে গেল। তাদের কাছে তখন গাদ্দাফী এক মহান নেতা, বিদ্রোহী লিবিয়ান বলতে কোন জিনিস নেই, সবই আল-ক্বায়েদা আর ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র। প্রতিদিন রাতে এসব নিয়েই তর্ক-বিতর্ক করেই শামীমদের বাসায় আমাদের সময় কাটতে লাগল।

বুধবার রাতে আবার প্রচন্ড বৃষ্টিপাত শুরু হল। রক্বম তালাতার সুয়ারেজ পাইপগুলোর অবস্থা এমনিতেই খারাপ ছিল, সারা রাতের বৃষ্টির পর সকালে উঠে দেখা গেল সুয়ারেজ লাইন জ্যাম হয়ে এই গলির সবগুলো বাসার টয়লেটে পানি উপচে উঠে আসছে। দুর্গন্ধে ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ল। আমরা জোহর এবং আসরের সময় প্রচন্ড যুদ্ধের মধ্যে দিয়েও মসজিদে বাথরুম সেরে আসলাম। মসজিদে যাওয়ার পথে আগের দিন রাতে ন্যাটো যেখানে বোমা মেরেছে, সেটা দেখতে পেলাম। একজন কর্ণেলের বিলাসবহুল বাড়ি, একটা পাশ ভেঙ্গে গুঁড়াগুঁড়া হয়ে আছে। শামীমদের বাসার দুই গলি পেছনে বিদ্রোহীদের মারা মিসাইল পড়েছিল, সেটাও দেখতে পেলাম - বারান্দা ভেঙ্গে পড়ে আছে। এতোদিন গাদ্দাফী বাহিনী যে মিসাইলগুলো মারত, সেগুলো মারার শব্দের দশ-পনের সেকেন্ড পরে ফোটার শব্দ কানে আসত। কিন্তু আজ দেখলাম মারার প্রায় তিন-চার সেকেন্ডের মধ্যেই সেগুলো ফেটে যাচ্ছে। আশেপাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম বিদ্রোহীরা সাওয়াবার শেষ মাথা পর্যন্ত চলে এসেছে। ওদিকে সীপোর্ট এবং সমুদ্রের পাড়ে নতুন তৈরি করা চারতলা বিল্ডিংগুলোও বিদ্রোহীদের দখলে। দুই দিকই এখান থেকে তিন কিলোমিটারেরও কম দূরে।

বিকালের দিকে আমি আর আব্বু গেলাম জয়নবের বাবাদের বাড়িতে আম্মুর সাথে দেখা করার জন্য। যাওয়ার সময় অবস্থা একটু শান্ত ছিল, কিন্তু ওখানে পৌঁছানোর পরপরই প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আম্মু সহ হামজা-আ'তেফের সাথে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আম্মুরা ওদের সাথেই থাকবে। কিন্তু আমরা পরদিন সকালে উঠে আরেকবার বাসায় যাওয়ার চেষ্টা করব। যুদ্ধ এখন এদিকেই বেশি, ওদিকে বেশ কয়েকদিন ধরে যুদ্ধ হচ্ছে না। যদি আমরা কয়েকদিন থেকে বুঝতে পারি যে ওদিকের পরিস্থিতি ভালো, তাহলে বাকি সবাই-ও হয়তো ফিরে আসবে। কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমরা ঘর থেকে বের হতে পারলাম না গোলাগুলির কারণে। ওদিকে সন্ধ্যও হয়ে আসছে। কারেন্ট নেই, সন্ধ্যার পর বের হওয়া একেবারই নিরাপদ না। অন্ধকারে স্নাইপাররা ভুল বুঝে গুলি করে ফেলতে পারে। তাই গোলাগুলির মধ্যেই আমরা বের হয়ে গেলাম। আশেপাশের বাড়ির লিবিয়ানরা, যারা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, চিত্‍কার করে দেয়াল ঘেঁষে দৌড়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যেতে বলতে লাগল। আব্বুর মেরুদন্ডে একটা অপারেশন হয়েছিল, তাই ভালো করে দৌড়াতে পারে না। আমি আব্বুকে ধরে ধরে দৌড়িয়ে নিতে লাগলাম। বাড়িগুলোর উপর দিয়ে গুলি উড়ে যাচ্ছে। হঠাত্‍ আমাদের থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ মিটার দূরে একটা রকেট এসে পড়ল। ধোঁয়ার চারদিক ভরে গেল। আমরা দেখার জন্য না দাঁড়িয়ে আরো তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ফিরে এলাম। ঘরে এসে দেখি তালহা আর শাওন ভাইয়া, শামীম-শাওনের সাথে মসজিদ থেকে বাথরুম সেরে ফিরে এসেছে। জানতে পারলাম তাদেরকে নাকি একই সাথে মাগরিব এবং এশার নামাজ পড়িয়ে দিয়েছে। জরুরী অবস্থায় নাকি এরকম পড়ার নিয়ম আছে।

রাতের বেলা প্রচন্ড দুর্গন্ধে আর মশার উত্‍পাতের মধ্যে আমরা ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। উপরে ন্যাটোর বিরামহীন উড়াউড়ি, সেই সাথে মাথায় বিরামহীন দুশ্চিন্তা। আগামীকাল আবার বাসায় ফেরার চেষ্টা করতে হবে। কে জানে এবার ঢুকতে পারব কি না। কে জানে, আমাদের ঘরবাড়ির কি অবস্থা। সে দিকে কি যুদ্ধ হচ্ছে? এখন যদি নাও হয়, আমরা যাওয়ার পরে যদি শুরু হয়, তখন আবার বের হতে পারব তো? এতোসব কিছু ভাবতে ভাবতে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলাম আমরা।



... চলবে ...



সিরতের যুদ্ধের কিছু ছবি -

পজিশন নিয়ে আছে বিদ্রোহীরা


ভার্সিটির হোটেল ন্যাটোর বোমায় বিদ্ধস্ত


ভার্সিটির প্রশাসনিক অফিস


ভার্সিটির প্রশাসনিক অফিস


ভার্সিটির প্রশাসনিক অফিস


ইউনিভার্সিটি থেকে গাদ্দাফীর আমলের সবুজ পতাকা নামিয়ে নিচ্ছে বিদ্রোহীরা


সমুদ্রের পাড়ের চারতলা বিল্ডিং-এর সামনে যুদ্ধ


সমুদ্রের পাড়ের চারতলা বিল্ডিং-এর সামনে যুদ্ধ


সমুদ্রের পাড়ের চারতলা বিল্ডিং-এর সামনে যুদ্ধ


সিরত কনফারেন্স হল / মিনিস্ট্রি


সিরত কনফারেন্স হল / মিনিস্ট্রির উল্টোপাশ থেকে আক্রমণ করছে বিদ্রোহীরা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29496190 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29496190 2011-12-04 16:11:21
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ৩
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ১
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ২


শুক্রবারের পুরো দুপুর এবং বিকেল আমরা না খেয়ে কাটালাম। মাস্তুরার (বাড়িওয়ালা কামালের স্ত্রী) মায়েরা এমনিতেই গরীব, তাছাড়া গত চার মাস ধরে তাদের উপর বসে বসে খাচ্ছিল মাস্তুরার মামাতো ভাই আ'ত হারাগাদের একটা বিশাল পরিবার এবং সেই সাথে তাদের আরও এক প্রতিবেশী বু'সেফীদের পরিবার, যারা মিসরাতা যুদ্ধের সময় মিসরাতা থেকে সিরতে পালিয়ে এসেছিল। সন্ধ্যার সময় খাবার দিল, কিন্তু তা নিতান্তই অপর্যাপ্ত। শুধুমাত্র কুসকুসি, কোন মাংস বা তরকারি ছাড়া। অবশ্য কারেন্ট না থাকার কারণে কারো বাসায় মাংস বা তরকারি আশা করাটাও বোকামী। সারাদিন ধরে শহরের ভেতর দিক থেকে যুদ্ধের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল এবং শব্দ শুনেই বুঝা যাচ্ছিল আগের দিনের থেকেও ভয়াবহ যুদ্ধ হচ্ছে। সন্ধ্যার সাথে সাথে আওয়াজ শুনে বুঝা গেল বিদ্রোহীরা যুদ্ধ শেষ করে ফিরে আসছে। সামনের রাস্তা দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় অনেক মানুষের "আল্লাহু আকবার" শ্লোগান আমাদের কানে এল।

শহরের ভেতরের কোন খবর আমরা পাচ্ছিলাম না। কামালের বড়ভাই মোহাম্মদ, যে ইউভার্সিটির ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর, সে শুধু সারা দিন রেডিও শোনার চেষ্টা করছিল। সিরত রেডিও বন্ধ, সেখানে অবিরত রেকর্ড করা গাদ্দাফীর পক্ষের গান চলছিল। সন্ধ্যা ছয়টার সময় মিসরাতা রেডিওর সংবাদে বলা হল, মিসরাতার যোদ্ধারা সিরতের সাবা কিলোর (মাস্তুরার মায়েদের এই এলাকাটাই) পূর্ণ দখল নিয়েছে। আগের দিন তারা সিরতের পশ্চিমে অবস্থিত জারফ প্রায় বিনা বাধায় দখল করে নিয়েছিল। তাছাড়া তাদেরই একটা গ্রুপ ভাগ হয়ে সিরতের দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘুরে পূর্ব দিকে অবস্থিত গার্দাবীয়া দখল করে নিয়েছে এবং আবুহাদীর দিকে এগোচ্ছে। তারা বেনগাজীর যোদ্ধাদের সিরতের দিকে আর এগোতে নিষেধ করেছে, তাদের আশা সিরত দখলের জন্য তারাই যথেষ্ট। সিরতে অবস্থিত সাততলা উঁচু একসারি আবাসিক ভবনের (ইমারাত তা'মিন) উপর ন্যাটোর বোমা হামলার সংবাদও বলা হল এতে।

আমাদেরকে নামিয়ে দিয়েই মোত্তালেব গাড়ি না নিয়ে হেঁটে হেঁটে কোথায় যেন চলে গিয়েছিল। রাত নয়টার দিকে সে ফিরে এল। তার কাছে জানা গেল সে বিদ্রোহীদের ক্যাম্পে গিয়েছিল। রাস্তায় বের হয়ে সে অনুমান করে বিদ্রোহীদের ঘাঁটির দিকে হাঁটতে শুরু করে। পথেই কয়েকজন যোদ্ধা তাকে ঘিরে ফেলে। তখন সে জানায় সে বিদ্রোহীদের সাপোর্ট করে এবং বিদ্রোহীদের সাথে কথা বলতে চায়। তখন তারা তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে সে রয়টার্সের সাথেও সাক্ষাতকার দিয়ে এসেছে। মাস্তুরার ভাইরা এবং আরো কয়েকজন মোত্তালেবকে ঘুরে ফিরে জিজ্ঞেস করতে লাগল, বিদ্রোহীরা কারা? আসলেই কি তাদের সাথে তালেবান, ফ্রেঞ্চ এবং কাতারী সৈন্য আছে? মোত্তালেব উত্তর দিল, তোমরা এখনও এইসব প্রচারণা বিশ্বাস করে বসে আছ? বিদ্রোহীরা সবাই-ই মিসরাতী। সিরতের কিছু লোকও তাদের সাথে আছে। আর তাদের ব্যবহার, সেটা আর কী বলব!

রাত আরেকটু গড়ানোর পরেও যখন কোন গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া গেল না, তখন কামাল বের হল একবার ঘর থেকে ঘুরে আসার জন্য। আব্বু-আম্মুও সাথে গেল আমাদের কিছু জামাকাপড় আনার জন্য। সেই সাথে আমাদের প্রতিবেশী মুক্তাদেরকে দেখে আসার জন্য এবং তাদেরকে বলে আসার জন্য যে আমরা লিবিয়ানদের সাথে আছি। আব্বু-আম্মু গেল ঠিকই, কিন্তু কামালের তাড়াহুড়ার কারণে মুক্তাদের সাথে দেখা করতে পারল না। ফিরে এসে কামাল তার স্বভাবসুলভ ভংগিতে বলতে লাগল, বিরোধীরা আজ কোন সুবিধাই করতে পারে নি। শহরের ভিতরে ঢোকা তো দূরের কথা, তারা বিন হাম্মাল কবরস্থানই পার হতে পারে নি।

পুরা রাতে ন্যাটোর উড়াউড়ি ছাড়া আর কিছু ঘটল না। এই প্রথম সিরতের আকাশে ন্যাটো ফাইটারের পাশাপাশি অ্যাপাচি হেলিকপ্টারও উড়ালো। রাতে অবশ্য ভালো ঘুম হলো না। ছোট একটা ঘরে আমরা বিশ থেকে পঁচিশজন মানুষ ঘুমালাম। ঘরের চারদিকে নিচে বিছানো ম্যাট্রেসে মাথা রেখে পাগুলো ঘরের কেন্দ্রের দিকে ছড়িয়ে দিল সবাই। ফলাফল হল, বিভিন্নজনের পা পরস্পরের সাথে ওভারল্যাপ হতে লাগল।

পরদিন শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে এক টুকরা খুবজা আর একটু চা দিয়ে নাস্তা সারার পরপরই দেখি আমাদের দুই বাসা পরের আইয়্যাদ হোয়েদারদের ফ্যামিলিও এখানে এসে হাজির। আইয়্যাদ বলল গতকাল সকালে সে হসপিটালে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফেরার আগেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। বাসা থেকে এক কিলোমিটার দূরে থাকতেই তার গাড়ির উপর দিয়ে একটা রকেট উড়ে গিয়ে পেছনের গাড়িকে উড়িয়ে দেয়। ফলে সে ভয় পেয়ে গাড়ি ফেলে গলির ভেতর দিয়ে দৌড়ে বাসার দিকে এগিয়ে যায়। বাসার কাছাকাছি আসার পরে একটা রাস্তার দিকে উঠতে হয়, তাই সে রাস্তা এড়ানোর জন্য কাছাকাছি একটা বাসায় ঢুকে পড়ে পাঁচিল টপকে পার হওয়ার জন্য। সেই বাসায় দুইজন তাওয়ার্গী নিগ্রো লিবিয়ান ছিল। আইয়্যাদ দেখতে পেল একজন মাথায় গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে আরেকজন তাকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। দুজন মিলে লাশটাকে একপাশে সরিয়ে দেয়াল টপকে টপকে অবশেষে আইয়্যাদের বাসায় পৌঁছল। ঘরে পৌঁছানো মাত্রই তারা বিদ্রোহীদের আল্লাহু আকবার ধ্বনি শুনতে পায়। তাকিয়ে দেখে বিদ্রোহীদের পতাকা লাগানো অনেকগুলো গাড়ি সমুদ্রের পাড়ের উঁচু রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। আইয়্যাদ আর তার ছেলে আহমেদ মিলে গুনেছিল সর্বমোট তেষট্টিটা গাড়ি গিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার একই রাস্তা ধরে ফিরে এসেছে।

শনিবারেও দুপুর এগারোটার দিকে যুদ্ধ শুরু হল। যুদ্ধ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই ঘনঘন গ্র্যাড মিসাইল পড়ার বিকট আওয়াজ শোনা যেতে লাগল এবং তার পরপরই বিদ্রোহীরা ফিরে এল। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য তারা আবার এগুলো। দুপুর দুইটার দিকে একটা ভয়াবহ ব্যাপার ঘটল। আমরা অনেকগুলো গাড়ির আওয়াজ শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম বিদ্রোহীদের ছয়টা অস্ত্রবাহী জীপ এবং পিকআপ কিছু দূরের একটা বাড়ির সামনে গিয়ে থামল এবং কয়েকজন সেই বাড়ির ভেতরে গিয়ে ঢুকল। সেই বাড়িটাতে একটা সুদানী ফ্যামিলি ছিল। তার একটু পরেই তার পাশের বাড়ি থেকে মহিলা এবং বাচ্চাকাচ্চারা চিত্‍কার করতে করতে বেরিয়ে এল। পুরো এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহীরা সুদানী মহিলাকে ধরে নিয়ে গেছে। মহিলাদের মধ্যে একটা আতংক ছড়িয়ে পড়ল। আ'তেফ এবং আ'তেফের স্ত্রী মবরুকা বলতে লাগল তারা কোনমতেই আর এই এলাকায় থাকবে না। এখানে কোন নিরাপত্তা নেই। যেকোন সময় বিদ্রোহীরা এই বাসায়ও এসে আক্রমণ করতে পারে। এখানে থাকার চেয়ে বাসায় গিয়ে যুদ্ধ করাও বরং আরো ভালো।

দুপুরের খাবারের পর আমরা বসে বসে মিসরাতা থেকে আসা হারাগা আর বুসেফী পরিবারের ছেলেগুলোর সাথে কথা বলছিলাম। তখন একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করলাম। প্রথম প্রথম তারা আমাদের সাথে এমন ভাবে কথা বলছিল, যেন তারা গাদ্দাফীর সাপোর্টার। গাদ্দাফী অতুলনীয় নেতা, বিদ্রোহীরা দেশদ্রোহী। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝল আমরা গাদ্দাফীর বর্তমান নীতির খুব একটা সমর্থক না, বা আমাদের সাথে সত্য কথা বললে নিজেদের কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, তখন তারা স্বীকার করল তারা মিসরাতা থেকে পালিয়েছে মূলত গাদ্দাফীর সৈন্যদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে। সেখানে একটা ছেলের মোবাইল ফোনে একটা ভিডিও দেখলাম যেটা আগে কখনো টিভিতে দেখিনি। ভিডিওটা ত্রিপলীর গ্রীণ স্কয়ারের, গোলমালের প্রথম সপ্তাহের, যেদিন গাদ্দাফীর ভেনেজুয়েলায় পলায়নের গুজব উঠেছিল। ভিডিওতে দেখা গেল গ্রীণ স্কয়ারে এক-দেড়শো মানুষ জড়ো হয়ে গাদ্দাফীর বিপক্ষে শ্লোগান দিচ্ছে, গাদ্দাফীর ছবি জ্বালাও-পোড়াও করছে, সাইনবোর্ড ভাংচুর করছে। তাদের বেশিরভাগই খালি হাতে, কয়েকজনের হাতে শুধু লাঠি। এমন সময় দশ-পনেরোটা আর্মির জীপ এবং পিকআপ এল, পেছনে মেশিনগান ফিট করা। হঠাত মেশিনগানের গুলি শুরু হল। কয়েকজন আন্দোলনকারী মাটিতে পড়ে গেল, আল্লাহু আকবার ধ্বনি শোনা যেতে লাগল আর বেশিরভাগই পালাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই গাদ্দাফী সমর্থকরা সবুজ পতাকা হাতে "আল্লাহ্ মোয়াম্মার ওয়া লিবিয়া ওয়া বাস" শ্লোগান দিয়ে গ্রীণ স্কয়ারে ঢুকতে লাগল। ত্রিপলীর আবু সেলিম তথা বুসলিমেরও ঠিক একই ধরনের আরেকটি ভিডিও দেখা গেল। আন্দোলনকারীরা সংখ্যায় এতো কম ছিল যে, ইচ্ছে করলেই সাধারণ পুলিশই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। কিন্তু তা না করে নির্মমভাবে তাদের দমন করা হলো, যেন তারা ভবিষ্যতেও আর মিছিল বের করার সাহস না পায়।

শনিবার বিকেলের দিকে গাদ্দাফী সিরিয়া ভিত্তিক আল-রাই টিভিতে অডিও ভাষণ দিল। ভাষণে গাদ্দাফী বিদ্রোহীরকে ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হওয়ায় রক্বম এতনীন এবং জাফরানের ভূয়সী প্রশংসা করল। উল্লেখ্য আমাদের বাসাটা জাফরানের একেবারে পূর্বপ্রান্তে তথা রক্বম এতনীনের পশ্চিমপ্রান্তে। এই এলাকাদুটোর অধিবাসীদের অধিকাংশই হামামলা ক্বাবিলার অন্তর্গত এবং এদেরকে বলা হয় হাম্মালী বা বিন হাম্মাল। গাদ্দাফী তার ভাষণে বিন হাম্মালদেরও প্রশংসা করল। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে, পরিচিত এমন কয়েকজনের নামও বলল। গাদ্দাফী আশ্বাস দিল, সিরত রক্ষা করতে পারলে পরবর্তীতে সিরতকেই লিবিয়ার রাজধানী বানানো হবে।

সন্ধ্যার দিকে মাস্তুরার মায়েদের বাড়িতে মানুষের সংখ্যা আরো বেড়ে গেল। বু'আরাবীয়াদের ফ্যামিলি এসে জানালো, তাদের ঘরের দোতলায় মিসাইল পড়ে আগুন ধরে গেছে। ঐ অবস্থাতেই তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তারা জানালো আজ বিদ্রোহীরা সাবা মিয়া নামক এলাকার ভেতরেও ঢুকেছে। আ'তেফ আর কামাল অবশ্য এসব কথা বিশ্বাস করতে রাজি না। তাদের দাবি, বিদ্রোহীরা সংখ্যায় কম, মাত্র দশ-বারোটা গাড়ি। তারা এখনও কবরস্থানের সামনেই যেতে পারে নি। যদি তারা সংখ্যায় এতো বেশিই হতো, তাহলে পুরো শহর দখল করে ফেলে না কেন?

রাতের বেলা দুপুরের গুজবের সঠিক খবরটা পাওয়া গেল। সকালের দিকে বিদ্রোহীরা যখন প্রচন্ড মিসাইল আক্রমণের কারণে পিছু হটছিল, তখন তারা এই এলাকার ভেতরে গুলির আওয়াজ শুনেছিল। তাই তারা সন্দেহজনক কয়েকটা বাসায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করে। তারা কাউকে কিছু না বলে শুধুমাত্র অস্ত্র নিয়েই চলে গেছে। কিন্তু পাশের বাসার মহিলারা এতো গাড়ি ভর্তি বিদ্রোহী যোদ্ধা দেখে ভয় পেয়ে চেঁচামেঁচি শুরু করে এবং ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু এই সংবাদ শুনেও আ'তেফ আর মবরুকা প্রভাবিত হল না। তারা এই এলাকাতে থাকবেই না। তার ভাই কামাল এবং মোহাম্মদ অনেক বুঝানোর চেষ্টা করল কিন্তু কোন লাভ হল না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল সবাই মিলে মাস্তুরার ভাই মোস্তফার শ্বশুর বাড়ি আশরিনে যাবে। আশরিন সিরতের পূর্বদিকে বিশ কি.মি. দূরে অবস্থিত এবং গ্রাম্য এলাকা। ঐদিকে এখনও গাদ্দাফীর দখলে। গাদ্দাফীর পক্ষের লোকেদের দাবি পূর্বদিকে ব্রেগা পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কি.মি. গাদ্দাফীর দখলে। তবে জাজিরা, বিবিসি সহ সকল সংবাদ অনুযায়ী বেনগাজীর বিদ্রোহী যোদ্ধারা ওদিকে সত্তর কি.মি. দূরে অবস্থান করছে। বিদ্রোহীরা সাধারণত দুপুর এগারোটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ করে, তাই সকাল সকালই যাত্রা শুরু করতে হবে।

রবিবারে সকাল আটটার দিকে আমরা সাবা কিলো থেকে আমাদের বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে আশরিনে যাব। মেইন রোড দিয়ে বাসায় যাওয়ার সময় যে দৃশ্য দেখলাম, তার সাথে তুলনা করার মতো দৃশ্য কোন সিনেমাতেও কখনো দেখিনি। রাস্তার দুইপাশের প্রত্যেকটা বাড়ি গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা ঝাঁঝরা হয়ে আছে, রকেট আর মর্টারের আঘাতে দেয়ালগুলো ভেঙ্গে চুরে পড়ে আছে। রাস্তায় কিছুদূর পরপর মানুষের গাড়ি পড়ে আছে। গাড়িগুলোর কাঁচ ভাঙ্গা, দরজা খোলা, সামনের রাস্তায় তাজা রক্তের দাগ। রাস্তায় যতদূর চোখ যায়, শুধু বুলেট আর মিসাইলের খোসা। বুলেটের খোসার কারণে গাড়ির চাকা পিছলে পিছলে যাচ্ছে। বিন হাম্মাল মসজিদের মিনার অর্ধেক ভেঙ্গে আছে। সবচেয়ে অবাস্তব একটা দৃশ্য হল, হাইওয়ের একলেন দিয়ে আমাদের (মাস্তুরার ভাইয়ের ছেলে মোহাম্মদ ওয়াফীর) গাড়ি চলছে, আর পাশের দিয়ে বিশালাকৃতির তিনটা উট রাজকীয় ভঙ্গিতে পা ফেলে এগিয়ে আসছে। কারো খামারে ছিল নিশ্চয়ই, গোলাগুলিতে বেরিয়ে পড়েছে।

বাসায় গিয়ে মাত্র জামাকাপড় গোছানো শুরু করেছি, এমন সময় মোহাম্মদ ওয়াফী চিত্‍কার শুরু করল, তাড়াতাড়ি। ইচ্ছা ছিল সময় পেলে নবী স্যার আর রমজান আংকেলরা কী অবস্থায় আছে সেটা দেখে যাওয়ার, কিন্তু সে সময় আর হল। পুনরায় যাত্রা শুরু হল। শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ন্যাটোর বোমা মারা সাততলা উঁচু ভবনগুলো দেখলাম। যেটার উপর বোমা মেরেছে, সেটার চিহ্নও আর অবশিষ্ট নেই। পুরো সাততলা একেবারে মাটির সাথে মিশে গেছে। চারপাশের রাস্তায় ভাঙ্গা টুকরো ছড়িয়ে পড়ে আছে। রক্বম তালাতাল পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শামীম-শাওনদের সাথে দেখা হল। ওরা জানেও না, বিদ্রোহীরা শহরের এতো ভিতরে ঢুকে গেছে।

প্রায় আধঘন্টা চলার পরে আমরা আশরিনে এসে পৌঁছলাম। শহরের ভেতরে ততক্ষণে পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এ জায়গাটা প্রায় ত্রিশ কি.মি. দূরে বলে এখানে শব্দ এসে পৌঁছাতে পারছে না। জায়গাটা পুরাই গ্রামাঞ্চল। বিশাল একটা একতলা বাড়ি, বিশাল একটা গেস্টরুম। মহিলারা ভেতরে চলে গেল আর পুরুষদের স্থান হল বিশাল গেস্টরুমটাতে। পৌঁছানোর সাথে সাথেই নাস্তা এল। বেশ ভালো নাস্তা। তবে আমরা সব মিলিয়ে মোট ত্রিশ জনের মতো এসেছি, শোনা যাচ্ছে আরও আসবে। দোকান-পাট সব বন্ধ, যে আগে যতটুকু খাবার-দাবার জমাতে পেরেছিল সেটাই এখন ভরসা। কতদিন আমাদের এখানে থাকতে হবে আর কতদিন এরা এতো মানুষকে খাওয়াতে পারবে, কে জানে?



