ঝক্কি ও ধক্কল ২ (আব্জাব)
১৯ শে এপ্রিল, ২০০৮ সকাল ৯:০৪
[প্রথম পর্বের পর]
যখন খুব ছোট ছিলাম আমাদের এলাকা দিয়ে মাঝে মাঝে দলে দলে অদ্ভুত কিছু প্রানী হেটে যেত! সেইসব দলের পিছনে থাকতো একজন রাখাল গোছের কেউ। আমাদের এলাকায় রাখালকে বলতো ‘কামলা’। কিন্তু এই অদ্ভুত রাখালদের সবাই বলত ‘কাঊরা’! কাঊরা’রা মাথায় ছন দিয়ে বানানো এক ধরণের অদ্ভুত ছাতা দিয়ে চরিয়ে বেড়াত সেই কালো কুৎসিত প্রানীদের। বাবা বলতো সেগুল শুকর। দেখলেই কেমন ঘেন্না হয়! এরা নাকি বিষ্ঠা খায়!!
পরে ওয়াল্ট ডিজনির কল্যানে কিছু পিঙ্ক ‘কিউট’ দেখতে শুকর ছানার কার্টুন দখেছি। অবাক হয়ে ভাবতাম বিদেশের শুকরও কেমন গোরা!! সেই গোরা শুকর দেখলাম বান্দরবানএ এসে। মোড়ে মোড়ে গোলাপী শুকর। দেখতে তেমন খারাপ লাগেনা। তবে যতই গোলাপী হোক শুকরই তো, তাই সেই ঘেন্না ভাবটাও আর কাটেনা আমাদের! মাসুদ বলে, “দেখেছিশ সবাই কেমন শুওর পালে! কোন ছাগল কিন্তু পালতে দেখলাম না।” আমরাও ভাবি আসলেই তো! ঘটনা কি!
এদিকে উঠেছি সেই বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে। “কখন যে বৌদ্ধং সরনাং গৎস্বামী...” স্টার্ট করে ঠিক নাই! ব্যবস্থা তেমন খারাপ না। সেই দুই ঘণ্টার হোটেলের চেয়ে অনেক ভালো আর ‘পবিত্র’! মুঞ্জুর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। “দেখলি আসল অ্যাডভেঞ্জার হয়ে গেল একটা”।
‘আসল আডভেঞ্জারের’ তখনো অনেক বাকি!
রাতে গাড়ি ঠিক করতে গিয়ে পড়লাম আরেক টাল্টুবাজের খপ্পরে। শহরের সব গাড়িও বুক হয়ে গেছে!! গাড়ি ঠিক করতে গেছি মিলনছড়ির দিকে। ড্রাইভার কবীর সেই রাতের অন্ধকারে বেশ সফেদ একখানা ল্যান্ডরোভার দেখালো আমাদের। আমরাতো মহা খুশি। একেবারে আফ্রিকান সাফারীতে দেখা সামনে পেছনে টায়ার লাগানো ল্যান্ডরোভার!! আকাশে পূর্ণিমা চাঁদ। কবীর আমাদের আবারো সেই সব নীলগিরি, চিম্বুক আর শৈল প্রপাতের গল্প শোনায়! কি সুন্দর মিষ্টি পানি নাকি তাতে!!
এই ফাকে সবার জন্য ভ্রমন টিপ্স দিয়ে রাখি। ভ্রমনের আগে অবশ্যই পঞ্জীকা দেখে নিবেন যাত্রা শুভ কিনা। নাইলে আমাদের মত বিপদের না পড়লেও অন্তত জেনে নিতে পারবেন পূর্ণিমা কবে। পাহাড়ে-বনে-নদী-সমুদ্রে যেকোন যায়গায় অবশ্যই যেতে হবে পুর্নিমায়। এই পুরো জার্নিতে একটাই প্রাপ্তি। মিলনছড়ির কূয়াশার পর্দায় ঢাকা পাহাড়, নিচে অনেক দূরে সাঙ্গু নদী আর সেই ভারী কুয়াশা ভেদী পুর্ণিমা!
ন্যাটজিওর এক প্রামান্য অনুষ্ঠানে দেখেছিলাম। পুরুষ পান্ডারা নাকি যে অঞ্চল তাদের পছন্দ হয় সেই অঞ্চলের এখানে সেখানে হিসু করে রাখে!! এতে দুইটা লাভ। অন্য পান্ডারা বুঝতে পারেঃ ‘লাভ নাই এই যায়গা আগেই দখল’!! আর ঊপরী পাওনা হিসেবে কামাতুর পান্ডা রমণীরাও সেই ট্রেইল ধরে হাজির হয় পান্ডা মহারাজের অর্ঘ্য হতে!!
