somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আন্টার্কটিকার-বরফ ও আবহাওয়া মন্ডল।

১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবীর সব মহাদেশের মধ্যে আন্টার্কটিকার গড় উচ্চতা সব থেকে বেশি।আর এই উচ্চতার কারন হলো এখানকার পুরু বরফের আবরন।এই বরফের আবরন ভেদ করে উচু উচু পর্বত দাড়িয়ে আছে,তবে তা কেবল মাএ শতকরা 2 ভাগ এলাকায়। আন্টার্কটিকার ভূ-পৃ্স্ঠ খুব বেশি উঁচু নয়,বরং বরফের চাপে ভূ-পৃস্ঠ প্রায় 700 মিটার নীচে নেমে গেছে,আবার কোথাও কোথাও আন্টার্কটিকা মহাদেশের অভ্যন্তরের শিলাতল সমুদ্রপৃ্স্ঠ থেকেও নিচে রয়েছে।সাড়া পৃথিবীতে যত বরফ আছে তার 90 শতাংশই আছে আন্টার্কটিকায়,এই বরফের গভীরতা বেশিরভাগ জায়গায় 2 কিঃমিঃ রের বেশি,আবার অনেক জায়গায় এই গভীরতা 4 কিঃমিঃ এর চেয়েও বেশি।আন্টার্কটিকার মোট বরফের পরিমান 30 মিলিয়ন ঘন কিঃমিঃ,আর পৃথিবীর মোট স্বাদু পানির শতকরা 75 ভাগ পানি আছে এই বরফের মধ্যে।
পৃথিবীর পৃস্ট বেশ কঠিন এবং হিস্তিহাপক জিনিস দিয়ে তৈরি,তাহলে বরফের চাপে কিভাবে ভূপৃস্ট নীচে নেমে যায়?
পৃথিবীর শিলাপৃস্টের ওপর যদি কয়েক ঘন্টার জন্য চাপ দেয়া যায় তবে সেটা একটা কঠিন হিস্তিস্হাপক পদার্থের মত ব্যাবহার করে।কিন্ত অল্প চাপ যদি হাজার হাজার বছর ধরে স্হায়ী হয়, তাহলে সেই দীর্ঘস্হায়ী চাপে পৃথিবীর অভ্যন্তরের নরম সান্দ্র পদার্থের মত ব্যাবহার করবে।এই জন্যেই আন্টার্কটিকার ভূ-পৃস্ঠ নীচের দিকে ঢেবে গেছে।আন্টর্কটিকার বরফের গভীরতা কিভাবে মাপা হয়?আমরা জানি ভূ-পৃস্ঠের গভীরে কূপ খনন করে গ্যাস,তেল সহ নানান খনিজ পদার্থ উওলন করে,কিন্ত আন্টার্কটিকার বরফের আস্তরন ড্রিল ব্যাবহার খনন করা সম্ভব নয়,কারন এখানকার প্রচন্ড ঠান্ডার জন্য ড্রিলের ভিতরকার তরল পদার্থ জমে যাবে।ভূপদার্থবিদরা এই জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের ঘনত্ব নির্নয় করে।আমরা জানি কোথাও ভূমিকম্প হলে সেখানে তিন ধরনের তরংগের সৃস্টি হয়, পি-তরংগ,এস-তরংগ এবং এল-তরংগ।এর মধ্যে এল-তরংগ শুধু পৃথিবীর পৃস্ঠদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়,বাকি দুটি পৃথিবীর অভ্যন্তর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কঠিন পদর্থের মধ্যে দিয়ে পি-তরংগ ও এস-তরংগ যাবার সময় এর গতিবেগের পার্থক্য হয়।শেষের এই তরংগ দুটিকে বিশেষ পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের উপরে ছোড়া হয়,এবং এগুলি বরফের স্তর ভেদ করে ভূপৃস্ঠের নীচের কঠিন পাথরের উপর প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে তখন ফিরে আসা এই তরংগকে সিসমোগ্রাফ যন্ত্রে রেকর্ড করা হয়,এবং এই তরংগের আসা যাওয়ার সময় হিসাব করে বরফের পূরত্ব হিসাব করা হয়।অবশ্য এর জন্য বরফের মধ্যে 150 মিটার গভীর গর্ত করে এর ভিতর বিস্ফোরন ঘটিয়ে এই কম্পনের সৃস্টি করা হয়।