... চলবে ...




সিরতের ধ্বংসের কিছু কিছু ছবি -

যুদ্ধের পূর্বে সিরত


যুদ্ধের পূর্বে সিরত (মাঝখানের ওভাল আকৃতির ক্রিম কালার ভবনটি একটি রেস্টুরেন্ট)


ন্যাটোর বোমা মারা পর উপরের রেস্টুরেন্টটা


ন্যাটোর বোমা মারা পর উপরের রেস্টুরেন্টটা


ইয়াসিনদের বাসার সামনের রাস্তা - আমাদের বাসা থেকে দেড়শো মিটার দূরে


রক্বম এতনীনের ধ্বংসস্তুপ


রক্বম এতনীনের ধ্বংসস্তুপ


আবাসিক ভবন


ধ্বংসস্তুপ


ধ্বংসস্তুপ


ধ্বংসস্তুপ


]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29494688 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29494688 2011-12-02 06:21:07
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ২ লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স - পর্ব ১

১৬ই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। আগের দিন রাতের বেলা ছাড়াছাড়া ভাবে ঘুম হয়েছিল, তবুও খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল। নাস্তা করে এলাকাটা দেখতে বের হয়ে আবিষ্কার করলাম পুরো এলাকা ফাঁকা। রাতে রাতেই বেশির ভাগ মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। মেইন রোডে গিয়ে দেখি রাস্তার দুপাশের গাছগুলো ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে উপড়ে পড়ে আছে। দুপাশের দোকানগুলোর দরজা, দেয়াল ভেঙ্গে রাস্তায় পড়ে আছে। কাঁচের টুকরার জন্য রাস্তায় হাঁটা যাচ্ছে না। এলাকার প্রায় প্রতিটা দোতলা-তিনতলার বাড়ির দেয়ালে কয়েকটা করে গুলির ছিদ্র। আশেপাশের বাঙ্গালিদের বাসায় গিয়েও একটু খোঁজ-খবর নিলাম। সৌরভরা, মুক্তারা, হীরণ ভাইরা - সবাই-ই ভালো আছে।

ঘরে ফিরে এসে গোসল টোসল সেরে যখন মাত্র ভাবছি আজ জুমার নামাজ পড়তে যাওয়া উচিত হবে কি না, তখনই আবার ধুপ-ধাপ শব্দ শুরু হয়ে গেল। বাড়িওয়ালার বোন উ'লা জানালা দিয়ে চিতকার করে বলল, বিদ্রোহীরা ১৭ কি.মি. পর্যন্ত এসে গেছে। আম্মু তাড়াতাড়ি মাটির চুলায় রান্না চাপিয়ে দিল, যেন গোলাগুলি শুরু হলে ঘরের বাইরে থাকা না লাগে। আধঘন্টা না পেরোতেই শব্দ আরো জোরালো হয়ে উঠল। বাড়িওয়ালার ভাই আ'তেফ এসে বলল তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের হতে। এলাকায় কোন লিবিয়ান নেই। বিদ্রোহীরা যদি এলাকায় ঢুকে পড়ে তাহলে সর্বনাশ। পুরুষদেরকে ধরে ধরে জবাই করবে আর মহিলাদেরকে ধরে নিয়ে যাবে। কাজেই এলাকায় থাকা যাবে না, অন্য কোথাও যেতে হবে। আব্বু জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবে, উত্তরে আ'তেফ বলল সে জানে না। আগে গাড়িতে উঠা যাক এরপর দেখা যাবে। কিন্তু ঘরে থাকা যাবে না।

লিবিয়ান প্রচার মাধ্যম যুদ্ধের প্রথম থেকেই প্রচার করে আসছে, বিদ্রোহীরা মানুষ জবাই করে, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, নারী নির্যাতন করে। এমনকি মার্চ-এপ্রিলের দিকে মোবাইল ফোনে করা কয়েকটা ভিডিওতে একজনকে জবাই করে পুরো গলা আলাদা করে ফেলছে এবং অপর একজনের কলিজা বের করে ফেলছে - এরকম দৃশ্য দেখাও গেছে। কিন্তু সব বিদ্রোহীই অমানুষ - এটা আমি কখনোই বিশ্বাস করিনি। একেবারে প্রথম দিকে যখন বিদ্রোহ শুরু হয় তখন স্বভাবতই গুন্ডা-বদমাশরাও তাতে যোগ দিয়েছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা না থাকার সুযোগে তারা কিছু অঘটন ঘটিয়েছেও। কিন্তু গত ছয়-সাত মাসে বিদ্রোহীরা এনটিসির অধীনে কিছুটা হলেও সংগঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রথম যখন নির্যাতনগুলো ঘটে তখনও সেটা শুধুই বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু এখন পুরোমাত্রায় যুদ্ধ। কাজেই বিদ্রোহীরা এসে শহর দখল না করে লুটপাট, খুন-খারাপি আর নারী-নির্যাতন করবে - এটা আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিন্তু নিজেদের জীবন নিয়ে কথা। তাই আ'তেফের সাথে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। আব্বুর ঘর ছাড়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমি শুধুমাত্র আম্মু এবং তিথির কথা চিন্তা করেই জোর করে রাজি করালাম। তাছাড়া আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে গতকাল ঠিক আমাদের বাসার সামনে থেকে যেভাবে আরপিজি মেরেছে, আজও যদি সেভাবে মারে, তাহলে বিরোধীরা শিওর আমাদের বাসা লক্ষ করে মিসাইল মারবে। আর ভাগ্য যদি আরও খারাপ হয়, তাহলে ন্যাটোও মেরে বসতে পারে।

আ'তেফের চেঁচামেঁচি আর তাড়াহুড়ায় আমরা দুপুরের খাবার না খেয়েই, কোন রকম জামাকাপড় না নিয়ে শুধুমাত্র পাসপোর্ট, কাগজপত্র এবং কিছু টাকাপয়সা ও স্বর্ণগয়না যে ব্যাগে ভরা ছিল, সেই ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দুটো গাড়ি তৈরি হল। একটা আ'তেফের ভলভো - সেটাতে আ'তেফ, উলা আর আ'তেফের স্ত্রী মবরুকা। অন্যটা টয়োটা পিকআপ। চালাবে মোত্তালেব, পাশের সীটে আব্বু, পেছনের সীটে আম্মু, তিথি আর মোত্তালেব-আ'তেফের মা হালিমা বুড়ী। পিছনের খোলা জায়গায় মালপত্র, খাবার-দাবার, তার সাথে উঠলাম আমি, তালহা, খালাতো ভাই শাওন, একটা মিসরী বুড়া এবং একজন মৌরতানী নিগ্রো। কালাশনিকভ রাইফেল নেওয়া হল চারটা, গুলি নেওয়া হল এক বালতি। রাইফেল একটা আ'তেফের গাড়িতে, একটা মোত্তালেবের সাথে, একটা আম্মুদের সীটের নিচে আর একটা নিল মৌরতানী ব্যাটা। সে বলল তার নাকি সামরিক ট্রেনিং আছে, প্রয়োজনে সে চালাতে পারবে।

আমার প্রথম থেকেই ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছিল না। কারণ লিবিয়ার যুদ্ধে গাদ্দাফী প্রথম থেকেই তার পক্ষে আফ্রিকান নিগ্রো মার্সেনারীদের ব্যবহার করে আসছিল। কারণ খুবই সহজ - লিবিয়ান সৈন্যদেরকে বিদ্রোহীদের দমন করতে পাঠালে তারা যদি গিয়ে দেখে বিদ্রোহীরা হচ্ছে তাদেরই ক্বাবিলার (গোত্রের) লোক, তাহলে তারা সাইড চেঞ্জ করে ফেলতে পারে। কিন্তু মার্সেনারীদের ক্ষেত্রে সেরকম কিছু ঘটবে না। আর তাই বিদ্রোহীরা এই মার্সেনারীদের উপরেই সবচেয়ে বেশি ক্ষ্যাপা। তাদেরকে পেলেই নির্বিচারে গুলি করে মারে। তবে বাস্তবে মার্সেনারীর সংখ্যা যতটা না বেশি, তার চেয়ে বেশি ছিল এ বিষয়ক প্রচারণা। শোনা যায় বিদ্রোহীরা কোন এলাকা দখলের পর সেখানে নিরীহ নিগ্রোদেরকে পেলেও তাদের হাতে অস্ত্র ধরিয়ে দিয়ে বলে, বল্ তোরা গাদ্দাফীর ভাড়াটে সৈন্য। এরপর সেই দৃশ্য ভিডিও করে মিডিয়াতে প্রচার করে।

যাই হোক, আমরা যাত্রা শুরু করার সময়ই দেখতে পেলাম আমাদের এলাকার ভেতরে জায়গায় জায়গায় পাঁচ-ছযজন করে যোদ্ধারা হেঁটে হেঁটে পজিশন নেওয়ার মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজছে। প্রায় সবার হাতেই কালাশনিকভ এবং পিঠে রকেট লঞ্চার। গলি থেকে বেরিয়ে আমাদের গাড়ি শহরের বাইরে পশ্চিম দিকে যেতে লাগল। ওদিক থেকেই বিদ্রোহীরা আক্রমণ করবে, কিন্তু ওদিক কিছু মাজরা (ফার্ম) আছে, সেখানে গিয়ে হয়তো আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। মেইন রোড দিয়ে এগুতো পারলাম না, সেখানে রোডব্লক। বিভিন্ন মানুষের মাজরার ভেতর দিয়ে অনেক ঘুরে ফিরে এগুতে লাগলাম। অবশেষে দূর থেকে একটা পাকা রাস্তা দেখা গেল (ম্যাপে ৬) যেটা পার হলেই আমরা কামালের শ্বশুরবাড়ির মাজরায় গিয়ে উঠতে পারব।



গুগল ম্যাপ থেকে নেওয়া ছবি


ছবির বর্ণনা:
(২) - আমাদের বাসা
নীল দাগ - যেদিক দিয়ে বিদ্রোহীরা প্রথমদিন বিকেলে ঢুকেছিল
(১) সমুদ্রের পাড়ের উঁচু রাস্তা দিয়ে যে পর্যন্ত এসে ফেরত গিয়েছিল
হলুদ দাগ (২ থেকে ১ পর্যন্ত) আমাদের বাসার সামনে থেকে বিদ্রোহীদের গাড়ি লক্ষ করে আরপিজি মারার পথ
(৫) কুশার সামনের গোলচত্বর, তালহা খুবজা কিনতে গিয়ে যেখানে গাদ্দাফী বাহিনীকে পজিশন নিতে দেখেছিল
(৪) এখান থেকে বিদ্রোহীরা দুই ভাগ হয়ে একগ্রুপ সমুদ্রের পাড়ের রাস্তা ধরে (১) এগিয়েছে, অন্যগ্রুপ সোজা এগিয়ে (৩) পর্যন্ত থেমে আক্রমণ করছিল
লাল দাগ - যে রাস্তা ধরে আমরা পালিয়েছি
(৬) যে জায়গায় আমরা বিদ্রোহীদের হাতে ধরা খেয়েছি



এতক্ষণ রাস্তায় একটা গাড়িও চোখে পড়েনি। কিন্তু এই প্রথম পাকা রাস্তাটার উপরে কয়েকটা যুদ্ধের গাড়ি (টয়োটা এবং মিতসুবিশী পিকআপ এবং আর্মি জীপ) চোখে পড়ল। মনে হল সেগুলো টহল দিচ্ছে। আমরা ধরেই নিলাম এগুলো গাদ্দাফীর সৈন্যদের গাড়ি। কারণ বিরোধীরা এই পর্যন্ত আসলে আর কিছু না হোক অন্তত কিছু গোলাগুলি তো হতো! তাছাড়া বিরোধীরা এতো ধীরে সুস্থে গাড়ি চালিয়ে টহল দেওয়ারও কথা না। মাজরা থেকে উঠে আমরা যেই মুহূর্তে রাস্তাটা অতিক্রম করে অন্যপাশের মাজরায় যাব, ঠিক তখনই হঠাত করে প্রচন্ড বেগে চারটা গাড়ি আমাদের পাশে চলে এল এবং আমাদেরকে লক্ষ করে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, ওয়াজ্ঞেফ! ওয়াজ্ঞেফ! অর্থাত, থাম! থাম! গাড়িগুলোর দিকে তাকাতেই আমার কেমন যেন সন্দেহ হতে লাগল। কারণ একটা গাড়ির পেছনে যেভাবে হেভী মেশিনগান ফিট করা এবং তার সামনে যেরকম পুরু লোহার পাতের ঢাল দেওয়া, সেটা শুরু জাজিরাতে বিরোধীদের গাড়িতেই দেখেছি। গাদ্দাফী বাহিনীর কাছে কখনও দেখিনি।

মোত্তালেব গাড়ি থামাতে না থামাতেই গাড়ি চারটাও থেমে গেল এবং সেগুলো থেকে যোদ্ধারা নেমে দৌড়ে আমাদের দিকে আসতে লাগল আর চিতকার করে বলতে লাগল, ইনজিল! হাইয়া, ইনজিল! খাল্লি শুফ ইয়াদাইকুম! অর্থাত, নাম! তাড়াতাড়ি নাম! হাতগুলো দেখতে দাও! প্রত্যেকের হাতে রাইফেল, কয়েকজন সেগুলো লোড করে নিল। ইয়ংবয়সী ফর্সা একটা ছেলে, যে দলটার নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সে পকেট থেকে ৯.৫ মি.মি. পিস্তল বের করে সেটাও লোড করে নিল। ততক্ষণে আমার চোখে পড়ে গেছে ফর্সা ছেলেটার মাথায় বিরোধীদের পতাকার রংয়ের ক্যাপ। আমার মনে হতে লাগল এই বুঝি আমাদের জীবনের শেষ দিন। কারণ তখনও আমাদের পাশে সেই মৌরতানী নিগ্রোটা রাইফেলটা হাতে ধরেই বসে আছে। সামান্য একটু ভুল বুঝাবুঝির কারণে এখন গোলাগুলি শুরু হয়ে যেতে পারে। আর এতো কাছ থেকেগুলি মিস হওয়ার কোনই সম্ভাবনা নেই। আমি তাড়াতাড়ি নেমে তালহা আর শাওনভাইয়াকেও নামতে বললাম। ততক্ষণে বিদ্রোহীরা এসে মৌরতানী লোকটার কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে গেছে এবং মোত্তালেবের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আমি তালহা, আব্বু আর শাওনভাইয়াকে আস্তে আস্তে বললাম, আমরা একটু দুই হাত দূরে থাকি যেন ওরা বুঝতে পারে আমরা একটা ফ্যামিলি এবং আমরা অস্ত্রশস্ত্রের সাথে জড়িত না। কিন্তু আমার নিষেধ সত্ত্বেও তালহা গাধাটা বারবার সামনে গিয়ে বিরোধীদের সাথে মোত্তালেবের তর্কাতর্কি শোনার চেষ্টা করছিল।

বিদ্রোহীরা মোত্তালেবের হাতের রাইফেলটা নিতে চাইল, কিন্তু মোত্তালেব সেটা দিতে রাজি হল না। মোত্তালেব এমনিতে প্রথম থেকেই বিদ্রোহীদের সাপোর্টার, কিন্তু অস্ত্র কে হাতছাড়া করতে চায়? একজন মোত্তালেবকে জিজ্ঞেস করল, অস্ত্রের কার্ড আছে? কোথা থেকে অস্ত্র পেয়েছ? মোত্তালেব চালাকি করে উত্তর দিল, দেশের অস্ত্র। দেশ দিয়েছে। লোকটা তখন বলল, দেশ মানে কি? মোয়াম্মারের অস্ত্র? মোত্তালেব মাথা নাড়িয়ে বলল, হ্যাঁ।
লোকটা তখন বলল, মোয়াম্মার? ওয়েন মোয়াম্মার? মোয়াম্মার হ্যাদা গেদিম, খালাস! তাউয়া মাজলেজ। মাজলেস গাল এসলাহ মামনুয়া। খালাস, আতিনী এসলাহ।
অর্থাত, মোয়াম্মার? কোথায় মোয়াম্মার? সে তো পুরানো কাহিনী, শেষ! এখন কাউন্সিল ক্ষমতায়। কাউন্সিল বলেছে সাধারণ মানুষের কাছে অস্ত্র নিষিদ্ধ। ব্যাস, অস্ত্র দিয়ে দাও।
মোত্তালেব তারপরেও বাড়াবাড়ি করতে লাগল। তখন একজন যোদ্ধা তার কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ইয়া খুইয়া, আতিনী এসলাহ, ওয়া ওয়েন তিব্বী, এমশি। মা'ক আ'ইলা, মানিশ কাল্লেম হাজা। অর্থাত, ভাই, অস্ত্র দিয়ে দাও, এরপর কোথায় যেতে যাও, যাও। তোমাদের সাথে ফ্যামিলি আছে, আমরা কিছু বলব না। একজন যোদ্ধা আমাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোথাকার? বললাম, বাংলাদেশী। হাতে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলল, ভালো। আরেকজন পিকআপের পেছনে মালপত্রের মধ্যে একনজর তাকিয়েই একটা বালতি তুলে নিল। সেই বালতিতেই গুলি ভরা ছিল। গাড়ির ভেতরেও হয়তো তার চেক করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু উঁকি দিয়ে যখন দেখল ভেতরে মহিলা, তখন আর চেক করল না। শুধু হাত উঁচু করে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, মাতখাফ্‌শ, মাতখাফ্‌শ। অর্থাত, ভয় পেওনা, ভয় পেওনা।

এই চরম পরিস্থিতির মধ্যেও তালহা কয়েকবার আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ফেলল, বিদ্রোহীরা কী ভালো, না? আসলেই! আমিও বিদ্রোহীদের ব্যবহারে অবাক না হয়ে পারলাম না। গত ছয় সাত মাস ধরে লিবিয়ান টিভিতে আর সিরতের লিবিয়ানদের মুখে বিরোধীদের সম্পর্কে যেসব ভয়ংকর কাহিনী শুনেছি, তার সাথে কোন মিলই নেই। কাঁধের উপর হাত দিয়ে, ভাই সম্বোধন করে, এতো ভদ্রভাবে কথা বলা, কোন বিদ্রোহী গ্রুপের কাছ থেকে আশা করা যায় - এটা আমার কল্পনাতেও ছিল না। মোত্তালেবের সাথে তর্কাতর্কি হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলত, কিন্তু এমন সময় হঠাত আশেপাশে কোথাও একটা শেল এসে পড়ল। তার প্রায় সাথে সাথেই একের পর এক গুলি এসে আশেপাশের গাছে এবং ল্যাম্প পোস্টের উপরের দিকে বাড়ি খেতে লাগল। দুইজন বিদ্রোহী যোদ্ধা একটা গাছের আড়ালে পজিশন নিয়ে কান ফাটানো শব্দে ফায়ার করতে শুরু করল। আর আমাদেরকে ঘিরে থাকা যোদ্ধারা বলতে লাগল, যাও ভাগো। তাড়াতাড়ি পালাও, সাবধানে যেও। মিসাইল এসে পড়তে পারে। মোত্তালেবও এবার রাইফেলটা ছেড়ে দিল। গাড়িতে উঠে বসে স্টার্ট দিয়ে সে গাড়িটা ছেড়ে দিল, পিছনে কে উঠতে পেরেছে সেটা না দেখেই। সবাই অবশ্য উঠে পড়েছে, আমি শুধু তালহাকে উঠিয়ে দিতে গিয়ে দেরি করে ফেললাম। গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। আমি সকল নিয়ম-নীতি ভংগ করে দৌড়ে এসে একটা লাফ দিয়ে পুরো শরীর নিয়ে একসাথে পিকআপটার পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।

পা'টা পড়ল একেবারে বেকায়দা ভাবে। হয়তো মচকে গেছে, কিন্তু সেদিকে লক্ষ করার মতো অবস্থা তখন নেই। এবড়ো-থেবড়ো কাঁচা রাস্তা দিয়ে ঝড়ের বেগে গাড়ি চলছে, আর আমরা পিকআপের পেছনে সবাই মাথা নিচু করে শক্ত করে একজন আরেকজনকে ধরে বসে আছি। মাথার উপর দিয়ে, কানের পাশ দিয়ে শাঁই শাঁই করে শিস কাটার মতো শব্দ করে বুলেট উড়ে যাচ্ছে। এর আগে শুধু মাসুদ রানাতেই এরকম বর্ণনা পড়েছিলাম, নিজের জীবনে কখনো ঘটবে, সেটা কল্পনাও করিনি।

গাড়ি এসে থামল কামালের শ্বশুরবাড়ির মাজরায়। নেমে দেখি আম্মু, তিথি, উলা, মবরুকা, বুড়ি সবার মুখ ফ্যাকাশে, চোখেমুখে কান্নাকান্না ভাব। যে বিরোধীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এতো আয়োজন, ঘর থেকে বেরোতে না বেরোতেই সেই বিরোধীদের হাতে পড়লে অবশ্য এরকমই হওয়ার কথা। একমাত্র মোত্তালেবের উল্লাস দেখার মতো। সে খুশি যে, বিরোধীরা শহরে ঢুকে পড়েছে। আ'তেফের চেহারার দিকে অবশ্য একেবারেই তাকানো যাচ্ছিলনা। সে মাথায় হাত দিয়ে এক কোনায় বসে রইল। আ'তেফ ছিল একেবারে খাঁটি গাদ্দাফীর পক্ষে। বিরোধীদের হাতে এভাবে ধরা খেয়ে সবগুলো অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে, এটা সে কল্পনাও করে নি। অবশ্য স্বান্তনার কথা একটাই, আম্মুদের সীটের নিচে যে রাইফেলটা ছিল, সেটা বেঁচে গেছে। বিরোধীরা গাড়ির ভেতরে চেক করেনি, তাই এটা দেখতেও পায় নি।

বিদ্রোহীরা আসলে কেমন হয়, সেটা দেখার শখ অনেক দিন ধরেই ছিল। আজ সেটা পূরণ হল, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা যে এমন ভয়াবহ হবে, সেটা কে জানত? আমাদের ধারণা হল, আমরা নিরাপদ স্থানে এসেছি, কিন্তু কামালের স্ত্রী মাস্তুরার ভাই ওমর আর মোস্তফা জানাল, বিদ্রোহীরা নাকি এখান থেকে মাত্র এক কিমি দূরে একটা মাজরায় ঘাঁটি তৈরি করেছে। কাজেই এই জায়গাও নিরাপদ না। বিরোধীরাও যেকোন সময় তল্লাশী করতে আসতে পারে, অথবা গাদ্দাফী বাহিনীও মিসাইল মারতে পারে। আমরা এক নতুন অপরিচিত জায়গায় বসে বসে আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।


... চলবে ...




