ফেব্রুয়ারী মাস এলেই চারিদিকে বেশ পরিবর্তন চোখে পড়ে। অমর একুশ’কে ঘিরে বইমেলা, সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতা উৎসব আর স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোতে বিশেষ নাটক কিংবা টেলিফিল্ম এর কারনে ভাষা আন্দোলন এর চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস প্রকট ভাবে প্রতীয়মান হয়। ইদানীং কালে যোগ হয়েছে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’। আবেগ, অনুরাগ, ভাবনা আর আহবান নিয়ে ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম তেরটি দিন পেরিয়ে গেছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো আকাশ। দূরে কোথাও কোন নৈশ প্রহরীর বাঁশীর শব্দ শোনা গেল। নিস্তব্ধ রাতে- সেই শব্দ সকলকে জানান দেয় যে, ‘আমি আছি। তোমারা নিশ্চিন্ত মনে নিদ্রা যাও’। বিকট শব্দ তুলে একটা প্লেন উড়ে গেল ওদের বাড়ীর ঠিক উপর দিয়ে।
আকাশ তার হাত ঘড়িতে সময় দেখলো। এখন রাত ১১টা ৪৭ বাজে। আর কিছু সময় বাদে ঘড়িতে ১২টা বাজার সাথেই আকাশ ২৬’এ পা দিবে। সে জানে বাবা-মা সারপ্রাইজ দিবেন। এখন বাইরে বের হলে সব মজা নষ্ট হয়ে যাবে। তাই আকাশ নিজের রুমেই বসে রইলো। বাবা’র মুখে সেই পঁচিশ বছর আগের ঘটনাটি এতবার শোনার পর থেকে -সে যেন কল্পনায় স্পষ্ট দেখতে পায় সেই ছবি।
বৃহত্তর টাংগাইলে পাকুল্লা’র চৌধুরী বাড়ীতে সবাই তখন প্রতীক্ষার প্রহর গুনছিল। রাতের আঁধার মিলিয়ে যাবার ক্রান্তি লগ্নে একটি শিশু সকলের প্রতীক্ষার ইতি টেনে চিৎকার করে কেঁদে আত্মপ্রকাশ করেছিল। সকলেই একত্রে বলেছিলেন, আলহামদুলিল্লাহ্। ধাত্রী এসে জানালো যে- চৌধুরী’সাব, আপনার ফুটফুটে একটা পোতা হইছে- মাশআল্লাহ্ । চৌধুরী সাহেব খুশী হয়ে তাকে দশ টাকা বক্শিস দিলেন। বাচ্চার কানে আযান দেয়া হলো। ততক্ষনে আকাশে আলো ফুটেছে। চৌধুরী সাহেব তার ছেলে’কে কাছে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো মুছে তিনি বললেন, নবজাতকের নাম রাখা হবে-আকাশ চৌধুরী। আকাশের বিশালতাকে বক্ষে ধারন করে যে অনেক বড় হবে ইনশাআল্লাহ্।...
দেয়াল ঘড়ির বার’টা বাজার সংকেত এ আকাশের কল্পনার ছবিতে ছেদ পড়লো। প্রায় এক সাথেই ডাইনিং রুম থেকে ভেসে আসলো জন্মদিনের কোরাস। অতঃপর ওর দরজায় টোকা পড়লো।
সে বাইরে এসে দেখে বাবা-মা ডাইনিং টেবিলে কেক সাজিয়ে মোমবাতি জ্বালাচ্ছে। কাছে এসে দেখা গেল, নীল আর সাদা রং এর ক্রীমে ঢাকা একটি কেক। মনে হচ্ছে -এক টুকরা আকাশ যেন। আকাশ বললো, অপূর্ব হয়েছে মা- ‘The best cake that I have seen ever Maa’!
মা বললেন, আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারী। ‘শুভ জন্মদিন বাবা’। এরপর ওরা তিনজনে মিলে মোমবাতি নেভানোর পালায় মাতলো। বাবা-মা দু’জনই আকাশ’কে কেক খাওয়ালেন। সেও তাদের’কে কেক খাওয়ালো। আকাশ বাবা-মা’কে পা ছুঁয়ে সালাম করলো। বাবা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। পরম স্নেহে কপালে চুমু খেলেন। মা আদর করলেন আর একটা সুন্দর গিফ্ট বক্স উপহার দিয়ে বললেন, কই খোল্।
আকাশ বক্স খুলে দেখে ভেতরে একটা চাবি। মনে হয় এটা Toyota গাড়ীর চাবি। সে এ জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। আকাশ অবাক দৃষ্টিতে চাবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। সম্বিত ফিরতেই সে দেখলো বাবা-মা দরজা খুলে প্রায় গাড়ী বারান্দায় পৌঁছে গেছেন। সেখানে যেয়ে ও ধপাস করে সিড়ির উপর বসে পড়লো। একটা Toyota Carina-My Road রাখা আছে সেখানে; গাড়ীটা কালো রং এর মডেল ১৯৯৩। অবিশ্বাস্য! মা তার ছেলেকে শুধালেন, কি আমাদের তোর গাড়ীতে চড়াবি না?
কিছুক্ষন পরে দেখা গেল, উত্তরা রোডে আকাশের গাড়ীটি ছুটে চলেছে। আকাশের বাবা এসি অফ্ করে জানালা খুলে দিলেন। রাতে ঢাকার ফাঁকা রাস্তা। নিয়ন লাইটের আলোয় বড় মায়াবী দেখাচ্ছে চারিপাশ।
আকাশ অডিও সেটের Play বোতাম চাপতেই; গান শুরু হলো-
বন্ধ হয়ে গেছে
সব কফি আর রেস্টুরেন্ট।
বৃষ্টি ভেজা রাস্তা
ফাঁকা হয়ে গেছে বাস স্ট্যান্ড।
এটা আকাশের অন্যতম প্রিয় একটি গান। পার্থ'র গাওয়া গানটির ছন্দের তালে Carina গাড়ীটা যেন উড়ে চলেছে। জানালা খোলা ছিল বলে, সবার চুল বড্ড এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ক্ষতি নেই। গাড়ীর তিনটি প্রান যেন আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। বলা বাহূল্য , প্রত্যেকের চোখে জল। এর নাম আনন্দ অশ্রু! এই অশ্রুপাত সেই কবে থেকে শুরু হয়েছে কে জানে? তবে আমাদের জীবনে এর প্রচলন ছিল, আছে এবং থাকবে...।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