এছাড়াও তরিৎ চূম্বকীয় তরংগ পাঠিয়েও অনেক সহজে বরফের গভীরতা মাপা হয়।এই ভাবে দেখা গেছে যে, আন্টার্কাটিকার মধ্যভাগের বরফের আবরনের গভীরতা সবথেকে বেশী এবং মধ্যভাগ থেকে বাইরের দিকে এই গভীরতা ধীরে ধীরে কমেছে।আন্টার্কটিকার এই বরফের মোট এলাকা প্রায় 14 মিলিয়ন বর্গ কিঃমিঃ।বিশাল এই বরফক্ষেএটি মাধ্যার্কষনের টানে মহাদেশের মধ্যভাগ থেকে চারিদিকে হিমবাহ রুপে প্রবাহিত হছে,এবং উপকুল ছাড়িয়ে মহীসোপানের (Continental Shelf) ওপর দিয়ে সমুদ্রের ওপরে বিস্তৃত হছে।
আন্টার্কটিকার বরফ কিন্ত পানি জমা বরফের মত নয়।এই বরফ তৈরি হয় অসংখ্য ছোট ছোট বরফের কৃস্টাল দিয়ে।তাই এই বরফের প্রবাহ তরল পদার্থের মত নয়,ধাতু বা শিলার মত কৃস্টালিন পদার্থের প্রবাহ-যাকে বলা হয় প্ল্যাস্টিক ফ্লো।এই জমা বরফ যখন প্রবাহিত হয় তখন সৃস্টি হয় হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার। এগুলি নদীর মত সঙ্কীর্ন উপত্যকা দিয়ে প্রবাহিত হয়।গ্রীনল্যান্ড বা আন্টার্কটিকায় যে তুষার ক্ষেএ আছে তাকে বলা হয় মহাদেশীয় হিমবায় (Continental glacier),আর পৃথিবীতে এই দুই এলকা ছাড়া আর কোথাও এই মহাদেশীয় হিমবাহ নেই।
বিঙ্ঘানীরা দেখেছেন যে,সমগ্র আন্টার্কটিকাতে তুষারপাতের পরিমান খুবই সামান্য।কারন আন্টার্কটিকার অধিকাংশ এলাকা এত ঠান্ডা যে সেখানকার বাতাস জলীয়বাস্প ধারন করে রাখতে পারে না,তাই এখানকার বাতাস মরুভূমির মত শুস্ক।সমগ্র আন্টার্কটিকাতে কেবলমাএ তীরবর্তী অঞ্চলে বছরে মোটামুটিভাবে 15 থেকে 20 সেঃমিঃ পুরু বরফ জমে।নতুন তুষারপাত এবং হিমশৈলের আকারে ব্যায়িত বরফের পরিমানের মধ্যে একটা সম্বনয় আছে,এর ফলে আন্টার্কটিকার বরফের পরিমান বর্তমানে তেমন কম বেশি হয়নি।আন্টার্কটিকার এই তুষারক্ষেএটি কোথাও কোথাও একেবারে গতিহীন আবার কোথাও এর গতি বেশ দ্রুত,এবং এই গতি কোথাও কোথাও বছরে কয়েকশো মিটার আবার কোথাও বছরে মাএ পনেরো মিটার।বিয়ার্ডমোর নামের একটি হিমবার গতি সবচেয়ে বেশি,দিনে প্রায় 2 মিটার,এখানে উল্লেখ্য যে বরফের নীচের শিলাপৃস্টের ঢালের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে হিমবাহের গতি।আবার বরফের গভীরতার সাথে এই গতির হেরফের হয়।
আন্টার্কটিকার বরফ স্তরীভূত,এই হিমবাহের মাঝে পাললিক শিলার মত অনুভূমিক স্তর দেখা যায়।শীতে যে বরফ জমে, গরমের সময় সেই বরফের ওপরের স্তরটি আবার গলে যায়।আন্টার্কটিকার ভিতরের বেশিরভাগ জায়গার বরফ কোন সময়েই গলে না,এবং বার্ষিক তুষারপাতের পরিমানও কম,তাই সেখানকার বরফের স্তর বোঝা সম্ভব নয়।তবে ধারনা করা হয় এই বরফের ঘনত্ব মোটামুটিভাবে 0.4 থেকে 0.5 গ্রাম প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে,এই গভীরতা যত বাড়তে থাকবে বরফের ঘনত্বও তত বাড়বে,কারন এত গভীরে বরফের মধ্যে আটকে পড়া বাতাস বেড়িয়ে যায়।এবং 50 থেকে 100 মিটার গভীরতায় এই বরফের ঘনত্ব বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় 0.83 গ্রাম প্রতি ঘন সেন্টিমিটার।