মিলনছড়ির যায়গাটা আমার এতই পছন্দ হয় সেই জ্যোৎস্না রাতে আমিও পান্ডা হই! আর মিলনছড়ির পাহাড় থেকে অনেক নিচের সাঙ্গু নদীতে সেই পান্ডামো জাহীর করার চেষ্টা করি! একারনেই মনে হয় প্রকৃতির সাকে সাড়া দেওয়া সংক্রান্ত বাগধারাটার সৃষ্টি।
কিন্তু এইসব সুখ বেশীক্ষন টিকেনা। সকালে দেখি গাড়ি হাজির। গাড়িতো না গাড়ির লাশ! এটাও সাদা ল্যন্ড রোভার কিন্তু দরজা জানালা কিছু নাই তেমন! গাড়ির ড্রাইভার ও যেন একটা জীবন্ত লাশ! চোখ ছাগলের চোখের মত হলদে সবুজ! কঠিন জন্ডিস! এই লোক এই গাড়ী নিয়ে কখন যে খাদে ফেলবে তার কোন ঠিক ঠিকানা নাই। সকালের খাওয়াটাও ঠিক মত হয়নি। রেস্তোরায় একটু খাসির মাংস খেতে গিয়ে মাসুদ সন্দেহ করেছে এই গুলো নাকি শুকর! ছাগলই দেখলাম না কোথাও! মাংস আসবে কোত্থেকে?!! সবাই আগেই খাওয়া বন্ধ করেছে। আমি জোর জবরদস্থি করে কয়েক মুঠ মুখে পুরে দিয়ে বুঝলাম স্বাদটাও এখন কেমন যেন লাগছে!
আধপেটা খেয়ে উঠেছি ভাঙ্গা গাড়ীতে। এই গাড়ি আমাদের নিয়ে পাহাড়ে উঠতে পারবে বিশ্বাস হয়না!
তার উপর যেই ড্রাইভার! আমি বসেছি সামনে। ড্রাইভার সাথে এক হেল্পার নিয়ে এসেছে। এরা নাকি চাঁন্দের গাড়ি চালায়! আমি বসার পর সেই হাতলবিহীন দরজা আটকাতে পারছিনা। হেল্পার একটা দড়ি দিয়ে দিল দরজা বেধে। বন্ধুদের মধ্যে কঠোর নিশেধাক্কা জারী করা হয়েছে! ভুলেও কেউ যেন গাড়ির ভিতরের ছবি না তুলে! মান ইজ্জত কিছু থাকবেনা। এর পর ইঞ্জিনের মধে কি যেন কসরত করে স্টার্ট করে দিল। যাকে বলে ম্যানুয়াল ইগনিশন!! হিটলার মনে হয় এই গাড়ি চালাতো ড্রাইভার কে কিছু বললে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে হাসে। আর জোরে জোরে কড়া জর্দা দেওয়া পান চিবায়। মাঝে হুঠ হাঠ গাড়ী ঝাকি খায়! মানুষ চাপা দিল কিনা কে যানে! ড্রাইভার একটা বিগলিত হাসি দিয়ে বলে, “দিলাম একটা শুওরের বাচ্চা মাইরা!!” কিছুক্ষন পর গাড়ি বিট্রে করে। একবার থামলে আর স্টার্ট হতে চায়না।
এর মধ্যে আর কিছু কিছু স্পট আমাদের কারো কারো পছন্দ হয়। সাথে সাথে ড্রাইভারকে বলে গাড়ি থামাই। আর একেক বার একেক জন পান্ডা হয়ে আসে। মাঝে মাঝে মঞ্জুর সেসব দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে আমাদের পান্ডামো পন্ড করার অপচেষ্টা চালায়! তবে মেইন সমস্যা হয় গাড়ি নিয়ে। প্রতিবার গাড়ি একটা ঢালের কাছে রেখে আসতে হয়। যাতে স্টার্ট নেবার সময় ঠেলা ঠেলি করা না লাগে। জাস্ট ব্রেক টা ছেড়ে দিলেই হবে।
তো এভাবেই রৌদ্র তপ্ত আর পানি শুন্য হয়ে আমরা পঞ্চপান্ডব পৌছাই শৈল প্রপাতের কাছে। সকালে কেউ খাইনি তেমন। লিকুইড যা ছিল তাও সব পান্ডামীতে পন্ড। মুড়ীরটিনে ঝাকিয়ে ঝালমুড়ি বানিয়ে ফেলেছে। নাজেহাল অবস্থা। মুড়ির টিন শৈল প্রপাতের একটু দূরে ঢালে থামায় ড্রাইভার। সেখান থেকে শৈল প্রপাত দেখা যায়না। আমরা সবাই আমাদের সুইম সুইট সাথে করে নিয়ে এসেছি। ড্রাইভার বলে “আপনারা গোছল করে আসেন। আমি এইখানে থাকি!!” আমরা সবাই সুইম সুইট পরে মনের মধ্যে শীতল পানিতে ঝাপ দিতে দিতে হাজির হই শৈলো প্রপাতে!!
