গাযায় নরকের দরজা খুলে দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের স্কুলে আশ্রয় নেওয়া ৪০ জন শরণার্থী এবং অন্য জায়গায় তিনজনকে তারা হত্যা করেছে। যে সেনাবাহিনী নিজেকে ‘নৈতিক বাহিনী’ বলে, তাদের জন্য এক রাতের অভিযানে এটাই বা কম কী? তাদের তো এটাই করার কথা। তাহলে কেন আমরা অবাক হচ্ছি?
আমরা কি ১৯৮২ সালের লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কথা ভুলে গিয়েছি? তখন ১৭ হাজার ৫০০ মানুষকে তারা হত্যা করেছিল। এদের বেশির ভাগই ছিল নিরীহ জনসাধারণ। ওই বছরই লেবাননের শাবরা-শাতিলা শরণার্থী শিবিরের গণহত্যায় এক হাজার ৭০০ নিরীহ মানুষ খুন হয়। ১৯৯৬ সালের কানা গণহত্যায় নিহত হয় ১০৬ জন লেবাননি। এরাও ছিল জাতিসংঘ আশ্রিত এবং নিহতদের অর্ধেকই ছিল শিশু। ২০০৬ সালে তারা লেবাননের মারওয়াহিন গ্রামের অধিবাসীদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে। সবাই তা মেনে নিয়ে পথে নামলে হেলিকপ্টার থেকে তাদের গুলি করে মারা হয়। ২০০৬ সালের লেবানন আগ্রাসনেও তাদের হাতে নিহত হয় এক হাজার জন। তারা তো বেসামরিক মানুষই ছিল, না কী?
আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, যখন পাশ্চাত্যের প্রায় সব নেতা, অনেক অনেক প্রেসিডেন্ট, অনেক অনেক প্রধানমন্ত্রী এবং অনেক সাংবাদিক, সম্পাদকও ইসরায়েলি মিথ্যাচারের কাছে আত্মা বিক্রি করে বসে আছে। ‘ইসরায়েল বেসামরিক মৃত্যু এড়াতে অতি সচেষ্ট’, গাযায় গণহত্যা শুরুর আগের দিনও বলছিলেন একজন ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত। আর যে রাষ্ট্রপ্রধানেরা এই বুলি আউড়ে যাচ্ছেন, পরিষ্কারভাবে তাঁদের উদ্দেশ্য যুদ্ধবিরতির চাপ এড়ানো। ইসরায়েলের সাফাই গাওয়া এই নেতাদের হাতেও লেগে রয়েছে ফিলিস্তিনি গণহত্যার রক্ত। জর্জ বুশ যদি দুই দিন আগেও সাহস করে ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করতেন, তাহলেও অন্তত শতটি জীবন রক্ষা পেত। বেঁচে থাকত ওইসব নারী ও শিশু।
যা ঘটছে তা কেবল লজ্বাজনকই নয়, মর্মান্তিক। কেবল যুদ্ধাপরাধ শব্দ দিয়ে কি এই অপরাধকে পরিমাপ করা সম্ভব? একই কাজ যদি হামাস করত, তাকে আমরা কী নাম দিতাম? কী ব্যবস্থা নিতাম তার বিরুদ্ধে? আমি ত্যক্তবিরক্ত। অথচ ইসরায়েল বলছে, তারা নাকি আমাদের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ লড়ে যাচ্ছে। তারা দাবি করে, গাযায় তারা নাকি আমাদের হয়েই লড়ছে, আমাদের পশ্চিমা মূল্যবোধ রক্ষার জন্য, আমাদের পাশ্চাত্যের নিরাপত্তার জন্য, আমাদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য। তাই যদি হয়, তাহলে গাযায় যে হত্যাযজ্ঞ চলছে, তার দায় আমাদেরও।
আমাদের চোখের সামনেই লেবাননের শাবরা-শাতিলায় ইসরায়েলের ডানপন্থী ফ্যালাঞ্জিস্ট মিলিশিয়ারা গণহত্যা চালায়। ইসরায়েলের নিজেদের তদন্ত প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী তাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছিল। এ নিয়ে ইসরায়েলকে নিন্দা করা হলে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনেশিম বেগিন উল্টো বিশ্বকে দোষারোপ করেন। ১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ শিবির কানায় বোমাবর্ষণ করার সময়ও ইসরায়েল বলেছিল যে, সেখানে নাকি হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা লুকিয়ে ছিল। এটা ছিল ডাহা মিথ্যা। লেবানন আগ্রাসনে এক হাজার জন নিহত হওয়ার দায়ও নাকি হিজবুল্লাহর। ইসরায়েল দাবি করে, নিহত শিশুদের লাশ নাকি কবর থেকে তুলে এনে ধ্বংসস্তূপের ভেতর রাখা হয়েছিল। এটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা। মারওয়াহিন গণহত্যাকে তারা স্বীকারই করে না। অথচ সেখানে গ্রামবাসীকে পালাতে বলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে। ওই হতভাগ্যরা শিশুদের দেখিয়ে নিজেদের বেসামরিক জনসাধারণ প্রমাণ করতে গিয়েছিল, ঘাতকেরা তাদেরও হত্যা করে।