বরফের ঘনত্ব ,এর গঠন,রাসায়নিক চরিএ,আইসোটোপ বিশ্লেষন,ব্যাকটেরিয়া এবং উদ্ভিদ ও প্রানীর অস্তিত আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য বরফের মধ্যে ড্রিলিং করে অনেক গভীর থেকে বরফের টুকরা সংগ্রহ করা হয়,এই টুকরা গুলিকে আইস-কোর বলে।এই আইস-কোর পরীক্ষাতে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায় এর আইসোটোপ বিশ্লেষন করে,এই পদ্ধতি ব্যাবহার করে বরফের ভিতরে আটকে থাকা কার্বন-ডাই-অস্কাইড এর কার্বন-14 আইসোটোপ থেকে এই বরফের স্তরের বয়স নির্ধারন করা সম্ভব।এছাড়া এই আইসোটোপ পরীক্ষা করেই বিঞ্জানীরা ধারনা করেন যে আন্টার্কটিকার এই তুষারক্ষেেএর কোন কোন অংশের বয়স প্রায় 7 কোটি বছর।
আন্টার্কটিকার বরফের মধ্যে আছে মহাকাশ থেকে আসা উল্কাপিন্ডের বিশাল ভান্ডার যুগ যুগ ধরে এগুলো বরফের মধ্যে জমা হয়ে রয়েছে,এবং প্রচন্ড ঠান্ডার কারনে এই উল্কাপিন্ডগুলো অবিকৃ্ত অবস্হায় থাকে।তাই বিঞ্জানীদের কাছে এইগুলোর মূল্য অপরিসীম।
আন্টার্কটিকার বরফ নিয়ে গবেষনার একটা ব্যাবহারিক দিক আছে,তাহলো এই বিশাল বরফ পৃথিবীর আবহাওয়ার উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে তাই পৃথিবীর আবহাওয়া নিয়ে গবেষনা করতে হলে আন্টার্কটিকার এই হিমবাহের সমস্ত তথ্য জানা বিশেষ প্রয়োজন।
আন্টার্কটিকার জলবায়ুঃ সমস্ত পৃথিবীর সামগ্রিক জলবায়ু নির্ধারনে দুই মেরু সুমেরু এবং কুমেরুর একটি প্রভাব আছে। পৃথিবী সূর্য থেকে যে তাপশক্তি পায়,তার বেশিরভাগ চলে যায় পৃথিবীর নিম্ন ও মধ্য অক্ষাংশ এলাকায়।সমুদ্র ও বায়ুস্রোতের সাথে এই তাপের অনেকটা অংশ এই দুই মেরু হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়।এই ভাবে শীতল দুই মেরু এলাকা ভূপৃস্ঠের সামগ্রিক তাপের সমতা বজায় রাখতে সাহায্যে করে।আন্টার্কটিকা মহাদেশের চারপাশের সমুদ্রতলকে তিনটি বেসিনে ভাগ করা হয়েছে,এর প্রত্যেকটির গভীরতা 3000 থেকে 5000 মিটার।এই তিনটি বেসিনের সীমানায় রয়েছে একটি করে শৈলশিরা,আবার এই সবকটি বেসিনকে উওর সীমা দিয়ে ঘিরে রয়েছে বিশাল মগ্ন শৈলশিরার (Circumantarctic ridge system)বেস্টনী।
ভারত ও আটলান্টিক মহাসাগরের এই শৈলশিরাগুলির মধ্যে দিয়ে যেমন গভীর ফাটল আছে,কিন্ত আন্টার্কটিকার এই শৈলশিরার
