somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মধ্যাহ্ন

২২ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ দুপুর ২:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেদিন তাড়াহুরা করে সার্ভার রুম থেকে ফিরছিলাম। রুমে ফিরে দেখি ব্লু-টুথ কার্ডটা ব্যাগে নেই। যদিও নেটে কানেক্ট করে বেশীর ভাগ সময়ই নেট ব্যবহার না করে প্রয়োজনীয় কাজগুলো করে থাকি, কিন্তু নেট না থাকলে কেমন যেন অসহায় লাগে। অনেকটা মোবাইল ভুলে ফেলে আসলে যেমনটা লাগে...। এই অবস্থায় কোন কাজও করা হয় না.. অনেক সময় নেট ডাউন থাকলে বসে বসে গেম খেলি বা বই পড়ি.. অথবা লেখালেখি করি। তো সেদিন কি করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হলো আগের রাতে হুমায়ূন আহমেদের 'মধ্যাহৃ ' ডাউনলোড করেছিলাম। বসে গেলাম পড়তে....

'মধ্যাহ্ন' আমার দেখা হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম একটি বই সন্দেহ নেই। বেশ কিছুদিন পর সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ তাঁর অসাধারণ লেখনির পরিচয় দিলেন... দুই খন্ডের বই। ব্যাস্ততার কারণে পুরোটা এখনো শেষ করা হয়নি। ১৯০৫ সালের পটভূমিতে লেখা উপন্যাস। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর চমৎকার লেখনীতে বিভিন্ন উল্লেখ যোগ্য ঘটনা তুলে ধরছেন... কিশোর নজরুলের হোটেলে রুটি বানাতে বানাতে গান লেখা থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গে হিন্দুদের ভূমিকা পর্যন্ত অনেক ঘটনা তুলে ধরেছেন। ভাল লাগলো যে আমাদের এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে হিন্দুদের বিরোধীতার ঘটনাকে অনেক গোঁয়ার গবিন্দের মত চোখ কান বন্ধ করে অস্বীকার করেননি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধীদের আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কথা কোন এক বিচিত্র কারণে এড়িয়ে গিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যে রাখি বন্ধনের প্রচলন করা হয়েছিলো সেটার বিষয়েও দেয়া তথ্যটা নিয়ে একটু সন্দেহ আছে.. (রাখি বিষয়ক তথ্যটার বিষয়ে অবশ্য আমি নিজেও নিশ্চিত নই.. তাই এটা নিয়ে আপাতত আর কিছু বলা গেল না)।

ভাল লেগেছে তৎকালীন মুসলিম সমাজের উপরে হিন্দু সমাজের নির্মম অত্যাচারের কিছু কিছু চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন দেখে। হিন্দুরা মুসলমানদের খুব নিকৃষ্ট মনে করতো তখনকার সময়ে। মুসলমানরা তাদের দৃষ্টিতে ছিলো 'অস্পৃশ্য'। আমার মা'য়ের মুখে এধরনের বেশ কিছু গল্প শুনেছিলাম। যেমন কোন ঘাট হতে হিন্দুরা কলসি ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছে.. কোন মুসলমান যদি ভুলেও ঐ পানির কোথাও স্পর্শ করতো তাহলে তারা সব পানি ফেলে দিয়ে নতুন করে পানি ভরে নিতো। বই থেকে একটা লাইন কোট করি-
"তিনি এক মুসলমান কাঠমিস্ত্রির ছেলে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন- এ দৃশ্য হাস্যকর। যবনপুত্র অস্পৃশ্য হওয়ার কথা। ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র। শূদ্রের নিচে যবনের অবস্থান। "
উপন্যাসের এক চরিত্র 'হরিচরণ'। এটা ছিল মুসলিম কাঠমিস্ত্রির ছেলে 'জহির'কে কোলে নেয়ার বিষয়ক ভাবনাটা।

মুসলিম কাঠমিস্ত্রির ছেলের জীবন বাঁচানো এবং নিজের ঘরে প্রবেশ করানোর অপরাধে হরিচরণকে সমাজচ্যুত করা হয়েছিলো। বিধান মতে যবনপুত্রকে কোলে নেয়া এবং তাকে ঘরে নেয়া নিষিদ্ধ। ধর্ম থেকে পতিত হওয়ার মতত অপরাধ। ধর্ম থেকে যে পতিত তার স্থান রসাতলে। পাতালের সাত স্তরের ষষ্ঠ তল হচ্ছে রসাতল। এই তলে যে পতিত, তার গতি নাই। এগুলো যদি তাদের বিধানে লেখা থেকে থাকে তাহলে বিষয়টা নিয়ে আমার ভাবাবার অবকাশ রয়েছে। আমার বেশ কিছু হিন্দু বন্ধু রয়েছে। তাদের বাড়ি গিয়ে আমি খেয়েছি তারাও আমার বাড়ি এসে খেয়ে গিয়েছে। বিধান মতে তাদের জাত যাওয়ার কথা। তাদের পুরো পরিবারকেই সমাজচ্যুত করার কথা... তেমনটি হতে শুনিনি। এর কারণ কি হতে পারে যে তারা বিধান মানে না বা মানার উপায় নেই!? ভারতের হিন্দৃ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে কি হিন্দুরা এগুলো এখনো মানে? তাহলে সেখানের মুসলমানদেরও কি সেই ১৯০৫ সালের মত পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে?

