মৃত্যুর অনিবার্যতা কতখানি গ্রহনযোগ্য?
১৮ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১০:২০
মৃত্যু নিয়ে একটা আবেগী পরিবেশ তৈরী হয়েছিল ব্লগে তখন পোস্টটা দেব ভাবছিলাম, আসলে হিমুর সাথে কথা বলতে গিয়ে সে বলছিল এই নিয়ে পোস্টাতে। যাইহোক দেরী হয়ে গেল, পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিয়ে এখন কিছুটা শান্ত হয়েছে। একটা সময় ছিল যখন পরিচিত কাউকে আমি মরে যেতে দেখিনি, মৃত্যকে বেশ দুরের এবং দুর্লভ ঘটনা মনে হতো। স্কুলে থাকতে ট্রাকের নিচে পড়ে একজনকে মরতে দেখেছিলাম, এত বড় শক পেয়েছিলাম যে দুই বছর ওই রাস্তায় আর যাই নি। কেন যাই নি অনেকদিন পর এখন বিশ্লেষন করলে মনে হয় আসলে ভয় পেয়েছিলাম যে আমি নিজেও ওরকম ট্রাকের নীচে পড়ে বসতে পারি ইত্যাদি (সংক্ষেপিত), একধরনের স্বার্থপর চিন্তা থেকে আসলে আর যাওয়া হয় নি। আরও পরে বেশ বড় হয়ে যাওয়ার পর আমার নানা মারা গেলেন বার্ধক্যজনিত কারনে 93 বছর বয়সে। বাবা মার পরে মনে হয় নানা আত্মীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ক্লোজ ছিলেন আমার। মাত্র কয়েকবছর আগের ঘটনা হওয়ায় পরিস্কার মনে আছে, আমার মা পালস দেখছিলেন সকাল বেলা, তখনই আমার মার হাতের মধ্যে বসেই নানার হার্ট শেষবারের মতো ধ্বক করে উঠে থেমে গেল। আমি তাড়াতাড়ি নানার গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম গা তো এখনও গরম, কিন্তু কোন কারনে নানা আর নিঃশ্বাস নিচ্ছেন না, এমনিতেও গত কয়েকদিন খুব আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন। কিন্তু এত সহজে চোখের সামনে নিঃশব্দে মরে যাওয়া যায় বিশ্বাস হচ্ছিল না। এর কয়েক বছর পর বাবাও সামনাসামনি মারা গেলেন ক্লিনিকের বেডে মাত্র 57 বছর বয়সে। ঘন্টাখানেক আগেও আমার মায়ের সাথে সামান্য কথা হচ্ছিল বাবার। এর পর থেকে মানুষের মরে যাওয়াটাকে বেশ সহজলভ্য মনে হয়। প্রসেসটা আসলে স্রেফ একটা সুইচ অন অফ করার মতই সরল।
বাবা মার মৃত্য একটা ভীষন ইমোশনাল প্রক্রিয়া, নিজে এর ভেতর না দিয়ে গেলে বোঝা অসম্ভব বলেই মনে হয়। বাবা যখন কোমায় যাচ্ছিলেন আমরা ধরে নিতাম আর হয়তো বেচে উঠবেন না। যেকোন কারনেই হোক আমি বাবাকে একা পেলে জেনে নিতাম আসলে কেমন লাগছে, কি মনে হয় আসলে স্রষ্টা আছে, মৃত্যুর পরে কি কিছু আছে। শুরুতে বাবা খুব মাইন্ড করেছিলেন। আসলে প্রথমবার বাইরে নিয়ে যাওয়ার পর বাবা বেশ খানিকটা সুস্থ হয়ে যাওয়ায় আমরা ধরে নিয়েছিলাম এ যাত্রা বোধহয় বাবা বেচেই গেলেন। বাসার অন্যরা ভালো চোখে না দেখলেও বাবা ফিরে আসার পর মৃত্য, কোমায় যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতাম। আসলে একটা টিভি প্রোগ্রামে একবার দেখাচ্ছিল অনেকে কোমায় গিয়ে একটা টানেল দেখতে পায়, অনেকে দেখে একপ্রান্তে একটা তীব্র উজ্জল