লেখক: সিরাজুর রহমান
গত মাসে লন্ডন পাতাল রেল নেটওয়ার্কে দু’বারে দু’দিন হরতাল হয়ে গেল। দিনে এক কোটির বেশি লোক পাতাল রেল ব্যবহার করে বেশির ভাগই কাজে যাওয়ার এবং বাড়ি ফেরার জন্য। এই লোকগুলোর ভোগান্তির কথা ভেবে দেখুন। একেক দিন পাতাল রেল হরতালে দেশের অর্থনীতির কত মিলিয়ন পাউন্ড ক্ষতি হয় সে হিসাব বহুবার দেখেছি, এখন আর মাথা ঘামাই না।
আমার ছেলে আর বউমা দায়িত্বপূর্ণ চাকরি করে তাদের বাড়ি থেকে বহু দূরে। অফিসে না গেলেই নয়। একাধিক বাসে আর কিছুটা পথ হেঁটে তারা অফিস করেছিল। এর মধ্যে এক দিন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি হচ্ছিল, সে সাথে ঝড়ো বাতাস। আমার স্ত্রী আর আমি বাড়িতে বসে ওদের জন্য চিন্তা করছিলাম। রাতের বেলা টেলিফোন করে খবর নিলে ছেলে একটু বিরক্ত হয়েছিল। তার ছেলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ছাত্র, সে যে এখন আর ছোট নয় সেটা কেন আমরা মনে রাখতে পারি না? এক কোটির বেশি যাত্রীর সবারই কমবেশি ভোগান্তি হয়েছিল।
তবু দেখেছি বহু লোকের সহানুভূতি ছিল ধর্মঘটী পাতাল রেল কর্মীদের প্রতি। এবারে তারা বেশি মাইনে-মজুরির দাবিতে হরতাল করছিলেন না। ব্যয় সঙ্কোচের জন্য পাতাল রেল কর্তৃপক্ষ রাতের বেলা বহু স্টেশনে টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে, তখন আর স্টেশনে কোনো কর্মচারী থাকবে না। এখন আনুমানিক ৯০ শতাংশ যাত্রী মাসিক কিংবা বার্ষিক টিকিট কেনেন, অথবা ‘অয়েস্টার কার্ড’ ব্যবহার করেন। অয়েস্টার কার্ড ট্রেনে ঢোকার পথে একটা যন্ত্রের ওপর লাগালেই সঠিক ভাড়ার অর্থ তার থেকে কেটে নেয় কম্পিউটার। তা ছাড়া সব স্টেশনে এখন অটোমেটিক টিকিট মেশিন আছে। সুতরাং টিকিট কাউন্টার রাতেও খোলা রাখা জরুরি নয়। অন্য দিকে রাতে-বিরেতে যাদের সফর করতে হয় বিশেষ করে জনবিরল এলাকায় স্টেশনে একটা জলজ্যান্ত মানুষের চেহারা দেখতে পেলে তারা বেশি নিরাপদ বোধ করেন।
ব্রিটেনের নতুন টোরি সরকার জাতীয় ঋণের বিরাট বোঝা লাঘব করার উদ্দেশ্যে বিরাট ব্যয় সঙ্কোচ করছে। বেশির ভাগ মন্ত্রী বা দফতরকে মোটামুটি ২৫ শতাংশ ব্যয় সঙ্কোচ করতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবেতন এখন বার্ষিক তিন হাজার পাউন্ড। সেটা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাবদ কিছু অর্থ তারা সরকারের কাছ থেকে ঋণ পায়। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পেলে মাসিক কিস্তিতে সে ঋণের অর্থ তাদের পরিশোধ করতে হয়। নতুন সরকার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ২০১২ সাল থেকে ছাত্রবেতন বার্ষিক ৯ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারবে। এ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে যে, তারপর ডিগ্রিধারীদের ঋণের অঙ্ক দাঁড়াবে ৫০-৬০ হাজার পাউন্ড। এ আশঙ্কা বাস্তব যে, বার্ষিক বহু হাজার ছাত্র বর্ধিত ফির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে না।
ছাত্রসমাজ এই বেতন বৃদ্ধি মেনে নিতে রাজি নয়। নভেম্বরের ১০ আর ২৪ তারিখে তারা প্রতিবাদ ধর্মঘট করেছে। আরো হরতাল হবে বলে ছাত্র ইউনিয়নগুলো বলে দিয়েছে। ১০ তারিখের ধর্মঘটে উল্লেখযোগ্য অশান্তি ঘটেছিল। যে বহুতল ভবনে শাসক টোরি দলের সদর দফতর ছাত্ররা সে বাড়িতে ঢুকে পড়ে এবং বেশি কিছু ক্ষতি করে। জন ত্রিশেক ছাত্র সে জন্য গ্রেফতার হয়েছে। এসব সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বহু প্রভাষক ও অধ্যাপক সে হরতাল সমর্থন করেছিলেন। ২৪ নভেম্বরের হরতালে স্কুলের ঊর্ধ্বতন শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরাও যোগ দিয়েছিল এবং সে দিনও কিছু অশান্তি ঘটেছে। তারা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে ছাত্রবেতন তখন বর্ধিত হারে দিতে হবে। শিক্ষকদের অনেকেই ছাত্রদের হরতালে আগাম সমর্থন দিয়েছিলেন। বহু শিক্ষক ও প্রভাষক হরতালে অংশও নিয়েছিলেন ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে।
