আমার প্রিয় পোস্ট
- সরকারের ২ বছরের সাফল্যগাথা - আমি মদন
- আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিতি নিয়ে জেনারেল এমএজি ওসমানীর বক্তব্য - অমি রহমান পিয়াল
- পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তান মেনে নেয়নি - অডং চাকমা
- প্রপোগান্ডা, স্টপ জেনোসাইড ও জহির রায়হান - অমি রহমান পিয়াল
- ডেথ অব আ জিনিয়াস : জহির রায়হান - অমি রহমান পিয়াল
- বঙ্গ নাম, অতঃপর লাবড়া ইতিহাস - সজল শর্মা
- ছবি ব্লগ: ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপে তোলা অসাধারন কিছু ছবি! - শোভন এক্স
- প্রিয় উত্তরবঙ্গ
- দীপান্বিতা
মুজিব হত্যা- ফিরে দেখা শোক ও উল্লাস!
২৮ শে জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:৪৭
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট ভোরবেলায় বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই একটি কর্কশ কন্ঠ ইথারে ভেসে এলো, " আমি মেজর ডালিম বলছি, স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে"। অপ্রত্যাশিত সেই ঘোষনা তখন কাউকে তীব্র বেদনায় স্তব্ধ করে দিয়েছে, কেউ কেউ এক ধরনের আনন্দের জোয়ারেও ভেসেছে, কিন্তু তাৎক্ষনিকভাবে সবাই বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে ভেবেছে সত্যিই কি এটা ঘটেছে? এও কি সম্ভব?
মুজিব হত্যার সাথে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার একটা ওতপ্রত সম্পর্ক আছে। ১৯৬৬ এর আগে মুজিব ছিলেন পূর্ব বাংলার অনেক নেতার মধ্যে বিশিষ্ট একজন। সাহসী, দিলদরাজ, গণমূখী, স্পষ্টভাষী, কিছুটা খেয়ালি, অত্যন্ত দক্ষ সংগঠক একজন নেতা। তিনি ছিলেন মূলতঃ সোহরাওয়ার্দীর অনুগত একজন রাজনীতিক, কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর প্রবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধী শেরে বাংলা এবং ভাসানীর সাথেও তাঁর ছিল অকৃত্রিম সুসম্পর্ক।
১৯৬৬ সালে মুজিব লাহোরে গিয়ে যখন ৬ দফা ঘোষনা করলেন, সঙ্গত কারনেই সর্ব মহলে তা ব্যাপক আলোরন সৃষ্টি করলো। পাকিস্তানের সামরিক শাসক গোষ্ঠী আর কায়েমী স্বার্থলোভী গোষ্ঠী কিন্তু ৬ দফার মধ্যে তাদের এতদিনের লালিত স্বার্থের বিনাশ দেখতে পেয়েছিল ঠিকই। অনতিবিলম্বে তিনি গ্রেপ্তার হলেন, তবে কোর্টের নির্দেশে ছাড়া পেয়ে সারা বাংলায় ৬ দফার সমর্থন আদায়ে ব্যাপক সফর শুরু করলেন। আবার গ্রেপ্তার হলেন, আবার ছাড়া পেলেন, জেলগেট থেকেই আবার গ্রেপ্তার হলেন। এই উপর্যুপরি গ্রেপ্তার আর ছাড়া পাওয়া ক্রমাগতভাবে চলতেই থাকলো। পাশাপাশি তিনি তরুন ছাত্রনেতাদের দিয়ে স্বাধীনতার জন্য বিশেষ একটি গোপনীয় পরিষদ গড়ে তোলেন, যাদের কাজ ছিল ৬ দফা বাস্তবায়নের বিকল্প হিসেবে স্বাধীনতার জন্য গোপনে কাজ করে যাওয়া। "স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ" নামের এই পরিষদের ব্যানারে সিরাজুল আলম খান, শেখ মনি, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, রব-সিরাজ-সিদ্দিকি-মাখন, প্রমূখ একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যেতে থাকেন, যে কারনে ২৫শে মার্চের অনেক আগেই ছাত্র এবং দেশের অগ্রসর চিন্তাচেতনার মানুষের মনে স্বাধীনতার একটা আপাত অস্পষ্ট ছবি অঙ্কিত হয়েছিল।
অবশেষে আগড়তলা ষঢ়যন্ত্র মামলা নামক রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় প্রধান আসামী করে স্পেশাল ট্রাইবুনালের মাধ্যমে ক্যানটনমেন্টের মধ্যে তাঁর বিচারের উদ্যোগ নেয়া হলো। ততদিনে সারা বাংলায় শেখ মজিবর রহমানের পক্ষে বিপুল জনমত তৈরি হয়ে গিয়েছে। উপরে বর্নিত নেতারা ছাত্র, শ্রমিক এবং জনতার মাধ্যমে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন, শেখ মুজিব মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হন, প্রবল পরাক্রমশালী আইয়ুব শাহীর পতন ঘটে, দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত ঘাতক ইয়াহিয়া খান। নতুন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সারা পাকিস্তানে সাধারন নির্বাচনের ঘোষনা প্রদান করে। ১৯৭০ সালের সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব-পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জিতে সারা পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিনত হয়। তখন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর মাথায় সত্যি সত্যি আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। তারা ভেবেছিল আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে ৭০-৮০ টি আসন লাভ করতে পারে যা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট হবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের অভাবিত বিজয়ে তারা হতচকিত হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় অপারেশন ক্র্যাক ডাউনের ষঢ়যন্ত্র। তারা ভেবেছিল সেনাবাহিনীর ব্যাপক দমন কার্যক্রমের দ্বারা অচিরেই সব কিছু ঠান্ডা করে দেয়া সম্ভব হবে।