শৈল প্রপাতে অনেক টুরিস্ট বসে আছে। তাদের অনেকেই আবার সুন্দরী রমনী!! আমি বলি, “ওই আমারে ঠেকা! আমি এখনি ঝাপ দিলাম” প্রপাত তখনো বেশ নিচে। তার পর হুড় মুড় করে যেই প্রপাতের সামনে পৌছাই। অমনি দেখি চারদিকে ছুটোছুটী লেগে গেছে। সেই শান্ত পরিবেশে বেরসিকের মত আমরা নাঙ্গাবাবা পঞ্চপান্ডব হাজির!! চারি দিকে হুলুস্থুল পড়ে যায়। আমরাও কেমন যেন বেকুব হয়ে যাই। কোথায় প্রপাত কোথায় কি!! এ যে একটা ড্রেনের মত সরু নালা!! সেই নালায় আবার পাহাড়ী এক রমনী কাপড় ধুচ্ছে। আমাদের আগমনে সেও কেমন যেন আঁতকে উঠে সরে যায়। মান ইজ্জত কিছুটা সেই ড্রেনে ফেলে রেখে তড়িঘড়ি ফিরে যাই গাড়িতে! এসব হয়ত পান্ডামীর খেসারত!
বিদায়।
পুনশ্চঃ- সেই ড্রেনের একটা ছবি দিলাম। পাশের ইটটা খেয়াল করুন!! এই নাকি প্রপাত!!
প্রকাশ করা হয়েছে: আব্জাব বিভাগে ।
রাশেদ বলেছেন:
হা হা! মজা পাইছি। তোমার লেখার স্টাইল অসাধারন।
লেখক বলেছেন: উৎসাহ দিয়েন না রাশেদ ভাই! এত উৎসাহ দিলে শেষে আমার আব্জাবের তোড়ে সামহ্যারইন ভরে যাবে!! ![]()
রন্টি চৌধুরী বলেছেন:
পছন্দের লিষ্টে গেল।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ!
রাশেদ বলেছেন:
ভইরা যাক, খুব খুশি হমু।
লেখক বলেছেন: হা হা হা!
দাঁড়ান হাতে মাঞ্জা দিতেছি! ![]()
বুইঝেন কিন্তু!
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ! ![]()
মুহিব বলেছেন:
আরো ভ্রমন লেখা চাই। ঐসব (পান্ডাকাহিনী) ছবি কই।
লেখক বলেছেন: "পান্ডাকাহিনী" ছবি তো আছেই!
কিন্তু দেখানো যাবেনা!
সিহাব চৌধুরী বলেছেন:
অতি সুস্বাদু লেখা ।
শুকরের বর্ণবৈশম্য চলবে না
আমিও পান্ডা হই প্রায়ই, তবে আমার বাসার ছাদে
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ!
কখন কার মাথা পন্ড করবেন
পান্ডী না জুটোলেও কোন ষণ্ডা এসে ডান্ডা জুটিয়ে যাবে! ![]()
বামপাশের সিঁড়িটা দিয়ে নামলে পাহাড়ী মেয়েদের দেখা মিলে , আর ডানপাশের টা ড্রেন অবধি চলে গেছে ।
চান্দের গাড়িতে বহুত আরামে ছিলা রে ভাই.............আমার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসার উপাখ্যান তো সেই চাঁদের গাড়িতেই নাজিল হয়েছিল
আকাশচুরি বলেছেন:
ভালৈছে+
লেখক বলেছেন: হা হা! ধন্যবাদ!
আমার যাত্রা ভাগ্য শুভ না! ![]()
মোঃ শিহাবুর রহমান বলেছেন:
আপনার লেখার হাত অসাধারণ । পড়তে খুব ভালো লাগল । আপনাকে লিংকসেযোগ করে রাখলাম ।
মোঃ শিহাবুর রহমান বলেছেন:
আপনার লেখার হাত অসাধারণ । পড়তে খুব ভালো লাগল । আপনাকে লিংকসেযোগ করে রাখলাম ।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ! ![]()
ভাঙ্গা পেন্সিল বলেছেন:
আবজাবের বন্যায় ভাসায় দেন ভাই!!


