হরতালের ইতিহাস
গণতান্ত্রিক সমাজে হরতাল নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় অধিকার। সাংবিধানিক প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করা হলে হরতাল ছাড়া উপায় কী? কর্তৃপক্ষ কিংবা অন্য কোনো মহল বিরোধিতা করলেও হরতাল অন্যায় হয়ে যায় না। ওপরের দু’টি দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যাচ্ছে হরতালের পেছনে বহু ক্ষেত্রেই যৌক্তিকতা থাকতে পারে। অনেক হরতাল আবার অযৌক্তিকও হয়। কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ আপনাকে স্খির করতে হবে হরতালের কারণ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পরিণামের কথা বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এখনো বহু মানুষের স্মৃতিতে জাগরূক আছে এমন কয়েকটা হরতালের উল্লেখ করছি। ১৯৮২ সালের মে মাস থেকে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্র চালু ছিল। বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন কোনো দেশে এক দিন যদি গণতন্ত্রের ধারা বন্ধ এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসন বজায় থাকে তাহলে গণতন্ত্রের অগ্রগতি ১০ দিন পিছিয়ে যায়। এবং মনে রাখতে হবে যে, গণতন্ত্রের দাবিতেই যুদ্ধ করে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম।
গোড়ার দিনটি থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অবসানের জন্য আপসবিহীন আন্দোলন করেছে; সে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। মনে রাখতে হবে যে, তার আগে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না, নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদস সাত্তারকে গদিচ্যুত করেই এরশাদ ক্ষমতা গ্রাস করেছিলেন। অন্য দিকে আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত নেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থনে (অনেকের মতে যোগসাজশে) এরশাদ অভ্যুথান ঘটিয়েছিলেন, ১৯৮৬ সালের লোক দেখানো সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে হাসিনা স্বৈরতন্ত্র এত দীঘস্খায়ী হতে পারত না। সে জন্যই ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপুল গরিষ্ঠতা দিয়ে জাতি বেগম খালেদা জিয়াকে পুরস্কৃত করেছিল।
গণতন্ত্রের সে দীর্ঘ আন্দোলনের সময় বিবিসি’র কাজে অনেকবার আমি বাংলাদেশে গেছি। আন্দোলনের এবং হরতালেরও বিস্তারিত খবরাদি আমরা প্রচার করেছি। এরশাদ অভিযোগ করতেন দেশের মানুষ হরতাল করছে না, হরতাল করাচ্ছে বিবিসি। অবশ্য স্বৈরতন্ত্রীরা সব সময়ই একে তাকে দোষ দেয়। ১৯৭১ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানও মুক্তিযুদ্ধের জন্য বিবিসি’র এবং আমার ওপর অনেক দোষ চাপিয়েছেন। এরশাদও বিবিসি শোনা এবং বিবিসিকে খবর পাঠানো আইনত দণ্ডনীয় করেছিলেন যেমন করেছিলেন ১৯৭১ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খান। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের আন্দোলনে হরতাল আমরা সমর্থনযোগ্য বিবেচনা করেছিলাম।
আওয়ামী লীগের হরতাল