বেশিরভাগ জায়গাতেই সেরকম কোন ফাটল নেই।এই শৈলশিরা যেখানে যেখানে পানির উপর উঠে গেছে সেখানে সেখানে সৃস্টি হয়েছে ছোট ছোট দিপের যেমন-কারগুলেন,প্রিন্স এডওয়ার্ড,বুভে,সাউথ অর্কনী,সাউথ স্যান্ডউইচ দিপ পূঞ্জ,সাউথ জর্জিয়া দিপ পুঞ্জ,সাউথ শেটল্যান্ড দিপ পুঞ্জ ইত্যাদি,এবং এই দিপ গুলির অধিকাংশই আগেনয়গিরি থেকে তৈরী।
আন্টার্কটিকার তাপমাএা এত কম কারন পৃথিবীর মেরুঅঞ্চলে অবস্হিত এখানে সূর্যের তাপ খুবই কম পৌছায়,তাছাড়াও আন্টার্কটিকার উচ্চতাও অনেক,আর উচ্চতা বেশী হলে তাপমাএাও কমে যায়।ভৌগলিক দক্ষিন মেরুর উচ্চতা 2900 মিটার,সেখানখার বার্ষিক গড় তাপ -51ডিগ্রী সেলসিয়াস।পৃথিবীর শীতলতম জায়গা ভোস্টক দক্ষিন মেরু থেকে 1600 কিঃমিঃ দূরে অবস্হিত,সেখানখার উচ্চতা 3400 মিটার সেখানে 22 শে মে থেকে 23 শে আগস্ট পর্যন্ত সময় রাত থাকে।1960 সালের 24 শে আগস্ট ভোস্টকে পৃথিবীর সর্বনিম্ন তাপমাএা -88.3ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছিল।
সুমেরু থেকে কুমেরু এলাকায় শৈত্য অনেক বেশী হলেও তুলনামূলক সৌ্র তাপ কুমেরু অঞ্চলেই বেশি আসে,ডিসেম্বর মাসে দক্ষিন মেরুতে প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে 37000 হাজার ক্যালোরি সৌ্র বিকিরন আসে।এই বিকিরনের কিছুটা বায়ু মন্ডল শোষন করে,আর বাকিটা 28500 ক্যালোরি প্রতি বর্গর্সেন্টি্মিটার আন্টার্কটিকার বরফের উপর পড়ে।আন্টার্কটিকার বায়ূন্ডল পরিস্কার থাকার কারনে বায়ুমন্ডল প্রতিফলিত সৌর বিকিরন খুব বেশি শোষন করতে পারে না,তার ফলে আগত বিকিরনের বেশিরভাগই আবার মহাশূন্যে ফিরে যায়।
আবার সুমেরু অঞ্চলের বরফের উপর সৌর বিকিরনের পরিমান 5900 ক্যালো্রি প্রতিসেন্টিমিটারে,এখন মনে প্রশ্ন আসতে পারে কুমেরু অঞ্চলে শৈত্য এত বেশি কেন?সুর্য বিকিরনই এই দুই অঞ্চলের তাপের একমাএ উৎস নয়,নিম্ন অক্ষাংশের গরম সমুদ্রস্রোত ও বায়ুস্রোত তাপবহন করে আনে।সুমেরু অঞ্চলের বরফের নিচে সমুদ্র আছে,এর পানির তাপ বরফের মধ্য দিয়ে এসে সুমেরুর বাতাসকে খানিকটা তাপ দেয়।দক্ষিন সমুদ্রের সাথে আর্কটিক সমুদ্রের বেশ কিছু পার্থক্য আছে,উওরের সমুদ্রের চারপাশ ঘিরে রয়েছে মহাদেশগুলি।এর মাঝের কিছু ফাঁক দিয়ে পৃথিবীর সব সমুদ্রের সাথে আর্কটিক সাগরের কিছুটা যোগাযোগ হয়,অন্যদিকে দক্ষিন সমুদ্রের সাথে পৃথিবীর সব মহাসমুদ্র সরাসরি যুক্ত এর ফলে দক্ষিন সমুদ্রের পরিস্কার কোন সীমানা নেই।তাই পৃথিবীর সমুদ্রের পানিরাশির সংবহনে আর্কটিকের চেয়ে আন্টার্কটিকের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
আবার গরমের তুলনায় শীতকালে বায়ুমন্ডল থেকে বরফের ওপর দ্বিগুন পরিমান তাপ বিকিরন হয়,কারন শীতকালে বরফের উপরিভাগের চেয়ে উর্ধ বায়ুমন্ডল বেশী গরম থাকে,এর ফলে উচ্চতা বাড়লে তাপমাএা কমার পরিবর্তে বেড়ে যায়।আবার গরমকালে এর ঠিক উল্টো্টা হয়।আন্টার্কটিকার বরফ গরমের সময় খুব অল্প সময়ের জন্য তাপ লাভ করে,অ্যাবসলিউট জিরো তাপমাএার ওপরে যেকোন জিনিসই তাপ বিকিরন করে।এর থেকে দেখা যায় যে আন্টার্কটিকার বরফ সূর্য থেকে যে পরিমান তাপ পায় তার থেকে বেশি তাপ সে বিকিরন করে।
