আমাদের মফস্বল এলাকায় ‘বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া’কে বলে ‘বিয়ে খেতে যাওয়া’। “আজকে অমুকের বিয়ে খেয়ে আসলাম” এধরণের বাক্য থেকেই বোঝা যায় বিয়েতে আগত অতিথিদের জন্য খাওয়াটাই মুখ্য। আমি নিজেই কয়েকটা বিয়ে ‘খেয়েছি’ বর-বউ এর মুখ না দেখেই! সিম্পল ব্যপার, প্রথমে গিফ্ট বুথে গিফ্ট জমা দাও। তার পর কপ্ করে বিয়ে খেয়ে ফেল!! বাস।
‘কপ্’ করে খাওয়া, শুনে ব্যপারটা খুব ‘আসানি-সে’ হয়ে যায় ভাবার কোন কারন নেই। বিয়ে বাড়ির সামিয়ানা টানানো ভোজন বিভাগে উপস্থিত হবার পর আপনি দেখবেন সব সিট দখল! তখন খুঁজতে হবে কোন চেয়ারটা শিঘ্রই খালি হতে যাচ্ছে। তারপর সেই চেয়ার এর পিছনে গিয়ে চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে! কোন ভোজনরতা সুন্দরী রমনী থাকলে তার চেয়ারটা হয় মেইন টার্গেট। সবাই তার চেয়ার ধরে দাঁড়াতে চায় আর ইতি উতি তাকিয়ে চলতে থাকে তার রূপ সুধা পানের চেষ্টা!! এক কাজে দুই কাজ। সেসব চেয়ার ধরতে পারাটাও ভাগ্য! আমার সে সৌভাগ্য হয়না। বড়জোর কোন টাকমাথা মুশকো পালোয়ান এর চেয়ার ধরে দাড়াতে পারি। কারণ এই ধরনের লোক কখন খাওয়া শেষ করে উঠবে তার ঠিক ঠিকানা নাই! নরমালি এদের চেয়ার ধরে দাঁড়াতে কারো ভরসা হয়না। ছাগলের তিন নং ছানা হিসেবে সে দায়িত্ব পড়ে আমার ঘাড়ে।
এইটা অবশ্য মূল ঘটনা না। মূল ঘটনা একটু লজ্জাস্কর। তাই এই বিয়ে সাদির কথা তুলে ভান ভনিতা করলাম কিছুক্ষন। যাই হোক মূল ঘটনা শুরু করি।
গেছি বান্দরবান। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে অনেকটা হুঠ করেই। আমারও পাহাড় দেখার শখ কম না। একুশে ফেব্রুয়ারির পরের দুই দিন ২২, ২৩ তারিখ শুক্র, শনি বার। টানা তিন দিনের ছুটির সুযোগে সেই ভ্রমন মৌসুমের শেষ দিকেও দুনিয়ার সব টুরিস্ট এসে হাজির হয়েছে বান্দরবানে। ২১ তারিখেই! আমরা ২২ তারিখ বিকালে গিয়ে বেকুব হয়ে গেছি। থাকবো কোথায়? সব হোটেল বুক।
এর মধ্যে পড়েছি এক টাল্টুবাজ রিক্শাওয়ালার খপ্পরে। বেটা আমাদের সাথে আলগা আলাপ জুড়ে দিয়েছে। পাহাড়িদের বানানো দেশি মদ, সেসবের খ্যাতি নাকি ভুবন জোড়া! তার ঐসব কথায় পাত্তা দিচ্ছেনা কেউ। এর পর গল্প শুরু করেছে, বান্দরবানে কি কি দেখার আছে সেখানে সেসবের। শৈল প্রপাত, চিম্বুক, স্বর্ণ মন্দির, টাইগার হিল এইসব বলে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষনে সমর্থ হয়েছে কোন রকমে। তার পরই স্টার্ট করেছে পাহাড়ি মেয়েদের গল্প। তারা নাকি অতি রূপবতী!! আমার সাথে রিকশায় আছে মিলন। আমার চেয়ে বড় মদন বলেই হয়ত আমার সাথে রিকশায় উঠেছে। সে বলে, পাহাড়ে যখন এসেছি পাহাড়ি মেয়েতো দেখবোই, ছবিও তুলবো! ক্যামেরাতো আছেই সাথে। তার পরই রিকশা ওয়ালা বলে, “নিয়ে আসবো নাকি স্যার?” আমি আঁতকে উঠি! মিলন ও কিছুটা ভ্যবাচ্যাকা খেয়ে যায়। “নিয়ে আসবো মানে!! ঐ বেটা দালালি বন্ধ কর, রিক্শা চালা!” এমনিতে হোটেল পাচ্ছিনা হয়তো সন্ধার বাসেই ফিরে যেতে হবে। এত জার্নি ধক্কল সব যাবে জলে! তার মধ্যে এইসব।
