somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢিল (শেষাংশ)

২৩ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো নিথর প্রকৃতিতে কান পাতে মেঘনা। তার মন বলছে, আজরাঈল আসছে।
কেমন তার ডানার শব্দ?

কলতলার পাশে সযত্নে- লালিত বাগানের মধ্যে হাঁটছে মেঘনা। ছোট ফুলগাছ-গুলি ছুঁয়ে-ছুঁয়ে
সবুজ-সজীবতা পরখ করে সে। পাপড়ির স্নিগ্ধতা গাল-ঠোঁটে অনুভব করতে-করতে মনের ভেতরের
মেঘনা বলে--সাপটা এখন কোথায়?

সাপের কামড়ে মৃত্যু মানে তো জান্নাতী। মেঘনার মৃত্যু কোন পর্যায়ে পড়বে, ইচ্ছামৃত্যু নাকি অপমৃত্যু?
পোস্ট-মর্টেম হবে? আইবুড়ো মেয়ে মারা গেলে তো অনেক গুঞ্জন ওঠে। মেঘনার অকালমৃত্যু
কলঙ্কের গন্ধ ছড়াবে বুঝি?


যে সাপের খোঁজে মেঘনা দিশেহারা। সে তার উপস্থিতি বুঝিয়ে গেল সিরাজুন্নেসাকে।

কাশতে-কাশতে সিরাজুন্নেসা ডাকলেন--মেঘা দ্যাখ তো বুবু কিসে যেন কামড়ালো, নাকি
খুয়াব দেখলাম কে জানে?


মেঘনা ছুটছে। তার হৃদয়ের সব গতিবেগ পায়ের তলায়। বারান্দায় জ্বেলে রাখা লন্ঠনের শিখা
দপ্-দপ্ করছে। সেটি যেন হৃৎপিন্ড হয়ে গেছে মেঘনার!


মেঘনার দৃঢ়-বিশ্বাস, তার ডাকে সাড়া দিয়েছে সাপ। বিছানায় গেছে। মশারীর শাসন অগ্রাহ্য
করে ছোবল মেরেছে। অবুঝ সরীসৃপ খেয়াল করেনি, তরুণী নয়, লোলচর্ম এক বৃদ্ধার পা সেটি।
আর্তনাদ করে উঠলো মেঘনা।

পড়শীদের জমায়েত। টেলিফোন। অ্যাম্বুলেন্স। ভিড়ের মত মেঘ জমে গেছে আকাশেও। বিজলী
যেন মেঘনার হৃদয় হয়ে চমকায়।

হাসপাতালের এমার্জেন্সী-তে ডিউটি-রত তরুণ ডাক্তারের উজ্জ্বল মুখে জড়ুলের মতো
হতাশা জমে উঠেছে। মেঘনাকে পাশে ডাকলো সে। বললো--সবরকম চেষ্টা করে দেখলাম,
উন্নতির লক্ষণ নেই। আপনি মানসিক ভাবে প্রস্তুত হোন।


একটু আগেও মেঘনাকে কাছে ডাকছিলেন সিরাজুন্নেসা। নাকি বিকারে প্রলাপ বকছিলেন!
চোখের পাতা খোলার সে-কি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। সারাজীবনের অপূর্ণ ঘুমের অভিযান যেন
মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরেছে সিরাজুন্নেসার চোখের পাতা। যে ঘুম তাঁকে একটু-একটু করে নিয়ে
যাচ্ছে চিরঘুমের দেশে।

চাহারম হয়ে গেছে। পড়শী-মেয়েরা ফিরে গেছে নিজের-নিজের সংসারে। যে যখন ফাঁক পায়
খোঁজ নিয়ে যায়। এই কয়দিন মায়ের মতো মেঘনাকে আগলে রেখেছে ওরা। নিজেরা সিদ্ধান্ত
নিয়েছে, পালা করে রাতে এসে মেঘনার কাছে শোবে।