মুজিব সে সময় কি ভাবছিলেন? স্পষ্টতই তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যেই তখনকার মতো সমাধান চেয়েছিলেন। সরকার গঠন করে ৬ দফার আলোকে শাসনতন্ত্র প্রনয়নের প্রস্ততি নিচ্ছিলেন, কারন জনগন তাঁকে সেই ম্যান্ডেটই দিয়েছিল। পাশাপাশি স্বাধীনতা পরিষদ স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্যও প্রস্ততি নিচ্ছিল, সেনাবাহিনীর বাঙ্গালী সদস্য এবং অন্যান্য বাঙ্গালী সসস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে স্বাধীনতার স্বপক্ষে নানা কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন তেমন অবস্থাই নির্দেশ করে। ২৫শে মার্চ সন্ধ্যার মধ্যে মুজিব নিশ্চিত হয়ে গেলেন, আওয়ামী লিগকে ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে না, আর্মী ডেপলয়মেন্ট হতে যাচ্ছে। সে অবস্থায় করনীয় সম্পর্কে শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথে আগেই কথাবার্তা চুরান্ত ছিল। আর্মী মাঠে নামার সাথে সাথে স্বাধীনতার ঘোষনা ই.পি.আর. হেড কোয়ার্টারে পৌঁছে দিয়ে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত, সবচেয়ে বিপদজনক গ্রেপ্তারটির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। সকল নেতৃবৃন্দ নিরাপদে ঢাকা ত্যাগ করে পাড়ি জমালেন সীমান্তের দিকে। মুজিব নিজে কেন গেলেন না? হয়তো তিনি নিজে ভারতের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধের সূচনা করতে চান নি, যা তাঁকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ভারতের সাথে বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলার সময় তুলনামূলকভাবে ভারতের প্রতি কম দায়বদ্ধ করেছিল।
স্বাধীন হওয়ার পরে যে দেশের তিনি প্রধান হলেন, তার অবস্থাটা একটু ভেবে দেখা দরকার। অতি দরিদ্র একটি দেশ, দেশের যা খাদ্য উৎপাদন- তা দিয়ে সারা দেশের মানুষ সাত আট মাসও পেট পুরে খেতে পায় না। দেশের মুদ্রা ব্যাবস্থা বলে কিছু নাই, আছে কেবলমাত্র পাকিস্তানী কিছু কাগজের নোট। এমনিতেই অতি অনুন্নত যোগাযোগ ব্যাবস্থা, তার উপর সেই যোগাযোগ ব্যাবস্থাও যুদ্ধের কারনে ধংসপ্রাপ্ত। দেশের প্রতিটি পরিবারের ঘর বাড়ী, ব্যাবসা বানিজ্য লেখাপড়া সব কিছু লন্ডভন্ড। ঘরে ঘরে মৃত্যুজনিত কান্নার হাহাকার। বহু মানুষের কাছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।
বঙ্গবন্ধু মুক্ত স্বদেশে তাঁর কান্নাবিজরিত প্রথম ভাষনে জনগনকে বলেছিলেন তিন বছর আমি আপনাদের কিছুই দিতে পারবো না। উপস্থিত জনতা সমস্বরে তাতে সম্মতিও দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শুরু করে দিলেন পুনর্গঠন এবং দেশ গঠন।
প্রথমেই প্রশাসন পুনর্গঠন- প্রশাসনে যোগ্য লোকের বড়ই অভাব, কারন পাকিস্তান আমলে সরকারী চাকুরির ৭৫% শতাংশ ছিল পশ্চিম পাকিস্থানী/অবাঙ্গালীদের দখলে। যা পাওয়া গেল তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অধিনে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম থেকেই শুরু হয়ে গেল মনস্তাত্বিক দ্বন্ধ, ফলাফল অদক্ষ গতিহীন প্রশাসন। এ ধরনের স্থবির প্রশাসনের পক্ষে ধংসপ্রাপ্ত একটি দেশের পুনঃগঠন অসম্ভব, যতটুকু হলো তা আশার মহাসাগরে এক পেয়ালা পানির মতো। দায়ভার সরকারের, তথা মুজিবের।
সামরিক বাহিনী পুনর্গঠন- বাংলাদেশের সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের ফসল, এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই। কিন্তু যুদ্ধে যে সকল বাঙ্গালী সৈনিক যোগদান করেছিলেন, তারা কিন্তু একসময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীরই একটি অংশ ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধানতম থীম হলো "ইন্ডিয়া মুসলমান এবং পাকিস্তানকে ধংস করার জন্য সদা সক্রিয়", সুতরাং ইন্ডিয়ার সাথে যুদ্ধ তথা জেহাদ করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে রিক্রুটমেন্টের পর তাদের ট্রেনিংএর পুরো বিষয়টি ভারতকে টার্গেট করে করা। এছাড়া রাজনীতিবিদ এবং জনগন সম্পর্কেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মনোভাব ইতরসদৃস্য। এ মনোভাব কম বেশী বাঙ্গালী সেনাদের মধ্যেও ছিল। মুক্তিযুদ্ধে যারা যোগদান করেছিলেন, তাঁদের অনেকে যেমন স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, অনেকে যোগ দিয়েছিলেন বাধ্য হয়ে- পাক সৈনদের হাতে জীবন হারানোর আশঙ্কা থেকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের সাথে যুক্ত হলো পাকিস্তান ফেরত বাঙ্গালী সেনা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় রিক্রুটকৃত কিছু সেনা। এই ত্রিমুখী ধারার সেনাদলে মনোভাব, স্বার্থ এবং আচরনের ক্ষেত্রে বিভিন্নমূখী স্রোত বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রথম থেকেই বিদ্যমান ছিল। তার সাথে যুক্ত হয়েছিল পদ, পদোন্নতি ইত্যাদি জটিলতা।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধীনায়ক ওসমানী যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই জিয়াউর রহমানকে নিস্ক্রিয় করে রেখেছিলেন, স্বাধীনতার পরে জিয়াকে তিনি অবসরেই পাঠিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এরকম টানাপোড়েন অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কিছুটা সিনিয়র হওয়া সত্বেও জিয়াকে আর্মী চীফ না করে শফিউল্লাকে করলেন, ফলতঃ জিয়া এবং ওসমানী দুজনই বঙ্গবন্ধুর উপরে অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হলেন। পদোন্নতি, খেতাব ইত্যাদি ব্যাপারে এরকম আরও বহু অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল।
পাকিস্তান আমলে রাজার হালে জীবন কাটানো সেনারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৈন্যতায় যেন স্বর্গ থেকে মর্তে পতিত হয়েছিলেন। তার উপর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় এবং যুদ্ধের আশংকা দূর হয়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয়তা তথা গুরুত্ব অনেক কমে যায়, যা সমগ্র সেনাবাহিনীকে হতাশ করে তুলেছিল। সেনাবাহিনীতে ভারত বিরোধীতা নিয়ে নতুন করে কাজ শুরু করে দেয় দেশী বিদেশী চক্র। ক্ষেত্র প্রস্ততই ছিল, তাতে নতুন করে ইন্ধন যোগানোর ফলে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে ভারত বিরোধী মনোভাব পোষন না করলে সে যেন সমগ্র সেনাবাহিনীর শত্রু হিসেবে পরিগনিত হয়ে যাচ্ছিল। আর ভারতের সাথে সঙ্গত কারনেই সদ্ভাব বজায় রক্ষাকারী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও একইরকম মনোভাব তৈরি করা হচ্ছিল। প্যারামিলিশিয়া রক্ষী বাহিনী সম্পর্কেও সেনাবাহিনীতে শুরু থেকেই অপপ্রচার এবং বিদ্বেষ ছড়ানো হতে থাকে। বলা হতে থাকে সেনাবাহিনীকে নির্মূল করার লক্ষে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য ছদ্মবেশে ঢুকানো হয়েছে, তাদের রাজার হালে রাখা হয়েছে ইত্যাদি। অনেকেই বুঝতে পারছিল সরকার এবং আর্মী যেন দুট পক্ষ হিসেব দাঁড়িয়ে গেছে।