সিরত যুদ্ধের আরও কিছু কিছু ছবি -

এই রাস্তাতেই আমরা বিদ্রোহীদের হাতে ধরা খাই


যুদ্ধ চলছে


যুদ্ধ চলছে


বিদ্রোহীরা পজিশন নিয়ে আছে


আরপিজি মেরে ফেরত আসছে


হাইডলার রোডে যুদ্ধ চলছে


বিদ্রোহীদের হাতে গাদ্দাফীর এক সৈন্য


হাইডলার রোড - গাড়ির উপরে ক্রস চিহ্ন যেন ন্যাটো বোমা না মারে


শহরের রাস্তায় মিসাইলের খোসা পড়ে আছে
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29491003 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29491003 2011-11-26 17:34:23
লিবিয়া যুদ্ধে আমি এবং আমাদের নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স
গত আটমাসে লিবিয়া জুড়ে যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধটি হয়েছে গাদ্দাফীর জন্মস্থান সিরতে। সিরতের মধ্যে যে এলাকাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছে, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে এলাকাটিতে তুমুল যুদ্ধ চলেছে এবং যে এলাকা থেকে শেষ পর্যন্ত গাদ্দাফীকে ধরা হয়েছে, তার নাম রক্বম এতনীন (এরিয়া নাম্বার টু)। আর দুর্ভাগ্যবশত আমরা ছিলাম সেই এলাকার অধিবাসী এবং যুদ্ধের শেষ পর্যন্তও আমরা হাজার হাজার মিসাইল এবং লক্ষ লক্ষ রাউন্ড গোলাগুলির মধ্যেও সেই এলাকাতেই ছিলাম। বাঁচব - এই আশা ছিল না। কিন্তু সম্ভাব্যতার সকল সূত্রকে ভুল প্রমাণ করে একমাত্র আল্লাহ্‌র অসীম অনুগ্রহে শেষ পর্যন্ত আমরা বেঁচে গেছি।

মুভির মধ্যে ওয়ার জেনরটা আমার সবচেয়ে ফেভারিট। দ্যা পিয়ানিস্ট, সেভিং প্রাইভেট রায়্যান, শিন্ডলার্স লিস্ট, হোটেল রুয়ান্ডা, ব্রাদারহুড অফ ওয়্যার সহ দেশ-বিদেশের সেরা সেরা যুদ্ধের প্রায় সবকটি মুভিই আমার দেখা। কিন্তু যে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমি নিজে প্রতক্ষ্য করেছি, সেটা নিঃসন্দেহে যেকোন সিনেমাকে হার মানায়। যে ঘটনাগুলো আমাদের জীবনে ঘটে গেছে, ভালো কোন ঔপন্যাসিকের হাতে পড়লে সেগুলো দিয়ে একটা কালজয়ী উপন্যাস লিখে ফেলা সম্ভব। কিংবা ভালো পরিচালকের হাতে পড়লে সেগুলো দিয়ে অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র বানিয়ে ফেলাও অসম্ভব কিছু নয়। দুর্ভাগ্য সেরকম লেখনী বা পরিচালনা কোন রকম ক্ষমতা নিয়েই আমার জন্ম হয়নি। তাই আপাতত এই যুদ্ধে আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সারমর্ম লিখেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

অবশ্য আমার ইচ্ছা আছে ভবিষ্যতে এই যুদ্ধের ঘটনাবলী নিয়ে ধারাবাহিকভাবে একটা আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস লেখার, যেখানে আমার অভিজ্ঞতা তো অবশ্যই, সেই সাথে এই যুদ্ধের মূল কারণ, যুদ্ধের জনসমর্থন, গাদ্দাফীর জনপ্রিয়তা, মিডিয়ার ভূমিকা প্রভৃতি বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। পড়ার অগ্রিম আমন্ত্রণ রইল।

১। যুদ্ধের প্রথম দিকে অর্থাত ফেব্রুয়ারি মাসে সিরতের পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক ছিল। মিছিল সমাবেশ যা হতো সবই সরকারী আয়োজনে এবং গাদ্দাফীর পক্ষে। সেই সব মিছিলে অবশ্য জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নিত। মার্চ মাসের ৪ তারিখে পুরো লিবিয়াতে ইন্টারনেট কানেকশন কেটে দেওয়া হয়। মার্চের ১৯ তারিখে ফ্রেঞ্চ-আমেরিকান-ব্রিটিশ বিমান আক্রমণ শুরু করে। প্রথম দুই সপ্তাহে সিরতেও বেশ কিছু ভয়াবহ বিমান হামলা হয়। দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা ন্যাটোর উড়াউড়িতে কান ঝালাপালা হওয়া ছাড়া অবশ্য এতে সাধারণ মানুষের অবশ্য তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। প্রথম প্রথম ন্যাটোর বিমানের আওয়াজে ভয় লাগলেও পরে সেগুলো অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। মে-জুন-জুলাই মাসের দিকে সিরতে ন্যাটো একেবারেই উড়ত না। তখন সিরতের মানুষের পক্ষে বুঝাই সম্ভব ছিল না যে, লিবিয়ার অন্যান্য এলাকায় রকম ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে।

২। রোযার মাস থেকে সিরতের পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। বিদ্রোহীরা মিসরাতা, জিনতান, নাফূসা মাউন্টেইন সহ বিভিন্ন এলাকার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলে এবং গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়েগুলো দখলে নিয়ে নেয়, যার কারণে সিরতের সাথে ত্রিপলীর যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়ে। দোকান-পাট গুলো খালি হতে শুরু করে, পেট্রোলের অভাবে রাস্তায় ট্যাক্সি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি, গ্যাস এবং বিদ্যুতের সংকটও শুরু হয়। রোযার মাঝামাঝি আমাদের গ্যাস শেষ হয়ে যায় এবং আমরা মাটির চুলা তৈরি করে কাঠ দিয়ে রান্না শুরু করি। শেষের দিকে অবশ্য শহরে কাঠেরও সংকট শুরু হয়। মানুষ মাজরায় গিয়ে আস্ত গাছ উপড়ে নিয়ে আসতে শুরু করে। এ সময় দুই দিন পরপর দুই-তিন ঘন্টা করে কারেন্ট দেওয়া হতো। অথচ এর আগে সারা জীবনে লিবিয়াতে মোট কত ঘন্টা বিদ্যুত ছিল না, সেটাও হাতে গুনে বলে দেওয়া যেত। গাদ্দাফী বাহিনীর দাবি ছিল বিদ্রোহীরা পাওয়ার সাপ্লাই কেটে দেওয়ার কারণে কারেন্ট নেই, কিন্তু এটা অনেকের কাছেই বিশ্বাসযোগ্য ছিল না কারণ বিদ্রোহীরা ইচ্ছে করলে পানির সাপ্লাইও কেটে দিতে পারত। বরং গাদ্দাফী বাহিনী নিজেই ইচ্ছে করে কারেন্ট বন্ধ করে রাখত যেন মানুষ আল জাজিরা, আল আরাবিয়া দেখে দেশের প্রকৃত অবস্থা (অধিকাংশ এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে) জানতে না পারে - এটা আরও অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য ছিল।

৩। রমজান মাসের ২০ তথা আগস্টের ২০ তারিখে বিদ্রোহীরা ত্রিপলী আক্রমণ করে এবং অকল্পনীয়ভাবে প্রায় বিনা বাধায় মাত্র এক রাতের মধ্যে ত্রিপলী দখল করে ফেলে। গাদ্দাফীর তথ্যমন্ত্রী মূসা ইব্রহীম আগের দিনও বলেছিল ত্রিপলী দখল করা অসম্ভব কারণ গাদ্দাফীর অনুগত ৬৫,০০০ সৈন্য এবং সশস্ত্র সাধারণ জনগণ ত্রিপলী রক্ষা করবে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয় নি। ত্রিপলীর গ্রীন স্কয়ার দখলের পরদিন ২২ তারিখে বিদ্রোহীরা টিভি সেন্টার এবং মোবাইল ফোন কোম্পানীগুলো দখল করে নেয়, সাথে সাথেই সবাইকে ৫০ দিনার (প্রায় ২৫০০ টাকা) করে উপহার দেয়, দীর্ঘ ছয মাস পর ইন্টারনেট উন্মুক্ত করে দেয় এবং "গাদ্দাফীকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সবাইকে অভিনন্দ" এই জাতীয় একটা এসএমএস পাঠায়। এই এসএমএস মোবাইলে আসা মাত্রই সিরতে গাদ্দাফী বাহিনী নেটওয়ার্ক কেটে দেয়।

৪। ত্রিপলী দখলের পরপরই বিদ্রোহীরা নজর দেয় সিরত, সাবহা এবং বেনওয়ালিদের উপর। এরমধ্যে সিরত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ সিরত কোস্টাল হাইওয়ের উপর অবস্থিত। এবং ত্রিপলী বা মিসরাতার সাথে বেনগাজীর যোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে এই কোস্টাল হাইওয়ে। রোযার ঈদের পরপরই বিদ্রোহীরা বেনওয়ালিদ আক্রমণ করে। সেপ্টেম্বরের দুই তারিখ রাত ঠিক বারোটার সময় বিদ্রোহীরা বেনওয়ালিদ শহরের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ঠিক যে মুহূর্তে আল জাজিরাতে এই সংক্রান্ত ব্রেকিং নিউজ পরিবেশন করে, তার পাঁচ মিনিট পরেই সমগ্র সিরতের বিদ্যুত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গ্যাস, ইন্টারনেট, ফোন আগেই বন্ধ ছিল। এবার কারেন্টও গেল। আমরা শুধু আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করছিলাম পানিটা যেন না যায়।

৫। সেপ্টেম্বরের ১০ বা ১১ তারিখে সিরতে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটল। সিরতের রক্বম ওয়াহেদ (এরিয়া নাম্বার ওয়ান) নামক এলাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই মিসরাতী ক্বাবিলার (গোত্রের) অন্তর্ভুক্ত এবং স্বভাবতই তারা গাদ্দাফীবিরোধী। কিন্তু সংখ্যালঘু হওয়ায় তারা এতোদিন নিশ্চুপ ছিল। তাদের অনেকে এমনকি মিছিলে সবুজ নিয়ে "আল্লাহ‌, মোয়াম্মার, ওয়া লিবিয়া, ওয়া বাস" অর্থাত "আল্লাহ, গাদ্দাফী অ্যান্ড লিবিয়া, অ্যান্ড দ্যাটস অল" স্লোগান পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে অনেকেই গোপনে স্যটেলাইট ফোনের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিল। এরকম একজন ব্যক্তি ছিল আ'দ সাফরুনী। খবর পেয়ে গাদ্দাফী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তারের জন্য যায়। ধরা খাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, তাই সে ধরা না দিয়ে বিদ্রোহীদের চাঁদ-তারা খচিত তিন বর্ণের পতাকা নিয়ে বেরিয়ে আসে। শুরু হয় গোলাগুলি। সাফরুনীর পুরো বাড়ি রকেট লঞ্চার দিয়ে ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। সে এবং তার এক ছেলে মারা যায়। গাদ্দাফীর পক্ষের মারা যায় আরও পাঁচজন।

গোলমালটা বাঁধে সাফরুনীর ছেলেকে নিয়ে। সে মারা গিয়েছিল ধারণা করে তাকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখা হয়। কিন্তু লাশ গোসল করানোর জন্য বের করতে গিয়ে দেখা গেল যে সে আসলে তখনও মরে নি। এই খবর কোন এক আশ্চর্য উপায়ে মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। এবং মিডিয়া তার স্বভাব অনুযায়ী ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জীবন্ত মানুষকে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখার মতো এই অমানবিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে। এর ফল হিসেবে মিসরাতার বিদ্রোহী যোদ্ধারা সিরত আক্রমণের জন্য দলে দলে এসে জমা হতে থাকে।

৬। ১৩ই সেপ্টেম্বর প্রথম আমরা একটু ভিন্ন ধরনের শব্দ পেলাম। এর আগে ন্যাটো যখন অনেক দূরে কোথাও বোমা ফেলত, তখন শব্দ যতটুকু হতো না হতো, সেই তুলনায় মাটি এবং ঘরের দরজা-জানালা কেঁপে উঠত অনেক বেশি। কিন্তু এই প্রথম আমরা অনেক দূর থেকে ধুপ-ধাপ জাতীয় এক ধরনের প্রতিধ্বনির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু কোন কম্পন অনুভব করছিলাম। আমাদের অনেকেরই ধারণা হল এবং মাত্র চার-পাঁচ জন লিবিয়ান স্বীকার করল এগুলো ট্যাংক, মর্টার এবং আরপিজির (রকেট প্রপেলিং গ্রেনেড) আওয়াজ। বিদ্রোহীরা চল্লিশ কিলোমিটার পর্যন্ত চলে এসেছে। সেখানে যুদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু সিরত রেডিও এবং সাধারণ লিবিয়ানদের মুখে তাদের সেই ক্লাসিক্যাল সুর। এগুলোর লিবিয়ান সেনাবাহিনীর (গাদ্দাফী বাহিনী) অনুশীলনের আওয়াজ। বিদ্রোহীরা সিরতের কাছাকাছি আসার প্রশ্নই উঠে না। কারণ সিরতে গাদ্দাফীর ২০,০০০ সৈন্য আছে। তাছাড়া লিবিয়ার সব জনগণই তো গাদ্দাফীকে চায়। বিদ্রোহীরা মূলত তালেবান এবং কাতার ও আরব আমিরাতের সৈন্য, তারা সংখ্যায় খুবই কম। সিরতে ঢুকবে কি, মিসরাতাই তো এখন আর তাদের দখলে নেই। সিরতের দিকে যখন এগোচ্ছিল, তখন লিবিয়ান সৈন্যরা দক্ষিণ দিকের সাহারা থেকে আক্রমণ করে মিসরাতা দখল করে ফেলেছে। একদিকে মিসরাতা পর্যন্ত এবং অন্যদিকে ব্রেগা পর্যন্ত গাদ্দাফীর দখলে। আর এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরা লিবিয়া গাদ্দাফীর দখলে চলে আসবে।

৭। ১৪ই সেপ্টেম্বর একটু শান্ত ছিল। কিন্তু ১৫ই সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই মর্টারের শব্দ ধীরে ধীরে জোরালো হতে থাকে। সকালে আমি, আমার খালাতো ভাই শাওন, আমাদের প্রতিবেশী ইয়াসিন এবং শাকের সমুদ্রে গিয়েছিলাম মাছ ধরার জন্য। গত কয়েকমাস ধরে বাজারে কোন মাছ নেই। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিম নেই, মুরগীও নেই প্রায় সপ্তাহখানেক ধরে। মাছ অবশ্য পাই নি, কিন্তু সেখানে একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম বিদ্রোহীরা নাকি সিরতের বিশ কিলোমিটারের মধ্যে চলে এসেছে। বাসায় ফিরে এসে দেখি আমার ছোটভাই তালহা ঘরে নেই। সে বাড়িওয়ালার ভাই মোত্তালেবের সাথে খুবজা কিনতে গেছে। খুবজার দোকানটা (কুশা) সিরত শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে। বিদ্রোহীরা ঐদিক দিয়েই আসছে। মর্টারের আওয়াজ যত জোরালো হয়ে উঠতে লাগল, তালহার জন্য আমরা তত দুশ্চিন্তা করতে লাগলাম। বিকেল চারটার দিকে তালহা যখন রাস্তার দিক থেকে কান ফাটানো শব্দ হতে লাগল, ঠিক তখনই ধুলো ছিটিয়ে প্রায় ১২০ কিমি গতিতে মোত্তালেব গাড়ি চালিয়ে এসে ব্রেক করল এবং হাঁপাতে হাঁপাতে তালহা গাড়ি থেকে নেমে এল। তারা মাত্র নেমেছে, আর সাথে সাথেই রাস্তার দিকে মর্টার শেল এসে পড়তে লাগল।

তালহার মুখ থেকে যা শুনতে পেলাম তা হচ্ছে, তারা যখন কুশায় খুবজার জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন প্রথমে একজন লোক এসে খবর দিল যে বিদ্রোহীরা ২৩ কি.মি. পর্যন্ত চলে এসেছে। তার পাঁচ মিনিট পরেই আরেকজন এসে বলল বিদ্রোহীরা ১৭ কি.মি. পর্যন্ত এসে গেছে, সবাই যেন তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যায়। লোকজন তার কথা বিশ্বাস না করে তাকে ধমকে ভাগিয়ে দিল। কারণ সবাই গাড়ির রেডিওতে সিরত রেডিও শুনছিল। সেখানে বলা হচ্ছিল, পঞ্চাশ কি.মি. দূরে যুদ্ধ হচ্ছে, স্বেচ্ছাসেবীরা যেন তাদের গাড়ি এবং অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে যায়। গাড়িতে বেশি পেট্রোল না থাকলেও সমস্যা নেই, ত্রিশ কি.মি. দূরের একটি ফিলিং স্টেশনে ফ্রি পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয় লোকটা চলে যেতে না যেতেই হঠাত কান ফাটানো শব্দ হতে থাকে এবং গাদ্দাফীর সৈন্যরা শহরের বাইরের দিকে ফিরে এসে কুশার সামনের গোল চত্বরে মেশিনগান এবং মিসাইল ফিট করে পজিশন নিয়ে ফায়ার করতে শুরু করে। সাথে সাথে সবাই দিগ্বিবিক শূণ্য হয়ে পালাতে শুরু করে। তালহা জোরে চিতকার করে কথা বলছিল কিন্তু আমরা সেটাও ঠিকমতো শুনতে পারছিলাম না। কারণ ততক্ষনে আমাদের সামনের গলিতে পজিশন নিয়ে গাদ্দাফী বাহিনী রাস্তার দিকে মেশিনগানের ফায়ার করা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাত বিদ্রোহীরা শহরে ঢুকে পড়ছে।

বৃহস্পতিবারের সেই বিকেল আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিনগুলোর মধ্যে একটা। কান ফাটানো শব্দ করে একটার পর একটা মিসাইল এসে আশেপাশে পড়ছে। উপর দিয়ে ন্যাটো প্রচন্ড শব্দ করে উড়ছে। গাদ্দাফী বাহিনীর মেশিনগান অবিরত বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষন করে যাচ্ছে। এর মধ্যে আমরা হঠাত অনেক মানুষের মিছিলের মতো আনন্দধ্বনি শুনতে পেলাম। আমাদের বাসার উত্তরে সমুদ্রের পাড় দিয়ে নতুন একটা রাস্তা গিয়েছে যেটা সমতল থেকে বেশ উঁচু, সেই রাস্তা দিয়ে বিদ্রোহীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে হঠাত গাদ্দাফী বাহিনীর কয়েকটা ছেলে এসে আমাদের বাসার ঠিক সামনে থেকে আড়াল নিয়ে বের হয়ে সেই রাস্তা লক্ষ করে একটা আরপিজি মারল। ধোঁয়ায় চারদিক ভরে গেল। এবং ছেলেগুলো আরপিজি মেরেই দৌড়ে পালিয়ে গেল। বিদ্রোহীরা সেই রাস্তা ধরে আর না এগিয়ে পিছু ফিরে গেল। কিন্তু সেখান থেকে শহরের উপর এলোপাথাড়ি মেশিনগানের গুলি আর মিসাইল মারতে লাগল। আমরা এবং বাড়িওয়ালারা আমাদের বাসা থেকে বের হয়ে সামনে বাড়িওয়ালার ভাই হামজা নতুন বাড়ি বানাচ্ছিল, সেখানে আশ্রয় নিলাম। বাড়িটাতে এখনও দরজা-জানালা লাগানো হয় নি, কিন্তু এর ছাদটা তুলনামূলকভাবে একটু মজবুত। তাই মিসাইল পড়লে হয়তো একটু কম ভাঙবে। এরমধ্যেই ন্যাটো হঠাত একটা বোমা মারল আমাদের বাসা থেকে এক থেকে দেড়শ মিটারের মধ্যে। মনে হল পুরো ঘর যেন ভেঙ্গে মাথার উপর পড়ছে। কিন্তু না, পুরানো প্লাস্টার খসে পড়ে ছাড়া আর কিছু ঘটল না।

এই গোলাগুলির মধ্যেই আমাদের বাড়িওয়ালা কামাল তার যাবতীয় অস্ত্রশ্ত্র, অর্থাত আট-দশটা কালাশনিকভ রাইফেল, একটা স্নাইপার রাইফেল, তিনটা রকেট লঞ্চার এগুলো বস্তায় ভরে মাটি গর্ত করে লুকিয়ে ফেলল। কামাল নিরাপত্তা বাহিনীর কিছুতে চাকরি করত। প্রায়ই সে অস্ত্র নিয়ে ব্রেগা, রাস লানুফ প্রভৃতি শহরে গাদ্দাফীর যোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে যেত। কিন্তু আজ যখন একেবারে ঘরের সামনে যুদ্ধ চলছে, সে তখন সব অস্ত্র মাটিচাপা দিয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে বউয়ের পাশে বসে আছে।

সেদিন শহরের ভেতর যুদ্ধ মাত্র দুই ঘন্টা স্থয়ী হয়েছিল। সন্ধ্যার সাথে সাথেই বিদ্রোহীরা ফিরে গেল। কিন্তু রেখে গেল একটি শহরের ধ্বংসস্তুপ। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলছে। আমাদের গলি থেকে বেরুলে রাস্তার উপরেই যে ফার্নিচারের দোকান, সেটায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের গন্দে বাতাস ভারী হয়ে গেছে। আমাদের নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হতে থাকে। কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য শুনলাম গাদ্দাফী বাহিনী রাস্তায় মিছিল বের করেছে। তাদের দাবি, তারা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে "ইঁদুরগুলোকে" তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এটা তাদের মহা বিজয়।

রাতের বেলা আমাদের প্রতিবেশী নবী স্যার এবং ইয়াসিনের আব্বা রমজান আংকেল আসল আমাদের বাসায়। ইয়াসিনের ছোট বোন খাদিজা পালি গুলি খেয়েছে। ঘরের দেয়াল ভেদ করে গুলি এসে পায়ে ঢুকেছে। ঐ মুহূর্তে হসপিটালে নেওয়া সম্ভব ছিল না, তাই রমজান আংকেল নিজেই ব্লেড দিয়ে উরুর মাংস কেটে এরপর প্লায়ার্স দিয়ে টেনে গুলিটা বের করেছেন। পরে যুদ্ধ থামার পর হসপিটালে নিয়ে গেছেন। হসপিটালে গিয়ে শুনলেন তখন পর্যন্ত দেড়শ লাশ নেওয়া হয়েছে হসপিটালে।

আজকের মতো যুদ্ধ শেষ হয়েছে। গাদ্দাফী বাহিনী যতই দাবি করুক, তারা বিদ্রোহীদের তাড়িয়ে দিয়েছে, আমরা তো দেখেছি তারা তেমন কোন প্রতিরোধই করতে পারেনি। বিদ্রোহীরা এল, দেখল এবং মারল। আজ হয়তো সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় তারা চলে গেছে। কিন্তু কাল তো আবার আসবে। সিরতের তথাকথিত ২০,০০০ সৈন্যের বূহ্য ভেদ করে একবার যেহেতু তারা ঢুকতে পেরেছিল, আবারও পারবে। কিন্তু কথা হচ্ছে কতদিন এভাবে আসবে আর আক্রমণ করে চলে যাবে? এতোদিন শুধু দোয়া করতাম বিদ্রোহীরা সিরতে আসে না কেন, এসে দখল করে ফেললেই তো শেষ হয়ে যায়। কিন্তু একবেলার এই যুদ্ধ দেখে এখন মনে হচ্ছে বিদ্রোহীরা না এলেই ভালো হতো।

... চলবে ...


সিরত যুদ্ধের কিছু ছবি -

আরপিজি মারছে একজন বিদ্রোহী


হাইডলার রোড (আমাদের বাসা থাকে পৌনে এক কিমি দূরে) দখল করছে বিদ্রোহীরা


হাইডলার রোড


হাইডলার রোড


হাইডলার রোড


হাইডলার রোড


হাইডলার রোড


সিরত দখল করতে আসছে


মিসাইল মারছে


মিসাইল রেডি করছে


মিসাইল মারছে বিদ্রোহীরা

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29490435 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29490435 2011-11-25 21:24:15
চলে আসুন ধাঁধাঁরুর গোলক ধাঁধাঁয়! সম্প্রতি নতুন একটা বাংলা ওয়েব সাইট (ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন) চালু হয়েছে এবং চালু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এটা যথেষ্ট সংখ্যক ভিজিটরের মন কেড়ে নিয়েছে। সাইটটির নাম হচ্ছে ধাঁধাঁরু। বুঝাই যাচ্ছে, ধাঁধাঁ নিয়েই আর কাজ-কারবার। আমি নিজে গত একমাস ধরে এটা নিয়মিত ভিজিট করছি এবং বলা যায় এটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। তাই ভাবলাম এর উপর একটা রিভিউ লিখে ফেলি যেন অন্যরাও এর সম্পর্কে জানতে পারে।

ধাঁধাঁরু হচ্ছে ধাঁধাঁ বিষয়ক বাংলা ভাষায় প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র ডায়নামিক ওয়েবসাইট যেখানে আপনি শুধু যে নিত্যনতুন ধাঁধাঁ পড়তে বা জানতে পারবেন তাই নয়, সেই সাথে আপনি সেগুলোর উত্তরও দিতে পারবেন এবং আপনি নিজেও নতুন নতুন ধাঁধাঁ প্রদান করতে পারবেন।

বিভিন্ন ব্লগসাইটে বা ফোরামেও অবশ্য অনেকে ধাঁধাঁর প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারেন। কিন্তু তার সাথে ধাঁধাঁরুর সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল এখানে যতজনই ধাঁধাঁর উত্তর দিক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজে কোন একটা উত্তর না দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি বাকিদের উত্তরগুলো দেখতে পারবেন না। ফলে ধাঁধাঁ সমাধান করার চেষ্টার উত্তেজনা কখনোই হ্রাস পাবে না। অবশ্য উত্তর না দিয়ে কেউ যদি কোন মন্তব্য করে, কোন অংশ আরো বিস্তারিতভাবে জানতে চায়, তাহলে অন্যরা সেটা ঠিকই দেখতে পারবে।

এই সাইটে ধাঁধাঁ পড়ার জন্য আপনাকে কিছুই করতে হবে না। সরাসরি শিরোনামের উপর ক্লিক করেই পড়তে পারবেন। কিন্তু ধাঁধাঁর উত্তর দিতে চাইলে বা নতুন কোন ধাঁধাঁ পোস্ট করতে চাইলে আপনাকে সাইটটিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, আপনার লগইন নেম অবশ্যই ইংরেজিতে হতে হবে। অবশ্য এরপর আপনি ইচ্ছে করলে আপনার প্রোফাইল থেকে আপনার ইউজার নেম বাংলা করে নিতে পারবেন, যা পরবর্তীতে সব সময় সাইটে প্রদর্শিত হবে।

সাইটটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর র‌্যাংকিং সিস্টেম। প্রতিটি নতুন ধাঁধাঁ এবং প্রতিটি উত্তরের জন্য পয়েন্টের ব্যবস্থা আছে। আপনি যদি নতুন ধাঁধাঁ পোস্ট করেন তাহলে পাবেন 3 পয়েন্ট। যেকোন ধাঁধাঁর উত্তর দিলে সাথে সাথেই পাবেন 2 পয়েন্ট। পরবর্তীতে আপনার উত্তরটি যখন প্রশ্নকর্তা যাচাই করবেন, তখন সেটা যদি সঠিক হয় তাহলে আপনি পাবেন আরো 3 পয়েন্ট। আর যদি উত্তরটা ভুল হয় তাহলে পাবেন -1 পয়েন্ট। মন্তব্যের ঘরে যদি আপনি উত্তর বিষয়ক কোন হিন্ট দেন, তাহলে আপনার কাটা যাবে 10 পয়েন্ট। এভাবে মোট পয়েন্টের ভিত্তিতে সেরা দশজন ব্যবহারকারীর নাম সর্বদা হোমপেজে প্রদর্শিত হবে।

কাজেই আর দেরি কেন? আজই এসে পড়ুন! যোগ দিন ধাঁধাঁরুর গোলক ধাঁধাঁয়! নতুন নতুন ধাঁধাঁ দিয়ে সাইটটিকে সমৃদ্ধ করুন, যেই ধাঁধাঁগুলো আছে সেগুলো সমাধান করে আপনার মস্তিষ্কের চর্চা অব্যাহত রাখুন, আর সেই সাথে পয়েন্ট র‌্যাংকিং বাড়িয়ে স্থান করে নিন শীর্ষ দশে!