আওয়ামী লীগ খালেদা জিয়ার প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় সরকারের আমলে বহুবার হরতাল করেছে। ১৯৯১-৯৬ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ হরতাল করেছিল ১৭৩ দিন। বিএনপি’র ১৯৯৬-২০০১ সরকারের আমলেও তারা সোয়া শ’ দিন হরতাল করেছিল। তারা হরতাল করেছিল ক্ষমতা পায়নি বলে। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকুন সেটা কখনো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের গ্রহণীয় কিংবা সহনীয় ছিল না। দিনের পর দিন তারা হরতাল করেছে। বস্তুত লাগাতার হরতাল কথাটা তারাই চালু করেছিল। সংসদ বর্জন, লাগাতার হরতাল, সড়কের রাজনীতি, ভাঙচুর, বাসে আগুন লাগিয়ে ৯ জন যাত্রী হত্যা এসব ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান প্রধান দিক। শুধু তা-ই নয়, ক্ষমতা পাওয়ার জন্য ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জেনারেল নাসিমকে দিয়ে সামরিক অভ্যুথানও করিয়েছিল তারা, যদিও দেশের ও জাতির ভাগ্যক্রমে সে অভ্যুথান ব্যর্থ হয়েছিল।
খালেদা জিয়া সরকার ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তাদের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কিন্তু সে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা আওয়ামী লীগের পছন্দের লোক ছিলেন না শুধু সে কারণেই আওয়ামী লীগ অপর একজন জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সাথে সমঝোতা করে লাগাতার হরতাল ডেকেছিল, লগি-লাঠি ও বৈঠাধারী বহু হাজার ভাড়াটে লোককে (শোনা যায় বড় একটি এনজিও’র উদ্যোগে ও অর্থে) বাসে করে দেশের সব এলাকা থেকে রাজধানীতে নিয়ে আসে। তারা উদ্যোক্তাদের হতাশ করেনি। প্রথম দিনেই পুরানা পল্টনে লাঠি-পেটা করে চারজনকে হত্যা করা হয়। সে হরতালে মোট ১৩ জন খুন হয়েছিল। সড়ক ও বন্দর অচল করে দিয়ে, রেললাইন উপড়ে ফেলে দেশের অর্থনীতি দিনের পর দিন সম্পূর্ণ অচল করে রাখা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতিকে বঙ্গভবনে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ রাখা হয়েছিল। (এফবিসিসিআই তখন প্রতিবাদ করেছিল বলে মনে করতে পারছি না)। এবং এ সন্দেহ এখন সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে গেছে যে, আওয়ামী লীগের নেতারা ক্ষমতালাভ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের যোগসাজশে এক-এগারো ঘটিয়েছিল।
সে সরকার আসলে একটা সেনাসমর্থিত অবৈধ সরকার ছিল। গণতন্ত্রে আবারো প্রায় দু’বছরের ছেদ পড়ে। বাংলাদেশে এখন যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে তার জন্যও এরশাদ এবং মইন-ফখরুদ্দীনের স্বৈরাচারী শাসন অনেকখানি দায়ী। এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মতো এক-এগারোর সরকারের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং সক্রিয় ছিলেন বলেই খালেদা জিয়া এবং বিএনপি মইন-ফখরুদ্দীন চক্রের রোষানলে পড়েছিলেন। খালেদা জিয়াকে নির্বাসনে পাঠানোর সব চেষ্টা করেছে অবৈধ সরকার, দুর্নীতির মামলা সাজিয়ে তার দুই পুত্রকে গ্রেফতার ও তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘বিরাট জয়’ মইন-ফখরুদ্দীন সরকার এবং একটি বিদেশী শক্তিকে নিয়ে চক্রান্তেরই ফসল।
নাৎসিবাদী পন্থা
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের এ যাবৎ কর্মকাণ্ড তাদের অতীতের সভ দুষ্কর্ম ও কুশাসনকে ছাড়িয়ে গেছে। ক্ষমতা পেয়েই তারা আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও র্যাবসহ শাসনযন্ত্রের সব অঙ্গের দলীয়করণ সম্পূর্ণ করে। ওদিকে তারা ছাত্রলীগ যুবলীগসহ দলের সব অঙ্গসংগঠনকে লেলিয়ে দেয় বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের দমন করার কাজে। হত্যা, ধর্ষণ, ভূমিগ্রাস, ছিনতাই, চাঁদা ও টেন্ডারবাজি, নারী নির্যাতন এসব বাংলাদেশে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনী পরিচালিত হয় দুর্বৃত্তদের নির্দেশে। সুতরাং দেশে আইনশৃঙ্খলা বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই।
