আজ ক্রিকইনফোতে মাশরাফি মুর্তাজা’র উপর একটা লিখা পড়ছিলাম। সিদ্ধার্থ মঙ্গা’র লিখা। অনেকদিন পর ক্রিকইনফোতে একটা ভাল লিখা পেলাম। পড়ছিলাম আর ভাল লাগছিল। মাশরাফির জন্য ভাল লাগছিল। গর্ব হচ্ছিল। নতুনভাবে মনের কোণে সুলুক সন্ধান করছিলাম। নড়াইলের ছেলে, চিত্রা নদীর পাড়ের ছেলে মাশরাফি। আমাদের মাশরাফি।
চিত্রা নদীতে সাঁতার কেটে বড় হওয়া ছেলে মাশরাফি। নড়াইলের রাস্তায় বাইক নিয়ে উড়ুক্কুবাজ ছেলে মাশরাফি। এই বয়সে একটা টেস্ট টিমের মূল বোলার, বাম হাঁটুতে তিনটে অপারেশন, ডান হাঁটুতে একটা, গোড়ালির লিগামেন্ট ইনজুরি দুবার, ব্যাক স্ট্রেস, কাঁধের ইনজুরি সব কিছুর সাথে যুদ্ধ করে আজ বাংলাদেশের সেরা বোলার। সম্ভবত পৃথিবীর সেরা বোলারের একজন হওয়ার পথে। নিজের ভালো-খারাপ দুটো দিকই খুব ভালভাবে অনুভব করতে পারা একটা মানুষ।
আচ্ছা কেউ কি বলে দেয়, তোমার বাড়ীর পাশের চিত্রা নদী তোমাকে ভালোবাসতে হবে। নিজের নদী অনুভব করবার কথা কি মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে হয়। নিজের মায়ের হাতে মাছ, ভাত, পেঁয়াজ, সব্জি কাটার পর একটা গন্ধ থেকে যায়। হাত ধোয়ার পরও একটা গন্ধ থাকে। সেই উষ্ণ গন্ধটা সবাই চেনে। পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকেনা, কিম্বা স্কুলে হোমওয়ার্ক দেয় না, যে যাও মায়ের হাতের মিষ্টি গন্ধটা নাও।
এটা আমরা সহজাত প্রবৃত্তির বশেই করি। আমার বাসার পাশেই কনগ্যারী নদী। একটু জেদী, একটু চটুল কিন্তু সহজিয়া, আমি বুঝতে পারি। বই না পড়েই, নদীর পানির অম্ল-ক্ষার মাত্রা না জেনেই, নদীর দৈর্ঘ্য না জেনেই আমি অনুভব করতে পারি নদীকে।
একসময় বিটিভি যখন ছিলো একমাত্র চ্যানেল, তখন দিনের বেলা মাঝে মাঝে টেস্ট ট্রান্সমিশন চলতো। তখন আমি অনেক ছোটো ক্লাস থ্রি হবে হয়তো। কয়েকটা গান খুব বেশী প্রচার হতো।
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’ গানটা কানে গেলেই মনে হতো, আমাদের সবার, সারা দেশের প্রাণভোমরা ঐ একটা ফুলে। ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ এই গান অনুভব করবার জন্য, শুনবার জন্য আমার বাসায় কিন্তু কোন টিভি ছিলনা। ছিলনা কোন প্লেয়ার।
কিন্তু গানগুলো অনুভব করেছি।
এখন আমার আইপড আছে। সেখানে কিন্তু এই গানগুলো নেই। কিন্তু আমার মাথায় গানগুলো মাঝে মাঝেই বাজে। আমি নিজের সাথে বোঝাপড়া করি। আমি ইতিউতি তাকাই, কিন্তু দেখতে পাইনা কোন পুস্তক, কোন ধ্বজাধারী ভাষণ কিম্বা আধহাত মোটা কোন হরলাল রায়ের রচনা বই যেখানে লিখা আছে;
এগুলো আমাদের রক্তের দামে লিখা স্বরলিপি। এগুলো আমাদের ছিন্নভিন্ন বাংলার এক চিলতে উঠোন।
আমি হতাশ হই। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার বাসার পাশের নদীটা থেমে গেছে অভিমান করে। আমি লজ্জিত হই, যখন শুনি কেউ বলছে;
৭১ নিয়ে আমার কোন আগ্রহ ছিলনা
জানিনা কারণ আমাদের হোমওয়ার্ক ছিলনা
জানিনা কারণ বিরক্ত বোধ করতাম ৭১ নিয়ে ধান্ধাবাজী দেখে,
জানিনা কারণ ভোট পাওয়ার জন্য নেতারা এটাকে ব্যবহার করেন।
ভোট পাওয়ার জন্য সবাই মাথায় কাপড় দেন, কই সবাইতো মাথায় কাপড় দেবার আগ্রহ হারায় না।
ভোটের জন্য মসজিদ বানায়, মন্দির বানায়, কলতলা বাঁধিয়ে দেয়, ইসলাম বেচে, শরিয়ত বেচে, ক্রিকেট বেচে, জগন্নাথ বেচে;
কই আমরাতো আগ্রহ হারাই না।
আমি নুয়ে যাই,
আমার নদী থেমে যায়,
এবং আমার আকাশ চিরে অতিবেগুনী রশ্মিরা হানা দেয়,
গোপন অলিন্দে;
কত লক্ষ মারা গেলে পরে আমরা অনুভব করতাম, এটা একটা যুদ্ধ ছিল। একত্রিশ লাখ, এক কোটি, দু কোটি, সাত কোটি, পুরো জনগোষ্ঠী। একটা সংখ্যা কত বড় হলে সেটা আমাদের চোখে পড়ে, আমাদের আগ্রহ তৈরি করে।
আমি বিস্ময়াহত, আমি স্তব্ধ।
আমার কবরের এপিটাফ বোধ করি,
অনেক বেশী প্রাণোচ্ছল হবে। কারণ সে জানেনা,
সে মৃতের উপরে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