পুলিশ পুনর্গঠন- মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক পুলিশ সদস্য যুদ্ধে যোগদান করলেও পুলিশের অধিকাংশ সদস্য, বিশেষতঃ মফস্বলের থানাগুলোতে পাকিস্তান সরকারের অধীনেই কর্মরত ছিল। স্বভাবতঃই স্বাধীনতার পরে তাদের নৈতিক মনোবল ছিল শূন্যের কোঠায়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় তারা কোন ভূমিকাই রাখতে পারছিল না।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠন- পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড যেহেতু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো, তাই ব্যাংক, বীমা, অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প কারখানা, ব্যাবসা বানিজ্য প্রভৃতির মূল কেন্দ্রসমূহের কোন কিছুই বাংলাদেশে ছিল না। কিন্তু যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ সকল দায় ঠিকই বজায় ছিল। অর্থাৎ ঢাকায় কেউ একজন ন্যাশনাল ব্যাংকে ১ লক্ষ টাকা রেখেছিল, যুদ্ধের পর সেই টাকাটা সেই ব্যাংকে ছিল না, কিন্তু তার দায় ঠিকই ছিল সেই ব্যাংকের তথা সরকারের। ব্যাংক এবং বীমার এরকম সমুদয় দায় মাথায় নিয়ে সর্বাংশে ধংসপ্রাপ্ত একটি দেশের অর্থনীতি কিভাবে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারলো তা একটি অবাক হওয়ার মত ব্যাপারই বটে।
অচিরেই এসব কিছুর প্রভাব মানুষের মনে পড়তে লাগলো। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বাঙ্গালীর অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত হবে, শুধুমাত্র এই আশায় যারা ভোট দিয়েছিল, তাদের হতাশার মাত্রা ছিল ব্যাপক। কারন- পাকিস্তানের বিলুপ্তি তারা চায় নি, চেয়েছিল উন্নততর পাকিস্তান, কিন্তু সেই পাকিস্তানেরই বিলুপ্তি ঘটেছে। অগ্রসর চিন্তা ভাবনার মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে এখনও কম, তখন আরও কম ছিল। সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল বারো আনা সের দরের চিনি ছয় আনা সের দরে, দশ আনা দিস্তা কাগজ চার আনা দিস্তা দরে পাওয়ার মতো অর্থনৈতিক প্রতিস্রুতিতে বিশ্বাস স্থাপন করে। সে সব তো হলোই না, উপরন্তু যুদ্ধে সহায় সম্বল জীবন মান সব গেল। এখন আবার ধনে প্রানে মরবার যোগার, আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়ার কারনেই এসব হয়েছে।
এর সংগে যুক্ত হচ্ছিল সরকার এবং মুজিব বিরোধী নানা কার্যক্রম, যেমন-
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই কট্টর চীনপন্থী কিছু দল চীনের রাজনৈতিক মনোভাবের সাথে সঙ্গতি রেখে সসস্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা শুরু করে। সেই সব দলের কেউ কেউ স্বতন্ত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেও স্বাধীনতার পর সবাই সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সসস্ত্র অবস্থান গ্রহন করে। দেশের মানুষ তাদের ব্যাপারে জানতো খুব কম, জনগনের উপরে তাদের প্রভাব ছিল আরো কম, কিনতু তারা ছিল সসস্ত্র্র। তখনকার নাজুক পুলিশ বাহিনীর পক্ষে তাদের মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তারা সারা দেশে বেশ কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ (সংসদ সদস্য সহ), বহু সংখক স্বচ্ছল কৃষক, ধনী ব্যাবসায়ী, সরকারী কর্মকর্তা, আনসার পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের যেমন হত্যা করে, প্রতিনিয়ত ব্যাংক এবং মানুষের বাসা বাড়ীতে ডাকাতি করে সরকারের উপর মানুষের মন বিষিয়ে তুলছিল। ডাকাতি করার সময় প্রায়সঃই তারা এমন কৌশল অবলম্বন করতো, যাতে করে ভুক্তভোগীদের মনে এমন ধারনা সৃষ্টি হয় যে তারা আওয়ামী লিগের লোকজন।
সরাসরি স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতাকারী ইসলামী দলসমূহের লোকজন, যারা অভিযোগ এড়াতে পেরেছিল, ওয়াজ নসিহত তাবলিগ ইত্যাদি ধরনের কাজে নিয়োজিত হয়, কিন্তু মূলতঃ সরকারবিরোধী প্রচারে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
ছাত্রলীগের নেতৃত্বের কোন্দলের ধারাবাহিকায় গঠিত হয় জাসদ, ফলে ছাত্রলীগের সমাজতন্ত্রী ভাবধারার ছাত্রগন আওয়ামী লীগের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে জাসদে অংগীভূত হয়, যা ছিল আওয়ামী লীগ এবং দেশের জন্য সুদূরপ্রসারী এক ক্ষতির কারন। জাসদের নেতৃত্বের যারা পুরোধা, সেই সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম. আব্দুর রব, সাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, মির্জা সুলতান রাজা, মেজর জলিল, কাজী আরিফ প্রমূখ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ছাত্রলীগের সবচেয়ে মেধাবী এবং সক্রিয় সদস্যগন এবং ব্যাপক মুক্তিযোদ্ধাদের(প্রধানতঃ বি.এল.এফ. তথা মুজিব বাহিনী) মধ্যে তাঁদের ছিল প্রচন্ড প্রভাব। জাসদের রাজনৈতিক কৌশল ছিল খুবই বিভ্রান্তিকর। তারা মুজিব সরকারকে রুশ ভারতের দালাল হিসেবে চিন্হিত করে প্রচন্ড হটকারী সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করে। এক পর্যায়ে তারাও চীনপন্থী দলগুলোর পদাঙ্ক অনুসরন করে গনবাহিনী নামে সসস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলে এবং চীনপন্থী সসস্ত্র সংগঠনগুলোর মতই কর্মকান্ড শুরু করে, পাশাপাশি প্রকাশ্যে উগ্র সভা সমাবেশ, মিছিল হরতাল করে দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে তাঁর ন্যাপ এবং অন্যান্য প্রকাশ্য চীনপন্থী দলগুলোও আওয়ামী লীগ এবং মুজিবের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার শুরু করে।