তৎকালীন মুসলিম সমাজের কিছু অন্ধত্বও বেশ চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে এখানে একটা বিষয়ে খুব সরলীকরণ করে ফেলেছেন। কিছু সুবিধাবাদী মুসলিম চরিত্র যারা না বুঝে দাসীদের সাথে অবৈধ সম্পর্ককে সঠিক মনে করে উলটা-পালটা কাজ কর্ম করে বেড়াতো তাদের রেফারেন্স দিয়ে পুরো বিষয়টা মুসলিম সমাজের উপরে চাপিয়ে দিয়েছেন। এধরনের সরলীকরণ দু:খজনক! তবে কিছু অন্ধত্ব (যা এখন অনেকটা কেটে গিয়েছে বলেই ধারণা করি) খুব ভয়াভয় ছিলো। ওগুলো ছিলো মূলত ধর্ম সম্পর্কে কম জানার ফল। মুসলিম সমাজের নামে এপর্যন্ত যত অপবাদ এসেছে তার বেশীর ভাগই এইসবআধা ধার্মিকদের কারণে হয়েছে। আমাদের মুসলমানদেরই উচিত এসব আধাধার্মিকদের সঠিক ধর্ম শিক্ষা দিয়ে এদের অন্ধত্ব দূর করা।

তবে একটা বিষয় সত্যি খারাপ লেগেছে। যেমন লেখক তার উপন্যাসে ইসলাম বিষয়ে বেশ কিছু ভুল বিষয় উপস্থাপণ করেছেন। তার ভেতরে একটি এরকম যে, তৎকালীন সময়ে মসজিদের ইমাম'রা ঢোল বাদ্য নিয়ে নিত্য করলে মানুষ কিছু মনে করতো না। কারণ হিসেবে বলেছেন তখনকার মুসলমানরা উগ্র ছিলো না.. তাই এগুলো সমস্যা সৃষ্টি করেনি। তার মানে আমাদের এখন উগ্রতা ছেড়ে মসজিদের ঈমামদের ঢোল-বাদ্য নিয়ে রাস্তায় নাচতে পাঠানো উচিত!!?!!

উপন্যাসে 'ধনু শেখ' নামে নাম মাত্র মুসলিম এক ধূর্ত চরিত্র রয়েছে যার একটা ধূর্তামির শিকার হয়ে 'অম্বিকা ভট্টাচার্য' নামের এক হিন্দু ঠাকুর কে গো-মাংস ভক্ষন করতে হয়েছিলো। সাধারন বিধান মতে এটা মহাপাত। তবুও বিধানের ফাঁক ফোকর গলে ঠাকুরকে রক্ষার চেষ্টা করা হলো, কিন্তু কাজ হলো না। সমাজচ্যুত হয়ে ঠাকুর পরিবার অবশেষে মুসলিম হওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন। অনিচ্ছাস্বত্বেও হিন্দু ধর্মের একজন সম্মানীত ঠাকুরকে এভাবে মুসলিম বানানো আমার কাছে খারাপ লেগেছে। তবে সেই ঠাকুর পরিবারের নিশ্চয় আরো বেশী খারাপ লেগেছে। যদিও অম্বিকা ভট্টাচার্যের প্রতি এই আচরণ করার পেছনে ধনু শেখের কিছু মটিভ রয়েছে। উপন্যাসের চরিত্র হরিচরণ ছিলো ধনু শেখের প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব। এই হরিচরণকে সমাজচ্যুত করার বিষয়টি নিয়ে হরিচরণ একদা জাত বিষয়ক কিছু প্রশ্ন তুলেছিলো যা হিন্দু সমাজের অপছন্দের কারণ হওয়া ধনু শেখের চাকুরী চলে যায় এবং গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে পথে নামতে হয়। হরিচরণকে সমাজচ্যুত করার পেছনে অম্বিকা ভট্টাচার্যের বিশেষ ভূমিকা থাকার কারণেই ধনু শেখ এই হঠকারিতার আশ্রয় নিয়েছিলো। একধরনের প্রতিশোধ বলা যায়।

এ উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের মত অম্বিকা ভট্টাচার্যও শুধু উপন্যাসের একটি চরিত্র নয়। 'অম্বিকা ভট্টাচার্য' একজন বাস্তবের মানুষ। তাঁর পরিবারের সদস্যরা এখনো আমাদের দেশে বাস করছে। 'ধনু শেখের' হঠকারিতায় মুসলিমদের উপর এই পরিবারের আজন্ম আক্রোশ থাকার কথা। আমার মনে হয় তেমনটিই রয়েছে... অম্বিকা ভট্টাচার্যের এক বংশধর আমাদের দেশে বেশ পরিচিত একটি ফ্যামিলি। সেই ফ্যামিলির এক সদস্য যদি চরম মুসলিম বিদ্বেষী হয়, তাহলে সম্ভবত এরজন্য তাঁকে খুব বেশী দোষ দেয়া যায় না...

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ৯:০৪
৩৮টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×