ভালো কথা, সাইটটা তৈরি করেছেন মোঃ নাসিমুল হক ওরফে আমাদের স্বপ্নচারী ভাই। সাইটটার ঠিকানা : http://dhadharu.appspot.com


আমার অন্যান্য লেখা পড়ুন আমার সাহিত্য ও প্রযুক্তি ব্লগ থেকে - http://tohamh.wordpress.com/]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29004384 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/29004384 2009-09-04 01:35:29
ডাউনলোড করুন বাংলা কুরআন সফটওয়্যার
চমত্কার এই সফটওয়্যারটির সাইজ মাত্র ১.৮৬ মেগাবাইট। এটা সরাসরি ডাউনলোড করতে পারবেন এই লিংক থেকে - Click This Link

সফটওয়্যারটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন আমার ব্লগের এই প্রবন্ধটি -
Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28838833 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28838833 2008-09-04 22:28:33
ইফতার - প্রণব ভট্ট Click This Link

গত কয়েক বছর পূজার ছুটিতে বাড়ি যাওয়া হয়নি দয়াময়র। এর মধ্যে তো টানা দু বছর সে দেশেই ছিল না। সে আর হেমন্ত এমএস করতে দেশের বাইরে গিয়েছিল। ওই পর্ব অবশ্য শেষ, তারা দেশে ফিরেছে। কিছুদিন তারা দেশে থাকবে। তারপর পিএইচডি করার জন্য আবার বাইরে চলে যাবে। সুতরাং এ বছর যদি পূজার সময় বাড়ি যাওয়া না হয়, তাহলে বেশ কয়েক বছর আর যাওয়া হবে না। হেমন্তকে সে আগেই বলে রেখেছে, হেমন্তরও কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি না থাকার কারণও আছে। দয়ামীয়কে সে ভালোবাসে প্রচণ্ড। এটা আপত্তি না করার পেছনে বড় একটা কারণ। দ্বিতীয় কারণটিও কম বড় নয়, এ দেশে হেমন্তর কেউ নেই। সুতরাং পূজার সময়টা সে যদি দয়াময়ীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে কাটায়, সেটা বউ নিয়ে নিজের বাড়িতে থাকার মতোই হবে।

পূজার সময় বাড়ি যাচ্ছে, এটা দয়াময়ীর ভেতরে উত্‍সাহ সৃষ্টি করেছে খুব। তার বাবা-মা দুজনই বেঁচে আছেন। খুব বড় না হলেও বড় দাদা ওই শহরেই ব্যবসা করছেন। ঠিকাদারি। দু দিদি অবশ্য দু জায়গায় ছড়িয়ে। দেশে ফিরে যাদের সঙ্গে কথা বলেছে দয়াময়ী, তারাও বলেছে এবারের পূজায় তারাও যাবে। বহুদিন পর সবাই একসঙ্গে হলে কী যে মজা হবে, সে তো বোঝাই যাচ্ছে!

তাদের দেশের বাড়ি সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায়। একসময় বেশ কয়েক ঘর হিন্দুর বসবাস ছিল সেখানে। এখন নানা কারণে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো যে কয়েক ঘর আছে, তারা খুব জাঁকজমক আর হইচইয়ের সঙ্গেই পূজা করে। হয়তো সেটা ঠিক দয়াময়ীদের ছোটবেলার মতো হয় না। যেটুকু হয়, তাতেও আনন্দ অনেক। এই আনন্দের মধ্যে একটু খচখচানি শুধু থাকে - ছোটবেলার সব বন্ধুকে যদি একসঙ্গে পাওয়া যেত, সবার সঙ্গে যদি দেখা হতো!

হেমন্ত তাকে বলে, ‘খামোখা একটা আশা করলেই হবে না, সব পুরনো বন্ধুকে তুমি কী করে পাবে!’

‘পাব না। আমি জানি।’ দয়াময়ী বলে, ‘কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে।’

হেমন্ত হাসে।

‘হেসো না। আমার কী মনে হয়, জানো?’ দয়াময়ী বলে, ‘আমার মনে হয় গেলাম বাড়িতে, শিমুলতলীতে, আর দেখলাম ছোটবেলার সব বন্ধু এসে হাজির। অঞ্জু, বীণা, জাহেদা, সালমা, আফরোজা, বেলী, নাগমা, শ্যামলী, সুমিত্রা … আরো কত কে!’

‘ওদের অনেকের সঙ্গে তোমার হয়তো আর কোনো দিন দেখা হবে না!’ হেমন্ত বলে।

‘কীভাবে হবে?’ দয়াময়ী জানায়, ‘ওদের অনেকে এখন দেশেই নেই। কেউ কেউ বিয়ের পর কোথায় ছড়িয়ে পড়েছে কিছুই জানি না! তবে কেউ কেউ তো এখনো আছে, তাই না?’

‘আর তাদের সঙ্গে দেখা হলে কী মজাটাই না হয়!’ হেমন্ত দয়াময়ীর মতো করে বলে।

দয়াময়ী সেটা বুঝতে পারে, ঠোঁট টিপে হাসে, ‘সেটা তুমি বুঝবে কী! শেষবার যখন গেলাম, পুরনো বন্ধু অনেকের সঙ্গে দেখা তো হলোই, লাইজু আপার সঙ্গেও দেখা হলো। স্কুলে আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। আর কী ভালোই না বাসতেন আমাকে! পথে আমার সঙ্গে দেখা। আমাকে একদম জড়িয়ে ধরে বললেন - আরে ময়ী, তুই এত বড় হয়ে গেছিস! বলো, তখন কত ভালো লাগে!’

‘সে নাহয় বুঝলাম।’ হেমন্ত কৃত্রিম গম্ভীর গলায় বলে, ‘কিন্তু আমি ছাড়াও কেউ কেউ তোমাকে ময়ী বলে ডাকে, একি কথা, অ্যাঁ!’

‘ডাকে, ডাকে।’ দয়াময়ী হাসে, ‘কেউ কেউ কিন্তু শুধু দয়া বলেও ডাকে। আমার নামটা বড় আর পুরনো ধরনের। তাই ছোট করে দয়া বা ময়ী, বুঝেছ?’

‘বুঝলাম। ভালো। তবে আমার জন্য আর কিছুই থাকল না। দেখা গেল এবার শিমুলতলীতে গিয়ে তুমি আর ফিরলেই না। যারা তোমাকে দয়া বা ময়ী বলে ডাকত, তারা তোমাকে রেখে দিল!’

‘তুমি ছাড়িয়ে আনবে। তুমি আছ কেন!’

‘তাও বটে।’

‘শোনো, আগেভাগেই একটা কথা বলে রাখি। এবার কিন্তু শিমুলতলীতে গিয়ে খুব ঘুরব আমি। বন্ধুদের বাসায় যাব। আপাদের বাসায় যাব। লাইজু আপা, রেখা আপা, ওহাব স্যার …’

‘তোমার জাহানারা আপার বাসায় যাবে না?’

‘কী বললে!’ দয়াময়ী তখনই কঠিন চোখে হেমন্তর দিকে তাকায়। দেখে, হেমন্তর মুখে ফিচকে হাসি। তাকে অমন চোখে তাকাতে দেখে হেমন্তর ফিচকে হাসিটা একটু একটু করে মিলিয়ে যায়। সে গম্ভীর মুখে নিরীহ গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘আমি বলছিলাম, তোমার জাহানারা আপার বাসায় যাবে না?’

‘তোমাকে না বলেছি, ওই মহিলার কথা তুমি কখনো আমার সামনে তুলবে না!’

‘কিন্তু তিনি তো তোমার হেডমিস্ট্রেস ছিলেন।’

‘থাকুক।’

‘শোনো।’ হেমন্তকে সিরিয়াস দেখায়, ‘তোমাকে কথাটা আরেকবার বলি। ওই ভদ্রমহিলা সম্পর্কে তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলেছ। কিন্তু আমি আমার যুক্তি দিয়ে ওনাকে তোমার মতো করে দেখতে পারিনি। কোথাও তোমার একটা ভুল …’

‘আমার ভুল নেই কোথাও। ওই মহিলা আমাকে স্কুলে পড়ার সময় অনেক জ্বালিয়েছেন।’ দয়াময়ী গম্ভীর চোখে তাকায়, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি তিনি আমাকে শুধু ছাত্রী হিসেবে দেখতেন না, দেখতেন হিন্দুছাত্রী হিসেবে।’

দুই.

দয়াময়ীদের স্কুলের নাম ছিল শিমুলতলী মডার্ন হাইস্কুল। সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি শহরে মেয়েদের জন্য দূরে থাক, ছেলেদের জন্যই সাধারণত এ রকম হাইস্কুল থাকে না! শিমুলতলীতে সেটা সম্ভব হয়েছিল এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তির কারণে। তারা নিজেরা উদ্যোগী হয়ে, নিজেরা পয়সা খরচ করে স্কুলটা করেছিলেন। শিক্ষক জোগাড় করার দায়িত্বও তারাই পালন করেছিলেন। তার পরের পর্ব ছিল স্কুলের জন্য সরকারি স্বীকৃতি আদায়। এর জন্যও অবশ্য কাঠখড় কম পোড়াতে হয়নি। তাও সম্ভব হয়েছিল। এর পেছনে একটা বড় কারণ ছিল, পরপর কয়েক বছর ধরে শিমুলতলী মডার্ন হাইস্কুলের ভালো রেজাল্ট।

দয়াময়ী ক্লাস ওয়ান থেকে ওই স্কুলের ছাত্রী। সে যখন ক্লাস সেভেনে, তখনই স্কুলের হেডমিস্ট্রেস হয়ে আসেন জাহানারা বেগম। পুরনো হেডমাস্টার চলে গেলে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি দেখেশুনে তাকে নিয়োগ দেন। এই হেডমিস্ট্রেস ছিলেন কড়াপ্রকৃতির মানুষ। বড় কড়াপ্রকৃতির। আগের প্রধান শিক্ষক রাজীব হোসেনের সঙ্গে তার কোনো তুলনাই চলে না। প্রথম দিনই অ্যাসেম্বলির সময় ছাত্রীদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘মেয়েরা শোনো, তোমাদের প্রথমেই একটা কথা জেনে রাখা দরকার। আমি নিয়মকানুনের সামান্য অবনতিও বরদাশত করব না। পান থেকে চুন খসে পড়ুক, এটা আমি পছন্দ করি না, বুঝতে পারছ?’

বুঝতে সময় লাগেনি দয়াময়ীদের। হেডমিস্ট্রেস নিজে ক্লাস নিতেন খুব কমই। দু-একটা যা নিতেন তাও ক্লাস নাইনের। তবু পুরো স্কুলে তার উপস্থিতি সব সময় টের পাওয়া যেত। তিনি আপাদমস্তক কালো বোরকা পরতেন। শুধু ক্লাসে এসেই বোরকা খুলতেন। বোরকা ছাড়া তাকে ক্লাসের বাইরে কেউ কখনো দেখেছে বলতে পারবে না, স্কুলের বাইরে দেখার তো প্রশ্নই ওঠে না। যদি এমন হতো, তিনি ক্লাস নেওয়ার সময়ও বোরকা পরে থাকতেন, তবে তার চেহারাটা কেমন, সেটা স্কুলের কারোরই জানা হতো না।

চেহারাটা ছিল অত্যন্ত গম্ভীর। তাকে কেউ কখনো হাসতে দেখেছে, এমন দাবি করতে পারবে না। স্কুল-বিল্ডিংয়ের এমাথা-ওমাথা ঘুরতেন তিনি। কড়া নজর রাখতেন চারদিকে। দেখতেন সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলছে কি না, হচ্ছে কি না। একবার হেদায়েত স্যার ক্লাস এইটে ভাব-সম্প্রসারণ করতে দিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে প্রচণ্ড নাকাল হতে হয়েছিল হেডমিস্ট্রেসের হাতে, ‘আপনি কি বাসায় ঘুমানোর সময় পান না?’

হেদায়েত স্যারের তখন তোতলামি আরম্ভ হয়ে গেছে, ‘জ্বি ম্যাডাম, জ্বি …’

‘তাও ভালো যে বাড়ি থেকে বালিশ নিয়ে আসেননি!’

হেদায়েত স্যার যেন পাথর হয়ে যান।

‘আপনার লজ্জা হওয়া উচিত, আপনার ছাত্রীরা লেখাপড়া করছে আর আপনি ঘুমাচ্ছেন।’

আরেকবার ক্লাস টেনের এক মেয়ে ক্লাসে লুকিয়ে গল্পের বই পড়ছিল। জানালা দিয়ে সেটা লক্ষ করে ভেতরে এসে মেয়েটাকে হাতেনাতে ধরে ফেললেন জাহানারা বেগম।

‘এটা দেখছি প্রেমের উপন্যাস! তোমাদের কি এখন প্রেমের উপন্যাসের ক্লাস চলছে?’

কেউ কিছু বোঝার আগেই মেয়েটি ভেউ ভেউ করে কাঁদতে আরম্ভ করেছে।

‘না, কাঁদলে চলবে না। আমাকে তোমার বোঝাতে হবে, তুমি ক্লাসে বসে এই বই কেন পড়ছিলে!’

মেয়েটার কান্না থামে না। পরের সিদ্ধান্ত ছিল আরো কঠিন। গার্জিয়ানকে ডেকে পাঠিয়ে মেয়েটাকে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে বহিষ্কার করেন তিনি।

বিয়ের পর দয়াময়ী এসব গল্প করেছিল হেমন্তর কাছে। ছোটবেলার গল্প করতে স্বামী-স্ত্রী দুজনই ভালোবাসে। হেমন্ত যদিও তেমন কিছু বলত না, সে বলত, ‘আমার কোনো ছোটবেলা নেই, আমার কোনো গল্পও নেই। আমি প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি।’

দয়াময়ী তার ছোটবেলার গল্প করত। তার বড়দা আর দু দিদির কথা, তার এলাকা আর স্কুলের বান্ধবীদের কথা, তার স্কুল আর স্কুলের শিক্ষকদের কথা। আরো নানা গল্প। জাহানারা বেগমের গল্প হেমন্তকে বিশেষভাবে শোনায় দয়াময়ী, ‘বুঝেছ, ওই মহিলাকে দেখলে আমাদের সারা শরীর ঠাণ্ডা হয়ে যেত!’

‘এটা তো ভালো, খুব ভালো। শিক্ষকদের ভয় করবে না ছাত্রছাত্রীরা?’

‘ভয় না শ্রদ্ধা, কোনটা করবে?’

‘দুটোই।’

‘কেউ শ্রদ্ধা করত না, বুঝেছ? কেউ তাকে শ্রদ্ধা করত না। সবাই ভয় পেত।’

‘একটু বোধহয় মেজাজি ছিলেন, না?’

‘একটু মানে! তিনি ছিলেন চলমান বিভীষিকা। ছাত্রছাত্রীরা এক-আধটু দুষ্টুমি করবে না, অল্প-স্বল্প ফাঁকি দেবে না, বলো?’

‘আচ্ছা, একটু নাহয় বেশিই মেজাজি ছিলেন তিনি। কিন্তু তাই বলে স্যার ক্লাসে এসে ঘুমাবেন, ক্লাস টেনের ছাত্রী ক্লাসে বসে উপন্যাস পড়বে, এসব তাকে কেন মেনে নিতে হবে? বিশেষ করে তুমিই যখন বলছ মেজাজি ছিলেন তিনি! যদিও এসব সব স্কুলে সব সময়ই হয়।’

‘শুধু এটুকু! তোমাকে তো তার আসল কথা বলাই হয়নি!’

দয়াময়ীর আজও মনে আছে সব। কিছুই ভোলেনি। সে যখন ক্লাস সেভেনের শেষ দিকে, জাহানারা বেগম হঠাত্‍ একদিন তাদের ক্লাস নিতে এলেন। সেটা ছিল ইসিএ বা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটিজ ক্লাস। ওই ক্লাসে তারা গান গাইত, আবৃত্তি করত, নাটক করত, আরো কত মজা করত! জাহানারা বেগম ওসবের ধার দিয়েও গেলেন না, এক-এক করে সবার নাম জিজ্ঞেস করলেন, কার রোল নম্বর কত, সেটাও জেনে নিলেন। তারপর দয়াময়ীকে বললেন, ‘এই স্কুলে আরো অনেক হিন্দুধর্মের মেয়ে পড়ে, তুমি জানো?’

‘জ্বি ম্যাডাম।’ দয়াময়ী ভয়ে ভয়ে বলে।

‘কিন্তু আর কোনো ক্লাসে কোনো হিন্দু মেয়ে ফার্স্ট গার্ল না, একমাত্র তুমিই ফার্স্ট গার্ল, এটা জানো?’

এটা জানা ছিল না দয়াময়ীর, সে তাই না-সূচক মাথা নাড়ে।

‘এটা মনে রেখো।’ হেডমিস্ট্রেস বলেন, বলে দয়াময়ীর দিকে তাকিয়ে হাসেন। তারপর ক্লাসের অন্য ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘তোমরাও মনে রেখো।’

দয়াময়ীর বক্তব্য, তার প্রতি হেডমিস্ট্রেসের হাসিটা ছিল তাচ্ছিল্যের।

‘তাচ্ছিল্যের কেন হবে?’ হেমন্ত এটা অনেকবার জানতে চেয়েছে। দয়াময়ী বলেছে, ‘হাসিটা তো তুমি দেখনি, আমিই দেখেছি, আমিই জানি।’

‘আর তোমাকে যে বললেন, তুমিই একমাত্র ফার্স্ট গার্ল, হিন্দু মেয়ে হিসেবে এটা যে তোমাকে মনে রাখতে বললেন, এটাকে তুমি কী বলবে?’

‘এটাকে কি উত্‍সাহ দেওয়া বলতে চাও? আমার কাছে ওটাও তাচ্ছিল্য, বিদ্বেষের।’

‘কেন? আমার তো মনে হয় উনি তোমাকে তোমার পজিশন ধরে রাখার ব্যাপারে উত্‍সাহী করতে চেয়েছেন।’

‘আরে না, ওনার ভঙ্গিতেই তাচ্ছিল্য ছিল। তা ছাড়া ক্লাসের অন্য মেয়েদেরও বললেন আমার ব্যাপারটা মনে রাখতে। এর মানে কী? এটা কি আমার বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা না?’

‘উসকে যদি তিনি দিতে চান, দিতে পারেনই। তা হলেই তো তোমাদের মধ্যে লেখাপড়ার লড়াইটা জমবে। আর একজন শিক্ষকের সেটাই তো কাজ। সবাইকে সবার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া, যেন তাদের ভেতর একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতাটা শুরু হয়।’

দয়াময়ী হাসে।

‘হাসছ কেন?’

‘তুমি যা বলছ তার সবই ঠিক আছে। আমি মেনেও নিচ্ছ। কিন্তু আমার একটা কথা তোমাকে শুনতে হবে। একজন শিক্ষক পড়াশোনায় ভালো করার জন্য একজন ছাত্রীকে আরেকজনের বিরুদ্ধে উসকে দিতে পারেন। কিন্তু সেই উসকানিটা তিনি কি ধর্মীয় আইডেনটিটির নামে দেবেন?’

হেমন্ত চুপ হয়ে যায়।

‘উনি তো আরো নানাভাবে বলতে পারতেন। ওদের বলতে পারতেন-তোমাদের কি বুদ্ধি নেই, তোমাদের কি ভালো রেজাল্ট করার ক্ষমতা নেই, তোমরা কি দয়াময়ীকে ছাড়িয়ে যেতে পার না? কিন্তু তা তিনি করলেন না। এটা কি একজন শিক্ষকের কাজ?’

হেমন্ত মৃদু গলায় বলে, ‘আসলে একেক জনের ভঙ্গি একেক রকম …’

‘তার ভঙ্গিটা সাম্প্রদায়িক।’ দয়াময়ী জোর গলায় বলে, ‘তিনি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা স্পষ্ট বিভাজন করতে চাইতেন। তুমি এটা বুঝতে পারছ না!’

তিন.

দয়াময়ীর প্রথম অভিজ্ঞতাটা অবশ্য শিমুলতলী মডার্ন হাইস্কুলে নয়, বড়দি অঞ্জলির বিয়ের সময়। তাদের আর্থিক অবস্থা কোনো সময় তেমন ভালো ছিল না। অভাব ছিল না ঠিকই, তবে হাতে বাড়তি টাকাও থাকত না। কিছু জমি ছিল, বড়দির বিয়ের সময় সেই জমিতে টান পড়ল।

তাদের জমি আর সোবহান চাচার জমি একেবারে পাশাপাশি। গায়ে গা লাগানো। কিছুদিন আগে সোবহান চাচা জমি বিক্রি করেছেন। তিনি যে দাম পেয়েছেন, দয়াময়ীর বাবা বহু চেষ্টার পরও সে দাম পেলেন না। জমি বিক্রি করে তিনি হাসতে হাসতে বাসায় ফিরলেন, বললেন, ‘এরকমই হবে। কারণ সোবহান ভাইয়েরটা মুসলমানের জমি আর আমারটা হিন্দুর জমি।’

জমির এই রঙ নিয়ে ভাবনা যখন দয়াময়ীর মাথায়, ওই সময়ই শিমুলতলী হাইস্কুলে জাহানারা বেগমের আগমন।
একবার জাহানারা বেগম ক্লাসে এক-এক করে মুসলমান মেয়েদের জিজ্ঞেস করেন - কে কে নামাজ পড়ে আর কে কে পড়ে না। দেখা গেল, অনেকেই পড়ে না। যারা পড়ে না তাদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন।

একবার রোজার সময় কড়া শাস্তি পেয়েছিল দয়াময়ী। রোজার সময় সাধারণত স্কুল বন্ধ থাকে। কিন্তু সেবার স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার সময় রমজান মাস। সকাল-বিকেল দুটো পরীক্ষা। একটা পরীক্ষা শেষে দয়াময়ী বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল আর আমলকী খাচ্ছিল। সে একা খাচ্ছিল না, আরো তিন-চারজন খাচ্ছিল। হেডমিস্ট্রেস সেটা দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন, বললেন, ‘কে কে রোজা?’

দেখা গেল বেশ কয়েকজনই রোজা। কেউ কেউ রোজা না। তাদের সামান্য ধমক দিয়ে তিনি ছেড়ে দিলেন। কিন্তু যারা আমলকী খাচ্ছিল তাদের ক্লাসের ভেতর ১৫ মিনিট নিল-ডাউন করিয়ে রাখলেন। দয়াময়ীও বাদ গেল না। দয়াময়ী খুবই অবাক হয়েছিল। সে তখন ক্লাস এইটে। তার কী অপরাধ সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না। ইচ্ছে করেছিল হেডমিস্ট্রেসকে জিজ্ঞেস করতে। শেষ পর্যন্ত সাহস হয়নি। তার মনে হয়েছিল, জিজ্ঞেস করতে গেলে নিশ্চয়ই নতুন কোনো শাস্তি পেতে হবে।

আরো একটা বড় ব্যাপার ঘটেছিল দয়াময়ী ক্লাস এইটে বৃত্তি পাওয়ার পর। তারা অনেকেই বৃত্তি পরীক্ষা দিয়েছিল, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল শুধু দয়াময়ী। সে নিয়ে তাদের স্কুলে হইচই। সবাই প্রচণ্ড খুশি। দয়াময়ীর নিজেরও খুশির সীমা নেই। সেদিনই ঘটনাটা ঘটে। সে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে হইচই করে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েছিল। স্কুলে ছিল টিউবওয়েল। একজন টিউবওয়েলে চাপ দিত, আরেকজন আঁজলায় করে জল খেত।

কিন্তু সেদিন তার কী যে হয়, ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়ার আনন্দেই বোধহয়, তার আঁজলায় ভরে জল খেতে আর ইচ্ছে করে না। সে একছুটে চলে যায় স্কুলের টিফিনরুমে। সেখান থেকে গ্লাস নিয়ে এসে টিউবওয়েল থেকে জল খায়, তারপর আর গ্লাসটা যথাস্থানে রেখে আসেনি। সে খেয়াল করেনি কিংবা তার জানা ছিল না - গ্লাসটা ছিল হেডমিস্ট্রেসের। খবরটা পৌঁছে যায় হেডমিস্ট্রেসের কানে। হেডমিস্ট্রেস জাহানারা বেগম তাকে ডেকে পাঠান, ‘দয়াময়ী, তুমি পানি খেয়েছ আমার গ্লাসে!’

সে নিয়ে তুমুল কাণ্ড। জাহানারা বেগমের ধমকে দয়াময়ীর নাজেহাল অবস্থা। হেডমিস্ট্রেসের ধমক বন্ধ হয়েছিল, কিন্তু দয়াময়ীর কান্না যেন বন্ধ হওয়ার নয়। তার বন্ধবীরা বলছিল, ‘দয়াময়ী, তুই কান্না থামা।’

দয়াময়ীর কান্না আরো বেড়ে গিয়েছিল, ‘উনি আমাকে এভাবে বলবেন, এভাবে বকবেন!’

বাড়িতে ফিরেও একই কথা বলেছিল, ‘আমাকে এভাবে বকবেন কেন!’

‘তার আগে তুই বল, তুই কেন তার গ্লাস ধরলি? জল খেলি?’ বাবা বলেছিলেন।

‘কোনো মুসলমান মেয়ে খেলে কিন্তু কিছু হতো না।’

‘কেন হবে না, তারাও ছাত্রী।’

‘কিন্তু তারা মুসলমান। ম্যাডাম হিন্দুদের দেখতে পারেন না। তার গ্লাসে আমি খেয়েছি, গ্লাস তাই অশুচি হয়ে গেছে। জাত গেছে তার।’

‘কী যে বলিস না তুই! ওসব জাত যাওয়ার ব্যাপার মুসলমানদের মধ্যে আছে নাকি! ওসব আছে আমাদের মধ্যে। তুই ছাত্রী হয়ে শিক্ষকের গ্লাস ব্যবহার করেছিস, এটাই হলো কথা।’

এ কথাটা আরো অনেকেই বলেছিল। তাদের কারোর কথাই বিশ্বাস হয়নি দয়াময়ীর। সে নিজে যেটা বুঝেছে, যেটুকু বুঝেছে, সেটাই ঠিক - এভাবেই ব্যাপারটাকে সে নিয়েছিল। শুধু ওই ব্যাপারটা কেন, হেডমিস্ট্রেসের আরো যা যা ঘটনা, তার সবগুলোই যে ধর্মীয় গোঁড়ামি আর সাম্প্রদায়িকতার মধ্যে পড়ে, এ নিয়ে সেই তখন থেকেই কোনো সন্দেহ ছিল না দয়াময়ীর। সন্দেহ তার এখনো নেই। এখনো কালো বোরকা পরা হেডমিস্ট্রেস জাহানারা বেগমকে সে চোখের সামনে দেখতে পায়। হিন্দুদের যিনি তাচ্ছিল্যের চোখে দেখেন, হিন্দুদের সংস্পর্শে পবিত্রতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করেন, তিনি কিসের শিক্ষক?

চার.

এতটা মজা হবে দয়াময়ী নিজেও তা বুঝতে পারেনি। হেমন্তকে নিয়ে শিমুলতলীতে পৌঁছেই সে খবর পায়, এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা তার বেশ কিছু বন্ধু এখন শিমুলতলীতে। এবার পূজার কিছুদিন পরই ঈদ। অনেকে আগেভাগেই চলে এসেছে ঈদের ছুটিতে, অনেকে এসেছে পূজায়।

হেমন্ত শুনে বলে, ‘ব্যস, তোমার আর চিন্তার কিছু নেই। আমারও চিন্তা গেল। তুমি বন্ধুদের নিয়ে ব্যস্ত থেকো, আমি থাকি আমাকে নিয়ে।’

‘কী করবে তুমি?’