আন্টার্কটিকার পিঠটা অনেকটা কচ্ছপের পিঠের মত,এর কারনে আন্টার্কটিকার ঠান্ডা ভারি বাতাস উচ্চভূমি থেকে উপকূলের দিকে গড়িয়ে প্রবাহিত হয়,এ ধরনের বাতাসকে বলে “ক্যাটাবেটিক হাওয়া”।এই বাতাস যখন একদিকে বয়ে যায় তখন এই বাতাস বরফের উপর সরু সরু একধরনের তীক্ষ টিলা তৈরী করে,এই টিলাগুলিকে বলে সাসএুগি। এছাড়াও এই হাওয়ার বেগ সাধারনত বরফের ঢালের উপর নির্ভর করে যেমন-30 ডিগ্রী ঢালে এই বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় 45 কিঃমিঃ এইভাবে যেতে যেতে এই বাতাসের বেগ আচমকা বেড়ে যায় এবং তখনি ব্লিজার্ডের (এক ধরনের মেরু ঝড় যার গতিবেগ অনেক সময় 200 কিঃমিঃও ছাড়িয়ে যেতে পারে)সৃস্টি হয়।মেরু অঞ্চলের এই ব্লিজার্ড বেশ আজব ধরনের,এই ব্লিজার্ড যখন সুরু হয় তখন কোন তুষারপাত হয় না,এমনকি কোন কোন সময় আকাশও পরিস্কার থাকে।
জনবসতি থেকে আন্টার্কটিকা অনেক দূরে থাকায় এখানকার পরিবেশ তেমন দূষিত হতে পারেনি,যার কারনে পৃথিবীর আবহাওয়া মন্ডল কিভাবে এবং কতটা দূষিত হয়েছে তা মাপার জন্য আন্টার্কটিকার পরিবেশকে একটি মডেল হিসাবে ধরা হয়।এই আন্টার্কটিকাতেই বিঞ্জানীরা ওজোন স্তরে বিশাল এক গর্তের সন্ধান পেয়েছেন (এই ওজোন হলো এক ধরনের গ্যাস যা অস্কিজেনের তিনটি অনু দিয়ে তৈরী একে বলা হয় এ্যালাট্রপিক ফর্ম, এই ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্নি থেকে পৃথিবীর প্রানী এবং উদ্ভিদ কে রক্ষা করে।)।পৃথিবীর উন্নত দেশ গুলির বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে এই গর্তের সৃস্টি হয়েছে,আন্টার্কটিকায় উপরের ওজোন স্তর তার 40 শতাংশ ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছে। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো যে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেএ এই গর্তটিকে টেনে মানুষ শূন্য আন্টার্কটিকায় নিয়ে গেছে।আন্টার্কটিকার ভূপৃস্ট থেকে 15 থেকে 25 কিঃমিঃ ওপরে এই ওজোন স্তরের পরিমান সব চেয়ে বেশি,এই কারনে বিঞ্জানীরা এখান থেকে ওজোন স্তরকে খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষন ও গবেষনা করতে পারে।এই ওজন স্তরের অবস্হান হছে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের দ্বিতীয় স্তর হলো স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার,এই স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওপরের দিকে ওজোন স্তর অবস্তিত।মেরু অঞ্চলের উপরের বায়ু মন্ডলের চরিএ নি্রক্ষীয় অঞ্চলের উর্ধবায়ুমন্ডল থেকে সম্পূর্ন অলাদা,এর কারন পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেএের প্রভাব।এই চৌম্বকক্ষেএ নিরক্ষীয় অঞ্চলে একরকম আর মেরু অঞ্চলে অন্যরকম আচরন করে,নিরক্ষীয় অঞ্চলে এই চৌম্বকরেখা ভূপৃস্ঠের সমান্তরাল থাকে,আর মেরু অঞ্চলে থাকে ভূপৃস্ঠে লম্বভাবে।