১৯৭৩ সালে আরব ইস্রায়েল যুদ্ধের পর বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বহুগুন বৃদ্ধি পায়, ফলে সকল কমোডিটির মূল্য সারা বিশ্বেই হটাৎ করে বহুগুন বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশের মুষ্টিমেয় কিছু সচ্ছল মানুষ ছাড়া অন্যদের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
১৯৭৪ সালে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি হলে মারাত্মক খাদ্যসংকটের আশংকা দেখা দেয়। সরকার চটজলদি আমেরিকা এবং কানাডা থেকে নগদ মূল্যে খাদ্য কেনার জন্য এল.সি. ওপেন করে। কিন্তু কিউবার সাথে বানিজ্য সম্পর্কের অজুহাতে আমেরিকা খাদ্য সরবরাহে অস্বীকৃতি জানায়, এমনকি বাংলাদেশ অভিমূখী গম বোঝাই জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ভারত তখন ব্যাপক খাদ্য ঘাটতির দেশ, তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব না হওয়ায় দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। হাজার হাজার মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরন করে।
রক্ষীবাহিনী গঠন- দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকারের এই উপলব্ধি হয় যে পুলিশ বাহিনী দিয়ে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয়, সেনাবাহিনীকেও এমন জনঘনিষ্ট অবস্থানে নিয়োগ করা ঠিক নয়। এমতাবস্থায় প্রধানতঃ মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। উল্লেখ্য এ ধরনের বাহিনী ভারতে (সি.আর.পি.), পাকিস্তানে (মিলিশিয়া), অধুনা বাংলাদেশে (RAB) এবং পৃথিবীর বহু দেশে ছিল এবং আছে। রক্ষীবাহিনীর প্রধান কাজ হয় দেশ এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন সসস্ত্র গ্রুপগুলোকে নির্মূল করা। সে কাজ তারা সফলতার সাথেই করতে থাকে, তবে প্রায় ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের ভাগ্যে সরাসরি মৃত্যু জুটতে থাকে। রক্ষীবাহিনীর এ সকল অভিযান অনেক ক্ষেত্রে সাধারন জনগনকেও ভোগান্তির মধ্যে ফেলে এবং জনগন ক্ষুদ্ধ হয়। এ ছাড়া রক্ষীবাহিনীকে তৎকালীন প্রচন্ড সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রনের কাজেও নিয়োগ করা হয়, যেমন পাবলিক পরীক্ষার নকল বন্ধ, ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমন বন্ধ, মাস্তানী নির্মূল ইত্যাদি। এ সকল ক্ষেত্রে রক্ষীবাহিনী যথেষ্ট নির্মমতা প্রদর্শন করে এবং সফলতাও পায়, কিন্তু ভূক্তভোগীদের (সে সময় সংখ্যাটা মাত্রাতিরিক্ত রকমের বেশী ছিল) মধ্যে দারুন ক্ষোভের জন্ম দেয়। রক্ষীবাহিনী রাজনৈতিক কর্মী বিশেষতঃ সর্বহারা পার্টী এবং জাসদের উগ্র কর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত নির্মম মনোভাব প্রদর্শন করে, তাদের অনেক কর্মী (তাদের প্রায় সবাই সসস্ত্র গ্রুপের সদস্য) গুম হয়ে যায় (ক্রসফায়ারের সাবেকি রুপ)। ফলে একেবারে নিরপেক্ষ জনগন তাদের সামগ্রিক কর্মকান্ডে খুশি থাকলেও মোটের উপর রক্ষীবাহিনী ছিল একটি ভীতিকর বাহিনী।
বাকশাল গঠন- ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু যখন দেশে ফিরে এলেন, তখনই কেউ কেউ তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সব দল ভেঙ্গে দিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠনের জন্য। সে কথা আমলে না নিয়ে তিনি সাধারন গনতন্ত্রের পথে গেলেন, যা পরিস্থিতি মোকাবেলার পক্ষে ইতিবাচক হয় নি। ১৯৭৪ এর বিপর্যয়ের পর অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নিবিড় করার উদ্যোগ নেন এবং আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সাথে সাক্ষাৎ করে এ ব্যাপারে তাঁকে অনুরোধ করেন। কিন্তু ফোর্ড এ ব্যাপারে শীতল মনোভাব প্রদর্শন করেন। ফলে বাধ্য হয়ে তিনি আরও বেশী করে সোভিয়েত ব্লকের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং সোভিয়েত পন্থী দলগুলোকে সাথে নিয়ে এক ধরনের জাতীয় সরকার তথা বাকশাল ব্যাবস্থা কায়েম করেন। প্রাথমিকভাবে জাসদও বাকশালে অন্তর্ভূক্ত হবে বলে ঠিক হয়, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজুল আলম খানের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক উভয়ের অশ্রুসিক্ত আবেগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবং সম্ভাবনাটি নস্যাৎ হয়ে যায়। বাকশাল ব্যাবস্থার কয়েক মাসেই দেশের আইন শৃঙ্খলা, প্রশাসন, অর্থনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষন পরিস্কার হয়ে ওঠে, কিন্তু বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রচন্ড হতাশা তৈরি হয়।
এর সাথে যুক্ত হয় সরকারবিরোধী হরেক রকম গোয়েবলসীয় প্রচারনা, যেমনঃ
* বিদেশ থেকে প্রচুর সাহায্য আসছে, কিন্তু আওয়ামী লিগের লোকজন সব খেয়ে ফেলছে।
* রিলিফের সমুদয় সামগ্রী সরকার ভারতে পাচার করে দিচ্ছে।
* আওয়ামী লীগের লোকজন ব্যাংক ডাকাতি করে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে।
* শেখ মুজিবের ছেলে ব্যাংক ডাকাতি করে পালানোর সময় গুলিতে আহত হয়ছে।
*বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধংস করে দেয়ার জন্য রক্ষী বাহিনী সৃষ্টি করা হয়েছে, এ বাহিনীতে প্রচুর ভারতীয়কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