দ্রব্যমূল্য হন্সাস করার, দশ টাকা কেজি দরে চাল সরবরাহের এবং রাতারাতি বিদ্যুৎ সঙ্কটের সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু চাল-ডাল-তেল-নুন ও অন্য সব ভোগ্যপণ্যের মূল্য এখন জেট বিমানের গতিতে ধেয়ে চলেছে, আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে। মন্ত্রীরাও এখন ব্যবসায়ী সমাজের একাংশকে দায়ী করছেন কিন্তু কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্খা নেয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহের দুর্গতি দিনে দিনে চরমে উঠছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এখানেও পদদলিত হয়েছে। সরবরাহ উন্নয়নের নামে বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরির কন্ট্রাক্ট দিয়ে শাসক দলের আরো কিছু লোককে অবাধ দুর্নীতির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে মাত্র। বিদ্যুৎই শুধু নয়, দেশের মানুষকে খাবার পানিও দিতে পারছে না সরকার।
সরকারের শাসনযন্ত্র সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে সব রাজনৈতিক বিরোধিতা নির্মূল করার লক্ষ্যে। প্রথমে ৩৫ বছর পর নতুন করে মুজিব হত্যার বিচার হলো। তারপর সরকার একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া হাতে নেয়। কিন্তু এখন অভিযুক্তদের পরিবার পরিজন, আগে বা পরে তারা যাদের সাথে পরিচিত ছিলেন, এমনকি তাদের কাউকে যারা কোনো ব্যাপারে সমর্থন করেছেন সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী তাদের সবাইকে পাইকারিভাবে যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় শামিল করছেন। ইতোমধ্যে নতুন করে জেলহত্যা ও কিবরিয়া হত্যা মামলার বিচার করারও তোড়জোড় চলছে। নিশ্চয়ই গায়ের জোরে বিরোধী দলগুলোর আরো নেতাকর্মীকে এসব মামলায় জড়ানোর চেষ্টা হবে। শুধুই কি তাই? আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিকভাবে অসুবিধাজনক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ করে চলেছেন। দলীয়কৃত পুলিশ কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই এসব ব্যক্তিকে জেলে পুরছে, আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ না নিয়েই তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ড মঞ্জুর করছেন এবং রিমান্ডে রেখে তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এখন আর কারোই বুঝতে বাকি নেই যে, বিচারের নামে সব বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের জেলে পুরে দেশজোড়া সন্ত্রাস চালানোর ফাঁকা ময়দান সৃষ্টি করে দেয়া হচ্ছে আওয়ামী লীগ কর্মীদের।
সরকারের মতলবও খুবই পরিষ্কার। তারা আর গদি ছাড়তে চায় না। পেশিশক্তির বলে রাজনৈতিক বিরোধিতা উপড়ে ফেলে তারা বাকশালী কায়দায় একদলীয় শাসন কায়েম করতে চায়। আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা ইদানীং বাকশাল পদ্ধতির গুণকীর্তন করছেন। আদালতের সহযোগিতায় সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করা হয়েছে। মন্ত্রীরা এখন বলছেন যে, তার ফলে দেশ আবার এক লাফে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে এসেছে। কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনীতে গৃহীত নির্যাতক জননিরাপত্তা আইন, তৃতীয় সংশোধনীতে ভারতকে তিন বিঘা ছিটমহল হস্তান্তর এবং চতুর্থ সংশোধনীতে ঘোষিত একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি বাতিল না করে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া কী করে সম্ভব সেটা কেউ খুলে বলছে না। বাকশাল পদ্ধতিকে অবৈধ ঘোষণা করতে সরকারের অনিচ্ছা তাদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সন্দেহ আরো ঘনীভূত করে।
স্বাধীনতা কার জন্য?