আলো। আশ্চযর্্যজনক ভাবে বাবা টানেল বা আলো কোনটাই দেখতে পান নি। টানেল রহস্যের অবশ্য এখন সমাধান হয়েছে, এর কারন মস্তিষ্কে অক্সিজেন ডেফিসিয়েন্সি, সুপার সনিক জেটের পাইলটরাও অনেক সময় এরকম দেখে থাকেন। মৃত্যুর অবব্যহিত পুর্বে ঠিক কি হয় এটা জানার কৌতুহল ছিল। অনেকে ফেরেশতা দেখে, কেউ ভয় পায়, কেউ দুঃস্বপ্ন দেখে। দুঃখজনক ভাবে মারা যাওয়ার কয়েকঘন্টা আগেও আমি খোজ নিয়েছি বাবার কাছে কোন কিছু সন্দেহজনক মনে হয় কিনা, বা এনিথিং সুপার ন্যাচারাল। কোনটাই না। বরং আগের দিন বিশ্বকাপ নিয়ে আমি একতরফা আলোচনা করলাম, বাবা টুকটাক মন্তব্য করলেন। এবং কয়েকঘন্টা পরে উনি নেই।
এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোন প্রমান দেখিনি মৃত্যুর পরের জীবন বা প্রক্রিয়া নিয়ে। তবে মৃত্যু যেহেতু এখনো রিভার্সিবল নয়, সুতরাং মৃত্যুকে গুরুত্বের সাথে না নিয়ে উপায় নেই। মানুষের ইতিহাস ঘাটলে দেখব মৃত্যু নিয়ে মানুষের কৌতুহল খুবই পুরোনো। নিয়ান্ডার্টাল, ক্রোম্যানিয়ন দের আমলে ওরাও মৃত্যুকে আলাদাভাবে দেখেছে। এবং সভ্যতার শুরু থেকেই একটা চেষ্টা ছিল কিভাবে না মরে থাকা যায়। এই চেষ্টার ওপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে আছে নানা কাহিনী, এবং বিশেষভাবে বেশীরভাগ, হয়তো, সমস্ত ধর্ম। মিশরীয়রা যেমন বিশ্বাস করত মামি বানিয়ে রাখলে আবার বেচে ওঠা যাবে। আবার অনেক ধর্মের কাহিনীতে আছে অমৃত পান করলে আর মরতে হবে না। উপমহাদেশের অনেক ধর্মে আছে জন্মান্তরবাদ, অমর থাকার একরকম অল্টারনেট। মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মগুলোতে আছে মৃত্যুর পর বিচার ব্যবস্থা, তারপর অনন্ত উদ্দ্যেশ্যহীন জীবন। এসব কাহিনীর সত্যমিথ্যা প্রমান করা বেশ সহজ। কিন্তু লক্ষ্যনীয় হচ্ছে সবগুলোতেই কোন না কোনভাবে অনন্তকাল বেচে থাকার হাতছানি আছে।
কয়েকবছর হয়ে যাওয়ায় এতদিনে আমার বাবা, নানা, দাদা সবাই মোটামুটি রিসাইকেল্ড হয়ে গেছেন ধরা যায়। হাড়গুলো ছাড়া বেশীরভাগ বায়োলজিকাল অংশগুলো প্রকৃতি এর মধ্যেই নিশ্চয়ই রিক্লেইম করে নিয়েছে। হয়তো মাংসগুলো ইদুর, সাপ, ওয়র্ম, ব্যক্টেরিয়া খেয়ে ফেলেছে। আবার তাদেরকে খেয়েছে ফুড পিরামিডে এদের ওপরে যারা আছে, শেষমেশ অনেককিছুই হয়তো ফুড পিরমিডের মাথায় আছে মানুষ তাদের কোন সদস্যের শরীরে গিয়ে জমা হয়েছে। হয়তো আমার গায়েই আছে। আত্মার কি হয়েছে, বা আদৌ কিছু হয়েছে কি না আমার জানা নেই। ওনাদের আত্মাদের কেউ আমার সাথে কোন যোগাযোগ করে নি এখনও। আসলে আত্মা নামে আদৌ কিছু আছে কি না সন্দেহ। বায়োলজিকাল রিসোর্সগুলো না হয় পুনব্যবহ্ৃত হচ্ছে, কিন্তু বাবার যে বিশাল স্মৃতি ভান্ডার ছিল সেগুলো কোথায়। শেষ 20 বছরে লেখা ডায়েরীগুলো আছে, কিন্তু ডায়েরী তো আর পুরো স্মৃতি, অভিজ্ঞতাগুলো নয়। মৃত্যু এইদিক থেকে চিন্তা করলে একটা বিশাল অপচয়। সভ্যতার জন্য একটা বড়সড় লোকসানী ঘটনা। আর ব্যক্তিজীবনে তো অবশ্যই। পরকালে আরেকটা জীবন আছে এটা হয়তো স্রেফ স্বান্তনা। নো ওয়ান্ডার অমৃতের এত ডিমান্ড কাহিনী-উপকাহিনীতে।