* ভারত বিভাগের সময় যে সকল হিন্দু ঘর বাড়ী ছেড়ে ভারতে চলে গিয়েছিল, তারা অচিরেই ফিরে আসবে এবং জমি জমা, বাড়ী ঘরের দখল নিয়ে নিবে।
আশ্চর্য মনে হলেও সত্য যে এ সকল তথ্য জাসদের মুখপত্র "গণকন্ঠ", ভাসানী ন্যাপ এর মুখপত্র "হক কথা", চীনপন্থীদের মুখপত্র "হলিডে" পত্রিকাতে প্রকাশিত হতে থাকে। এ দেশের কুখ্যাত সি.আই.এ. এজেন্ট ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেনের ইত্তেফাকেরও তখন একই ভূমিকা।
এ সকল কারনে আওয়ামী লীগ তথা মুজিব ১৯৭০ সালে জনপ্রিয়তার যে শিখরে উঠেছিলেন, তাতে ব্যাপক ধ্বস নামে। দেশের বহু মানুষ সকল দুর্গতির জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী বলে ভাবতে থাকে। অনেকে এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছে যায় যে এর চেয়ে পাকিস্তানই ভাল ছিল। কেউ কেউ এমনও ভাবতে থাকে, পাকিস্তান নামক সমৃদ্ধ মুসলিম দেশটি থেকে মুজিব এবং ভারতই আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিল।
এমন প্রেক্ষাপটে মুজিব হত্যার প্লটটি বাস্তবায়িত করা হয়। মুজিবের এমন নির্মম হত্যাকান্ডে সমস্ত আওয়ামী লীগ সাথে সাথে স্থবির হয়ে গিয়েছিল। মোশতাকের কর্মকান্ড দেখে কেউ আর কাউকে বিশ্বাসও করতে পারছিল না। মুজিবের অনুসারীরাই সরকার গঠন করলো, মোশতাক, ঠাকুর, মোয়াজ্জেম প্রমূখ ষঢ়যন্ত্রকারী ছাড়া অন্যরা সেখানে যেন মৃত মানুষ। ক্যু বাস্তবায়নকারী অফিসারেরা সফল অভিযানের পর জিয়ার সাথে দেখা করতে গেল, জিয়া তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বললেন, ইউ হ্যাভ ডান আ গ্রেট জব, কিস মি! কিস মি!! হত্যাকান্ডের ৩ দিন পর আর্মীর টপ লেভেল মিটিং বসলো। সেখানে প্রথমেই গর্জে উঠলেন ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক শাফায়াত জামিল, এই পদাতিক ব্রিগেড তখন ঢাকা অন্চলে দায়িত্বরত ছিল। সেনাবাহিনী প্রধান শফিউল্লাহকে অভিযুক্ত করে তিনি প্রশ্ন করলেন, এটা কি আর্মীর ক্যু? তাহলে আর্মীর কেউ তা জানে না কেন? শফিউল্লাহ মিন মিন করে বললেন না, এটা তা নয়। শাফায়াত জামিল তখন আবার বললেন, দেন ইউ অর্ডার, উই উইল ক্র্যাস দেম উইদিন মিনিটস। শফিউল্লাহ নিরবে অধোবদন হয়ে রইলেন। তিনি কি ভাবছিলেন?- ভার্চুয়ালী আর্মীই এখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় এবং ঘটনাক্রমে আমি সেই আর্মীর চীফ। পড়ে পাওয়া এই সুযোগটি হাতছাড়া করি কেন? না কি স্রেফ প্রানভয়ে তিনি সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন? তখন জিয়া বললেন, তা করা ঠিক হবে না, কারন তাতে করে আর্মীর ভিতরে গোলযোগ দেখা দিতে পারে, আর সেই সুযোগে ইন্ডিয়া মিলিটারী ইনটারভেনশন করতে পারে। মীর শওকত জিয়ার বক্তব্য সমর্থন করলেন। জিয়া বললেন, টু প্রিভেন্ট ফ্রম আ হিউজ ড্যামেজ অব দা কান্ট্রি, উই শুড সাপোর্ট নাউ মোশতাক।
ক্যু যে কোন দিন হতে পারে, এমন আশংকা অনেকেই করেছিলেন। স্বয়ং বঙ্গবন্ধুও এ ব্যাপারে অভিহিত ছিলেন। যারা ক্যু সংঘটিত করেছে, তাদের ব্যাপারেও বঙ্গবন্ধুকে একাধীকবার সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু যে ডালিমকে তিনি পুত্রবৎ স্নেহ করেন, বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে তাঁর শিয়রে বসে যে ডালিম তার পারিবারিক জীবনের সুখ দুঃখের অনুভূতি ভাগাভাগি করে, তার মনের অন্ধকার দিকটি মুজিব খুঁজে দেখার তাগিদ অনুভব করেন নি। তাদের অবিশ্বাস করার নীচুতা বঙ্গবন্ধু দেখাতে পারেন নি।
১৫ই আগষ্ট ভোরে দেশবাসী যখন ডালিমের ঘোষনাটি শুনলেন, তখন যারা ডালিমের ব্যাপারটি জানতেন, তাদের অনেকেরই সিরাজউদ্দৌলার ঘাতক মোহাম্মদী বেগের কথা মনে পড়লো। সাধারন মানুষ বিস্ময়ে, বেদনায়, শোকে পাথর হয়ে গেলেন, অনেকে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, অব্যক্ত বেদনায় তাদের দুচোখে গড়িয়ে পড়লো অশ্রুর ধারা। যে সমস্ত মানুষ তখন মুজিবের অপসারন কামনা করছিলেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র- কেউ কেউ যে ভাবেই হোক, মুজিবের পতন হওয়ায় খুশিই হলেন। কেউ কেউ মুজিব শাসনের অবসান হওয়ায় স্বস্তি পেলেও কিছু মানুষ নামক পিশাচের পৈশাচিকতার এই রুপটি দেখে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন, এ যেন মধ্যযুগের কোন অসভ্য জনগোষ্ঠীর নির্বোধ পাশবিক হত্যালিপ্সা। বিশ্বের বিবেকবান মানুষ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, তোমরা তোমাদের দেশের ফাউন্ডারকে এভাবে হত্যা করলে? এর বাইরে আরও একদল মানুষ আড়মোড়া ভেঙ্গে সোল্লাসে চীৎকার করে উঠলো। হত্যাকান্ড তাদের অতি প্রিয় একটি কাজ, সাড়ে তিন বছর আগে সেই প্রিয় কাজটির ইতি ঘটেছিল, তারপরে এতদিন অন্ধকার গহ্বরে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। এতদিন পর আবার কত প্রিয় কিছু হত্যাকান্ড, নাজাতের আনন্দে তাদের কেউ কেউ দুই রাকাত নফল নামাজও পড়ে ফেললো।
সেদিন ছিল শুক্রবার, পবিত্র দিনটির সেই ভোরে সারাদেশ কবরের স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। সেদিন সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। মানুষ ঘর থেকে বের হয় নি, বের হওয়ার ইচ্ছাও অধিকাংশ মানুষের হয় নি, আর কি হবে বের হয়ে, সব কিছুই তো শেষ হয়ে গেল!
বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
রাজিয়েল বলেছেন:
দুর্দান্ত পোস্ট! সরাসরি প্রিয়তে। শফিউল্লাহ এবং জিয়াউর রহমান, দুজনেরই ১৫ই অগাস্টের ভুমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করার সময় এখন।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ, শফি এবং জিয়ার ব্যাপারে একমত!
কিরামত বলেছেন:
অনক সু্নন্দর লিখেছেন।
কিরামত বলেছেন:
অনক সু্নন্দর লিখেছেন।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ!
