সহজ, আদিম ও জনপ্রিয় যোগাযোগের মাধ্যম হল ডাক বিভাগ । কিন্তু এ কথাটি এখন আর পুরোপুরি প্রযোজ্য নয় । ভাব বিনিময় এবং যোগাযোগের অনেক সহজতর মাধ্যম যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে । তারপরও এখনও অনেক ক্ষেত্রে ডাকবিভাগের সহায়তা নিতে হয় । অবশ্য সেটা লেনদেন ভিত্তিক বা গ্রহণ-প্রেরনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ।
ডাক বিভাগ হল পূর্ণ সরকারি বিভাগ । আজকের দিনে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা সরকারি ক্ষেত্রে পরিবেশ বলতে যা বুঝি ঠিক তেমন চিত্রই ফুটে ওঠে ডাকবিভাগেও ।
আজকের এই লেখায় আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ডাকবিভাগের একদিনের চিত্রের মধ্য দিয়ে প্রতিদিনের প্রতিটি সরকারি বিভাগের স্থিরচিত্র ফুটে উঠবে ।
কয়েকদিন আগে বিশেষ প্রয়োজনে আমি আর আমার ছোট বোন টাঙ্গাইল প্রধান ডাকঘরে গিয়েছিলাম । যথারীতি সকাল নয়টায় খোলা হয় । আমরা ঠিক নয়টায় ডাকঘরের গেইটে গিয়ে পৌঁছাই । দেখলাম দো’তলার কলাপ্টেবল গেইট খোলা হল । আমার বোন দৌঁড়ে ওঠে যায় সিড়ি দিয়ে আগে-ভাগে সিরিয়াল পাবার আশায় । কিন্তু বিধীবাম ! দৌড়ে পৌছুতে না পৌছুতেই দশ-বার জনের পেছনে পড়ে যাই আমরা...! বেচারির দৌড়িয়ে কোন লাভ হল না । কারণ ডাকঘরের এই নিয়মিত দুর্ভোগ কেউই সহ্য করতে চায় না বলেই ৯ টার আগে যাবার চিন্তা সবার মাথায়-ই থাকে ।
তারপর হেলেদুলে অফিস কর্মচারীরা নির্ধারিত স্থানে বসলেন ৯টার অনেক পরে । ততোক্ষণে জমা পরা কাগজগুলো (পাশ/চেক) নিয়ে সিল-স্বাক্ষর দিতে শুরু করেন তারা । আর আমরা তীর্থের কাকের মত চেয়ে থাকি প্রতিটি গ্রাহক । এখানে একই সাথে দু’জনের কাজ করতে হয় একজনকে অর্থাৎ যে কাগজ জমা নেয় সেই টাকা প্রদান করে যার ফলে বাড়তে থাকে ভীড় । এথেকে দেখা যায় সরকারি অফিসে প্রয়োজনীয় লোক নিয়োগ দেয়ার অবহেলা ।
যারা সকাল ৯ টায় এসে কাগজ জমা দিল আর যারা ১০ টায় এসে জমা দিল , এক্ষেত্রে কি কোন পার্থক্য থাকা উচিত ? আমি আমার সমস্ত কাজ ফেলে সকাল ৯ টায় গেলাম তার অর্থকি এটাই দাড়ায় না যে, আমি টাকাটা আগে পাওয়ার অধিকারী ? কিন্তু না...এরকম ঘটেনি বা ঘটেও না । কর্তব্যের অবহেলার কারণে সব কাগজ এলোমেলো করা হয় । তারপর এভাবে অপেক্ষার পর অপেক্ষা...। তবে কেউ কেউ পূর্ব পরিচিতির সুযোগটাও অনায়াসে পেয়ে যায় । অতএব ভোর বেলা এসে প্রথম সিরিয়াল পেলেও কোন লাভ হয় না...। অপেক্ষা করে করে বেলা গড়িয়ে দুপুর হয়ে যায় । তারপর দুপুরের বিরতি মানে আর একদিন আসতে হবে । এটা খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা । এভাবে মানুষকে প্রচুর দুর্ভোগ পোহাতে হয় ।
সেদিন যখন সিল-স্বাক্ষর দেয়া শুরু হল তখন দেখলাম একের পর এক কাগজ জমা পরছে কিন্তু যাদেরগুলো হয়ে গিয়েছে তাদেরকে টাকা প্রদান করা হচ্ছে না । যদি প্রথমে জমা পরা বই এর টাকাগুলো প্রদান শুরু হত তাহলে এভাবে ভীড়ও বাড়ত না আবার আমাদের ও তাদের মূল্যবান সময় অনেকটাই বেচে যেত ! তার ফলে যে যখন আসত সে তখনই টাকাটা পেয়ে যেত । কিন্তু এমন সুফল ভোগ আমাদের হয়না । এসব তাদের অনিয়ম ছাড়া আর কিছুই লক্ষিত হয়না । হ্যাঁ তাদের নিয়ম আছে , যেখানে মানুষকে দুর্ভোগের শিকার হতে হয় বা মানুষ যেখানে অপকৃত হয় সেখানে । এখানে যার নামে পাশ বই তাকে ডাকা হয় এবং তার চেহারাখানি দেখে টাকাটা দেয়া হয় । যদি কেউ উপস্থিত না থেকে অন্য কেউ থাকে তবে তাকে দেয়া হচ্ছে না । তাকেই আসতে হবে । অথচ চেক এ স্বক্ষর দেয়া আছে এবং প্রতিটি ‘ইনস্টলমেন্ট’ টাকা নির্দিষ্ট করা আছে । ওই দিন বিশেষ কারণ বশত আমার মা উপস্থিত হতে পারেন নি । স্বভাবতই আম্মুর নাম ডাকলে আমি তার না আসার কারণ বর্ণনা করলাম । কিন্তু টাকাটা দেয়া হল না । অন্যদিন আসতে হবে আমি সেটা মেনে নিলাম । আমার বোন কে বললাম ‘ শত অনিয়মের ভীড়ে তবুওতো একটা নিয়ম হয়েছে...আমি এতেই খুশি ।’
