আমার প্রিয় পোস্ট

দাঁতাল বাঘ

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ বিকাল ৫:৩০

শেয়ার করুন:                   Facebook

হিমু মন্তব্য করেছে একটা পোস্টে আবার বিবর্তন নিয়ে লেখা শুরু করতে, সেও লিখবে বলেছে। আসলে বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখাগুলোর একটা বড় অংশ কেবল মানুষের বিবর্তন নিয়ে আমরা আলোচনা করি, অথচ বিবর্তন মেকানিজমের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে মানুষের বিবর্তনের এমন কোন বিশেষত্ব নেই আর দশটা জীবের চেয়ে। মানুষকে তৈরী করা বিবর্তনের টার্গেট ছিল না, এখনও নয়, ন্যাচারাল এভ্যুল্যুশনের কোন টার্গেট নেই। বিবর্তন এখনও থেমে নেই, প্রতি জেনারেশনেই আমরা, এবং অন্যান্য জীব একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি, ন্যাচারাল সিলেকশন (survival of fittest) যেসব জীব তুলনামূলক ভাবে ভালো বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মেছে তাদেরকে টিকিয়ে রাখবে, বাকীরা আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সমস্যা হচ্ছে ভালো বৈশিষ্ট্যের কোন ইউনিভার্সাল সংজ্ঞা নেই, পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে কখন কোনটা সুবিধা পাবে। যেমন সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে ক্রেটাশাস যুগে ডায়নোসররা তাদের অতিকায় আকৃতির (আরো বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য সহ), এ কারনে অন্যান্য প্রানীর চেয়ে ওরা তুলনামূলক ভাবে বেশী সুবিধা পাচ্ছিল। তখনকার যুগে তারাই সবচেয়ে সফল প্রানী, অথচ যখন একটা গ্রহানু বা ধুমকেতু এসে পৃথিবীকে আঘাত করল (মেক্সিকোর ইউকাটানে) তখন অতিকায় আকৃতি, খাদ্য পিরামিডের চুড়ায় থাকাই তাদের জন্য কাল হল। সুবিধা হঠাত্ করে বদলে গেল অসুবিধায়। ডায়নোসর সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়, প্রায় তের কোটি বছর পৃথিবীতে রাজত্ব করার পর।

বেশীরভাগ জীব অবশ্য ডাইনোসরদের মতো নাটকীয় বিলোপের (Mass Extinction) সুবিধা পায় নি। Ice Age 2 মুভিটা দেখলাম ওইদিন, প্রথমটাও ভালো লেগেছিল আমার কাছে। এই মুভিতে যেসব প্রানী দেখানো হয় এর অনেক গুলোই কিন্তু এখন বিলুপ্ত। যেমন হাতির মতো দেখতে চরিত্র Manny আসলে এখনকার সময়ের আফ্রিকান বা ভারতীয় হাতি নয়, বরং বরফ যুগের উলী ম্যামথ (Wooly Mammoth). ম্যামথ আরো ছয় হাজার বছর আগে থেকেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই সিনেমার কাহিনী অবশ্য বিশ হাজার বছর আগের। অথবা বিরক্তিকর চরিত্র Sid হচ্ছে স্লথ, সম্ভবত মেগাথিরীয়াম (Megatherium) বা জায়ান্ট স্লথ, মূলত উত্তর এবং দক্ষিন আমেরিকার অধিবাসী। আর Diego হচ্ছে Saber Toothed Tiger(দাঁতাল বাঘ ) এবং খুব সম্ভব আমেরিকার স্মাইলোডন (Smilodon) প্রজাতি।

দাঁতাল বাঘের বিশেষত্ব হচ্ছে এদের উপরের চোয়ালের বিশালাকৃতির দুটি দাঁত। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এরকম দাঁতওয়ালা বাঘের বেশ কয়েকবার আলাদা ভাবে উদ্ভব হয়েছে, অর্থাত্ একবার এরকম প্রানী উদ্ভব হয়ে তারা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, বহু লক্ষ বছর পরে আবার কাছাকাছি বৈশিষ্ট্যের দাঁতওয়ালা প্রানীর উদ্ভব হয়েছে, সময়ের সাথে আবার তারাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাসে এটা ভীষন স্বাভাবিক কোন ঘটনা নয়, এরকম বারবার একই বৈশিষ্ট্য আলাদা প্রানীতে উদ্ভব হওয়া। যেমন 50 থেকে 15 লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা এবং এশিয়ায় একরকম দাঁতাল বাঘ ছিল যাদের নাম দেয়া হয়েছে ডাইনোফীলিস (Dinofelis)। ডাইনোফীলিস প্রায় আড়াই ফুট লম্বা বাঘ (তার মানে বেশী বড় নয়)। আফ্রিকায় এদের অনেক ফসিল (জীবাশ্ম) পাওয়া গেছে, দুঃখজনক হচ্ছে এদের ফসিলের আশে পাশে অনেক অস্ট্রালোপিথেকাসের ফসিলও আছে। অস্ট্রালোপিথেকাস 40 থেকে 30 লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ, আকারে আমাদের এখনকার আকৃতির চেয়ে একটু ছোট। অস্ট্রালোপিথেকাসের নামকরা ফসিল হচ্ছে "লুসি", বিজ্ঞানী ডনাল্ড ইয়োহানসন (Donald Johanson) 1974 সালে ইথিওপিয়ার হাডার এলাকায় ফসিলটি খুজে পান। গৃহযুদ্ধের কারনে অবশ্য লুসির পরে আর খুব বেশী খোজাখুজি চালানো যায় নি ইথিওপিয়ায়। পূর্ব আফ্রিকার এই দেশগুলো এক অর্থে আমাদের মাতৃভুমি, আমাদের পুর্বপুরুষরা লক্ষ বছর আগে এখানেই ছিলেন। ফসিল আবিস্কারের ধরন, এবং কয়েকটি ফসিলে দাঁতের দাগ দেখে মনে হয় লুসির মতো প্রানীরা ওই সময় ডাইনোফীলিসের সহজ শিকার ছিল।