দল-মত-নির্বিশেষে সব মানুষের আরো বড় সন্দেহ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে সরকারের অভিসন্ধি সম্বন্ধে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানুয়ারি মাসে দিল্লিতে গিয়ে ভারতের সাথে কতগুলো চুক্তি করে এসেছেন। শুধু এ কথাই বলা হচ্ছে দেশের মানুষকে। কিন্তু সেসব চুক্তির বিষয়বস্তু দেশের মানুষকে জানতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি চুক্তিগুলোর বিবরণ সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদেও পেশ করা হয়নি। এ দিকে ভারতকে ডবল ডবল করিডোর দেয়া হচ্ছে। ভারী ভারতীয় যানবাহন চলাচলে বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও সেতুগুলোর মেরামতের ব্যয়ও বহন করতে হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের জন্য যে হারে সুদ দেয় তার সাত গুণ হারে সুদ দিয়ে ভারতের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। সে ঋণের অর্থে ভারতীয় প্রকৌশলীরা ভারতীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সড়ক তৈরি করবেন এবং ভারত সেসব সড়ক ও অবকাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করবে। কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশ কোনো শুল্ক কিংবা ফি পাবে কি না সেটাও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না মন্ত্রীরা। সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পারছে না এত রক্ত দিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছে নিজেদের জন্য না ভারতের জন্য।
স্বভাবতই সরকারের এসব ঢাক ঢাক গুড় গুড় কাণ্ডকারখানা দেশের মানুষের সন্দেহ ক্রমেই বাড়িয়ে তুলছে। বিএনপিসহ জাতীয়তাবাদী দলগুলো এসব ব্যাপারেই প্রশ্ন তুলছে, সরকারের সমালোচনা করছে। দেশবাসীর অভিযোগ আর প্রশ্ন সবচেয়ে জোরালো ভাষায় ধ্বনিত হচ্ছে খালেদা জিয়ার কণ্ঠে। সে জন্যই সরকারের সব আক্রোশ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। জিয়াপরিবারকে নিপাত করতে সরকার এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
অনেক ভাষ্যকার আর কলামিস্ট এখন একমত যে নাৎসিদের মতো ফ্যাসিস্ট পন্থায় একটা স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এগিয়ে চলেছে বর্তমান বাংলাদেশে। আরো তিন বছর সে চেষ্টা চলতে থাকলে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার কাজ তখন দুরূহ হয়ে পড়বে। বহুদলীয় গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে। অথচ ক্ষমতালোভী সরকার গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণ করে একটা মেয়াদ মধ্য নির্বাচনে জনমত যাচাই করতে নারাজ। খালেদা জিয়া এখন সরকার পতনের ডাক দিয়েছেন, হরতাল ডেকেছেন সে জন্য। বর্তমান সরকারকে তাদের দুরভিসন্ধিগুলো সফল করতে দেয়া হলে তার পরিণতি বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ হবে। শুধু সে কথা বিবেচনা করেই ৩০ নভেম্বরের হরতালকে সঙ্গত বলতেই হবে।
ব্যবসায়ীদের সংস্খা এফবিসিসিআই আইন করে হরতাল বন্ধ করার প্রস্তাব করেছে। সেটা খুবই দু:খজনক, কেননা হরতাল করার অধিকার গণতন্ত্রের একটা বড় খুঁটি। তা ছাড়া সরকারের অপ্রিয়তার জন্য ব্যবসায়ী সমাজেরও কিছু দায়িত্ব আছে। তারা যদি দ্রব্যমূল্যকে লাগামছাড়া না করতেন, মূল্যমান নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে সাহায্য করতেন, তাহলে দেশের মানুষের দুর্গতি এত চরমে উঠত না, সরকার হয়তো এত অপ্রিয় হতো না।
[email protected]
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ২৯/১১/১০]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১০ বিকাল ৩:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


