আকাশ’দের বাড়ীর নাম ‘তিলোত্তমা’। উত্তরা’র তিন নম্বর সেক্টরে সাদা রং এর 'ওয়েদার কোট' দেয়া দোতলা একটি ছিমছাম বাড়ী। খুব আহামরি খরচ ছাড়াই একজন রুচিশীল মানুষ যদি নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে কোন বাড়ী বানাতে চান, এই বাড়ীটি তার যথার্থ উদাহরন বটে। এই বাড়ীর সদস্য সংখ্যা তিনজন। সীমান্ত চৌধুরী, তার স্ত্রী সাগরিকা চৌধুরী এবং তাদের একমাত্র সন্তান আকাশ চৌধুরী।
সীমান্ত চৌধুরী একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। নিষ্ঠা এবং যশ এর সাথে চাকরী করে গেল বছরে চাকুরীকাল শেষ করেছেন। সারা জীবনের পুঁজি আর সঞ্চয় দিয়ে এই বাড়ীটি বানিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরন করেছেন। পরম আত্মতৃপ্তিতে তিনি বাড়ির নাম রেখেছেন - ‘তিলোত্তমা’। এখন তিনি নির্ভেজাল অবসর কাটাচ্ছেন। বেশ কেটে যাচ্ছে তার দিনগুলো। বন্ধুমহলে ইদানীং তাকে বলতে শোনা যায়, এ্যাই - তোরা আমার লাল গাড়ীটার মত টুকটুকে কোন মেয়ে পেলে জানাস তো। ঘরে এবার বৌ আনতে হবে। হুম্ম। আমরা বুড়িয়ে গেলাম না, কিন্তু ছেলেটা কেমন করে যেন বড় হয়ে গেল! হ্যাঁ... ? ( তারপরই ওনার স্বভাবজাত অট্টহাসি- হাঃ...হাঃ...হাঃ...। )
সাগরিকা চৌধুরী একজন গার্হস্থ্য অর্থনীতির ছাত্রী ছিলেন। বিএ বিএড করে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। এখন পুরোপুরি গৃহিনী। এই মমতাময়ী মা, তার নিপুণ হাতে সংসারের হাল ধরে আছেন। আকাশের বাবা’র মত তিনিও এখন তার সময় কাটানোর জন্যে একজন সঙ্গী খুঁজছেন। তার নিজের মেয়ে নেই বলে, তিনি অধীর আগ্রহে ছেলের জন্য একটা ভাল মেয়ের অপেক্ষায় আছেন। তার বিশ্বাস ঘর আলো করে এক মেয়ে এসে তার আকাশের জীবনটা রাঙিয়ে দিবে। তিনি পরিচিত অনেক'কেই মেয়ে দেখতে অনুরোধ করেছেন। তার মা বলতেন, সব্বাইকে জোড়া মিলিয়ে বানানো হয়েছে। পবিত্র 'কুরআন’এ কথা বলা আছে। আমাদের আকাশে’র জোড়াটা যে কোথায় আছে-সে ভাবনায় বিভোর তার মন।
আকাশ চৌধুরী সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ একজন বুয়েটের গ্র্যাজুয়েট। ও এখন একটা ফার্মে কাজ করছে। নিজের মাস্টার্স কমপ্লিট করতে তার শুধু থিসিস’টা বাকি। অফিসের কাজ ছাড়া বাকি সময়টা আকাশ বাড়ীতেই কাটায় বেশির ভাগ সময়। কিছু সময় বরাদ্দ আছে ওর বন্ধুদের জন্য, আর আরো নিবিড় কিছু সময় একান্ত আপনার। সে সময়ে ও সাধারনত গান শোনে, মুভি দেখে - না হয় নিজের ডায়েরীতে লেখালেখি করে। হঠাৎ হঠাৎ ,কয়েকটি শব্দ তো কয়েকটি লাইন যেন ওর মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ে! শত চেষ্টা করেও সেগুলোকে আর হঠানো যায় না। পরিচিত কোন কবিতার বিশেষ ক’টি লাইন কিংবা প্রিয় কোন গানের নির্দিষ্ট একটি লাইন মনে করতে না পারলে যে এক ধরনের অস্বস্তি হয়, ব্যাপারটা অনেকটা সেইরকম। তাই ঐ সময়গুলোতে আকাশ যেন কেমন বেশ ঘোরের মধ্যে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, এ সময়টা এলেই আকাশের বাবা বুঝতে পারেন এবং তিনি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করেন। কেননা, লেখাটা আকাশের ডাইরীবন্দী হয়ে গেলে সে প্রথমে তাকেই দেখায়। তিনি যত্ন নিয়ে সে লেখা পড়েন এবং মন্তব্য করেন। সে সময় আকাশের মা'ও কাছে থাকেন আর -পিতা-পুত্রের নিবিড় আলোচনা মন দিয়ে শোনেন। সে মূহুর্তটা বড় প্রানবন্ত হয়ে ওঠে। দুই বিশিষ্ট বোদ্ধা যেন তাদের সদ্য প্রসূত শিল্প নিয়ে কথোপকথনে মত্ত। মা ফিরে যান তার কলেজ জীবনের দিনগুলোতে। তখন টি এস সি’তে বসে উঠ্তি কবি আর লেখকদের নিজ ও অপরের লেখা নিয়ে জমজমাট আড্ডা চলতো ঘন্টার পর ঘন্টা। এখনো নিশ্চয় ক্যান্টিনগুলোতে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে সহপাঠীদের মধ্যে...।
আশ্চর্য ! সময়টা কেমন করে যে আমাদের ফাঁকি দিয়ে ফুরুৎ করে উড়ে যায়। ভাবতে ভারী অবাক লাগে!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