প্রায় পচিশ লাখ বছর আগে আমেরিকায় আরেক ধরনের বিশাল আকৃতির দাঁতালো বাঘের উদ্ভব হয়, আগেই উল্লেখ করেছি এর নাম স্মাইলোডন। স্মাইলোডনের অসংখ্য ফসিল আছে আমেরিকা জুড়ে। গড়ে এদের দাঁতের দৈঘর্্য সাড়ে আট ইঞ্চির মতো। এত বড় দাঁত ঠিক কি কাজে লাগত বলা মুস্কিল। কারন আকারে বড় হওয়ার জন্য এরকম দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশী, বিশেষ করে কামড়াতে গিয়ে যদি হাড়ের সাথে সংঘর্ষ হয়। স্মাইলোডনের সময় পৃথিবীতে বরফ যুগ চলছিল, এসময় মোটা চামড়া বা পশমী অনেক প্রানীর উদ্ভব ঘটে, যেমন উলী ম্যামথ বা উলী রাইনো (গন্ডার), হতে পারে আট ইঞ্চি লম্বা ধারালো দাত এসব মোটা চামড়ার প্রানী শিকারে সাহায্য করত। মানুষ আমেরিকা মহাদেশে পা দেয়ার আগেই সম্ভবত স্মাইলোডন বিলুপ্ত হয়ে যায়, যদিও অনেক সিনেমায় দেখানো হয় স্মাইলোডনের সাথে গুহমানবরা মুখোমুখি হচ্ছে।

এ মুহুর্তে পৃথিবীতে কোন দাঁতাল বাঘ নেই, তবে ওরা যেহেতু ঘুরে ফিরে বারবার ফিরে আসে, কে জানে পরবর্তি বরফযুগে হয়তো আবার দেখা যাবে।

[ইটালিক]ছবিঃ সংগৃহিত[/ইটালিক]

 

 

  • ১২ টি মন্তব্য
  • ২১৯ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ২ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ১১:৩৭
comment by: অতিথি বলেছেন: এতবড় দাঁত মনে হয় আর হইবো না ।
২. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ১:৩৪
comment by: অতিথি বলেছেন: পড়লাম, আগ্রহ নিয়ে ।
৩. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ রাত ২:৫৮
comment by: অরূপ বলেছেন: হিমুর একটা পোষা স্মাইলোডন আছে!
হিমু তাকে পিরিচে করে টাকিলা খাওয়ায়
৪. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ ভোর ৬:৪৯
comment by: অতিথি বলেছেন: ডরাইসি।

ভাল লাগল পড়ে।
৫. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সকাল ৮:২৫
comment by: অতিথি বলেছেন: দারুন
৬. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সকাল ১১:১৩
comment by: মাহবুব সুমন বলেছেন: @ অরুপ
আমিতো ভেবেছিলাম বালতিতে করে টাকিলা খাওয়ায় !
৭. ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সকাল ১১:১৯
comment by: অতিথি বলেছেন: আমার প্রিয় ট্রপিক। পড়লাম আগ্রহভরে।
৮. ০১ লা জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:২৯
comment by: runningX বলেছেন: বেশ মজা পেলাম জ্ঞানও বুদ্ধি পেল।
৯. ০১ লা জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৩৭
comment by: হযবরল বলেছেন: সাইবেরিয়ান বাঘের নাম কেন ডিয়েগো রাখলো সিনেমায় এইটা আমার মাথায় ঢুকে না, না কি ওরা স্নাইলোডনরে দেখাইছে।
১০. ০১ লা জানুয়ারি, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৪২
comment by: অতিথি বলেছেন: মানুষের আবির্ভাব কত আগে?
১১. ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:২৩
comment by: অতিথি বলেছেন: ভালো লাগলো ।
১২. ০২ রা জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ১০:৩৭
comment by: runningX বলেছেন: দাতগুলো ভালো লাগে নাই। কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি!

 



 

comment by:
উৎসের সন্ধানে ...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ১৮৯৩৭