সত্য ভাষন বলেছেন:
ভাইজান এটাই হলো সত্যিকারের ইতিহাস। আমি শুনেছি যে ১৫ আগষ্ট সকাল বেলা অনেক রাজাকার পতাকার দিকে তাকিয়েছিলো যে পতাকা পরিবর্তন হয়েছে কি না। ধন্যবাদ আপনাকে সত্য ইতিহাস লেখার জন্য। প্লাস
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ! ঠিকই শুনেছেন, বাংলাদেশ বেতারের বদলে রেডিও বাংলাদেশ (রেডিও পাকিস্তান অনুকরনে) এবং জয় বাংলার বদলে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ (পাকিস্তান জিন্দাবাদ অনুকরনে) ফিরে আসায় কারো কারো মনে এরুপ আশাবাদ জন্ম নিয়েছিল বৈকি।
জাতীয়তাবাদী শুভ বলেছেন:
ইতিহাস যে নিজের মনের মত করে লেখা যায়, আপনি আবার তা প্রমান করলেন। ঘটনা প্রবাহগুলোকে এমন ভাবে রেফারেন্স ছাড়া বর্ণনা করলেন তাতে কিন্তু আপনার পক্ষপাতিত্বের বিস্তর প্রমাণ পাওয়া যায়। আপনি স্বাধীনতা পরবর্তী সেনাবাহিনী/পুলিশবাহিনী সবার বাংলাদেশ বিরোধী মনভাবের কথা বললেন তাতে মনে হচ্ছে আপনি ঐ সময়ের একজন চলমান স্বাক্ষী। আপনার কথা থেকে মনে হলো তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন নিজেদের ইচ্ছায় করেনি। আবার লিখছেন"এর সাথে যুক্ত হয় সরকারবিরোধী হরেক রকম গোয়েবলসীয় প্রচারনা" আপনার কাছে কোনো প্রমাণ আছে যে প্রচারণাগুলো এসেছিল তা পুরোটাই বানোয়াট ছিল? আপনার চেয়ে আরো প্রামান্য তথ্যবহুল বই হলো 'বাংলাদেশ- এ লিগাসি অব ব্লাড', এন্থনি ম্যাখারেনসাস র। পড়ে দেখবেন- কিভাবে বঙ্গবন্ধু র নিজের মানুষ রা নিজেদের সম্পদ গড়ছিল যখন দেশের অনেক মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছিল। ১৯৭৪ র দুর্ভিক্ষের পর উনার দেশের মানুষ ক্ষুধায় মারা যায় আর উনি জাঁকজমক করে ছেলের বিয়ে দেন। যাই হোক তারপর আমি ১৯৭৫ র ১৫ ই আগস্টের মত এইরকম নৃশংস ঘটনার পক্ষে কোনোদিনই নই। তবে আপনার বোঝা উচিত- যে দেশের মানুষ এত চাওয়া পাওয়া হিসেব করে যে ৫ বছর পর পর বিশাল ব্যবধানে সরকার বদল হয়, সেখানে রক্তগরম সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে মুজিব সরকারের পতন ঐ সময় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল বলেই দেশের কোথাও তেমন কোনো প্রতিবাদও হয়নি সেইসময়- এমনকি আরো অনেক বঙ্গবন্ধুর অনুসারী রক্তগরম মুক্তিযোদ্ধা ছিল তারাও কোনো প্রতিবাদ করেনি।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। প্রথমেই বলে নেই, আমি কোন ইতিহাস লিখতে যাই নি, ঘটনার নির্মোহ বর্ননা দিয়েছি মাত্র। ঘটনার সময়ের একজন চাক্ষুষ স্বাক্ষী না হলেও এ ঘটনার অবিকৃত বর্ননা দেয়া সম্ভব, কারন সে সময়ের অনেকেই এখনো জীবিত। এবার আপনার মন্তব্যগুলোর ব্যাপারে আলোকপাত করা যাক-
আপনি যেমন অভিযোগ করেছেন, আমি না কি বলতে চেয়েছি সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যগন নিজেদের ইচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন নি, এমন কথা আপনি কোথায় পেলেন?
আসুন গোয়েবল্সীয় কায়দায় প্রচারনা প্রসংগে। যে ধরনের প্রচারনার উল্লেখ আমি করেছি, পরবর্তীতে বিপরীতমূখী সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্বেও সেরকম কিছু প্রমান করা গেছে কি?
মাসকারেনহাসের বইটি কোন প্রামান্য দলিল নয়, তিনি বেশ কিছু প্রচলিত প্রচারনাকেও তার বইতে কার্যকরন হিসেবে উল্লেখ করেছেন, পরবর্তীতে যা ভুল প্রমানিত হয়েছে। যেমন আওয়ামী লীগের লোকজন সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন- যদি তাই হয়, তাহলে মুজিব সরকারের পতনের পর সে সব সম্পদের হদিস কেউ দিতে পারলো না কেন?
১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষের পর তাঁর ছেলের বিয়েতে তেমন কোন জাঁকজমক হয় নি, তবে পারিবারিক গুরুত্বের কারনে সেটি প্রচার পেয়েছিল অনেক বেশী, আর উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারন উপাচারগুলোই প্রচারনার কারনে ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
১৫ই আগষ্টের ঘটনায় কোন প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ হয় নি উল্লেখ করে তার অপরিহার্যতা প্রমানের চেষ্টা করেছেন। যদি আদপেই তা হতো, জনমনে তার প্রতি সত্যিকার অর্থে কোন সমর্থন যদি থাকতো, তাহলে সুদীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর বলে কয়ে তাদের বিচার করা সম্ভব হতো কি?
এটা সত্য, পৈশাচিক বলদর্পী কিছু উর্দীধারীর বিরুদ্ধাচারন করার সাহস তখন কেউ দেখাতে পারে নি, তাজউদ্দিন আহমেদ সহ যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ঘৃনাভরে তাদের সমর্থন করতে অস্বীকার করেছিলেন, তারা মূলতঃ হাসিমুখে মৃত্যুকেই বরন করে নিয়েছিলেন। অবশ্য কেউ কেউ বরং নতুন করে ভাগ্যান্বেষনে ব্রতি হয়েছিল। কিন্তু বিপথগামী কতিপয় সেনাসদস্যের অমানুষিক নির্মম হঠকারীতার আসলে যে কোন জনভিত্তি ছিল না, সময়ের পরিক্রমায় তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে।
কালীদাস বলেছেন:
আপনি নিশ্চয়ই ম্যাসকারেনহাসের বইটা পড়েছেন অথবা লিফসুলজের।এই সত্যগুলো আওয়ামী লীগ বিএনপি কেউ মানতে চায়না, নিজেদের অনেক গুমর ফাঁস হয়ে যায় বলে। ৭২-৭৫এ আ লীগের নেতাকর্মীরা যা দেখিয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থতার জন্যই প্রাণ দিতে হয় বঙ্গবন্ধুকে। নাহলে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সেনার কি ঠেকা পরেছিল নিজেদের কমান্ডারকে (প্রেসিডেন্টকে) খুন করার?