১২ বছর আগে এভাবেই ইসরায়েলি হেলিকপ্টার ফিলিস্তিনি অ্যাম্বুলেন্সে হামলা চালিয়ে নিরপরাধ নাগরিকদের হত্যা করে। অজুহাত সেই একই, অ্যাম্বুলেন্সে নাকি হামাসের গেরিলা ছিল। এটাও ভুয়া কথা। আমি নিজে এসব ঘটনার খবর সংগ্রহ করেছিলাম। আমি বিস্তারিত অনুসন্ধান করেছি, বেঁচে থাকা সাক্ষীদের কথা শুনেছি। সেসব তথ্য ফাঁস করায় এখন ইসরায়েলের কাছে আমাদের পরিচয় হয়েছে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’।
নিচের কথাগুলো নিয়েও আমার কোনো সন্দেহ নেই: গাযা হামলা নিয়েও আবারও মিথ্যার ফুলঝুরি ছুটতে দেখব। সব দোষ চাপানো হবে হামাসের ঘাড়ে। তাদের দোষ নিশ্চয়ই রয়েছে, কিন্তু ইসরায়েল যা বলে সেগুলো নয়। এবারও বলা হবে, লাশগুলো নিশ্চয়ই কবর থেকে তুলে আনা। আবারও ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ গালি শুনতে হবে আমাদের। আর আমাদের নেতারা ধরি মাছ না ছঁুই পানি করে আবারও ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি এড়ানোর সুযোগ করে দেবেন, সুযোগ করে দেবেন ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ণ করার। তাঁরা বলবেন যে, হামাসই প্রথম যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে। এটাই নির্জলা মিথ্যা কথা। ইসরায়েলই প্রথম ১৮ মাস অবরোধ দিয়ে, গত ৪ নভেম্বরের বোমাবর্ষণে ৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং পুনরায় ১৭ নভেম্বরে আরও আরও ফিলিস্তিনিকে বোমাবর্ষণে খুন করার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
অবশ্যই, ইসরায়েলিদেরও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। গত ১০ বছরে নিহত হয়েছে ২০ জন ইসরায়েলি। কিন্তু গত এক সপ্তাহেই নিহত হয়েছে ৯০০ ফিলিস্তিনি। ১৯৪৮ সাল থেকে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা যোগ করলে কত হয়? এর শুরু ১৯৪৮ সালের দায়ের ইয়াসিন গণহত্যা দিয়ে। তারপরই দলে দলে ফিলিস্তিনি প্রাণ রক্ষায় বিদেশে উদ্বাস্তু হওয়া শুরু করে। আজ সেই অঞ্চলে ইসরায়েল কায়েম হয়েছে। আরবে যা ঘটে চলেছে তা পরিষ্কারভাবেই ঔপনিবেশিকতা, দখলদারিত্ব ও গণহত্যা। এর সঙ্গে একমাত্র তুলনীয় বসনিয়া-কসোভোর গণহত্যা। আজকের একজন আরব যখন সার্বক্ষণিক মৃত্যু, আক্রমণ, নির্যাতনের মধ্যে থাকে, যখন চোখের সামনে তার স্বজাতি নিধন দেখে, তখন তার মধ্যে যে ঘৃণা জন্ন হয়, তার লক্ষ্য কিন্তু একা ইসরায়েল নয়, গোটা পাশ্চাত্য। আমরা বলতে পারি, আমাদের কী দোষ? কিন্তু আমরা কি জানতে চেয়েছি, কেন তারা আমাদের ঘৃণা করে? এখন আমরা বলতে পারি না যে, এর উত্তর জানা নেই।
ব্রিটেনের দি ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটেনের দি ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা।
লিংক: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১১:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