আরো কিছু অনিবার্য বিষয় ছিল আগে। যেমন যক্ষা, কুষ্ঠ, গুটি বসন্ত হলে রক্ষা ছিল না। বিভিন্ন কারনে এগুলো আর অনিবার্য নয়। রোমানদের আমলে মানুষের গড় আয়ু ছিল 18। একশতক আগেও ছিল 40 এর নীচে। এখন অনেক দেশেই 80র ওপরে। বলাবাহুল্য দোয়াদুরুদ, ঝাড়ফুকের কারনে মানুষের জীবন এত লম্বা হয়ে যায় নি। যদি এসব মন্ত্র পড়লে লাভ হতো তাহলে সপ্তম শতাব্দিতে বা এরকম যখন নতুন ধর্ম এসেছে তার পরপরই মানুষের আয়ুতে তার একটা প্রভাব দেখা যেত। সেরকম কোন প্রমান নেই। প্রমান যা আছে তাহলো পেনিসিলিন বা এরকম এ্যান্টাইবায়োটিক আবিস্কারের পর হঠাত্ করে মানুষের আয়ু বেড়ে যাওয়া। বিজ্ঞানের উন্নতির কারনে মানুষ এখন বেশিদিন বাচে ঝাড়ফুক, দোয়াদুরুদের জন্য নয়।
কিন্তু মৃত্যু প্রসঙ্গে বিজ্ঞান কি করতে পারে? এই অংশটুকু পরের লেখায়। শুধু এটুকু বলে রাখি আজকে, 2035 সাল পর্যন্ত বেচে থাকা খুবই জরুরী, যদি মৃত্যুকে পাশ কাটাতে চান। হয়তো 2030 এই হবে। ঠিক মেইনস্ট্রীম মিডিয়ায় আসার মত ঘটা করে এসব গবেষনা হচ্ছে না অবশ্য। মৃত্যু থেমে গেলে আমাদেরকে দ্রুত আশেপাশের গ্রহগুলো কলোনাইজ করতে হবে। অনেক জিনিষই আছে যেগুলো মরে যায় না, অথবা যাদের জীবনকাল ভীষন দীর্ঘ শত মিলিয়ন বছর, যেমন জিন। কিন্তু কিভাবে মানুষের জন্য এরকম কৌশল প্রয়োগ করা যেতে।
হিমু, আপনার কথা ছিল সিঙ্গুলারিটির বাংলা একটা সমার্থক বের করে আমাকে দেবেন। এখন লাগবে আমার।
কনফুসিয়াস বলেছেন:
চমৎকৃত হলাম পড়ে। মৃত্যুকে পাশ কাটানোর সময় কি আসলেই এত কাছে নাকি? পরেরবার আরো ডিটেইলে জানাবেন।
অতিথি বলেছেন:
এক নিশ্বাসে পড়লাম। চমৎকার বিশ্লেষণ। ধন্যবাদ আবারও।
অতিথি বলেছেন:
এক কথায় অসাধারণ!
পথিক!!!!!!! বলেছেন:
অপবাক হয়ে এক িনশ্বাসে পড়ে গেলাম ..........চমৎকার লেখা
হযবরল বলেছেন:
বাবার মৃত্যু। এটার ভেতর দিয়ে না গেলে আসলে বুঝা সম্ভব না, এটার তীব্রতা।
উৎস বলেছেন:
কনফুসিয়াস রে কুর্টযওয়াইলের সাইটে গিয়ে দেখেন - !@!20921। রে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মির উপদেষ্টা এবং আরো অন্যান্য কিছু। ওভারঅল টাইমফ্রেম 2030 থেকে 2040। খুব বেশী বাধা আর নেই, রে-র ধারনা 2010 এর দশকেই মৌলিক কয়েকটা আবিস্কারের পর বিষয়টা পরিষ্কার হবে।পথিক, ঠিক আছে।
হযু, কথা আসলেই ঠিক। কিছু কিছু জিনিস হারানোর পর তার মুল্য বোঝা যায়।
ধন্যবাদ আড্ডাবাজ।
সারিয়া তাসনিম বলেছেন:
বড় লেখা দেখলেই কেটে পরি , অলসতা । সেদিন হিমু'র একটা লেখা মুগ্ধ হয়ে এক নিঃশ্বাসে পড়েছিলাম ।
আজ আপনার লেখা পড়লাম ।
অসাধারন !