যদিও ধিক্কার জানাই এই হত্যাকান্ডের, এরা প্রত্যেকেই কিন্তু একদিন জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করতে গিয়েছিল। ফারুক লেবানন থেকে সম্ভবত পালিয়েছিল আর্মী ক্যাম্প থেকে দেশ স্বাধীনের যুদ্ধে আসার জন্য।
আরেকটা কথা বলে যাই আপনার পোস্টে, আজকে অনেক লোক শোকর-গোজার করছে, মিস্টি বিতরণ করছে, হত্যাকান্ডের পর এরা কোথায় ছিল? তাজউদ্দীন আর কাদের সিদ্দিকী ছাড়া কোন বীর আওয়ামী লীগার সেদিন প্রতিবাদ করেনি। শফিউল্লাহর মত অথর্বরা সেদিন চুপ ছিল, আজ আসে কোন মুখে রাজনীতির ময়দানে বক্তব্য রাখতে।
সরাসরি প্রিয়তে রাখলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ পোস্টের জন্য।
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। আপনার উল্লেখিত দুটি বই পড়েছি, পড়েছি এদেশে প্রকাশিত আরও অনেক বই। এর বাইরে সে সময়ের স্বাক্ষী আরও অনেকের সাথে কথা বলেছি, তাদের বর্ননা, মতামত, মূল্যায়ন মনোযোগ সহকারে শুনেছি।
আমার কাছে আপনার মূল্যায়ন কিছুটা ঢালাও বলে মনে হয়েছে। ৭২-৭৫ সালে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যা দেখিয়েছে, একটি সভ্য দেশের মানদন্ডে তা গ্রহনযোগ্য নয়, এটা ঠিক। শুধুমাত্র সে কারনে দেশের স্বাধীনতার প্রানপুরুষকে, তাঁর বাসভবনের সকলকে বর্বর নিষ্ঠুরতায় খুন করতে হবে তা তো গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। সে সময়ের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেমন আচরন করেছে, পরবর্তীতে সাত্তার সরকারের সময় বি.এন.পি.'র নেতাকর্মীরা, পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের নেতাকর্মীরা, তৎপরবর্তীতে গনতান্ত্রিক পরিবেশে বি.এন.পি. নেতা কর্মীরা, পরবর্তীতে আবার আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা, পরে আবার বি.এন.পি., এখন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা কি প্রত্যাশিত আচরন করেছে কিংবা করছে? এখনও আমজনতা চায়ের দোকানে হরহামেশা বিধান দেয়, দেশের সকল রাজনীতিবিদদের ধরে ধরে ফাঁসিতে ঝোলানো দরকার, মাঝে মাঝে কিছু কিছু বাহিনীর অস্ত্রধারী লোকেরও তাই মনে হয়। কিন্তু সেটা কি আসলেই কোন বাস্তব সমাধান? আমাদের পার্শ্ববর্তী ভারত দীর্ঘদিনের গনতান্ত্রিক দেশ. সেখানেও কোন কোন রাজ্যে গনতান্ত্রিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের আচরনের বিধানও তো তাহলে হওয়ার কথা নির্বিচার হত্যা?
ফারুক, ডালিম, পাশা প্রমূখরা যুদ্ধকালীন সময়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক দল যে নীতি এবং আদর্শ সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছিল, সে নীতি এবং আদর্শ তাদের মনপুতঃ ছিল না। ফারুক-রশিদ প্রনীত "মুক্তির পথ" এবং ডালিম প্রনীত "যা দেখেছি, যা শুনেছি, যা বলেছি" বইগুলি পড়লে সে কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে। সে কারনেই তাদের পক্ষে প্রতিবিপ্লবী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়া খুবই সম্ভব, বিশেষতঃ ফারুক-রশিদের "মুক্তির পথ" বইটিতে সেরকমই ইংগিত আছে। অনেকেই এমন মত পোষন করেন যে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত হয়ে ওঠার প্রেক্ষতেই তারা একটি উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল।
আজকে যারা শোকর গোজার করছে, মিষ্টি বিতরন করছে, তারা সেদিনও এ দেশেই ছিল। ঘাতক বাহিনী একটি ক্লীয়ার সিগন্যাল দিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছিল, তা হলো নির্মমতা এবং বিবেকহীনতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটাতে তারা বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হবে না। আর শাসকদলের অধিকাংশ নেতাকে কুক্ষিগত কিংবা বন্দী করে ফেলতে সমর্থ হওয়ায় সাধারন এসব নেতাকর্মী নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সর্বোপরি মুজিব এবং তাঁর পরিবারের নির্মম হত্যাকান্ড তাঁর প্রতি বিরুপ এবং সহানুভূতিশীল সকলকে হতবাক করে দিয়েছিল।
মাত্রাগত দিক থেকে অনেক কম হলেও এ দেশেই সেরকম আরও দুটি উদাহরন বিদ্যমান- ১৯৮২ সালে এরশাদ যখন সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বি.এন.পি. সরকারকে গলাধক্কা দিয়ে বিদায় করে দিয়েছিল, তখন কেউ টু শব্দটি উচ্চারনও করে নি, এমন তো নয় যে এরশাদের কার্যকলাপের বিরোধী কেউ ছিল না। এর আগে জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হলো, চট্টগ্রামের কোন বি.এন.পি. নেতা-কর্মীর তখন টিকিটিও দেখা গেল না, এমন তো নয় যে চট্টগ্রামে জিয়ার প্রতি অনুরক্ত তখন কেউ ই ছিল না। ঠিক এরকম কারনেই, এর চেয়ে অনেক ভয়াবহ বাস্তবতায় সেদিন মুজিব ভক্ত অগনিত মানুষ নিরবে নিভৃতে চোখের জলই শুধু ফেলেছে, আর প্রতীক্ষায় থেকেছে ২০১০ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাতের জন্য।
নিঃসঙ্গ পথিক.. বলেছেন:
নিজের মতো করে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তাকে ইতিহাস বলা যায়না নিশ্চয়?.. আপনার লেখার হাত ভালো, তবে বর্ণনাটি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেল না?৭৫ সাল পযর্ন্ত শেখ মুজিব নানা সমস্যার কারণে কিছু করতে পারলেননা, অথচ এর পরের ৪-৫ বছরের মধ্যেই কিন্তু দেশের চিত্র অনেকটাই পাল্টে গিয়েছিল-- আর সেজন্যই আগের দুরাবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার দায় নিশ্চয় শেখ মুজিবকেই নিতে হবে?
লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ পথিক সাহেব। পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে গেল? আমার তা মনে হয় না। আপনি শুধু একটি অসংগতির কথা এখানে বলেছেন, আমি সে পরিপ্রক্ষিতেই বলছি-
৭৫ সাল পর্যন্ত মুজিব কিছুই করতে পারেন নি? ঠিক বলছেন তো? হ্যাঁ ৭০ সালের নির্বাচনের সময় জনগনের যে প্রত্যাশা ছিল, সে প্রত্যাশা পূরন করা তো দূরের কথা, উল্টো নানা দুর্বিপাকে জড়িয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষের জীবন, কিন্তু তার জন্য কি মুজিব দায়ী ছিলেন? না কি ঘটে যাওয়া বাস্তবতার কারনেই সেরকম হয়েছিল? ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, ১৭ই ডিসেম্বরে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থীতি ছিল শূন্য, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংকে (তখনকার ষ্টেঠ ব্যাংক) তখন একটি টাকাও ছিল না, অন্যান্য ব্যাংকের সমুদয় টাকা লোপাট হয়ে গেছে, একমাত্র সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম ব্যাবহার অনুপযোগী, রাস্তাঘাট তখন এমনিতেই কম ছিল- যা ছিল তাও ধংশপ্রাপ্ত, যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম রেল ব্যাবস্থাও অনেকাংশে ধংসপ্রাপ্ত। ভৈরব, পাকসী, তিস্তা সহ প্রধান অপ্রধান বহু রেল সেতু পাক সেনারা ধংস করে দিয়েছে, সরকারী অফিস চালাবার মত যোগ্য অফিসার নেই, বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় কোন পন্য নেই, বহু মানুষের হাতে অবৈধ অস্ত্র।
মিত্র দেশ ভারত তখন দরিদ্র দেশ, ধনী রাষ্ট্র আমেরিকার সরকার বৈরী, চীন সৌদি আরব চরম বৈরী, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মুজিব ছাড়া আর কারো পক্ষে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব হতো, এ কথা বিশ্বাস করার মত কোন কারন খুঁজে পাচ্ছি না।
১৯৭৫ সালের আগষ্টে যখন মুজিব সরকারের পতন হয়, তখন পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে, বিদ্ধস্ত দেশ তখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মুজিব পরবর্তী জিয়া সরকারের সময় তিন গুরুত্বপূর্ন দেশ আমেরিকা, চীন সৌদি আরব এবং বিশ্বব্যাংকের বদান্যতায় দেশে প্রথমবারের মত পর্যাপ্ত অর্থ প্রবাহের দ্বার খুলে যায়, ঋনের টাকায় দেশে বড় বড় প্রকল্প গৃহীত হয়, আপাতদৃষ্টিতে উন্নয়নের এক নতুন মাত্রা যোগ হয়।
ইসটুপিড বলেছেন:
ভাল পোস্ট।
দাসত্ব বলেছেন:
শেখ মুজিবের পতন প্রয়োজন ছিলো । তবে আমি জানিনা ঐ নির্মম হত্যাকান্ডের বিকল্প কি ছিলো ?নিজেই স্বীকার করেছেন রক্ষীবাহিনীর নির্মমতা ছিলো ।
তবে আপনি শেখ মুজিব ভক্ত , নির্মোহ নন।
শেখ কামাল সম্পর্কে সাফাই গাইবেননা প্লীজ।
জিয়ার যেই কাজ গুলো নিয়ে আওয়ামি লীগ সমালোচনা করে সেগুলো ১৯৭৫ বাস্তবতায় শেখ মুজিব কেও করতে হত।
ফারুক , রশিদের একটা কথা আমি মানি:
শেখ মুজিব দেশ শাসনের কিছুই জানতোনা।
আবরার হোসেন বলেছেন:
আপনার লেখায় কিছু একতরফা ভাব প্রকাশ পেয়েছে। তার মানে আমি লেখাটাকে খারাপ বলছি না। কিছু অভিযোগ ভিত্তিহীন মনে হয়েছে, যেমন ইত্তেফাকের বিরুদ্ধে অভিযোগটা। বঙ্গবন্ধুরও অই সময় বেশ অনেক কিছুই ভুল ছিল। যেটা আপনি মনে হয় স্বীকার করতে চাননি। তবে তার হত্যাকান্ড অবশ্যি ঘৃনীত।এখানে একটা লিংক দিলাম পড়ে দেখবেন।
কি-আইডি-দেব-সব-দখল-হয়ে-গেছে বলেছেন:
পক্ষপাতদুষ্ট লেখা। গুছিয়ে তথ্যসূত্রবিহীন মিথ্যে লিখবার জন্যে লেখার হাত দরকার। আপনার লেখার হাত ভালো। দেশের কল্যাণে লিখুন, অন্তত নিজের কাছে সৎ থাকবেন। মুজিবের হত্যাকারীদের ঘৃণা করি... কিন্তু তার চাইতেও ঘৃণা করি সেই দলটিকে যারা মুজিবের নাম ভাঙিয়ে দল চালায় আর ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র ও জনগণকে জিম্মি করে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনার এ লেখাকে স্রেফ চাটুকারিতা ও পদলেহনের সৃজনশীল প্রয়াস হিসেবে দেখছি। ধন্যবাদ।
যুক্তিপ্রাজ্ঞ বলেছেন:
আবরার হোসেনের লিন্কটা ধরে আহমদ ছফার 'মুজিবের শাসন: একজন লেখকের অনুভব' পড়ে এসে পোস্টটা রিরাইট করুন. না হলে এমন একচোখা পোস্ট দিয়ে নির্মোহ দাবি করাটা কতটা হাস্যকর, সেই বোধটুকু কখনও হবে না... অবশ্য যদি থোরাই কেয়ার করেন...
বিদ্রোহী কান্ডারী বলেছেন:
মাঝ রাতে একি শোনালেন? আর্মিরা রাজার হালে থাকতো! জিয়া আর ওসমানীর গন্ডগোল! ভালো। তবে চাপাবাজীটা তেমন ভালো হয় নাই। পুরো একপেশে। ভাই শোনেন একটা কথা, ইতিহাসে ফেরাউনেরা সবসময়ই পতন হয়েছে লজ্জাজনক ভাবে যেভাবে আজকে হোসনি মূবারকরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ব্যপারটাও অনেকটা ওইরকম। হাসিনা বলেন আর খালেদা বলে একটানা ১০বছর থাকতে দেন দেখবেন তাদেরও পরিনতি একই রকম হবে। মাত্র ৫ বছর করে থাকে তো তাই বুঝতে পারে না। মানুষের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন সেই মানুষের চেয়ে ভয়ঙ্গকর আর কেউ হতে পারেনা। আমাদের রাজনীতিবিদেরা ক্ষমতার লোভে আর মোহে মাঝে মাঝে এই সত্যটাভুলে যায়।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...