শহরে আমাদের মত ভাসমান টুরিস্ট আরো আছে। তারাও রুম খোঁজ করছে। ক্যান যে আগে বুকিং দিয়ে আসলাম না। সব দোষ এই মুঞ্জুরের। বলে কিনা এত অ্যারেঞ্জ করে গেলে আর মজা থাকলো কোথায়? অ্যারেঞ্জ করে তো যাবি হানিমুনে!! খবর পেলাম মুঞ্জুররা নাকি একটা রুম খুজে পেয়েছে! পাঁচ জন হয়তো কোন রকমে থাকা যাবে। গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি হোটেলের করুন অবস্থা। রুমের সামনে মুঞ্জুর আর মাসুদ দাঁড়িয়ে আছে। দেখে বিয়ে বাড়িতে চেয়ার ধরে দাঁড়ানোর কথা মনে হচ্ছে। সাথে হোটেলের কেয়ারটেকার গোছের কেউ। লুঙ্গিটা ডান হাতে কেমন উচু করে ধরে আছে গ্রাম্য মোড়লের মত। মুখ ভরা পান। কড়া জর্দার গন্ধ আসছে। আমি বলি, “কি ব্যপার দাঁড়িয়ে আছিস ক্যান? ঢুকে পড়।”
কেয়ার টেকার ব্যটা বলে “একটু দেরি হবে ভাইজান”।
“কেন?”
“রুম এখনো ফাকা হয়নাই। পনের বিশ মিনিট পর ফাঁকা হবে।”
“পনের বিশ মিনিট পর ফাকা হবে মানে? রুম যদি না ছাড়ে? এই শেষ বিকালে কি কেউ রুম ছাড়ে নাকি?”
“এক ভাইয়া আর আপু ভাড়া নিছে দুই ঘন্টার জন্য। সময় প্রায় শেষ।”
“দুই ঘন্টার জন্য মানে?!!”, আমি ঝাড়ি দিয়ে বলি।
ইঙ্গিত পুর্ণ হাসি দিয়ে সে বলে, “পিকনিকে আসছিল। ‘সবাই গেছে বনে’ আর তারা এইখানে এসে উঠছে। এইরকম প্রতিদিনই হয়। একেকটা রুম আমরা দিনে পাঁচ ছয়বার ভাড়া দেই।”
মুঞ্জুর কে বলি, “শুনছস কথা? আমি এই শালার রুমে থাকবো না!!”
মাসুদ ও না না রব তুলে।
লোকটা বলে, “না নিলে এখন রুম পাবেন কোথায়? আর আপনাদের দিলে তো আমার লস। ভাড়া পাব মাত্র এক বার। মানবিক কারনে দিলাম।”
মুঞ্জুর কে বলি, “আর তুই শালা এই দরজা ধইরা দাঁড়ায় আছিস?!! এর মধ্যে কি হচ্ছে বুঝিস?”
মুঞ্জুর বলে, “আরে এত খেপার কি আছে। দুনিয়ার এমন কোন রুম দেখাতে পারবি যেখানে কেউ এইসব করেনাই? আর এখন রুম পাবোইবা কোথায়?”
“ঐ সব দুনিয়াদারির কথা বাদ দে। এই রুমে আমি ঢুকবোনা এই হইলো ফাইনাল। তোরা থাকলে থাক ওগো ফালায় যাওয়া ... এর মধ্যে শুয়ে। আমি এখনই ফিরতি টিকিট কাটবো”
লুঙ্গি পরা আবালটা বলে, “বিছানা বেডিং সব চেঞ্জ করে দিব স্যার।”
“আপনি চুপ করেন!” ধমক দেই আমি। মেজাজ চরম খারাপ।
এর মধ্যে রিদোয়ান এসে হাজির হলো। সেও থাকার একটা ব্যবস্থা খুঁজে পেয়েছে। কোন হোটেল না। থাকতে হবে বৈদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে। একেবারে নাকি ফক ফকা পবিত্র ব্যবস্থা!! আমি ফিরতি টিকেট কাটার প্রোগ্রামটা পোসপন করি। দেখেই আসা যাক কি অবস্থা!
এই হল ঘটনার শুরু। তবে এইটাও মূল ঘটনা না। মুল ঘটনা বড়ই লজ্জার। সেই গল্প পরের পর্বে...
এখন বিদায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