পৃথিবী যে অক্ষরেখার চারপাশে আবর্তন করছে সেই অক্ষরেখাটি ভূপৃস্ঠকে যে দুটি বিন্দুতে ছেদ করছে তাকেই সাধারনত মেরু বলা হয়।এই ভৌগলিক মেরু ছাড়াও আরও দুধরনের মেরু আছে-চৌম্বক মেরু ও ভূ-চৌম্বক মেরু।ভৌগলিক দক্ষিন মেরুর অবস্তান 90 ডিগ্রী দক্ষিন অক্ষাংশে,আর দক্ষিন চৌম্বক মেরুর উপস্হিতি (এই চৌম্বক ক্ষেএ একজায়গায় স্হির থাকে না) হলো 72.5 ডিগ্রী দক্ষিন অক্ষাংশ ও 155 ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমায়,এখন এই বলা যায় যে এই চূম্বকের অক্ষরেখা ভূপৃস্ঠের যে দুটি বিন্দুতে ছেদ করে তাকে বলে হয় ভূ-চৌম্বক মেরু।দক্ষিন ভূ-চৌম্বক মেরু আছে 78.6 ডিগ্রী দক্ষিন অক্ষাংশ ও 110 ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাতে।
এই চৌম্বক রেখাগুলি দুই ভূ-চৌম্বক মেরুতে খাড়াভাবে ঢুকেছে,আর নিরক্ষীয় অঞ্চলে এই রেখাগুলি থাকে ভূ-পৃস্টের সাথে সমান্তরাল ভাবে।পৃথিবীর এই চূম্বক সূর্য থেকে আগত বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকারক কনিকাকে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।এই বাধা দেয়ার শক্তি পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে সব থেকে বেশী,কারন এখানে চূম্বক রেখাগুলি ভূ-পৃস্ঠের সাথে সমান্তরাল ভাবে থাকে এবং আগত কনিকাগুলি এই রেখার ওপর সরাসরি লম্বভাবে পড়ে।আবার মেরু অঞ্চলে এই বাধা সব থেকে কম,কারন এখানে এই কনিকাগুলো চৌম্বকরেখার সাথে সমান্তরাল ভাবে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে।এমনি ভাবে সূর্যের এই কনাগুলি যখন চৌম্বকক্ষেএে প্রবেশ করে তখন এই চৌম্বকরেখা এই কনাগুলিকে টেনে উওর বা দক্ষিন ভূ-চৌম্বক মেরুতে নিয়ে যায়,সেখানে এই কনাগুলি তখন উল্লম্বভাবে সেখানকার বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে।এবং এই কনাগুলি বায়ুমন্ডলের সাথে সংঘর্ষ ঘটায়,এর ফলে সেখানকার আকাশ জুড়ে তখন শুরু হয় অদ্ভুত আলোর খেলা যাকে আমরা বলি অরোরা।উওর মেরুর অরোরাকে বলা হয় অরোরা বোরিয়ালিস এবং দক্ষিন মেরুর অরোরাকে বলা হয় অরোরা অস্ট্রালিস।
পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেএের সাথে অরোরার একটা সর্ম্পক আছে,দেখা যায় যে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেএের বাড়া কমার সাথে সাথে অরোরাও বাড়ে কমে।আর এই অরোরা মেরু অঞ্চল ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না,কারন সূর্য থেকে আগত এই চার্জযুক্ত কনাগুলি মেরু অঞ্চলের আয়োনোস্ফিয়ারে (বায়ুমন্ডলের একটি অংশ) সব থকে বেশি থাকে।বিঞ্জানীরা এই অরোরার আলো পরীক্ষা করে বায়ুমন্ডলের রাসায়নিক বিক্রিয়া (Chemical Composition) সর্ম্পকে ধারনা লাভ করে যেমন-অরোরায় পীতাভ সবুজ যে রংটি দেখা যায় তা হলো অক্সিজেনের উপস্তিতির ফলে।