অথচ কিছুক্ষণ পর দেখলাম একটি ছেলে আমাকে টাকা প্রদান করা হল না বলে সেখানে উপস্থিত অন্য একজন মহিলাকে ‘মা’ রেসপন্স করতে অনুরোধ করল এবং টাকাটাও পেয়ে গেল । আমি যদি এরকম একটা কাজ করতাম তাহলে লোকটার বোঝার সাধ্য ছিল না । ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শি হয়েও কিছু বললাম না তার কারণ আমি দেখতে চাইছিলাম প্রকৃত অর্থে ঘটনাটা কি ঘটছে । তখন বুঝলাম ছবি মিলিয়ে দেখা হয় না যে, সঠিক লোককেই টাকা দেয়া হচ্ছে কিনা । কারণ সে নিশ্চই একজনের পেছনে এতটা সময় ব্যয় করবে না । এখানে আমার প্রশ্ন হচ্ছে , যেখানে স্বাক্ষর এর লিগ্যালিটি পরীক্ষা করা হয় সেখানে কেন চেহারা দেখেই টাকা প্রদান করা হবে ? তাই যদি না হবে তাহলে ওই মহিলা একই সাথে ছেলেটির মা সেজে এবং পরে নিজের টাকা গ্রহণ করল কিভাবে...! এটাকি সত্যি কোন নিয়ম নাকি অনিয়ম অথবা নিপাতনে সিদ্ধ !
কয়েক বছর আগের একটা ঘটনা মনে পরছে...আমাদের পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোক । তার মায়ের মৃত্যুর পর প্রায় ১৬ মাস নকল মা সাজিয়ে পেনশন এর টাকা উত্তোলন করতেন । তার বাবা পোস্ট অফিসে চাকুরি করতেন । সেই সূত্রে বাবার মৃত্যুর পর তার মা পেনশন ভোগী ছিলেন । কিন্তু মায়ের যখন মৃত্যু হল বেচারা ভদ্রলোক লোভ সামলাতে পারেননি । চোরের দশদিন গ্রেহস্তের একদিন । অবশেষে তিনি ধরা পরলেন । ওই সময় এটা শহরের আলোচিত ঘটনা হয়েছিল । লোকাল পত্রিকায় বিষয়টি নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছিল ( আমি লিখেছিলাম ) কিন্তু ‘তিনি’ আইনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন । এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকারি অফিস সমূহে আসলেই দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে । তবে ওই ঘটনার পর পেনশন প্রদানের ক্ষেত্রে এখন বেশ কড়াকড়ি লক্ষিত হয় ।
মাঝে মাঝে ডাকঘরে টেলিফোন বিল দিতে যেতাম। চিরাচরিত ভাবে এক/দুই এমনকি পাচঁ টাকার ভাংতি তারা কখনো ফেরত দেয় না । বলে ভাংতি নেই । এক/দুই টাকা এখানে হয়ত কিছুই না কিন্তু এভাবে সবার কাছ থেকেই নেয়া হয় যা তাদের পকেটে যাচ্ছে ।
একদিন আমি সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার পাওনা এক টাকার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম কিন্তু লোকটি অমাকে তা দিতে পারল না । বলল ঘুরে আসেন ভাংতি হলে দেব । কিছুক্ষণ পর আমি অন্য কাজ সেরে ওখানে গেলাম কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত লোকটিকে পেলাম না আর আমি আমার সচেতনতার প্রমাণ ঘটাতে পারলাম না !
এই আমরা , আমাদের ডাকবিভাগ তথা সরকারি ক্ষেত্র । চাইলেও আমরা অনেক কিছু পরিবর্তন করতে পারিনা বা পারব না । আমরা হতাশার সাথে বলি , আমাদের দেশটা কোনদিন পরিবর্তন হবে না !
দেশ কখনো বদলাবে না , বদলাতে হবে আমাদের নিজেদেরকেই । আমরা যেদিন নিজেদেরকে বদলাতে পারব সেদিন বাংলাদেশও বদলাবে...!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