‘ঘুমাব ভোঁস ভোঁস করে। সবাই এ যুগের কুম্ভকর্ণের ঘুম দেখবে।’

‘বেশ।’ দয়াময়ী বলে। বলে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার দু দিদি এখনো এসে পৌঁছাননি। তাতে অসুবিধা নেই। বরং সুবিধাই। দিদিরা এলে বাসায় একটু বেশি সময় দিতে হবে। এখন সে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে অকাতরে সময় ব্যয় করতে পারবে। তা করেও সে। সকালে এক বন্ধুর তো দুপুরে আরেকজনের বাসায়, রাতে আরেক জনের।

শিমুলতলী অবশ্য বদলে গেছে অনেক। পুরনো অনেক কিছুই আর নেই। দয়াময়ীরা সবাই মিলে বসে সে গল্প করেও। তাদের সময়ে কেমন ছিল এ গ্রাম আর এখন কেমন। একটু একটু করে কখন কতটাই যে বদলে গেল সবকিছু, তারা টেরও পেল না! তারা অবশ্য এ কথাও বলে, তারা নিজেরাও অনেক বদলেছে। আফরোজা অবশ্য বলে, দয়াময়ী নাকি একটুও বদলায়নি। সেই আগের মতোই আছে।

‘চেহারা?’ দয়াময়ী জানতে চায়।

‘সবকিছু। তোকে দেখে এখনো আমার মনে হয় তুই স্কুলে পড়িস।’

‘হা ভগবান, একি বলিস! আমি সামনের বছর পিএইচডি করতে যাব।’

সালমা হেসে বলে, ‘তুই কি জানিস, সেটা আমাদের জন্য কত আনন্দ আর গর্বের?’

অঞ্জু শিমুলতলীতেই থাকে। সে বলে, ‘স্কুলের টিচাররা, যারা শিমুলতলীতে থাকেন, দেখা হলেই তারা তোর কথা
জিজ্ঞেস করেন। জিজ্ঞেস করেন - তুই ওনাদের কথা মনে রেখেছিস কি না।’

‘কারো কথা আমি ভুলিনি রে। লাইজু আপা, ওহাব স্যার …। শিমুলতলীতে কে কে আছে, বল তো?’

অঞ্জু এক-এক করে সবার কথা বলে, জাহানারা বেগমের নামও বলে। শুনে দয়াময়ীর ভ্রু কুঁচকে যায়, ‘ওই মহিলা এখানে থাকেন! উনি তো এখানকার নন।’

‘কিন্তু এখানেই সেটেল করেছেন। বাড়ি করেছেন জমি কিনে। একটু ভেতরের দিকে অবশ্য …’

‘ও। পূজার দাওয়াত দিতে হয় তাহলে!’ দয়াময়ী হাসে।

‘যাবি? খুব খুশি হবেন কিন্তু। তোর কথা দেখা হলেই জিজ্ঞেস করেন।’

‘তাই নাকি!’ দয়াময়ীর গলায় কৌতুক। পরমুহূর্তে তাকে গম্ভীর দেখায়, ‘কিন্তু তার সঙ্গে দেখা করতে আমি কখনোই যাব না।’

‘দয়া!’ মৃদু গলায় জাহেদা বলে, ‘তুই এখনো ওসব মনে রেখেছিস!’

‘কোনো দিনই ভুলব না।’

‘তোকে বলেছি আগে, আবারও একবার বলি - বোরকা পরতেন, আমাদের নামাজ পড়ার জন্য চাপ দিতেন, সব ঠিকই আছে তবু যতটা গোঁড়া তুই ম্যাডামকে মনে করিস, ততটা গোঁড়া আসলে উনি নন।’

‘এটা তোর ধারণা, তাই না? শোন, তোর ধারণা নিয়ে তুই থাক, আমার ধারণা নিয়ে আমাকে থাকতে দে। উনি শুধু গোঁড়া নন, সাম্প্রদায়িক, বুঝেছিস? এখন অন্য কথা বল।’

‘কী কথা?’

‘যেকোনো কথা, কিন্তু ওই মহিলার কথা না। ঠিক আছে? আমার মেজাজটা খারাপ হয়ে গেছে।’

পাঁচ.

সালমাদের বাসা থেকে বের হতে হতে দয়াময়ীর দেরি হয়ে যায়। আজ তার বিকেলের আগেই ফেরার কথা। দিদি আর জামাইবাবুরা ছেলেপুলে নিয়ে এসেছেন। আজ তারা একসঙ্গে বসে পূজার পরিকল্পনা করবে। দয়াময়ীকে অবশ্যই সেখানে থাকতে হবে। কিন্তু সালমাদের বাসায় আরো কয়েক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করতে করতে দেরি হয়ে যায়। সালমারা বারবার অবশ্য বলছিল ইফতার করে যেতে। কিন্তু তাহলে তো আরো দেরি হয়ে যাবে।

সালমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে দয়াময়ী রিকশা পায় না। ইফতারের সময় এ রকম হয়, রিকশা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় দয়াময়ীকে। শেষ পর্যন্ত একটা রিকশা জোটে। পথও কম নয়। রাস্তা ফাঁকা। দয়াময়ী ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বাড়ির গেটের দিকে দ্রুত পা বাড়ায়। এ সময় পেছন থেকে এক মহিলা অসহায় গলায় বলেন, ‘একটু শুনবেন?’


সামান্য মাথা ঘোরায় দয়াময়ী। দেখে, কালো বোরকা পরে একজন দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে বেশ কয়েকটা প্যাকেট। বোরকা-পরা মহিলা বলেন, ‘আমি আসলে দয়াময়ী, মানে গৌতমবাবুদের বাসা খুঁজছিলাম। এদিকেই কোথাও, কিন্তু ঠিক চিনতে পারছি না। আপনি বলতে পারবেন?’

দয়াময়ী কিছুক্ষণ বোরকা-পরা মহিলার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বলে, ‘আপনি কাকে চাইছেন? এটাই গৌতমবাবুদের বাড়ি।’

‘একজনকে পেলেই হলো। দয়াময়ী নিশ্চয় এখন নেই। গৌতমবাবু যদি থাকেন …’

‘আমিই দয়াময়ী।’

‘তুমি দয়াময়ী! তুমি! কী আশ্চর্য!’ মহিলা বোরকার নেকাব তুলে ধরেন, ‘তুমি দয়াময়ী, আর আমি কিনা তোমাকে চিনতে পারছি না! তুমি আমাকে চিনতে পারছ তো মা?’

‘পারছি।’ দয়াময়ী গম্ভীর গলায় বলে।

‘যাক। পেরেছ। তুমি কিন্তু একদম আগের মতোই আছ মা, প্রথমে খেয়াল করিনি।’

দয়াময়ী আরো গম্ভীর গলায় বলে, ‘হুঁ।’

দয়াময়ীর এই গাম্ভীর্য তাদেরই স্কুলের বোরকা-পরা হেডমিস্ট্রেস জাহানারা বেগম একদম খেয়াল করেন না। তিনি বলেন, ‘হয়েছে কি, ঈদের মার্কেটিং করতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু পথে এত দেরি হয়ে গেল, আমার বাড়িটা আবার একটু ভেতরের দিকে। যেতে গেলে ইফতারের সময় পার হয়ে যাবে। হঠাত্‍ মনে হলো তোমাদের বাড়িটা এদিকে। তাই রিকশা ছেড়ে তোমাদের বাড়ি খুঁজতে আরম্ভ করলাম।’

‘কেন?’ দয়াময়ী অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে, সে অবশ্য এখনো পুরোপুরি সহজ হতে পারেনি।

‘কেন আবার, ইফতার করব! যেকোনো বাসায়ই অবশ্য ইফতারের জন্য যাওয়া যায়। কিন্তু ছাত্রীর বাসা থাকতে অন্য বাসায় কেন যাব, বলো?’

দয়াময়ী অপলক তাকিয়ে থাকে। এ রকম একটা অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে, এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।

‘শোনো।’ জাহানারা বেগম বলেন, ‘এখন তো পূজার সময় তোমাদের। নাড়ু, মোয়া - এসব নিশ্চয়ই আছে। দাও না, বেশ অন্য রকম একটা ইফতার হবে!’

বিশ্বাস করতে পারে না দয়াময়ী, ভাবতেও পারে না। ভাবে, বুঝি ভুলই শুনছে সে, ‘আপনি আমাদের বাসায় বসে নাড়ু-মোয়া দিয়ে ইফতার করবেন! আমাদের বাসায়!’

‘অসুবিধা হবে তোমাদের?’ জাহানারা বেগমকে সংকুচিত দেখায়, ‘আচ্ছা, আসল কথাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। স্কুলে তোমাদের কী কড়া শাসনই না করতাম! সেই তুমি, তোমরা কত বড় হয়ে গেছ! দয়াময়ী, তুমি কেমন আছ, বলো তো?’

কেমন আছে সে-এই প্রশ্নের উত্তরে যে কী বলবে দয়াময়ী বুঝতে পারে না।


ডাউনলোড - Click This Link
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28837580 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28837580 2008-09-01 22:58:09
গল্প - রহস্য - হুমায়ূন আহমেদ
আপনি যদি গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে ডাউনলোড করতে চান, তাহলে ভিজিট করুন আমার ব্লগের এই লিংকে - Click This Link



রহস্য জাতীয় ব্যাপারগুলিতে আমার তেমন বিশ্বাস নেই। তবু প্রায়ই এ রকম কিছু গল্প-টল্প শুনতে হয়। গত মাসে ঝিকাতলার এক ভদ্রলোক আমাকে এসে বললেন, তার ঘরে একটি তক্ষক আছে - সেটি রোজ রাত 1টা 25 মিনিটে তিনবার ডাকে। আমি বহু কষ্টে হাসি থামালাম। এ রকম সময়নিষ্ঠ তক্ষক আছে নাকি এ যুগে? ভদ্রলোক আমার নির্বিকার ভঙ্গি দেখে বললেন, কি ভাই বিশ্বাস করলেন না?
জ্বি না।
এক রাত থাকেন আমার বাসায়। নিজের চোখে দেখেন তক্ষকটা। ঘড়ি ধরে বসে থাকবেন। দেখবেন ঠিক 1টা 25 মিনিটে তিনবার ডাকবে।
আরে দুর! কি যে বলেন?

ভদ্রলোক মুখ কালো করে উঠে গেলেন। চারদিন পর তার সঙ্গে আবার দেখা। পৃথিবীটা এরকম, যার সঙ্গে দেখা হবার তার সঙ্গে দেখা হয় না। ভুল মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। আমাকে দেখেই ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বললেন, আপনি কি দৈনিক বাংলার সালেহ সাহেবকে চেনেন?
হ্যাঁ চিনি।
তাকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি নিজের কানে শুনেছেন। বলেছেন একটা নিউজ করবেন।
ভালই তো। নিউজ হবার মতই খবর।
আপনি আসেন না ভাই, থাকেন এক রাত।
আমাকে শোনালে কি হবে?
আরে ভাই আপনারা ইউনিভার্সিটির টিচার। আপনাদের কথার একটা আলাদা দাম।
তাই নাকি?
আপনারা একটা কথা বললে কেউ ফেলবে না।
এই জিনিসটা নিয়ে খুব হৈ-চৈ করছেন মনে হচ্ছে?
না, হৈ-চৈ কোথায়? অনেকেই অবশ্যি শুনে গেছেন। বাংলাদেশ টিভির ক্যামেরাম্যান নাজমুল হুদাকে চেনেন?
জ্বি না।
উনিও এসেছিলেন। খুব মাইডিয়ার লোক। আপনি আসুন না।
আচ্ছা ঠিক আছে, একদিন যাওয়া যাবে।

ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি মুখভর্তি করে হাসলেন। টেনে-টেনে বললেন, চলেন চা খাই।
না, চা খাব না।
আরে ভাই আসেন না। প্রফেসর মানুষ, আপনাদের সঙ্গে থাকাটা ভাগ্যের ব্যাপার।
ভদ্রলোক হা হা করে হাসতে লাগলেন। যেতে হল চায়ের দোকানে।
চায়ের সঙ্গে আর কিছু খাবেন? চপ?
না।
আরে ভাই খান না। এই এদিকে দু’টো চা দে তো। এখন ভাই বলেন, কবে যাবেন?
আপনার সঙ্গে তো প্রায়ই দেখা হয়, বলে দেব একদিন।

চা খেতে খেতে ভদ্রলোক দ্বিতীয় একটা রহস্যের কথা শুরু করলেন। নাইনটিন সিক্সটিতে তিনি বরিশালের পিরোজপুরে থাকতেন। তার বাসার কাছে বড় একটা কাঁঠাল গাছ ছিল। অমাবস্যার রাতে নাকি সেই কাঁঠাল গাছ থেকে কান্নার শব্দ ভেসে আসত। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, সেই কান্নারও কি কোন টাইম ছিল? নির্দিষ্ট সময়ে কাঁদত? আপনার তক্ষকের মত?
ভদ্রলোক আহত স্বরে বললেন, আমার কথা বিশ্বাস করলেন না?
বিশ্বাস করব না কেন?
আমি কান্নার শব্দ গোটাটা টেপ করে রেখেছি। একদিন শোনাব আপনাকে।
ঠিক আছে।

বরিশালের ডিসি সাহেবও শুনেছেন। চেনেন উনাকে? আসগর সাহেব। সি এস পি। খুব খান্দানী ফ্যামিলি।
না, চিনি না।
ডিসি সাহেবের এক ভাই আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। বিরাট অফিসার।
তাই বুঝি?
জ্বি। উনার বাসায় একদিন গিয়েছিলাম। খুব খাতির-যত্ন করলেন। গুলশানের বাসা। তিন তলা। উনি থাকেন এক তলায়। ওপরের দুটো তলা ভাড়া দিয়েছেন।
ভদ্রলোক আমার প্রায় এক ঘন্টা সময় নষ্ট করে বিদায় হলেন। আমার মায়াই লাগলো। ইন্ডেন্টিং ফার্মে সামান্য একটা চাকরি করেন। দেখেই বুঝা যায় অভাবে পর্যুদস্ত। চোখের দুষ্টি ভরসাহারা। বয়স এখনো হয়তো ত্রিশ হয়নি কিন্তু বুড়োটে দেখায়। বিচিত্র চরিত্র।

মাস খানেক তার সঙ্গে আমার দেখা হল না। তার প্রধান কারণ, যে সব জায়গায় তার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা সে সব জায়গা আমি এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি। নিউমার্কেটে আড্ডার জায়গাটিতে যাই না। কি দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে? এই লোকটি পিচ্ছিল পদার্থ, সে গায়ের সঙ্গে সেঁটে যাবে। আর ছাড়ানো যাবে না। কিন্তু তবু দেখা হল। একদিন শুনলাম সে ইউনিভার্সিটি ক্লাবে এসে খোঁজ নিচ্ছে। ক্লাবের বেয়ারা বলল, গত কিছুদিন ধরে নাকি সে নিয়মিতই আসছে। কি মুসিবত।

একদিন আর এড়ানো গেল না। ভদ্রলোক বাসায় এসে হাজির।
কি ভাই আপনি তো আর এলেন না?
কাজের ব্যস্ততা …
আজকে আপনাকে নিতে এসেছি।
সে কি?
কবি শামসুল আলম সাহেবও আসবেন।
তাই বুঝি?
জ্বি। চিনেত তো শামসুল আলম সাহেব কে? দু’টো কবিতার বই বেরিয়েছে। পাখির পালক আর অন্ধকার জ্যোত্স্না।
তাই বুঝি?
জ্বি। আমাকে দু’টো বই-ই দিয়েছেন। খুবই বন্ধু মানুষ। বাড়ি হচ্ছে আপনার ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা।
ও।
উনার ছোট ভাইও গল্প টল্প লেখেন। আরিফুল আলম।

গেলাম তার বাসায়। ঝিকাতলার এক গলিতে ঘুপসি মত দু’কামরার বাড়ি। মেজাজ খুবই খারাপ। রাত দেড়টা পর্যন্ত বসে থাকতে হবে সময়নিষ্ঠ তক্ষকের ডাক শোনার জন্য। কত রকম যন্ত্রণা যে আছে পৃথিবীতে!

ভদ্রলোক আমাকে বসার ঘরে বসিয়ে অতি ব্যস্ততার সঙ্গে ভেতরে চলে গেলেন। বসার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। মহিলার হাতের সযত্ন স্পর্শ আছে। ভদ্রলোক বিবাহিত জানতাম না। এ নিয়ে তার সঙ্গে কখনো কথা হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার স্ত্রী ঘরে এসে ঢুকলেন। খুবই অল্প বয়েসী তরুণী এবং অসম্ভব রূপসী। আমি প্রায় হকচকিয়ে গেলাম।

আমার স্ত্রী লীনা। আর লীনা, উনি হুমায়ূন আহমেদ। এর কথা তো তোমাকে বলেছি।
লীনা হাসি মুখে বললো, জ্বি আপনার কথা প্রায়ই বলে।
লীনা একটু চায়ের ব্যবস্থা কর।

লীনা চলে গেল ভেতরে। ভদ্রলোক নিচু গলায় বললেন, লীনার গল্প-উপন্যাস লেখার শখ আছে। কয়েক দিন আগে সাপ নিয়ে একটা গল্প লিখেছে। মারাত্মক গল্প ভাই। আপনাকে পড়ে শোনাতে বলবো। আমি বললে পড়বে না। আপনিও কাইন্ডলি একটু বলবেন।
আমি বললাম, গুণী মহিলাতো!
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
তা ভাই, কথাটা অস্বীকার করব না। গানও জানে। নজরুল গীতি। ভালো গায়। বাড়িতে টিচার রেখে শিখেছে।
তাই নাকি?
জ্বি, শোনাবে আপনাকে। একটু প্রেসার দিতে হবে আর কি। আপনি একটু রিকোয়েস্ট করলেই শোনাবে। কাইন্ডলি একটু রিকোয়েস্ট করবেন।
ঠিক আছে, করব।

চা এসে পড়ল। চায়ের সঙ্গে বড়া জাতীয় জিনিস। বেশ খেতে। আমি বললাম, কিসের বড়া এগুলি? ডালের নাকি?
ভদ্রলোক উচ্চস্বরে হাসলেন, নারে ভাই, কুলের বড়া। হা-হা-হা। কত রকম অদ্ভুত রান্না যে জানে! মাঝে মাঝে এত সারপ্রাইজ হই। খেতে কেমন হয়েছে বলেন? চমত্কার না?
ভাল, বেশ ভাল।
আরেক দিন আসবেন, চাইনীজ সুপ খাওয়াবো। চিকেন কর্ন সুপ। চাইনীজ রেস্তোরাঁর চেয়ে যদি ভালো না হয় তাহলে কান কেটে ফেলবেন। হা-হা-হা।

আমি মেয়েটার লেখা একটা ছোট গল্প শুনলাম, দু’টি কবিতা শুনলাম। ভদ্রলোক মুগ্ধ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন। বার বার বললেন, ইস শামসুল আলম সাহেব আসলেন না। দারুণ মিস্ করলেন, কি বলেন ভাই?
রাত এগারোটার দিকে বললাম, তা হলে আজ উঠি?
তক্ষকের ডাক শুনবেন না?
আরেক দিন শুনব।
আচ্ছা, ঠিক আছে। ভুলবেন না যেন ভাই। আসতেই হবে।

ভদ্রলোক আমাকে এগিয়ে দিতে এলেন। রাস্তায় নেমেই বললেন, আমার স্ত্রীকে কেমন দেখলেন ভাই?
ভাল, গুণী মহিলা।
ভদ্রলোকের চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ধরা গলায় বললেন, বাঁদরের গলায় মুক্তার মালা। ঠিক না ভাই?
আমি কিছু বললাম না। ভদ্রলোক কাঁপা গলায় বললেন, গরীব মানুষ, স্ত্রীর জন্যে কিছুই করতে পারি না। কিন্তু এই সব নিয়ে লীনা মোটেই মাথা ঘামায় না। বড় ফ্যামিলির মেয়ে তো। ওদের চাল চলনই অন্য রকম।

আমি রিকশায় উঠতে উঠতে বললাম, খুব ভাগ্যবান আপনি।
ভদ্রলোক আমার হাত চেপে ধরলেন। যেন আবেগে কেঁদে ফেলবেন।
ভাই, আরেকদিন কিন্তু আসতে হবে। তক্ষকের ডাক শুনতে হবে। আসবেন তো? প্লীজ।

তক্ষকের ডাকের মত কত রহস্যময় ব্যাপারই না আছে পৃথিবীতে!


গল্পটি পিডিএফ ফরম্যাটে ডাউনলোড করতে চাইলে ভিজিট করুন আমার ব্লগের এই লিংকে - Click This Link]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28836886 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28836886 2008-08-31 01:48:58
রিজিউম করুন আপনার ডাউনলোড
ইন্টারনেটে ফ্রি ডাউনলোডযোগ্য প্রচুর নাটক সিনেমা পাওয়া যায় এমন একটা সাইট হল মিডিয়াফায়ার। কিন্তু এ জাতীয় অধিকাংশ সাইটের মতোই এতে আপলোড করা ফাইলসমূহের কোন হট লিংক থাকে না। এতে প্রতিটা আপলোড করা ফাইলের জন্য একটা রেফারেন্স লিংক থাকে যে লিংকটা ব্রাউজারে চালু করলে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্রাউজারের রিকোয়েস্টের ভিত্তিতে সার্ভার থেকে আপনাকে একটা ডাউনলোড লিংক দিবে। কিন্তু এই লিংকটা হবে অস্থায়ী এবং অবিতরণযোগ্য। অর্থাত্‍ নির্দিষ্ট সময় পরে এটা আর কাজ করবে না এবং যতক্ষণ কাজ করবে ততক্ষণও এটা যে কম্পিউটার থেকে পাওয়া গেছে শুধুমাত্র সেই কম্পিউটারেই কাজ করবে। শুধু মিডিয়া ফায়ার না, বর্তমানে অধিকাংশ ফাইল স্টোরেজ সাইটের পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম।

এখন আপনার ইন্টারনেট কানেকশন যদি খুব ফাস্ট হয়, তাহলে আপনি এসব সাইট থেকে কয়েকশ মেগাবাইট সাইজের ফাইল কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ডাউনলোড করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু আপনার স্পীড যদি কম হয় অথবা ফাইলের সাইজ যদি অনেক বড় হয় তাহলে আপনার পক্ষে সম্পূর্ণ ফাইলটা একবারে ডাউনলোড করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি দেখবেন যে ফাইলটা কিছু সময় পরে আর ডাউনলোড হচ্ছে না। এমন কি ডাউনলোড রিজিউমও করা যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে এই সময়ের মধ্যেই ফাইলটার ডাউনলোড লিংক পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থাত্‍ এরকম অবস্থায় ডাউনলোড রিজিউম করার জন্য আপানাকে ঐ ফাইলের রেফারেন্স লিংকটা অর্থাত্‍ যে লিংকটা ব্যবহার করে আপনি প্রথমবার ডাউনলোড লিংকটা পেয়েছিলেন সেই লিংকটা পুনরায় ব্রাউজারে চালাতে হবে। এরফলে আপনি ফাইলটার একটা নতুন ডাউনলোড লিংক পাবেন। আপনি যদি ভালোভাবে লক্ষ করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে পূর্বের ডাউনলোড লিংক এবং এই ডাউনলোড লিংক ভিন্ন। এবার আপনি যেই ডাউনলোড ম্যানেজার দিয়ে ফাইলটা ডাউনলোড করছিলেন (ধরে নিচ্ছি Internet Download Manager) তার ডাউনলোড লিস্ট থেকে ঐ ফাইলটার নামের উপর রাইট ক্লিক করে Properties এ ক্লিক করুন। এবার এই Properties উইন্ডোর Referer বক্সে ঐ রেফারেন্স লিংকটা এবং Address বক্সে নতুন ডাউনলোড লিংকটা প্রবেশ করিয়ে এরপর Resume বাটনে ক্লিক করুন। দেখবেন কোন ঝামেলা ছাড়াই পুনরায় ডাউনলোড শুরু হয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে ইন্টারনেট ডাউনলোড ম্যানেজার ব্যবহার করে মিডিয়া ফায়ার থেকে ডাউনলোডের সময় কিছু কিছু ফাইল 99.99% ডাউনলোড হয়ে এরপর আর ডাউনলোড হয় না। সেক্ষেত্রে এই পদ্ধতি পর পর দুইবার প্রয়োগ করলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। IDM ছাড়াও অন্যান্য ডাউনলোড ম্যানেজারেও এই পদ্ধতি সুন্দরভাবে কাজ করে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে ফাইলটা করাপ্টেড হওয়ারও সম্ভবনা থাকে। বিশেষ করে ফাইলটা যদি *.rar ফাইল হয় তাহলে IDM ছাড়া অন্য কোন সফটওয়্যার যেমন Orbit Downloader দিয়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগ না করাই ভালো।

আরো বিস্তারিত বিবরণ সহ মূল প্রবন্ধটা আছে আমার ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগে - Click This Link

এই লেখাটা আমার হলেও বুদ্ধিটা আমি পেয়েছিলাম ব্লগার মাহবুব জামান আশরাফীর কাছ থেকে ... ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28835838 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28835838 2008-08-28 01:42:03
রিজিউম করুন আপনার ডাউনলোড
ইন্টারনেটে ফ্রি ডাউনলোডযোগ্য প্রচুর নাটক সিনেমা পাওয়া যায় এমন একটা সাইট হল মিডিয়াফায়ার। কিন্তু এ জাতীয় অধিকাংশ সাইটের মতোই এতে আপলোড করা ফাইলসমূহের কোন হট লিংক থাকে না। এতে প্রতিটা আপলোড করা ফাইলের জন্য একটা রেফারেন্স লিংক থাকে যে লিংকটা ব্রাউজারে চালু করলে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্রাউজারের রিকোয়েস্টের ভিত্তিতে সার্ভার থেকে আপনাকে একটা ডাউনলোড লিংক দিবে। কিন্তু এই লিংকটা হবে অস্থায়ী এবং অবিতরণযোগ্য। অর্থাত্‍ নির্দিষ্ট সময় পরে এটা আর কাজ করবে না এবং যতক্ষণ কাজ করবে ততক্ষণও এটা যে কম্পিউটার থেকে পাওয়া গেছে শুধুমাত্র সেই কম্পিউটারেই কাজ করবে। শুধু মিডিয়া ফায়ার না, বর্তমানে অধিকাংশ ফাইল স্টোরেজ সাইটের পদ্ধতি মোটামুটি একই রকম।