সহজ - সাবলীল কিন্তু ষ্পষ্ট
অতিথি বলেছেন:
সবই বুঝি, কিন্তু জগতে অসহায়, বঞ্জিত, নিপীড়িত আর শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কষ্ট লাগে যখন জানি ইহকালের যন্ত্রনাই শেষ, এর পর হতভাগ্যদের জন্য আর কিছু নাই।
অতিথি বলেছেন:
চমতকার, অসাধারণ।
হিমু বলেছেন:
ভালো লাগলো পড়ে। আরো ঘন ঘন পোস্ট চাই আপনার কাছ থেকে। ইনসমনিয়াক ইয়াবাখোরদের উৎপাতে ভালো পোস্ট পাচ্ছিলাম না কয়েকদিন ধরে, এই পোস্টটা পড়ে স্বস্তি ফিরে পেলাম।কিন্তু সিঙ্গুলারিটি তো দেখছি শাব্দিকভাবেও সিঙ্গুলার। এর বাংলা ভাবতে গিয়ে তো ঘেমে যাচ্ছি। দ্্বৈপিকতা (দ্্বীপ থেকে) বলা যেতে পারে। তবে এর চেয়েও ভালো বাংলা খুঁজে বার করতে হবে।
রাশেদ বলেছেন:
ভাল্লাগছে।
মো: আটিকুর রহমান বলেছেন:
জীবনের সংগা আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি, এক মাত্র কোরআনেইআল্লাহ পাক এ বিষয়ে বলেছেন।জীবন হছ্ছে আল্লাহর আদেশ বা হুকুম।অনেকটা একটা দেশের মুদ্রার মত।সরকার আদেশ করলে চলে , নিষেধ করলে চলেনা। তদরুপ আমাদের জীবনটাও আল্লাহর আদেশে চলছে।জার্মান দার্শনিক কান্ট বলেসছন, ''আত্বা অমর''।তার প্রধান যুক্তি হছেছ ,এই পৃথিবিতে মানুষের আসল বিচার হয় না।দেখা যাছ্ছে যে যত নীতিহীন ও দু্র্নীতিপরায়ন সে তত বড়লোক বা আরাম
আয়াসে আছে। অপরদিকে যে নীতি নিয়ে চলার চেষ্টা করে সেই তত কষ্টে থাকে।তাই মানুষের আসল বিচারের জন্য আত্নার অমরত্বের প্রয়োজন আছে।এই যুক্তির বিপক্ষে একজন দর্শনিকও মত দেন নি।তার কারন হিসেবে লিখেছেন যে, এই যুক্তির বিপক্ষে মত দিতে
গেলে নৈতিকতার কোনো মুল্য থাকে না।
ধন্যবাদ
মো: আটিকুর রহমান বলেছেন:
জীবনের সংগা আজ পর্যন্ত কোনো বৈগ্গানিক বা অন্য কেও দিতে পারেনি, এক মাত্র কোরআনেইআল্লাহ পাক এ বিষয়ে বলেছেন।জীবন হছ্ছে আল্লাহর আদেশ বা হুকুম।অনেকটা একটা দেশের মুদ্রার মত।সরকার আদেশ করলে চলে , নিষেধ করলে চলেনা। তদরুপ আমাদের জীবনটাও আল্লাহর আদেশে চলছে।জার্মান দার্শনিক কান্ট বলেসছন, ''আত্বা অমর''।তার প্রধান যুক্তি হছেছ ,এই পৃথিবিতে মানুষের আসল বিচার হয় না।দেখা যাছ্ছে যে যত নীতিহীন ও দু্র্নীতিপরায়ন সে তত বড়লোক বা আরাম
আয়াসে আছে। অপরদিকে যে নীতি নিয়ে চলার চেষ্টা করে সেই তত কষ্টে থাকে।তাই মানুষের আসল বিচারের জন্য আত্নার অমরত্বের প্রয়োজন আছে।এই যুক্তির বিপক্ষে একজন দর্শনিকও মত দেন নি।তার কারন হিসেবে লিখেছেন যে, এই যুক্তির বিপক্ষে মত দিতে
গেলে নৈতিকতার কোনো মুল্য থাকে না।
ধন্যবাদ

