মেঘনার সামনে উন্মুক্ত দিন। চোখ-মুখ, এলোচুলে এলিয়ে পড়েছে পড়ন্ত বেলার রোদ। ঠিক
যেন সিরাজুন্নেসার অস্থি-চর্মসার হাতের পরশ। কর্কশ তবু স্নেহে মায়াময়।

কলতলায় হুটোপুটি করছে তিনটে কাক। এঁটোকাটার সন্ধানে তাদের তেড়ে যাচ্ছে দুটো কুকুর।
সিরাজুন্নেসার উপস্থিতিতে এই ' বেলেল্লাপনা' সম্ভব ছিল না। তাঁর গলার জোরে ঘাবড়ে যেতো
কাক-কুকুর, এমনকি মানুষও। মেঘনা শুধু জানে ভেতরের মানুষটি কত মোলায়েম ছিল। সে
আরও জানে, মেঘনাকে রক্ষা করতেই তিনি এঁটেছিলেন রুঢ়তার মুখোশ।


সিরাজুন্নেসা নেই। তাঁর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে এ-বাড়ির সবখানে। মেঘনার প্লাবিত চোখ-দুটি
সিরাজুন্নেসাকে খুঁজছে। অনর্থক সেই সন্ধানের সামনে এসে দাঁড়ালো হাসপাতালের সেই ডাক্তার।
আজরাঈলের মতো তার নিঃশব্দ উপস্থিতি মেঘনাকে চমকে দিলো। রুঢ়-স্বরে সে বললো--
আপনি এখানে?

মেঘনার রুঢ়তায় তরুণ-ডাক্তার হতচকিত। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখচোখের অপ্রস্তুত-ভাব মুছে ফেললো সে। সাবধানী উচ্চারণে বললো--আপনার মানে তোমার এখনকার
অবিভাবক কে, আমি তাঁর সাথে কথা বলতাম।


ডাক্তারের উঁচু নাক টিয়াপাখির নাকের মতো বাঁকা। মাথার চুলে টাঁকের আভাষ। কুকুর এবং
কাকের দল তা দেখছে না। হঠাৎ নিজেকে মেয়েমানুষ মনে হয় মেঘনার। তবু স্পষ্ট উচ্চারণে সে
বললো--আমার অবিভাবক আল্লাহ, যান তাঁর সাথে কথা বলুন।


একটানা কথা বলা নাকি টেনশনে ডাক্তারের চোখ ক্রমান্বয়ে বন্ধ হচ্ছিল এবং খুলে যাচ্ছিলো।
সে কাঁপা-স্বরে যা বললো তা হলো--আমি ওয়াশিম হায়দার, মহুকুমা হাসপাতালে আর মাস
ছয়েক আছি। বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাঁরা নেই তাই নিজের বিয়ের কথা নিজেকেই
বলতে হচ্ছে। আমাকে বিয়ে করতে তোমার আপত্তি আছে?

সাপটা কোথায় যেন ফোঁস করে উঠলো। মেঘনার পায়ে কাঁটার অনুভব। ঠোঁট একটু কাঁপলো।
তবু সে উচ্চারণ করতে পারলো--আমার বিয়ের বিষয়ে যা বলার তা আমার দাদিজান বলে
গেছেন, তাঁর অবর্তমানে আপনি আমার পড়শি-মায়েদের সাথে কথা বলতে পারেন।

--ধন্যবাদ। বলে মৃদু হাসলো ওয়াশিম।

উচ্ছিষ্টের খোঁজে হয়রান কুকুর এবং কাকের দল। মেঘনার ফুলবাগানের একটি গাছ নড়ে উঠলো
যেন। মনেমনে সেখানে ঢিল ছুঁড়লো মেঘনা। তার বিশ্বাস, এই ঢিলে সাপটা মরবে।


সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ডিসেম্বর, ২০০৮ সকাল ৯:৩৬
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×