এখন আপনার ইন্টারনেট কানেকশন যদি খুব ফাস্ট হয়, তাহলে আপনি এসব সাইট থেকে কয়েকশ মেগাবাইট সাইজের ফাইল কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ডাউনলোড করে ফেলতে পারবেন। কিন্তু আপনার স্পীড যদি কম হয় অথবা ফাইলের সাইজ যদি অনেক বড় হয় তাহলে আপনার পক্ষে সম্পূর্ণ ফাইলটা একবারে ডাউনলোড করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনি দেখবেন যে ফাইলটা কিছু সময় পরে আর ডাউনলোড হচ্ছে না। এমন কি ডাউনলোড রিজিউমও করা যাচ্ছে না। এর কারণ হচ্ছে এই সময়ের মধ্যেই ফাইলটার ডাউনলোড লিংক পরিবর্তিত হয়ে গেছে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য অর্থাত্‍ এরকম অবস্থায় ডাউনলোড রিজিউম করার জন্য আপানাকে ঐ ফাইলের রেফারেন্স লিংকটা অর্থাত্‍ যে লিংকটা ব্যবহার করে আপনি প্রথমবার ডাউনলোড লিংকটা পেয়েছিলেন সেই লিংকটা পুনরায় ব্রাউজারে চালাতে হবে। এরফলে আপনি ফাইলটার একটা নতুন ডাউনলোড লিংক পাবেন। আপনি যদি ভালোভাবে লক্ষ করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে পূর্বের ডাউনলোড লিংক এবং এই ডাউনলোড লিংক ভিন্ন। এবার আপনি যেই ডাউনলোড ম্যানেজার দিয়ে ফাইলটা ডাউনলোড করছিলেন (ধরে নিচ্ছি Internet Download Manager) তার ডাউনলোড লিস্ট থেকে ঐ ফাইলটার নামের উপর রাইট ক্লিক করে Properties এ ক্লিক করুন। এবার এই Properties উইন্ডোর Referer বক্সে ঐ রেফারেন্স লিংকটা এবং Address বক্সে নতুন ডাউনলোড লিংকটা প্রবেশ করিয়ে এরপর Resume বাটনে ক্লিক করুন। দেখবেন কোন ঝামেলা ছাড়াই পুনরায় ডাউনলোড শুরু হয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে ইন্টারনেট ডাউনলোড ম্যানেজার ব্যবহার করে মিডিয়া ফায়ার থেকে ডাউনলোডের সময় কিছু কিছু ফাইল 99.99% ডাউনলোড হয়ে এরপর আর ডাউনলোড হয় না। সেক্ষেত্রে এই পদ্ধতি পর পর দুইবার প্রয়োগ করলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। IDM ছাড়াও অন্যান্য ডাউনলোড ম্যানেজারেও এই পদ্ধতি সুন্দরভাবে কাজ করে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে ফাইলটা করাপ্টেড হওয়ারও সম্ভবনা থাকে। বিশেষ করে ফাইলটা যদি *.rar ফাইল হয় তাহলে IDM ছাড়া অন্য কোন সফটওয়্যার যেমন Orbit Downloader দিয়ে এই পদ্ধতি প্রয়োগ না করাই ভালো।
আরো বিস্তারিত বিবরণ সহ মূল প্রবন্ধটা আছে আমার ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগে - http://tohamh.wordpress.com/2008/08/27/resume_download/

এই লেখাটা আমার হলেও বুদ্ধিটা আমি পেয়েছিলাম ব্লগার মাহবুব জামান আশরাফীর কাছ থেকে ...]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28835512 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28835512 2008-08-27 11:05:23
জন্মদিনে আবার ...
এখনও যে ব্যস্ততা কমেছে, তা নয়, বরং একটু বেড়েছে। কারণ সিরত স্কুলের প্রথম সাময়িকী পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হয়েছে - কাজেই প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে। তবে যেহেতু গত সপ্তাহে ভার্সিটির মিড সেমিস্টার এক্সাম শেষ হয়েছে এবং লিবিয়ানে মোবাইল ফোনের বদৌলতে এখন ঘরে বসেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছি, সেজন্যই শত ব্যস্ততার মধ্যেও আবার একটু পরিচিত সাইটগুলোতে উঁকিঝুঁকি মেরে গেলাম। ও হ্যাঁ, এতদিন পরে আজ আসার আরো একটা কারণও হয়তো আছে, সেটা হল আজ আমার জন্মদিন।

কে জানে, এই উপলক্ষে লেখা শুরু করে আবার নিয়মিত হতে পারব কি না?]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28797376 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28797376 2008-05-13 16:46:33
শাইখ সিরাজের মোবাইল নাম্বার প্লীজ! খুবই জরুরী! দুর্যোগ সংক্রান্ত!
লিবিয়ার সিরতের অধিবাসীরা বাংলাদেশের সিডর আক্রান্ত জনগণকে সাহায্য করার জন্য টাকা তুলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১০০০ ডলার উঠেছে। এখন তারা চাচ্ছে এই টাকাগুলো চ্যানেল আইয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার তহবিলে পাঠাতে। সেজন্যই শাইখ সিরাজের নাম্বারটা দরকার।

দূতাবাসের মাধ্যমেও অবশ্য টাকা পাঠানো হবে। কিন্তু এই টাকাটা শুধুমাত্র সিরতবাসীদের উদ্যোগ। সেজন্যই এটা ভিন্নভাবে পাঠানো হচ্ছে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28748629 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28748629 2007-11-30 21:32:28
সুসংবাদ - caebd.com এ আমার তিনটা প্রবন্ধ একসাথে জনপ্রিয় লিস্টে! http://www.caebd.com নামে কম্পিউটার ও ইলেক্ট্রনিক্সের উপর নতুন করে সাইট তৈরি করেছেন। এই সাইটটিতে যে কেউ রেজিস্ট্রেশন করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে লেখা জমা দিতে এবং যেকোন লেখার উপর মন্তব্য করতে পারবে।

সাইটটি চালুর পর প্রথম কয়েকদিনের মধ্যেই আমি এতে চারটা লেখা জমা দেই। চারটা প্রবন্ধই প্রকাশিত হয়। কিন্তু তখন জুয়েল ভাই প্রতিদিন এত বেশি সংখ্যক নিজের পুরানো প্রবন্ধগুলো সেখানে প্রকাশ করছিলেন যে, আমার গুলো সেগুলোর নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল। কাজেই আমি সেখানে লেখা বন্ধ করে পূর্বের মতো বিজ্ঞানী ডট কমেই লিখে যেতে থাকি। কিন্তু জুয়েল ভাইয়ের ভাইয়ের অনুরোধে পরবর্তীতে আমি আবারও caebd তে লেখা শুরু করি।

caebd তে নতুন করে লেখা শুরু করে আমি পরপর তিনটা লেখা জমা দেই। প্রবন্ধগুলো হল - হ্যকিং টিপস - পাসওয়ার্ড ছাড়াই আনলক করুন নকিয়া 1110!, ফ্রি ডাউনলোড করুন কুরআনের নতুন একটি বাংলা অনুবাদ, ডাউনলোড করুন বাংলা কুরআন সফটওয়্যার]। মজার ব্যাপার হল, তিনটা প্রবন্ধই এখন সেরা দশ জনপ্রিয় প্রবন্ধের তালিকায় আছে। এর মধ্যে wjsK=http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28735088হ্যকিং টিপস - পাসওয়ার্ড ছাড়াই আনলক করুন নকিয়া 1110! প্রবন্ধটি সেরা দশের মধ্যে প্রথম স্থানে আছে। আমার মতো অভাজনের পক্ষে এটা একটা খুশির সংবাদ বৈকি!


আরও পড়ুন :

টেকনোলজি টুডেতে আমার দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে - পড়ুন প্রথম প্রবন্ধ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28741817 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28741817 2007-11-01 15:56:17
আমার বাংলা ই-বুক সংগ্রহের এক বছর - সংগ্রহে দুই শতাধিক বই - তালিকা এখানে - দ্বিতীয় পর্ব
এই এক বছরে আমর কম্পিউটার বাংলা বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইশোরও বেশিতে এবং এগুলো দখল করে আছে হার্ডডিস্কের 1. গিগাবাইট। নিচে আমার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর একটা তালিকা দিলাম। এর মধ্যে যে বইগুলো আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে, সেগুলোর পাশে ব্র্যাকেটে চমত্‍কার লিখে দিলাম। যারা এখনও সেগুলো পড়েননি, তাদের প্রতি অনুরোধ, দেরি না করে এগুলো ডাউনলোড করা শুরু করে দিন। তা না হলে সাহিত্যের একটা ইন্টারেস্টিং অধ্যায় মিস করবেন।

আজ শুধু মুহম্মদ জাফর ইকবালের বইগুলোর তালিকা দেওয়া হল। আমার কাছে যেগুলো বেশ ভালো লেগেছে, সেগুলোর পাশে ভালো এবং যেগুলোকে অসাধারণ মনে হয়েছে, সেগুলোর পাশে চমতকার লিখে দিলাম।

আমার সংগ্রহে থাকা বাংলা বইয়ের (পিডিএফ) তালিকা - হম্মদ জাফর ইকবাল (25)


সায়েন্স ফিকশন

টুকি এবং ঝায়ের (প্রায়) দুঃসাহসিক অভিযান (চমত্‍কার, চমত্‍কার, চমত্‍কার)
বিজ্ঞানী সফদর আলির মহা মহা আবিষ্কার (ভালো)
কপোট্রনিক সুখ দুঃখ (ভালো)
ওমিক্রণিক রূপান্তর (ভালো)
বেজি (চমত্‍কার, চমত্‍কার)
বিজ্ঞানী অনিক লুম্বা
একজন অতিমানবী
মহাকাশে মহাত্রাস
ফোবিয়ানের যাত্রী
নয় নয় শূণ্য তিন
ত্রিনিত্রি রাশিমালা
যারা বায়োবট
মেকু কাহিনী
রুহান রুহান
জলমানব
মেতসিস
ক্রুগো
ইরন
পৃ


কিশোর উপন্যাস + উপন্যাস + আত্মজীবনীমূলক + কলাম

হাত কাটা রবিন (চমত্‍কার, চমত্‍কার)
দীপু নাম্বার টু
বৃষ্টির ঠিকানা
আমি তপু

রঙ্গিন চশমা

নিঃসঙ্গ বচন



আপনারা যদি এই বইগুলো ডাউনলোড করতে চান, তাহলে মূর্ছনাতে যেতে পারেন। এই তালিকার অধিকাংশই মূর্ছনাতে পাবেন। যদি সেখানে রেজিস্ট্রেশন করা ঝামেলার মনে করেন, তাহলে সেখানকার অধিকাংশ বই সরাসরি সুমন আহমেদের ইস্নিপস ডাউনলোড সেন্টার থেকে ডাউনলোড করতে পারেন। কারণ সুমন আহমেদ হচ্ছেন মুর্ছনার অ্যাডমিন এবং মূর্ছনার অধিকাংশ বই তারই আপলোড করা। আর তার স্ক্যান কোয়ালিটিও অসাধারণ!

লিংক :
মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস
মুহম্মদ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন


আরো পড়ুন - আমার সংগ্রহে হুমায়ূন আহমেদের 78 টি বইয়ের তালিকা
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28739810 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28739810 2007-10-25 21:27:07
ঈদ স্পেশাল প্রেমের গল্প - সে ভালোবাসে, নাকি বাসে না - ইমদাদুল হক মিলন
রবি বলল, টায়ার্ড হওয়ার কথা আমার। আমি ড্রাইভ করেছি। তুই তো শুধু বসে থেকেছিস।

কোথায় বসে থাকলাম? তোর বকবকানি শুনেছি না! এত কথা শুনলে কেউ টায়ার্ড না হয়ে পারে! এখন মনের মতো থাই ফুড খেয়ে টায়ার্ডনেস কাটাব। রবি, নো বকবক।

কিন্তু আমার সমস্যা তো মিটছে না।

কী সমস্যা সেটাই তো বলছিস না। শুধু ঘুরে বেড়ালি। এ কথা, সে কথা। আমি এতবার জানতে চাইলাম, তাও বললি না। এখন বল।

দাঁড়া, খেতে খেতে বলি।

রবি ওয়েটারকে ডাকল। কিউজ মি!

মম বিরক্ত হলো। কিউজ মি আবার কী? এক্সকিউজ মি।

পুরোটা বলতে টায়ার্ড লাগছে। এ জন্য সংক্ষেপ।

ওয়েটার সামনে এসে দাঁড়াল। রবি মমর দিকে তাকাল। তাকিয়ে আর চোখ সরায় না।

মম বলল, কী হলো?

তোকে যা লাগছে না! নীল শাড়ি, এত সুন্দর মেকাপ। একদম ঐশ্বরিয়া, একদম।

রবির কথা পাত্তা দিল না মম, ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে। অর্ডার দে।

আমি এসব পারি না। তুই দে।

কী খাবি?

শোন বাবা, তোর জন্মদিন, যা ইচ্ছা অর্ডার দে। নো প্রবলেম।

টাকা-পয়সা আছে, নাকি খাওয়ার পর আমাকে পে করতে হবে?

আমার কাছে না থাকলে তুই করবি! তোর টাকা আর আমার টাকা একই। অর্ডার দে, আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি।

ওদের কথাবার্তা শুনে ওয়েটার মুচকি মুচকি হাসছিল। রবি উঠে যেতেই সিরিয়াস মুখ করে মমর দিকে তাকাল, ইয়েস, ম্যাডাম।

মম মেনু ঘাঁটতে ঘাঁটতে কয়েকটা আইটেমের কথা বলল।

খাবার দেখে খুশিই হলো রবি। মজার মুখভঙ্গি করল। অর্ডার তো ভালোই দিয়েছিস। তার মানে বন্ধুর পকেটটা আজ খালি করবি।

মম তার অসাধারণ সুন্দর চোখ তুলে রবির দিকে তাকাল। রবি, আজ আমার জন্মদিন।

সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তোকে না বলেছি, এ রকম চোখ করে আমার দিকে তাকাবি না। আমার অসুবিধা হয়।

কী অসুবিধা?

বলব না। খা বাবা, খা। আমিই পে করব।

রবির প্লেটে খাবার তুলে দিল মম। নিজে নিল। খেতে খেতে বলল, কিন্তু সমস্যাটা বলছিস না কেন?

এখন বলতেই হবে। এখন আর না বলে উপায় নেই। ইয়ে মানে, মম, আমি ডট ডট পড়েছি আর কী!

ডট ডট পড়েছিস মানে? ডট ডট পড়া অর্থ কী?

বুঝিসনি?

না।

তোর সমস্যা হচ্ছে তোকে সবকিছু একেবারে পানির মতো পরিষ্কার করে বলতে হয়। ডট ডট মানেটা হচ্ছে ইয়ে আর কি! ইয়ে ...

ইয়ে মানে কী?

ইয়েও বুঝিস না? আরে ইয়ে মানে হচ্ছে ওই ইয়ে আর কি! প্রেম প্রেম। আই অ্যাম ইন লাভ।

মম খুবই খুশি হলো। সুন্দর চোখ আরও সুন্দর হলো তার। মিষ্টি মুখখানি উদ্ভাসিত হয়ে গেল। সত্যি?

সত্যি।

হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে ডান হাত বাড়িয়ে দিল মম। কনগ্রাচুলেশন্স।

রবিও হাত বাড়াল। মমর হাত ধরে বলল, থ্যাংকস।

কিন্তু মেয়েটা কে? কোথায় থাকে? তোর সঙ্গে পরিচয় হলো কবে? আমাকে তো কিছুই বলিসনি?

বলি বলি করেও বলা হচ্ছিল না।

একটা একটা করে বল। নাম কী?

ইয়ে, নাম হচ্ছে অন্তরা। অন্তরা। কয়েক দিন আগে পরিচয় হয়েছে।

দেখতে কেমন?

অসাধারণ সুন্দর। রিয়েলি অসাধারণ। রানী মুখার্জি টাইপ। সিডি কিনতে গিয়েছিলাম রাইফেলস স্কয়ারে। ওখানে পরিচয়।

তোকে পছন্দ করেছে? নাকি ওয়ান সাইডেড?

আরে না, আমাকে খুবই পছন্দ করেছে। ফোনে রোজ তিন-চারবার করে কথা হচ্ছে।

মম খুবই খুশি, রিয়েলি?

রিয়েলি।

আমার খুবই মজা লাগছে। এত দিনে তোর একটা গতি হলো।

কিন্তু সমস্যাটা তো শুনছিস না?

এরপর আর কী সমস্যা?

আমি এখনো তাকে কিছুই বলতে পারিনি।

মানে?

মানে প্রপোজ করা হয়নি। কীভাবে বলব, আমি তোমাকে ভালোবাসি বা ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কীভাবে বলতে হয় জানি না তো! তুই আমাকে হেল্প কর।

আমি কী হেল্প করব?

শিখিয়ে দে, কীভাবে প্রপোজ করতে হয়।

তুই একটা সম্পূর্ণ গাধা। এসব কাউকে শিখিয়ে দিতে হয়? হিন্দি সিনেমায়, আমাদের টিভি নাটকে দেখিস না কীভাবে নায়কেরা প্রপোজ করে?

হিন্দি সিনেমা আমি দেখি না। কোন কোন সিনেমা দেখা যায় বলে দে। আজই দেখে ফেলি। মানে দেখতে শুরু করি।

থাক, এত পরিশ্রমের দরকার নেই। আমিই শিখিয়ে দিচ্ছি।

না না, শুধু শেখালে হবে না। পুরোপুরি একটা রিহার্সেল করাতে হবে। খাওয়া শেষ করে আমাদের ফ্ল্যাটে চল। মা আর বাবা দশ দিনের জন্য গেছে গ্রামের বাড়িতে। বুয়া দুটোকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ফ্ল্যাটে আমি একদম একা। ওখানে গিয়ে রিহার্সেল করি। কারণ আজই তাকে আমি প্রপোজ করতে চাই। আজ বিকেলেই সে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবে।

আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন খা। গাধা কোথাকার! একটা মেয়েকে কীভাবে প্রপোজ করতে হয় তাও জানে না।

বাড়িতে ঢুকে গাড়ি পার্ক করে রবি বলল, একটু দাঁড়া, মম। আমি দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলে আসি।

দারোয়ানের সঙ্গে আবার কী কথা?

বললাম না ঝুমু আজ বিকেলে আমাদের ফ্ল্যাটে আসবে। আসলে যেন আমাকে ইন্টারকম করে।

মম অবাক, ঝুমু আবার কে?

ওই যে ওই মেয়েটা।

তুই না ওর নাম বললি অন্তরা?

রবি সরল মুখ করে হাসল। ভালো নাম অন্তরা। ডাকনাম হচ্ছে ঝুমু।

ও। আসার আগে তোকে ফোন করবে না?

তা তো করবেই।

তাহলে দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলার কী আছে?

তবু একটু বলে আসি। তুই দাঁড়া। এক মিনিট।

এক-দেড় মিনিটের মধ্যেই ফিরল রবি। মমকে নিয়ে তাদের ফ্ল্যাটে এল। ফ্ল্যাটে ঢুকে মম কোনো কথা বলল না। কিচেনে ঢুকে দু মগ কফি করল। দু হাতে মগ দুটো ধরে ড্রয়িং রুমে এল। একটা মগ রবির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, আয় কফি খেতে খেতে তোকে সব শেখাই। নে, ধর।

রবি কফির মগ নিল। চুমুক দেওয়ার আগেই বলল, তাড়াতাড়ি কর, তাড়াতাড়ি। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কিন্তু এসে পড়বে।

রবির মুখোমুখি বসে কফিতে চুমুক দিল মম। কিন্তু নিজেদের ফ্ল্যাটে ডেকে প্রপোজ করাটা কি ভালো দেখাবে?

রবি এক চুমুক কফি খেল। এটা আমিও ভেবেছি। কিন্তু ও আসতে চাইছে, না করি কী করে। যা ইচ্ছা হোক গিয়ে। আমি আর দেরি করতে পারছি না। আজই যা বলার বলে ফেলব। তুই আমাকে শিখিয়ে দে।

কথাগুলো বলতে হবে খুব সুন্দর করে, বুঝলি?

আচ্ছা, ঠিক আছে। সুন্দর করেই বলব।

গলার আওয়াজ থাকবে স্নিগ্ধ।

স্নিগ্ধ আওয়াজটা কী রকম?

নরম ধরনের আর কি! আর মুখটা সব সময় হাসি-হাসি।

তুই একটু দেখিয়ে দে।

ঠিক আছে। দাঁড়া।

কফির মগ রেখে উঠে দাঁড়াল রবি। মমও তার মগ রাখল। অভিনয় করে দেখাতে লাগল রবি কীভাবে অন্তরাকে প্রপোজ করবে। বলল, অন্তরা তোর ফ্ল্যাটের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। কলিং বেল বাজাল। তুই দরজা খুলেই বললি, ‘আজকের আগে এত সুন্দর করে কেউ আমাদের কলিং বেল বাজায়নি। তোমার আঙ্গুলের ছোঁয়ায় কলিং বেলের আওয়াজও মিষ্টি হয়ে গেছে।’ কিন্তু গলার স্বর অতি নরম, অতি স্মিগ্ধ। মুখটা হাসি-হাসি।

বুঝলাম। তারপর?

বলবি, ‘ফ্ল্যাটে কেউ নেই। শুধু আমরা দুজন। তুমি কি আমার রুমে গিয়ে বসবে, নাকি ড্রয়িং রুমে? আই মিন, তুমি যেখানে কমফোর্ট ফিল কর।’

আরে, এসব কায়দা আমি জানি। এসব শেখাতে হবে না। আসল কথা বল। প্রেমের কথাটা বলব কী করে?

সেই দিকেই তো যাচ্ছি। ওকে কোথাও বসিয়ে, না না বসাবার দরকার নেই, আগে থেকেই জিনিসটা তোর হাতে রাখবি।

কোন জিনিস?

ফুল, ফুল। একটা টকটকে লাল গোলাপ হাতে ধরে রাখবি। কিন্তু সেই হাতটা রাখবি পেছনে। আচমকা ফুলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলবি, ‘আমার হৃদয় তোমাকে দিলাম।’

এতেই হয়ে যাবে?

হ্যাঁ। কিন্তু সঙ্গে আর একটা কাজও করতে হবে। অপলক চোখে তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

রবির মুখে করুণ একটা ভঙ্গি ফুটে উঠল। এই একটা সমস্যা হয়ে গেল। আমি অপলক চোখে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারি না। চোখে পলক পড়ে যায়।

মম রেগে গেল। এ জন্যই বলি তুই একটা সম্পূর্ণ গাধা। আয়, একবার প্র্যাকটিস কর। ওই ওখান থেকে একটা ফুল নিয়ে আয়।

ওগুলো তো তোর জন্মদিনের জন্য কিনে রেখেছি। তাড়াহুড়ো করে চায়নিজ খেতে চলে গেলাম, এ জন্য নেওয়া হয়নি। তোকে দেওয়াও হয়নি।

কোনো অসুবিধা নেই। ওখান থেকে একটা গোলাপ নে। অন্যগুলো বাড়ি যাওয়ার সময় আমি নিয়ে যাব।

আচ্ছা, ঠিক আছে।

রবি একটা লাল গোলাপ নিল।

মম বলল, হাতটা পেছনে লুকা।

ফুল ধরা হাত পেছনে লুকাল রবি।

এবার আমার চোখের দিকে তাকা।

রবি তাকাল।

এবার বল।

মমর চোখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে ফুল ধরা হাত তার দিকে বাড়িয়ে দিল রবি। সুন্দর উচ্চারণে বলল, আমার হৃদয় তোমাকে দিলাম।

মমর বুকের ভেতর কোথায় যেন কী রকম একটা কাঁপন লাগল এ কথায়। শরীর কী রকম কাঁটা দিল। চোখ বদলে গেল মমর, মুখ বদলে গেল। নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে রবির গোলাপ সে নিল। রবির মতো করেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের অজান্তেই যেন বলে ফেলল, আমার হৃদয়ও আজ আমি তোমাকে দিলাম।

মমর কথা বলার ভঙ্গি, তাকিয়ে থাকা, চোখ ও মুখের পরিবর্তন খেয়াল করল রবি। সে একটু থতমত খেল। অন্তরা কি তোর মতো করে বলবে?

মম যেন অন্য এক জগত্‍ থেকে ফিরল। একটু যেন বিব্রত সে। বলল, তা আমি কী করে বলব? তবে অন্তরার জায়গায় আমি হলে এভাবেই বলতাম।

এ সময় রবির মোবাইল বাজল। রবি ব্যস্ত ভঙ্গিতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ধরল, হ্যালো।

তার পরই মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল তার। ও তুমি? এসে পড়েছ? কোথায়? আরে তাই নাকি? দারোয়ানকে বলা আছে। চলে এসো, চলে এসো।

মোবাইল অফ করে হাসিমুখে মমর দিকে তাকাল রবি। অন্তরা এসে পড়েছে।

মম চিন্তিত হলো। এত তাড়াতাড়ি এসে পড়ল? কিন্তু আমাকে নিয়ে তো একটা ঝামেলা হয়ে যাবে।

কী ঝামেলা?

মেয়েরা খুব ঈর্ষাকাতর হয়। তোর একা ফ্ল্যাটে এভাবে আমাকে দেখলে অন্তরা ভুল বুঝতে পারে। তোদের প্রেম আজই শেষ হয়ে যেতে পারে।

এটা তো আমি ভাবিনি! এখন তাহলে কী হবে?

গেস্টরুম দেখিয়ে মম বলল, আমি ওই রুম ভেতর থেকে বন্ধ করে বসে থাকি। অন্তরা চলে যাওয়ার পর বেরোব।

ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুই ওই রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ কর, আর আমি দরজা খুলে অন্তরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকি।

ঠিক আছে। তবে আমি যেভাবে বলেছি ঠিক ওভাবে সব করবি। ওকে?

ওকে, ওকে।

দৌড়ে গেস্টরুমে ঢুকল মম। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দরজায় কান পেতে দাঁড়িয়ে রইল। সে যেভাবে যা শিখিয়ে দিয়েছে রবি ঠিক সেভাবে সব কথা বলতে পারে কি না জানার আগ্রহ।

রবির উত্সাহী গলা শোনা গেল মিনিটখানেক পর। আরে, এসো এসো। আমি তোমার জন্য দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছি।

তারপর দরজা বন্ধ করার শব্দ পেল মম। নিশ্চয় অন্তরা ভেতরে ঢুকেছে, রবি দরজা বন্ধ করেছে।

আবার রবির গলা শোনা গেল। শোনো অন্তরা, দরজা খুলে রাখা কথাটার অন্য একটা অর্থও আছে।

অন্তরা বলল, কী অর্থ?