মেরু অঞ্চলের আয়োনোস্ফিয়ারে আর একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে,এখানে যে সমস্ত গবেষনাগার আছে সেখানকার বেতার যন্ন্ত্রে কয়েক সেকেন্ড পর পর একটা শিসের আওয়াজ ধড়া পড়ে।একে বলা হয় হুইসলার (Whistler),এগুলি এক ধরনের দীর্ঘ তরিৎ-চূম্বক তরংগ,এই তরিৎ-চুম্বক তরংগের সৃস্টি হয় বজ্রপাতের ফলে।আর এই তরংগ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেএ দ্বারা প্রভাবিত হয়।অনেক সময় এই শিস চৌম্বকরেখা অনুসরন করে দুই মেরুর দুটি যুগ্ম (Conjugate) চৌম্বক বিন্দুর মধ্যে প্রতিফলিত হতে থাকে।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে বায়ুমন্ডল নিয়ে গবেষনার জন্য মেরুঅঞ্চল সবদিক থেকে আর্দশ জায়গা।এছাড়াও পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের ওপর মেরুঅঞ্চলের প্রভাব বেশি,আর মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে সমগ্র পৃথিবীর তাপমাএা বেড়ে গিয়েছে যার কারনে বায়ুমন্ডল আজ হুমকির মুখে।আর এর প্রভাব পড়ছে মেরু অঞ্চলের বরফের উপর,আগেই বলেছি সমগ্র পৃথিবীতে যে পানি আছে তার 75 শতাংশই আছে আন্টর্কটিকার বরফে,আর পৃথিবীতে যত বরফ আছে তার 90 শতাংশই আছে এই বরফের মধ্যে।এই বরফ যদি গলে যায় তবে পৃথিবীর অবস্হা কি হবে?আন্টার্কটিকার বরফ যদি 35 মিটার গলে তাহলে পৃথিবীর সমস্ত সাগরের পানির উচ্চতা 1 মিটার বাড়বে,আর যদি সব বরফ গলে যায় তাহলে সমুদ্রপৃস্ঠের উচ্চতা 60 মিটার বাড়বে,এর ফলে পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রবন্দর,উপকুলীয় এলাকা এবং এর সংলগ্ন সমস্ত বড় বড় শহর পানির নীচে ডুবে যাবে।আর পৃথিবীর অনেক বড় বড় শহর সমুদ্রের পাশে অবস্হিত।তবে উন্নত বিশ্বের চেয়ে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হবে,কারন আমরা প্রযুক্তি এবং অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে আছি,আর সবথেকে ভয়ের বিষয় হলো আন্টার্কটিকার এই বরফ বর্তমানে গলতে শুরু করেছে।যদিও এই হার এই মুহুর্তে খুব বেশি না তবে একেবারে কমও না,কিন্তু পৃথিবীর তাপমাএা যদি আর একটু বাড়ে তাহলে আর রক্ষা নেই।
কাজেই এখনি সময় পৃথিবীর উন্নয়নশীল দেশ গুলি একসাথে মিলে উন্নত দেশগুলিকে চাপ দিয়ে কার্বন ও অন্যান্য ক্ষতিকারক গ্যাসের নির্গমন কমাতে বাধ্য করা।
ছবি সৌজ্যন্যেঃগুগল ও নাসা।
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×