আমি তোমার জন্য আমার হৃদয়ের দরজাও খুলে রেখেছি।

অন্তরা মুগ্ধ হলো, তুমি এত সুন্দর করে কথা বলো, শুনলে বুকের ভেতরটা কেমন তোলপাড় করে। হৃদয়ে দোলা লাগে।

হৃদয় শব্দটা শুনলেই হৃদয়ে দোলা লাগে, ঠিক না?

বন্ধঘরের ভেতর মমর চেহারা তখন বদলাতে শুরু করেছে। একেবারেই অন্য রকমের একটা অনুভূতি তার হচ্ছে। অন্তরা মেয়েটার কথা যেন সে সহ্য করতে পারছে না। কী রকম একটা রাগ, কী রকম একটা জেদ, নাকি অচেনা এক ঈর্ষাবোধ নিজের ভেতর জেগে উঠতে দেখছে মম। অস্থির লাগছে তার, খুবই অস্থির এবং দিশেহারা লাগছে।

কেন, এমন হচ্ছে কেন মমর?

বাইরে তখন আবার শোনা গেল রবির গলা। একটু যেন জোরে কথা বলছে রবি। আমার নাম রবিন। কিন্তু এখন আর কেউ রবিন ডাকে না। রবি বলে ডাকে সবাই।

অন্তরা বলল, রবিই সুন্দর। রবির কিরণ। অর্থাত্‍ তোমার কিরণে আমার জীবন উজ্জ্বল হয়ে যাবে।

মম মনে মনে বলল, ইস, রবির কিরণ! জীবন উজ্জ্বল হয়ে যাবে! কোথাকার কে হঠাত্‍ করে এসে জীবন উজ্জ্বল করছে। কী তোর জীবন রে!

রবি বলল, এই গোলাপ তোমাকে দিলাম। এ কোনো গোলাপ নয়, এ আমার হৃদয়। আমার হৃদয় আমি তোমাকে দিলাম। তুমি গ্রহণ করো। আমার হৃদয় তুমি গ্রহণ করো। আর তোমার হৃদয় দাও আমাকে।

এবার আর সহ্য করতে পারল না মম। কোনো কিছুই মাথায় রইল না তার। পাগলের মতো দরজা খুলে ছুটে বেরোল সে। না, রবি, না। আমার ফুল তুই অন্য কাউকে দিতে পারবি না। না। না।

রবি হো হো করে হেসে উঠল।

রবির হাসি পাত্তা দিল না মম। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, কোথায়? সে কোথায়?

সে মানে? অন্তরা?

হ্যাঁ। কোথায় গেল?

কোথাও যায়নি। কোথাও থেকে আসেওনি। সে আছে আমার অন্তরে।

কী বলছিস তুই? আমি পরিষ্কার তার গলা পেলাম। তোর সঙ্গে এতক্ষণ ধরে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলল।

সেই মিষ্টি গলার কথাটা তুই শুনবি?

কিছুক্ষণ আগে অন্তরা যে ভঙ্গিতে, যে সুরে কথা বলেছে, অবিকল সেই ভঙ্গি, সেই সুরে রবি বলল, আমিই অন্তরা। রবির অন্তরে বাস করি।

অন্য সময় হলে রবির এই মেয়েলি স্বর আর ঢং দেখে হেসে মরে যেত মম। এখন উল্টো অবস্থা হলো তার। কেমন কান্না পেল। কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল, ও, তাহলে এসব তোর চালাকি! রবি, রবি, আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না। আমার এমন লাগছিল কেন? এখনই বা এমন লাগছে কেন? আমিই তোকে সব শিখিয়ে দিয়েছি, তারপর তুই যখন ওসব কথা বলছিলি, আমার মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল, আমার সম্পদ যেন কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার এমন হচ্ছিল কেন, রবি?

রবি গম্ভীর গলায় বলল, এটাই আমি চেয়েছি। মম, অন্তরা বা ঝুমু বলে কাউকে আমি চিনি না।

সত্যি?

সত্যি। আমি চিনি তোকে। আমি চাই তোকে। আর কাউকে না, কাউকে না।

মমর চোখে-মুখে তখন আশ্চর্য এক ঘোর লেগেছে। কণ্ঠে লেগেছে অচেনা এক মাদকতা। রবির মতো করেই সে বলল, আমিও, আমিও তোকে চাই। শুধু তোকে, শুধু তোকে। তোকে ছাড়া আর কাউকে আমি ভাবতে পারি না। কাউকে না।

কিন্তু এত দিন আমরা কেউ কাউকে বলিনি কেন?

কী জানি। আজকের আগে এই অনুভূতিই আমার হয়নি।

সত্যিকার প্রেম কখনো কখনো এইভাবে চাপা পড়ে থাকে। তাকে তুলে আনতে হয়। আমি এই তোলার কাজটা আজ করেছি।

এত দিন করিসনি কেন? আরও আগে করিসনি কেন?

অনেক আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছি, তোর জন্নদিনে এভাবে তোকে আমি জাগিয়ে তুলব।

কিন্তু অন্তরা যে ফোন করল?

অন্তরা না, ওটা আমাদের দারোয়ান।

কী?

হ্যাঁ। দারোয়ানকে বলেছিলাম, সে যেন আমার মোবাইলে একটা ফোন করে। একদম সাজানো নাটক। ওই যে তোকে দাঁড়াতে বলে আমি দারোয়ানের কাছে গেলাম না!

মম কাতর, অসহায় গলায় বলল, এখন কী হবে, রবি?

কী হবে মানে? আজ থেকে আমাদের নতুন পরিচয়। প্রেমিক-প্রেমিকা। কদিন পর আমি হচ্ছি বর, তুই হচ্ছিস কনে। বছর দেড়েক পর তুই হচ্ছিস মা, আমি হচ্ছি বাবা।

রবিকে আলতো করে একটা ধাক্কা দিল মম। যাহ্।

একটু থেমে বলল, এই, আমার কেমন যেন লজ্জা লাগছে। রবি, আমি তোর দিকে তাকাতে পারছি না। একদম তাকাতে পারছি না।

রবি দুহাতে মমর মুখটা তুলে ধরল। আমিও পারছি না। তবু জোর করে তাকাচ্ছি। শোন, আজ সকালে তোর জন্য ফুল কিনতে গিয়ে একটা ফুলের পাপড়ি ছিঁড়েছি আর বলেছি, সে ভালোবাসে, নাকি বাসে না! প্রথমে একবার ইংরেজিতে বলেছি, শি লাভস মি, শি লাভস মি নট। ইংরেজিটা বলতে ভাল্লাগছিল না। বাংলায় বলতে গিয়ে দেখি, বাহ্, বেশ জমে গেল। ‘সে ভালোবাসে’ কথাটায় এসে পাপড়ি শেষ হলো। তখন থেকেই জানি তুইও আমাকে ভালোবাসিস। তোর মুখ থেকে কথাটা শোনার জন্য এত কিছু। নারী চরিত্রে অভিনয়ও করতে হলো।

দুহাতে রবির গলা জড়িয়ে ধরে মম বলল, ভালোবাসা প্রমাণের জন্য ফুলের পাপড়ি ছেঁড়াছেঁড়ি করে তো মেয়েরা।

মমর গ্রীবার কাছে মুখ রেখে রবি বলল, ছেলেরাও করে।

সৌজন্যে - প্রথম আলো


# আপনি সম্ভবত এই পোস্টগুলোও পছন্দ করবেন -
সায়েন্স ফিকশন - অক্টোপাসের চোখ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
সায়েন্স ফিকশন - একটি মৃত্যুদণ্ড - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু - হুমায়ূন আহমেদ
টুয়েন্টি টুয়েন্টি - আনিসুল হক
গল্প - ইফতার - প্রণব ভট্ট
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738821 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738821 2007-10-21 17:30:26
আমার বাংলা ই-বুক সংগ্রহের এক বছর - সংগ্রহে দুই শতাধিক বই - তালিকা এখানে ইন্টারনেটে আমি প্রথম বাংলা গল্পের বই পাই গত বছর রোযার ঈদের দিন বিডি বাংলা ডট কম থেকে। সেই শুরু - এরপর বাংলা ডট ডেলডা, ফ্রি বুকস ডট ফিফটি ওয়েবস, ক্যালকাটা ওয়েব, মূর্ছনা, বাংলাবুক - একের পর এক এসব সাইটের সন্ধান পেতে থাকি এবং বাংলা বই ডাউনলোড করে আমার হার্ড ডিস্ক পূর্ণ করে তুলতে থাকি এবং জন্মের পর থেকে প্রবাসে থাকার ফলে বাংলা বই না পড়াতে পারার যে অতৃপ্তি ছিল, সেটা পূরণ করতে থাকি।

এই এক বছরে আমর কম্পিউটার বাংলা বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইশোরও বেশিতে এবং এগুলো দখল করে আছে হার্ডডিস্কের 1. গিগাবাইট। নিচে আমার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর একটা তালিকা দিলাম। এর মধ্যে যে বইগুলো আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে, সেগুলোর পাশে ব্র্যাকেটে চমত্‍কার লিখে দিলাম। যারা এখনও সেগুলো পড়েননি, তাদের প্রতি অনুরোধ, দেরি না করে এগুলো ডাউনলোড করা শুরু করে দিন। তা না হলে সাহিত্যের একটা ইন্টারেস্টিং অধ্যায় মিস করবেন।

আজ শুধু হুমায়ূন আহমেদের বইগুলোর তালিকা দেওয়া হল। আমার কাছে যেগুলো বেশ ভালো লেগেছে, সেগুলোর পাশে ভালো এবং যেগুলোকে অসাধারণ মনে হয়েছে, সেগুলোর পাশে চমতকার লিখে দিলাম।

আমার সংগ্রহে থাকা বাংলা বইয়ের (পিডিএফ) তালিকা - হুমায়ূন আহমেদ (78)

কবি
বাসর
মৃণ্ময়ী
কিছুক্ষণ
কৃষ্ণপক্ষ
অন্যদিন
আয়নাঘর
দুই দুয়ারী
বৃষ্টি বিলাস
যদিও সন্ধ্যা
উড়াল পঙ্খী
রূপার পালঙ্ক
লিলুয়া বাতাস
গৌরীপুর জংশন
নীল অপরাজিতা
সাজঘর (ভালো)
সবাই গেছে বনে
আজ চিত্রার বিয়ে
আমার আছে জল
তোমাকে (ভালো)
অচিনপুর (ভালো)
বহুব্রীহি (চমতকার)
আকাশ জোড়া মেঘ
এই মেঘ, রৌদ্রছায়া
রোদন ভরা এ বসন্ত
লীলাবতী (চমতকার)
তিথির নীল তোয়ালে
অনিল বাগচির একদিন
মৃণ্ময়ীর মন ভালো নেই
অন্ধকারের গান (ভালো)
নন্দিত নরকে (চমতকার)
পাখি আমার একলা পাখি
তেঁতুল বনে জোছনা (ভালো)
চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে
মধ্যাহ্ন (চমতকার, চমতকার, চমতকার)
আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি (চমতকার, চমতকার)
শঙ্খনীল কারাগার (সবাই বলে ভালো, কিন্তু আমার কাছে লাগেনি)

# শুভ্র বিষয়ক (4 টি)

রূপালী দ্বীপ
মেঘের ছায়া
এই শুভ্র এই
দ্বারুচিনি দ্বীপ (ভালো)

# মিসির আলি বিষয়ক (8 টি)

দেবী
বৃহন্নলা
ভয় (চমতকার)
নিষাদ (চমতকার)
আমিই মিসির আলি
নিশিথিনী (চমতকার)
কহেন কবি কালিদাস
মিসির আলির অমীমাংসিত রহস্য

# হিমু বিষয়ক (14 টি)

হিমু
পারাপার
এবং হিমু
সে আসে ধীরে
হিমুর দ্বিতীয় প্রহর
আঙ্গুল কাটা জগলু
হিমুর রূপালী রাত্রি
তোমাদের এই নগরে
হলুদ হিমু কালো র্যাব
চলে যায় বসন্তের দিন
আজ হিমুর বিয়ে (ভালো)
ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু
হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম
একজন হিমু এবং কয়েকটি ঝিঁঝিঁ পোকা

# সায়েন্স ফিকশন (3 টি)

ইরিনা
কুহক (ভালো)
তোমাদের জন্য ভালোবাসা

# আধিভৌতিক (4টি)

নি
কুটুমিয়া
অদ্ভুত সব গল্প
দ্যা এক্সরসিস্ট (অনুবাদ)

# আত্মজীবনীমূলক (2 টি)

কিছু শৈশব
এলেবেলে প্রথম পর্ব

# শিশুতোষ (3টি)

ছেলেটা
নীল হাতি
একি কান্ড!

# গল্প (2 টি)

পাপ
জলিল সাহেবের পিটিশন

বর্তমানে ইন্টারনেটে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ হল মূর্ছনা। সেখানে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের সংখ্যা 65 টি। আর আমর কাছে আছে 78 টি!
উপরের তালিকার মধ্যে ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু পড়তে পারেন আমার ব্লগ থেকে। এছাড়া এটা আমার ইস্নিপস ডাউনলোড সেন্টার থেকে পিডিএফ ফরম্যাটে ডাউনলোডও করে নিতে পারেন। আর বাকি বইগুলোর অধিকাংশই পাবেন মূর্ছনা থেকে। যদি সেখানে রেজিস্ট্রেশন করা ঝামেলার মনে করেন, তাহলে সেখানকার অধিকাংশ বই সরাসরি সুমন আহমেদের ইস্নিপস ডাউনলোড সেন্টার থেকে ডাউনলোড করতে পারেন। কারণ সুমন আহমেদ হচ্ছেন মুর্ছনার অ্যাডমিন এবং মূর্ছনার অধিকাংশ বই তারই আপলোড করা। আর তার স্ক্যান কোয়ালিটিও অসাধারণ!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738633 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738633 2007-10-20 17:04:59
সামাজিক বন্ধন সবচেয়ে দৃঢ় বাংলাদেশীদের; দ্বিতীয় সুদানিদের; সবচেয়ে কম মিসরীদের মধ্যে! শিরোণামে উল্লেখিত বিষয়ের প্রতিপাদ্যটা গবেষণালব্ধ না হলেও নিছক কল্পনাপ্রসূত নয়; বরং বলা যায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাপ্রসূত। বিভিন্ন ভাবে আমি অসংখ্যবার এই প্রতিপাদ্যের প্রমাণ পেয়েছি। কিন্তু আজ শুধু একটা বিষয়ের কথাই বলব - সেটা হল ঈদের নামায বা জুমার নামাযের পর কুশল বিনিময়ের কথা।

খুব বেশি ছোটকালের কথা বলব না; গত এক যুগের কথাই বলি। গত বারো বছর ধরে কোন ঈদেই আমি ঈদের নামায মিস করিনি। প্রথমে যখন মিসরাতায় ছিলাম, তখন সেখানকার সবচেয়ে বড় মসজিদ জামা'ল আলীতে এবং সিরতে আসার পর থেকে এখানকার একমাত্র ঈদগাহ আল মুতাবা'তে নিয়মিতভাবে ঈদের নামায আদায় করে আসছি।

সঠিকভাবে বলা কঠিন, তবে আনুমানিকভাবে বলা যায় এসব মসজিদে উপস্থিত মুসল্লীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষতো অবশ্যই লিবিয়ান; তারপর সম্ভবত যথাক্রমে মিসর, সুদান, ফিলিস্তিন, জেজায়ের, মাগরিব, ইরাক, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সিরিয়া, ঘানা, তেশাদ, মৌরিতানিয়া, নাইজার, বসনিয়া, ইন্ডিয়া প্রভৃতি দেশীয়রা।

অন্য সব দেশের মুসল্লীরা সাধারণত ঈদের নামায এবং খুতবা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ পরিচিতদের সাথে কুশল বিনিময় করেই বাড়ি ফিরে যায়। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে। মিসরাতা এবং সিরত দুইজায়গাতেই দেখেছি, হোক সেটা জুমার নামায শেষে বা ঈদের নামায শেষে, সব দেশীরা চলে যাওয়ার পরেও আরো অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশীরা থেকে যায়। প্রায় সব বাংলাদেশীই তাদের সকল পরিচিতের সাথে কোলাকুলি করতে থাকে এবং বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে থাকে। আর এটা নিছকই লোক দেখানো নয় - তাদের কন্ঠস্বর থেকেই তাদের আন্তরিকতাটুকু টের পাওয়া যায়। প্রায় ঘন্টাব্যাপী কোলাকুলি করার পরে বুক ব্যাথা হয় না, এমন বাংলাদেশী পাওয়া খুবই কঠিন।

যেমন এবারকার ঈদের কথাই ধরা যাক। ঈদের নামাযের পর খুতবা শেষ হয়েছে আটটা বাজে। সাড়ে আটটার দিকে দেখা গেল, ঈদগাহের ব্যবস্থাপনায় যে কয়েকজন লিবিয়ান ছিল তারা, দুইটা পুলিশের পেট্রোল কার আর দূরে একটা অ্যাম্বুলেন্স ছাড়া আর কেউ উপস্থিত নেই; কিন্তু তখনও প্রায় সব বাংলাদেশীই বহাল তবিয়তে উপস্থিত ছিল। আমরা ঈদগাহ থেকে বাসার দিকে রওনা দেই সোয়া নয়টার দিকে। তখন পুরো ঈদগাহে মানুষ বলতে ছিল শুধুমাত্র ছয়-সাত জন বাংলাদেশী।

আর এই চিত্রতো শুধু এবারের নয়, প্রতিবারের ঈদের। আর শুধু ঈদ কেন, জুমার নামাযের পরেও সবাই চলে যাওয়ার পর, এমনকি মসজিদের শেষ ব্যক্তিটিও চলে যাওয়ার পরেও দেখা যায় কয়েকজন বাংলাদেশী মসজিদের সামনের কোন একটা ছায়ায় দাঁড়িয়ে গল্প-গুজব করছে, কথা-বার্তা বলছে - কাজের কথার চেয়ে অকাজের কথাই বেশি, যার মধ্যে একটা বড় অংশ অবশ্যই বাংলাদেশের এবং সারা বিশ্বের রাজনীতি।

ঈদগাহে বাংলাদেশীদের চেয়ে একটু আগে যারা স্থান ত্যাগ করে, তারা হল সুদানিরা। শুধু ঈদগাহের ক্ষেত্রে নয়, এমনিতেও সুদানিরা বেশ সামাজিক। বাংলাদেশীদের মতোই তারা অতিথি-আপ্যায়নপ্রিয়। প্রায়ই দেখা যায় পুরো পরিবার নিয়ে এক সুদানি আরেক সুদানির বাসায় বেড়াতে গিয়েছে, যেটা বাংলাদেশী ছাড়া এখানে অন্যদেশীদের মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।

অপরদিকে মিসরীদের অবস্থান এদিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম। ঈদগাহে দেখা যায় অধিকাংশ মিসরীই ঈদের নামায শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঊটে চলে যায়; খুতবা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করে না।

বাংলাদেশীদের অনেক দিকে অনেক নেগেটিভ পরিচয় আছে। কিন্তু বাংলাদেশীরা যে অন্যান্যদেশীদের তুলনায় অনেক বেশি সামাজিক, অতিথিবত্‍সল, আতিথ্যপরায়ন, সেটা কি খুব বেশি বিদেশী জানে


আরও পড়ুন : প্রতি ঈদে এশীয়রা করে বকাবকি আর আরবীয়রা করে গালাগালি

ঈদ ছড়া - ঈদের চাঁদ

]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738522 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738522 2007-10-19 21:59:33
প্রতি ঈদে এশীয়রা করে বকাবকি আর আরবীয়রা করে গালাগালি <img src='http://www.somewhereinblog.net/smileys/emot-slices_03.gif' /> ঈদের দিন সকাল বেলা পুরো আরব বিশ্বে গালাগালির ধুম পড়ে যায়। অপরিচিতরা তাও একটু রেহাই পায়, কিন্তু পরিচিতদের কোন রেহাই নেই। দেখা হওয়া মাত্রই একজন আরেকজনকে সমানে গালাগালি করতে থাকে। কি, বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে ব্যখ্যা করছি।

আমরা যেরকম ঈদের দিন একজন আরেকজনের সাথে কোলাকুলি করি, আরবীয়রা কিন্তু সেরকম কোলাকুলি করে না। তারা একজন আরেকজনের গালের পাশে গাল নিয়ে চুমুর মতো শব্দ করে (জোশ ফিল্মের ইয়ার মেরে গানটার মধ্যে রাণী আর ববি দেওল যেরকম করছিল )। এটাকে ইচ্ছা করলে চুমাচুমিও বলা যায়। কিন্তু যেহেতু তারা প্রকৃতপক্ষে চুমু দেয় না, জাস্ট গালের পাশে গাল রাখে, কাজেই একে গালাগালি বলাই ভালো!

আর এই সূত্র অনুসারে এশীয়রা যে কোলাকুলি করে, সেটা যেহেতু বুকের সাথে বুক মিলিয়েই করা হয়, কাজেই তাকে ইচ্ছে করলে বুকাবুকি বা বকাবকিও বলা যেতে পারে!

ঈদ হল একটা প্রধান ধর্মীয় উত্‍সব। আর এই দিনে কিনা মনুষ্য জাতির একদল বকাবকি আর আরেক দল গালাগালি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বড়ই আফসোস!
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738506 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738506 2007-10-19 20:49:44
কৌতুক 09 - আপনি একজন ইন্টারনেট আসক্ত ব্যক্তি ...
01. যদি আপনি মানুষকে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে আসল নামের পরিবর্তে ভুলে ব্লগের নিকটাই বলে দেন!

02. যদি আপনার সকল বন্ধু-বান্ধবের নামের মধ্যে একটা করে @ চিহ্ন থাকে!

03. যদি আপনার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হয় এমন একজন, যাকে আপনি কোনদিন দেখেনই নি!

04. যদি আপনার বাসার পোষা কুকুরটারও "ব্যক্তিগত" হোমপেজ থাকে!

05. যদি আপনি নিজের বাসার ঠিকানা লেখেন এভাবে - Click This Link

06. যদি আপনি নতুন কোন জায়গায় গেলে সে জায়গার ল্যান্ডস্কেপটা কেমন, তার পরিবর্তে সেখানে নেটস্কেপ আছে কি না, সেটাই আগে লক্ষ্য করেন!

07. যদি ঘুম আসতে দেরি হলে আপনি মনিটরটাকে বালিশের পাশে কাত করে রেখে কিছু একটা পড়তে বা দেখতে থাকেন!

08. যদি আপনি ডাস্টবিনকে রিসাইকেল বিন, মুড অফ হয়ে যাওয়াকে হ্যাং, চুরি হওয়া হ্যাকিং প্রভৃতি বলে সম্বোধন করেন।

09. এমনকি, যদি বাথরুমে দৈহিক আবর্জনা ত্যাগ করতে যাওয়াকে আপনি ডাউনলোডিং বলে সম্বোধন করেন!

10. এবং সর্বোপরি, যদি আপনি একজন পাইপ ফিটারকে বাসায় ধরে নিয়ে আসেন আপনার কম্পিউটারের চেয়ারটাকে টয়লেটের কমোডটা দিয়ে প্রতিস্থাপন করে দিতে!


সৌজন্যে - লটস অভ জোকস ডট কম


### এই কৌতুকগুলো যদি আপনাকে হাসাতে ব্যর্থ হয়ে থাকে তবে এগুলো পড়ে দেখতে পারেন। হাসলেও হাসতে পারেন পরাণও খুলিয়া -
কৌতুক 07 - একটি কৌতুক + ধাঁধা + আই কিউ টেস্ট
কৌতুক 05 (রাজনৈতিক 02) - হাসি ফোটানোর সূত্র
কৌতুক 04 - (রাজনৈতিক 01) - আয়কর ফাঁকি
কৌতুক 03 - আস্তাগফিরুল্লাহ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738077 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28738077 2007-10-17 23:11:45
কৌতুক 08 - শিক্ষক বনাম ছাত্র কথপোকথন এক.

শিক্ষক : রাজু, বল তো পানির রাসায়নিক সংকেত কি?
রাজু : স্যার, H I J K L M N O!
শিক্ষক : কানে ধরে দশবার ওঠবস কর। তার আগে বল কোথা থেকে শিখেছ এটা?
রাজু : কেন স্যার, আপনিইতো গতকাল বললেন যে পানির সংকেত হচ্ছে এইচ টু ও (H to O)!


দুই

ভূগোলের ক্লাসে শিক্ষক : রাজু, যাও তো দেয়ালের মানচিত্র থেকে আমেরিকা খুঁজে বের কর তো!
রাজু : এই যে স্যার, পেয়েছি।
শিক্ষক : হয়েছে। এবার সবুজ, তুমি বলতো আমেরিকা কে আবিষ্কার করেছে?
সবুজ : স্যার, রাজু!


তিন.

শিক্ষক : রাজু, তোমার স্কুলে আসতে এত দেরি হল কেন?
রাজু : স্যার, স্কুলের সামনের রাস্তার সাইনবোর্ডটা দেখে।
শিক্ষক : কেন? সাইনবোর্ড আবার কি দোষ করল?
রাজু : কারণ স্যার, সাইনবোর্ডটাতে লেখা ছিল, "সামনে স্কুল, আস্তে চলুন!"


চার.

শিক্ষক : রাজু, কুকুরের উপর লেখা তোমার আর আর তোমার ভাইয়ের রচনাটা হুবহু একই হয়েছে। তোমরা কি দেখাদেখি করেছ?
রাজু : জ্বি না, স্যার। আসলে আমাদের দুজনের একটাই কুকুর আছে!


পাঁচ.

শিক্ষক : আচ্ছা রাজু, বলতো যিনি শ্রোতার আগ্রহ না বুঝে ক্রমাগত বকবক করতে থাকেন - এর এক কথায় প্রকাশ কি হবে?
রাজু : স্যার, এটার এক কথায় প্রকাশ হবে শিক্ষক!


সৌজন্যে - লটস অভ জোকস ডট কম



### এই কৌতুকগুলো যদি আপনাকে হাসাতে ব্যর্থ হয়ে থাকে তবে এগুলো পড়ে দেখতে পারেন। হাসলেও হাসতে পারেন পরাণও খুলিয়া -

কৌতুক 07 - একটি কৌতুক + ধাঁধা + আই কিউ টেস্ট
কৌতুক 05 (রাজনৈতিক 02) - হাসি ফোটানোর সূত্র
কৌতুক 04 - (রাজনৈতিক 01) - আয়কর ফাঁকি
কৌতুক 03 - আস্তাগফিরুল্লাহ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737697 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737697 2007-10-15 23:34:44
ঈদ স্পেশাল সায়েন্স ফিকশন - অক্টোপাসের চোখ - মুহম্মদ জাফর ইকবাল বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালক মহামান্য কিহি কালো গ্রানাইট টেবিলের চারপাশে বসে থাকা অন্য সদস্যদের মুখের দিকে একনজর তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, ‘অনেক দিন পর আজ আমি তোমাদের সবাইকে আমার এখানে ডেকে এনেছি। আমার ডাক শুনে তোমরা সবাই এসেছ, সে জন্য অনেক ধন্যবাদ।’

একাডেমির তরুণ সদস্য ফিদা তার মাথার সোনালি চুল হাত দিয়ে পেছনে সরিয়ে বলল, ‘মহামান্য কিহি, আপনি আমাদের ডেকেছেন, এটি আমাদের কত বড় সৌভাগ্য!’

অন্য সবাই মাথা নেড়ে সায় দিল, বলল, ‘অনেক বড় সৌভাগ্য।’

মহামান্য কিহি মৃদু হেসে বললেন, ‘অনেক বয়স হয়েছে, কখন পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়, তাই ভাবলাম, একবার তোমাদের সবার সঙ্গে বসি। একটু খোলামেলা কথা বলি।’

জীববিজ্ঞানী রিকি মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনাকে আমরা এত সহজে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে দেব না। আপনি আরও অনেক দিন আমাদের সঙ্গে থাকবেন।’

অন্যরাও মাথা নাড়ল, গণিতবিদ টুহাস সোজা হয়ে বসে বলল, ‘মহামান্য কিহি, আপনি পৃথিবীর ইতিহাসে বিজ্ঞান একাডেমির সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপরিচালক। আপনার সময় এই পৃথিবী সব দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গায় পৌঁছেছে।’

বিজ্ঞানী ফিদা মাথাটা সামনে এগিয়ে এনে বলল, ‘হ্যাঁ। এই মুহূর্তে পৃথিবী যে অবস্থায় পৌঁছেছে, আর কখনো সে রকম অবস্থায় ছিল না। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, শিল্পে-সাহিত্যে সব দিক দিয়ে পৃথিবীর মানুষ একটা নতুন অবস্থায় পৌঁছেছে।’

গণিতবিদ টুহাস বলল, ‘এর পুরো কৃতিত্ব আপনার।’

মহামান্য কিহি বাধা দিয়ে বললেন, ‘না, না, তোমরা তোমাদের কথায় অতিরঞ্জন করছ। এটা মোটেই আমার একক কৃতিত্ব নয়। আমি কখনোই একা কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। তোমাদের সবার সঙ্গে কথা বলেছি, কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কাজেই যদি কোনো কৃতিত্ব থাকে তাহলে সেটা আমার একার নয়, আমাদের সবার।’

বিজ্ঞানী ফিদা বলল, ‘কিন্তু নেতৃত্বটুকু দিয়েছেন আপনি।’

মহামান্য কিহি বললেন, ‘যা-ই হোক, আমি এটা নিয়ে তোমাদের সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। বরং তোমাদের কি জন্য ডেকেছি সেটা নিয়ে কথা বলি।’

সবাই মাথা নেড়ে সোজা হয়ে বসে উত্‍সুক চোখে মহামান্য কিহির দিকে তাকাল। মহামান্য কিহি খানিকটা অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে মানুষ হচ্ছে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। হোমো স্যাপিয়েনস এই পর্যায়ে এসেছে বিবর্তনের ভেতর দিয়ে, তার জন্য সময় লেগেছে লাখ লাখ বছর। সেই দুই শ হাজার বছর আগের হোমো স্যাপিয়েনস বিবর্তনের ভেতর দিয়ে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। এই বিবর্তনটুকু পুরোপুরি এসেছে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রভাবে, স্বাভাবিকভাবে।’

মহামান্য কিহি একটু থামলেন, তিনি ঠিক কী বলতে চাইছেন বোঝার জন্য সবাই আগ্রহ নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। মহামান্য কিহি আবার শুরু করলেন, বললেন, ‘এ মুহূর্তে এই পৃথিবীতে মানব প্রজাতি তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অবস্থায় আছে। আমরা কি জানি, আজ থেকে এক লাখ বছর পর কিংবা এক মিলিয়ন বছর পর আমরা কোন পর্যায়ে থাকব? আমরা কি আমাদের মতোই থাকব, নাকি অন্য রকম হয়ে যাব?’

জীববিজ্ঞানী টুহাস বলল, ‘আমরা সিমুলেশন করে সেটা দেখেছি ...’

মহামান্য কিহি মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি সেই সিমুলেশন দেখেছি। তোমরাও দেখেছ। আমি দেখে একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়েছি এবং সে জন্যই আমি তোমাদের ডেকেছি।’

মহামান্য কিহি একটু থামলেন। সবার চোখের দিকে তাকালেন এবং বললেন, ‘মানুষ প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিবর্তনের ভেতর দিয়ে এখানে এসেছে, কিন্তু এখন বিজ্ঞানের মহিমায় আমাদের আর বিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে হয় না। মানুষের ভেতরে যদি কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, আমরা ইচ্ছে করলে সেটা আনতে পারি।’

জীববিজ্ঞানী টুহাস বলল, ‘মহামান্য কিহি, আপনি কি বলতে চাইছেন আমরা নিজে থেকে মানুষের ভেতরে কোনো পরিবর্তন আনি?’

‘আমি সেটা সেভাবে বলতে চাইছি না। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাইছি। বিজ্ঞান একাডেমির সদস্য হিসেবে এই পৃথিবীর মানবজাতির পুরো দায়িত্ব আমাদের হাতে। ভবিষ্যতের মানুষ এই পৃথিবীতে কীভাবে থাকবে, সেটা নির্ভর করে বর্তমানের মানুষকে আমরা কীভাবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করি। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাইছি, পৃথিবীর মানুষ কি ভবিষ্যতের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত? মানবদেহ কি নিখুঁত?’

হঠাত্‍ করে সবাই একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল, আবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সবাই চুপ করে গেল। জীববিজ্ঞানী টুহাস বলল, ‘না, মহামান্য কিহি, মানবদেহ নিখুঁত নয়। এর মধ্যে অনেক ত্রুটি আছে। আমরা সবাই সেটা জানি। বিবর্তনের কারণে আমাদের চোখটা ভুল, চোখের ভেতরে আলো-সংবেদন কোষ নিচে, নার্ভ ওপরে। অক্টোপাসের চোখ হচ্ছে সঠিক।’

বিজ্ঞানী ফিদা বলল, ‘তুমি চোখের কথা বলছ, কিন্তু আমরা তো সাধারণত চোখের সীমাবদ্ধতাটা দৈনন্দিন জীবনে টের পাই না। যেটা টের পাই সেটার কথা বলো না কেন?’

‘সেটা কী?’

‘নবজাতকের মাথা। তুমি জানো, মানবশিশুর মাথা কত বড়? একজন মায়ের গর্ভনালি দিয়ে মানবশিশু বের হতে পারে না, মায়ের সন্তান জন্ম দিতে কত কষ্ট হয়, তুমি জানো?’

জীববিজ্ঞানী টুহাস বলল, ‘আমি পুরুষ মানুষ, সন্তান জন্ম দিতে হয় না। তাই কষ্টের পরিমাণটুকু জানি না। কিন্তু বিষয়টি আমি বুঝতে পারছি।’

গণিতবিদ রিকি বলল, ‘বিবর্তনের কারণে মানুষ হঠাত্‍ করে দুই পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু হাড়ের সংযোগটা মানুষের পুরো ওজন ঠিকভাবে নিতে পারে না। দুটি পা না হয়ে চারটি পা হলে ওজনটা ঠিকভাবে নিতে পারত। মানুষের হাঁটুও খুব দুর্বল।’

প্রযুক্তিবিদ রিভিক কম কথা বলে, সে সবাইকে বাধা দিয়ে বলল, ‘তোমরা কেউ এপেনডিক্সের কথা কেন বলছ না? এটা শরীরের কোনো কাজে লাগে না। হঠাত্‍ হঠাত্‍ সংক্রমিত হয়ে কী ঝামেলা করে দেখেছ?’

রিভিকের কথার ভঙ্গিতে সবাই হেসে উঠল। জীববিজ্ঞানী সুহাস বলল, ‘এটা ঝামেলা দিতে পারে, কিন্তু এর গুরুত্ব কম। এর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পুরুষ ও নারীর জননেন্দ্রিয় এবং এগুলো কোনোভাবেই সঠিক নয়। এর অবস্থান খুবই বিপজ্জনক!’

বিজ্ঞানী ফিদা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। মহামান্য কিহি হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দিলেন। মৃদু হেসে বললেন, ‘আমি জানি, মানবদেহের ডিজাইনের অসম্পূর্ণতা নিয়ে তোমাদের সবারই অনেক কিছু বলার আছে! আমরা ইচ্ছে করলে এটা নিয়ে সারা দিন কথা বলতে পারি। কিন্তু আমি সেটা করতে চাইছি না। আমাদের কেন্দ্রীয় কম্পিউটারে মানবদেহের সীমাবদ্ধতার পুরো তালিকা রয়েছে। তোমরা এখন যা যা বলেছ, তার বাইরে আরও অনেক বিষয় আছে। আমি তোমাদের কাছে জানতে চাইছি, আমরা কি প্রাকৃতিক বিবর্তনের ওপর ভরসা করে অপেক্ষায় থাকব, নাকি আমরা নিজেরা মানবদেহের সীমাবদ্ধতাগুলো মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব?’

বিজ্ঞান একাডেমির সদস্যরা আবার সবাই একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা অবশ্য থেমে গেল। তারপর একজন একজন করে নিজের বক্তব্য বলল। দীর্ঘ আলোচনার পর বিজ্ঞান একাডেমি থেকে মানবজাতির ভবিষ্যত্‍ নিয়ে সর্বকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো। বিজ্ঞান একাডেমি সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত নিল, মানবজাতির জেনোমে আগামী এক শ বছরে খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা হবে, যেন এক শ বছর পর মানবদেহে আর কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকে। মানবদেহ হবে নিখুঁত, যেন তারা ভবিষ্যতে এই পৃথিবীতে অত্যন্ত সফল একটা প্রজাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মহামান্য কিহি নরম গলায় বললেন, ‘তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ। ভবিষ্যতের মানব আজকের এই সিদ্ধান্তের জন্য তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।’

সবাই মাথা নাড়ল, বিজ্ঞানী ফিদা বলল, ‘আপনার নেতৃত্ব ছাড়া আমরা কখনোই এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম না, মহামান্য কিহি।’

*** **** *** *** ***

বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালকের সামনে রাষ্ট্রীয় চিকিত্সাকেন্দ্রের পরিচালক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিচালক মাথা তুলে বলল, ‘এটি আপনি কী বলছেন, মহামান্য কিহি?’

‘আমি এটা ঠিকই বলছি। আমি অনেক চিন্তা করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ মহামান্য কিহি বললেন, ‘তুমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করো।’

চিকিত্সাকেন্দ্রের পরিচালক বলল, ‘আপনার দেহ সুস্থ ও নিরোগ। আপনি আরও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। আপনি কেন এখনই শীতল ঘরে যেতে চাইছেন?’

মহামান্য কিহি বললেন, ‘তার দুটি কারণ। প্রথমত, আমি নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চাই। আমি দীর্ঘদিন বিজ্ঞান একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন অন্য কেউ করুক। দ্বিতীয়ত, আমি খুব বেশি বৃদ্ধ হয়ে অচল হওয়ার আগেই শীতল ঘরে যেতে চাই। আজ থেকে এক শ বছর পর আমি জেগে উঠে পৃথিবীর মানুষকে দেখতে চাই। মানবদেহের সব সম্পূর্ণতা আর ত্রুটি দূর করার পর তারা পৃথিবীতে কীভাবে বসবাস করবে, আমি সেটা নিজের চোখে দেখতে চাই।’

চিকিত্সাকেন্দ্রের পরিচালক বিষন্ন গলায় বলল, ‘আপনি যদি সেটাই চান, তাহলে আমরা সেটাই করব। তবে, মহামান্য কিহি, পৃথিবীর মানুষ কিন্তু আপনাকে এভাবে হারাতে চাইবে না।’

মহামান্য কিহি মৃদু হেসে বললেন, ‘তুমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। আমাকে একটা শীতল ঘরে রাখার ব্যবস্থা করো। আমাকে জাগিয়ে তুলবে আজ থেকে ঠিক এক শ বছর পর।’

চিকিত্সাকেন্দ্রের পরিচালক মাথা নুইয়ে বলল, ‘আপনার আদেশ আমাদের সবার জন্য শিরোধার্য।’

*** *** *** *** ***

ক্যাপসুলের ভেতর খুব ধীরে ধীরে চোখ খুললেন মহামান্য কিহি। ভেতরে আবছা ও নীলাভ এক ধরনের আলো। মাথার কাছে কোনো একটা পোর্ট থেকে শীতল বাতাস বইছে। সেই বাতাসে এক ধরনের মিষ্টি গন্ধ। চোখের কাছাকাছি একটা প্যানেল। সেখানে সবুজ আলোর একটা সংকেত। ছোট মিটারটি দেখাচ্ছে, পৃথিবীতে এর মধ্যে একশ বছর কেটে গেছে। মহামান্য কিহি শান্ত হয়ে শুয়ে রইলেন, তাঁর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কিছুক্ষণের মধ্যেই সচল হয়ে উঠবে। তখন তিনি এই ক্যাপসুলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসবেন। তিনি নিজের ভেতরে এক ধরনের উত্তেজনা অনুভব করতে থাকেন।

মহামান্য কিহি যখন ক্যাপসুল খুলে বের হয়ে এলেন তখন পৃথিবীতে সূর্য ঢলে পড়ে বিকেল নেমে এসেছে। তিনি সুরক্ষিত ঘরের ভারী দরজা খুলে বের হয়ে আসতেই বাইরের সতেজ সবুজ পৃথিবীর ঘ্রাণ অনুভব করলেন। চারপাশে বড় বড় গাছ, ঘাস উঁচু হয়ে আছে, ওপরের নীল আকাশে সাদা মেঘ। তিনি কান পেতে পাখির কিচিরমিচির শব্দ শুনতে পেলেন। বুকের ভেতর তিনি এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করলেন। ফিসফিস করে নিজের মনে বললেন, ‘আহা! এই পৃথিবী কী অপূর্ব! সৃষ্টিকর্তা, তোমাকে ধন্যবাদ, আমাকে মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে পাঠানোর জন্য!’

মহামান্য কিহি ঘাসের ওপর পা দিয়ে সামনে হেঁটে যেতে থাকেন। তাঁকে একটা লোকালয়, একটা জনপদ খুঁজে বের করতে হবে। পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ মানুষকে নিজের চোখে দেখতে হবে। তাঁর কৌতূহল আর বাধ মানতে চাইছে না।

হঠাত্‍ মহামান্য কিহি এক ধরনের সতর্কশব্দ শুনে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন। খানিকটা দূরে কয়েকটি চতুষ্পদ প্রাণী তাদের চার পায়ের ওপর ভর করে তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কী বিচিত্র এই প্রাণীটি, আর কী বিচিত্র তার দৃষ্টি! তাঁর সময় কখনো তিনি এ ধরনের কোনো প্রাণী দেখেননি।

প্রাণীগুলো এক ধরনের হিংস্র শব্দ করতে করতে হঠাত্‍ চার পায়ে ভর করে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে থাকে এবং হঠাত্‍ করে তিনি বুঝতে পারেন, এগুলো আসলে মানুষ। ভয়াবহ আতঙ্কের একটা শীতল স্রোত তাঁর মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে যায়। তাঁর ভবিষ্যতের মানুষের এটি কোন ধরনের পরিণাম? মানুষগুলো একটু কাছে এলে তিনি বুঝতে পারেন, মায়েদের সন্তান জন্ন দেওয়ার কষ্ট লাঘব করার জন্য এদের মাথা ছোট করে দেওয়া হয়েছিল। সে জন্য মস্তিষ্কের আকারও ছোট হয়েছে। এখন তারা আর বুদ্ধিদীপ্ত মানুষ নয়। তারা এখন বুদ্ধিবৃত্তিহীন পশু। তারা সবাই উলঙ্গ, কাপড় পরার প্রয়োজনীয়তাটুকু পর্যন্ত অনুভব করে না। শরীরের ওজন সঠিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তারা এখন চার হাত পায়ে ছোটাছুটি করে। বিবর্তনে মানুষ একবার দুই পায়ে দাঁড়িয়েছিল। এখন উল্টো বিবর্তনে আবার তারা চার পায়ে ফিরে গেছে। মহামান্য কিহি এই মানুষগুলোর দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকেন। তাদের ভেতরে আরও অনেক সূক্ষ্ম পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সেগুলো বোঝার আগেই মানুষগুলো তাকে ধরে ফেলল, হাতগুলো এখনো ব্যবহার করতে পারে। শক্ত হাতে তাঁকে ধরে ফেলে হিংস্র শব্দ করতে করতে দাঁত দিয়ে কামড়ে তাঁর কণ্ঠনালি ছিঁড়ে ফেলল।

মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে তিনি তাদের চোখের দিকে একবার তাকাতে পেরেছিলেন, বোধহীন পশুর হিংস্র চোখ, কিন্তু সেগুলো ছিল নিখুঁত অক্টোপাসের চোখ।


সৌজন্যে - প্রথম আলো


# আপনি সম্ভবত এই পোস্টগুলোও পছন্দ করবেন -
সায়েন্স ফিকশন - একটি মৃত্যুদণ্ড - মুহম্মদ জাফর ইকবাল
ময়ূরাক্ষীর তীরে প্রথম হিমু - হুমায়ূন আহমেদ
টুয়েন্টি টুয়েন্টি - আনিসুল হক
গল্প - ইফতার - প্রণব ভট্ট
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737675 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737675 2007-10-15 21:45:14
একটি কৌতুক + ধাঁধা + আই কিউ টেস্ট আপনার আই কিউ টেস্ট করার জন্য নিচে চারটি প্রশ্ন করা হল। প্রতিটি প্রশ্ন পড়ার পর মনে মনে উত্তর ঠিক করে নিবেন এবং এরপর স্ক্রোল করে নিচে দেওয়া উত্তরের সাথে মিলিয়ে নিবেন। আশা করছি কয়টা উত্তর ঠিক হয়েছে (যারা আগেই পড়েছেন তারা বাদে) সেটা মন্তব্যের ঘরে জানাবেন।

প্রশ্ন এক: আপনাকে একটি রেফ্রিজারেটরের ভেতর একটা জিরাফ রাখতে বলা হল। কিভাবে রাখবেন?



















ভুল উত্তর : বনে যাব, জিরাফ শিকার করব, সেটা কাটাকুটি করব, এরপর রেফ্রিজারেটরে ঢুকাবো।

সঠিক উত্তর : রেফ্রিজারেটরটা খুলব, জিরাফটাকে এর ভেতরে ঢুকাবো এবং এরপর রেফ্রিজারেটরটা বন্ধ করে দিব।

এই প্রশ্নটা করা হয়েছে এটা দেখার জন্য যে, আপনি একটা সহজ কাজকে জটিল উপায়ে করছেন কি না?



প্রশ্ন দুই: আপনাকে একটি রেফ্রিজারেটরের ভেতর একটা হাতি রাখতে বলা হল। কিভাবে রাখবেন?




















ভুল উত্তর : রেফ্রিজারেটরটা খুলব, হাতিটাকে এর ভেতরে ঢুকাবো এবং এরপর রেফ্রিজারেটরটা বন্ধ করে দিব।

সঠিক উত্তর : রেফ্রিজারেটরটা খুলব, জিরাফটাকে এর ভেতর থেকে বের করব, হাতিটাকে এর ভেতরে ঢুকাবো এবং এরপর রেফ্রিজারেটরটা বন্ধ করে দিব।



প্রশ্ন তিন : সিংহরাজ বনের সকল পশুপাখিদের একটা জরুরী সভা আহ্বান করেছেন। সব পশুপাখি যথাসময়ে সভায় হাজির হল শুধুমাত্র একজন বাদে। বলুন তো, সে কে?




















ভুল উত্তর : সিংহরাজ নিজেই।

সঠিক উত্তর : হাতি। কারণ সে তো রেফ্রিজারেটরের ভেতরে! সে সভায় উপস্থিত হবে কি করে?



আপনি যদি উপরের একটা প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে না পেরে থাকেন, তবে এটাই আপনার জন্য শেষ প্রশ্ন।

প্রশ্ন চার : আপনাকে একটা নদী পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু নদীটা শতশত কুমিরে পরিপূর্ণ। আপনি কিভাবে নদীটা পাড়ি দিবেন?




















ভুল উত্তর : একটা নৌকা জোগাড় করে সেটাতে চড়ে।

সঠিক উত্তর : সোজা সাঁতরে চলে যাব। কারণ সবগুলো কুমিরতো সিংহরাজের সভায় যোগ দিতে গেছে ...



সৌজন্যে - লটস অভ জোকস ডট কম



### আপনি সম্ভবত এই পোস্টগুলোও পছন্দ করবেন -
কৌতুক 05 (রাজনৈতিক 02) - হাসি ফোটানোর সূত্র
কৌতুক 04 - (রাজনৈতিক 01) - আয়কর ফাঁকি
কৌতুক 03 - আস্তাগফিরুল্লাহ
]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737073 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737073 2007-10-12 02:13:17
ঈদ ছড়া - ঈদের চাঁদ কারণটা এর জানতে চাইলে সবাই-ই দেয় খোঁটা॥

কেউবা দারুণ হাসি হেসে,
কেউবা ভীষন কাশি কেশে,
কেউবা বলে ধমকে শেষে -
এখনও তুই ছোটা,
বুঝবি না তুই কেন যে চাঁদ চিকণ কিবা মোটা।

ধমক খেয়ে যাহার যথা,
চুপটি করে দাঁড়িয়ে তথা,
ভাবতে থাকি চাঁদের কথা
ঘুম না গিয়ে ফোঁটা,
ভাবতে ভাবতে বহু দিনই রজনী যায় গোটা।

ভাবতে গিয়ে চাঁদটি দেখে,
হঠাত্‍ আমি গেলাম শেখে,
তিরিশটি দিন রোযা রেখে
শুকিয়ে গেছে ওটা,
অপর চাঁদটা আড়াই মাসে হয়েছে খেয়ে মোটা॥



# আপনি সম্ভবত এই কবিতাটাও পছন্দ করবেন -
প্রিয় চ্যানেল আই]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737056 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737056 2007-10-12 00:50:35
আমার ঈদ আয়োজন - লিবিয়ার চির অব্যাতীক্রমী ঈদ আগামীকাল (শুক্রবার) ঈদ। ঈদে কি করব? করার আসলে তেমন কিছুই নেই। সকালে ঈদগাহে যাব। সেখান থেকে হয়তো বাসায় ফিরতেও পারি অথবা সরাসরি শামীম-শাওনদের বাসায়ও চলে যেতে পারি - বলা যায় না কি করব। সিরতে এখন আমার সমবয়সী বলতে এই দুই জনই আছে। কাজেই ঈদে বেড়াতে গেলে শুধু ওদের বাসায়ই যাওয়া যেতে পারে। এছাড়া প্রতিবেশী তিন-চারটা বাংলাদেশী বাসা এবং লিবিয়ানদের বাসায়ও যাব।

আর যদি ঘরে থাকি, তাহলে ফুল সাউন্ড দিয়ে গান শুনব এবং মিস্টার বিন অভিনীত জনি ইংলিশ ফিল্মটা দেখব। সিডিটা কিনেছি কিন্তু এখনও দেখা হয়নি। গত বছর ঈদের দিন দেখেছিলাম ট্রয় 2000 এবং টাইটানিক। এবছর স্পার্টা দেখব ভেবেছিলাম কিন্তু পেলাম না। তাই বাধ্য হয়ে জনি ইংলিশই কিনে আনলাম।

আগে যখন আমাদের ডিশ ছিল না, তখন ঈদের দিন আরবী চ্যানেলগুলোতে (বিশেষতঃ MBC, ART) সুন্দর সুন্দর অনুষ্ঠান দিত - সেগুলো দেখেই সময় কেটে যেত। (আরবীয়দের ইসলাম প্রচারের যুগের এবং প্রাক-ইসলামিক যুগের পটভূমিতে নির্মিত নাটকগুলো খুব দারুণ হয়।) কিন্তু এখন ডিশ কেনার ফলে শুধুমাত্র বাংলা চ্যানেলগুলোই দেখা হয় (আরবী হেড লাগাই নি) - আর বাংলাদেশে তো ঈদের অনুষ্ঠান শুরু হবে আরো দুই দিন পরে। কাজেই টিভি দেখার চান্স নেই।

অন্যান্যবার তো এখানকার ঈদের দুই দিন পরে অর্থাত বাংলাদেশের ঈদের সময় কিছু অনুষ্ঠান দেখা হতো - এবার বোধহয় তাও হবে না। কারণ ঈদের দুদিন পরই জরুরী কাজে ত্রিপলীতে যেতে হতে পারে। কাজেই এবারের ঈদ অন্যান্য ঈদের চেয়ে আমার এবারের ঈদ সম্ভবত আরো বোরিং হবে।

আমার ঈদ যেরকমই হোক, আশা করছি আপনাদের ঈদ ভালোই কাটবে।]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737030 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737030 2007-10-11 22:03:27
আগামীকাল ঈদ - সবাইকে ঈদ মোবারক লিবিয়াতে আগামীকাল ঈদ।

গতকাল সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা না যাওয়ায় ত্রিশ রোযা পূর্ণ করেই আগামীকাল ঈদুল ফিতর পালন করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিবছরই লিবিয়া সৌদি আরবের একদিন আগেই রোযা, ঈদ প্রভৃতি শুরু করে থাকে। এবারও তাই করেছে। ফলে বাংলাদেশের দুদিন আগেই এখানে ঈদ শুরু হয়ে যাচ্ছে। (যদি বাংলাদেশেও ত্রিশটি রোযা পূর্ণ হয়)।

ঈদ উপলক্ষে সকল ব্লগারকে জানাচ্ছি ঈদ মোবারক। ]]>
http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737020 http://www.somewhereinblog.net/blog/toha_mhblog/28737020 2007-10-11 21:11:48